গা মোড়ানো উষ্ণতায় অবশেষে শীত আসে ধরণীতে ধীর পায়ে। শিশির ভেজা শিউলি ফুলের সাদা কমলা রঙের ছোঁয়ায় ভরে উঠে বাগিচা। কুয়াশার আবরণে দূর পাহাড় হয়ে উঠে অস্পষ্ট। মাথা উঁচু গাছগুলো হতে ঝরে টুপটাপ জলের কণা।
নভেম্বরের শুরু। শীতভেজা সকালে মিষ্টি রোদ এখনও দেখা না দিলেও বেলকনি হতে ভেসে আসছে বাবা মেয়ের মিষ্টি আদুরে কথন। দূরত্বের মাঝে আটকা পড়া বাবা, মেয়ের নতুন জার্নিতে চাইলেও পারছে না শামিল হতে। তবে, আনন্দে আত্মহারা সে। তার ছোট্ট আদুরে রাজকন্যা নাকি 'মা' হবে আর সে হবে নানুভাই।
" ওহহো বাবা। একটু বিশ্বাস করো আমি সত্যি বড় হয়ে গিয়েছি। আমি এখন প্রোপ্রারলি ভাত রান্না করতে পারি, সবজি কাটতে পারি, মুরগি রান্না করতে পারি, ডাল রান্না করতে পারি, ডিম ভাজতে পারি। ঘরে কোথায় কোনটা ডেকোরেশন করতে হবে সেটা শিখেছি।"
"আস্তে আস্তে মা। বাবা এতোকিছু একসাথে নিতে পারছে না তো।"
"তোমার এখনও অবিশ্বাস লাগছে বাবা?"
"অবিশ্বাস না মা। বাবা আসলে মানতেই পারছে তার রাজকন্যা বড় হয়ে গিয়েছে।"
শেহরিন এক হাতে গ্রিল চেপে মুখে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি টানে। নরম গলায় বলে," আমি যখন একদম বুড়ি হয়ে যাবো,আমার চুলগুলো যখন পেকে সাদা হয়ে যাবে তখন যদি তুমি আমাকে দেখো নিশ্চিত বলবে, এই এই আমার রাজকন্যা, আমার ছোট্ট মা। এটা ধরো না, ওটা করো না ব্যথা পাবে। তুমি তো এখনও বড়ই হওনি।"
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের কথা শুনে হেসে ফেলেন। সে কি করে বুঝাবে তার মেয়েকে যে, তার চোখ দুটো বড়ই অবাধ্য। মেয়ের লম্বা বিনুনি এর জায়গায় এখনও সে ছোট দুটো ঝুঁটি দেখতে পায়, যে হাতে তার চামচ খুন্তি উঠেছে সেই হাতে এখনও সে রঙিন পুতুল দেখতে পায়, মেয়ের মুখের দিকে তাকালে এখনও তার সদ্য জন্মানো সেই টুকটুকে ছানার মতো লাগে। এই চোখকে কি করে ঠিক করবে সে? সে তো চায় তার মেয়ে বড় হ'য়েছে এটা দেখতে। কিন্তু পারে না কোনোভাবেই। চোখদুটো তাতে সাড়া দেয় না।
"বাবা।"
"জ্বি মা।"
"আমি মাঝে মাঝে ভাবনার অতলে হারিয়ে যাই। যেখানে থাকে না কূল কিনারা। তোমার প্রতিটি কথা আমি জীবনে চলার পথে রিলেট করতে পারছি এখন। সত্যি ! মানুষকে সৃষ্টিকর্তা যে পরিস্থিতিতে রাখেন, সেই পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য যেকোনোভাবে উপযুক্ত করে দেন। আমরা আগে থেকেই ভয় পাই ভাবি কিভাবে কি করবো, কি হবে, কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাট নো, সম্ভব, সব সম্ভব। আমি নিজে তার উদাহরণ। আমি জিরো থেকে খুব হলেও টোয়েন্টি পার্সেন্ট নিজেকে গ্রো করতে পেরেছি সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পরিবেশে। সৃষ্টিকর্তা আমাকে সেই সুযোগটা করে দিয়েছেন, দিয়ে চলছেন। আমার হয়তো তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই।"
" জীবনটা একটা ফেজ মা। এর প্রতিটা স্টেপে রয়েছে সুখ দুঃখ হাসি কান্না। তাই চ্যালেঞ্জ নেওয়া শিখতে হবে। আমি পার্সোনালি খুশি হয়েছি তুমি এরকম একটা কন্ডিশনেও সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছো। তাও সেটা নিজস্ব ইচ্ছেতে এবং স্বীয় আত্মবিশ্বাসে। আমার মনে হচ্ছে এই জার্নিটা তোমাকে দারুণ একটা লিসেন দিবে। তুমি জীবন সম্পর্কে আরো গভীরভাবে জানতে পারবে।"
"আমি প্রত্যেকটা দিনই নতুন কিছু না কিছু শিখে চলেছি বাবা।"
"পড়াশোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে তাই না?"
শেহরিন নিস্তব্ধ ঠোঁটে হাসে৷ এই প্রশ্নের উত্তরটা তার জন্য একটু জটিল। কেননা, সেকেন্ড ইয়ারে ক্লাস ফুলদমে চলছে। পড়াশোনার চাপও বেশ। সেই সঙ্গে দুজোড়া প্রতিপক্ষ তার। ফার্স্ট ইয়ারে রেজাল্টে টপ টু সে। কিন্তু সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনালে টপ টুয়েন্টি হতে পারবে কি না সন্দেহ। শরীরের যে অবস্থা দিন রাত মিলিয়ে চার হতে পাঁচবার বমি করতেই যায়। যেটুকু যা খাবে হজম হতে না হতেই উগড়ে আসে। শরীর হয়ে যায় নিস্তেজ।
"চেষ্টা করছি তাল মিলিয়ে চলার বাবা। এখন দেখা যাক কতদূর যেতে পারি।"
"সেকেন্ড ইয়ারের জন্য টপ প্লেসের এক্সপেক্টেশান ছেড়ে দাও। থার্ড কিংবা ফোর্থ ইয়ারের জন্য তুলে রাখো। সেকেন্ড ইয়ারের জার্নিটা যেহেতু কম্বাইন্ড। সেক্ষেত্রে দুটোকে মাঝামাঝি ব্যালান্সে রাখো। যেন কোনোটাই তোমার হাতছাড়া না হয়ে যায়। সিজি মিডিয়াম হোক নো প্রব্লেম বাট অ্যাজ আ মাদার তুমি সুস্থ থাকো, তোমার অনাগত সন্তান সুস্থ থাকুক। এটা তোমার সিজির চেয়ে অনেক বেশি দামি।"
"আমি নিজেকে স্ট্যাবল রেখে যতটুকু স্টাডি করা যায় করবো। বাট ভয় একটাই এক্সাম টাইমে যদি সি সেকশন নিয়ে.. "
"আল্লাহ ভরসা মা। সবসময় দোয়া করবে আল্লাহ যেনো তোমাকে সঠিক টাইমিং এবং সঠিক ও'য়ে দেখিয়ে দেয়। আগাম চিন্তা আমরা না করি। তুমি নিজেকে যতটুকু তৈরি করে রাখার সেটা রাখতে শুরু করো।"
"হুম বাবা সেটাই। ব্রেকফার্স্ট করেছো তুমি?"
"এইতো করবো। চা চলছে আপাতত। তোমার ব্রেকফার্স্ট কম্পিলিট?"
"সাড়ে আটটার দিকেই হয়েছে।"
"নেতাসাহেব কোথায়?"
"উনি বের হয়েছেন উনার কাজে । আর বের হওয়ার সময় জোর করে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছেন আমাকে। না হলে এতো সকালে তো আমি খেতামই না। আমার মোটেও খেতে ইচ্ছে করে না বাবা। এই যে গলার ধারে খাবার এসে মনে হচ্ছে আটকে আছে। যখন তখন বের হয়ে যাবে।"
"কি খেয়েছো?"
"সবজি খিচুরি আর ডিম পোচ।"
"তুমি রান্না করেছো?"
"উহু নেতাসাহেব করেছেন।"
রিজওয়ান সাহেব চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে হাত থামিয়ে ফেলেন। অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন," সান্নিধ্য করেছে? সান্নিধ্য রান্না করতে পারে?"
" ইউটিউব দেখে। আমি প্রতিদিন সাড়ে ছয়টার দিকে উঠার চেষ্টা করি। কিন্তু বেশিরভাগ দিনেই মিস করে ফেলি। আর উনি আমার আগে উঠেই সব কম্পলিট করে ফেলে। ব্রেকফার্স্ট রেডি করে তারপরে ডাকে।"
"বাহ নেতাসাহেব তো দেখছি সত্যি জেন্টেলম্যান। দম আছে মানতেই হবে।"
শেহরিন স্মিত হাসে। অদূর পানে চেয়ে ধীর কন্ঠে বলে," আমার লেটে উঠার কারণ শুনবে বাবা?"
" বলো শুনি।"
"আমি ছয়টা থেকে সাতটা পর্যন্ত অ্যালাম দিয়ে রাখি। আর উনি আমি ঘুমিয়ে গেলে সবগুলো অ্যালার্ম অফ করে দেয়।"
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের কথা শুনে আয়েশি ভঙ্গিতে চা পান করেন। একজন বাবা হিসেবে মেয়ের এই সুখটা তার ভিতরটাকে শীতল করে তোলে। এইটুকুই তো তার চাওয়া, এইটুকুই ছিলো তার প্রার্থনার মূল অংশবিশেষ। চোখের জল ঝড়িয়ে সে প্রাণপণে যা চেয়ে গিয়েছেন, সৃষ্টিকর্তা তাকে অনেক বেশি দিয়েছেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কি বা হতে পারে। চোখ তার সুখানুভূতিতে ঘোলা হয়ে আসে। খোলা আকাশের পানে নির্নিমেষে চোখে তাকিয়ে আরো একবার প্রার্থনা করে, তার মেয়ের এই সুখটা যেন স্থায়ী হয়।
"উফফ বাবা এই শীতে তোমার হাতে আলু শিম দিয়ে মাছ রান্নাটা এইবার মিস করবো। তোমার মনে আছে প্রত্যেক শীতে আমরা মাসজুড়ে মাছের উপরই থাকি। তুমি সবসময় বলতে শীতে চিকেন বিফ সাইডে রেখে টাটকা সবজি মাছ এগুলো খাও,এগুলোতেই আসল স্বাদ।"
"তোমার মনে আছে দেখছি। ভেরি গুড। বেশি বেশি সবজি ফল মাছ এগুলো খাবা।"
" বাবা জানো, একেক সময় একেক খাবার খেতে ইচ্ছে করে আমার। অদ্ভুত অদ্ভুত খাবার। কিন্তু কোনোটাই হজম করতে পারি না। উনি যতক্ষণ বাসায় থাকে ততক্ষণ তো আমার মুখ চলতেই থাকে। বমি করলেও বলে সমস্যা নেই তবুও খাও। এদিকে যে আমার নাড়িভুঁড়ি উল্টে যায় পেটের মধ্যে সেটা বুঝবে কি করে?"
" হাহা। এজন্যই মা শব্দটা এতোটা দামী। এজন্যই মা এর মূল্য আকাশছোঁয়া। তোমরা যে ত্যাগ স্বীকার করো সেটা অবর্ণনীয়।"
শেহরিন উচ্ছ্বসিত নয়নে চোখ বন্ধ করে দম টেনে নেয়। মুখে হাসি চওড়া করে বলে," আমি নিজেকে নিয়ে ভীষণ প্রাউড ফিল করি বাবা। আমার ভিতরে একটা অস্তিত্ব বড় হচ্ছে। আমি মা এর সম্মানটা অর্জন করছি। এই স্টেজে এসে আমি বুঝলাম,
"জীবনের দ্বার যত জটিল হয়, তত জানালার সৃষ্টি হয়।"
"সাব্বাস মা। গড ব্লেস ইউ।"
|সুখনিবাস, সন্ধ্যা সাতটা|
চা-নাস্তার পর্ব শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ হলো। যে যার ঘরে অবস্থান করছে বর্তমানে। মিসেস নাজনীন রাতের খাবার তৈরির জন্য প্রস্তুতি সারছেন। তার মেজাজ একটু গরমই বলা চলে। খেপেছেন আমিনের উপর। বিকেলবেলায় তার গার্ডেনে পানি দেয়নি সে । ছাদ বাগানের বড় বড় ঘাসগুলো আজ তোলার কথা থাকলেও সেটা তুলেনি। সুখনিবাসের কোনো কিছুর উপর খানিক ত্রুটি সে সহ্য করতে পারে না। এজন্য খানিক হম্বিতম্বি সেড়ে এসেছেন একটু আগে।
"খালাম্মা বড় ভাবি নিচে নামবো না কইলো।"
"কেন?"
"জানি না। কইলো রাতে সে খাইবো না। তাসিনের জন্য শুধু পাঠাই দিতে।"
"আচ্ছা।"
মিসেস নাজনীন খানিকটা সংশয় মন নিয়ে কিচেনের দিকে পা বাড়ায়। ক'দিন হলো সে তিথিকে খেয়াল করে আসছে, আগের মতো উৎফুল্লতা নেই তার মধ্যে । সবসময় কেমন রেগে রেগে থাকে। কথাবার্তার ধাঁচও কেমন বদলে গিয়েছে চোখের পলকেই।
"হলোটা কী? সরফরাজের সঙ্গে কি কিছু হয়েছে?"
উপর তলাতে সচরাচর এই সময় তাসিনের গলা ফাটানো চিৎকার, মাঝে মাঝে জোরে জোরে পড়ার ধ্বনি কিংবা না পড়ার বাহানার সুর ভেসে আসে। কিন্তু আজ তা সম্পূর্ণ নিরব। বাবা আজ বাসায় আছে। সেই কারণে সে বাবার সঙ্গে ভিডিও গেইম খেলতে মজেছে।
"তাসিন একটু ফু'মণির ঘরে যাও তো বাবা।"
"এখন না মামণি আমি খেলছি তো।"
"একটু পরে এসে খেলো।"
"না..না আমি এখন যাবো না। বাবা.."
সরফরাজ তিথির অন্ধকার আবৃত মুখোরেখার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলে," কি হয়েছে?"
"তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।"
সরফরাজ ফের ভিডিও গেইমের দিকে মনোযোগ দিয়ে ছোট করে বলে,"বলো।"
"তাসিনের সামনে বলতে চাই না। ওকে সানজির ঘরে যেতে বলো।"
"না.. আমি যাবো না মামণি।"
তাসিন কাঁদো কাঁদো গলায় সরফরাজের গলা জাপ্টে ধরে। সে কিছুতেই এখন ফু'মণির ঘরে যাবে না। মামণির রাঙানো চোখ পরোয়া না করে সে বাবার আশ্রয় নেয়। সরফরাজ ছেলের নাছোড়বান্দা রূপ দেখে কিছু একটা ভেবে ধীর কন্ঠে বলে, "বেলকনিতে যাও। আসছি।"
তিথি আগুপিছু কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে যায় বেলকনিতে। সরফরাজ ছেলের সঙ্গে আরো মিনিট দুয়েকের মতো সময় কাটায়।
"বাবা তুমি খেলতো থাকো আমি একটু আসছি।"
"তাড়াতাড়ি আসবে।"
"ওকে।"
সরফরাজ বিছানা ছেড়ে উঠে। দু'হাত ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বেলকনিতে পা বাড়ায়। মুখোরেখা তার বরাবরের ন্যায় শান্ত। তবে চোখদুটোতে এক অন্যরকম ধারালো রেশ ছড়িয়ে আছে। অপেক্ষারত অর্ধাঙ্গিনীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে। বাহিরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শীতল কণ্ঠে বলে,
"বলো এখন।"
তিথি নিজের দৃষ্টি বাহির হতে এনে সরফরাজের দিকে নিক্ষেপ করে। থমথমে মুখোরেখায় স্পষ্ট স্বরে বলে, "তুমি কি চাইছো আমাদের সংসারটা এখানেই থেমে যাক?"
"একই প্রশ্ন আমারও।"
"আমি কি করেছি বলবে দয়া করে? আমার উপর এতো রাগ কেনো তোমার? তুমি নিজে আমাকে কোণঠাসা করেছো। রীতিমতো ইগনোর করে চলেছো। এসবের মানে কি সরফরাজ?"
"আস্তে কথা বলো। ভিতরে তাসিন আছে।"
সরফরাজ পকেটে দু'হাত রেখেই তিথির দিকে ঘুরে তাকায়। জ্বলন্ত আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে তিথির দুটো চোখ। বুঝতে পারছে ভিতরটাও একইরকম জ্বলছে। পরিস্থিতিভেদে পারছে না উগড়ে দিতে।
"তুমি কি করেছো সেই হিসেব যদি আমি তুলে ধরি তাহলে তুমি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলবে এই মুহূর্তে। অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছো তুমি। অনেক বড় ভুল। যে ভুলের কোনো ক্ষমা হবে না।"
" সেটাই শুনতে চাইছি কি করেছি আমি?"
"আমাকে বলতে হবে? তুমি জানো না?"
তিথি সরফরাজের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। ভস্মীভূত হয়ে টি শার্ট খামচে ধরে তিক্ত গলায় বলে," এতো জাজ করো কেন তুমি?? আমাকে কি তোমার ওয়াইফ মনে হয় না? সবসময় নিজের ফ্যামিলি আগে রাখো। আমার কোনো গুরুত্ব নেই তোমার কাছে?"
"কি গুরুত্ব চাও তুমি আর? কোথায় আমি তোমাকে কমতি রেখেছিলাম? ভালোবাসায়? কোনো চাহিদা পূরণে? তোমার নিজস্ব স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাতে?"
"আমি কি তোমাকে ভালোবাসি না সরফরাজ??"
সরফরাজ তিথির হাত টি শার্ট হতে ছাড়িয়ে নেয়। মুখে স্মিত হাসি টেনে শক্ত গলায় বলে, "আমি টক্সিক লাভ পছন্দ করি না। কোনো প্রয়োজন নেই।"
"আমি তোমাকে সত্যি অনেক ভালোবাসি।"
"তোমার এইরকম মন মানসিকতার মাঝে সত্যি ভালোবাসাটা মূল্যহীন। এতো নিচু মনোভাব নিয়ে চলা মানুষ কখনো সত্যি কারের ভালোবাসা আনতে পারে না। নিজের পরিবারের যে ক্ষতি চায়,গোপনে গোপনে ধ্বংস করার চিন্তা করে তার মুখে এগুলো বেমানন।"
তিথির বাঁকানো ভ্রু দ্বয় সোজা হয়ে যায়। অতিরিক্ত রাগে চোখের কোণায় তার পানি জমে। নিজের ক্রোধকে সংবরণ করে বলে," কি বলতে চাইছো তুমি?"
"আমি তোমাকে ওয়ার্নিং করেছিলাম মনে আছে? তোমার সংশ্লিষ্টতা আমি পেয়েছি। এবার বলো ল'ইয়ার ম্যানেজ করবে কবে থেকে?"
"সরফরাজ..। "
"শাট আপ তিথি। আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিতে এসো না। আমি যেটা বলেছি সেটাই হবে। এই নোংরা মন মানসিকতা নিয়ে তোমার সঙ্গে আমার সংসারটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না। একজন ভালো স্ত্রী কিংবা ভালো মা হওয়ার যোগ্যতা তোমার নেই।"
তিথির গা বয়ে শীতল স্রোত নেমে যায়। ভস্মীভূত চোখ নিভে যায় দপ করেই। চোখের সামনে সরফরাজের কঠোর রূপ তার আত্মায় কাঁপন ধরায়। হতবিহ্বল কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, "তুমি ডিভোর্স কনফার্ম করতে চাইছো? একটাবার আমাদের ছেলের কথা ভাবলে না? এতোটা রুড হতে পারছো?"
সরফরাজ নিজেদের মধ্যে নূন্যতম দূরত্ব ঘুঁচিয়ে একদম নিকটে এসে দাঁড়ায়। পকেট হতে ডান হাত বের করে সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হাতে ঠাস্ করে চড় বসিয়ে দেয় তিথির বাম গালে।
তিথি আকস্মিক চড়ে তাল সামলাতে পারে না। হেলে পড়তেই সরাসরি কপাল গিয়ে লাগে লোহার গ্রিলে।
"মা হয়ে সন্তানের কথাটা কি তোমার ভাবা উচিত ছিলো না আগে? নিজেকে নোংরা কাজে শামিল করার আগে এটা মাথায় আসেনি তোমার? নাকি আমার শান্ত রূপটাকে তুমি হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছিলে। আমাকে উল্টো বুঝ দিলেই আমি বুঝে যাবো? হাউ ডেয়ার ইউ???"
তিথি অস্ফুটস্বরে কেঁদে উঠে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অনবরত জল। কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে সে ফের সরফরাজের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। বিস্মিত নয়নে তাকিয়ে বলে,
"তুমি আমার গায়ে হাত তুললে ??"
"আরো আগে তোলা উচিত ছিলো। এখন মনে হচ্ছে আমি তোমাকে সুযোগ দিয়ে ভুল করেছি। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে ওয়ার্ন করে ঠিক করার। বাট তুমি আমার ভালোটা ভালোভাবে নিতে পারোনি।"
"শেহরিনের জন্য তুমি এমন করছো আমার সাথে?"
সরফরাজ বাঁকা হাসে। ঠান্ডা গলায় বলে,"সানজিকেও তো ছাড়োনি তুমি। পুরো বিষয়টাতে অন্বেষাকে কম্পানি দিয়েছো তুমি।"
"আমি সানজির ব্যাপারে অন্বেষাকে কিচ্ছু বলেনি। ওরাই এসব করেছে ওদের প্ল্যানে।"
"তুমি জানতে না?"
"আমি পরে জেনেছি।"
"কত পরে জেনেছো? মুহিদ পালিয়ে যাওয়ার পরে তো নয়। আমাকে কেন বলোনি তুমি? মজা দেখতে চেয়েছিলে?"
"আ..
" একটা কথা বলবা না আর। শেহরিন সানজি তোমার কি ক্ষতি করেছে? ওরা তোমার শত্রু? শত্রু মনে করো? আন্সার মি..
সরফরাজের জোরালো গলার ধমকে তিথি কেঁপে ওঠে।
সামনে দাঁড়ানো মানবটির ক্রুব্ধ দৃষ্টি হতে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করলেও ফলপ্রসূ হয় না। মুখ খুলতে গিয়েও হয় ব্যর্থ।
"নিজের বাবার বিজনেস পার্টনারের মন রক্ষার্থে স্বজনপ্রীতি দেখাতে গিয়েছিলে অন্বেষার প্রতি। আমার বোনের ইমোশন তোমার কাছে এন্টারটেইনমেন্ট এর মতো ছিলো। জেলাসি, ইগো নিয়ে শেহরিনকে ছোট করতে। আম্মাকে উস্কে দিতে সব ক্ষেত্রে। তারপরেও কিভাবে বলছো তুমি কিছুই করোনি? আর কি করা বাদ ছিলো তোমার? এতো টক্সিসিটি নিয়ে থাকো কিভাবে?"
"তুমি ভুল বুঝছো আমাকে সরফরাজ।"
"নিজেকে সেভ করার কোনো ওয়ে আর কাজে লাগবে না। মনে করবে তোমার স্বার্থপরতা তোমাকে ধ্বংস করেছে। আমাকে বুঝিয়ে আর লাভ হবে না।"
তিথি সরফরাজের একরোখা জেদ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। মলিন মুখে হেসে বলে,"তোমার কি একটুও খারাপ লাগছে না ডিভোর্স শব্দটা উচ্চারণ করতে?"
" তোমার ভালোটাকে আমি সবসময় মাথায় তুলে রেখেছি। কিন্তু সেটার মান তুমি নিজে কমিয়েছো। তুমি কি এক্সপেক্ট করো আমার থেকে তিথি? তুমি কুকাজ করে বেড়াবে, নিজের ইগো বজায় রেখে চলবে, সবসময় সবক্ষেত্রে অশান্তি সৃষ্টি করবে।আর সেগুলোতে আমি তোমাকে সার্পোট করবো? তোমার পাশে থাকবো। রিয়েলি?? আই'ম নট দ্যা কাইন্ড অফ ম্যান হু উইল টার্ন আ ব্লাইন্ড আই টু ইনজাস্টিস,ওয়েদার ইউ আর মাই ওয়াইফ অর মাই ক্লোজ অন।"
"এসব কিছু শেহরিন তোমাকে...
তিথি কথা শেষ করতে পারে না এর মাঝেই আবারো সপাটে একটা থাপ্পড় এসে পড়ে তার গালে। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত বের হয়ে আসে। সরফরাজের এই অচেনা রুপ তাকে হিমশীতল বরফের ন্যায় জমিয়ে তোলে।
" আর একটা উল্টা পাল্টা কথা বলবে না। তোমার ভাগ্য ভালো এই মুহুর্তে তাসিন আর বাবার কথা ভেবে আমি শান্ত আছি। নয়তো তুমি যা করেছো এর চাইতে ভয়ানক রুপ প্রকাশ্যে আনতে আমি বাধ্য হতাম। একটা মা হারা মেয়েকেও তুমি ছাড়োনি। সুযোগ পেয়ে প্রতি পদে পদে হেনস্তা করে গিয়েছো। মেয়ে হয়ে একটা মেয়ের প্রতি যেখানে তোমার কোনো ভালোবাসা নেই, সম্মান নেই সেখানে একজন ভালো মা হবে কিভাবে তুমি?"
সরফরাজের তীক্ষ্ণ গলার স্বর কানে যেতেই খেলা ছেড়ে দৌড়ে বেলকনিতে আসে তাসিন। চোখের সামনে মামণির কান্না সেই সাথে বাবার রাগী রূপ তাকে ভীত করে তোলে। বড় বড় চোখ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে বাবা মায়ের মধ্যে চলমান অস্থিতিশীল কথোপকথন।
"ভাইয়া কি হয়েছে? কি করছিস তোরা? তাসিনের সামনে এগুলো কি?"
সানজির কথায় এতোক্ষণে তাসিনকে নজরে আসে তিথি সরফরাজের। বেচারা বাচ্চাটা ভয়ে জড়সড় হয়ে ফু'মণিকে পেতেই জাপ্টে ধরে। অস্ফুট স্বরে ডুকরে কেঁদে উঠে সে।
"ফু'মণি আমার ভয় করছে। আমাকে নিয়ে যাও তোমার রুমে।"
সরফরাজ মুখে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। দু কদম এগিয়ে তাসিনের কাছে এসে শান্ত গলায় বলে,"আই'ম সরি বাবা। তুমি ফু'মণির ঘরে যাও। আমি একটু পরে আসছি।"
"সানজি.. প্লিজ তোমার ভাইয়াকে বোঝাও। আমি সত্যি এতোকিছু ভেবে কিছু করেনি..তোমাকে হার্ট করার ইন্টেশন আমার ছিলো না বিশ্বাস করো। প্লিজ.."
তিথির ক্রন্দনরত কন্ঠস্বরে পা থামায় সানজি। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরে তাকিয়ে বলে,
"সরি ভাবি। ভাইয়ার উপস্থিতিতে তোমাদের মাঝে আমার কথা বলাটা অনুচিত। যদিও জানি ভুল তোমার, দোষ তোমার, অন্যায় তোমার। তারপরেও আমি কিছু বলবো না। তবে,চাই তুমি একটা সঠিক লিসেন পাও। অন্যের ক্ষতি করতে গেলে যে নিজের ক্ষতি হয়। সেটা তুমি ফিল করো। আমার নিজের জন্য কষ্ট হচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছে বাচ্চাটার জন্য।"
সানজি তাসিনকে কোলে নিয়ে চলে যায় রুম হতে। স্তব্ধ হয়ে দেয়ালে ঠেঁস দিয়ে দাঁড়ায় তিথী। বাম হাতের পৃষ্ঠে চোখ মুছে বলে,"যে বাসায় আমার কোনো সম্মান নেই, সেই বাসায় আমি এক মুহূর্ত আর থাকবো না।"
"থ্যাংকস তিথি। তুমি চাইলে এখনই চলে যেতে পারো। সময়মতো ডিভোর্স পেপার তোমার বাসায় পৌঁছে যাবে। আর তোমার বাবাকে বলে দিবে তার বিজনেসের অবস্থা রাজ্জাক সাহেবের মতোই হবে। একটু শুধু অপেক্ষা।"
তিথিকে বিমূর্ত করে দিয়ে সরফরাজ চলে যায়। চোখ তুলে তাকানোর প্রয়োজন অব্দি করে না। পারস্পরিক দ্বন্দ্বে তাদের মাঝে তৈরি হয়ে যায় শক্ত এক বিভেদের দেয়াল। যে দেয়াল দুটো মানুষকে ঠেলে দেয় দুদিকে।
---------------------------------------------------
"এসব কি হচ্ছে? তিথি কোথায় যাচ্ছো তুমি? সরফরাজ কোথায়?"
"বউমা শান্ত হও। এমন পাগলামি করছো কেনো হঠাৎ?"
"আমি কোনো পাগলামি করছি না বাবা। আমি আর এ বাসাতে থাকবো না৷ আপনারা প্লিজ আমাকে আটকাবেন না।"
মিসেস নাজনীন অস্থির হয়ে উঠেন। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। তিথিকে আটকানোর প্রয়াসে সে সানজিকে ক্রমাগত ডাকতে শুরু করেন।
" সরফরাজের সাথে কোনো সমস্যা হলে তুমি আমাদের বলো বউমা। আমরা সলভ করছি। এভাবে বাসা থেকে চলে যাওয়াটা কি ঠিক বলো?"
তিথী এক হাতে লাগেজ ঠেলে অপর হাতে চোখ মুছে। তিক্ত গলায় বলে, "আপনার ছেলে সেপারেশন চাইছে। তার ল'ইয়ারও ম্যানেজ করা হয়েছে গিয়েছে। আমার তো তাহলে এ বাসাতে থাকার আর কোনো প্রশ্নেই উঠে না।"
"সরফরাজের বাবা সরফরাজকে ডাকো। এক্ষুণি ডাকো।"
"ভাইয়াকে ডেকে লাভ নেই আম্মা। ভাইয়া তার মত জানিয়ে দিয়েছে। সে তার কথার নড়চড় করবে না।"
মিসেস নাজনীন হতভম্ব হয়ে যায় সানজির কথায়। আশ্চর্যান্বিত কন্ঠে বলে, "সান্নিধ্যের বাতাস লেগেছে নাকি। সে যা বলবে সেটাই মেনে নিতে হবে?"
" আম্মা প্লিজ সিনক্রিয়েট করো না তুমি।"
"সিনক্রিয়েট করবো না মানে? খেলনা নাকি। আমার দাদুভাই এর কথাটা ভাবতে হবে না?"
"ওকে আমি আমার কাছে নিয়ে যাবো। আমার ছেলেকে আমি এ বাসায় কোনদিনই রাখবো না।"
"তাসিন এখন ঘুমে আছে। বাচ্চাটা বেশ ভয় পেয়েছে ভাবি। তুমি নিজেও জানো সে কতটা বাবা ভক্ত। ওর উপর দয়া করে জোরজবরদস্তি করো না, টানাহেঁচড়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। তবুও তোমাদের সমান অধিকার। ওর যখন যার কাছে থাকতে ভালো লাগবে তার কাছেই থাকবে। আপাতত ও ওর বাবার কাছেই থাকুক।"
"আমি সত্যি বুঝতে পারছি না এসব কি হচ্ছে? সরফরাজের বাবা আমার সংসারটা কি এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে?"
তিথি দাঁড়ায় না আর এক মুহূর্ত। মিসেস নাজনীন শাহজাহান সাহেবের অনুরোধ উপক্ষা করে লাগেজ টেনে সোজা বের হয়ে যায় বাসা ছেড়ে। তবে দোরগোড়া পেরোনোর সময় মনে ক্ষীণ আশা জন্মে হয়তো সরফরাজ আসবে। আটকাবে। কিন্তু সেটা পূরণ হয় না। চোখের পানি ঝরিয়ে সে চলে যায় সুখনিবাস ছেড়ে।
"তোমার সংসার ভাঙার মূল কারিগর হচ্ছো তুমি আম্মা। কেবল তো শুরু। একে একে এমন করেই ভাঙন ধরবে। একটা নিরপরাধ এতিম মেয়েকে তুমি বিনা কারণে কথার বাণে, কাজের মাধ্যমে হেনস্তা করেছো। বাড়ি ছাড়া করেছো। আল্লাহ তো তা সইবে না তাই না? এর ফল তো ভোগ করতেই হবে। এইতো শুরু হলো।"
"মেয়ে হয়ে নিজের মা'কে এই কথাগুলো বলতে পারছো তুমি?"
সানজি মৃদু হাসে। মিসেস নাজনীনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,
"দুনিয়াতে সব বাবা মা'ই যে তাদের সন্তানদের জন্য শুভাকাঙ্ক্ষী সেটা কিন্তু না। কিছু কিছু বাবা মা থাকে যারা সন্তানদের ভালো থাকাটা নিজ হাতে গুঁড়িয়ে দেয়। তুমি হচ্ছো সেই মা। তোমার কারণে তোমার ছেলেরা ভুক্তভোগী, ওই নিষ্পাপ বাচ্চাটা ভুক্তভোগী। ক্ষতি কিন্তু ওদেরই হচ্ছে। তোমার আর কি। নিজের ভাইদের কুকর্ম বাঁচাতে তুমি নিজের সংসার নিজ হাতে ধ্বংস করছো। তোমার চোখ বুঁজে আছে। বাট নিয়তি বলেও একটা কথা আছে।"
"প্রশ্নবিদ্ধ করছো?"
"হ্যাঁ করছি। তিথি ভাবির অন্যায়গুলোকে তুমি প্রশ্রয় দিয়েছো,বেয়াদব অন্বেষাকে প্রশ্রয় দিয়েছো, তোমার ভাইদের অন্যায়গুলোকে প্রশ্রয় করেছো। সংসারের কর্ত্রী হিসেবে তোমার বিচার সবসময় ছিল একপাক্ষিক। অথচ উচিত ছিলো নিরপেক্ষ। একজন ভালো মা, একজন ভালো শাশুড়ী কোনোটাই তুমি হতে পারোনি। এতো অহমিকা থাকা ভালো না আম্মা। নিজের ছেলেদের কষ্ট রেখে ক্ষমা করতে পারবে তো নিজেকে?"
"তোমার কথা শুনে আমি অবাক না হয়ে পারছি না সানজি। আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছো তুমি?এসব কিছুর পিছনে আমাকে দায়ী করছো?"
" অবশ্যই দায়ী তুমি। শুরু থেকেই শেহরিনের প্রতি তোমার নেগেটিভিটি ছিলো। আমি বুঝতে পারি না আম্মা তুমি এতো পাথর কিভাবে হতে পারলে? একটা বাচ্চা মেয়ে যে কিনা কিছুই জানে না বোঝে না, সংসার সম্পর্কে যার কোনো ধারণা নেই, একটুখানি মানিয়ে নেওয়ার কি প্রচেষ্টা তার, তাকে তুমি এতো অবহেলা করেছো। ওই মেয়েটার একটু ভালোবাসা পাওয়ার আক্ষেপটাকে তুমি এতো দীর্ঘ করেছো? মায়া হয়নি কখনো? তোমার বিপরীতে অনেক শাশুড়ী আছে যারা ছেলের বউকে নিজের মেয়ের মতো গড়ে তোলে। স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু শিখিয়ে তোলে। তাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে দেখো একটাবার।
আর তিথি ভাবি, অন্বেষা যেসব কাজ করেছে সেগুলো আমি চাইলেই এখন তোমাকে বলতে পারি। কিন্তু বলবো না। আমি চাই তুমি নিজ হতে সবটা জানো এবং লম্বা সময় ধরে আফসোস করো। টিপিক্যাল শাশুড়ীদের মতো যে বিহেভ তুমি করেছো শেহরিনের সঙ্গে সেটার জন্য তোমার অনুশোচনা হোক। গভীর অনুশোচনা হোক। আমি স্বচক্ষে দেখতে চাই সেটা।"
মিসেস নাজনীনকে স্তব্ধ মূর্তি করে দিয়ে সানজি উপরে চলে যায়। শাহজাহান সাহেব স্ত্রীর পানে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিমূঢ় হয়ে সোফায় বসে পড়েন। আপাত সময়ের জন্য সে হারিয়ে ফেলে ভাষা।
এক লগ্নেই সুখনিবাসে এসে ভীড়ে কালো মেঘের ছায়া। ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সেই সাথে থমকে যায় কিছু মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তা ভাবনা আর প্রত্যাহিক জীবন যাত্রা।