শীতের সকালে কোমল রোদ্দুর জানালার পর্দা ছাড়িয়ে ঘরের মধ্যে এসে পড়েছে। চোখের পাতায় মিঠে আলোর সেই রেশ ছড়িয়ে পড়তেই কেঁপে উঠে শেহরিন। দু'হাত মুচড়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সে অল্প অল্প করে চোখ খুলে তাকায়। ঝলমলে আলোমাখা সকালের সূচনা দৃষ্টি কোটরে বন্দি হতেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে সে সময় দেখে। সাড়ে আটটা বেজে চলেছে। আজকে ক্লাস রয়েছে দশটা পনেরো হতে।
আড়মোড়া ভেঙে সে বিছানা ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে। নেতাসাহেব আজকেও তার আগে উঠেছে মানে নিশ্চিত এখন কিচেনে আছে। হয়তো নাস্তা তৈরি করছে। ক্ষত হাত নিয়ে একা একা কাজ করছে ভেবে শেহরিন পা বাড়ায় কিচেনে একটু সাহায্য করার জন্য।
"গুড মর্নিং ভাবিজান।"
হুট করে চেনা পরিচিত মেয়েলি কন্ঠস্বর পেতে শেহরিন চমকে উঠে খানিকটা। সানজিকে এই মুহুর্তে বাসায় উপস্থিত দেখে
একটু অবাক হলেও সঙ্গে সঙ্গে মুখে ফুটে উঠে এক উজ্জ্বল হাসি।
"গুড মর্নিং ম্যাডাম। আপনি??এই সময়?আমি কি স্বপ্ন দেখছি?"
"নো.. নো স্বপ্ন কেন দেখবেন? সানজি সত্যি এসেছে।"
"বাহ!! আজকে এতো সকাল সকাল? ব্যাপার কি?"
সানজি দু'হাতে ধোঁয়া উঠা কফি মগ নিয়ে এসে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে। চোখের ইশারায় শেহরিনকে কাছে ডেকে বলে,"ব্যাপার স্যাপার কিছু একটা। আসুন আগে একসাথে কফি আড্ডা দেই। তারপরে কারণ ব্যাখ্যা করি।"
শেহরিন কিচেনের দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখে স্মিত হাসি বজায় রেখে বলে, "কফি কি তুমি বানিয়েছো? নাকি নেতাসাহেব বানিয়েছেন? উনি কিচেনে?"
"আমি নিজে বানিয়েছি। আসো তুমি।"
"উনি কোথায়?"
"আছে কোথাও। আসো তো তুমি।"
শেহরিন স্বাভাবিকভাবে সানজির কাছে এসে বসে। কফির দিকে তিক্ততা মিশ্রিত চাহনি নিক্ষেপ করে বলে,"কফি খেতে পারবো না আপু আমি।"
"স্মেল লাগে নাকে?"
"হ্যাঁ।"
"ওহহো, শুধু শুধু দুটো তৈরি করলাম তাহলে।"
"সমস্যা নেই। দু ভাইবোন শেয়ার করুন আজকে।"
সানজি হালকা চুমুক টেনে কফি মগটা টেবিলে রাখে। ঠান্ডা দুটো হাতের তালু ঘষতে ঘষতে উষ্ণ করে। নরম চাহনিতে তাকিয়ে বলে,"ভাইয়া বাসায় নেই শেহরিন।"
সানজির কথা শোনা মাত্র শেহরিন দেয়ালে সাঁটানো বড় ঘড়ির দিকে তাকায়। উজ্জ্বল মুখোরেখায় খানিকটা কপাল ভাঁজ করে বলে,"আজকে আগেই বের হয়েছে? প্রতিদিন তো দশটার দিকে বের হন।"
"আমি আসার কারণ শুনবে না?"
"হ্যাঁ বলো।"
"আমি যদি বলি এখন থেকে আমি এ বাসায় থাকবো অনির্দিষ্টকালের জন্য। তাহলে কি তুমি খুশি হবে?"
শেহরিনের কপালের ভাঁজ মিলিয়ে যায়। ছোট ছোট চোখ করে ঠোঁটের কোণের হাসি প্রসারিত করে বলে,"তুমি কি মজা করছো আপু? সত্যি তুমি থাকবা?"
"সত্যি থাকবো।"
"সত্যি?"
সানজি মৃদু হেসে শেহরিনের একদম কাছাকাছি এসে বসে। আদুরে কন্ঠে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে বলে,"সত্যি থাকবো ভাবিজান।"
শেহরিন মুহুর্তেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে। দু-হাতে সানজিকে জড়িয়ে ধরে প্রফুল্লচিত্তে বলে,"আল্লাহ আমি বোধহয় স্বপ্ন দেখছি। সকাল সকাল এত্তো ভালো একটা গুড নিউজ পাবো বিশ্বাসই হচ্ছে না। থ্যাংকিউ সো মাচ।"
"ওয়েলকাম ভাবিজান।"
"উফ্ আপু, বাঁচালে তুমি। দেখছো তো তোমার ভাইয়ার ব্যস্ততা। ঘুম না ভাঙতেই সে পাড়ি দিয়েছে তার কাজের জগতে। একদম আসবেন রাত এগারোটায়। পুরোটা দিন আমার একা একা কাটাতে হয়। এক পুঁচকোর সাথে আর কত গল্প করা যায় বলো?"
"পুঁচকো তার মায়ের সাথে গল্প করে বুঝি?"
"এতো কিক মারে আপু। বিশেষ করে ক্লাসের সময়টাতে।
আমি তখন চুপচাপ থাকি এটা বোধহয় সে চায় না। রাগ করে, কেনো মামণি তার সাথে কথা বলছে না।"
"এটা নিশ্চিত বাঁচাল সানজির ডুপ্লিকেট হবে। রক্ত বলে কথা। যাই হোক, এখন একটা কথা বলবো। সেটা তোমাকে মন দিয়ে শুনতে হবে। কেমন?"
"আচ্ছা শুনবো বলো।"
সানজি শেহরিনের দু'হাত মুঠো পাকিয়ে নিজের হাতের মধ্যে নেয়। লম্বা করে দীর্ঘ শ্বাস ঝেড়ে নিজেকে প্রস্তুত করে কঠিন সেই কথাটা বলার জন্য। সে নিজেও ভিতরে ভিতরে বেশ ভয়ে আছে শেহরিনের প্রতিক্রিয়ার জন্য। জানে না কিভাবে সামলাবে। তবে সামলাতে হবে। আর এই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে।
সানজি মুখ খোলা মুহুর্তে কলিং বেল বেজে ওঠে। ফলে নিজের কথা গুটিয়ে নিয়ে থেমে যায় সে সঙ্গে সঙ্গে। দরজা পানে তাকিয়ে বলে," কে এসেছে?"
"শেফালী এসেছে হয়তো। দাঁড়াও আসছি।"
শেহরিন ভারী পেট নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে যায় দরজা খুলতে। আজ শেফালী তার সময়ের আগেই এসেছে ভেবে মনে মনে হাসে। এই মেয়েটা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সঙ্গে চলে। কত করে বলে,একটু আগে আসতে৷ সে তা শোনেই না। আজ বোধহয় একটু জ্ঞান হয়েছে।
নব ঘুরিয়ে দরজা খোলামাত্র শেফালীর জায়গায় বিশেষ কাউকে দেখে শেহরিনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। চোখের পাতা অনড় রেখে অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে, "বাবা ! তুমি?"
রিজওয়ান সাহেব মেয়েকে দেখামাত্র মলিন হাসি উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি হাসেন। স্নেহাতুর কন্ঠে বলেন, "আসসালামু আলাইকুম মা। কেমন আছেন আপনি?"
"ওয়ালাইকুম সালাম বাবা। তোমাকে দেখে এখন আরো বেশি ভালো আছি।"
শেহরিন দীর্ঘদিন পর বাবার দেখা পেয়ে খুশিতে আত্নহারা হয়ে যায়। চোখে মুখে তার আনন্দের ঝিলিক বায়। বাবার সঙ্গে উষ্ণ আলিঙ্গন সম্পন্ন করে তাকে ভিতরে আগমন জানাতে জানাতে বলে,
"বুঝতে পারছি না আজকে কি বিশেষ কোনো দিন? সবাইকে আমাকে এভাবে সারপ্রাইজ দিচ্ছো সকাল সকাল।"
"তুমি খুশি হয়েছো?"
"ভীষণ ভীষণ ভীষণ।"
রিজওয়ান সাহেবকে দেখামাত্র সানজি উঠে দাঁড়ায়। বুকের ভিতরে জমানো চাপা শ্বাস তার হালকা হয়। এতোক্ষণ বেশ চিন্তায় ছিলো একা একা পুরো বিষয়টা ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে যাবে ভেবে। কিন্তু এখন শেহরিনের বাবাকে উপস্থিত দেখে সে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়।
"আসসালামু আলাইকুম আংকেল? কেমন আছেন?"
"ওয়ালাইকুম সালাম মা। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?"
"জ্বি এইতো আলহামদুলিল্লাহ।"
"বাবা তোমরা বসে গল্প করো। আমি ঝটপট কিছু নাস্তা করে আনছি।"
শেহরিন তার বাসায় আগত বিশেষ অতিথিদের অ্যাপায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠতেই রিজওয়ান সাহেব বাঁধা দেন তাতে। ধীর শান্ত কন্ঠে বলেন,"তুমি বসো। এখন কিছু তৈরি করার প্রয়োজন নেই। আমরা সবাই মিলে কথা বলি।"
"বেশি সময় লাগবে না। তোমার শেহরিন এখন ব্রেকফার্স্ট তৈরিতে এক্সপার্ট হয়ে গিয়েছে।"
"সেটাতো আমি তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি। কিন্তু এখন সত্যি এসবের প্রয়োজন নেই মা। আমি কিছু কথা বলতে চাই তোমাকে।"
শেহরিন বাবা এবং সানজির দিকে পরপর তাকিয়ে সামান্য কপাল কুঁচকে হাসিমুখে বলে,"তোমারও কথা রয়েছে বাবা? আপুরও তো কথা রয়েছে। কি হয়েছে বলো তো? দুজনের কথাটা কি একই?"
"হ্যাঁ।"
"বাহ তাহলে তো ভালোই হলো। ঠিক আছে বলো শুনি।"
রিজওয়ান সাহেব নিজেকে কিছুটা থিতু করে নেয়। মেয়ের পানে তাকিয়ে কোমল গলায় বলেন,
"তোমাকে আমরা একটা কঠিন কথা জানাতে চাই। চাইলে হয়তো আরেকটু সময় নিয়ে তোমাকে জানাতে পারতাম। বাট আমাদের মনে হয়েছে, যেটা সত্য সেটা চাপা না রেখে সরাসরি জানানোই উচিত। কারণ সত্য কখনো মিথ্যে হবে না। এটা তোমাকে একটা না একটা সময় জানাতে হবেই বা তুমি জেনে যাবে।"
শেহরিনের মুখে হাসি উবে যায় বাবার মুখোরেখার সঙ্গে কথার ভঙ্গিমা দেখে। সানজির ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে নিরস কন্ঠে বলে,"বাবা..সব ঠিক আছে?"
"একটু এলোমেলো হয়ে গিয়েছে কোথাও।"
"কি হয়েছে?"
শেহরিনের আকুল চাহনিতে সানজি ধীর কদমে এগিয়ে আসে। কাঁধে হাত রেখে নমুজ কন্ঠে বলে, "ভাইয়া বর্তমানে পুলিশ কাস্টাডিতে আছে শেহরিন। তাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।"
শীতের সকালে মৃদু মন্দ বাতাস হুট করেই যেন হিম হয়ে যায়। মুহুর্তে বলা কথাটার ভার সামলাতে না পেরে শেহরিন তাল হারিয়ে ফেলে। ডান হাতটা এলোমেলোভাবে খুঁজে বেড়ায় কোনো একটা জিনিস ধরে দাঁড়ানোর জন্য। রিজওয়ান সাহেব মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই, তার হাতটা সে আঁকড়ে ধরে নিজেকে দাঁড় করায়। মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হয় না। শুধু ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে।
"মা..প্লিজ তুমি ভেঙে পড়ো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবা বলছে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"সব ঠিক হয়ে যাবে শেহরিন।"
শেহরিন কথা বলতে পারে না। হুট করেই শরীর থেকে সমস্ত শক্তি ভেঙে পড়ে তার। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়তে শুরু করে। নিঃশব্দ এই কান্না তার বেদনাকে আরও মূর্ত করে তুলে মুহুর্তেই।
"না...এটা কিভাবে সম্ভব? উনি..কেন যাবেন?"
নিজমনে অস্থির কন্ঠে ফিসফিস করতে থাকে ভঙ্গুর কামিনী। মস্তিষ্ক তার বিগলিত হয়ে উঠছে কেমন যেন৷ একটু আগের স্বতঃস্ফূর্ত মুহুর্ত হঠাৎ এমন বিষাক্ত কেন লাগছে বুঝতে পারে না সে। তার নেতাসাহেব তাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। উনাকে পুলিশ কেন অ্যারেস্ট করবে। উনি সেরকম কিছুই করতে পারে না।
"বা..বা একটু আমার কথা শোনো। তো..তোমরা হয়তো ভুল করছো। উনাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেনি। উনি কোনো দরকারে হয়তো থানায় গিয়েছে।"
"মা তুমি কেঁদো না। হ্যাঁ সান্নিধ্য দরকারেই গিয়েছে। ইনশাআল্লাহ তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।"
"আপু..আমি একটু কথা বলতে চাই উনার সাথে।"
"বলবে সোনা। কিন্তু এখন সম্ভব নয়। তুমি এরকম করো না প্লিজ,কিছু হবে না ভাইয়ার দেখো।"
শেহরিন ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠে। সে তার মন মস্তিষ্ককে বুঝাতে চাইছে সব ঠিকঠাক আছে,নেতাসাহেবের কিছু হয়নি তবুও মানতে পারছি না। কখন কি হলো? সে জানলো না কেন? নেতাসাহেব তাকে না বলে কোথাও তো যায় না।
"আমি একটু শুধু কথা বলতে চাই। উনি ঠিক আছেন এটুকুই শুনেই ফোন রেখে দিবো। সত্যি বলছি আর ডিস্টার্ব করবো না।"
শেহরিন বাবাকে ছেড়ে তড়িঘড়ি করে ফোন খুঁজতে উদ্যত হয়। এলোমেলো হয়ে চারপাশটা সে চোখ বুলাতে থাকে। বুকের ভিতরের সূক্ষ ব্যথাটা তার উত্তালসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নেতাসাহেবের সঙ্গে কথা না বলা পর্যন্ত শান্ত হতে পারবে না সে কোনোভাবেই।
রিজওয়ান সাহেব এবং সানজি শেহরিনের উদ্যমতা দেখে তাকে আটকানোর চেষ্টা করে। জানে,এখন ফোন দিয়ে কোনো লাভ হবে না, কাউকে পাবে না সে ফোনের অপর পাশে।
"শেহরিন এমন করো না আপু। তুমি ভাইয়াকে পাবে না এখন ফোনে।"
"উনি আমার ফোন ধরবে।"
"ভাইয়ার কাছে এখন ফোন নেই। তুমি শুধু শুধু কষ্ট পাবে। প্লিজ থামো।"
শেহরিন দু'হাতে কপাল চেপে ধরে। অবিরাম ধারায় কাঁপতে থাকা ঠোঁট ফুঁড়ে সে অস্পষ্টস্বরে চিৎকার করে কান্না করে উঠে। নিজেকে পারে না আর আটকে রাখতে। এতোক্ষণের নিস্তব্ধ কান্না হয়ে উঠে শব্দে মুখর। আটকে আসা শ্বাস টেনে সে একদম ভেঙে পড়ে মুসলধারে কান্নায়।
"মা..এমন করে না মা। তুমি না আমার বুদ্ধিমতি মেয়ে।"
রিজওয়ান সাহেব মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ক্রমাগত সান্ত্বনা দিতে থাকে। মেয়ের চোখের অশ্রু আর করুণ গলার স্বর তার পাজর ভেঙে দিলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে খুব কষ্টে। উপায়ও নেই যে তাছাড়া। মেয়েকে সামলানো এই মুহুর্তে কঠিন চ্যালেঞ্জ তার কাছে।
"একটু বোঝো তোমরা আমাকে..আমি সত্যি উনাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। আমি পায়ে ধরি তোমাদের। আমাকে নিয়ে যাও উনার কাছে।"
"সান্নিধ্য নিজেই তোমার কাছে আসবে। একটু ধৈর্য্য ধরো মা।"
" না আসবে না উনি, আমি বুঝতে পেরেছি কঠিন কিছু হয়েছে।আমাকে তোমরা একারণে আটকাচ্ছো। আমি কিন্তু সত্যি মরে যাবো বাবা উনার কিছু হলে।"
"তুমি যদি এটা বলো, বাবা যে ভীষণ কষ্ট পাবে।"
শেহরিন বাবার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে ফোপাঁতে থাকে। সমস্ত শরীর তার কাঁপছে অসম ধারায় । চোখ মুখ তার লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে। বিন্দুমাত্র নিজস্ব শক্তি সে অনুভব করতে পারে না। একটুখানি ছাড়া পেলেই যেন সে মুখ থুবড়ে পড়বে।
"বাবা..আমি হয়তো বুঝাতে পারছি না তোমাদের, আমার ভিতরে কতটা কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করো,মনে হচ্ছে কেউ আমাকে পাথর দিয়ে পিষে আমার ভিতরটা থেঁতো করে দিচ্ছে। আমার অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে । কিভাবে বুঝালে তোমরা একটু আমাকে উনার কাছে নিয়ে যাবে বাবা? আমি একটু উনার কাছে যেতে চাই। একটুখানি তাকে দেখতে চাই। ওই মানুষটাকে ছাড়া আমি একটাদিনও চলতে পারবো না। আমি ওনাতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি যে।"
এক উদভ্রান্ত বিধ্বস্ত নারী তার প্রিয়জনের জন্য উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। ছিন্নমূল হয়ে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে এক ভয়ংকর পরিস্থিতিতে। তার আর্তনাদিত প্রতিটি সুর উপস্থিত দুজনকে স্তব্ধ করে দেয়। কেউই ভাবতে পারিনি এই মেয়েটার ভিতরে এতো ভালোবাসা তার স্বামীর জন্য।
সানজির চোখে বৃষ্টি নেমেছে। অথচ এই দৃশ্য সে অভ্যস্ত। বাবাকে নিজ চোখে সে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে দেখেছে ছোটবেলায়। বছরে বছরে পুলিশ কেস,মামলা, আদালত দেখে বড় হয়েছে। কই তখন তো এতো খারাপ লাগেনি? এতোটা কষ্ট হয়নি যতটা না এখন তার শেহরিনকে দেখে হচ্ছে। চোখে জল পর্যন্ত এনে ছেড়েছে এই মেয়ে।
______________________________________
সকাল দশটা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনারের অফিস কক্ষের ডোর নক হয়। ডিসিপি আফতাব উদ্দীন ফাইল স্বাক্ষর করতে করতে চোখ তুলে তাকানো মুহুর্তে ভিতরে প্রবেশ করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এবং ক্ষমতাশীল রাজনীতিবিদ এমপি সাহেবের পিতা শাহজাহান খান। পিছনে তার দু'জন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী।
"আসসালামু আলাইকুম ডিসিপি সাহেব।"
"ওয়ালাইকুম সালাম। প্লিজ টেক সিট।"
আফতাব উদ্দিন নিজ চেয়ার ছেড়ে খানিকটা উঠে সম্ভ্রম কায়দায় শাহজাহান খানকে বসার আমন্ত্রণ জানান। অতঃপর
সাথে থাকা এএসআই কে ইশারায় বের হয়ে যেতে বলে নিজে আসন গ্রহণ করেন।
"চা না কফি।"
"আপাতত পানিই ঠিক আছে।"
আফতাব উদ্দিন মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়। সুস্পষ্ট কন্ঠে বলে,"বলুন স্যার,আপনার জন্য কি করতে পারি।"
"হাতে সময় খুব কম। কথা সংক্ষেপে বলি। বারোটার সময় আদালতে আমার ছেলেকে তোলা হবে। রিমান্ডের জন্য যে আবেদন করবেন, সেটা উইথড্র করতে হবে।"
"সরি স্যার। এটা তো আমার একার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় না। এটি একটি সেন্সিটিভ মার্ডার কেস। উচ্চ পর্যায় হতে নির্দেশনা এসেছে।"
শাহজাহান সাহেবের মুখোভঙ্গি বদলে যায়। গলার স্বর চড়িয়ে বলেন,"কিসের উচ্চ পর্যায়? রিমান্ডের জন্য আবেদন করবেন আপনি। সম্পূর্ণ বিষয়টা দেখার দায়িত্ব আপনার। আমাকে এসব বুঝ দিতে আসবেন না। সারাজীবন এসব করেই এসেছি আমি।"
"বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এবারের কেসটা ভীষণ মিডিয়া স্পটলাইট হয়ে গিয়েছে। প্রিমিনারি এভিডিয়েন্স.."
"এভিডিয়েন্স? আপনার ওসি যে রিপোর্ট লিখেছে, সেখানে কি আমার ছেলের হাতে রিভলবার দেখেছে? সে কি স্পটে ছিলো?"
"স্যার, আসিফ নামক ছেলেটি পলাতক। সে এবং এমপি সাহেব সরাসরি জড়িত এই খুনের সঙ্গে। তার সন্ধান চলছে তুমুলভাবে। তাকে খুঁজে বের করার জন্য বা সঠিক তথ্যের জন্য আমরা যদি রিমান্ডের আবেদন না করি তাহলে পুরো বিষয়টা এমনকি আইন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে।"
"রিলাক্স। এই একই বিষয়টা আপনি অন্যভাবে ঘুরিয়ে দিন। আদালতকে বলবেন, আসিফকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এবং তার জবানবন্দি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে বর্তমান আসামির সাথে জড়িত থাকার নতুন কোন প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এই মুহূর্তে রিমান্ডের কোন প্রয়োজন দেখছি না।"
আফতাব উদ্দিনের মুখ শুকিয়ে উঠে। ধীর গলায় তাকিয়ে বলে, "আমার জব যাবে স্যার। সরাসরি মিনিস্ট্রি সাহেবের পক্ষ হতে এই কেস চলছে। আসিফকে হন্য হয়ে খুঁজছে পুলিশ। তাকে দেশের ভিতরে যেকোনো জায়গা হতে যেকোনো সময় গ্রেফতার করা হবে। তখন তো ঠিকই রিমান্ডে নেওয়া হবে।"
শাহজাহান সাহেব নিঃশব্দে মৃদু হাসেন। টেবিল হালকা চাপড়ে নরম গলায় বলেন,"সাধারণ মানুষদের আইনের খেল আর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আইনের খেলের মধ্যে একটু হলেও পার্থক্য আছে। পাশার দান উল্টে যাওয়ার আগে পাশা খেলাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যে কোনো কিছুই হতে পারে। চোখের সামনে আপনি যা দেখছেন,চোখের পাতা ফেলে আবার তাকাবেন, দেখবেন সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তবে আসিফকে খুঁজে পেলে রিমান্ডে নেওয়ার বিপক্ষে আমি যাবো না। আইনের কাজ আইন করবেই। বাট এই মুহুর্তে আপনি উইথড্র করবেন।"
"আমি চেষ্টা করবো। তবে, রাজনৈতিক মারপ্যাচের ভীড়ে হয়তো অনেক কিছুই ঘটে যাবে। প্রমাণ কিন্তু জোরালো স্যার। সাময়িক সময়ের জন্য রিমান্ডের আবেদন আমি করছি না। তবে, আসিফকে পাওয়া মাত্র আমি আমার দায়িত্বে বহাল থাকবো। আশা করছি অতি শীঘ্রই আমরা তাকে ধরে ফেলতেও সক্ষম হবো।"
শাহজাহান খান উঠে দাঁড়ান চেয়ার ছেড়ে। হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বলেন,
"আমার কোনো আপত্তি নেই। মাঠে নেমেছি গোল খাবো, গোল হয়তো দিবো। তবে কার পেনাল্টি কখন মিস হয়ে যাবে বলা কঠিন। দেখা যাক কি হয়। আর হ্যাঁ, আপনার জুনিয়র অফিসাররা যারা এই কেসে কাজ করছে তারা যেন তাদের ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে কেয়ারফুল থাকে। আদালতে যেন রিমান্ডের জন্য জোর না দেয়।"
"জ্বি বিষয়টা আমি দেখবো।"
"গুড। আসছি। দেখা হবে।
চট্টগ্রাম দায়রা জজ আদালতে সান্নিধ্যেকে হাজির করা হয় বেলা এগোরোটায়। এসময় তার ব্যক্তিগত সহকারীগণ এবং তার পক্ষের আইনজীবী উপস্থিত থাকে। প্রয়োজনীয় সমস্ত কার্যাবলি শেষে আদালতে পুলিশের পক্ষ হতে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। কিন্তু আসামি পক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান এর বিরুদ্ধে জোরালো আপত্তি করেন। ডিসিপি আফতাব উদ্দিন কৌশলে নিজেদের সবার সামনে ক্লিয়ার রেখে
রিমান্ডের যুক্তি ইচ্ছেকৃতভাবে উপস্থাপন করেন না। তারা এমপি সাহেবের আইনজীবীকে ট্রাকল করা হতে বিরত থাকে।
দায়রা জজ সাহেব পুলিশের পক্ষ হতে জোরালো যুক্তি খন্ডন না পেয়ে রিমান্ড আবেদন খারিজ করে দেন। তিনি তার রায়ে উল্লেখ করেন, "এটি একটি সংবেদনশীল মামলা। তবে পুলিশ তাদের আবেদন যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। তদন্তের অগ্রগতি এবং রিমান্ডের অপরিহার্যতা সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়নি। বিশেষ করে, পলাতক আসামিকে না খুঁজে পুলিশ কীভাবে দাবি করছে যে শুধুমাত্র বর্তমান আসামির রিমান্ডই একমাত্র উপায়, তা বোধগম্য নয়। অতএব আসামিকে বিচারাধীন বন্দী হিসেবে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।"
আদালতের পক্ষ হতে এই রায়ে মনে মনে ক্ষুব্ধ হন নাসির চৌধুরী। মুখোচোয়াল তার শক্ত হয়ে যায়। পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু হতে গিয়ে মাঝখানে এমন উল্টো দানে তিনি মেজাজ হারিয়ে বের হয়ে যান আদালত কক্ষ হতে।
"এসব কি হচ্ছে?"
"বুঝতে পারছি না স্যার, ডিসিপি পল্টি নিলো কেন। শা'লার ব্যাটা শা'লা হাত গুটিয়ে থাকলো?"
"চার্জশিট দাখিল করতে কত সময় লাগতে পারে?"
"হাই প্রোফাইল কেস স্যার। শুরুতেই ধাক্কা। খুব সম্ভবত দুই মাস সময় লাগবে।"
নাসির চৌধুরী ক্রুর হাসি হাসেন। পকেট হতে ফোন বের করতে করতে বলেন," তার মানে এই হারামির বাচ্চা এতোদিন জেলে পঁচবে।"
"জামিনের আবেদন করে যদি?"
"আরেহ ধুর, আবেদনই তো করবে না। করলেও শুনানিতে নাকচ করে দিবে। কেস এমনভাবে সাজিয়েছি না, এতো সহজ নয় বাছা।"
লিয়াকতের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। গালে হাত দিয়ে বলে,"স্যার আমার একটা অনুরোধ রাখবেন?"
"বলে ফেল।"
"এমপির বউরে নিয়া আমি একবার একটা কথা বলেছিলাম। জানোয়ার শালা আমারে কাচের গ্লাস ছুঁইড়া মারছিলো। অল্পের চেয়ে চোখ কানা হয় নাই। এই যে,দেখেন আমার চোখের কিনারায় কালো দাগ।"
নাসির চৌধুরী একপলক লিয়াকতের কাটা স্থান দেখে গমগমে আওয়াজে বলেন,"তো কি করতে চাস?"
"ওর বউরে.. একটাবার মনের খায়েশ মিটাইতে চাই।"
"বাঘের ডেরায় হাত দিবি?"
"বাঘ তো বন্দি স্যার।"
নাসির চৌধুরী বিদঘুটে হাসি ঝুলিয়ে বলেন,"শা'লা সময়মতো উসুল করবা।"
"অনেকদিনের ইচ্ছা। সব ব্যবস্থা নেওয়া শেষ স্যার। খালি আপনার অনুমতি।"
"লোকেশান?"
"জারা কনকর্ড।"
নাসির চৌধুরী লিয়াকতের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেন,"যা অনুমতি দিলাম। অনেক কাজ করে দিয়েছিস আমাকে। এখন একটু ইনজয় কর।"
"শুকরিয়া স্যার।"
__________________________________________
ফেব্রুয়ারির তিন তারিখ। সন্ধ্যা ছয়টা। শহরে শীত কমেছে আগের তুলনায় কিছুটা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলো সাতটা দিন। আর এই সাতটা দিন শেহরিন নিজেকে কোনমতে জিইয়ে রেখেছে তার নেতাসাহেবকে ছাড়া। এই মুহুর্তে কেউই তাকে তার নেতাসাহেবের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিতে ইচ্ছুক নয়। কেন ইচ্ছুক নয়, কারণ অজানা।
নির্ঘুম রাত পার করে আসা রমণীর চোখের নিচে কালিগুলো স্পষ্টত হয়ে আছে। নিজের প্রতি নিজের অযত্ন, অবহেলায় মনটাকে পরিণত করেছে ভঙ্গুর। চারপাশে সবকিছুর প্রতি তার বিতৃষ্ণা জমে গিয়েছে। নিজেকে ভেঙে ফেলতে গিয়ে বারবার বাঁধা প্রাপ্ত হচ্ছে রিজওয়ান সাহেব, সানজি আর সরফরাজের কারণে। এই মানুষগুলো তাকে সবটা দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টায় আছে। তারা যেন তার কষ্টগুলো নিজেরা ভাগ করে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতোটা আত্মনিবেদন সৌভাগ্য ছাড়া পাওয়া হয়তো দূর্লভ।
শেহরিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে তার। পেটের ভিতরে নেতা সাহেবের অস্তিত্ব বারে বারে তাকে জানান দিচ্ছে কথা বলতে। মামণির চুপ থাকা হয়তো সে সহ্য করতে পারছে না। শেহরিন বুঝতে পারে,অনুভব করে। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না।
রিজওয়ান সাহেব পাঁচদিন মেয়ের কাছে থেকে ঢাকায় ফিরেছেন। ব্যবসায়িক সমস্ত কাজ গুছিয়ে হয়তো আজ রাতে কিংবা কাল সকালেই আবার চট্টগ্রামে ব্যাক করবেন। মেয়েকে এই পরিস্থিতিতে একা রেখে সে অন্য কোথাও স্থির থাকতে পারছেন না। ওদিকে সানজি গিয়েছে সুখনিবাসে কিছু বই আনতে। সামনের সপ্তাহ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা শুরু তার।
শেহরিন একা একা ঘর জুড়ে পায়চারি করা শেষে কিচেনে চলে যায়। মাথার মধ্যে তার চিন্তারা ঘুরপাক খাচ্ছে, এই সুযোগে সে কি বের হয়ে যাবে নেতাসাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। এখন বাবা, সরফরাজ ভাইয়া কিংবা সানজি আপু কেউই নেই। কিন্তু কোন থানা, কোথায় কি এগুলো জানবে কিভাবে? আজাদের কাছে সাহায্য চাইবে কি? সে তো এমপি সাহেবের লোক। জানার তো কথা।
আজাদকে পরোখ করার উদ্দেশ্য শেহরিন কিচেনের জানালার কাছে যায়। এখান হতে নিচের অংশটুকু পরিষ্কার দেখা যায় জন্য জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করে সে। চোখ দুটো স্থির করা মুহুর্তে হুট করে নিচে চলমান এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যে তার মুখ সাদা হয়ে যায় তৎক্ষনাৎ। স্থির চোখ দুটো অস্বাভাবিক হয়ে আসে। নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম হয়ে উঠে মুহুর্তেই।
নিজ চোখে সে দেখে, আজাদকে মাথা ফুঁড়ে গুলিবিদ্ধ করে একজন বন্দুকধারী লোক। আশেপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে সঙ্গে দিয়ে চলেছে আরও পাঁচ সাতজন লোক। মুখ থুবড়ে রক্তের হ্রদে ভেসে যায় দেহখানা। কোনো সিকিউরিটি গার্ড নেই। কোনো মানুষজন নেই। এলোমেলো মস্তিষ্ক শেহরিনকে হুট করে ভাবিয়ে তোলে, আদৌও এটা আকস্মিক আক্রমণ নাকি সুপরিকল্পিত হত্যা? আজাদকে মেরে ফেললো, তার মানে তো এরা নেতাসাহেবের শত্রু। তাহলে কি নেক্সট টার্গেট সে?
দূর্গম এই ভাবনা মনে আসতেই শেহরিনের মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বেয়ে যায়। ভয়ে তার হাত পা কাঁপতে শুরু করে। আপনাআপনি হাত চলে যায় তার পেটে। বুঝতে পারছে তার আবার প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়েছে। কিন্তু তাকে যদি এখন মেরে ফেলে তাহলো তো তার বাচ্চাকেও..
"এতো কষ্টের সন্তান আমার। এতো ত্যাগের সন্তান...আমি আত্মসমর্পণ করতে চাই না। আল্লাহ তুমি আমাকে পথ দেখাও। আমাকে বাঁচাও।"
কম্পনরত স্বরে শেহরিন ডুকরে উঠে। নিজেকে বোঝাতে থাকে ভয় না পেতে। মনের মধ্যে সাহস সঞ্চার করার চেষ্টা করে। তার অনাগত সন্তানকে সে কোনোভাবে ক্ষতি হতে দিবে না। কঠিন এক দৃঢ়তা নেমে আসে তার কপালের রেখায়। কি করবে, না করবে ভাবতে ভাবতে নিজের গায়ের ওড়না দিয়ে মুখ মাথা ঢেকে নেয়। এই মুহুর্তে দরজা লাগিয়ে ঘরে বসাটা বিপদজনক। ওদের দরজা ভাঙতে সময় লাগবে না এক মিনিটও। তাই সরাসরি ধরা দিবে না সে। নিজের তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা মতো বের হয়ে যায় মেইন ডোর ছেড়ে।
লিফটের কাছে আসতেই দেখে তা বন্ধ। একমাত্র পথ সিঁড়ি। শেহরিন সময় ব্যয় করে না। সে সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করে সাবধানী পায়ে। ঠিক তখনই নিচ থেকে ভেসে আসে কর্কশ কণ্ঠস্বর এবং ভারী পায়ের আওয়াজ।
শেহরিনের হৃদয় এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। লিফট বন্ধ পেয়ে শয়তানগুলোও একই পথে আসছে তার মানে । এখন যদি ধরা পড়ে? মুখ রক্তশূন্য হয়ে উঠে এক লহমায়। ঠোঁট তিরতির করে কাঁপতে শুরু করে। কিন্তু ভিতরে জ্বলতে থাকা আত্মরক্ষার আগুন তাকে দমাতে পারে না । সিঁড়ির রেলিং শক্ত করে ধরে নামতে থাকে যেন তার হাতের কাঁপুনি বোঝা না যায়।
শেহরিন নিচে নামছে, আর শয়তানগুলো উপরে উঠছে। মুখোমুখি হওয়ার সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। শয়তানগুলোর হাতে চাপাতি, রামদা। একজনের গলায় সোনার চেইন, আরেকজনের হাতে ট্যাটু আঁকা ডাগার নকশা।
শয়তানগুলো এক পলক শেহরিনের দিকে তাকায়। কিন্তু চিনতে পারেনা ওড়নায় ঢাকা মুখ দেখে । এটাও জানে না এমপির বউ অন্তঃসত্ত্বা। যার ফলে সহজেই পাশ কাটিয়ে যায়। শেহরিনও চোখ নামিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। মুখের ভঙ্গি তার সম্পূর্ণ নির্বিকার, প্রাণহীন পুতুলের মতো।
"দুই তলাতে শিউর?"
"শিউর।"
"তাড়াতাড়ি চল। খেয়ে.. তারপরে জানে মেরে দিবো।"
শয়তানগুলো হতে উচ্চারিত শব্দ শেহরিনের কানে বিষের মতো ঢেলে পড়ে। তার মানে, তার ধারণা শতভাগ ঠিক। হত্যার পরিকল্পনা ছিলো। মনে মনে আল্লাহ এর প্রতি অশেষ শুকরিয়া জানিয়ে সে নেমে যায় নিচে।
গ্রাউন্ড ফ্লোরে পা রাখার সাথে সাথেই আজাদের লাশ সামনে এসে পড়ে। কুয়াশার ভাঁজে একটা কাক পক্ষীও নেই চারপাশে। অন্যান্য সিকিউরিটি গার্ডসহ বসবাসরত সকল লোকজনগুলো মনে হচ্ছে বিলীন হয়ে গিয়েছে আজ। অবশ্য এই অ্যাপার্টমেন্টে
মানুষ জন এমনি কম। দরকার ছাড়া কেউ বের হয় না।
আজাদের লাশ দেখে শেহরিনের ভিতরটা পুড়ে যায়। কয়দিনেই লোকটা অনেক আপন হয়ে উঠেছিল সবার। কি অমায়িক ব্যবহার, কি সম্মান শ্রদ্ধা। আজ এই পরিণতি হয়তো তাকে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে হলো। আফসোস কিংবা অনুতাপে চোখের কোণে জমা হওয়া অশ্রুগুলো শেহরিন জোর করে চেপে রাখে। এখন যে কাঁদার সময় নেই।
ব্যস্ত রাস্তায় উঠতেই দ্বিগবিদিক হারায় শেহরিন। সমস্ত শরীরে সে সুঁচ ফোঁটার ন্যায় ব্যথা অনুভব করতে থাকে। কোমড় পিঠ ভেঙে আসছে। এভাবে আর কিছুক্ষণ হাঁটলে হয়তো আর নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। আশেপাশে যানবাহনের খোঁজে হন্য হয়ে উঠে। একটা কিছু পেলে..
"এক্সকিউজ মি..আমি কি একটু হেল্প পেতে পারি?"
ভগ্ন কন্ঠে অনুনয় শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তিথি। রোড সাইডের মলিন আলোতে চেনা পরিচিত মুখটা দেখতেই অবাক হয়ে উঠে সে। উইন্ডোর অর্ধেক গ্লাসখানা পুরোপুরি নামিয়ে বলে,"শেহরিন তুমি?"
ঘর্মাক্ত, ব্যথায় কাতর রমণী ভালোভাবে দৃষ্টি রাখে। রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়িটিতে তিথিকে দেখে সে নিজেও খানিকটা অবাক হয়। জানতো না এটা তিথি ভাবির গাড়ি কিংবা সে এই গাড়িতে রয়েছে। এই মুহুর্তে আশেপাশে এই একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া সে আর কোনো গাড়ি দেখতে না পেয়ে এখানেই ছুটে এসেছে।
"কিছু সময়ের মান অভিমান ছেড়ে আমাকে কি একটু সাহায্য করবেন ভাবি? আমার বাচ্চাটার জন্য অন্তত। আমি এই মুহুর্তে বিপদজনক অবস্থায় আছি ভীষণ।"
"আমি তো খারাপ। আমার কাছে সাহায্য চাইছো। যদি তোমার ক্ষতি করি?"
শেহরিন এক নজর পিছনে তাকিয়ে ক্লিষ্টতা জড়ানো মুখে যৎসামান্য হাসি ফুটিয়ে বলে,"আমার মনে হয় আল্লাহ আপনাকে উসিলা হিসেবে এই মুহুর্তে পাঠিয়েছেন আমার কাছে। তিনি হয়তো দেখতে চান কার ইগো বেশি। আমার না আপনার। আমার যদি ইগো থেকেও থাকে,আমি সেটা ভেঙে নিজ হতে সাহায্য চাইছি। নিজেকে নত করছি। এখন বাকিটা আপনার হাতে। আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন?"
তিথি অবাক হয় শেহরিনকে দেখে। একটা মেয়ে এতো অল্প বয়সে এতোটা ম্যাচিউরিটি নিয়ে কিভাবে কথা বলতে পারে? এরকম একটা পরিস্থিতিতেও তার সুস্পষ্ট জবান। সে নত হয়েও নিজেকে কিভাবে উপরে রেখেছে। যেখানে সে তার চেয়ে বড় হয়েও কথা খুঁজে পাচ্ছে না।
তিথির শ্রবণে তার মায়ের কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হয়। এতোগুলো দিন সে নিজের সঙ্গে বোঝা পড়া করে অনেক ভুল বের করতে পেরেছে নিজের। তবুও রাগ কিংবা ক্ষোভ পুরোটা কমেনি। সরফরাজের অবহেলা তাকে এখনও একইভাবে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। কিন্তু আজ এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে, সে নিজের খোলস ছেড়ে বের হয়ে এই মেয়েটার মতো হতে শিখবে একটু। খুব কি ক্ষতি হবে তাতে?
তিথি গাড়ি হতে নেমে পড়ে তৎক্ষনাৎ। গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে শেহরিনকে ভিতরে প্রবেশের জন্য পথ করে দেয়। এদিকটায় এসেছিল সে বান্ধবীর বাসায়। ফিরতি পথে মিসেস রেহানার কল আসায় কথা বলার জন্য থেমেছিলো একটু।
"ধন্যবাদ বড়জা।"
তিথি ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করে। সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে থমথমে গলায় বলে," আমার বাসায় যেতে তোমার কি খুব সমস্যা হবে?"
"আপনার সমস্যা না থাকলে যাওয়া যেতে পারে। আমার এই মুহুর্তে একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার ভীষণ।"
"সান্নিধ্যের জন্য আজ তোমার এই পরিণতি? অস্বীকার করতে পারবে?"
শেহরিন সিটের সাথে গা এলিয়ে দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস টেনে নেয়। চোখ বন্ধ রেখে মুখে মলিন হাসি টেনে বলে,"তার ভালোটা নিতে পারলে, খারাপটাও নিতে শিখতে হবে আমার।"
"এখনও এতো কনফিডেন্স?"
"যারা আমার নেতাসাহেবের বিরুদ্ধে যাবে, আমি তাদের বিরুদ্ধে যাব। এতে কেউ আমাকে স্বার্থপর বলুক আর যাই বলুক আই ডোন্ট কেয়ার। আমি আমার নেতাসাহেবকে চিনি, তার মোরালিটি আমার চেনা।"
"রাজনীতি ঘৃণা করেও এই কথা বলছো?"
"রাজনীতিবিদকে ভালোবাসি যে।"