রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৫৫

🟢

অন্তিমপাতা-|০২|

রাত সাড়ে এগারোটা। এক্সিডেন্টের খবর পাওয়া মাত্র অন্ধকার রাতকে বিদীর্ণ করে হাসপাতালে ছুটে এসেছে শেহরিন। সঙ্গে এসেছে সরফরাজ। গাড়ি হাসপাতাল গেটে পৌঁছাতেই চোখে ভেসে ওঠে বিশৃঙ্খল এক দৃশ্য। অসংখ্য সংবাদকর্মী, ক্যামেরা হাতে মিডিয়ার লোক, আর উৎসুক জনতার ভিড়ে রাস্তা পুরোপুরি অবরুদ্ধ। গাড়ি থেকে নামার পরিস্থিতিটুকু যেন নেই। সবাই ব্যস্ত লাইভ টেলিকাস্ট করতে।

বিশৃঙ্খল এই পরিস্থিতির মাঝেই তাড়াহুড়ো করে গাড়ি হতে নেমে পড়ে শেহরিন। মাথায় ওড়না টানা বিবর্ণ তার চোখ মুখ। এক লহমায় জীবনের সমস্ত রঙ যেন তার ছুটে গিয়েছে মুখোরেখা হতে। তাকে দেখা মাত্র মিডিয়ার লোকজন ক্যামেরা সেদিকে ফোকাস করে। একাধিক ক্যামেরার ঝলসানি, হুড়োহুড়িতে নাজেহাল অবস্থা। সাবেক আলোচিত ও সমালোচিত এমপি সাহেবের স্ত্রীকে এই প্রথম তারা সামনাসামনি পেয়েছে। এর আগে কখনো কোনো পরিস্থিতিতে তাকে মিডিয়ার সামনে দেখা যায়নি। এমনকি রাজনৈতিক কোনো অঙ্গনেই তার পদচিহ্ন পাওয়া যায়নি। একারণে তাকে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী, বিপক্ষ দল, এবং সাধারণ জনগনের মধ্যে বেশ কৌতূহল ছিলো। আজ তাই সম্মুখে পেয়ে তার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য তৎপর হয়ে উঠে মিডিয়ার লোকজন।য ার ফলে, হসপিটালের মূল ফটকের সামনে গিয়ে থেমে যায় শেহরিন। এই ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢোকা প্রায় অসম্ভব।

সরফরাজ দু-হাত প্রসারিত করে শেহরিনকে আগলে রাখে। ভাঁজকৃত কপালে তার ঘামের কণা ঝরছে। রাগে ভস্মীভূত হয়ে সে নিরাপত্তা কর্মীদের বলে সরিয়ে দিতে সবাইকে। অস্থিতিশীল পরিবেশ দেখে শেহরিন অসহায় চোখে মাথা নিচু করে থাকে। মিডিয়ার সামনে কথা বলতে সে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক। তাদের অনুনয় তার কাছে ভীষণ তিক্ত লাগে। এই মুহুর্তে কথা বলার মতো কিছুই নেই। বরং এগুলোকে তার অপ্রয়োজনীয়

হ্যারাসমেন্ট মনে হচ্ছে।

বহু কষ্টে, নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় ভিড় কিছুটা সরিয়ে পথ তৈরি করে সরফরাজ। মুখোচোয়াল তার শক্ত হয়ে আছে। পারছে না ভিতরের রাগটাকে উগড়ে দিতে।

গুরুতর অবস্থায় ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হসপিটালে আনা হয়েছে সান্নিধ্য এবং রিমনকে। প্রাথমিক অবজারভেশনের পর পরেই জরুরি ভিত্তিতে উভয়কেই হাসপাতালের তৃতীয় তলার বিশেষায়িত ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এর ৪২১ ও ৪২৬ নম্বর কেবিনে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। আইসিইউ এর নিরবচ্ছিন্ন কাঁচের ওপারে নিয়ন আলোর নিচে এক মুহূর্তে শরীর জুড়ে ছেয়ে গিয়েছে তাদের ধাতব যন্ত্রপাতিতে।

শেহরিন পথ খোলা পেতেই বিদ্যুৎবেগে হসপিটালের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। সরফরাজ পিছন হতে বারেবারে লিফটের কথা বললেও সে কথা তার কানে যায় না। সে ছন্নছড়া, দ্বিকবিদিক ভোলা এক নারী। চোখের সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না আপাতত। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে উঠে যায় সে তৃতীয় তলাতে। গায়ের ওড়নার কার্নিশ পুরোটা ফ্লোরজুড়ে ছেয়ে যায় অগোছালো তালে।

আইসিইউ-র বাইরে থেকে কাঁচের ওপারে সান্নিধ্যেকে দেখা মাত্র এতোক্ষণের সমস্ত জমানো শক্তি উবে যায় শেহরিনের। ভিতরটা তার দুমড়ে মুচড়ে আসে। সামান্য ঢোক গিলতেও মনে হচ্ছে গলায় কাঁটায় বেঁধে আছে।

সান্নিধ্য শুয়ে আছে অচেতন অবস্থায়। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, শরীরে নানা রকম তার ও টিউব বসানো। মনিটরে উঠানামা করছে তার প্রাণস্পন্দনের গতি। শেহরিনের চোখের পানি এতোক্ষণ চোখের কোণজুড়ে বিস্তার করলেও মানুষটার মুমূর্ষু অবস্থা দেখে সে পারে না ধরে রাখতে। এক ফোটা গরম জল নির্বিঘ্নে গড়িয়ে পড়ে তার গাল বেয়ে। কাঁচের দেয়ালে হাত রাখতে গিয়ে অনুভব করে হাত তার অসমধারায় কাঁপছে। নিজেকে সংবরণ করে নেয় সে মুহুর্তেই। নাক টেনে দ্রুত হাতে চোখ মুছে ফেলে।

"ভাইয়া আমার মনে হয় দেশের বাহিরে..

"ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে হবে শেহরিন।"

কিছুক্ষণের অপেক্ষায় হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাক্তার অরুণাংশু দত্তের সঙ্গে দেখা করে সরফরাজ শেহরিন। সরফরাজের প্রস্তাবে ডাক্তার অরুণাংশু গম্ভীর দৃষ্টিতে মাথা নেড়ে বলেন,"এই অবস্থায় তাকে নেওয়া সম্ভব নয়। তার অবস্থা অত্যন্ত জটিল। কারণ মাল্টিপল ইনজুরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা তার ডান হাতে। হিউমেরাসে ফ্র্যাকচার হয়েছে বাজেভাবে। আমরা অপেক্ষায় আছি, পেশেন্টের শারীরিক কন্ডিশন স্থিতিশীল হয়ে এলেই আজকে রাতের মাঝেই জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করবো। তা নয়তো স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে।"

ডাক্তারের কথায় শেহরিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায় এক লহমায়। অস্থির চোখে সে সরফরাজের দিকে তাকাতেই সরফরাজ তাকে চোখের পাতায় শান্ত হতে বলে। ডাক্তার আরও জানান, সান্নিধ্যের মাথায় আঘাতসহ অভ্যন্তরীণ কিছু রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা গেছে। তাই ক্রিটিক্যাল মুহুর্তে স্থানান্তর মানে জীবন ঝুঁকি নেওয়া।

"৪২৬ নাম্বার কেবিনের পেশেন্টের অবস্থা কি আরও জরুরি?

"তুলনামূলক কম বলা যায়। তার বাম হাত এবং বুকের পাঁজড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাথায় আঘাত পেয়েছে। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।"

"যেটার প্রয়োজন হয় সেটা করুন। আমি কোনো প্রকার কম্প্রোমাইজ চাই না। ফার্স্ট অফ অল, আল্লাহ ইজ দ্যা বেস্ট প্রটেক্টর। সেকেন্ড, আই রিকোয়েস্ট ইউ টু প্রোভাইড মি উইথ দ্যা বেস্ট ট্রিটমেন্ট। প্লিজ হ্যান্ডেল দ্যা সিচুয়েশন অ্যাজ বেস্ট অ্যাজ ইউ ক্যান।"

"সময়সাপেক্ষ ব্যাপার যেহেতু আমাদের ধৈর্য্য ধরতে হবে। আর যেহেতু পেশেন্টদের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ আমরা আগেই কোনো প্রকার নিশ্চয়তা দিতে চাই না। বাট উই আর ট্রাইং টু গিভ আওয়ার বেস্ট।"

ডাক্তার সাহেব দ্রুতপায়ে প্রবেশ করেন ভিতরে। পুরো হাসপাতালের করিডোর গভীর ভারাক্রান্ততায় নিমজ্জিত হয়ে উঠে মুহুর্তেই। সময় থেমে আছে ঘড়ির কাঁটায়। ডাক্তার নার্সদের দৌড়াদৌড়ি, মনিটরের বীপ বীপ আওয়াজ, আশেপাশে পরিবারের সদস্যদের চাপা কান্না কানে ভাসে শেহরিনের।

স্তিমিতনেত্রে সে ফের কাঁচের দেয়ালের ওপারে চোখ রাখে। ভীষণ দূর্গম এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো আবারো সে। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর অনুনয়ে বিরবির করে বলে,"আমাকে তুমি আরও কঠিন পরিস্থিতি ফেলো,আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা তুমি আরো নাও, আমি সবকিছু মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার মন তুমি স্থায়ীভাবে ভেঙো না খোদা,সবকিছুর বিনিময়ে আমার বেঁচে থাকার শক্তিটাকে তুমি জিইয়ে রাখো, তার জীবিত বুকে আমার স্থান করে দিও আবারো।"

----------------------------------------------

রাত প্রায় তিনটা। তৃতীয় তলার আইসিইউ কেবিন থেকে সরাসরি দ্বিতীয় তলায় ওটিতে স্থানান্তরিত করা হয় সান্নিধ্যেকে।অর্থোপেডিক সার্জন ড. রফিক জামিল এবং তার নেতৃত্বধীন সার্জিক্যাল টিম শুরু করেন অস্ত্রোপচার।

ঘন্টাখানিক ধরে চলে এই অপারেশন। ঘড়ির কাঁটায় যখন ঠিক সাড়ে পাঁচটা তখন নিভে যায় অপারেশন থিয়েটারের বাইরে জ্বলমান লাল আলো। অপেক্ষারত প্রতিটি মানুষ এই মুহুর্তের জন্য শতাব্দীর মতো প্রহর গুনে চলেছিলো। শাহজাহান সাহেব, মিসেস নাজনীন, সানজি সবাই হসপিটালে উপস্থিত রয়েছে। আসেনি শুধু তিথি। সে বর্তমানে আছে শাহমিকার কাছে।

​ভোর ৫:৪০ মিনিটে ড. জামিল বের হয়ে আসেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্পষ্ট গলায় বলেন, "অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। আমরা ফ্র্যাকচার ভালোভাবে ফিক্স করতে পেরেছি। তবে অপারেশন সফল হলেও, পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর শরীরে এখনো দুর্বলতা ও ট্রমা রয়েছে। তাঁকে আবার আইসিইউতে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।"

​অস্ত্রোপচারের পর পরেই সান্নিধ্যকে পুনরায় ৪২১ নম্বর কেবিনে আনা হয়। অস্ত্রোপচারের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার জন্য তাঁর হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্থিতিশীল রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়। বর্তমান অবস্থার উপর ভিত্তি করে লাইফ সাপোর্টে রাখার প্রয়োজন না হলেও ভেন্টিলেটর সাপোর্টের কাছাকাছি রাখা হয়।

"ভাইয়া..আমি এখন বাসায় ফিরি। শাহমিকার উঠার সময় হয়ে গিয়েছে। "

সরফরাজ শেহরিনকে দেখে ক্রমেই অবাক হচ্ছে। পারছে না, মুখে জিজ্ঞেস করতে, শেহরিন তুমি ঠিক আছো তো? তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি? কারণ সে যতটুকু চেনে জানে মেয়েটাকে, মেয়েটা অত্যন্ত নাজুক এবং দূর্বলচিত্তের। কাল রাত হতে আজ ভোর অব্দি কোনো উচ্চবাচ্য কান্নার শব্দ নেই,কোনো ভঙ্গুরতা নেই। চোখের কোণে জল চিকচিক করলেও নিমজ্জিত হয়নি তা। এতোটা শক্ত সে কবে থেকে হলো? আদৌও কি সম্ভব। যেখানে সম্পূর্ণ বিষয়টা সান্নিধ্যেকে ঘিরে, সেখানে শেহরিন এই অবস্থাতেও নিশ্চুপ? অথচ সান্নিধ্য যখন কারাগারে ছিলো তখন তো সে একদম প্রায় ভেঙে পড়েছিলো। তবে, কি মেয়েটা বড় হয়ে গেলো এর মাঝেই ? বাস্তবতা চিনতে শিখলো? রাজনীতির কঠিন মার প্যাচে জীবনকে অভ্যস্ত করার চেষ্টায় আছে?

"ভাইয়া..."

শেহরিনের দ্বিতীয় ডাকে সরফরাজের খানিকক্ষণের ভাবনা কেটে যায়। মাথা সামান্য নেড়ে সে সামনের পথ ইশারা করে এগোতে। শেহরিন সবার থেকে বিদায় নিয়ে সাবলীল কন্ঠে বলে, "আমি দুপুরের দিকে আবার আসছি।"

"তুমি একদম বিকেলে এসো শেহরিন। আমি আছি, বাবা, ভাইয়া আছে তো। শাহমিকাকে এভাবে লং টাইম রেখে আসাটা উচিত হবে না।"

"তুমি এতোক্ষণ থাকবে আপু?"

সানজি ক্ষীণ হেসে শেহরিনকে আগলে নেয় নিজের সঙ্গে। কপালের এক পার্শ্বে মৃদু ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলে,"আমি যতক্ষণ পারি থাকবো। তারপরে আমি গিয়ে শাহমিকাকে রাখবো তুমি এসো কেমন?"

"আচ্ছা।"

"কষ্ট হচ্ছে ভীষণ তাই না।"

"বুঝতে পারছি না আপু।"

"অনেক স্ট্রং হয়ে গিয়েছো বাচ্চা।"

"তোমার মতো হতে চাই।"

"মনে হচ্ছে আমাকেও ছাড়িয়ে যাবে তুমি।"

"ছাড়িয়ে যেতে চাই না , শোক সামলানোর সামর্থ্য নেই।"

"ইনশাআল্লাহ ভাইয়া ঠিক হয়ে যাবে।"

"সে শুধু আমার কাছে ফিরে আসুক। আর কিছু চাই না।"

________________________________________

মার্চের শেষলগ্ন। বেলা সাড়ে দশটার রোদ নরম সোনালি আভা ছেড়ে উজ্জ্বল সাদা রূপ নিয়েছে। আকাশ প্রায় নীলাভ স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। কেবল মাঝে মাঝে সাদা তুলতুলে মেঘের কয়েকটি গুচ্ছ ভেসে বেড়াচ্ছে ডানামেলে। শিমুল গাছে ফুটতে শুরু করা লাল ফুলগুলো এই রোদে যেন আরও তেজোদ্দীপ্ত দেখাচ্ছে। বাতাসে এখনও লেগে আছে শেষ বসন্তের সুঘ্রাণ।

রাস্তায় সকালের ভিড় প্রায় শেষ। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। অফিসগামী মানুষদের ভিড়ও কেটে গেছে অনেকটা। এখন রাস্তায় দেখা যাচ্ছে বাজার সেরে ফেরা কিছু গৃহিণী,হাঁটাহাঁটি করে ফেরা বয়স্ক মানুষ। অ্যাপার্টমেন্ট হতে বেরিয়ে পায়ে হেঁটে ভার্সিটির উদ্দেশ্য রওনা হয়েছে শেহরিন। আশেপাশে লোকালয়ের চিত্র গুলো সে নিখুঁত চোখে তাকিয়ে থেকে দেখতে দেখতে যাচ্ছে। হসপিটাল টু বাসা, বাসা টু হসপিটালের দৌড়াদৌড়ি শেষে আজ তিনদিন পর ভার্সিটিতে যাচ্ছে সে। নেতাসাহেবকে পরিস্থিতি সাপেক্ষে কেবিনে শিফট করা হয়েছে তবে শরীরে ঝুঁকি এখনও কাটেনি।

মনে হচ্ছে, চোখের পলকে কেটে গিয়েছে হয়তো এই তিনটা দিন। কিন্তু এই তিনটা দিনের প্রতিটি মিনিট,সেকেন্ড, ঘন্টার কাঁটা সাক্ষী কতটা নির্মমতায় কেটেছে এক একটা মুহুর্তে। প্রতিটি ক্ষণের শক্ত কাঁটা বিঁধেছে তার হৃদয়ে গহ্বরে। জীবনস্রোত বয়ে চলেছে ঠিক কিন্তু তার তলদেশে প্রবাহিত হয়েছে বেদনার এক অদৃশ্য ধারা।

ঘড়িতে বারোটা পঁয়তাল্লিশ । দুটো ক্লাস শেষে মাথা নিচু করে হাঁটছে শেহরিন। প্রশাসনিক ভবনের করিডোর ধরে নিঃশব্দে চলন তার। হাতে ভাঁজ করা একটা দরখাস্ত। কাঙ্ক্ষিত কক্ষের সামনে আসতেই তার পদচারণা থেমে যায়। থাই ডোর টেনে সবিনয়ে নক করে কম্পিত গলায় বলে, "মে আই কাম ইন স্যার?"

প্রফেসর ড. কামাল পাশা। যিনি একই সাথে তাদের ডিপার্টমেন্টের একজন শিক্ষক এবং প্রক্টর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত। নিজস্ব কাজের মাঝে কলম থামিয়ে তিনি চোখ তুলে তাকান। ভারী গলায় বলেন,

"ইয়েস।"

"আসসালামু আলাইকুম স্যার।"

"ওয়ালাইকুমু সালাম।"

"স্যার, আমি একটা বিশেষ দরকারে এসেছি।"

"জ্বি বসুন।"

শেহরিন সন্তর্পণে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। সম্ভ্রমচিত্তে হাতের ভাঁজে থাকা দরখাস্তটা রেখে নমুজ কন্ঠে বলে,"স্যার আমি কিছুদিনের জন্য ছুটির আবেদন করতে এসেছি।"

"অ্যানি অ্যাপ্লিকেশন?"

"ইয়েস স্যার।"

শেহরিন দরখাস্তটা টেবিলের উপরে রেখে কিছুটা এগিয়ে দেয়। ড.কামাল পাশা সামনে হতে তার কাগজ ফাইল গুলো সরিয়ে দরখাস্তটা হাতে তুলে নেন। চোখে পরিহিত চশমা খানিকটা ঠিক করে ​শিরোনামে চোখ বোলাতেই তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠে। সাতদিনের ছুটি!!

পুরো দরখাস্তে এক নজর চোখ বুলিয়ে সে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখেন। অতঃপর শেহরিনের দিকে সরাসরি তাকান। রাশভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন,

​"আপনি কি কখনো আপনার ক্লাস অ্যাটেন্ডেন্স রিপোর্ট দেখেছেন?"

স্যারের বজ্রের আওয়াজে শেহরিন মাথা নিচু করে চোখ নামিয়ে নেয়। শুকনো গলায় বলে,"জ্বি না স্যার।"

"তাহলে হয়তো এটাও জানেন না,আপনি আপনার ডিপার্টমেন্টের সব স্যারদের নজরে এসেছেন একাডেমিক স্টাডিজের ক্ষেত্রে। এ সপ্তাহে তিনটা ক্লাস মিস করেছেন। সপ্তাহখানেক আগের ক্লাস টেস্টে অনুপস্থিত। আপনার কি রেগুলারেটি সম্পর্কে কোনো আইডিয়া নেই? আপনি কি মেইনটেইন শব্দটার সঙ্গে অপরিচিত?"

"সরি স্যার।"

"আপনার গ্রুপের সদস্যরা অভিযোগ করেছে, আপনি গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্টের কাজে ঠিকমতো অংশ নেন না। ল্যাবের গ্রুপ ওয়ার্কে ইনভলভমেন্ট নেই ঠিকমতো। এমন দায়সারা ভাব নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কেন পড়তে এসেছেন?"

"স্যার..আমি কিছু পারিবারিক সমস্যার কারণে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছি। যার কারণে রেগুলারিটি মেইনটেইন করার চেষ্টা করলেও পেরে উঠতে পারছি না।"

"প্লিজ ডোন্ট মেইক অ্যানি এক্সকিউজ। ইট'স অ্যানোইং।"

ড.কামাল পাশা একটু থামেন। তার সামনে মাথা নিচু করে থাকা শিক্ষার্থীর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলেন,

"ইউ উইল টেক দ্যা ফাইনাল এক্সাম ইন আ ফিউ ডেইস। আর এখন এসেছেন ছুটি নিতে? আপনার এই কঠিন পড়াশোনা করার দরকারই বা কি? এই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর এত চাপ নেওয়ার চেয়ে আপনি বরং অ্যাজ আ হাউজ ওয়াইফ, সেই দিকেই মন দিন। সেটার জন্য তো আপনার এত দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। কোনো অভিযোগ ও সৃষ্টি হবে না। আপনার যা কন্ডিশন, ইন ফিউচার খুব বেশি কিছু তো মনে হয় না করতে পারবেন। আপ ডাউন সিস্টেমের মধ্যে না থেকে সাংসারিক দিকটাতেই ফোকাস করুন। এটাই আপনার জন্য বেটার হবে। মনে রাখবেন সবার জন্য সবকিছু নয়।"

​ছুঁড়ে আসা কঠিন বাণী শেহরিনের কর্ণপাত হতেই চোখ বন্ধ করে নেয় সে। চুপচাপ হজম করে যায়। চোখ তুলে তাকানোর জো নেই। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, সমস্ত পরিশ্রম, সমস্ত স্বপ্নগুলো যেন স্যারের এই কয়েকটা কথার আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে ।

তার আত্মবিশ্বাস টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। লজ্জায়, অপমানে সে দগ্ধ। গলায় আটকে থাকা কান্নার পিন্ড সে চুপিসারে গিলে ফেলে।

"এখন বলুন, আপনার কি সত্যিই এই ছুটি লাগবে? এই পরিস্থিতিতেও?"

শেহরিন খুব ধীরবেগে মাথা তোলে। সশ্রদ্ধেয় মনোভাবে সরাসরি স্যারের দিকে না তাকিয়ে টেবিলের দিকে দৃষ্টিপাত করে। শান্ত গলায় বলে, "ইট'স ওকে, স্যার। আমি ম্যানেজ করে নিতে পারবো।"

বিজ্ঞাপন

"ওকে..গুড।"

"থ্যাংকিউ স্যার।"

শেহরিন নম্রস্বরে সালাম দিয়ে উঠে পড়ে। আগপিছু না তাকিয়ে সরাসরি বের হয়ে যায় প্রক্টর রুম হতে। কিছুটা হেঁটে করিডোরের এক পাশে এসে থমকে দাঁড়ায় সে। দু'পা কেমন যেনো তার লতার মতো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরছে। সামনে এগোবার সাহস পাচ্ছে না। বুকের উপর বাম হাত রেখে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিতে থাকে। গলা চেপে ধরার মতো কষ্ট অনুভব হচ্ছে। মধ্যাহ্ন ভাগের কড়া রোদ্দুর লোহার গ্রিল ভেদ করে তার গালের উপর এসে পড়ে। চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা নির্মেদ অশ্রু সেই সোনালি রোদে চকচকে করে উঠে।

কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে শেহরিন। বুকের মধ্যে

ধড়ফড়ানি কম আসলে সে হাতের পৃষ্ঠে চোখ মুছে নেয়। অতঃপর লম্বা করে শ্বাস ফেলে এগোয় সামনের দিকে।

ফ্যাকাল্টি হতে বেরিয়ে ধীর পায়ে এগোতে থাকে সে। কাঁধের ব্যাগ শক্ত করে চেপে ধরে আনমনে মনস্তাত্বিক যুদ্ধ মেতে উঠে। কিছুটা সামনে এগোতে এই আঁধারের জীবনে হঠাৎ রঙিন ছায়া এসে ভীড়ে। শেহরিনের আধভেজা চোখ দুটো হয়ে উঠে শুষ্ক। ঠোঁটের কোণে ফোটে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি। সমস্ত কষ্ট অপমান গলাধঃকরণ করে সে নির্মল চাহনি মেলে দু হাত প্রসারিত করে।

"মা.."

আসিফের কোলে শাহমিকা। মা'কে দেখতেই রাজকন্যা খুশিতে উপচে পড়ে। চাচ্চুর কোল হতে ঢলে পড়ে মায়ের কোলে যেতে।

শেহরিন মেয়েকে নিজের কোলে নিয়ে চোখেমুখে চুমু খেতে থাকে অনবরত। এদিকে আদরে আহ্লাদে রাজকন্যা তার খিলখিলিয়ে হেসে উঠে।

"পুরো ক্যাম্পাস ঘোরা শেষ আমাদের ভাবি।"

"সিরিয়াসলি? কখন এসেছেন?"

"ঘন্টাখানিক হলো।"

"এতোক্ষণ ও চুপ ছিলো?"

"সে তো এতো মানুষ দেখে অবাক।"

শেহরিন মেয়ের গাল লাল হয়ে যাওয়া দেখে তটস্থ চোখে তাকায়। ভীত কন্ঠে বলে, "ভাইয়া ওর গাল লাল কেন?"

আসিফ দু'হাত কোমড়ে চেপে দীর্ঘ শ্বাস চেপে বলে,

"শাহমিকাকে যে দেখে, সেই শুধু গাল টেনে আদর করে দেয়। ইতিমধ্যে দু চারজন আন্টির কোলেও উঠা শেষ তার।"

"তাও ভালো। আমি তো ভেবেছি নতুন করে আবার এলার্জির সংক্রমণ ।"

আসিফ সম্মানী ভঙ্গিতে মা মেয়েকে সামনে এগোনোর জন্য বলে। শেহরিন মেয়েকে নিয়ে খুনসুটি করতে করতে হাঁটা ধরে। পাশ কাটিয়ে সামনে চলা একজন লম্বা চওড়া পুরুষকে দেখে ছোট্ট দেহী বাচ্চাটা চোখ বড় বড় করে তাকায়। এক হাতের আঙুলে উঁচিয়ে ইশারা করে বলে," বাবা...বাবা"

" না মা..বাবা না।"

"উজি.. বাবা.."

"বাবা আসবে..।"

শাহমিকা আজ চারদিন হলো বাবার দেখা পায় না। সে যেন ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠেছে বাবার জন্য। পারছে না মুখফুটে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ করতে। বাসায় কলিংবেল বাজতেই দৌড়ে যায় বাবা বাবা বলে। কিন্তু বাবার দেখা সে পায় না। চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে থাকে দরজা পানে।

"ভাবি একটা কথা ছিলো।"

"জ্বি বলুন।"

"বুঝতেই তো পারছেন, পরিস্থিতি এখন কোন পর্যায়ে আছে। গোছানো সবকিছু হাতের বাহিরে চলে গিয়েছে। এখন কি করা উচিত আমাদের?"

"নির্বাচনের কথা বলছেন?"

আসিফ মাথা নিচু করে ধীর কন্ঠ জবাব দেয়,

"জ্বি।"

"একটু ক্লিয়ারভাবে বললে বুঝতে পারবো ভাইয়া।"

"নির্বাচনের খুব বেশি যে সময় আছে তাও নয়। এই সময়টা হচ্ছে সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল একটা সময়। বলতে পারেন একজন নির্বাচনী প্রার্থীর জন্য টার্নিং পয়েন্ট নিজেকে মেলে ধরার। জনগনের কাছে পৌঁছানোর। সান্নিধ্য ভাইয়ের যে কন্ডিশন সেখানে পুরোপুরি সুস্থ হওয়াটাই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সেক্ষেত্রে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ করা..আমরা আমাদের দিকে ঠিক আছি। বাট মাথা যদি না থাকে.. দেহের বাকি অঙ্গের তো কোনো মূল্য থাকে না।"

"আমি তো এসব ব্যাপারে কিছু জানি না। বাবা ভাইয়ারা কি কোনে সলিউশন দিতে পারবে না?"

"আপনার উপর সিদ্ধান্ত নির্ভর।"

শেহরিন হাঁটা থামায়। অবাক চোখে তাকিয়ে বলে,"আমার উপর সিদ্ধান্ত নির্ভর মানে?"

"ভাবি, নির্বাচনের প্রার্থীতা বাতিল করার মতো এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। আংকেল, সরফরাজ ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে। তারা বলেছেন, আপনার কথা। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমরা প্রার্থীতা বাতিল করবো। কারণ আপনি সান্নিধ্য ভাইয়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমরা তার বিকল্প হিসেবে আপনাকে ধরেছি। কঠিন এই সিদ্ধান্ত তার ওয়াইফ হিসেবে আপনার নেওয়ার বৈধতা আছে। আমাদের নেই।"

শেহরিন গোলকধাঁধায় পড়ে যায়। যে মানুষটার আত্মার সঙ্গে রাজনীতি মিশে গিয়েছে সেই মানুষটা এতোবড় সিদ্ধান্ত কিভাবে মেনে নিবে? প্রার্থীতা বাতিল তার মানে এমপি পদে সে লড়বে না..এখানেই সমাপ্তি ??

"ভাইয়া কোনোভাবেই কি.."

"স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনের মাঠে লড়াই করা অনেক বেশি কঠিন ভাবি। সঠিক প্রচার এবং জনগণের দ্বারে দ্বারে না পৌঁছালে হাজার সমর্থন থাকলেও সম্ভব নয় জেতার। ভোট জিনিসটা অনেক মার প্যাচের।"

"আমি একটু সময় নিয়ে ভেবে জানাই তাহলে।"

"একটু তাড়াতাড়ি করবেন ভাবি।"

"আচ্ছা।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

দিনের আলো নিভে অন্ধকার হয়ে আসে চারপাশ। ঠান্ডা মৃদুমন্দ দক্ষিণে হাওয়া বয় প্রকৃতির মাঝে। বেলকনিতে রোপণ করা গাছগুলোর পাতা দোল খেয়ে হেলে পড়ে একটা আরেকটার উপরে। চারদিকে বিল্ডিং হতে আসা আবছা আলো ফ্লোরজুড়ে লুকোচুরি খেলে। হসপিটাল হতে বাসায় এসে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে, শাওয়ার নিয়ে ক্লান্ত দেহটাকে বেলকনির সোফায় নিমজ্জিত করে শেহরিন। চোখ দুটো তার ভারী হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কতকাল ঘুমায় না সে। কানে ফোন চেপে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে সামনের দিকে।

"আমি কোনো সিম্প্যাথি চাই না বাবা, আমাকে তুমি সাজেস্ট করো এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার কি করা উচিত? কোনটা করলে আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো।"

"তুমি কি নিজেকে ভরসা করো?"

"ভরসা বলতে পারছি না তবে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সাহসটুকু নিজের ভিতরে আনতে সক্ষম হয়েছি।"

"কি চাও তুমি?"

"সবকিছু মোকাবিলা করতে। বিনা অশ্রুতে।"

রিজওয়ান সাহেব মেয়ের কঠিনচিত্তের সঙ্গে একাগ্রতা প্রকাশ করেন। ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি বজায় রেখে সুস্পষ্ট কন্ঠে বলেন,"তুমি যেটা চাও সেটাতে প্রয়োজন নিজের প্রতি ভরসা, বিশ্বাস। মানুষ যেটা চায় সেটা কখনোই সহজলভ্য হয় না। ময়দানে নামতে হয় মা। রিস্ক নাও জীবনে। যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি চেষ্টা করছো, তুমি জানছো না সামনে তোমার জন্য কি অপেক্ষা করেছে। তুমি প্ল্যান করছো, তুমি ভাবছো কিন্তু কাজ করছো না। কিছুই হবে না। স্বপ্ন তৈরি হয় ভয় দিয়েই। তুমি অসংখ্যবার হারবে,নুইয়ে পড়বে কিন্তু তুমি উঠে দাঁড়াবে বারবার।"

"আমি ময়দানে নামতে চাই বাবা।"

"বাবা তোমাকে সেজন্য স্বাগতম জানাচ্ছে। তুমি যদি হেরেও যাও তাতেও অনেক কিছু অর্জন করবে মা। তোমার ভিতরের সব ভীত সত্তাগুলো মরে যাবে। দ্বিতীয়বার পা রাখার সাহস পাবে জীবন যুদ্ধে। মনে রাখবে, পানিতে স্পর্শ না করা পর্যন্ত মানুষ বুঝতে পারে না সেটা ঠান্ডা কি না গরম। তুমি স্পর্শ করো, অনুভব করো। কাজটা কঠিন, কিন্তু স্ট্রং ডেটারমিনেশান এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর বিশ্বাস তোমাকে তোমার লক্ষ্যে পৌঁছে দিবে ইনশাআল্লাহ।"

শেহরিন চোখ বন্ধ করে চোখে জমা জলগুলোকে নিমজ্জিত করে। বাবার প্রতিটি কথা তার ভিতরটাকে পুনরায় জোড়া লাগাতে সাহায্য করছে। আজ দুপুরে যে ভাঙন টা ধরেছিলো তা আবারো মিলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

"আমি চেষ্টা করবো বাবা। বিনিময়ে যাই পাই না কেন, সেদিকে আমার ভ্রু'ক্ষেপ থাকবে না। নিজেকে টেস্ট করে দেখি,কতটুকু আমার দ্বারা সম্ভব।"

"দ্যাটস মাই গার্ল, মাই প্রিন্সেস। সবসময় মনে রাখবে, জীবনের কঠিন সময় কখনোই শাস্তিস্বরূপ কিছু নয়, এটা জাস্ট একটা স্টেপ যেটা তোমাকে নতুন করে তৈরি করবে,তোমাকে শেখাবে তুমি আসলে কে। আমার বিশ্বাস তুমি সফল হবে,একদিন নিজেকে নিয়ে প্রাউড ফিল করবে। আমি সেটা নিজ চোখে দেখতে চাই।"

শেহরিন ঠোঁট চেপে কান্না আটকায়। মাথা নেড়ে স্পষ্ট স্বরে বলে,

"ইয়েস বাবা..ইয়েস। থ্যাংকিউ থ্যাংকিউ সো মাচ..।"

" ওয়েলকাম মা।"

শেহরিন ফোন রেখে উপরিপানে তাকায়। ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ঝেড়ে নিজেকে শান্ত করে। অতঃপর দ্রুতহাতে ফোন করে কাউকে।

"হ্যালো।"

"বলো শেহরিন।"

"ভাইয়া উনার প্রার্থীতা বাতিল করবো না।"

"আর ইউ শিউর?"

"ইয়েস, আই এম।"

"কিন্তু কিভাবে?"

"কাল থেকে উনার হয়ে আমি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করবো। চট্টগ্রাম-২ আসনে যতগুলো এলাকা আছে আমি সেখানে যাবো। উনার জন্য ভোট চাইবো।"

"শেহরিন.."

"আমি তাকে হেরে যেতে দেখতে পারবো না ভাইয়া.."

"তুমি রাজনীতি পছন্দ করো না,তুমি এই কথা বলছো?"

"পছন্দ করি না,কিন্তু অসম্মান করার অধিকার আমার নেই।"

"সব ব্যবস্থা করা থাকবে। তোমার অপেক্ষায় থাকবো।"

"ধন্যবাদ ভাইয়া।"

শেহরিন ফোন নামিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। রুটিনে ড.কামাল পাশা স্যারের সাবজেক্টটাতে রেড মার্ক করে

পড়ার টেবিলে বসার আগে এক বার মিররে নিজের দিকে তাকায়। এক দৃষ্টিতে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থাকা শেষে মৃদু ঠোঁট প্রসারিত করে বলে, "মানুষ মূলত আয়না। যার সামনের পৃষ্ঠ মসৃণ ঝকঝকে, কিন্তু পিছনের পৃষ্ঠ খসখসে কঠিন পেরেকে গাঁথা। মানুষ হাসে, তার হাসি ঝকঝক করে। কিন্তু ভিতরে সেই কঠিন পেরেক শুধু মাত্র তার বুকেই গাঁথা থাকে। সেটা কেউ দেখতে পায় না৷ আমার এই হাসি মানুষ দেখবে, জাজ করবে। বাট আমার ভিতরের ক্ষতটা কেউ দেখতে পাবে না। এনিওয়ে,আয়নার পিছন পার্ট কয়জনই বা দেখে?"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প