রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৫৩

🟢

"রিমন কিছু ফুল এনে দিতে পারবি? খালি খালি লাগছে।"

"ভাই..আপনার কি মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে ?"

"মাথা আমার ঠিকই আছে। তুই তাড়াতাড়ি ফুল এনে দে।"

রিমন হতাশা আর ভয়ার্ত চাহনির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পা বাড়ায় ফুল আনতে। তার মাথা বনবন করে ঘুরছে। কল্পনাতেও ভাবেনি এই পাগলা প্রেমিক এতোদূর চলে আসবে। এই পুরুষের এতোকালের ভালোবাসার সাক্ষী সে, নিজ চোখে দেখেছে সানজির প্রতি আড়ালে জমানো ভালোবাসার কিছু পরিস্ফুটন। কত রাত গিয়েছে গিটারের সুরে সুরে সে তার অব্যক্ত ভালোবাসাগুলোকে স্মরণ করেছে নিভৃতে। এই সব কিছু রিমনের জানা। কিন্তু শেষ মেশ এমন দুঃসাহসিক কাজ যে করে বসবে সেটা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি। সরাসরি বিয়ে? তাও আবার কাজি অফিসে!!

"এতো সময় নিলে তো সমস্যা। আমার তো আরো ক্লায়েন্ট বসে আছে।"

"একটু বসে থাকলে ক্ষতি নেই কাজি সাহেব। সারাদিন মানুষ দৌড়ের উপরই থাকে। বসার সুযোগ কোথায় পায়? এই সু্যোগে একটু বসে থাকুক।"

কাজি সাহেব বিরক্ত হন খানিকটা। রেজিস্ট্রার খাতা বের করে অকারণেই পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকেন। আধাঘন্টা হয়ে এলো এমনভাবে বসে আছেন। এতোক্ষণে তার গোটা তিনেক বিয়ে পড়ানো সম্পন্ন হয়ে যেতো। অথচ এই কপোত-কপোতীর পাল্লায় পড়ে সে একদম আটকে আছে। একবার বলছে, গার্জিয়ান আসছে অপেক্ষা করুন,এখন আবার ফুল আনার পর বিয়ে হবে অপেক্ষা করুন। এতো অপেক্ষা করলে তো ব্যবসা তার লাটে উঠে যাবে !!

প্রশ্বস্ত কাঠের টেবিলে বড় চেয়ারটায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন তিনি। ঠিক তার সামনে দুটো চেয়ারে বসেছে পাত্র পাত্রী । পাশের বেঞ্চে সাক্ষীদাতা হিসেবে আসিফের মামাসহ দু তিনজন বন্ধু বান্ধব।

একটু পরেই বিবাহিত বনে যাবে বসারত এই নারী। মনে তার চাপা উত্তেজনা বইছে। অসম বেগে ছুটছে ঘাম, মুখোরেখা আর গা জুড়ে। বুকের মধ্যে ধড়ফড় কিছুতেই কমছে না। হিসেব নিকেশের পালা শেষ হলেও ভাইয়েদের ভয়ে সে গুটিয়ে যাচ্ছে বারেবারে। তাদের না জানিয়ে বিয়ের মতো একটা শুভ কাজ করতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা অনুচিত এর চেয়েও তার কাছে থ্রিলিং থ্রিলিং ভাইব লাগছে। এদিকে, আসিফ ভাইয়ের প্রতি তার আস্থা অজান্তেই এতো গাঢ় কেন হচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছে না। মন মস্তিষ্ক তাকে একটাবারও বিপত্তির প্রশ্ন তুলছে না৷ অদ্ভুত!!

রিমন বৃষ্টিতে ভিজে কুঁড়ে ফুল এবং ফুলের গহনা নিয়ে এসে হাজির হয়। টাটকা লাল গোলাপ আর সাদা জার্ভেরার মিশেলে তৈরি গাজরা আর কপালের টিকলি। এছাড়া রাত হয়ে যাওয়াতে বিশেষ কিছু পায়নি সে।

টুপটাপ জলের কণা পড়ে রয়েছে ফুলগুলোর উপরে। কাঁচা ঘ্রাণ ছড়িয়েছে বেশ। আসিফ চেয়ার ছেড়ে উঠে রিমনের হাত থেকে ফুলের গহনাগুলো নিজ হাতে নেয়। সাদা চূড়িদার পড়নে কোমল কান্তার কাছে এসে বিনাসঙ্কোচে হাঁটু গেঁড়ে বসে সে। আশেপাশে কাজি সাহেব সহ মানুষজনের তোয়াক্কা না করেই নরম হাতদুটোতে সে গাজরা পরিয়ে দেয় সযত্নে। অতঃপর মাথায় ফুলের টিকলিটা কোনমতে একটু লাগিয়ে দিয়ে ওড়না দিয়ে ঘোমটা টেনে দেয়।

"এখন বউ বউ লাগছে।"

সানজি হিমশীতল বরফের ন্যায় জমে আছে। নির্নিমেষ চাহনিতে সে তখন থেকে এই লোকটার পাগলামি গুলো দেখে যাচ্ছে। লোকটার মুখে বউ শব্দ আর দূর্দান্ত এক হাসি, সরাসরি তার বুকে এসে আঘাত করে। এতো যত্ন করে সে কি কখনো ভালোবাসা পেয়েছে? কেউ কি তাকে এতোটা সমাদর করেছে?

না করেনি, যে মিথ্যে ভালোবাসার জালে সে আবদ্ধ ছিলো সেখানে সবটাই কৃত্রিমতায় ভরপুর ছিলো। এতো সতেজ অনুভব সে করেনি, না পেয়েছে একটুখানি যত্ন। দামি দামি রেস্টুরেন্ট, শপিংমল, ব্রান্ডের গাড়ি এসবেতে আটকে ছিলো সেই নামে মাত্র ভালোবাসা। অথচ, সোনায় মুড়িয়ে থাকা রমণী আজ সামান্য দুটো ফুলেই এতো পরিতৃপ্তি পাচ্ছে। যার ফলে সে নির্বাক পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না কি বলবে।

সানজির পায়ের কাছে বসা পাগলা প্রেমিক তার হবু বউয়ের হাত ধরে মুখ তুলে চায়। ঠোঁটের কোণে লুকানো প্রাপ্তির হাসিটাকে দমিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,"সমুদ্রের মাঝে এক বিন্দু জল ফেলেছি হয়তো, যেটা পরিমাপ করা বোকামি। চোখে ধরবে না কারো। অপরিমেয় বিশালতার মাঝে একেবারেই নগন্য। তবুও নিরর্থক হয়ে একটুখানি... খুব সামান্য চেষ্টা। একটু কষ্ট করে মানিয়ে নাও।"

সানজি নিরুত্তর হয়ে থাকে। চোখ দুটো তার আপনা আপনি ঘোলাটে হয়ে এলেও খুব কষ্টে তা সংবরণ করে নেয়। বুকের ভিতরে বহমান ঝড় তাকে লন্ডভন্ড করে দিলেও সে টু শব্দ অব্দি করে না। বরং ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সামান্য মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।

"এবার তাহলে শুরু করা যাক।"

কাজি সাহেবের তাড়াতে আসিফ উঠে দাঁড়ায়। পাশের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বলে, "শুরু করুন।"

"আসিফ ভাই..ভাইয়াদের ছাড়া আমি বিয়ে করতে পারবো না মনে হচ্ছে।"

" কথা দিচ্ছি, কবুল বলার সঙ্গে সঙ্গে জানাবো।"

"আগে জানালে কি সমস্যা?"

"আর রিস্ক নিতে চাই না।"

"রিস্ক কেন হবে?"

আসিফ শীতল দৃষ্টিতে তাকায় সানজির দিকে । নির্মেদ কন্ঠস্বরে বলে,"অনেক কষ্টে পেয়েছি তোমাকে। হারিয়ে ফেললে নিঃশ্বাস আটকে মরে যাবো।"

"কেন শ্বাসকষ্ট আছে আপনার?"

"হু৷ ভালোবাসার শ্বাসকষ্ট। যেখানে ইনহেলার তুমি।"

রিমন দু'হাত বুকের সাথে ভাঁজ করে পিছনে দাঁড়িয়ে দু'জনের প্রেমালাপ শ্রবণ করে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। মানুষের সেকেন্ডই প্রেম হচ্ছে, সেকেন্ডই ভালোবাসা হচ্ছে আবার সেকেন্ডের মাঝেই বিয়ে হচ্ছে। আর তার? হাট্টিমা টিম ছড়া কেটে কেটে বাচ্চার কান্না থামানো লাগছে। হাসানো লাগছে। এই দুঃখ রাখার জায়গা নেই আর তার। অথচ ঠিক সময়ে বিয়ে করলে সেও স্যারের মতো বাবা হতে পারতো।

জল্পনা কল্পনা এবং দ্বিধা দ্বন্দ্বতা কাটিয়ে অবশেষে কাজি সাহেব শুরু করেন বিয়ে পড়ানো। দেনমোহর নির্ধারণের সময় আসিফ কিছুটা ভেবে চিন্তে আজকেই পরিশোধ করার মতো টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে।

একলক্ষ এক টাকা ধার্য করে সানজিকে কবুল বলার জন্য কাজি সাহেব অনুরোধ করেন। কবুল উচ্চারণ করার আগে সানজি শেষবার আসিফের মুখোরেখার দিকে তাকায়। অগভীর বিশ্বাস ভরসার প্রতিফল তার দৃষ্টিসীমায় এসে ভীড়ে। চোখ বন্ধ করে শুকনো ঢোক গিলে এক বিরাট দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলে সে। সুস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে, "কবুল।"

"আরো দু'বার।"

"কবুল,কবুল।"

"আলহামদুলিল্লাহ।"

পাত্রীর হতে কবুল বাক্য নেওয়া শেষে কাজি সাহেব এবার আসিফের হতে কবুল বাক্য নেওয়ার জন্য অগ্রসর হয়। তার প্রয়োজনীয় কথা শেষ হতে না হতেই আসিফ জোরালো গলায় নিজ হতেই উচ্চারণ করে, "কবুল,কবুল,কবুল।"

কাজি সাহেব খানিকটা হতভম্ব হলেও পর মুহুর্তে নিজেকে সামলে নেন। তিনি ধরেই নিয়েছেন, আজকের এই বিয়ে পড়ানোটা তার নিজস্ব ধারার কাজের বর্হিভূত। শুরু থেকেই উলট পালট। রেজিস্ট্রার খাতায় সাইন করার জন্য এগিয়ে দিয়ে

ভারী গলায় আসিফের দিকে তাকিয়ে বলেন,

"একটু রয়ে সয়ে কবুল বললে ক্ষতি নেই। বউ আপনার পাশেই আছে।"

আসিফ কলম হাতে নিয়ে সাইন করা শেষে সানজির দিকে খাতাটা এগিয়ে দেয়। কাজি সাহেবের চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে বলে,

"শুভকাজ ওভারস্পিডে করতে হয়।"

______________________________________

রাত সাড়ে আটটা। বেডের উপরে শুয়ে দু হাত পা ছড়াছড়ি করে আপনমনে খেলছে রাজকন্যা। একা একাই হাসছে তো আবার গুনগুন করে গাইছে নিজতালে। ঠিক তার নিচে বেডের গা ঘেঁষে হেলান দিয়ে ফ্লোরে পা ছড়িয়ে বসে আছে সান্নিধ্য। কোলের উপর তার ল্যাপটপ। দুটো হাত তার ব্যস্ত কিবোর্ডে ক্রিয়াচালন করতে। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ নজর তার মেয়ের দিকে।

একদম রেডি হয়েই বসে আছে সে। শেহরিনের শাওয়ার শেষ হলেই সে বের হবে তার কাজের উদ্দেশ্য বাহিরে। পড়নে তার সাদা পোলো টি শার্ট। সঙ্গে কালো প্যান্ট। মুখোভঙ্গি বেশ ঠান্ডাই রয়েছে এখন পর্যন্ত।

চলমান কাজের মাঝে তার ফোন বাজে। বেড সাইডের ডেস্কের উপর হতে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে একপলক স্ক্রিনের দিকে তাকায়। আসিফের ফোন। কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে সরাসরি রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ হতে ভেসে আসে নির্জীব এক স্বর।

পুরো দেড়মিনিট সান্নিধ্য নিরব থেকে সব কথা শুনে যায় অপর পাশের ব্যক্তির। ঠান্ডা মুখোয়াবে আগের চেয়ে কিঞ্চিত পরিবর্তন হয়ে আসে তার। কপাল খানিকটা ভাঁজ হয়ে আসলেও বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কাটকাট গলায় বলে,"লোকেশন বলো।"

"আগ্রাবাদের স্ট্যান্ড রোডের পাশে দোতলা কাজী অফিস।"

সান্নিধ্য কান হতে ফোন নামিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে পড়ে। ওয়ালেট, গাড়ির চাবি পকেটে নিয়ে হাত ঘড়ি পরতে পরতে সে

ওয়াশরুমের কাছে গিয়ে দরজা নক করে।

"বলুন।"

"কতক্ষণ লাগবে তোমার?"

"দশ মিনিট।"

সান্নিধ্য হাত ঘড়িতে সময় দেখে। দশ মিনিট মানে অনেক লম্বা সময়। এতোক্ষণ অপেক্ষা করা তার মতো ধৈর্য্যশীল ব্যক্তির কাছে ভীষণ কঠিন একটা কাজ।

"শাহমিকাকে বাইরে নিয়ে গেলে কি কোনো সমস্যা হবে?"

"এই না..না ঠান্ডা লেগে যাবে বাতাসে।"

"গাড়িতে ঠান্ডা লাগবে না।"

"কোথায় যাবেন?"

"একটা দরকারে। তাড়াতাড়িই ফিরে আসবো।"

"ক্যাবিনেটের ডান পাশে ওর গরম জামা কাপড় ভাঁজ করে রাখা আছে। ওখান থেকে একটা সেট নিয়ে পরিয়ে দিন। বাম পাশের গুলো থেকে নিবেন না। ওগুলো পাতলা সব।"

সান্নিধ্য শেহরিনের কথামতো ক্যাবিনেট খুলে জামা হাতে নেয়৷ এর মাঝে আসে আবারো ফোন। এবার ফোন করেছে তার চাচ্চু, সেলিম সাহেব৷ তার বন্ধু আখতারুজ্জামান এমন বিস্ফোরক চিত্র নিজ চোখে দেখার পর পরই তাকে ইনফর্ম করেছে।

"চাচ্চু একটু পরে কথা বলছি। আমি নিজেও মাত্র জেনেছি।"

"আমার মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে সান্নিধ্য। কিছু একটা করো। মান সম্মান আর রইলো না।"

সান্নিধ্য ফোন কেটে দিয়ে শাহমিকাকে গরম জামা পরিয়ে দেয় অপটুহাতে। জামা পরানো হয়ে গেলেও প্যান্ট পরানোটা তার খেয়ালে আসে না। সানজির আবাসিক হোটেলে উপস্থিতি দিকটা বিকৃতভাষ্যতে মিডিয়ায় উপস্থাপন করার ভাবনটা তার মস্তিষ্কজুড়ে বিচরণ চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজকন্যাকে কোলে তুলে সে বেরিয়ে যায় গন্তব্যে। এদিকে রাজকন্যাও ডায়াপার পড়েই তার চার মাস ছুঁই ছুঁই বয়সে বাবার সঙ্গে যায় ফু'মণির ঝামেলা মেটাতে। হাজার হোক, মাথা গরম মানুষের কন্যা সে। একটু এদিক সেদিক তো মেনে নিতেই হবে।

-----------------------------------------------

দোতলা ভবনের করিডোরজুড়ে পায়চারি করছে সানজি। দৃষ্টি তার ব্যস্ত রাস্তার দিকে নিমজ্জিত। সাই সাই করে ছুটে চলা গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে দাঁত দ্বারা নখ খুঁটতে থাকে সে। সদ্য বিবাহিত নারীর তকমা গায়ে লেগে গিয়েছে। বিয়ে বিয়ে সুঘ্রাণ ছড়িয়েছে চারপাশটা জুড়ে। মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় সে সমুদ্রের অথই জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। যেভাবেই হোক, ভাইদের তার ঠান্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করতে হবে। কোনো প্রকার ঝুট ঝামেলা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে একটু না হয় ইমোশনাটাকে অতিরিক্ত প্রয়োগ করবে। হাজার হোক, ভাইয়েরা তার চোখের পানি সহ্য করতে পারে না। তার সিদ্ধান্তটাকে নিশ্চয়ই সম্মান করবে।

কালো রঙের দুটো গাড়ি একসঙ্গে আওয়াজ তুলে এসে থামে রাস্তার এক ধারে পার্কিং লটে। সানজি করিডোর ভেদ করে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি রাখে নিচে।

দুপাশে স্থির হওয়া দুটো গাড়ি হতে নেমে আসে দুজন মানুষ। একজনের সঙ্গে আবার একটা আধগান পুঁচকেও এসেছে। হালকা বেগুনি রঙা একখানা জামা পরিধান করে বাবার কাঁধে মাথা রেখে আছে সে। বাবা সযত্নে মেয়েকে একহাতে কোলে নিয়ে অপর হাতে গাড়ির দরজা বন্ধ করে নির্বিকার চিত্তে উঠে আসে উপরে।

"আসিফ ভাইই...এসে গিয়েছে।"

সানজি চিৎকার করে রুমে ঢুকে পড়ে। এদিকে কাজি সাহেব অন্য দুজনকে বিয়ে পড়ানোর সময় এমন চিৎকারে যৎসামান্য কেঁপে ওঠেন ভয়ে। বুকে ফুঁ দিয়ে সে করুণ চোখে তাকান। আজ তার অফিসে কি যে হচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছেন না। কিছু বলতেও পারছেন না যখনই শুনেছেন পাত্রী এমপি সাহেবের বোন।

আসিফ রিমন ঠিকঠাক হয়ে যে যার জায়্গায় অবস্থান নেয়। এদিকে বাদ বাকী সাক্ষীদাতা সব উধাও। আসিফ তাদের আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে কাজি অফিস হতে। যা কিছু হবে নিজে বুঝে নিবে। মামা কিংবা বন্ধু বান্ধবের সামনে আর লজ্জায় পরতে চায় না।

সরফরাজ আগে প্রবেশ করলেও সান্নিধ্য মাঝপথে পড়ে আটকা। কিছু আমজনতা তাকে ঘিরে ধরেছে। এমপি সাহেবের আচমকা এখানে উপস্থিতি হয়তো তাদের কাম্য ছিলো না। বিস্মিত নজরে তারা সবাই হ্যান্ডশেক করে এমপি সাহেবের সাথে। সেই সাথে নিজেদের সমস্যা তুলে ধরে। সদ্য যে ঘটনাটা এমপি সাহেবের সাথে ঘটেছিলো সেজন্য অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করে। কেউ কেউ ছবি তোলার আবদার করলে সান্নিধ্য মেয়ে আছে জন্য সবিনয়ে না করে দেয়।

"ভাইয়া.."

সরফরাজ সামনে দাঁড়ানো দু'জন মানব মানবীর দিকে স্থির চক্ষুতে তাকিয়ে থাকে কিয়ৎক্ষণ। অতঃপর শক্ত গলায় বলে,

"ভয় করলো না?"

"করেছিলো।"

"এতো সাহস হয় কি করে?"

সানজি ভাইয়ের কড়া গলা শুনে ছলছল নয়নে তাকায়। নমুজ কন্ঠে বলে,

"মনে হয় ঘাড়ে ভূত চেপেছিল ভাইয়া। আমার কি এতো সাহস আছে বলো?"

"খুব বড় হয়ে গিয়েছো ? একা একা বিয়ে করে এখন ভূতের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছো?"

"ভাই...ওর কোনো দোষ নেই। আমিই ওকে বিয়ে করার জন্য বলেছিলাম। সব দোষ আমার।"

"কিন্তু কবুল তো আমিও বলেছি। তাহলে তো দোষ আমারও।"

"দু'টোকে ধরে কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দিয়ে আয়।"

সান্নিধ্যের আগমন হতেই নড়েচড়ে দাঁড়ায় আসিফ। চোখ নামিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। মাথাগরম লোক এসে গিয়েছে। এখন চুপ থেকে হজম করাই শ্রেয়। এদিকে কোমলমতি কায়া ভাইদের রাগান্বিত ভাব দেখে নীমিলিত লোচনে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁট উল্টে কান্না আসা মুহুর্তে সে সান্নিধ্যের পানে এগিয়ে যায়। এমন করে হঠাৎ বিয়ের কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোলে থাকা রাজকন্যার ডায়াপারে চোখ পরে তার। কপাল ভাঁজ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে উবে যায় তার কান্না। ফিক করে হেসে উঠে সে।

"হায় খোদা..ভাইয়া..তুই শাহমিকাকে ডায়াপার পরিয়ে নিয়ে এসেছিস? হায় হায়..তোর কি হুঁশ জ্ঞান নেই?"

সান্নিধ্য সানজির কথা শোনামাত্র সঙ্গে সঙ্গে কোলে থাকা রাজকন্যার দিকে তাকায়। সাদা ডায়াপার চোখে পড়তেই তার ভ্রু কুঁচকে যায় আপনাআপনি। সে এই কাজ কখন করলো?সে তো ঠিকই জামা প্যান্ট পরিয়ে দিয়েছিলো মনে হচ্ছে।

এজন্যই তো বেশকিছুক্ষণ হলো হালকা ভেজা ভেজা অনুভব হচ্ছিলো বাহুর উপরে। তারমানে লিক হয়ে গিয়েছে।

"হাসার কিছু নেই। ডায়াপারও এক ধরনের পরিধেয় বস্তু।"

"তাই বলে এভাবে সরাসরি বাহিরে নিয়ে আসবি?"

এই দুঃসময়ে সানজি হেসেই কূল পায় না। ডায়াপার পরনে রাজকন্যার দিকে যতবারই তাকাচ্ছে ততবারই তার খিলখিল করার হাসির শব্দ ভেসে আসছে। অথচ উপস্থিত বাকিসব মানুষের মুখে কোনো হাসি নেই। তাদের কাছে বিষয়টা অস্বাভাবিক কিছু লাগছে না। এমপি সাহেবের মতো মানুষ যে এতোটুকু ঘরোয়া স্বভাব এনেছে নিজের মাঝে এটাই অনেক বড় কিছু।

"ধমক দিবো?"

"না।"

"লাফিয়ে লাফিয়ে বিয়ে করার সাহস পাস কই তুই? বেশি সাহস হয়ে গিয়েছে না? হালিশহর থেকে আগ্রাবাদে চলে এসেছিস?

সান্নিধ্যের ধমকে সানজি হাসির বেগ কমে যায়। মুখখানা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায় মুহুর্তেই। নিচু চোখ করে সে তাকায় ভাইয়ের মুখের দিকে।

" বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলি কিভাবে?"

"লোভে পরে।"

"কিসের লোভ?"

সানজি ছোটমুখ করে নিরব গলায় আসিফের দিকে তাকিয়ে বলে,"আসিফ ভাই আমাকে লোভ দেখিয়েছে। সে বলেছে বিশ্বস্ততা,বিশুদ্ধ ভালোবাসা, সম্মান দিবে। আজীবন থাকবে এর মেয়াদকাল। আমি এগুলোর লোভে পরে বিয়েতে রাজি হয়েছি। আর এমনিতেই কন্ট্রোভার্সি হয়তো শুরু হয়ে গিয়েছে। তোকে যাতে সবাই প্রশ্নবিদ্ধ না করতে পারে তার জন্য এটা কি ভালো সলিউশন না?"

বিজ্ঞাপন

"আমার দিক ভেবে তুই প্রব্লেম সলভ করার জন্য চাপে পড়ে এতো বড় ডিসিশন নিবি সেটাতে আমার সার্পোট কখনোই থাকবে না। এসব ফেইক নিউজ, কন্ট্রোভার্সি, মিডিয়া সামলানো আমার জন্য খুব একটা কঠিন কিছু না। এগুলোর জন্য আমি নিজেই যথেষ্ট।"

"চাপে পরে করিনি।"

"নিজ ইচ্ছায় করেছিস?"

"হু।"

"ভাইয়ার সামনে স্বীকার কর।"

সান্নিধ্যের হঠাৎ এমন ক্রোধান্বিত রূপ দেখে সানজির গলা ভারী হয়ে উঠে । একটুখানি আগের হাসিমুখ এখন তার কান্নায় নিমজ্জিত। ফোঁপানো সুর তুলে সরফরাজের দিকে তাকিয়ে বলে, "আমি স্বইচ্ছায় সজ্ঞানে আসিফ ভাইকে বিয়ে করেছি ভাইয়া।"

সরফরাজ বোনের চোখে পানি দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। এই একটা জিনিসই যথেষ্ট তাকে কাবু করে ফেলার। একটুখানি হাত বাড়াতে না বাড়াতেই সানজি ঝেঁপে যায় তার বুকের মধ্যে। দমকানো কান্নার সুর তুলে বলে,"সরি.."

"হয়েছে আর কান্না করতে হবে না।"

সান্নিধ্য নিজেকে ধাতস্থ করে। আসিফের দিকে একনজর তাকিয়ে সরফরাজের দিকে দৃষ্টিপাত করে স্পষ্ট কন্ঠে বলে,

"আসিফ আমার লোক। ওর সাথে আমার কাজের সময়সীমা পাঁচ বছরের। মানুষ হিসেবে ও কেমন সেটা বলার প্রয়োজন বোধ করছি না৷ ওর বাবা মা নেই। যেহেতু আমার আন্ডারে ও থাকে, তাই কিছুটা দায়িত্ব আমারও আছে। ধরতে পারিস,আমি ওর গার্ডিয়ান বা এমন কিছু। বোনের সাইডটা আমি কিছু সেকেন্ডের জন্য অফ রেখে আসিফের হয়ে তোর কাছে বলছি, ভরসা করতে পারবি ওকে? সানজির জন্য ও ঠিকঠাক?"

"তুই আসিফকে কিভাবে বিচার করিস?"

"আমি ওকে বিচার করতে পারি না। আমার জন্য ও সেই অপশন রাখেনি৷ নিজের লোক বলে আমি কখনোই ওর কোনো প্রশংসা করবো না। কারণ বোনটা আমারও। ও স্বইচ্ছায় সজ্ঞানে যেহেতু বিয়ে করেছে এক্ষেত্রে আমি দ্বিতীয় কোনো কথা বলতে পারি না। সেই রাইট আমার নেই।আমি জাস্ট তোর থেকে শুনতে চাইছি তোর কোনো আপত্তি আছে কি না?

"আমি আমার বোনের সুখ চাই। যেকোনো মূল্য সুখ চাই। আসিফ এতো বড় সিদ্ধান্ত যখন নিতে পেরেছে একা একা, তাহলে ওর নিজের স্বীকার করতে হবে সে আমাকে এই বিষয়ে নিশ্চয়তা দিবে। আমি তার ইনকাম সোর্স, পজিশন, কি আছে কি নেই সেটা দেখতে চাই না। সে কিভাবে আমার বোনকে সুখে রাখবে আমি সেটা দেখতে চাই।"

আসিফ সরফরাজের দৃঢ়গলায় বলা প্রতিটি কথা নিশ্চুপে শ্রবণ করে। অতঃপর মাথা উঁচু করে চোখে চোখ রাখে বিনয়ী ভঙ্গিতে।

শান্ত গলায় বলে," আমি অধিক টাকা পয়সা দিয়ে হয়তো সুখ কিনতে পারবো না,কিন্তু আমার যা আছে তা দিয়ে সুখ তৈরি করে নিতে পারবো। আপনারা দু'জনই আমার কাছে অনেক সম্মানের ভাই। অনেক উঁচুতে আপনাদের স্থান। আমি চেষ্টা করবো নিজের নেওয়া এই সিদ্ধান্তটাকে সারাজীবন আগলে রাখার। একটু ভরসা করে দেখুন।"

সরফরাজ এক হাত সানজির মাথায় রেখে অপর হাত হতে পকেট থেকে ফোন বের করে। সান্নিধ্যের উদ্দেশ্য তাকিয়ে বলে, "আমার কোনো আপত্তি নেই। সানজির যেখানে পূর্ণমত সেখানে আমারও দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। বাট অ্যাপ্রিশিয়েট ইউর কোয়ালিটিজ। নিজে দায়িত্ব তুলে নিয়েছিস।"

চলমান মিমাংসায় এতোক্ষণ ধরে চুপ থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে ওঠে শাহমিকা। কাঁধ হতে মুখ তুলে সে বাবার গলা খামচে ধরে ঠোঁট উল্টায়। দেখতে দেখতে ফু'মণির মতো হুট করে শুরু করে দেয় কান্না।

সানজি সরফরাজের বুক হতে মুখ তুলে চায় শাহমিকার কান্নার শব্দে। দু হাতে চোখ মুছে সে এগিয়ে যায় সেদিকে। হাত বাড়িয়ে সান্নিধ্যের কোল হতে রাজকন্যাকে নিজ কোলে তুলে নেয়। অতঃপর কন্ঠ ভারী করে বলে,"ধমক দেওয়ার জন্য এক হাজার টাকা আর তোর মেয়ের কান্না থামাবো এখন সেটার জন্য এক হাজার টাকা। টাইম টু টাইম পাই যেন। বিনা পয়সায় সানজি কাজ করে না।"

সান্নিধ্যের কপাল ফের কুঁচকে যায়। থমথমে গলায় বলে,

"তোকে আবার আমি কখন ধমক দিলাম?"

"দিয়েছিস।"

"এটা ধমক হলো কিভাবে?"

"অতশত জানি না। জরিমানা করা হয়েছে মানে দিতে হবে।"

নিজের পারিশ্রমিক উত্থাপিত করা শেষে সানজি শাহমিকাকে নিয়ে চলে যায় করিডোরে। সান্নিধ্য অবাক চোখে সরফরাজের দিকে তাকায়। সরফরাজ কানে ফোন চেপে ধীর কন্ঠে বলে, "ভাগ্য ভালো আমাকে জরিমানা করে নাই।"

শাহজাহান সাহেব ফোন ধরা মাত্র সরফরাজ কন্ঠ নামায়। ফোন লাউডস্পিকারে রেখে নির্মেদস্বরে বলে,"হ্যালো বাবা।"

"বলো।"

"একটা বিশেষ ঘটনা ঘটে গিয়েছে।"

"কোথায় তুমি?"

"আগ্রাবাদে।"

"কি বিশেষ ঘটনা?"

সরফরাজ লম্বা দম টেনে নেয়। সুস্থির কন্ঠে বলে, "সানজি আসিফ বিয়ে করেছে।"

ফোনের অপর পাশে শাহজাহান সাহেব খানিক সময়ের জন্য নিরব হয়ে যান। এতোবড় একটা সংবাদ হঠাৎ শোনার পর তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা সান্নিধ্য সরফরাজ দুজনেই আন্দাজ করতে সক্ষম হয়। কিছুক্ষণ নিরবতা পালন শেষে অসন্তোষ্ট চিত্তে বলেন," চমৎকার ছিলো তোমার বিশেষ কথাটা। শুনে ভীষণ খুশি হলাম। তোমাদেরই তো বোন, তোমাদের মতো উদ্ভট কাজই তো সে করবে। তোমাদের দ্বারা তো স্বাভাবিক কোনো কাজ সম্ভব নয়। তুমি বিজনেস বাদ দিয়ে সারাজীবন এসব বিচার সালিশই করে যাবে, কোটি টাকার ডিল হাতছাড়া হয়ে যাক তাতে তোমার কিছু যায় আসে না,তোমার ছোট ভাই তো আরেকজন। সে মারামারি হানাহানি করে জেল হতে ঢুকবে আর বের হবে। পুলিশ আদালত বছরের বারো মাস পিছু লেগে থাকবে তার, তোমার বোন হুট করে বিয়ে করে চমকে দিবে। এটাই তো তোমাদের কাজ। খুব ভালো খুব ভালো। আমার কিছু বলার নেই। যা খুশি করো।"

শাহজাহান সাহেব মুখের উপর ফোন কেটে দেন। তার রণমুর্তিতে সান্নিধ্য সরফরাজ নির্বাক চাহনি মেলে একে অপরের সঙ্গে। এক মিনিটে তিন ভাই বোনকেই একেবার ধুয়ে দিয়েছেন তাদের পিতাসাহেব।

" শ্বশুরের মন জয় করতে বউ নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাত্রা ধরো।"

সরফরাজের কথা শুনে আসিফ অসহায় চাহনি মেলে সান্নিধ্যের দিকে। সান্নিধ্য দু'হাত পকেটে ঢুকিয়ে নিশ্চল ভঙ্গিতে বলে," আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। একা বিয়ে করেছো একা শ্বশুরকে হ্যান্ডেল করো।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

সুখনিবাস, রাত এগারোটা।

ড্রয়িংরুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। মধ্যে সোফায় বসে আছেন শাহজাহান সাহেব পাশে মিসেস নাজনীন। ডান পাশে বসে আছে

সরফরাজ, তিথি। বাম পাশে সান্নিধ্য এবং চাচা সেলিম সাহেব।

সান্নিধ্য ঘন্টাখানিক আগে মধ্যে রাস্তা অব্দি গিয়ে রিমনের কাছে মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছে মায়ের কাছে। অপরদিকে শেহরিন মেয়ের ডায়াপার পরিধানরত অবস্থায় ঘুরে বেড়িয়ে আসার কান্ডকারখানা দেখে রাগে ভস্মীভূত হয়েছে। নেতাসাহেবকে ফোন করে একচোট বকাবকিও করে ফেলেছে এর মাঝে। নেতাসাহেবও চুপচাপ বউয়ের ঝাড়ি হজম করেছে৷ যতই হোক, ভুলটা তো তারই।

"তোমার বিয়ে করার এতো ইচ্ছে, আগে জানাওনি কেন আমাদের ?"

" আগে ইচ্ছে করেনি বাবা। পাঁচ ঘন্টা আগে ইচ্ছে ঘাড়ে চেপে বসেছিল।"

"এতো বড় সাহস হলো কি করে তোমার? বাবা মা পরোয়া করো না। সরাসরি নিজ ইচ্ছেতে বিয়ে করা নাও? আর আসিফ তুমি ! সান্নিধ্যের এতো কাছের একজন হয়েও তোমার একাজ করতে দ্বিধাবোধ হলো না?"

আসিফ মাথা নিচু করে হাতের পৃষ্ঠে হাত ভাঁজ করে বলে,"আমি সানজিকে ভালোবাসি আংকেল।"

"তাই বলে হোটেলে নিয়ে যাবে? এই তোমার রুচি? এই শিক্ষা?"

"আমি হোটেলে নিয়ে যাইনি।"

"এই ছেলে মিথ্যা কথা বলবে না। আমার বন্ধু আখতার নিজ চোখে তোমাদের দেখেছে। ছিঃ ছিঃ লজ্জায় আমি মুখ দেখাতে পারছি না। আমাদের খান বাড়িতে এভাবে চুনকালি লাগবে কখনোই ভাবতে পারিনি।"

"মুখ দেখাতে না পারলে মুখোশ পরে থাকতে পারো চাচ্চু।"

সান্নিধ্যের কথায় সেলিম সাহেব কপাল ভাঁজ করে বলেন,"তোমার গা সাওয়া হয়ে গিয়েছে বলে কি আমারও গা সাওয়া হয়ে যাবে? বুঝতে পারছো ব্যাপারটা কেমন হতে চলেছে?"

"চুপ করে থাকো যেটা জানো না সেটা নিয়ে কথা বলবে না। তোমার বন্ধু চট্টগ্রামে বাসা থাকতে হোটেলে কি করে? গড়বড় তো নিশ্চিত আছে। দাঁড়াও খোঁজ লাগিয়ে এক্সপোজ করে দিচ্ছি।"

সেলিম সাহেব মুখ আঁধার করে ঠোঁটকাটা ভাতিজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। শাহজাহান সাহেব বিরক্তি স্বর তুলে বলেন,

"আহঃ সান্নিধ্য থামবে তুমি।"

"আংকেল নাসিরের লোকজন সানজিকে..

"আমি জানি বলতে হবে না। আমার কথা সেটা না, কথা হলো তুমি কেন আমার মেয়েকে জোরপূর্বক বিয়ে করেছো?"

"আংকেল জোরপূর্বক বিয়ে করিনি, ভালোবেসে বিয়ে করেছি।"

"আমার মেয়ের জন্য তুমি কি নিজেকে উপযুক্ত মনে করো? আমি তো আমার মেয়েকে আরো বড় পজিশনে বিয়ে দিতাম।"

বাবার কথা শুনে সানজি চোখ তুলে তাকায় তার দিকে। নিজের ভয়ভীতি কাটিয়ে নিরেট গলায় বলে,"বড় পজিশন, অধিক টাকা কড়ির মধ্যে তো এতোকাল থাকলাম বাবা, ভালোবাসার মতো মূল্যবান বস্তু তাহলে পেলাম না কেন? "

"তুমি পারবে সার্ভাইভ করতে?"

"মানুষ ভালোবাসা, যত্ন আর সম্মান পেলে সব পারে। আমার তো এগুলোরই অভাব ছিলো নতুন একটা জীবনে পা রাখতে। খুব বেশি সমস্যা হবে না, কিছুটা হলেও শিক্ষা আছে। খুব দরকার পড়লে কাজে লাগাতে পারবো যে কোনোভাবে।"

সেলিম সাহেব চলমান কথার মাঝে সান্নিধ্যের দিকে হেলে আঁড়চোখ তাকিয়ে বলেন,"ভুল করেছো তুমি আর সরফরাজ। তোমাদের উচিত ছিলো ছেলেটাকে বাড়তি কিছু দিয়ে হেল্প করার। আরেকটু বেশি স্বাবলম্বী করে ভাইজানের সামনে উপস্থাপন করার। তাহলে এতো কথা শুনতে হতো না।"

সান্নিধ্য চুপচাপ দু'হাতে বুকের সাথে ভাঁজ করে সামনের দিকে দৃষ্টি রাখে। সাবলীল কন্ঠে বলে,

"আসিফের যা আছে সেটাই সানজিকে মেনে নিতে হবে। সম্পদ দিয়ে তাকে উপস্থাপন করা মানে অপমান করা। একটা স্বাবলম্বী ছেলে কখনোই অন্যের অনুদান নিয়ে নিজেকে ছোট করবে না। তার যেটুকু সামর্থ্য আছে সেটা দিয়ে ফুলফিল করার চেষ্টা করবে। আর এটাই হবে তার ভালোবাসার নমুনা।"

কিছুক্ষণ নিরবতা বয়ে যায় ড্রয়িংরুমে । শাহজাহান সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন," তোমার তাহলে কোনো আপত্তি নেই বলছো?"

"নাহ। আপত্তি নেই।"

"ভেবে বলছো তো?"

"বাবা..বিয়ে হয়ে গিয়েছে আমাদের। ভাবাভাবি অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এখন ভেবে আর কি বলবো?"

"তোমার মাস্টার্স কম্পলিট করতে তো ১ বছর লাগবে তাই না?"

"হ্যাঁ।"

শাহজাহান সাহেব উঠে দাঁড়ান। মেরুদণ্ড সোজা রেখে টান টান ভঙ্গিতে দু'হাত পিছনে ভাঁজ করে বলেন,"ঠিক আছে। এক বছর পরে তুমি শ্বশুরবাড়ি আই মিন তোমার হাসবেন্ডের বাড়ি যাবে। আমি একটা বড় করে রিসেপশনের ব্যবস্থা করবো। এর আগে কোথাও যাচ্ছো না তুমি।"

আসিফ শাহজাহান সাহেবের এমন সিদ্ধান্ত ফ্যাকাশে মুখ করে তাকায়। নিচু কন্ঠে বলে, "আংকেল আমি আমার বউকে বিয়ে করার পরেও বাবার বাড়ি কিভাবে রাখি? আমার কি হবে?"

আসিফের কথায় শাহজাহান সাহেব বাদে উপস্থিত সবাই ঠোঁট চেপে হাসে। মিসেস নাজনীন মাথা নেড়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ান। আসিফের দিকে তাকিয়ে বলেন,"তুমি আপাতত ঘর জামাই থাকবে বাবা। কোনো সমস্যা হবে কি? একটা বছরই তো।"

"আমি ঘর জামাই থাকবো না আন্টি। আমার পছন্দ নয়। তবে,

একটা বছরের একদিনও কিন্তু বেশি রাখবো না।"

"না। তা কি করে হয়, এখন তো তোমার স্ত্রী সে। তোমারই তো অধিকার বেশি।"

সানজি মুখ টিপে মাথা নিচু করে হাসে। সুখে তার চোখে জল এসে হাজির। আসিফ ভাইয়ের মুখে 'আমার বউ' কথাটা শুনে সে আপ্লুত হয়ে উঠে। ইশ্ এতো মধুর কেন লাগে শুনতে, এতো কেন মিষ্টি। তার ইচ্ছে করছে,দৌড়ে উপরে চলে যেতে।

যে রুমে ভালোবাসা হারিয়ে চিৎকার করে কেঁদেছিলো সে একসময়,সেই রুমে ভালোবাসা পেয়ে আজ মন উজাড় করে সুখের কান্না কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

চোখ বন্ধ করে বুকে হাত রাখে সে। ঠোঁট নেড়ে বিরবির করে বলে,

“ সানজির বিশ্বাস, ভালোবাসা দামি বস্তুতে হয় না, ভালোবাসা হয় অনুভবে,ভালোবাসা হয় অনুরক্তিতে।”

-----------------------------------------------------

রাত তিনটা ছুঁই ছুঁই। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির গহীন পাহাড়ি এলাকার পরিত্যক্ত এক চা কারখানা। যেখানে স্থানীয়দের বসবাস চোখে পড়া দায়। কারখানাটির চারপাশ কাঁটাতারের বেড়া আর জঙ্গলে ঢাকা। অভ্যন্তরে একাধিক কক্ষের মধ্যে একটা কক্ষ,যেখানে একসময় চা শুকানোর জন্য ব্যবহার হতো সেখানে বন্দিদশায় আছে এক মানব।

অন্ধকার, দূর্গন্ধময় কক্ষ। লোহার ভারী চেয়ারে হাত পায়ে শিকল বেঁধে আটকে রা়খা হয়েছে মুহিদকে। অর্ধচৈতন্য অবস্থায় ঘাড় নিচু করে হেলে আছে পড়ে আছে সে।

গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার আওয়াজ কানে এসে পৌঁছায় তার। প্রথম প্রথম চমকে উঠলেও এই কয়েক মাসে সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে এই আওয়াজে।

জোরালো পায়ের ধ্বনি। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে একজন।

কক্ষের দরজা খুলতেই স্যাঁতসেঁতে, পচা গন্ধ মিশানো বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ে। ধীর, স্থির পায়ের গতিতে সামনে এসে দাঁড়ায় একজন। আলো আঁধারি খেলায় লম্বা ছায়া পড়ে মেঝেতে।

খানিক সেকেন্ড পেরোতেই মাথার ওপরে ঝুলানো তারে হলুদ বাল্ব জ্বলে উঠে। ম্লান আলোতে মুহিদ চোখ মুখ কুঁচকে উপরের দিকে দৃষ্টি তোলে। চেনাপরিচিত সেই মানব। যাকে দেখে তার বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। গত কয়েক মাস যাবত সেই তাকে এভাবে বন্দি করে রেখেছে।

"কেমন আছ, মুহিদ? আজ একটা বিশেষ কাজ করে ফেলেছি। শুনবে?"

মুহিদের গলা শুকনো, কথা বের হয় না। সে নির্নিমেষ চাহনিতে তাকিয়ে থাকে আসিফের দিকে।

আসিফ তাদের মাঝে কয়েক ফুটের দূরত্ব ঘুঁচিয়ে আরো একটু সামনে এসে দাঁড়ায়। লোহার চেয়ারের দু হাতলে দু হাত রেখে খানিকটা ঝুঁকে মুহিদের মুখের উপরে। ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি ঝুলিয়ে ঠান্ডা শীতল কণ্ঠে বলে,

"সানজি এখন থেকে আমার ওয়াইফ। আমাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সেই খুশিতে আজ থেকে তোমার মুক্তি।"

মুহিদ সানজির বিয়ের কথা শুনে নিরব থাকলেও নিজের মুক্তির কথা শুনে নড়েচড়ে উঠে। মুখোরেখা উজ্জ্বল হয়ে যায় মুহুর্তেই। আজ কত মাস হলো সে এই নরক তুল্য জায়গায় পঁচে মরছে। আর কিছু দিন হলে নিশ্চিত মরে যেতো। অথচ তার যাওয়ার কথা ছিলো কোথায়, আর সে এতোগুলো মাস কাটিয়েছে কোথায়।

সিঙ্গাপুর যাওয়া তার হয়নি। সানজিকে ধোঁকা দিয়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই আসিফের হাতে বন্দি হয়ে যায়। তারপর হতে গুম হয়ে যায় সে একেবারে। তার কোনো খোঁজ মেলেনা, কোনো ছায়া পড়ে না।

একেবারে নিখোঁজ। সবাই জানে, সে সিঙ্গাপুরে আছে। কিন্তু সিঙ্গাপুর তো দূরে থাক, এয়ারপোর্ট অব্দি পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি।

"তোমার আজ মুক্তি দিবস। আমার কাজ শেষ। কিন্তু সান্নিধ্য শাহজাদ খানের কবলে পড়লে কি হবে সেটা তুমি জানো। এর কোনো দায়ভার আমার আর নেই। আমি আমার ভালোবাসাকে পেয়ে গিয়েছি। আমার হিসাব মিটমাট।"

আসিফ পকেট থেকে একটা ছোট চাবির রিং বের করে। নিচু হয়ে প্রথমে পায়ের শিকল অতঃপর হাতের শিকল খুলে দেয়। কংক্রিটের সাথে লাগানো লোহার বেল্ট খুলতে খুলতে সে মুহিদের স্তব্ধ রুপ দেখে মুচকি হাসে।

"বাঁশ আমার কপালেও আছে। এমপি সাহেবকে আমি বলেছি তুমি সিঙ্গাপুরে আছো। মিথ্যা বলেছি আর কি! সে তোমার গলা কাটার নির্দেশ দিয়ে রেখেছে। বলেছে দেখামাত্র তোমাকে নিঃশেষ করে দিতে। কিন্তু আমি এক্ষেত্রে একটু স্বার্থপর হয়েছি। কারণ তুমি যদি তোমার আসল রূপটা না দেখাতে আমি কখনোই সানজিকে পেতাম না। বাট.. থ্যাংক ইউ.. থ্যাংকিউ সো মাচ..তুমি একদম রাইট টাইমে তোমার মুখোশ উন্মোচন করেছো। এরজন্য একটু হলেও তো আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করাই উচিত বলো? তাই তোমাকে কোনো প্রকার শারিরীক টর্চার ছাড়াই বের করে দিলাম। আমি এমপি সাহেবের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিবো এ কারণে। কিন্তু.. ভবিষ্যতে কখনো কোনোভাবে যদি তোমার ছায়া আমাদের মাঝে পড়ে। তাহলে তোমার গলা কে'টে আমি বানের জলে ভাসিয়ে দিবো। একদম ডিরেক্ট গলা কেটে ফেলবো। কেমন?"

মুহিদ নিশ্চুপ হয়ে সমস্ত কথা শ্রবণ করে নেয়। সামান্য মাথা নাড়িয়ে সায় জানাতেই আসিফ তার শরীর হতে সমস্ত শিকল সরিয়ে নেয়। কোমড় হতে একটানে শিকলটা খুলে দিয়ে বলে," নিচে যাও। আমার লোকেরা তোমাকে তোমার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে আসবে।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প