উপসংহার— (প্রথমাংশ)
হসপিটাল হতে ডিসচার্জ পাওয়ার পর সান্নিধ্যের পুরোপুরি সুস্থ হতে লেগে যায় দেড়মাসের মতো সময়। তবে দূর্ঘটনার চিহ্ন হিসেবে নানা ক্ষত স্পষ্টভাবে রয়ে গিয়েছে এখনও তার শরীরজুড়ে । কপালের একটু উপরে চুলের আড়ালে কাটা অংশের দাগটা শুকিয়ে গেলেও কালসিটে বর্ণটা বেশ গাঢ় হয়ে আছে। ডানহাতের কবজিতে অস্ত্রোপাচার হওয়ার কারণে সেখানে এখনও চলমান ফিজিওথেরাপি।
তবে এসবে কোনো ভ্রু'ক্ষেপ নেই সাবেক এই এমপি সাহেবের। ডাক্তারের সাজেশন ছিলো অন্তত এক সপ্তাহ বেড রেস্টে থাকার। কিন্তু এই মানব দু'দিন কোনমতে বেড রেস্ট কাটিয়ে তারপর হতেই নেমেছে ভোটের মাঠে। পুরোদমে শুরু করেছে তার জমানো সব কাজ। ফুসরত মেলবার সময় নেই এখন আর একদন্ড। একের পরে এক শোডাউন, মিটিং, মিছিলে পার করে চলেছে একেকটা দিন। নির্বাচনের শেষ মুহুর্তের সময়টাকে সে একদম ধরে বেঁধে নিয়েছে। কেননা প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানও বেশ শক্তিশালী। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এর আভাস চলছে চারদিকে।
সময়ের ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে দরজায় কড়া নাড়ছে নির্বাচন। মাঝখানে রয়েছে আর একটা মাত্র দিন। প্রচার প্রচারণাসহ সমস্ত কিছু কালকের মাঝেই সমাপ্তি ঘটবে। আর এই বিশেষ মুহুর্তে মিসেস সান্নিধ্য ব্যস্ত তার সেমিস্টার ফাইনাল নিয়ে। প্রচন্ড ইচ্ছে ছিলো নেতাসাহেবের সাথে থেকে শেষ মুহুর্তে তাকে সঙ্গ দেওয়ার। চাইলে হয়তো দিতে পারতো, কিন্তু সে তার ইচ্ছেকে বিশেষ একটা কারণে মাটি চাপা দিয়েছে। বিষয়টা পরীক্ষার কারণে হলেও এর ভিতরে কাহিনী রয়েছে ভিন্ন।
রাত তখন আটটা,
আজকে একটু বিকেল বিকেল করে ঘুমিয়েছিলো শাহমিকা। সাড়ে তিনটের দিকে ঘুমিয়ে উঠেছে প্রায় সাতটার কাছাকাছি সময়ে। আর এই মোক্ষম সুযোগটাকে লুফে নিয়েছিল শেহরিন। দরজা জানালা ফোন সমস্ত কিছু বন্ধ করে টানা পড়েছে সে। মাঝে সাত আট মিনিট মাগরিবের নামাজের জন্য বিরতি দিয়ে পুনরায় আবার শুরু করে একদম থেমেছে মেয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে।
ঘুম ঘুম চোখে থাকা শাহমিকা গুনগুন করে কান্না করছে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে। শেহরিন জানালাগুলো একহাতে খুলে দিয়ে বেলকনির দরজাগুলোও খুলে দেয় সেই সাথে। এতোক্ষণে জমায়েত হওয়া গুমোটে আবহাওয়া কেটে নির্মল হাওয়া প্রবেশ করে ভিতরে। শব্দবিহীন নিরব এই চারঘন্টা পড়ে বেশ কম্ফোর্ট ফিল করেছে সে। এজন্য মনটা একটু হালকাও লাগছে। স্টাডি ডেস্কের সঙ্গে হলুদ স্টিকি নোটে পরবর্তী সময়সীমা লেখা তার রাত এগারোটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত। চলমান এই সেমিস্টার ফাইনালে বিশেষ করে পরীক্ষার আগের দিনগুলোতে সে তার ঘুম হারাম করে দিয়েছে নিজের জন্য। কঠোর অধ্যাবসায়ে হয়েছে বিছানাবিমুখ।
মেয়ের জন্য ইনস্ট্যান্ট কিছু নাস্তা তৈরি করবে এখন। তাকে সময় নিয়ে খাওয়াবে, সাথে কিছুটা সময় খেলবে, সময় কাটাবে। তারপর ঠিক দশটার সময় হালকা পাতলা ডাল ভাত ডিনারের জন্য তৈরি করবে। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে শেহরিনের মোটামুটি বোঝাপড়া শেষ।
পরিকল্পনা মতো ওটস রেডি করে মেয়েকে ফ্রেশ করিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে খাওয়াতে। এক চামচ মুখে দিতে না দিতেই বেজে ওঠে কলিং বেল।
"একটু.. মা। দরজাটা খুলে আসি।"
শাহমিকাকে বসিয়ে রেখে শেহরিন ছোটে দরজা খুলতে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত মানুষগুলোকে দেখামাত্র তার ঠোঁট প্রসারিত হয়ে যায়। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে,"এতোরাতে গেস্ট আমার বাসায়?"
"বিনা দাওয়াতেই চলে এলাম।"
"কাহিনী কি?"
"রেডি হও।"
"কোথায় যাবো?"
সানজি তাসিন হুরহুর করে ভিতরে প্রবেশ করে। তানিশা শেহরিনের সঙ্গে উষ্ণ আলিঙ্গন সেরে প্রফুল্লগলায় বলে,
"যাবো একজায়গায়। কেমন আছো তুমি?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো আপু?"
"ভালো আছি। "
"এসেছো কবে?"
"আজকেই এসেছি । শুনলাম, তুমি নাকি নেত্রী সাহেবা হয়ে গিয়েছো। ভোট প্রচারণা করেছো সান্নিধ্যের হয়ে?"
"ওই একটু।"
"হায়রে রাজনীতি দেখে নাক সিটকানো নারী..
স্বামীর জন্য হয়েছো তুমি আজ ছলনাময়ী।"
শেহরিন তানিশার কথায় হেসে ফেলে। খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে," জানি তো..তুমি আমাকেই ক্ষ্যাঁপাতে এসেছো।"
"আসবো না মানে? এতো বড় কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছো !! তোমাকে লজ্জা দিতে দিতে লাল টকটকে টমেটো করে ফেলবো।
কিন্তু আগে লিটেল সান্নিধ্যের সঙ্গে দেখা করি। দেখি সে বাবার মতো, কতবড় মাস্তান হয়েছে।"
তানিশা ভিতরে যেতেই সর্বশেষে সুযোগ পায় তিথি। শেহরিনের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আলতো হেসে বলে,"ছোট চাচ্চু চাচিমা আজকে আমাদের ডিনারের ইনভাইট করেছে রেস্টুরেন্টে । তোমাকে ফোন করেছে অনেকবার, ধরোনি কেন?"
"ধরিনি.!! ওহহো সরি ভাবি,আমার ফোন বন্ধ ।"
"হ্যাঁ। আমরাও কল করে সুইচঅফ পেয়েছি। সেজন্য একদম ডিরেক্ট তোমাকে নিতে এলাম। সান্নিধ্যেকে তো ফোন করে লাভ নেই। কখনোই রিসিভ করবে না। নাও ঝটপট রেডি হয়ে নাও এখন।"
তিথি শেহরিনকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে চলে যায় শাহমিকার কাছে। শেহরিন দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থেকে খানিক সেকেন্ডে হিসেব নিকেশ করে ফেলে। এই মুহুর্তে বের হওয়া মানে,সমস্ত টাইম টেবিল তিনশো ষাট ডিগ্রি কোণে ঘুরে যাওয়া। আর সে যদি ঠিকভাবে টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে না পারে কিংবা পড়া কিছু বাদ থাকে তাহলে টেনশনে টেনশনে হাই ফোবিয়ার পেশেন্ট হয়ে যাবে। কালকের এক্সামের জন্য আজ সবকিছু স্যাক্রিফাইস তার। এই সুসময় কিংবা পারিবারিক আড্ডা সে পরেও করতে পারবে। কিন্তু একবার এক্সাম খারাপ হলে...
"না..না কোনোভাবেই না।"
সানজি তিথি মেতে উঠে শাহমিকাকে নিয়ে। এদিকে রাজকন্যা ও তার পরিচিত মুখদের দেখা পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠে। শেহরিন দরজা লাগিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে উপস্থিত সবার মাঝে। চোখে মুখে আড়ষ্টভাব ফুটিয়ে আমতা আমতা স্বরে বলে,
"ইয়ে মানে.. ভাবি আমার যাওয়া সম্ভব নয়।"
তিথি শাহমিকাকে খাওয়াতে খাওয়াতে সহজ গলায় বলে,
"কেন যাবা না?"
"ভাবিজান যাবেন না আপনি? পরীক্ষার জন্য নিশ্চয়ই? কালকে এক্সাম আছে?"
সানজির পরপর প্রশ্নে শেহরিন ঠোঁট কামড়ে বড় বড় চোখ করে মাথা নাড়ায়। অকপটে স্বীকারোক্তি দান করে সে। সানজি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শেহরিনের কাঁধ থুতনি ঠেকিয়ে আহ্লাদিত কন্ঠে বলে,"একটু তো...সমস্যা হবে না।"
"আজকের জন্য ক্ষমা চাই আপু..প্লিজ।"
"এটা কেমন হলো? তোমরা না গেলে তো পুরো ডিনারটাই নিরামিষ লাগবে।"
"আচ্ছা শেহরিন না যেতে চাইলে থাক..যেহেতু ফাইনাল সেমিস্টার একটু চাপ থাকবেই। তোমার না হয় চিন্তা নেই কিন্তু ওর তো আর তা না.."
"অপমান করছো ভাবি?"
"এতেও যদি একটু তোমার বোধশক্তি হয়। দেখো,ওকে দেখে শিখো। এক্সামের জন্য কতটা ডেডিকেটেড সে। তুমি হলে তো কিসের এক্সাম.. কিসের কি। আগে আগে রেডি হতে।"
সানজি শেহরিনের কাঁধ হতে হাত ছাড়িয়ে নিজের কোমড়ে চেপে ধরে। সরু চোখে তাকিয়ে বলে,"ওরেহ.. দু জা'য়ের কি ভালোবাসা। একদম উথলে উথলে পড়ছে। আমাকে কুটনী ননদিনী বানানোর চিন্তা তাই না??"
"হু তুমি তো আমাদের কুটনী ননদিনী। একদম আমাদের দু'জায়ের মধ্যে আসবে না বলে দিলাম।"
"একশোবার আসবো। তোমাদের মধ্যে কুটকাচালি বেশি বেশি করবো।"
"আমরা দুই জা মিলে তোমাকে আমাদের সুখনিবাস হতে তাড়ানোর ব্যবস্থা করবো তাহলে।"
তানিশা মুখ ভেঁটকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সানজির দিকে তাকায়। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,
"ভয় পাস না সানজি। আমি তোর সাথে আছি। আমরা দুই ননদিনী মিলে দুই ভাইয়ের বউকে আচ্ছামতো শায়েস্তা করবো। তলে তলে কাঠি করবো। এমন অবস্থা করবো দুজন আমাদের দেখে ভয়ে ভয়ে থাকবে। আমরা তখন পায়ের উপর পা তুলে বসে বসে শুধু অর্ডার করবো। বলবো, এই বড়জন যাও চিকেন তান্দুরি করে নিয়ে আসো এক্ষুণি..ছোটজনকে বলবো,এই যাও আমার জন্য গরম পানি নিয়ে আসো। হুকুম চলবে হুকুম.."
তানিশার কথা শেষ হতে না হতেই একসাথে হাসির রোল পড়ে। জায়ে ননদে মিলে শুরু হয় তাদের মিষ্টি খুনসুটি। কিন্তু এর মাঝে চুপ করে বসে থাকে বেবি মানকি। আঁড়চোখে সে তাকিয়ে দেখছে শাহমিকাকে।
"এই বেবি মানকি এভাবে মুখ লটকে রেখেছিস কেন?"
"ফু'মণি একটা কথা কানে কানে।"
সানজি নিচু হয়ে তাসিনের মুখের কাছে মাথা নিয়ে বলে,"বল এখন।"
"চাচিমণিকে বলো, ইয়ো পানিকে আমরা ডিনার করাতে নিয়ে যাবো। ডিনার করিয়ে আবার বাসায় দিয়ে যাবো।"
"তুই বল.."
"না তুমি বলো।"
"তোর বললে কি সমস্যা?"
"তুমিইই বলো না..."
"কি গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর হচ্ছে হ্যাঁ?"
সানজি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিরাশামাখা কন্ঠে বলে,"কি আর হবে? আমার বাপ্পারাজ সাহেবকে তোমরা আর কত ছ্যাকা দিবে? সে তার ইয়ো পানিকে ছাড়া ডিনার করতে যাবে না। আমাকে বলছে, চাচিমণিকে বলো ইয়ো পানিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। ডিনার শেষে আবার দিয়ে যাবে বাসায়।"
শেহরিন প্রতিত্তুর দেওয়ার আগেই তানিশা তড়াক করে বলে,"আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ নয়। শেহরিন নাই গেলো, আমরা শাহমিকাকে নিয়ে যাই। ফিরতে পথে আবার বাসায় ড্রপ করে দিয়ে যাবো।"
"এটাই ভালো হবে।"
"আপু এই বাচ্চা মোটেও স্থির থাকবে না। তোমাদের ডিনারও করতে দিবে না প্রোপ্রারলি। শুধু শুধু ঝামেলা করার কারণ নেই। তোমরা যাও আমরা পরে আবার গেট টুগেদার করবো।"
"এই মেয়ে চিন্তা কি? শাহমিকাকে রাখার তো মানুষ আছেই।"
শেহরিন সামান্য কপাল ভাঁজ করে বসে বলে,"কে সে?"
"কেন? আমাদের পেয়ারে মজনু সাহেব।"
সানজির কথায় সবাই একযোগে তাকায় তাসিনের দিকে। ক্লাস ফোরে পড়ুয়া বাচ্চাটা এখন একটু বড় হয়ে যাওয়ার দরুন সবার তাকানোর ভঙ্গিমা দেখে খানিকটা লজ্জা পায়। শেহরিন মুচকি হেসে দু'হাতে টেনে নিজের কোলের মাঝে নিয়ে আসে৷ গালে চুমু দিয়ে বলে,
"তোমরা ওকে কেন এতো লজ্জা দাও হ্যাঁ!! আমার বাবাটা দেখো লজ্জায় গাল লাল করে ফেলেছে।"
"রাখো তোমার লজ্জা। বাসায় সারাক্ষণ শাহমিকা শাহমিকা বলে ঘ্যান ঘ্যান করে।"
"এই বেবি মানকি.. পারবি না তোর পেয়ারি লায়লাকে সামলে রাখতে? যদি না করিস তাহলে কিন্তু আমরা ভিলেন হয়ে তোদের আলাদা করে দিবো।"
তাসিন শেহরিনের কোলের মাঝে মুখ লুকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,"পারবো। কিন্তু ছোট্ট বেবিটাতো আমাকে দেখে ভয় পায়।"
"এটা ব্যাপার না। এক্ষুণি ভয় কাটিয়ে দিচ্ছি।"
সানজি শাহমিকাকে তাসিনের কাছে নিয়ে আসতেই শাহমিকা ভয়ার্ত চোখে তাকায় তার দিকে । কেন জানি,সে বেবি মানকিকে দেখলেই ভয় পায়,কাছে যায় না মোটেও। কাছাকাছি আসতেই
সে ফু'মণির কাঁধে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। দু'হাতে চেপে ধরে গলা।
সানজি অনেক চেষ্টা করে তাসিনের সঙ্গে রাজকন্যাকে একটু সহজ করার জন্য। হাঁটু ভেঙে বসে আদুরে আহ্লাদে সে তাসিনের সামনে তাকে দাঁড় করায়। নানান কথা বলে বলে তার মুখটা ঘুরিয়ে সামনে এনে কোমল হাতটা তাসিনের হাতের উপর রাখে।
সবাই এক সেকেন্ডের জন্য নিরব হয়ে যায় প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। আগ্রহ চোখে তাকিয়ে থাকে রাজকন্যার দিকে। অন্যদিকে
রাজকন্যা গোলগাল চোখে তার নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। অতঃপর মুখ তুলে সামনে বসা মায়ের দিকে তাকিয়ে সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠোঁট উল্টাতে শুরু করে। শরীরে কম্পন ধরে। কান্না শুরুর প্রাথমিক ধাপ ফোঁপানোর অস্ফুট আওয়াজ বের হতে না হতেই চিৎকার করে জুড়ে দেয় কান্না।
মিশন ফেইল। সবাই একসাথে দীর্ঘ শ্বাস ঝেড়ে কপাল চাপড়ে উঠে। এদিকে, সানজি রাজকন্যাকে কোলে তুলে তার কান্না থামাতে পায়চারি শুরু করে দেয়। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে সে বেবি মানকিকে মেরে দেওয়ারও হুমকি দেয়।
"এভাবে হবে না রে,মজনু । তোর লায়লার মন পেতে তোকে আরো যুদ্ধ করতে হবে।"
তাসিনের মুখ ভার। চোখ টলমল। শাহমিকার প্রত্যাখান পেয়ে তার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। ইয়ো পানি কেন তার কাছে আসতে চায় না? কেন তাকে দেখো ভয় পায় বুঝতে পারে না সে। তবে,কি ইয়ো পানি তাকে বিয়ে করবে না? পাঞ্জাবি টুপি বিড়াল প্যান্ট পড়ে বিয়ে করা হবে না? তার কপালে কি বিয়ে নেই!!
"মামণি.."
ঝুরঝুরে বৃষ্টির ন্যায় চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে তার পানি। চাচিমণির থেকে সোজা মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে সেও শুরু করে দেয় উচ্চশব্দে কান্না।
লায়লা মজনুর চলমান বিরহকালে উপস্থিত জনতা একদম নির্বাক হয়ে যায়। অবাকচোখে একে অপরের সাথে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।
"ছিঃ বেবি মানকি ছিঃ!! প্রেমিক পুরুষ হয়ে তুই এতো ছিঁচকাদুনে? বড়লোকি রাজকন্যা তোকে প্রত্যাখান করে দিয়েছে জন্য তুই এভাবে কান্না করবি? গরিব হয়েছিস তো কি হয়েছে? তোর কি ভালোবাসার মূল্য নেই??"
তানিশার জোরালোগলায় বলা কথার সঙ্গে তাল মেলায় সানজি। শাহমিকাকে কোলে রেখে হাঁটতে হাঁটতে বলে,"অবশ্যই মূল্য আছে। খান বংশের ছেলে তুই। তোর চাচ্চু নামকরা মাস্তান এই চট্টগ্রামের। আর তুই কি না সামান্য প্রত্যাখান পেয়ে এমনভাবে কান্না করবি? শোন বেবি মানকি, তোর চাচিমণির ডিএনএ তার মেয়ের মধ্যে। তাই প্রত্যাখান করে দেওয়াটা নরমাল। তোর চাচ্চুকেও তোর চাচিমণি এমনভাবে প্রত্যাখান করে দিয়েছিল কিন্তু তোর চাচ্চু হাল ছাড়েনি। দেখ,বিয়ে করে তোর জন্য ইয়ো পানিকে নিয়ে এসেছে। তোরও উচিত হাল ধরে থাকা। একদিন না একদিন ঠিকই মন পাবি ইয়ো পানির।"
"হায়রে..সানজি আপু।"
"সত্য কথা। কোনো ভেজাল নেই এতে।"
"সহমত।সহমত।"
"এই সানজি আর তানিশা মিলে আমার ছেলেটাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে।"
"তোমার ছেলে প্রেমে দিওয়ানা হলে আমাদের কি দোষ ভাবি?"
"আর কিছু বুঝতে চাই না এনাফ হয়েছে। চাচ্চু চাচিমণি ওয়েট করছে। যাও শাহমিকাকে রেডি করিয়ে নিয়ে আসো। আর দেরি করাটা ঠিক হবে না।"
বিরহ বেদনার ক্রান্তিলগ্ন কাটিয়ে তাসিনকে সাহস দিয়ে কাজ লেগে পড়ে সানজি। শেহরিনের মানা উপেক্ষা করে সে চলে যায় শাহমিকাকে রেডি করিয়ে নিতে।
অতঃপর সব ঠিকঠাক করে নয়টার কাছাকাছি সময়ে বের হয়ে যায় তারা প্রত্যেকে। শেহরিন সবাইকে বিদায় দিয়ে দরজা লাগিয়ে সোফায় বসে পড়ে। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে নিজের ক্লান্তি ভাব দূর করে। মনে মনে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে, যেহেতু শাহমিকা বাসায় নেই, এই মুহুর্তে রান্নাটা অফ রেখে পড়তে বসবে। শাহমিকা আসলে ওকে সময় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝটপট রান্নাটা সেড়ে ফেলবে। তাহলে একসঙ্গে দুটো কাজই হলো।
যেই ভাবনা সেই কাজ। শেহরিন বসা ছেড়ে আবারো চলে যায় তার স্টাডি টেবিলে। ওয়াটার পট হতে ঢোকে ঢোকে পানি পান করে নিজেকে সে সুস্থির করে নেয়। অতঃপর ঘড়ি ধরে শুরু করে পড়া।
------------------------------------------------
রাত বারোটার কাছাকাছি। শহুরে আলো নিভে অর্ধেকে চলে এসেছে। কমে এসেছে যানবাহনের ঘনঘটা শব্দ। কলিংবেলের শব্দ বেজে উঠতেই শেহরিন পড়ার মাঝে দৌড়ে যায় দরজা খুলতে। বাবা মেয়ে একসঙ্গে বাসায় ফিরেছে। আসার সময় সান্নিধ্য শাহমিকাকে নিয়ে এসেছে ওদের থেকে।
সারাদিন শেষে ক্লান্তিমাখা প্রিয় মুখটা দেখতেই সান্নিধ্য তার প্রিয় ফুলকে আগলে নেয় নিজের মাঝে। রোজাকার নিয়মের মতো ঘরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কপালে এঁকে দেয় গাঢ় একখানা চুমু।
"অনেক ক্লান্ত লাগছে আপনাকে। ওকে নামিয়ে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ডিনার রেডি করছি।"
"এক্সাম না কালকে তোমার?"
"হু।"
"যাও তাহলে পড়ো।"
শেহরিন চোখ পাকিয়ে তাকায়। ওড়না দিয়ে সান্নিধ্যের কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘামের কণাগুলো মুছে দিতে দিতে বলে, "এতোক্ষণ পড়েছি। এখন একটু ব্রেক। কোনো সমস্যা হবে না আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন।"
"আমারও কোনো সমস্যা নেই৷ তুমি রুমে চলো।"
"আমাকে রাগাবেন না নেতাসাহেব। যেটা বলছি সেটা করুন।"
"আমিও বেশি কথা বলতে চাই না। সোজা রুমে যাও। কি করতে হবে সেটা বলো।"
শেহরিন সান্নিধ্যেকে হার মানাতে মানাতে ক্লান্ত হয়ে উঠে। কিন্তু সান্নিধ্য তার কথা কর্ণপাত করে না। মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে সোজা পাঁজাকোলে তুলে নেয় তার অর্ধাঙ্গিনীকে। শেহরিন আকস্মিক কান্ডে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে বলে,
"হায় খোদা.. আপনার হাত ভালো হয়নি এখনও নেতাসাহেব। কি করছেন আপনি? নামান বলছি..নামান এক্ষুণি।"
"কিছু হবে না। হাত ঠিক হয়ে গিয়েছে আমার। ফিজিওথেরাপিতে এরকম ব্যায়ামই করতে হয়।"
শেহরিনকে ফের স্টাডি টেবিলে বসিয়ে দেয় সান্নিধ্য। অতঃপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঠান্ডা শীতল চাহনিতে তাকায়। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে শান্ত কন্ঠে বলে," চেয়ার ছেড়ে উঠলে পানিশমেন্ট হবে। দশমিনিট কানে ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবো। তাও সেটা মেয়ের সামনে। সো বি কেয়ারফুল, পড়ো মন দিয়ে।"
শেহরিন গাল হাত দিয়ে হতাশা মাখা চাহনিতে তাকিয়ে থাকে তার নেতাসাহেবের দিকে। কে বলবে, এই মানুষটা সকাল ছয়টায় বের হয়ে রাতটা বারোটা ফিরেছে তাও সেইম এনার্জি নিয়ে? এই যে দুচোখ ভরা তার ক্লান্তির রেশ, তবুও কি সুন্দর করে প্রিয়তমার সামনে সেটা লুকিয়ে যাচ্ছে। গলার স্বর তার ভেঙে গিয়েছে সারাদিনের মিটিং মিছিলে, এদিকে প্রিয়তমার সামনে নিজের শীতল স্বরে সে ঝর্ণায় গা ভিজিয়ে দিচ্ছে। এই মানুষটা কি তবে যন্ত্র? যে যন্ত্র শুধু মাত্র তার প্রিয়তমাকে সকল কাজ হতে নিষ্পত্তি দেয়। তাকে মাথায় তুলে রাখে পরম যত্নে।
---------------------------------------------
রাত একটা ছুঁই ছুঁই। মেয়েকে কাঁধে নিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে ছোট খাটো রান্নার আয়োজন সেড়ে নেয় সান্নিধ্য। বিশেষ কিছু নয় গরম গরম ভাত, সাথে ডিম ভাজি আর ফ্রিজে আগের রান্না করা মাংস ওভেনে গরম করে নেয় আনাড়ি হাতে । আসা মাত্র দশ মিনিটের মাথায় শাওয়ার সেড়েই কাজে লেগে পড়েছিলো সে। পরনের সাদা টি শার্টে তার তরকারির গাঢ় ঝোল চেয়ে আছে। লাগিয়েছে শাহমিকা। ডিম ভাজার সময় একটুখানি সেদিকে মনোযোগ দিতেই রাজকন্যা ছাড়া পেয়ে বের করে রাখা মাংসের বাটির ঢাকনা সরিয়ে আঙুল চুবিয়ে দিয়েছিলো তাতে। অতঃপর সোজা গিয়ে লাগিয়ে দেয় বাবার টি শার্টে।
লম্বা সময় ধরে এমন দুষ্টামি, ছোটাছুটি করে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে বাবার কোলে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। ফু'মণির সাথে একটু আকটু খেয়েছে রেস্টুরেন্টে এজন্য আর মুখেই তোলেনি খাবার। একদম গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়েছে ।
কিচেনের সবকাজ গুছিয়ে শাহমিকাকে শুয়ে দিয়ে সান্নিধ্য প্লেটে খাবার নিয়ে এসে থিতু হয় শেহরিনের কাছে। স্টাডি টেবিলের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে সে। দক্ষ হাতে সুন্দর করে ভাতের লোকমা তুলে মুখের সামনে ধরে শেহরিনের।
শেহরিন বই বন্ধ করে চুপচাপ বাড়ানো লোকমা মুখে তুলে নেয়। খাবার খেতে খেতে নেতাসাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
" এতো প্রশয় পেয়ে পেয়ে আপনার মাথায় চড়ে বসেছি।"
"তোমার স্থান আমার মাথাতেই।"
"এতো পার্ফেক্ট হাসবেন্ড হতে কে বলেছে?"
"পার্ফেক্ট ওয়াইফের জন্য পার্ফেক্ট হাসবেন্ড হওয়া অনিবার্য।"
"কথার যুদ্ধে আপনাকে হার মানানোর সাধ্যি নেই আমার।"
" হ্যাঁ কিন্তু রাজনীতি নিয়ে কথা তুললে তখন আন্তর্জাতিক ডিবেট কম্পিটিশন করো আমার সাথে।"
শেহরিন খাওয়ার মাঝে শব্দ করে হেসে উঠে। এই একটা লোক তার এই বিষয়টা যে কতো কষ্টে হজম করে নেয় সেটা বলার বাহিরে। রাজনীতি নিয়ে যখনই কথা উঠে টেনে টেনে সে নিয়ে যায় সেটা বির্তকের পর্যায়ে। বেচারা জামাই সাহেব তার পারে না কিছু বলতে। দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তি খন্ডন করে, তর্ক বির্তক করে, অতঃপর একদম শেষে গিয়ে বউকে বিজয়ী ঘোষণা করতে বাধ্য হয় সে। হার মেনে নেয় তার ব্যক্তিগত নারীর কাছে।
"চিন্তা হচ্ছে নির্বাচন নিয়ে?"
"হচ্ছে না।"
"এতো নেগেটিভিটি ছড়াচ্ছে নাসির চৌধুরী আপনাকে নিয়ে। এরপরেও এতোটা কুল আছেন কিভাবে?"
সান্নিধ্য শেহরিনের মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে ধীর গলায় বলে,"নেগেটিভটাকেই পজিটিভ হিসেবে নিয়েছি। তুমি প্লিজ এক্সামের মাঝে আমাকে নিয়ে ভাববে না। অনলি ফোকাস অন ইউর এক্সাম।"
" লক্ষণ খারাপ নেতাসাহেব। অতিরিক্ত ভালো হাসবেন্ড হয়ে যাচ্ছেন আপনি। অতিরিক্ত ভালো ওয়াইফ হয়ে আপনাকে হারিয়ে দিতে হবে।"
শেহরিনের চিকন কন্ঠে প্রতিদ্বন্দ্বী স্বরুপ কথা শুনে সান্নিধ্য নরম হাসে। চোখে চোখ রেখে নির্মেদস্বরে বলে,"আপনিই একমাত্র আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যার কাছে আমি সবসময় হেরে থাকি।"
মে মাসের সকাল। বাতাসে বসন্তের উষ্ণ আমেজ থাকলেও দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা স্পষ্ট। গাছের ডালে ডালে পাখিদের পরিচিত সুরে ঘুম ভাঙা শহরের সকাল মুখরিত হয়ে উঠে । ফুটন্ত কৃষ্ণচূড়া আর জারুলের গাঢ় রঙ সকালের স্নিগ্ধতাকে দেয় আরও বাড়িয়ে। হালকা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে সদ্য ফোটা ফুল থেকে।
ঘড়ির কাঁটার টিক টিক আওয়াজকে রুখে টেবিল ছেড়ে শেহরিন উঠে পড়ে। দু'হাত মুচড়ে আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় ঘুমন্ত দুটো প্রিয়মুখের উপর মিষ্টি চুম্বন দিয়ে ছোটে ফ্রেশ হতে।দেড়ঘন্টার মাঝে সকালের নাস্তাসহ মেয়ের খাবার তৈরি করে গুছিয়ে রাখে সে টেবিলে। আজ তার নয়টার মধ্যে বের হতে হবে জন্য সান্নিধ্য বের হবে একটু দেরিতে,একদম শেফালী এলে।
শাওয়ার নিয়ে রেডি হয়ে কোনমতে একটু ব্রেকফার্স্ট সেরে নেয় শেহরিন। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে আবারো মেয়েকে এবং মেয়ের বাবাকে শীতল স্পর্শ একে দেয় ললাটে। নেতাসাহেবের কানে ফিসফিস করে বলে,"আজকের দিনের জন্য শুভকামনা। সবকিছু ভালো হোক আপনার।"
সান্নিধ্য চোখ বন্ধ রেখে ঘুম ঘুম ভারী কন্ঠে ঠেলে বলে,"অলসো গুড উইশেস টু ইউ। ডু ইউর বেস্ট মাই ফ্লাওয়ার।"
"ইনশাআল্লাহ।"
শেহরিন বেরিয়ে পড়ে ব্যস্তপায়ে। চার চাকার গাড়িতে ভার্সিটিতে পৌঁছাতে লাগে না বেশি সময়। ভিতরে ভিতরে তার অস্থির উত্তেজনা বইছে। আজকের পরীক্ষাটা নিয়ে একটু বেশিই নার্ভাস সে। ঠোঁট গলা শুকিয়ে আসছে কেমন থেকে থেকে।
------------------------------------------
দিগন্তের কিনার থেকে সূর্য উঠে ঠাঁই নেয় দূর আকাশের বুকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে তার তেজ, উত্তপ্ততায় মুখর হয়ে উঠে চারপাশ। আকাশ স্বচ্ছ নীল। দুই একটা সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে পালকির মতো করে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটু একটু করে রোদ চড়ে বেড়ায় ভূপৃষ্ঠতলে।
দেখতে দেখতে সকালের ভাব কমিয়ে বেলা এখন প্রায় দুপুরে। সূর্য এসে থেমেছে মাথার ঠিক উপরে। ক্যাম্পাসে লম্বা লম্বা গাছের ছায়াগুলো সংকুচিত হয়ে এসেছে। তিন ঘন্টার পরীক্ষা শেষ হতেই বেরিয়ে পড়ে শেহরিন। আজ ছিলো জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সাম।
ভার্সিটির মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই পিছু ডাকে পদ যাত্রায় থামায় সে। ঘাড় ঘুরাতেই দেখতে পায় তার অতি পরিচিত বিষধর ক্লাসমেট তূর্ণা, নিশি, আরেফিনদের।
"এমপি সাহেবের বেগম আমাদের একটু হেল্প করুন রাস্তা পারাপার হতে।"
শেহরিন ভ্রু কুঁচকে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করে, "কেন?"
"ভিআইপি পার্সনদের জন্য রাস্তা ব্লক করে রাখা হয়েছে। আই মিন সাবেক এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খানের গাড়ি এখন পাস হবে।"
শেহরিন মূল ফটক হতে রাস্তার বাহিরে নজর দেয়। এতোক্ষণ নিমগ্ন চেতনায় হেঁটে আসছিলো সে। খেয়ালই করেনি সামনে রাস্তা ব্লক করে রাখা হ'য়েছে। কোনো যানবাহন চলাচল করতে দিচ্ছে না দু তিনজন ট্রাফিক পুলিশ। বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে হাতে লাঠি নিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার রাখতে ব্যস্ত।
"তো?"
"আফটার অল, তুমি তো উনার ওয়াইফ। ট্রাফিক পুলিশ তোমাকে ঠিকই যেতে হবে। আমাদের তো আর যেতে দিবে না। এখন এমপি সাহেবের গাড়ি কখন আসবে সেটারও তো ঠিক নেই। এতোক্ষণ ওয়েট করবো আমরা?"
"ট্রাফিক পুলিশকে আমার কিসের দরকার পড়েছে গিয়ে হুকুমজারি করার? সাবেক এমপি সাহেব আমার হাসবেন্ড হলেও তার প্রফেশনাল লাইফে আমি এই মুহুর্তে কোনো এখতিয়ার রাখার প্রয়োজন বোধ করছি না। আর আমি ভার্সিটির স্টুডেন্ট পরিচয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছি এমপি সাহেবের বউয়ের পরিচয়ে নয়।"
আরেফিন দু'হাত পকেটে ঠেলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে,
"এমপি সাহেবের পরিচয়েই তো প্রচারণা করো। মিডিয়ায় কথা বলো তখন?"
শেহরিন স্মিত হেসে দু'হাত বুকের সাথে ভাঁজ করে দাঁড়ায়। ঠান্ডা গলায় আরেফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কয়দিন পর ফোর্থ ইয়ারে উঠবে। এইটুকু ব্যাসিক নলেজ অন্তত সাথে রাখো যে, প্রফেশনাল লাইফ পার্সোনাল লাইফ ভিন্ন, ভার্সিটি আর নির্বাচনের মাঠ ভিন্ন। এমপির বউ হওয়ার সুবাদে যদি ভার্সিটির স্যারেরা আমাকে এক্সট্রা মার্ক দিতো,তাহলে আমিও তোমাদের এক্সট্রা কেয়ার দিতাম। যেখানে আমার এখানে এই পদবির কোনো মূল্য নেই, আমিও তাই তোমাদের অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারছি না। সরি..আমি অপেক্ষা করছি, তোমরাও করো।"
শেহরিনের ঝাঁঝালো উত্তরে নিশ্চুপ হয়ে যায় তিনজন। কেউ আর মুখ খোলার সাহস পায় না। মনে মনে ভস্মীভূত হলেও উপরে উপরে ঠান্ডা থাকে। তবে মুখোজুড়ে আমাবস্যার ন্যায় অন্ধকার। নিশি পরিস্থিতি সামাল দিতে জোরপূর্বক হেসে বলে,
"পরীক্ষা কেমন হলো আজকে তোমার?"
"ভালো। তোমাদের কেমন হয়েছে?"
"তোমার ভালো হয়েছে?"
একসঙ্গে তিনজনের আশ্চর্যান্বিত কন্ঠস্বরে হকচকিয়ে উঠে শেহরিন। সাবলীল কন্ঠে বলে, "অবাক হচ্ছো যে?"
"অবাক হবো না!! আজকের প্রশ্ন এতো হার্ড ছিলো। আমরা যতজনকে আস্ক করেছি সবাই বলেছে এক্সাম খারাপ হয়েছে। একমাত্র তুমি বলছো ভালো হয়েছে। সিরিয়াসলি?"
"রিলাক্স। এতো অবাক হওয়ার দরকার নেই। প্রশ্ন হার্ড হলেও সবাই যে খারাপ করবে এমনটা নয়। এর মাঝেই দেখবে টপাররা হায়েস্ট মার্ক পেয়েছে।"
"তোমার যেহেতু ভালো হয়েছে তুমিও তাহলে ভালো মার্ক পাবে।"
"জানি না অ্যাকচুয়ালি। দেখা যাক,আল্লাহ ভরসা।"
অপেক্ষার ঠিক তিন মিনিটের মাথায় সাই সাই করে সামনে দিয়ে চলে যায় পাঁচটা গাড়ি সাথে ত্রিশ পঁয়ত্রিশটার মতো বাইক। ধূলো উড়িয়ে তেজালো রোদ্দুর ভেদ করে ছুটে চলে গন্তব্যের উদ্দেশ্য।
শেহরিন কিছুটা দূর হতেই সান্নিধ্যের গাড়ি দেখে চিনতে পারে। তিনটে গাড়ির পর চতুর্থ নাম্বার গাড়িটা ছিলো নেতাসাহেবের।আজকে তাদের গন্তব্য কোথায় সঠিক জানা নেই তার। কাল নির্বাচন আজ ছোটাছুটি এমন করেই চলবে।
__________________________________
গোধূলির লগ্নের মায়া ছেড়ে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে সূর্য। সন্ধ্যার ঘোর কাটিয়ে রাতের সূচনা লগ্নে হালকা গোলাপি রঙা সেই ডায়েরি আর কলম নিয়ে বেলকনিতে বসে শেহরিন। ঝুরোঝুরো হাওয়ায় দুলতে থাকা চুলগুলোকে কানের পিঠে গুঁজে বেতের সোফায় সে হেলান দিয়ে বসে পা গুটিয়ে।
কলমের কালিতে ছোঁয়া পৃষ্ঠাগুলোকে কাটিয়ে সে চলে যায় ঝকঝকে এক মসৃণ পৃষ্ঠায়। কিয়ৎক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সেই পৃষ্ঠার দিকে। অতঃপর স্বতঃস্ফূর্ত ভাবমূর্তিতে লম্বা করে শ্বাস টেনে শুরু করে লেখা,
❝শ্রদ্ধেয় কামাল পাশা স্যার,
এক তুচ্ছ, ক্ষুদ্র, গণনার বাহিরে থাকা এক ছাত্রী আপনাকে নিয়ে লিখতে বসেছে আজ। সিভিল ডিপার্টমেন্টের মিডেল বেঞ্চে বসা সেই অনিয়মিত ছাত্রী যাকে আপনি প্রায়শই ক্লাসে দাঁড় করাতেন। যে মেয়ে চোখে চশমা পড়ে নতজানু হয়ে থাকতো আপনার সামনে। হাজারো অভিযোগের পাল্লা ভারী করে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতো চুপচাপ। আমিই সেই আলোচিত রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার ৭৩০, সাবরিনা শেহরিন অনিভা।
স্যার,
ফোর্থ ইয়ারে আপনার ক্লাস পাবো কি না জানি না। আজকে আপনার সাবজেক্টের এক্সাম হলো। মনে হচ্ছে, এখানেই হয়তো বিদায়ের ঘন্টা বেজে গিয়েছে। তাই আমার ভিতরে থাকা কিছু অব্যক্ত কথা পরিস্ফুটনের জন্য কলমটাকে তুলে নিলাম হাতে।
জিওটেকনিক্যাল সাবজেক্ট !! বেশ কঠিন একটা সাবজেক্ট । পার্সোনালি আমার কাছে পড়ার চেয়েও কঠিন লাগতো আপনাকে স্যার। বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে আপনার কঠোরচিত্তের স্পন্দন পেতাম। ভীষণ ভয় পেতাম। কখনো ভাবিনি এই সাবজেক্টটা আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে।
তবে, আমি আজ আমার ভয় কাটিয়েছি আমার নিজস্ব চেষ্টায়, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। আলহামদুলিল্লাহ আমার খুব ভালো এক্সাম হয়েছে আজকে। এতোটা ভালো এর আগে কোনো এক্সামে হয়নি। প্রশ্ন অন্যসবার কাছে হার্ড মনে হলেও আমার কাছে স্ট্যান্ডার্ড মনে হয়েছে। আমি পুরোটা আমার মতো করে কভার করতে পেরেছি। আমি ভীষণ সন্তুষ্ট, পরিতৃপ্ত। আলহামদুলিল্লাহ। যদি আল্লাহ চায়, যদি দূর্নীতি, পূর্ববর্তী আক্রোশ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক মনোভাব না থাকে আমার বিশ্বাস সর্বোচ্চ নাম্বারটা হয়তো আমার দখলে থাকবে। ক্লাস টপারদের সাথে আমার কথা হয়েছে। তাদের ছোট ছোট দু একটা ভুল যেগুলো আমি সহজেই উতরে এসেছি।
আমি মোটেও অহংকার করছি না। আমি শুধু আমার কষ্টের প্রতিফলনগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিজের ভিতরের আত্মবিশ্বাস টেনে বের করছি। আমার নির্ঘুম রাতের ফসল, আমার কঠোর অধ্যবসায়ের ফসল। ঠিক যেমন কষ্ট করে কৃষক জমিতে ধান ফলায়। বিরূপ আবহাওয়া না থাকলে সে যেমন আশা করে ফলন ভালো হবে,ঠিক তেমনভাবে আমিও আশা করছি আমার মার্কস অনেক ভালো আসবে।
আমি চাই, আপনি আমার খাতা খুব ভালোভাবে দেখুন স্যার। খাতা দেখা শেষে আপনি যখন টোটাল মার্কস লিখবেন তখন আপনার বলা 'সবার জন্য সব নয়' এই কথাটা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে যাক। আপনার দামি মূল্যবান মস্তিষ্কে একটা ছোট্ট অনুধাবন হোক, 'মানুষ' চাইলে সব পারে। প্লিজ জেন্ডার দিয়ে জাস্টিফাই করবেন না স্যার। 'মেয়ে মানুষ শুধু ঘর সংসার সামলানোর জন্য' এমন ধারণাটা ফিঁকে হয়ে যাক মলিন রোদের মতো। মেয়েরা সংসারের ধর্ম বোঝে, মেয়েরা বাচ্চা সামলায়, পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ায়৷ বড় বড় সেক্টরে ফিমেলদের পদচারণা থাকে ঝকঝকে কাচের মতো। যেখানে সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিজেকে কংগ্রাচুলেট করে বলে, ইউ ডিড ইট, গার্ল। আই'ম ভেরি প্রাউড অফ ইউ।"
স্যার, অ্যাজ আ হাউজ ওয়াইফ আমার মন যেমন সংসারে থাকবে,অ্যাজ আ স্টুডেন্ট আমার মন সেরকম পড়াতেও থাকবে। ইন ফিউচার আমি খুব বেশি বড় পদে অভীষ্ট হতে না পারলেও নামের আগে অনুমোদিত ইঞ্জিনিয়ার শব্দটা বসাবোই ইনশাআল্লাহ। গর্ভমেন্ট হোক কিংবা কর্পোরেট জব সেক্টর হোক নিজের মেধা যাচাইও অবশ্যই করবো ইনশাআল্লাহ।
আমার আপনার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই স্যার। রয়েছে শুধু অনুনয়। প্লিজ স্যার, আমার মতো শেহরিনদের ভিতরটাকে ক্ষত করবেন না। স্বইচ্ছায় কে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে চায় বলুন!! পরিস্থিতি,পরিবেশ, অবস্থান সবসময় আমাদের অনুকূলে থাকে না। অনেক কিছুর সঙ্গে লড়াই করে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে হয়। একটা মেয়ের জীবনে অনেক অজানা গল্প থাকে। অনেক কষ্ট লুকায়িত থাকে। তার পিছিয়ে পড়ার অনেক কারণ থাকে। তাই বলে, সে যে জীবনে কিছু করতে পারবে না। এই তিক্ত কথাটা মাথায় না আসুক।
If there is God's grace, if there is husband's support, if the family is suitable for a girl, then she can do anything. She just needs a little back support to prove herself.
আপনি সম্মানিত শ্রদ্ধাশীল একজন ব্যক্তি। আপনার চোখে চোখ রেখে কথা বলার স্পর্ধা আমি করি না। তবে, ডায়েরির ভাঁজে লুকিয়ে থাকুক আমার নিরব প্রতিত্তুর। সেদিন যে প্রশ্নগুলো আমার গলায় কাঁটার ন্যায় বেঁধেছিলো আজ কলমের কালিতে তা উগড়ে দিলাম। আমার পরীক্ষার খাতা হোক এসব কিছুর নির্ভেজাল উদাহরণ। যে উদাহরণ আপনার অন্তরের চার পাল্লার কপাটযুক্ত জানালা খুলে দিতে সক্ষম হবে। আপনার হৃদয়ে সহানুভূতির হাওয়া বইবে। অনুপ্রেরণা দিয়ে বলবেন, মানুষ চেষ্টা করলে সব অর্জন করতে পারে। এগিয়ে যাও।ভয় নেই।
আজ এই পর্যন্তই। অনেক লিখে ফেলেছি৷ আবেগী হয়ে উঠেছি।
ভালো থাকবেন স্যার, ভালো হোক আপনার।❞