২৫ জুন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার।
নির্জন সেলের মাঝে গুমোটে আধার, ধোঁয়াশার ন্যায় ছেয়ে আছে চারদিকটা। জানালার গ্রিল দিয়ে পড়ে থাকা চাঁদের আলো আসিফের শীর্ণ মুখের ওপর পড়ে ফুটিয়ে তুলেছে তার বিধ্বস্ত রূপ। দীর্ঘ দিনের পলায়নপর অবস্থার ছাপ মুখমণ্ডলে গভীর ক্ষতের মতো দাগ কেটে দিয়েছে। নির্ঘুম রাতের স্পষ্ট চিহ্ন হিসেবে চোখ দুটো পরিণত হয়েছে গর্তে। মনে হচ্ছে কতোকাল তার চোখে নিদ্রা এসে নামে না। শান্তির ঘুম কি সেটা সে জানে না।
দামি স্যুট বুট আর চকচকে স্যু পড়নে এক বিশালদেহী মানুষের ছায়া এসে ভীড়ে সেলের সামনে৷ পিছু পিছু তার তিনজন লোক। লম্বা সেই ছায়া গিয়ে পড়ে আসিফরে জীর্ণ শরীরের উপর। আকস্মিক ছায়ার উৎসের খোঁজে আসিফ রক্তলাল চোখ দুটো উপরে তোলে। দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বাহিরের পানে।
পাহারাদার এক পুলিশ এসে সেলের তালা খুলে চলে যায়। ডান বায়ে কোনদিকে ভ্রু'ক্ষেপ করে না সে। নাসির চৌধুরী তার তিন সহযোগী হতে দুজনকে বাহিরে দাঁড় করিয়ে একজনকে নিয়ে অকপটে সেলের ভিতরে ঢুকে যায়।
আসিফের দৃষ্টি শিথিল হয়ে আসে। কারাগারের সেলে এভাবে বাহিরের মানুষের প্রবেশের আজ্ঞা হলো কবে থেকে জানা নেই তার। তবে, আইনে না থাকলেও ক্ষমতায় তো আছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইন হাটে দরদামে কেনাবেচা করতে পারলে এ তো মামুলি ব্যাপার। নিশ্চিত ওসি সাহেবের পকেট ভারী হয়েছে। সেই হিসেবে মিলেছে অনুমতি।
"এমপি সাহেবের ডানহাত? কি অবস্থা? ভালো আছো?"
নাসির চৌধুরী গটগটে পায়ে আসিফের একদম সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। দু'হাত পকেট ঢুকিয়ে ঠোঁটের কোণে তীর্যকহাসি বজায় রেখে সে দৃষ্টি নিমজ্জিত করে। ঠিক তার পিছনে এসে দাঁড়ায় লিয়াকত।
"এখানে কি চাই?"
"অসময়ের বন্ধু হতে এসেছি।"
"অসময় কোনটা?"
আসিফের প্রশ্নে নাসির চৌধুরীর ঠোঁটের কোণের হাসি স্পষ্ট হয়। লিয়াকতের সাথে খানিক সেকেন্ডের দৃষ্টি বিনিময় সেড়ে নিয়ে ভারী কন্ঠে বলেন,
"বুঝতে পারছো না অসময় কোনটা?? এতোটা অবোধ হলে তো সমস্যা। নেতা কি ঘোলে একটু বেশিই পানি মিশিয়ে খাইয়েছিল তোমাকে? নিজের এমন করুণ অবস্থাতেও এই প্রশ্ন কিভাবে করছো?"
"স্যার, ওকে বলে লাভ নেই। এসব কিছু ব্রেইন ওয়াশের ফল। ওই হারামজাদা এমপি এদের কু'ত্তার মতো খাটিয়ে খাটিয়ে মুঠোবন্দি করে ফেলেছে। একেবারে পোষ মানানো আর কি! "
"তাইতো দেখছি।"
"কি কারণে এসেছেন। সেটা ক্লিয়ার করুন।"
নাসির চৌধুরী পকেট হতে দু'হাত বের করে হাঁটু ভেঙে বসেন আসিফের সামনে। মুখের হাসি তার উবে যায় মুহুর্তেই। চোখে তার স্পষ্ট হয় হিংসার দাহন। শক্ত গলায় বলেন,
"শোনো আসিফ, সান্নিধ্য তোমাকে কী দিয়েছে? কি করেছে তোমার জন্য? এইতো জেলের সেলে পচে মরছো। তোমার জন্য কিন্ত এ পর্যন্ত সে কোনো উকিলের ব্যবস্থা করেনি কিংবা তার দলের লোকজন তোমাকে নিয়ে কোনো কথাই তোলেনি । অথচ তার পক্ষে সব নামি দামি উকিলেরা মৌমাছির মতো ভীড় জমিয়েছে। যে কোনো উপায়ে জামিনের জন্য হন্য হয়ে কেসের বিপক্ষে লড়ছে। বুঝতে পারছো, জল কোথায় দিয়ে গড়াচ্ছে? তুমি কে এখানে? তোমার মূল্য তো দু'আনাও করেনি সে।"
আসিফ চোখে চোখ রাখে নাসির চৌধুরীর। শান্ত অবিচল দৃষ্টি তার। শ্রবণে মাত্র পৌঁছানো কথাগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ভাবসাব তার মাঝে ফুটে ওঠে না। নিরবতায় মুখর হয়ে থাকে সে।
"কি চাই তোমার? কি প্রয়োজন তোমার? গাড়ি বাড়ি অঢেল সম্পত্তি? আমি সব দেব তোমাকে। বাড়ি, গাড়ি এমনকি বিদেশে
সেটেলমেন্ট, নতুন আইডেন্টিটি যা চাইবে। পুরো লাইফ যাতে পায়ের উপর পা তুলে বসে খেতে পারো সেই বন্দোবস্ত আমি করে দিবো।"
"বিনিময়ে কি চাই আপনার?"
নাসির চৌধুরী ক্রুর হাসি হাসেন। মাথা নিচু করে ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে জবাব দেন,"এমপির ডানহাত বলে কথা! মগজ থাকাটাই স্বাভাবিক। এভাবে ডিরেক্ট বিনিময়ের কথা তুলবে?"
"রাজনীতি শেখাতে এসেছেন?"
"না প্রয়োগ করতে এসেছি। আমার কথাগুলো কি তুমি বুঝতে পেরেছো? যদি না বোঝো তাহলে মাথা খাটিয়ে বোঝার চেষ্টা করো। এই বিন্দাস জীবনের অফার কিন্তু আর কোথাও পাবে না। কোটিপতি বানিয়ে দিবো তোমাকে। রোদে পুড়ে, মেঘে ভিজে আর কারো সার্ভেন্টগিরি করতে হবে না। পুলিশের মার, জেল খাটাখাটুনি করতে হবে না। আয়েশের জীবন ভোগ করবে। বিনিময়ে ছোট্ট একটা কাজ, কাল আদালতে গিয়ে বলবে, সান্নিধ্যেই খুন করেছে রজত সমাদ্দারকে। এই স্বীকারোক্তিটুকু দিবে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে জেল হতে বের করে আমি টাকার গদিতে বসাবো৷"
আসিফ বাক্যব্যয় করে না। নাসির চৌধুরীর হতে দৃষ্টি সরিয়ে সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। এক মুহূর্তে নিরব হয়ে উঠে পুরো সেলটি। উভয়পক্ষ হতে নিঃশ্বাস এতই মৃদুভাবে প্রবাহিত হয় যে তা প্রায় অস্তিত্বহীন।
নাসির চৌধুরীর চোখের ইশারায় লিয়াকত আলী মাথা নাড়ায়। পকেট হতে ভাঁজ করা দুটো কাজ বের করে সে নাসির চৌধুরীর হাতে দেয়। নথিপত্রের মুদ্রণদুটোর ভাঁজ খুলে স্যুটের ভিতর পকেট হতে কিছু একটা বের করে বলেন,
"এই নাও, চট্টগ্রামের বাইপাস রোডে সাততলা বাড়ি, খুলশীতে দুটো রেস্টুরেন্টের ডকুমেন্টস। সঙ্গে গাড়ি। এগুলো তেমন কিছুই না। মনে করতে পারো, আতিথিয়েতার প্রাথমিক ধাপ। জানোই তো,আমরা চট্টগ্রামের মানুষ কতটা আতিথেয়তা প্রবণ। প্রাথমিক ধাপ ছেড়ে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ধাপ তো এখনো বাকি।"
"বলো রাজি তুমি? স্বীকারোক্তি দিবে, সান্নিধ্যেই আসল খুনী?"
গুমোটে সেলে গরমে ঘর্মাক্ত মুখোরেখা নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে থাকে আসিফ। আর তার এই নিরবতায় নাসির চৌধুরীর কপালে ঘাম জমতে শুরু করে। মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠে। এই নিশ্চুপতা তার জন্য বিষবাষ্পের ন্যায় অনুভূত হয়।
"তোমার এই নিরবতা কি তবে সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরে নিবো, আসিফ?"
"আমি সুস্পষ্ট জবাব চাই আসিফ। ভয় পেয়ো না, তোমার ক্ষতি ওই এমপির বাচ্চা কোনোভাবেই করতে পারবে না। একটা মাছিও তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। তুমি যদি মনে মনে ভয় পেতে থাকো তাহলে সেটা দূর করে ফেলো। নাসির চৌধুরী নিজে তোমার দায়িত্ব নিচ্ছে। তুমি শুধু রাজি হও। বলো রাজি তুমি। স্বীকারোক্তি দিবে তুমি সান্নিধ্যের বিরুদ্ধে।"
চলমান অনুনয়ের মাঝেও আসিফ নিজের নিরবতা ভাঙায় না। সে মুখে কুলুপ এঁটে স্থির লোচনে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। আর এতেই, নাসির চৌধুরীর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায়। হাত মুঠো করে পাকিয়ে সে বসা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
"এভাবে চুপ থাকার মানে কি? ভালো ভাবে বলছি ভালো লাগছে না? উত্তর দাও..কথা বলো।"
আসিফের ক্রমাগত মৌনতা নাসির চৌধুরীর ভিতরে ক্রোধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সে ছটফট করতে করতে চিৎকার করে উঠে। যে চিৎকার দেয়ালের সাথে বাড়ি খেয়ে কম্পিত হয়ে উঠে। সেলের বাহিরে দুজন সহযোগী নড়েচড়ে উঠে। লিয়াকত চোখের ইশারায় বার বার তাকে শান্ত হতে বলে। কপালে জ্বলমান দপদপানি শিখার মাঝে গর্জে উঠে বলে,"স্যার আপনি শান্ত হন। এই ব্যাটা রাজি। মুখে স্বীকার করছে না। ভাবছে আমরা রেকর্ড করে হয়তো রাখছি হয়তো।"
"সিরিয়াসলি?"
"এজন্যই ভয়ে মুখ খুলছে না।"
নাসির চৌধুরী দু'হাতে নিজের চুলগুলো মুষ্টি বদ্ধ করে ধরে ছেড়ে দেয়। লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে সে আবারো বসে পড়ে আসিফের সামনে। কাঁধে হাত রেখে নিজের ক্রোধান্বিত ভাবটাকে রুখে বলে," বলছি তো কোনো ভয় নেই। একটাবার ভরসা করেই দেখ। ক্ষতি হবে না, বামুন হয়ে চাঁদে হাত দিবি সরাসরি। আর কি চাই?? এমপির উপর দিয়ে উঠে যাবি। ওরে একটু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডটা পাইয়ে দে। তোরে আমি সারাজীবন মাথায় তুলে রাখবো। আর যদি রাজি না হস,যেমন করে আজ পুলিশি হেফাজতে থেকেও তোর কাছে এসেছি।এমন করে এসেই তোকে লাশ বানিয়ে দিয়ে যাবো। কাকপক্ষীও টের পাবে না। বল ভাই, রাজি?"
আসিফ তার নিশ্চল নিঃসাড় ভঙ্গিমা অবশেষে ছাড়ে। নাসির চৌধুরীর হুমকিতে চোখ বন্ধ করে গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলে। মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, "রাজি। আমি স্বীকারোক্তি দিবো।"
"সাব্বাস..সাব্বাস।"
_________________________________
পরদিন সকাল এগারোটা।
আদালত কক্ষ নং ৩। আসিফকে গ্রেফতারের পর তাকে আজ আদালতে তোলা হয়েছে । সেই সাথে মামলা শুনানির জন্য উপস্থিত করা হয়েছে সান্নিধ্যেকে।
খুনের মামলার বিচার কাজ চলছে দায়রা আদালতে। ভিড়ে ঠাসা কোর্টরুম। বিচারক এজলাসে বসে আছেন। তাঁর সামনে সরকারি কৌঁসুলি, ভিকটিম রজত সমাদ্দারের আইনজীবী এবং সান্নিধ্য ও আসিফের নিযুক্ত আইনজীবী।
বিচারকালীন পর্বে সহযোগী আসিফকে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। ভিকটিম পক্ষের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করে স্থির চক্ষুতে আসিফের দিকে তাকান। সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন,
"জনাব আসিফ, আপনি এমপি সান্নিধ্য সাহেবের ব্যক্তিগত সহযোগী।"
"জ্বি।"
"গুড। আচ্ছা এবার বলুন, রজত সমাদ্দারকে নিজের হাতে কে খুন করেছে? আপনি নাকি এমপি সাহেব? নাকি দু'জনে মিলে?"
আসিফ দু'হাত কাঠগড়ার উপরে রেখে মুষ্টিবদ্ধ করে চেপে ধরে। সামনে প্রখর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে আছে নাসির চৌধুরী। চোখ মুখ তার জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি। আসিফের একটা স্বীকারোক্তি তাকে আসন্ন নির্বাচনে গদি পাইয়ে দিবে। চট্টগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য হবে সে। এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খানকে সে হারিয়ে দিবে অনায়াসে।
আসিফ চোখ বন্ধ করে নিভৃতে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। জোরগলা উন্মুক্ত করে বলে,
"আমরা কেউই রজত সমাদ্দারকে খুন করিনি।"
একটা মাত্র বাক্য। আর তা উচ্চারিত হতেই সমস্ত কোর্টরুমে নিরবতা বনে চলে যায়। নাসির চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি মুহুর্তেই দপ করে নিভে যায়। গা এলিয়ে বসা ছেড়ে সে তাৎক্ষণিক সোজা হয়ে বসে। আসিফের মাত্র বলা কথাটা তার বোধগম্য হয় না। সে আশেপাশে তার লোকেদের দিকে তাকায়। সবাই তাকে চোখে চোখ রেখে আশ্বস্ত করেন। বুঝান অ্যাডভোকেট সাহেবের উপর আস্থা রাখতে।
"সস্তা স্বীকারোক্তি দিয়ে লাভ নেই আসিফ সাহেব। এগুলো কেউ খায় না। সমস্ত প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। স্বীকার করুন, সান্নিধ্যই খুনটা করেছে! আর আপনি তার পাশে ছিলেন। এই নির্মম দৃশ্য আপনি নিজ চোখে দেখেছেন।"
আসামি পক্ষের আইনজীবী অর্থাৎ সান্নিধ্যের আইনজীবী অ্যাডোভোকেট মাহবুব বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। বিচারকের সামনে দু হাত প্রসারিত করে মৃদু হেসে বলেন,
"ইয়োর অনার, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত চলমান কথার মাঝে আমাকে ইন্টারফেয়ার করতে হচ্ছে। আমি আসলে এই মুহুর্তে কোথায় আছি বুঝতে পারছি না। এটা কি কিন্ডারগার্টেন? এটা কি শিশুদের পাঠশালা? যেখানে শিক্ষক ছাত্রকে বুলি শিখিয়ে দিচ্ছেন।
একপাক্ষিক অ্যালিগেশন কিভাবে দিতে পারেন উনি? মনে হচ্ছে জোর করেই সে স্বীকারোক্তি নিবেন আর উনার কথামতো জনাব আসিফ সেটা স্বীকার করবেন? রূপকথার গল্পের ন্যায় লাগছে কি না?"
"আপনার কাছে রূপকথার গল্প মনেই হতেই পারে। কারণ, আপনার চোখে এমপি সাহেব দুধে ধোঁয়া তুলসি পাতা। তার দ্বারা কোনো অন্যায় হতেই পারে না। অথচ গোটা চট্টগ্রামের মানুষ জানে তার বিধ্বংসী রূপের কথা।"
"ইয়েস, ঠিক বলেছেন। এজন্য কোর্ট চত্বরের বাহিরে সাধারণ জনগণের মুখে এমপি সাহেবের জয়ধ্বনি শোনা যায়। কোথাও দেখেছেন কি,খুনের মামলায় অভিযুক্ত নেতার পক্ষে এমন জোরালো সমর্থন?"
দু'পক্ষের উত্যপ্ত বাক্য বিনিময় শুরু হয়৷ পাল্টাপাল্টি কাউন্টার অ্যাটাক দিতে দুজনেই তৎপর। কোর্টরুমের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে বিচারক আসামির পক্ষের আইনজীবীকে থিতু হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বাদী পক্ষের আইনজীবীকে জেরা কার্যক্রম চালানোর আদেশ দেন।
"আপনি কি সত্য প্রমাণকেও অস্বীকার করবেন আসিফ সাহেব? নাকি ভয়ে, ক্ষমতার জেরে নিজের মতামতকে পরিবর্তন করে ফেলছেন? আপনি সত্য স্বীকার করুন। আপনার নিরাপত্তা প্রশাসন দিবে।"
"আমি আমার জবানবন্দিতে আবারও বলছি, আমি বা এমপি সাহেব কেউই খুন করিনি। আমরা সেদিন শুধু ঘটনাস্থলে ছিলাম, কিন্তু খুনটা করেছে অন্যকেউ। আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রজত সমাদ্দারকে ব্যবহার করে আমাদের ফাঁসানোর জন্য এই ষড়যন্ত্র সাজানো হয়েছে।"
শামসুর রহমান ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসেন। মাথা নাড়িয়ে স্পষ্ট গলায় বলেন,
"এসব বাজে কথা ছাঁড়ুন। আপনি সহ আসামিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। আপনাদের দু'জনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। গত ২৯ শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ডিসি হিলে কুঠি বাড়ি নামক বাড়িটায় রজত সমাদ্দারের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এবং সেই কুঠি বাড়ির মালিক স্বয়ং এমপি সাহেব। সেসময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার হাতে রিভলবার ছিলো। পুলিশ জানিয়েছে, পুরনো শত্রুতার জেরে এমপি সাহেব রজত সমাদ্দারকে জিম্মি করে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। ওইদিন বিকেল বেলাতেও তাদের মুখোমুখি গাড়ি নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছিল। নিজের রাগ জেদ চেপে না রাখতে পেরে এমপি সাহেব এই নৃশংস হত্যাকান্ড চালান।"
"পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে পৌঁছালো কিভাবে? তারা কি তাহলে আগে হতেই জানতো ডিসি হিলের কুঠি বাড়িটায় সেরকম কিছু হবে?"
আসামি পক্ষের আইনজীবীর জেরায় বিচারক এসআই নিজাম উদ্দিনকে কাঠগড়ায় আসার নির্দেশ দেন। তাকে একই প্রশ্ন করা হলে বলেন,
"রজত সমাদ্দার নাসির চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন। বিকেলের পর থেকে তিনি যখন নিখোঁজ হলেন তখন নাসির চৌধুরী থানায় জিডি করেন। আমরা তৎক্ষনাৎ তদন্তের জন্য বের হয়ে যাই। যেহেতু ডবল মুরিং এলাকায় এমপি সাহেবের সাথে তাদের ছোটখাটো একটা সংঘর্ষ হয়। সেই সাপেক্ষে আমরা এমপি সাহেবের খোঁজ করি এবং আটটা এক মিনিটে ডিসি হিলের সেই কুঠি বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়ে সবকিছুর চাক্ষুষ প্রমাণ পাই। সেখানে এমপি সাহেব উপস্থিত ছিলেন এবং তার হাতে রিভলবার ছিলো। ছিলেন আসিফ সাহেবও। আর মাটিতে রজত সমাদ্দারের মৃতদেহ।"
"আপনাদের উপস্থিতিতে আসিফ পালালো কিভাবে?"
"এমপি সাহেবের লোকজনদের সাথে আমাদের বাকবিতন্ডা শুরু হয়েছিল। এই সুযোগে তিনি পালিয়ে যান। কারণ কুঠি বাড়ির আনাচে কানাচে জুড়ে বাহিরে বের হওয়ার হাজার রাস্তা।"
"আচ্ছা সব বুঝলাম, সব ঠিক আছে। বাট আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো। এমপি সাহেবের সাথে সংঘর্ষ এবং রজত সমাদ্দারের নিখোঁজ হওয়ার মাঝে সময়সীমা ছিল মাত্র আটান্ন মিনিট। এর মাঝেই নাসির চৌধুরী কিভাবে নিশ্চিত হলেন রজত সমাদ্দার নিখোঁজ হয়েছেন এবং এমপি সাহেব তাকে ডিসি হিলের সেই কুঠি বাড়িতেই নিয়ে গিয়েছেন। এর মাঝে আবার জিডি করাও হয়ে গেলো?"
অ্যাডভোকেট সাহেবের জেরাতে এসআই নিজামুদ্দিনের মুহুর্তেই মুখোভঙ্গি পাল্টে যায়। শুকনো ঢোক গিলে সে নাসির চৌধুরীর দিকে তাকান।
"ইয়োর অনার, আমি শুরুতেই বলেছিলাম এসব কিছু রূপকথার গল্প। আমার মনে হয়, নাসির চৌধুরী আলাদীনের চেরাগ হাতে পেয়েছিলেন। সে জাদুকরী দৈত্যকে সেই দুই ঘন্টায় তিনটে নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। সেই নির্দেশ অনুযায়ীই জাদুকরী দৈত্য সব পালন করেছে। হাজার হোক প্রভুর আদেশ তো ভৃত্য পালন করবেই।"
কোর্টরুমে মৃদু হাসি এবং গুঞ্জন বায়। আশেপাশে মানুষদের কানাঘুঁষা শুরু হয়। বাদী পক্ষের আইনজীবী চড়াও হয়ে উঠে বলেন,"সত্যকে মিথ্যা দ্বারা ঢাকার অপচেষ্টা করে লাভ হবে না। আপনি প্রমাণ করুন এমপি সাহেব খুন করেননি।"
"ধৈর্য্য ধরুন। নব্বই মিনিট এখনো শেষ হয়নি। ট্রাইব্রেকারে গোল দেওয়ার মজাই আলাদা।"
"কি বলতে চাইছেন আপনি?"
অ্যাডভোকেট মাহবুব সাহেব বিচারকের সামনে সুদূঢ় হয়ে দাঁড়ান। স্পষ্টত স্বরে বলেন,"ইয়োর অনার, প্রাথমিক অবজারভেশনে আমরা এতটুকু নিশ্চিত, ২৯ শে ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে চারটা হতে রাত নয়টা পর্যন্ত যা যা হয়েছে সব এক পক্ষের পূর্ব পরিকল্পিত প্ল্যান ছিলো। আমার মক্কেল জনাব আসিফ সেটার প্রমাণ দিবেন।"
প্রমাণের কথা উঠতেই নাসির চৌধুরীর গা বেয়ে ঘাম ঝরে যায়। মুখ হয়ে উঠে ফ্যাকাশে। তার মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রমাণ? কিসের প্রমাণ?কোনো প্রমাণ তো থাকার কথা নয়। তার লোক তো সব..
আসিফ মুখ খোলে। দৃঢ় কন্ঠে বলে,
"ডিসি হিলের কুঠি বাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আমার কাছে ছিলো। পুলিশদের সঙ্গে যখন আমাদের বাকবিতন্ডা শুরু হয় তখন আমি কৌশলে ফুটেজটা সংগ্রহ করি এবং সবার চোখে ধূলো দিয়ে পালিয়ে যাই। এক্ষেত্রে আমি স্যারকেও সেই কথা বলিনি। উনিও সবার মতো জানতেন, আমি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে কিংবা নিজেকে বাঁচাতে পালিয়েছি। আসলে আমি যদি সেসময় পালিয়ে না যেতাম এবং সেই ফুটেজটা পুলিশের হাতে কোনোভাবে যেতো তাহলে সেটা কখনোই চার্জশিটে উল্লেখ করা হতো না। বরং তারা প্রমাণ মুছে ফেলতে যা যা করতে হতো তাই করতেন। কেননা এসআই নিজামুদ্দিন সাহেব নাসির চৌধুরীর পোষা প্রাণী। আমি পলায়ন থাকা অবস্থাতেও ঠিক থাকতে পারিনি। আমার থেকে এই প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্য নাসির চৌধুরী এবং তার লোক হন্য হয়ে খুঁজেছে। একসময় আমি যখন ধরা পড়ি ঠিক তার আগ মুহুর্তে সেই ফুটেজ আমি মাহবুব স্যারের হাতে তুলে দেই। কারাগারে যখন এসআই সাহেব আমাকে জেরা করেন, তল্লাশি চালিয়েও ফুটেজ পাননা। তখন আমাকে অমানবিকভাবে মার শুরু করেন। আশা করি,আমার শারীরিক অবস্থা দেখে তা বুঝতে পারছেন। আমি সেই ফুটেজটা এখন আদালতে জমা দিতে চাই।"
আসিফের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোর্টরুমে ফের গুঞ্জন উঠে। বিচারক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে গম্ভীরভাবে আসিফের আইনজীবীকে সেই প্রমাণ আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
সিসিটিভির ফুটেজ চালু করা হয় বড় স্ক্রিনে। দেখা যায়, কুয়াশা মাখা কুঠি বাড়ির বাগানে ঠিক ছয়টা বাইশ মিনিটে রজত সমাদ্দারকে হাজির করা হয়। দু'জন লোক তাকে দু হাত ধরে থাকেন। চোখে মুখে কাপড় বাঁধা। লোকগুলো এমপি সাহেবেরই। রঞ্জু নামে এমপি সাহেবের অতি কাছের ব্যক্তিটি একটা রিভলবার বের করে রজত সমাদ্দারের মুখে ধরে। প্রায় সাত মিনিট ধরে চলে তাদের কথোপকথন। ঘড়ির কাঁটায় যখন সাতটা ঊনত্রিশ বাজে ঠিক সেসময় তিনি ডিরেক্ট পেটে শ্যুট করে দেন। দুজন লোক সেই ধরা হাত ছেড়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গে রজত সমাদ্দার মুখ থুবড়ে লুটিয়ে পড়ে যায় মাটিতে। এর ঠিক দেড় মিনিটের মাঝে দেখা যায় আসিফকে। সে আসামাত্র রজত সমাদ্দারের মৃতদেহ দেখে ফোন করে কাউকে।
সাতটা বায়ান্ন মিনিটে সান্নিধ্যের গাড়ি প্রবেশ করে কুঠির বাড়ির বাগানে। গাড়ি এসে থামে একদম ঘটনাস্থলের সামনে। রিভলবার হাতে বেরিয়ে সে ক্রোধান্বিত হয়ে সরাসরি রঞ্জুর গলা চেপে ধরে। তাদের চলমান কথার মাঝে এমপি সাহেবের ফোন আসে। সেই ফোনটা মূলত এসেছিল সানজির। শেহরিনকে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি নিতে। দু মিনিটের বাক্যব্যয় শেষে সান্নিধ্য ফের এসে রঞ্জুর সাথে তর্কাতকি শুরু করেন।
আর এর মাঝেই আকস্মিক পুলিশের টিম এসে উপস্থিত হয়। তাৎক্ষণিক মুহুর্তে সান্নিধ্যের হাতে রিভলবার এবং রজত সমাদ্দারের মৃতদেহ দেখে তারা সরাসরি অভিযুক্ত করেন এমপি সাহেবকে। এদিকে এমপি সাহেবের লোকজন এসে জমায়েত হয়। শুরু করেন বাকবিতন্ডা। আর এসবের মাঝে নিখোঁজ হয়ে যায় আসিফ।
পুরো ফুটেজটা দেখা শেষ অ্যাডভোকেট মাহবুব সাহেব ঠোঁট প্রসারিত করে হাসেন। স্থির গলায় বলেন,"ইয়োর অনার, আর কি কিছু প্রমাণ করার আছে? কে আসল খুনী সেটা দেখতেই পাচ্ছেন। তবে, এর পিছনে কিন্তু রয়েছে। সান্নিধ্য সাহেবের লোক রজত সমাদ্দারকে খুন করেছে বলেই যে সান্নিধ্য সাহেব মদদদাতা তা কিন্তু নয়। রঞ্জু এক্ষেত্রে বেইমানি করেছে। সে নাসির চৌধুরীর প্রলোভনে পা দিয়ে এমপি সাহেবকে এই খুনে জড়িয়েছে। এর স্বীকারোক্তি সে নিজেই দিয়েছে। এই নিন তার প্রমাণ।"
অ্যাডভোকেট সাহেব গ্রেফতারকৃত রঞ্জুর জবানবন্দির শিট তুলে দেন বিচারকের হাতে। অতঃপর নিরেট গলায় বলেন,
"কাহিনী সংক্ষেপ করি, নাসির চৌধুরী মূলত একটা ব্রেইন গেম খেলতে চেয়েছিলেন। প্রথমত, এমপি সাহেবের সঙ্গে স্বইচ্ছায় সংঘর্ষে জড়িয়েছেন, অতঃপর এমপি সাহেবের হাতে রজত সমাদ্দারকে তুলে দিয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন, শিকারী শিকার হাতে পেলে চুপ করে বসে থাকবে না। এদিকে রঞ্জু, সান্নিধ্য সাহেবের ঘটনার স্থলে আসার আগেই নাসির চৌধুরীর আদেশে রজত সমাদ্দারকে হত্যা করেছেন। মানে, নিজের লোককে প্রতিপক্ষের লোক দ্বারা হত্যা করিয়েছেন। কতটা বিকৃত মস্তিষ্কের হলে এমন গেইম প্ল্যান করা যায়? এখানে সে রজত সমাদ্দারকে গুঁটির চাল হিসেবে ব্যবহার করে গিয়েছেন।"
চোখের পলকে পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায়। বিচারক সমস্ত কিছু পুনরায় বিচার বিশ্লেষণ করেন। খুনের সঙ্গে এমপি সাহেবের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, আদালত প্রথমে মামলার মূল অভিযোগ খুন থেকে সান্নিধ্য এবং আসিফকে নির্দোষ ঘোষণা করে খালাসের রায় দেন সেই সাথে পুলিশকে নির্দেশ দেন নাসির চৌধুরী এবং এসআই নিজামুদ্দিনকে প্রাথমিক জবানবন্দির জন্য আটক করার জন্য।
কাঠগড়া হতে আসিফ নেমে আসে। অদূরে দুহাত বুকের সাথে ভাঁজ করে দাঁড়ানো এমপি সাহেবের দিকে তার দৃষ্টির মিলন ঘটে। যে দৃষ্টিতে প্রকাশ পায় একে অপরের বিশ্বস্তার নমুনা।
"কাজটা ঠিক করলে না আসিফ। বেইমানি করলে নাসির চৌধুরীর সাথে?"
"যার নুন খেয়ে এসেছি এতোদিন, তার গুণ গাইতে তো হবেই স্যার। সান্নিধ্য আমার ভাই হয়, ভাই। তারে আমি বড় ভাই মানি। কোটি কোটি টাকার বিনিময়েও এই সম্পর্ক কিনতে পারবে না কেউ। তার জন্য দরকার হলে, আমি জীবন দিয়ে দিবো। তার পিছনে ঢাল হয়ে দাঁড়াবো, মৃত্যুরও পরোয়া করবো না। সবাই মীরজাফর হয় না,সবাই রঞ্জু হয় না। আমার মতো আসিফও দুনিয়াতে অনেক আছে। ভুইলা যাবেন না। ওসব সম্পত্তি, টাকা, গাড়ি, বাড়ি আমি মুখ খুললেই সান্নিধ্য ভাই হাজির কইরা দিবে। কিন্তু আমার ওসব চাই না। আমি এমনেই ভালো আছি। যান, এবার সম্পত্তি ধুইয়া পানি খান। দেখা হবে, সান্নিধ্যের ডেরায়। এই লোক আপনারে ছাড়বে না।"
"কালকে কারাগারে রাজি হয়েছিলি কেন শুয়োরের বাচ্চা?"
"আপনাদের মতো ঘোলা জলে আমরা পা রাখি না। রাজি না হলে, আপনার চামচা আমার উপর টর্চার করে আদালতে যেন হাজির না হতে পারি সেই অবস্থা করে দিতো। আমি কি করে সেই সুযোগটা দেই বলুন? আর হ্যাঁ, বুঝে শুনে মানুষের সাথে লাগতে যাবেন। সান্নিধ্য আর সান্নিধ্যে ভাই সরফরাজ পাকা খেলোয়াড়। এই যে রঞ্জুর ব্যাপারটা সামনে এসেছে না এটা পুরোটাই সরফরাজের খেল। আর সান্নিধ্য কারাগারে বসে থেকে সবটা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ভাবুন, খুনী অভিযুক্ত হয়ে জেলে খেটে, রিমান্ডে গিয়েও এমপি পদটা সরে যায়নি তার। আহঃ পলিটিক্স!!! "
আসিফ মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে নাসির চৌধুরীকে স্থির মূর্তি করে দিয়ে প্রস্থান নেয়। পুলিশ এসে নাসির চৌধুরীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। ঠিক সেই মুহুর্তে সান্নিধ্য শিরদাঁড়া টান টান করে হেঁটে আসে সামনে। ঠোঁটের কোণে ধারালো হাসি টেনে বলে,"নিজে ক্ষমতাবান ঠিক আছে, কিন্তু অন্যকে দূর্বল ভাবা ভুল।"
জারা কনকর্ড,সন্ধ্যা সাতটা
ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মৃদু গুঞ্জন ঘর জুড়ে বহমান। সাদা রোলার কার্টেনগুলোতে হাওয়া লেগে দাপিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে এলোমেলোভাবে। ড্রয়িং রুমজুড়ে নিভু নিভু আলোর ছটা। এই বৃষ্টিমুখো দিনে শেফালী বের হয়েছে বাড়ির উদ্দেশ্য। অন্যদিকে সানজি বই নিয়ে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে শাহমিকার পাশে।
মাত্রই লম্বা ঘুম শেষ করে উঠেছে রাজকন্যা। দু'হাত নেড়ে মুখ দিয়ে অস্ফুট আওয়াজে খেলতে ব্যস্ত। ফু'মণিকে সাড়ে তিনমাস বয়সেই হয়তো চিনে ফেলেছে সে একটু একটু করে। দেখলেই মুখে হাসি বিস্তার হয়ে যায় তার আপনাআপনি।
পড়নে তার সাদা রঙের একটা ফ্রক। মাথার চুলগুলো শেহরিনের মতোই ঘন কালো হয়েছে। তবে সবাই মুখ দেখে বলে, একদম সান্নিধ্যের মতো হয়েছে। শুধু তিরতিরে নাকটা পেয়েছে মায়ের মতো। নানান জনের নানান মন্তব্য শেহরিন মিষ্টি হেসে গ্রহণ করে নেয়। সবার চোখের দৃষ্টি ভঙ্গি এক নয়। যার যার দৃষ্টিকোণ হতে সে সে বিচার বিশ্লেষণ করে।
কিচেন হতে সানজির জন্য কফি তৈরি করা শেষে টাওয়েলে হাত মুছে বের হয় শেহরিন। শাহমিকা হওয়ার পর পরেই আবারো শুকিয়ে গিয়েছে সে। ছাপান্ন কেজি হতে তড়তড় করে নেমে এসেছে একান্নতে। কেন জানি খাবার তার গলা দিয়ে নামে না। শুধু মাত্র মেয়ের জন্য জোর করে গলাধঃকরণ করতে হয়। ইদানীং সে যা কিছু করে সব শুধু মেয়ের জন্যই। মুখে প্রকৃত হাসির চেয়ে কৃত্রিম হাসিটাই অধিক প্রাধান্য পায়।
কিচেন হতে বের হয়ে নিজ কক্ষে যাওয়া মুহুর্তে জানালা ভেদ করে বৃষ্টির ছাঁট আসা দেখে সে গতিপথ পরিবর্তন করে। হাতে কফিমগ নিয়েই যায় জানালা বন্ধ করতে। বেশ ভালোই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলো অ্যাপার্টমেন্টের নিচে লাগানো ফুলগাছগুলোতে কেমন মলিন আভা তৈরি করেছে। বৃষ্টির ভারী ফোঁটার ভাড়ে ফুটন্ত ফুলগুলো নুইয়ে পড়েছে। যেন মনে হচ্ছে এই ভার সামলাতে সে অক্ষম। শেহরিন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। এসব কিছুর প্রতিচ্ছবি ঠিক যেন তার চলমান জীবনের মতো।
"শেহরিন.. "
"হু আসছি.."
শান্ত গলার ডাক কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই শেহরিনের ধ্যান ভাঙে। একহাতে জানালার থাই টেনে বন্ধ করে ফেলে। বৃষ্টির ছাঁটে ফ্লাওয়ার ভাসটা সিক্ত হয়ে উঠেছে। হাত দিয়ে আলতো করে ঝেড়ে সে পিছু ঘুরে তাকায়।
আকস্মিক দৃষ্টি হঠাৎই কিছু একটাতে আটকে যায় শেহরিনের। শ্বাস আটকে আসে এক মুহূর্তের জন্য। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক চেনা ছায়া। আলতো আলোর আভাসে সেই ছায়া দূরীভূত হয়ে পরিষ্কার হয়ে উঠে সেই মুখ, সেই চোখ, সেই চিরপরিচিত লম্বা দৈহিক রেখা।
সান্নিধ্যের পড়নে নেভি ব্লু রঙের একটি শার্ট। কনুই অব্দি ফোল্ড করে রাখা হাতাটা কুঁচকে আছে বৃষ্টিতে আধভেজা হয়ে। মুখোরেখা মৃদু ঘামে সিক্ত। কিন্তু চোখদুটো তার ঠান্ডা হিমশীতল।
শেহরিনের মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হয় না। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠে প্রশ্নে, অবিশ্বাসে, এক অবর্ণনীয় উৎকণ্ঠার ছাপ নিয়ে। ঠোঁট দুটো সামান্য খুলে গেলেও শব্দ হারিয়ে ফেলে সে। মস্তিষ্ক জুড়ে আবারো প্রতিধ্বনিত হয়ে একটু আগের সেই ডাক 'শেহরিন'। তার মানে.. এটা সানজি আপুর ডাক ছিলো না? অবচেতন মন তার ধরে নিয়েছিল সানজি আপুর ডাক। কিন্তু এটা তো আসলে উনার ডাক.. উনার..!!
শেহরিনের পুরোটা বোধগম্য হতেই তার স্তব্ধতা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অস্ফুটস্বরে চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুর ধারা। সে ডুকরে কেঁদে উঠে। হাতদুটো নিঃসাড় হয়ে আসতেই কফির মগটা মেঝেতে পড়ে যায়। গরম কফি ছিটকে এসে লাগে তার পায়ে। কিন্তু সে তা অনুভব করতে পারে না। কারণ,মস্তিষ্ক এই মুহুর্তে তার নিশ্চল। দ্বিগবিদিক ভুলে ঝড়ের বেগে ছুটে যায় সে সান্নিধ্যের পানে।
নিঃসঙ্গতার সমুদ্রে ডুবে থাকা রমণী আচমকা তার প্রিয় পুরুষের দেখা পেতেই ছন্নছড়া হয়ে যায়। এক ঝটকায় প্রশ্বস্ত বুকের মাঝে হানা দেয়। দু-হাত পেঁচিয়ে নেয় গলার সঙ্গে। অন্যদিকে সান্নিধ্য ও তার দৃঢ় বাহু দ্বারা কোমল কায়াকে জড়িয়ে ধরে । আকড়ে নেয় নিজের সঙ্গে ভেঙে পড়া, কাঁপতে থাকা দেহটাকে। শেহরিন মুখ গুঁজে দেয় তার ঘাড়ে, ভেজা শার্টের মাঝে। শূন্য ভাসতে থাকে তার পা দুটো।
দু'জনের নিরব সময় পেরোয়। শেহরিনের কান্না থামে না।
সান্নিধ্য মাথা নিচু করে চুমু খায় শেহরিনের গালে, কপালে, থুতনিতে। অজস্র চুমুতে ভরিয়ে তোলে ভেজা মুখোরেখাকে। দু'হাতে চোখের কার্নিশে বেয়ে চলা অশ্রুগুলোকে নির্মেদ করে দেয় সে।
"প্লিজ আর কান্না করো না।"
"আপনার তৃষ্ণায় শেহরিন মরে যাচ্ছিল।"
"এজন্য তো সব নিয়ম ভেঙে চলে এসেছি।"
"আপনি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ নেতাসাহেব। প্লিজ আমাকে আর এতো কঠিন পিপাসায় কাতর করবেন না৷ আমি সহ্য করতে পারি না।"
" করবো না কথা দিচ্ছি।"
শেহরিন সান্নিধ্যের ডান হাতটা নিজের গাল ছুঁইয়ে দিয়ে ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসে। ছোট ছোট চুমুর মাঝে কান্নাভেজা রক্তিম চোখে তাকিয়ে বলে,"আপনার রাজকন্যাকে দেখবেন না?"
"দেখতে চাই।"
"পিছু ফিরে তাকান।"
সান্নিধ্য পিছু ঘুরে তাকায়। সানজির কোলে নব্য প্রস্ফুটিত তার রক্তের অংশকে দেখা মাত্র দৃষ্টি স্থির করে ফেলে। ধারালো সেই চোখজোড়াতে শ্রাবণের বৃষ্টির ন্যায় শীতল হয়ে উঠে মুহুর্তেই। তার নির্ঘুম রাতের ক্লান্তিকর দেহটাতে এক অন্যরকম আবেশ এসে ভীড়ে। তার মেয়ে, তার রাজকন্যা। তার জীবন্ত ফুল দুনিয়াতে এসেছে, অথচ বাবা হয়ে সে এতোদিন পারেনি ছুঁতে তাকে। মেয়ে তার বাবাকে পায়নি জন্মের তিনমাস অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরেও। এই হাহাকার সান্নিধ্যের পাথর বুকটাকে একদম ছিন্ন ভিন্ন রক্তক্ষয়ী করে তোলে। ত্রিশ একত্রিশ বছরের জীবনে যদি হার শব্দটা আসে তাহলে সেটা এখানেই হবে। সে তার মেয়ের কাছে হেরেছে।
নিজের অসাড়তাকে দমিয়ে সান্নিধ্য ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সানজির পানে। কোলে থাকা তার মেয়েকে এড়িয়ে সানজির কপালে স্নেহের চুমু এঁকে দেয়। অতঃপর হাত বাড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে তুলে নেয় কোলে। সানজি চলে যায় নিজস্ব কক্ষে। এই মুহুর্তটা একান্তই তাদের।
শাহমিকার সঙ্গে তার বাবার প্রথম দৃষ্টি বিনিময় হয় নিরবে। দু'জন দুজনের পানে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। বাচ্চাটা অচেনা এক মুখ আচানক দেখতে পেয়ে হাত পা নাড়াতে থাকে। গোলাপি রঙা ঠোঁটটা ফুঁড়ে নিজ বাক্যে সুর তোলে।
পুরুষ মানুষ কালে ভদ্রে চোখ জল আনে। তাও সেটা অধিক সুখে। জীবন সংকটপূর্ণ কিংবা অতলে হারিয়ে গেলেও তাদের চোখ থাকে শুষ্ক। ঠিক তেমনি সান্নিধ্যের জ্বলন্ত চোখে বৃষ্টি নামে না বহু বছর ধরে। কবে,কোথায় কখন কেঁদেছে মনে করতে পারে না সে। তবে আজ প্রকৃতির সাথে তার চোখ সঙ্গ মেলায়। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা এই লাগামহীন বেপরোয়া নেতাসাহেবের চোখের কোণে পানি এসে জমে। এবং কিছু সময়ে ব্যবধানে নিভৃতে গড়িয়ে পড়ে তার মেয়ের পায়ের উপরে।
সান্নিধ্য মাথা নিচু করে চুমু খায় তার জীবনে আগত জারুল ফুলের কলিকে। স্নিগ্ধ, নরম ছোট্ট দেহটাতে সে পিতৃস্নেহে ভরিয়ে তোলে। বুকের ভিতরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়ে আদুরে আহ্লাদে ভাসায়। কানের কাছে মুখটা নিয়ে ধীর কন্ঠে উচ্চারণ করে,"আই'এম সরি মা। আই'এম সরি।"
শাহমিকার নরম কোমল হাত এলোমেলোভাবে বাবার গালে বিচরণ করে। খামচে ধরে সে ছোট ছোট নখ দ্বারা।
শেহরিন চোখ বন্ধ করে দমকানো কান্না থামায়। বাবা মেয়ের এই মিষ্টি মুহুর্ত তার কলিজা ঠান্ডা করে তোলে নিমিষেই। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সে ঘোলাটে চোখ নিয়ে এগিয়ে আসে । সান্নিধ্য এবং মেয়েকে জড়িয়ে ধরে মুখ লুকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,"এই দিনের অপেক্ষায় আমার কেটেছে বহুদিন।"