"এমপি আনোয়ারুল আজিমের পুত্র বধূ আপনি। আপনাদের নিজস্ব ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমার কাছে এসেছেন সাহায্য চাইতে? আসলে কারণ ক্লিয়ার করুন।"
" পদবি কিংবা ট্যাগ শব্দটা শেষ স্যার। আমি এখন আলাদা। অফিসিয়ালি হইনি এখনো তবে অতিদ্রুত হয়ে যাবো। স্বতন্ত্র হিসেবে আমি তো আপনার কাছে সাহায্য চাইতেই পারি।"
সান্নিধ্য পায়ের উপর পা তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সামনে বসা নারীটির ভাবমূর্তি লক্ষ্য করে। নিরেট কন্ঠ স্বরে বলে," সাহায্য চাওয়ার অনেক লোক রয়েছে। আমাকেই কেনো মনে হলো আপনার?"
"আপনার কাছে আসলে সাহায্য পাবো এই আশায়। এছাড়া এখানে আপনারও সুবিধা আছে। শুধু আমার একার নয়।"
"আমার সুবিধা?"
"জ্বি স্যার।"
চোখের নিচে কালি জমা ক্লান্তক্লিষ্ট রমণীটি মেঝেতে দৃষ্টি রেখে লম্বা করে শ্বাস টেনে নেয়। জরাজীর্ণ দেহে শক্তি সঞ্চয় করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেও নিজেকে সংবরণ করে নেয় অতিকষ্টে। সুস্পষ্ট কন্ঠে বলে, "এমপি আনোয়ারুল আজিম এবং তার পরিবার কতটা নিকৃষ্ট এটা হয়তো আপনি জেনে থাকবেন স্যার। উনার একমাত্র পুত্র বধূ হওয়া সত্ত্বেও আমাকে দিনের পর দিন মাসের পর মাস তাদের অত্যাচার সহ্য করে আসতে হয়েছে। উনার ছেলে একটা কুলাঙ্গার চরিত্রহীন। একাধিক নারীর সঙ্গে মেলামেশা। বিয়ের পর কিছু দিন ভালো গেলেও তারপর হতে আমার উপর শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। আমার শাশুড়ী ননদ ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাদের ছেলে সম্পর্কে আমি কিছু বলতে গেলেই উল্টো আমাকে শাসিয়ে দিতেন। মেরে ফেলার হুমকি দিতেন।"
"আপনার বিয়ে হয়েছে কত বছর আগে?"
"দুই বছর।"
"এতোদিন পর মুখ খুলছেন হঠাৎ?"
"সহ্যসীমা হারিয়ে ফেলেছি স্যার। নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলার পর মনে হয়েছে আর চুপ থাকা সম্ভব নয়।"
সান্নিধ্য পাশে দাঁড়ানো আরহাম আসিফের দিকে এক নজর তাকিয়ে সামনে বসা ক্রন্দরত নারীকে বলে," আপনার কি তাহলে পুলিশি সাহায্য দরকার?"
"না । পুলিশ ক্ষমতার কাছে নতশির হয়ে থাকে। আমি ওনাদের বিরুদ্ধে কেস করলে সঠিক বিচার পাবো না।"
"আপনার ফ্যামিলি জানে?"
"লাভ ম্যারেজ। আমি আমার পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলাম। বাসা থেকে আমাদের মেনে নেয়নি। তাদের জানানোর কোনো সুযোগ নেই। আমি একা জন্য ভয়ে চুপ করে থাকতাম। সব অন্যায় মেনে নিতাম। কিন্তু শেষ পর্যায়ে তাদের নিকৃষ্ট রূপ দেখে আর পারিনি চুপ থাকতে। আপনার কথা শুনেছি, আপনি ভরসাযোগ্য। এজন্য প্রায় এক মাস ধরে চেষ্টায় ছিলাম আপনার সাথে দেখা করার।"
সান্নিধ্য থুতনির নিচে হাত রেখে স্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,"আপনি মূলত কি ধরনের সাহায্য চাইছেন আমার কাছে থেকে সেটা বলুন। আপনার সাথে যেসব অন্যায় হয়েছে সেগুলো মীমাংসা করা নাকি আইনগত কাজে সাহায্য করা।"
"আমি কি চাই সেটা নিজেও জানি না স্যার। আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। আমি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছি। আমাকে অনেকেই বুঝিয়েছিলো এই পথে না আসতে কিন্তু কারো কথা শুনিনি। মোহে পড়ে আজ সব হারিয়ে ফেলেছি। তবে,আমি চাই উনাদের এই নোংরা মুখোশটা জনসম্মুখে আসুক। মানুষ দেখুক তাদের এমপি সাহেব কতটা অমানুষ।"
"শান্ত হন। আপনি কেইস করুন। আইনগত সাহায্য আমার পক্ষ থেকে আসবে।"
"স্যার একটা অনুরোধ রাখবেন?"
"বলুন।"
রমণীটি হাতের তালুতে ভেজা চোখের পাতা মুছে। দমকানো কান্নাটাকে প্রশমিত করে লাল চক্ষুরেখাতে তাকায় সান্নিধ্যের দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে শক্ত গলায় বলে," আমার তথাকথিত স্বামীকে আমি নিজ হাতে জ'বাই করতে চাই স্যার। আপনি আমাকে শুধু একটু সাহায্য করুন। আপনি আমাকে সেই সুযোগটা সৃষ্টি করে দিন। প্লিজ স্যার..প্লিজ।"
সান্নিধ্যের সঙ্গে সঙ্গে আসিফ আরহাম দু'জনেই বেশ অবাক হয় রমণীটির মুখের কথা শুনে। একে অপরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে আসিফ বিস্মিত গলায় বলে," আপনি জ'বাই করতে চান মানে?"
"আমার অনাগত সন্তানকে আমার স্বামী মেরে ফেলেছে । আমি এর প্রতিশোধ নিতে চাই।"
"আপনার কি কোনো সেন্স আছে আপনি কি বলছেন? না..মানে.."
সান্নিধ্য সামান্য উঁচিয়ে আসিফকে চুপ করতে বলে। রমণীটির দিকে তাকিয়ে ধারালো স্বরে বলে," আপনি ডেস্পারেট হয়ে উঠেছেন। নিজেকে কন্ট্রোল করুন। আপনার সন্তানকে মেরে ফেলার প্রতিশোধ আপনি আইনগত দারস্থ হয়ে নিন। জবাই করা আপনার কাজ নয়।"
"আমি পরিতৃপ্তি পাবো না স্যার। প্লিজ একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আর শত্রু তো ওরা আপনারও । আপনার নিজেরও তো লাভ আছে।"
" এরকম শত্রু আমার অনেক। তাই বলে সবাইকে তো আর গলা কাটতে পারিনা। যখন আমার পায়ে পা লাগাতে আসবে তখন আমি ধরবো।"
রমণীটি মলিন হাসে। স্তব্ধ কন্ঠে বলে," আপনার সুবিধার কথা বলি তাহলে। বুঝতে পেরেছি স্বার্থ ছাড়া কেউ কাজ করে না।"
সান্নিধ্য ঠোঁট চেপে মৃদু হাসে। মাথা নাড়িয়ে সেই তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি বজায় রেখে বলে, "আপনি নিজেও তো স্বার্থ হাসিলে আমার কাছে এসেছেন। ব্যাকআপ হিসেবে এনেছেন আমার সুবিধা। আমি গেস করতে পারছি আপনি হয়তো আমার বিরুদ্ধে তাদের কোনো গোপন ইনফরমেশন কালেক্ট করে এনেছেন। যেটা জানলে আপনার ভাষায় আমার সুবিধা হবে। আমি আপনাকে সাহায্য করবো। এগুলো নতুন নয়। যাই হোক বলুন, কি সুবিধা।"
রমণীটি স্থবির হয়ে সামনে বসা এমপি সাহেবের কথা গলাধঃকরণ করে। মস্তিষ্ক অনায়াসে জানান দেয়, লোকটা ভীষণ ধূর্ত। অতিদ্রুত ধরে ফেলেছে পুরো বিষয়টা।
"বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে আপনার সঙ্গে আনোয়ারুল আজিমের একটু দ্বন্দ্ব লেগেছিলো। সেই দ্বন্দ্ব ঘি ঢেলেছে আপনার প্রতিপক্ষ নাসির চৌধুরী। সে আনোয়ারুল আজিম সহ তাদের কাতারের অনেক ক্ষমতাসীনদের বুঝিয়েছে সামনের নির্বাচনে যে করেই হোক আপনাকে পতন ঘটিয়ে তাকে আসন দেওয়ার। যাতে এই সব বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে কোনো ঝামেলা পোহাতে না হয়। আপনি যেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন জনগন আপনার কাজ দেখে সন্তুষ্ট। এতে আনোয়ারুল আজিম জ্বলছে। সে হাত মিলিয়েছে নাসির চৌধুরীর সঙ্গে। তারা আপনার বিপক্ষে অতিদ্রুত মাঠে নামবে এবং আপনাকে হারাবে। মাস্টার প্ল্যান চলছে আর কি।"
"আপনি এক কাজ করুন তাহলে কিছুদিন অপেক্ষা করুন। আমার পদটার বয়স চলছে ৩ বছর ৪ মাস । হাতে আছে ১ বছর ৬ মাস। দেখতে দেখতে পার হয়ে যাবে। যেহেতু সামনে নির্বাচন ব্যাপক গন্ডগোল হবে। এক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আপনার চাওয়াটাও পূরণ হয়ে যেতে পারে।"
"ধন্যবাদ স্যার। আমি অপেক্ষা করতে রাজি আছি। আমি আমার প্রতিশোধ পূর্ণ করে দরকার হলে ফাঁসির দড়িতে ঝুলবো তবুও কাজটা করবোই। আমার সন্তানকে মেরে ফেলার দায়ভার আমি এড়িয়ে যেতে দিবো না।"
সান্নিধ্য হাত ঘড়িতে সময় দেখে নেয়। শেহরিনের ভার্সিটিতে ক্লাস শেষ হবে দেড়টার দিকে। আজকে যেহেতু বাসায় আছে তাই নিজে যাবে রিসিভ করতে।
"আপনার পার্সোনাল ইনফরমেশনগুলো জানিয়ে রাখবেন। বর্তমানে কোথায় আছেন?"
" হাটহাজারীতে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে আছি। আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। তবে আমি যেনো মুখ না খুলি তাদের বিরুদ্ধে সেজন্য সার্বক্ষণিক লোক দিয়ে নজরে রাখে।"
"বুঝতে পেরেছি। ইনকাম সোর্স কি?"
"জমানো কিছু টাকা আছে কাছে।"
"শেষ হলে কি করবেন?"
"জানা নেই ।"
" এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশান?"
" এইচএসসি পাশ।"
সান্নিধ্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। টি শার্ট টেনে আরহামকে শান্ত গলায় বলে,"উনাকে একটা কর্মংস্থানের ব্যবস্থা করে দিবে।"
আরহাম মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে রমণীটির দিকে তাকিয়ে বলে,"আপনার সার্টিফিকেটগুলো কালকে আমার কাছে জমা দিবেন।"
রমণীটি নিজেও বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। চোখের কোণে জ্বলজ্বল করতে থাকা অশ্রগুলোকে হটিয়ে নির্মেদ স্বরে বলে,"এমনি এমনি আপনার কাছে আসিনি। লোকমুখে সত্যিকারে নেতার কাছেই এসেছি। ধন্যবাদ স্যার আপনাকে। অনেক অনেক ধন্যবাদ। এটা আমার জন্য ভীষণ প্রয়োজন ছিলো।"
"ইট’স ওকে। কোনো সমস্যা হলে আমার লোকেদের জানাবেন।"
রমণীটি বিদায় নেওয়া মুহুর্তে দরজার কাছে যেতেই সান্নিধ্যের ফের কন্ঠস্বর ভেসে আসে। দু'হাত প্যান্টের পকেটে রেখে পিছন না ঘুরেই বলে," আপনার নাম কি?"
রমণীটি থেমে যায়। সেই সাথে পদচারণাটা থামে আসিফেরও। হালকা মাথা ঘুরিয়ে ধীর গলায় বলে," জাফরিন তালুকদার।"
দিন পেরোয় দিনের মতো করে। জাগতিক নিয়মে ক্যালেন্ডারের পাতার সঙ্গে পরিবর্তন হয়ে যায় মাস আর ঋতুর নাম। হালকা শীতে এসে ভীড়ে শহরের বুকে। গৌধূলিকালে ফিনলে স্কোয়ারে শপিং এ মত্ত অন্বেষা এবং তিথি।
"আমি সত্যি বিশ্বাস করতে পারছি না অন্বেষা, তুমি এতো বড় একটা ডিসিশন ইজিলি নিতে পারবে।"
"কাম অন ভাবি। লাভ ইস্যুতে সব সম্ভব।"
"তাই বলে এতো তাড়াতাড়ি এনগেজমেন্ট করবে?"
" এতো তাড়াতাড়ি না ভাবি। আমাদের এতো মাসের রিলেশন। রাহাদ তো লিট্রেলি আমাকে পাগল করে ফেলছে এনগেজমেন্ট এর জন্য। বার্লি ট্রিপ এর আগে একটা সাইনিং তো রাখা উচিত।"
"মাই গড বার্লি ট্রিপ। রিচ কিড?"
অন্বেষা বাঁকা হেসে একটা স্ক্যার্টার ড্রেস চয়েস করে। নিজের গায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দেখতে বলে,"ইয়েস ক্রোড়পতি। বাট অনেস্টলি এটা রিয়েল লাভ ভাবি। আমি ওকে সত্যি ভালোবাসি।"
"কি বলছো? এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে মন ডাইভার্ট করলে? সান্নিধ্য মন থেকে বের হয়ে গেলো?"
" সান্নিধ্যের সঙ্গে এখন আমার আর কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক নেই। যা ছিলো ওর বউ এসে দূর করে দিয়েছে। এখন শুধুই প্রতিশোধের সম্পর্ক। আমার গায়ে হাত তুলেছে না ওই মেয়ে? ওর হাত আমি দুমড়ো মুচড়ে দিবো।"
তিথি নিজের জন্য কিছু ড্রেস দেখে। হতাশার নিঃশ্বাস ঝেড়ে বলে," বাট আমি তোমাকেই এক্সপেক্ট করেছিলাম সান্নিধ্যের সঙ্গে।"
"ওও..ইউ আর ভেরি সো সুইট ভাবি। সুখনিবাসে একমাত্র তুমি আর ফুপিই আমার বিগ সার্পোটার।"
"হুহ। আসলে না তো আমাদের কাছে।"
"কি করবো!! হয়ে গিয়েছে অন্য জায়গায়। রাহাদকে ছাড়া সম্ভব নয়।"
"গাঢ় প্রেম?"
"ইয়েস গাঢ় প্রেম।"
"বাট তুমি শিউর তো অন্বেষা? সামথিং.."
তিথির সংশয় মাখানো কন্ঠে অন্বেষা ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
"তুমি কি ভেবেছো ভাবি? আমি বোকা? শেয়ালের লেজে পা দিয়ে ফাঁদে পড়বো? নোহ!! অন্বেষা এত বোকা নয়। অন্বেষা চোখ কান খোলা রেখে শেয়ালের সঙ্গে লড়াই করবে।
রাহাদকে ইয়েস বলার আগে ওর ফুল এভিডিয়েন্স আমি কালেক্ট করেছি। ওর সাথে সান্নিধ্যের কোথাও কোনোভাবেই সংযোগ নেই। সেটা পলিটিকাল দিকে হোক, ফ্রেন্ডস কিংবা পরিচিত যেদিকেই হোক না কেন। নো কানেকশান উইথ হিম।"
"তাহলে ঠিক আছে। তুমি আসলেই অনেক বুদ্ধিমতি মেয়ে অন্বেষা। তুমি পারবে সান্নিধ্যের সঙ্গে টক্কর দিতে।"
"টক্কর যে আমাকে দিতেই হবে ভাবি।"
একসাথে হাসাহাসি করতে করতে ফের শপিং এ ব্যস্ত হয়ে উঠে অন্বেষা তিথি। এনগেজমেন্ট উপলক্ষে একগাদা শপিং করে দুজনে । রাহাদ এর সঙ্গে অবশেষে তার প্রণয়ের বাঁধন জোড়া লাগছে।
"সরি ম্যাম কার্ড এক্সিস্ট করছে না।"
"সরি?"
"প্লিজ চেক।"
তিথি বিরক্তি ভঙ্গিতে সেলসম্যানের থেকে ক্রেডিট কার্ডটা নিয়ে নিজে ট্রাই করে। কার্ড রিডারে যতবার দেয় ততবার ডিক্লেইন লেখা দেখে তার মেজাজ গরম হয়ে উঠে। চোখ হতে সানগ্লাস খুলে পার্স হতে ডেবিট কার্ড বের করে। কিন্তু ফলাফল একই।
"আশ্চর্য এমন হচ্ছে কেন?"
"ম্যাম আপনার ক্রেডিট এবং ডেবিট দুটো কার্ডই সম্ভবত ব্লক করা হ'য়েছে।"
"ব্লক হবে কেন?"
একগাদা শপিং শেষ করে কাউন্টারে এসে পেমেন্ট করা নিয়ে ঘটে বিপত্তি। হঠাৎ করে ক্রেডিট ডেবিট দুটো কার্ডই রেস্ট্রিকটেড দেখাচ্ছে। তিথির তরতর করে মেজাজ খারাপ হতে থাকে। এতোগুলো শপিং এর পেমেন্ট করতে না পারলে তো মান সম্মান থাকবে না। আজকে সন্ধ্যায় অন্বেষা আর রাহাদের এনগেজমেন্ট। একটা ডায়মন্ড এর রিংও নেওয়া হয়েছে তাও সেটা অন্বেষার পছন্দনুযায়ী। এই সময় এমন বিপত্তি!
"ভাবি তোমার আর সরফরাজ ভাইয়ার জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট নেই?"
অন্বেষার কথায় হুঁশ ফেরে তিথির। এটা এতোক্ষণ কেন মনে আসেনি। তার আর সরফরাজের তো জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সেখান থেকে সে তো অবাধে কত টাকা তোলে। আর আজ এই সময় টাকা কোথায় পাবে এটাই ভেবে পাচ্ছিলো না।
"ওয়েট আ মিনিটস।"
তিথি এটিএম বুথে এসে তড়িঘড়ি করে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট হতে টাকা তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু তার মাথায় বাজ ফেলে বুথে লেখা উঠে, "ইনসাফিশিয়েন্স ফান্ডস।"
চরম আক্রোশে তিথি মুখ হতে বিরক্তিকর ধ্বনি বের করে। অসহ্য লাগছে তার। রাগে গা কাঁপছে। এই সময় এরকম হতে হয়? কি করবে, কি করবে ভেবে উপায় না পেয়ে সে আগুন গরম হয়ে কল করে ব্যাংক ম্যানেজার আসাদুল করীমকে।
" সমস্যাটা কি? আমি টাকা তুলতে পারছি না কেন? আমার ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড সব ব্লক হলো কি করে? তামাশা করছেন? অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা উঠাতে পারছি না। আমার কি আসতে হবে?"
"ম্যাম শান্ত হন প্লিজ। আপনার সমস্ত কিছু বিশেষ নির্দেশনায় টেম্পোরারি ফ্রিজ করা হ'য়েছে। সলো উইথড্র রাইট স্থগিত করা হ'য়েছে আর কি।"
"অটো পেমেন্ট? "
"বাতিল করা হয়েছে ম্যাম।"
"আমি বলছি অ্যাক্টিভ করুন।"
"সরি ম্যাম এটা সম্ভব নয়৷ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এগুলো এরকমই থাকবে। ধন্যবাদ।"
তিথি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফোন চেপে ধরে। বিক্ষুব্ধ নয়নে এক দৃষ্টিতে সামনের পানে তাকিয়ে থাকে সে। চোখ তার লাল হয়ে এসেছে। এসব কিছু যে সরফরাজ করেছে সেটা অনায়াসে বুঝতে পারছে। তাকে ফাইনান্সিয়াল দিকটাতে উইক করার জন্য এসবকিছু।
" কারণটা কি? এমন করছো কেন তুমি আমার সাথে সরফরাজ?"
" আস্তে কথা বলো। কি হয়েছে? "
"আমার সবকিছু ফ্রিজ করেছো কেন? তুমি জানো আমি এখন কি অবস্থায় আটকে আছি। "
" কন্ডিশন ফেস করতে শেখো তিথি।"
তিথি ক্রোধান্বিত হয়ে নিজেকে কন্ট্রোলে করার চেষ্টা করে। কানে ফোন চেপে দাঁতে দাঁত পিষে শক্ত গলায় বলে,"আমাকে রাগিও না। প্লিজ সবকিছু স্ট্যাবল করো। পেমেন্ট করাটা জরুরি। বোঝার চেষ্টা করো। নিজের ওয়াইফের সঙ্গে শত্রুতা করতে লজ্জা করে না তোমার?"
"জাস্ট শাট আপ। কোনো কিছু স্ট্যাবল হবে না। না এখন, আর না ভবিষ্যতে। অনেক উড়েছো, উড়িয়েছো। এবার নিজের লাগাম টানতে শুরু করো। সামনে খারাপ দিন অপেক্ষা করছে। ফোন রাখো, আমি বিজি। বাসায় গিয়ে কথা হবে।"
___________________________________
চট্টগ্রামের বিলাসবহুল হোটেলের বলরুম হতে ঝাড়বাতিগুলোর নরম সোনালি আলো ঝরছে চকচকে ফ্লোরজুড়ে। মখমল কার্পেট, ক্রিস্টালের গ্লাস সঙ্গে সবার উচ্ছ্বাসমাখা বদন। রাজ্জাক সাহেব একমাত্র কন্যার এনগেজমেন্ট অনুষ্ঠানটা বেশ সাড়ম্বরে আয়োজন করেছেন। অতিথি সমাগমে ভরপুর। সুখনিবাস হতে শাহজাহান সাহেব মিসেস নাজনীন এবং তিথি ও তাসিন এসেছে। আসেনি শুধু সরফরাজ সানজি। তবে, তিথি উপস্থিত থাকলেও তার মুখে নেই কোনো হাসি। এতো কাছের মানুষের স্পেশাল একটা দিনেও তার মুখোরেখা মলিনতায় ছেয়ে আছে। যেনো মনে হচ্ছে শুধু মাত্র দাওয়ার রক্ষার্থে তার এখানে আসা।
জাঁকজমকপূর্ণ আড়ম্বরের এই রাতের কেন্দ্রবিন্দু অন্বেষা।পরেছে ঝলমলে বডি টাইট ফিটিং সাদা একটি গাউন। গাউনের নেকলাইনে রয়েছে সূক্ষ্ম পিঠের কাজ। ঝালরের ওপর হাতে তোলা ফুলের নকশা। গলায় ঝুলছে নেকলেস। পায়ে ক্রিস্টাল হিলের স্যান্ডেল। পিছনে লো বানে বাঁধা চুল, তাতে গুঁজে দেওয়া হয়েছে সাদা গোলাপ। সব মিলিয়ে প্রিন্সেস এর ছোঁয়া এনেছে নিজের মাঝে।
ঘড়ির কাঁটা নয়টার পার হয়। রাহাদের আসার সময় হয়ে গিয়েছে। নিজেকে আয়না পুনরায় দেখতে দেখতে গুনগুনিয়ে গান গাইতে থাকে অন্বেষা। ঠোঁটের কোণে তার উচ্ছ্বাস মাখা হাসি। ফাইনালি একজন বিত্তবান জীবন সঙ্গী পেলো সে। সাথে পেলো অগাধ ভালোবাসা।
"এটাই তো চেয়েছিলাম আমি । যেখানে ভালোবাসা অর্থ দুটোই থাকবে। অ্যাকচুয়ালি যেকোনো একটাতে অন্বেষার পোষায় নাহ। অর্থ ও লাগবে ভালোবাসাও লাগবে।
নিজমনে বিরবির করে ঠোঁট নাড়ায় সে। এর মাঝে বেজে ওঠে ফোন। ভেসে উঠা নাম্বার দেখতেই তার মুখে হাসি ফোটে। তৎক্ষনাৎ রিসিভ করতেই অপর পাশ হতে ভেসে আসে,
"মাই লাভ তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ রয়েছে একটু বের হতে পারবে কি?"
"কোথায়?"
" ইটস ভেরি স্পেশাল। আমি বলছি। তুমি বের হও সুইটহার্ট।"
অন্বেষার সামান্য কপাল কুঁচকে গেলেও ঠোঁটের কোণে হাসি বিদ্যমান থাকে। এক হাতে গাউনের একাংশ তুলে ধরে অপর হাতে ফোন কানে চেপে ধরে সে বের হয় বাহিরে।
"একি অন্বেষা কোথায় যাচ্ছো তুমি?"
"বাবা জাস্ট আ সেকেন্ডস। রাহাদ..."
অন্বেষা তাড়াহুড়ো করে রাহাদের কথামতো রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ায়।
"এসেছি এখন।"
"একটু সামনে এগিয়ে এসো।"
"আমি সত্যি বুঝতে পারছি না তোমার সারপ্রাইজ রাহাদ।"
"ওহ ডার্লিং কাম অন। দারুণ একটা সারপ্রাইজ। তুমি ভীষণ খুশি হবে।"
"আচ্ছা সামনে একটা চিরকুট পড়ে আছে। এটার কথাই বলেছো তুমি?"
"হ্যাঁ। চিরকুট নাও এবং খোলো।"
অন্বেষা অধিক উত্তেজনায় কাঁপা কাঁপা হাতে চিরকুটটা খোলে। এখানে নিশ্চয়ই তার আবদার করা বিএমডব্লিউ গাড়ির কথা লেখা রয়েছে। রাহাদ তাকে বলেছিলো এনগেজমেন্ট এর দিন তাকে স্পেশাল এবং ইউনিক ওয়েতে বিএমডব্লিউ গিফট করবে। তার মানে এটাই তার সেই ও'য়ে।
"হাই অননেসা ডার্লিং,
শুরুতেই সরি। আমার পক্ষে তোমাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। কারণ খান সাহেব পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে বলেছেন তোমাকে ভুলে যেতে তাই ভুলে গেলাম। এতোদিন ধরে অভিনয় করার জন্য দুঃখিত। আসলে আমার সবকিছু ভাড়ায় চালিত। যা যা গাড়ি বাড়ি টাকা কড়ি দেখিয়েছি সব ভাড়া করা মানুষের। আমি পেশায় একজন ডিশ লাইন ম্যানেজার। তবে আমি শিক্ষিত পোলা। ডিগ্রি পাশ করেছি। আর আমার নাম রাহাদ না,ছাগল জবাই করে আকীকা করে নাম রাখা হয়েছে আহমদ আলী। সবাই আলী নামে ডাকে। তুমি ও চাইলে আলী বলে ডাকতে পারো। যদি সবকিছু ভুলে আমায় ডাকো,
" ও আলী...
আমি তোমায় ভালোবাসি... "
তাহলে আমি দৌড়ে চলে আসবো তোমার কাছে। ভালোবাসা কি টাকা দিয়ে হয় বলো? আমি না হয় তোমাকে ডিশ লাইনের রাণী বানাবো। রঙিন টিভির ঝলকানিতে শুধু তোমার নামই লেখা থাকবে। যাই হোক, ভালো থাকো ডার্লিং। এখন কাজে ফিরতে হবে। অনেকদিন বসে খেয়ে খেয়ে গায়ে তেল জমে গিয়েছে। এগুলো এখন ছাড়াতে হবে। তবে শোনো সুইটহার্ট, মন আমার গরিব হলেও দেহখানা কিন্তু বড়লোক। ওয়ান্স এগেইন, ভেবে দেখতে পারো। "
পুরো চিঠিটা পড়ে অন্বেষার মুখ সাদা হয়ে যায়। কাঁপতে থাকা হাত স্থির হয়ে যায় মুহুর্তেই। নিজেকে মনে হয়,সে যেন মাটি ফুঁড়ে গভীর অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের মধ্যে জট পাকিয়ে আসছে। অবিশ্বাস্য নজর তার চিরকুট হতে সরে না। এগুলো কি হচ্ছে? সে কি ভ্রম দেখছে? নাকি সত্যি !!
মুখ ফুটে অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে উঠে অন্বেষা। দু কদম পিছিয়ে সে দেয়ালের সাথে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঘোলাটে চোখে অদূরে দাঁড়ানো এক মানবকে দেখে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়।
কালো রঙের গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সান্নিধ্য। পড়নে তার সাদা শার্ট। শার্টের টপ দুটো বাটন খোলা। স্লিভ ফোল্ড করে কনুই অব্দি টেনে রেখেছে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেটটা তার মতোই জ্বলছে। ঠোঁটে হালকা এক বিদ্রূপের হাসি। নীরবে, নির্দয়ভাবে কোনো একভাবে সে তার পাওনা মেটায় অন্বেষাকে দেখে। দু ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট চেপে সে পকটে হতে ফোন হতে বের করে।
" অননেসা,, মন ভাঙার চেয়ে বিয়ে ভাঙার কষ্টটা কি বেশি? মন খারাপ করো না। সানজি মন খারাপ করেনি। জাস্ট একটু কলিজায় ঘা দিলাম তোমার। হ্যাভ আ গুড নাইট।"