রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৫২

🟢

রাঙা সকালে ঝকঝকে আলো ফুটেছে ধরণীতে ৷ আকাশে আজ ঠাঁই মেলেনি মেঘের। এ দুদিন পুরোটাই বৃষ্টিমুখো হয়ে থাকার পরে মিষ্টি রোদ্দুর আজ সবিস্তারে নিজেকে ছড়িয়েছে। দূর আকাশে পাখির কলতানের মৃদু আওয়াজ কানে ভাসে।

সকাল সকাল শাওয়ার শেষে ভেজাচুল মুছতে মুছতে আয়নায় নিজেকে দেখে শেহরিন। ঠোঁটের কোণে লেপ্টানো তার স্বতঃস্ফূর্ত হাসি। আজ কতগুলো মাস পেরিয়ে সে নিজেকে এতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আয়নায়। কি প্রাণবন্ত,সতেজ লাগছে দেখতে। অথচ পার করে আসা দিনগুলো কত বীভৎস, বিদঘুটে ছিলো। মনে হতেই গা শিউরে উঠে তার। আয়নাতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখারও বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হয়নি এতোদিন। তার সব ইচ্ছে,রঙ,আহ্লাদ নেতাসাহেবের কাছে জিম্মি হয়েছিল। আজ সেগুলো মুক্তি পেয়ে যেন ডানা মেলে উড়ছে আকাশে !!

টাওয়েল দিয়ে চুল পেঁচিয়ে সে পিছু ঘুরে তাকায়। সর্বোপরি একজন স্ত্রী ও একজন মা হিসেবে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা তার চোখের সামনে ফুটে উঠে। নেতাসাহেব আর তার আদুরে রাজকন্যা একসাথে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ঘুমের মাঝেই বাবা তার হাত মেয়ের পেটের উপর ছাড়িয়ে আগলে রেখেছে আলতোভাবে। যেন একমুহূর্তে ছাড়তে নারাজ। মেয়েও তা বেশ সুন্দরভাবে লুফে নিয়েছে। কোনো নড়াচড়া, হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি নেই। গোলাপি চিকেন ঠোঁট দুটো চোখা করে সেও পিতৃ ছায়ায় আরামের নিদ্রায় নিমজ্জিত।

ইশ! কত আকাঙ্ক্ষার দিন ছিলো এগুলোর। কত অপেক্ষা, কত কামনার ছিলো। এমন সুন্দর দৃশ্য উত্তাল সমুদ্রে খেই হারিয়ে ভেসে বেড়ানো নৌকোকেও যেন থিতু করে পথ দেখিয়ে দেয়। বাবা তার মেয়েকে পেয়েছে, আর মেয়ে পেয়েছে তার বাবাকে। ব্যস, আর কি চাই !

শেহরিন নীমিলিত লোচনে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের চোখ জুড়ায়। ভিতরে হতে প্রশান্তির দীর্ঘ শ্বাস ঝেড়ে ঘড়িতে সময় দেখে নেয় ৷ সাড়ে আটটা বাজে৷ দশটায় তার ক্লাস রয়েছে। দেখতে দেখতে দ্বিতীয় বর্ষও শেষ হয়ে এলো। আর ক'দিন পর হতেই ফাইনাল এক্সাম শুরু হবে। প্রিপ্রারেশন তার একদম বাজে। কোনমতে এখন সিজিপিএ থ্রি টা ধরে রাখতে পারলেই যেন খুশি।

জীবনের গতিপথ যে প্রতি মুহুর্তে পরিবর্তন হয় এটা এখন শেহরিন মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। আপ এন্ড ডাউন সিস্টেমটা সে বেশ ভালোভাবে রপ্ত করতে শিখেছে। নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, জীবন কখনোই সমানতালে প্রবাহিত হয় না । এক্ষেত্রে নিজেই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। এই যে, ছোটবেলা হতে ভার্সিটি উঠার পর ফার্স্ট ইয়ার পর্যন্ত পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে সে কতো বেশি সিরিয়াস ছিলো। আর যাই হয়ে যাক না কেন, টপ লিস্টে তাকে থাকতেই হবে। একটু এদিক সেদিক হলে তার চোখের ঘুম উবে যেতো। আর আজ!! পরিস্থিতি তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে। টপ লিস্টের মায়া ছেড়ে এখন সে একটু ভালোভাবে পাশ নিয়ে চিন্তিত। আর এটুকু হলেই সে মহা খুশি।

"শুনছেন? একটু উঠুন না.."

সান্নিধ্যের শিয়রে এসে বসে শেহরিন। ঘাড় নিচু করে হাত দিয়ে সন্তপর্ণে সে সান্নিধ্যেকে তোলার চেষ্টা করে। মেয়ের দিকে নজর রেখে ফিসফিস কন্ঠে বলে,"উঠুন একটু। চোখটা খুলুন।"

"হু।"

"ঘুমটা একটুখানির জন্য ভাঙান।"

"বলো শুনছি।"

"আজকে আপনি বের হবেন কখন?"

সান্নিধ্য ঘুম হালকা করে চোখ খুলে তাকায় ধীরে ধীরে। পাশ ফিরে কন্যা সাহেবার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে শেহরিনের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,"রাতে।"

"সারাদিন বের হবেন না?"

"সম্ভবত না।"

"শিউর হয়ে বলুন।"

"কোনো দরকার?"

"আপনি বাসায় থাকলে আম্মাকে আর আসতে বলবো না তাহলে। কালকে রাতে আম্মা ফোন করে বলেছেন আজকে আসবেন৷"

"আসুক সমস্যা কি।"

"সমস্যা আছে। আম্মা টানা কয়দিন ধরে এরকম আসা যাওয়ার পথেই আছে। আমি বুঝতে পারছি তার সমস্যা হচ্ছে কিন্তু সে বলছে না৷ এরকম চলতে থাকলে আর্থ্রাইটিসের সমস্যাটা বেড়ে যাবে ।"

সান্নিধ্য বাম হাতে শেহরিনের কোমড় জড়িয়ে ধরে নিজের একদম কাছাকাছি টেনে আনে। কোলের মাঝে মুখ ডুবিয়ে রেখে নরম গলায় বলে, "আচ্ছা আমি না করে দিবো তাহলে।"

"শেফালী দু'দিনের ছুটিতে আছে। আমার আসতে আসতে দুপুর পার হবে। এটুকু সময় আপনি মেয়ের সঙ্গে কক্ষবন্দি থাকবেন। ওর জন্য তোলা সব খাবার আমি রেডি করে রেখে দিয়েছি। সঙ্গে টাইমটাও লিখে রেখেছি। সেই অনুযায়ী খাওয়াবেন।আর আপনার ব্রেকফার্স্ট, লাঞ্চ দুটো আলাদা বাক্সে রাখা। সময়মতো খেয়ে নিবেন ঠিক আছে?"

"আচ্ছা আজকেই শুধু আম্মা আসুক ।"

শেহরিন চোখ সরু করে কপালে কুঁচকে তাকায় সান্নিধ্যের দিকে। চুল টেনে ধরে কোমড়ের ভাঁজে হতে মুখ টেনে তুলে বলে,"বললাম না আম্মার সমস্যা। কঠিন কি কাজ যে নিজে করতে পারবেন না? আমি তো সব গুছিয়েই রেখেছি।"

"শাহমিকাকে খাওয়ানোটা টা টাফ। আমি এসব পারি না খুব একটা।"

"টাফ কিছুই না। আমার মেয়ে দেখতে তার বাবার মতো হলেও স্বভাবে মায়ের মতো হয়েছে। একদম শান্ত, নম্র।"

"মেয়ের বাবাও শান্ত নম্র।"

"হু তারকাঁটা শান্ত নম্র। শুনুন নেতাসাহেব, অভ্যাস করতে হবে। সামনে আমার এক্সাম। আম্মা, তিথি ভাবি, সানজি আপু এনাফ করে চলেছেন আমাদের জন্য। এই মানুষগুলোর উপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে নিজেদের একটু অ্যাক্টিভ হতে হবে। আর কতো করবে তারা বলুন? আপনি শুধু ফিডিং বোতলটা ওর মুখে ঠিকঠাকভাবে ধরবেন৷ আন্ডাবাচ্চা কোনো প্রকার টু বাক্যে ছাড়াই সুন্দরভাবে খেয়ে নিবে।"

"যদি কান্না করে?"

"গান, ছড়া এটা সেটা বলে বলে কান্না থামাবেন।"

"টিভি বা ফোনে গান বা ছড়া দিলে হবে না?"

"চুল ধরে টান দিবো?"

"মহামুশকিল!"

"গুন্ডাগিরি খুব ভালো পারেন তাই না? এসব ভালো কাজ তো পারবেন না। এখন যদি বলি যান,ওই মানুষটাকে আইসিইউ এর কেবিনে শিফট করুন। দৌড়ে দৌড়ে যাবেন।"

সান্নিধ্য ক্ষীণ হেসে দু'হাতে কোমড় চেপে ধরে এক ঝটকায় নিজের বুকের উপর নিয়ে আসে শেহরিনকে। টাওয়েল খুলে ভেজা চুলগুলো তার মুখের উপর এসে পড়ে। দু এক ফোঁটা জলের কণা চোখের ভিতরে যেতেই চোখ বন্ধ করে নেয় সে।

" ধরলাম না,ছুঁলাম না। শাওয়ার নেওয়া হয়ে গেলো তোমার?"

"একদম বাজে কথা বলবেন না। ভার্সিটি থেকে ফিরতে দেরি হবে জন্য শাওয়ার নিয়ে যাচ্ছি। ছাঁড়ুন।"

"এখন না। দশ মিনিট পর। যে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছো সেগুলো ফুলফিল করার জন্য এনার্জির প্রয়োজন আমার।"

"আপনি ঠোঁটকাঁটা কেন এতো?"

সান্নিধ্য শেহরিনের ভেজাচুল গুলো একহাতে পিছনে সরিয়ে দিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দেয়। চোখে চোখ রেখে হাস্কি স্বর টেনে বলে,"আমার ভালো ঠোঁট তোমার কাছে কাঁটা মনে হচ্ছে? তার মানে, আমার ঠোঁট আসলে কেমন সেটা এতোদিনেও তুমি চিনতে পারোনি৷ ভেরি স্যাড। এনিওয়ে নো,প্রব্লেম চলো দেখিয়ে দিচ্ছি।"

"নেতাসাহেব.. "

"প্রাক্টিক্যালে মার্ক বেশি নেত্রীসাহেব। সো প্লিজ, নো মোর আর্গুমেন্ট।"

"মেয়ে আছে।"

"মেয়ে ঘুমাচ্ছে ওপাশ ফিরে।"

"ইশ্ দেরি হয়ে যাবে ।"

"জাস্ট ওয়ান কিস.."

"শিউর?"

"শিউর।"

শেহরিনকে নিশ্চয়তা প্রদান করার সঙ্গে সঙ্গে সান্নিধ্য নরম ঠোঁটজোড়া দখল করে নেয় তার পুরু ঠোঁটের মাঝে। দীর্ঘ দিনের তৃষ্ণার্ত পথিক কোমল সুধা পান করতে হয়ে উঠে ব্যস্ত। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে প্রগাঢ় অভিলাষে দু'জনের ওষ্ঠ মিলে যায় একে অপরের সাথে । পরম আবেশে চোখ দুটো বুঁজে আসলেও সর্তক থাকে শেহরিন। কিছু সময় পেরোতে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য হয়ে উঠে ব্যাকুল। কিন্তু নেতাসাহেবের জাস্ট ওয়ান কিসের মেয়াদ ফুরোয় না। সে তার কাজে মত্ত। দু-হাতে শেহরিনের গাল ধীর স্পর্শে চেপে ধরে মাথা নাড়িয়ে শান্ত থাকতে বলে তাকে।

সময় পেরোয় খানিকটা। অধৈর্য্য হয়ে বহুকষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় শেহরিন নিজেকে। চোখ দুটো বড় বড় করে হাঁপিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ে সে। কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে কড়া সুর তুলে বলে," সাত আট মিনিট ধরে জাস্ট ওয়ান কিস?"

"একটা কিসই তো করেছি। মাঝখানে তো কোথাও থামেনি। ব্রেক চাইছিলে তুমি?"

শেহরিন সান্নিধ্যের গাল খামচে ধরে। গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে বলে, "আপনার মাথা। যেগুলো বলেছি সেগুলো ঠিকভাবে পালন করবেন৷ উল্টাপাল্টা কিছু হলে এই ঠোঁট সেলাই করে দিবো। মাইন্ড ইট।"

_____________________________________

শেহরিন ভার্সিটি যাওয়ার পর বাবা মেয়ে মিলে প্রায় দেড়ঘন্টার বেশি ঘুমিয়ে নেয়। এগোরোটা ছুঁই ছুঁই সময়ে কলিংবেলের শব্দে প্রথমে ঘুম ভাঙে সান্নিধ্যের। মেয়ের ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখের পাতায় চুমু দিয়ে শোয়া ছেড়ে উঠে পড়ে সে। আড়মোড়া ভেঙে পড়নের টি শার্টের ভাঁজ টেনে চলে যায় দরজা খুলতে।

"সরি স্যার। ঘুমাচ্ছিলেন।"

"সমস্যা নেই, এসো ভিতরে।"

আরহাম এবং রিমন এসে উপস্থিত হয়েছে অ্যাপার্টমেন্টে। একজনের হাত খালি থাকলেও আরেকজনের হাতে ফাইলপত্রে ঠাঁসা। সান্নিধ্য ড্রয়িংরুমে গিয়ে সোফায় বসতে না বসতেই বেডরুম হতে ভেসে আসে সদ্য ঘুম ভেঙে উঠা রাজকন্যার কান্নার শব্দ।

কর্ণকুহরে সেই কান্নার শব্দ পৌঁছানো মাত্র সান্নিধ্য তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। দ্রুত গতিতে সোজা চলে যায় মেয়ের কাছে।

কিছুটা সময় পেরোতেই মেয়েকে কোলে নিয়ে বের হয়ে আসে সে। কিন্তু রাজকন্যার কান্না চলমান। বুঝে উঠতে পারে না কি বলে কান্না থামাবে এখন সে।

"আরহাম গান বা ছড়াটড়া কিছু পারো?"

আরহাম এদিক সেদিক তাকিয়ে নিরব গলায় বলে,

"স্যার পারি না। রিমন পারে।"

"রিমন একটা ছড়া বলো তো।"

রিমন থতমত দৃষ্টিতে আরহামের দিকে তাকায়। এই মুহুর্তে সে কি ছড়া বলবে। ছড়া বলার বয়স তো পেরিয়ে এসেছে সেই কোন কালে। বিয়ে করার বয়সে ছড়া বলা মানায় নাকি!! হতাশাগ্রস্ত চাহনি মেলে সে এবার সান্নিধ্যের দিকে তাকায়।

"স্যার.."

"লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আমরা দু'জনই শুধু শুনবো। শুরু করো। একটু হাত পা নেড়ে নেড়ে আবৃত্তি করবে।"

ফ্যাসাদে পড়ে রিমন উঠে দাঁড়ায়। শাহমিকার সামনে এসে দু'হাত নেড়ে ছড়া কেটে কেটে বলতে শুরু করে,

"হাট্টিমাটিম টিম,

তারা মাঠে পাড়ে ডিম

তাদের খাঁড়া দুটো শিং

তারা হাট্টিমাটিম টিম।"

শাহমিকা একদন্ড থামে। ছলছল চোখে সে বাবার গলা খামচে ধরে সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির আবৃত্তি শোনে। কিন্ত তার চুপ থাকার স্থায়িত্বকাল বেশক্ষণ হয় না৷ রিমনের ছড়া শেষ হতে না হতেই আবার শুরু করে কান্না।

"একটা গান বলো এবার।"

"স্যার আমি গান পারি না। সত্যি বলছি।"

সান্নিধ্য মেয়েকে নিয়ে পায়চারি শুরু করে। এটা ওটা বলে কান্না থামানোর চেষ্টায় মত্ত হয়ে উঠে। কিন্তু মেয়ে তার থামে না৷

"স্যার আমি একটু বাইরে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি? বাইরে গেলে বাচ্চারা আর কান্না করে না।"

"সত্যি?"

"পিউর সত্যি।"

"আচ্ছা দু মিনিট ঘুরিয়ে নিয়ে এসো। মনে হচ্ছে ক্ষুধা লেগেছে।"

সান্নিধ্যের কোল হতে শাহমিকাকে নিয়ে রিমন বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। দরজার কাছে যেতে না যেতেই বেজে ওঠে কলিংবেল।

"কি ব্যাপার! কোথায় যাচ্ছো? দাদুমণি কান্না করছে কেন?"

"আন্টি একটু বাইরে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। তাহলে কান্না থামবে।"

মিসেস নাজনীন হাতের ব্যাগটা কোনরকমে স্যু ক্যাবিনেটের উপর রেখে নাতনীকে নিজ কোলে নিয়ে নেয়। ব্যস্ত কন্ঠে বলে, "মনে হচ্ছে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। খিদে পেয়েছে। বাহিরে থেকে ঘুরিয়ে আনলে কি পেট ভরবে? এসব উদ্ভট আইডিয়া কোথায় থেকে পাও তোমরা বুঝি না।"

রিমন নির্নিমেষ চাহনিতে সান্নিধ্যের দিকে তাকায়। সান্নিধ্য মায়ের আগমন দেখে কিছুটা অবাক হলেও পরমুহূর্তে মনে পড়ে, সে আসলে ফোন করে তাকে আসার জন্য নিষেধ করতে ভুলে গিয়েছে। শেহরিন চলে যাওয়ার পর পরই আবারো ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমনোটা হচ্ছে মেইন কারণ।

"শেহরিন ভার্সিটি গিয়েছে?"

"হ্যাঁ।"

"দাদুমণির খাবার?"

"ডাইনিং প্লেসে।"

মিসেস নাজনীন ছেলের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলেন,"বাবাও হয়েছো তুমি! খিদে পেটে মেয়েকে বাহিরে পাঠাচ্ছো ঘুরতে যেতে?"

সান্নিধ্য ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে সোফায় বসে পড়ে। ছোট বাচ্চা কাচ্চার সে কি কিছু বোঝে নাকি। খিদে যে লেগেছিল, এটুকু যে তাও বুঝতে পেরেছে তাইতো অনেক।

"স্যার এই ফাইলগুলোতে আপনার সাইন লাগবে। কাজ আটকে পড়ে আছে অনেক। যে সময় নির্ধারণ করেছিলেন তার চেয়ে বেশি সময় লাগছে।"

"বর্ষার আগেই কাজ শেষ করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমি আমার পদ তার আগেই ছাড়ছি।"

সান্নিধ্যের শেষ কথাটা আরহাম রিমন কেউই বুঝতে পারে না। কিঞ্চিত কপাল ভাঁজ করে ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,"সরি স্যার..পদ ছাড়ছেন মানে?"

সান্নিধ্য ফাইলগুলোতে সাইন করতে করতে এক নজর চোখ তুলে তাকায়। ঠান্ডা গলায় বলে," এমপি পদ থেকে আমি আমার জায়গা ছেড়ে দিবো। আই মিন পদত্যাগ করবো।"

"কেন স্যার? কি বলছেন আপনি? হঠাৎ এরকম সিদ্ধান্ত? "

" ফাইনাল ডিসিশন। অচিরেই ইস্তফা দিয়ে দিবো।"

আরহাম রিমন দুজনেই সমানতালে বিচলিত হয়ে উঠে। এমপি সাহেবের দূর্গম সিদ্ধান্তের কারণ তারা বুঝে উঠতে পারে না। বিস্মিত গলায় বলে,"রাজনীতি ছেড়ে দিবেন স্যার?"

"তোমার মনে হয় এরকম?"

"আমার মাথায় এই মুহুর্তে পিস্তল ধরে কেউ বললেও আমি বিশ্বাস করবো না।"

সান্নিধ্য আরহামের কথা কিঞ্চিৎ ঠোঁট প্রসারিত করে। শীতল কণ্ঠে বলে,"স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি পদে লড়বো।"

"স্যার বুঝতে পারছি আপনি রিসেন্ট ঘটনার জেরে এমন ডিসিশন নিয়েছেন। কিন্তু এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ বুঝতে পারছেন? স্যার জেনেশুনে অথই সাগরে ঝাঁপ দিবেন?"

"ঝাঁপ না দিলে ভয় কাটবে না।"

"স্যার.."

"দিস্ উইল নট চেঞ্জ। এনিয়ওয়ে, আগামীকাল মিটিং এ সব ক্লিয়ার করবো। তোমাদের দুজনকে জাস্ট আগে থেকেই জানিয়ে রাখলাম। হয়ে গিয়েছে নাও.."

আরহাম সান্নিধ্যের হাত হতে সম্ভ্রমচিত্তে ফাইলগুলো নিজ হাতে তুলে নেয়। স্যারের এমন সাহসী পদক্ষেপে সে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলেও নিজেকে সামলে রাখে। তিনি যেটা সিদ্ধান্ত নেন সেটার এমনিতেও কোনো পরিবর্তন হয় না। অতএব,অবাক হয়ে লাভ নেই খুব একটা। কাজে লেগে পরতে হবে৷ কিন্তু কাজটা যে কতটা কঠিন হবে সেটা ভাবতেই তার গা ঘেমে উঠছে।

"ব্রেকফার্স্ট করেছো সান্নিধ্য ?"

সান্নিধ্য আরহাম রিমনকে বিদায় দিয়ে এসে বেডের উপর শুয়ে পড়ে। মেয়েকে দু'হাতে কোলে নিয়ে সে শূন্যে তুলে ধরে। একটু হাসি হাসি মুখ করতেই মেয়ে তার বাবাকে দেখে গড়গড় আওয়াজ করে হাসে।

নাতনীকে ফ্রেশ করিয়ে খাইয়ে দাইয়ে সুন্দর একটা পীচ কালারের ফ্রক পরিয়ে দিয়েছেন মিসেস নাজনীন। একদম গায়ের রঙের সঙ্গে মিলে গিয়েছে ফুটফুটে কন্যার রঙ। এদিকে পেট ঠান্ডা তো রাজকন্যার মাথাও ঠান্ডা।

" উঠেইছি মাত্র।"

"কাজ শেষ হয়েছে?"

"হ্যাঁ।"

মিসেস নাজনীন উঠে চলে যান কিচেনে। বাসা হতে ছেলের পছন্দের ঝরঝরে খিচুড়ি আর মাংস ভুনা করে নিয়ে এসেছেন তিনি। প্লেটে সার্ভ করে সে নিয়ে আসে আবারো কক্ষে।

বিজ্ঞাপন

"একটু উঠে বসো।"

"পরে খাচ্ছি।"

"খাইয়ে দিচ্ছি। দাদুমণিকে তুলে বসো তুমি।"

সান্নিধ্য শাহমিকাকে নিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে। বাবার মেয়ের চলমান খুনসুটির ফাঁকে ফাঁকে মিসেস নাজনীন ছেলেকে খাইয়ে দেন। আজ কতদিন পর মনে হচ্ছে ছেলেকে একটু কাছে পেয়েছেন তিনি। নিজ হাতে খাইয়ে দিতে পেরে তার আত্মায় প্রশান্তির ঢেউ উপচে পড়ে।

"মেয়ে হয়েছে, এবার একটু নিজের লাগাম টানো। এতোদিন যা করেছো, করেছো। এখন এসব কোর্ট কাচারি, পুলিশি কেস,খুন খারাবি থেকে নিজেকে দূরে সরাও।"

"আমি দূরে সরেই থাকি। এরা আমার পিছু পিছু আসে।"

"রাজনীতি না করলেই হয় না? এতো ঝড় দেখতে দেখতে আমার নিজেরই ক্লান্ত লাগে। চাইলে বিজনেসের দিকটা ফোকাস করতে পারো তুমি।"

"বিজনেস তোমার বড় ছেলের জন্য। রাজনীতি আমার জন্য। আমার অন্যদিকে ফোকাস করা সম্ভব নয়।"

মিসেস নাজনীন ছেলের কথা শুনে নিভৃতে দীর্ঘ শ্বাস ঝাড়েন। কাকে কি বুঝাতে এসেছে তিনি। এই একরোখা ছেলে ছাড়বে রাজনীতি? তাহলে ঝামেলা করবে কে?

"আম্মা..তুমি হঠাৎ করে ভালো 'মা' হয়ে যাচ্ছো যে? কোনো কম্পিটিশনে নাম লিখিয়েছ নাকি?"

"মানে..?"

"তোমার এতো সুন্দর পরিবর্তন হুট করে। কারণটা কি?"

মিসেস নাজনীন মুখ ভার করেন। শক্ত গলায় বলেন,"মায়েদের ভালোবাসতে কোনো কারণ লাগে না। তুমি কারণ খুঁজতে এসেছো মানে?"

"একটু দেরিতে হলেও তার মানে তোমার উপলব্ধি হয়েছে।"

"দয়া করে আর লজ্জা দিও না। আমি নিজেই নিজের কাজের জন্য অনেক অনুতপ্ত। এখন একটু আমাকে আমার দায়িত্বগুলো পালন করতে দাও। তোমাদের তিন ভাই বোনের মুখে কিছুই আটকায় না তাই না? জানো,অনেক সন্তানেরা আছে যারা, মায়েরা হাজার অন্যায় করলেও মুখ ফুটে কিছু বলে না। চুপচাপ থাকে। তাদের মতে,মায়েরা কখনোই ভুল করতে পারে না। আর আমারও তিনটা ছেলে মেয়ে মাশাল্লাহ হয়েছে, মায়ের একটু খুঁত পেলে সঙ্গে সঙ্গে শূলে চড়ায়৷ একেক জনের কথার বাণে আমি খেঁই হারিয়ে ফেলি। মনে হয় যেন আমি চরম শত্রু। মাঝে মাঝে তো ভাবি আমার পেটের সন্তানগুলো এমন কিভাবে হলো। একটা অন্তত মায়ের পক্ষে থাকা উচিত ছিলো নয় কি?"

সান্নিধ্য মায়ের হাত হতে লোকমা মুখে নিয়ে খেতে খেতে বলে,

"অন্যায় সবার কাছেই সমান। 'মা' ইমোশনাল একটা ওয়ার্ড জন্য সবাই ভাবে মায়েদের কোনো ভুল হতে পারে না বা তারা যা করে সেটার প্রতিবাদ করা উচিত নয়। তাহলে বেয়াদবি হবে। বাট ইট’স টোটালি রং। মায়েদের ভুলগুলোকে গ্রহণ করে নেওয়া মানে তার বিপরীতে থাকা মানুষটাকে কষ্ট দেওয়া বা তার প্রতি অবিচার করা। এটা কখনোই করা উচিত নয়।

ভুল সবাই করে, প্রতিবাদও তাই সবার জন্য করা উচিত।"

"এটা ঠিক। যদিও আমার একটু খারাপ লেগেছিলো নিজের সন্তানেরা কেন আমার বিপক্ষে যাবে এটা ভেবে । কিন্তু তার পরে যখন আমার অনুশোচনা হয়েছে তখন মনে হয়েছে আমি সত্যি শেহরিনের প্রতি অন্যায় করেছি। এসময় তুমি যদি আমাকে সার্পোট করতে আমি হয়তো আরো ওর প্রতি রুড হয়ে যেতাম। ওর ভালোটা আমার চোখে পড়তো না। এভাবে চলতে থাকলে একটাসময় সেটা খারাপ দিক নিতো।

তবে, ধন্যবাদ আপনাদের তিন ভাই বোনকে। আপনারা আমাকে সেই দিকটা হতে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে সরিয়ে এনেছেন।"

"এটা ধরে রাখবা আম্মা। আর শেহরিন যদি কখনো তোমার সাথে খারাপ বিহেভ করে তুমি ওকে প্রথমে বুঝিয়ে বলবে। যদি সেটাতে কাজে না হয়, আমি ওকে বুঝাবো।"

"শেহরিন ওরকম মেয়েই নয় যে খারাপ বিহেভ করবে ৷ ও ভীষণ আদুরে একটা বাচ্চা। আদর ভালোবাসা পেলেই তার আর কিছুর প্রয়োজন নেই।"

"শাহমিকাও মনে হচ্ছে শেহরিনের মতো হবে।"

"হলেই ভালো। তোমার মতো না হয়, এটাই চাই। বাসায় ফিরবে কবে?"

"শেহরিনের ফাইনাল এক্সাম শেষ হলে। এখান থেকে ওর ভার্সিটি কাছে।"

"তাড়াতাড়ি ফেরো। আমার মন টিকছে না বাসায় কোনোভাবেই।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

সোনালি রোদ মাখা বিকেলের সমাপ্তি ঘটেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। লাল আভার সূর্য অস্ত গিয়েছে পশ্চিম আকাশে। সারাটাদিন রৌদ্রজ্জ্বল পার হবার পর সন্ধ্যা নামার পর পরই আকাশে জমেছে মেঘ ৷ থেকে থেকে হালকা বিদ্যুৎ এর ঝলকানি চোখ পড়ছে। জোরালো হাওয়ায় গাছ হতে ঝরে পড়ছে পাতা পিচঢালা রাস্তায়। তবে, এতোকিছুর মাঝে নেই বৃষ্টির কোনো আভাস।

এমনই এক লগ্নে জোর কদমে খানিকটা দৌড়ে দৌড়ে ছুটছে এক রমণী। মাথায় ওড়না টেনে একহাতে মুখ আবৃত করে রেখেছে কোনমতে। চোখ দুটোতে ভয়ার্ত রেশের স্পষ্ট ছাপ। শুকনো ঠোঁট। আতঙ্কময় মুখোরেখা। খুব সম্ভবত তার হৃদপিণ্ডটাও অশান্ত গতিতে কেঁপে চলেছে ।

"আসিফ ভাই কোথায় তুমি?"

"কেন?"

"বলো।"

"আগ্রাবাদে।"

"আমিও এখানে। তোমার এলাকায় এসে এই মুহুর্তে আমি ড্যাঞ্জার জোনে।"

"ড্যাঞ্জার জোনে মানে? কি হয়েছে?"

"নাসিরের লোকজন আমার পিছু নিয়েছে। লিয়াকত নামের ও ব্যাটাও আছে সাথে। পাঁচজন হবে হয়তো। মনে হচ্ছে আর একটু হলেই ধরা পড়বো। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। হাঁটতে হাঁটতে আমার পা ছিঁলে রক্ত বের হয়ে আসবে এখন।"

"সন্ধ্যার সময় তুমি আগ্রাবাদে কি করতে এসেছো তাও একা একা? তোমার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেই?"

সানজি কানে ফোন ধরেই পিছু ঘুরে এক নজর তাকায়। শয়তানগুলো একদম তার পিছু সই সই। জনমানবে পূর্ণ রাস্তা জন্য দৌড় দিয়ে এসে তাকে ধরতে পারছে না,নয়তো এতোক্ষণে ধরে ফেলতো। শুষ্ক ঠোঁট চেপে সে সামনে দৃষ্টি রেখে গতি বাড়িয়ে কম্পন গলায় বলে,

"কেন এসেছি, কি কারণে এসেছি এসব পরে শুনে বকবে। আগে আমাকে হেল্প করো।"

"আশেপাশে কোনো বাসা বাড়ি আছে কি?"

"না মনে হচ্ছে। রোডের ধার ঘেঁষে হাঁটছি আমি।"

"সামনে জনবহুল কোনো কিছু?"

"আসিফ ভাই..দুটো গলি দেখতে পাচ্ছি। কোনটাতে যাবো?"

"গলির মধ্যে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।"

"না যেয়ে উপায় নেই। সামনে রাস্তা শেষ। আমি একটাতে ঢুকলাম্। আমার লোকেশান চালু আছে এক্ষুণি চলে এসো।"

আসিফ গাড়ি ড্রাইভিং করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"আমার তো পাখা আছে, বললেই উড়ে উড়ে আসবো। সময় লাগবে না? এখান থেকে তেরো মিনিট শো করছে। অকাম ঘটানোর সময় মনে থাকে না। সবগুলো ভাই বোনের মাথার তার নষ্ট।"

"এইই.. আসিফ ভাই ভালো হচ্ছে না কিন্তু। এই কথা আমি যদি ভাইকে না বলে দিয়েছি দেখো। উল্টা পাল্টা কথা ছেড়ে তাড়াতাড়ি আসো। আজ যদি কোনো অঘটন ঘটে এর সম্পূর্ন দায়ভার তোমার থাকবে। তোমার এলাকায় এসেছি মানে..তোমার দায়িত্বের মধ্যে এসে পড়েছি। যেকোনোভাবে উদ্ধার করা তোমার কাজ।"

সানজি পিছন ঘুরে আরেকটাবার তাকিয়ে সোজাসুজি ডান গলির মাঝে ঢুকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু করে দৌড়। বৈদ্যুতিক খুঁটিতে লাগানো সাদা আলো তার লম্বা প্রতিচ্ছবি ফেলে রাস্তায়। লিয়াকতের দল ও সেই সাথে ঢুকে পড়ে গলিতে।

"আজকে আর ছাড়াছাড়ি নাই। বউরে পাই নাই তো কি হইছে বোনরে তো পাইছি৷ একদম লুটাইয়া খুটাইয়া খতম কইরা দিমু।"

"ওস্তাদ..দৌড় শুরু করেন। পাখি উইড়া যাওনের আগেই খাঁচায় বন্দী করতে হইবো।"

"দৌড় লাগা।"

সানজি হন্য হয়ে ধেয়ে আসা জানোয়ারগুলোর হাত হতে নিজেকে রক্ষা করতে উপায় না পেয়ে, সামনে মাঝারি আকারের একটা বিল্ডিং এর খোলা গেইট পেয়ে ঢুকে পড়ে। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখার সময়ও পায় না সে কোথায় ঢুকলো। রাতের কালো আঁধারে নীল রঙের সাইনবোর্ডে গেইটের উপরে লেখা 'নিরঞ্জন আবাসিক হোটেল' তার চোখে পড়ে না।

"ওস্তাদ শালীর বেটি এই হোটেলের মধ্যে ঢুকছে চলেন।"

সানজি হাঁপাতে হাঁপাতে রিসিপশন পার হয়ে সোজা সামনের একটা কক্ষে ঢুকে পড়ে। উপস্থিত দু'জন লোক ঝড়ের বেগে ছুটে আসা রমণীর সরাসরি কক্ষে ঢুকে যাওয়া দেখে একে অপরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তাদের বোধগম্য হয় না এই মুহুর্তে কি ঘটে গেলো। এই মেয়ে কোথায় দিয়ে কিভাবে আসলো? বিনাবাক্যে কক্ষে ঢুকে পড়লো?"

"একটা মাইয়া ঢুকছে এহানে মাত্র। কোনদিক গেছে?"

রিসেপশনিস্ট দুজন একদল মাস্তান চেহারার মানুষদের সরাসরি প্রবেশ দেখে অবাক হয়ে পিছুপা হয়। নিশ্চিত হয়, ঘটনা আসলে কি। তারমানে এই মেয়ের পিছন পিছন এরা এসেছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা..

"এ ব্যাডা কথা কানে যায় না? পিস্তল বাইর করমু।"

"ওও...ওইদিকে গিয়েছে।"

লিয়াকত চারপাশে চোখ বুলিয়ে পকেট হতে পিস্তল বের করে। চোয়াল শক্ত করে বলে," দুই ট্যাকা দামের হোটেল। খুঁজতে লাগবো না বেশি সময় এই চল।"

"স্যার আপনারা একটু স্থির হন। এভাবে রুম তল্লাশি করে অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করার কোনো নিয়ম নেই।"

"এ ব্যাটা বেশি কথা কইবি না। ডিরেক্ট মাটি চাপা দিমু।"

লিয়াকতের দল প্রথম কক্ষ বাদ রেখে সোজা চলে যায় শেষ মাথায়। দুপাশে তাও প্রায় তেরো কিংবা চৌদ্দটা রুম হবে। একটা একটা করে তারা শুরু করে তল্লাশি।

ঠিক তার এক কিংবা দুই মিনিটের মাথায় ফের ঝড়ের বেগে এসে পৌঁছায় একজন লম্বাচওড়া পুরুষ। যে কি না নির্দ্বিধায় আসামাত্র সরাসরি সামনের কক্ষে ঢুকে পড়ে। যে কক্ষে একটু আগে প্রবেশ করেছে সেই রমণী।

রিসেপশনিস্ট দু'জন বিস্ফোরিত নেত্রে তাকিয়ে থাকে। কি হচ্ছে, কি সার্কাস চলছে কিছুই বুঝতে পারে না তারা। তন্মধ্যে একজন নিস্তেজ গলা ভেদ করে বলে,"এটা কি পুরনো বাংলা সিনেমা লুকোচুরি প্রেম খেলা চলছে?"

"বুঝতে পারছি না। তবে হতে পারে, এরা হয়তো শ্যুটিং করছে। ওরা ভিলেন। আর মাত্র যে সুন্দর দেখে লোকটা ঢুকলো সেটা হয়তো নায়ক।"

"তাহলে মেয়েটা নায়িকা। উল্টাপাল্টা কিছু হয়ে যাওয়ার আগে তাড়াতাড়ি স্যারকে ফোন করে এখানে আসতে বলো।"

হোটেল ম্যানেজার সাজ্জাদ আলম ফোনকল পেয়ে ছুটে আসেন তৎক্ষণাৎ। তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই এসে পৌঁছায় কক্ষের মালিক আখতারুজ্জামান। দ্বিধাহীনভাবে তার কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র ভিতর হতে বের হয়ে আসে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ে। মুহুর্তেই থমকে যায় সে।

"আ..আসিফ? "

আসিফ সানজির হাত ধরে বের হয়ে যাওয়া মুহুর্তে মুখ তুলে তাকায়। সামনে দাঁড়ানো অতি পরিচিত ব্যক্তিকে দেখে সে থমকায়। এনি হচ্ছেন এমপি সাহেবের চাচার বন্ধু আখতারুজ্জামান। ইশ্ সময়ই সময়। এখনই এই ব্যাটার এখানে আসতে হলো। আসিফ বুঝতে পারছে সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। তবে,সে নিজের নার্ভাসনেস প্রকাশ করে না।

"সেলিমের ভাতিজি তুমি না? সা..সানজি নাম? সান্নিধ্যের ছোট বোন।"

সানজি আসিফের হাতের তালুতে নখ বসিয়ে দেয় চেনা পরিচিত মানুষের সম্মুখীন হতেই। শিরদাঁড়া বেয়ে তার শীতল স্রোত বেয়ে যায়৷ কোনমতে, মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাতেই বয়স্ক লোকটা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলেন,

"ওহ মাই গড!! তোমরা আমার কক্ষে..??"

হোটেল ম্যানেজার সাজ্জাদ আলম চলমান পরিস্থিতি দেখে ঘামতে থাকেন। একদিকে কিছু মাস্তান তার হোটেলের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে আরেকদিকে কপোত কপোতী জালে পড়েছে আটকা। হচ্ছেটা কি আসলে? জোর গলায় চেঁচিয়ে উঠেন তিনি।

"আমার হোটেলে এসব কি চলছে??"

ম্যানেজারের চিৎকারে লিয়াকতের দল ঘুরে তাকাতেই দূর হতে তাদের শিকারীকে দেখতে পায়। সাথে সাথে গর্জন তুলে তারা ছুটে আসতে থাকে। এদিকে অথই সমুদ্রে বিপদসংকেত উপরে উঠে যেতেই আসিফ সানজির হাত শক্তভাবে ধরে সবকিছু উপেক্ষা করে দৌড় শুরু করে।

ঝড়ো হাওয়া এলোমেলোভাবে বইয়ে চলেছে। হেলেদুলে নড়ছে দুপাশের গাছগুলো। আকাশ হতে ঝরছে দু এক ফোঁটা করে বৃষ্টি। ম্লান রাত্রিতে দু'জন মানব মানবী দৌড়ে ছুটছে অজানা এক গন্তব্যে। সানজির পড়নে সাদা রঙের গোলাকার ঘেরওয়ালা কুর্তি সঙ্গে ওড়নাটা হাওয়ায় উড়ছে ছন্দ হারিয়ে।

"দু কামরার ফ্ল্যাট, ছোট সংসার, মাসে হাত খরচ চার হতে পাঁচ হাজার টাকা, সাথে সব শখ পূরণ ফ্রি হবে??"

"এগুলো কি আসিফ ভাই? আর আমরা কোথায় যাচ্ছি?"

"কাজী অফিসে।"

"জীবন বাঁচে না। এর মধ্যে আবার কে বিয়ে করবে?"

"আমরা বিয়ে করবো এখন।"

সানজির দৌড়ের গতি এক মুহূর্তেই ধীর হয়ে আসে। বিস্ময় ঘেরা চোখে সে তাকিয়ে থাকে আসিফের দিকে। অসংলগ্ন মুহুর্তে এমন ভারী একখানা কথা তার মাথার উপর দিয়ে যায়। বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠে। আসিফ ছুটে চলা কালে হাতে টান পড়তেই পিছু ঘুরে তাকায়।

"কি হলো?"

"এসব কি বলছো তুমি? আমরা বিয়ে করবো মানে?"

"এই মুহুর্তে বিয়ে ছাড়া গতি নেই। আখতার সাহেব গরম গরম খবরের হেডলাইন তৈরি করছে হয়তো।"

"কিন্তু তুমি তো আমার ভাই হও আসিফ ভাই।"

"দুনিয়াতে মায়ের পেটের ভাই পিতৃসমতুল্য হয়,আর বাদ বাকি সবভাই স্বামীতুল্য।"

"ছিঃ!! এই লজিক আপনি কোথায় থেকে পেয়েছেন?"

আসিফ সানজির হাত ফের পাকড়াও করে জোরগতিতে দৌড় শুরু করে। শুষ্ক গলা ভেদ করে বলে," নিজে তৈরি করেছি। কোনো আপত্তি আছে?"

সানজি পড়ে যায় বিপাকে। বুকের ভিতরে তার বাহিরের ন্যায় ঝড় শুরু হয়েছে। এমন ক্রান্তিলগ্নে বিয়ের প্রস্তাবে সে খানিকক্ষণের জন্য নিরব হয়ে যায়।

"তাড়াতাড়ি উত্তর চাই।"

"আমার চাহিদা যে বেশি আসিফ ভাই।"

"কত বেশি।"

"অনেক বেশি। তোমার কি সামর্থ্য হবে সেটা পূরণ করার?"

আসিফ পাশ ফিরে চায়। এলোমেলো চুলে ছন্নমতি নারীর চোখে চোখ রেখে বলে,"যেমন।"

"আমি বিশ্বস্ততা চাই।"

"আছে।"

"বিশুদ্ধ ভালোবাসা।"

"আছে।"

"প্রয়োজনীয় সম্মান।"

"অবধারিত।"

"জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এগুলোর মেয়াদকাল চাই।"

"আজীবন মেয়াদকাল।"

"আমি ঠঁকতে চাই না আর।"

"সে সুযোগ দিচ্ছি না আর।"

সানজি দৌড় থামায়। অনেকটা দূর এসে গিয়েছে তারা। চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলে,"ভালোবাসেন আমায়?"

আসিফ জবাব দেয় না। নিজের বিক্ষুব্ধ মনটাকে শান্ত করার প্রয়াস করতে থাকে। দুহাতে মুখ ঢেকে সে নিজেকে সংবরন করে। সানজিকে সে ভালোবাসে এই প্রশ্ন মনকে করতেই মন তাকে জবাব দেয় সেই পুরনো দিনের কথা। নিজেকে দমাতে চায় সে। কিন্তু বেহায়া মন সুর তুলে বলে,

"প্রথম দেখাতে আমি প্রেমে পরেছি তোমার,

দুই চোখে আন্ধার দেখি ঘুম আসে না আমার..

রাতের বেলা শুয়ে শুয়ে..

শুধু ভাবি তোমায় কিভাবে পাব আমি.."

এই দুঃসময়ে এমন গান মাথায় আসতেই লজ্জা পায় আসিফ। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে। অবশ্য মনকে দোষ দিয়ে খুব একটা লাভ নেই। সানজিকে যেদিন প্রথম দেখেছিলো সেদিন হতেই সে অহনার জায়গায় তাকে বসিয়েছে। এর একমাত্র জীবন্ত উদাহরণ রিমন। সে জানে গিটারের তালে আসিফ এই গানের সুর কতবার তুলেছে। কিন্তু সানজির সামনে তা থেকে গিয়েছে অপ্রকাশিতব্য।

"হ্যালো রিমন, মামাকে নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। আমি সানজিকে বিয়ে করতে যাচ্ছি। স্ট্যান্ড রোডে কাজি অফিসের কাছাকাছি। সান্নিধ্য ভাইদের জানাবি না। বিয়ের পর আমি নিজেই জানাবো। তাড়াতাড়ি।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প