রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৫৬

🟢

অন্তিমপাতা-০৩

সময়কাল নয়টা । ধরণীতে আজকের দিনে ফোটা প্রথম চকচকে রোদ্দুর তখন মাথার উপরে। প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে তীব্রতম দহন। গরমের ভাপে সকালের দিকেই মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাওয়ার উপক্রম। এদিকে, চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদে পিচঢালা রাস্তা যেন গলতে শুরু করেছে। গাছের পাতাগুলোও ঝিমিয়ে আছে নির্জীব হয়ে।

ফটিকছড়ি সদর থেকে একাধিক গাড়ি বহর রওনা হয়েছে নাজিরহাটের উদ্দেশ্য। বহরের সামনে পেছনে সুসজ্জিত নিরাপত্তা কর্মীর গাড়ির বেষ্টনী দ্বারা ঘেরা। ছুটছে উচ্চ গতিতে।

গাড়িতে বসে সাদা কাগজে লেখা এলাকাগুলোর নাম চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে শেহরিন। পরনে তার সাদা রঙের ফুলস্লিভ সালোয়ার কামিজ। মাথায় টানা ছোট ছোট ফুলেল নকশা করা একই রঙের ওড়না। চোখে মুখে নেই তার কোনো ভীরুতা। বরং একরাশ দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসে সে নিজেকে রেখেছে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

গাড়ি এসে পৌঁছায় নাজিরহাট বাজারে। ধূলো উড়িয়ে একে একে তিনটা গাড়ি এসে থামতেই আশেপাশে কিছু মানুষ কৌতূহলী চোখে এগিয়ে আসে। আসিফ আরহাম দুজন দুপাশে দাঁড়িয়ে সানজি শেহরিনকে সম্ভ্রমচিত্তে নামার সুযোগ করে দেয়। পাশে সারি সারি হয়ে দাঁড়ায় নিরাপত্তা কর্মীরা।

আসিফ আরহাম দুজনেই পরিচিত মুখ। নেতাসাহেবের সর্বদা সময়ের সঙ্গী। তাদের দেখামাত্র জনগণ উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে। মুহুর্তেই জমে উঠে ভীড়। কিন্তু মিসেস সান্নিধ্য বা সঙ্গে থাকা মেয়েকে তারা খুব একটা চিনতে পারেন না৷ কেউ কেউ কানাঘুঁষা করে এমপি সাহেবের স্ত্রী হিসেবে। কেননা এক্সডিন্টের পরে হসপিটালে সেদিন তাকে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করতে দেখা গিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ভিডিওতে ছড়াছড়ি। সাংবাদিকেরা উল্লেখ করে বলেছেন ইনিই মিসেস সান্নিধ্য।

শেহরিন মুহুর্তেই জমে যাওয়া ভীড় বাট্টা দেখে কিছুটা নার্ভাস হয়ে গেলেও পর সময়ে লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে দমায়। আসিফ আরহামদের নির্দেশনায় তারা নাজিরহাট বাজারের মেইন পয়েন্টে এসে দাঁড়ায়। এতে চারদিক হতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকজনও গুলো উৎসাহী নজরে এসে জমায়েত হয়।

শেহরিন মুখে হাসি প্রস্ফুটিত করে সুস্থির গলায় বলে,

" আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন আপনারা সবাই? আমাকে হয়তো চিনতে পারছেন না আপনারা তাই না?"

উপস্থিত জনতা কয়েক সেকেন্ডের নিরবতা পালন করা শেষে নিজেদের মাঝে গুঞ্জন তোলে। কানাকানি ফিসফিসানির মাঝে এক বয়স্ক লোক বাজারের ব্যাগ হতে ভঙ্গুর গলায় উচ্চারন করেন, "আমাগো এমপি সাহেবের সহধর্মিণী আপনে মা।"

শেহরিন বৃদ্ধ লোকটার উত্তর শুনে নম্রহেসে বলে,"জ্বি।"

"এমপি সাহেবের অবস্থা কি? আমরা কি তাকে পাবো না ম্যাডাম? তার দিকে আমরা এতো আশা নিয়ে চেয়ে আছি। দয়া করে বলবেন, আপনি আমাদের কি কোনো দুঃসংবাদ দিতে এসেছেন?"

যুবক ছেলেটার প্রশ্নে উপস্থিত বাকি সবাই সমর্থন জানায়। আসিফ আরহাম কিংবা সানজি কেউই মুখে খোলে না। আজ সব দায়িত্ব এমপির সাহেবের স্ত্রীর। আর তাদের কাজ শুধু সঙ্গ দেওয়া। দেখা যাক মিসেস সান্নিধ্যের কত দম।

" আমি আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত। কিন্তু তার আগে বলুন, আপনাদের এমপি সাহেব তো এখন এমপি পদে নেই। সে তো এমপি পদ হতে ইস্তফা দিয়েছেন অনেক আগে। যতদূর জানি উপনির্বাচনে নতুন এমপিও এসেছেন। আপনারা সাবেক শব্দটা তাহলে তার ক্ষেত্রে ব্যবহার করছেন না কেন?"

"কিসের সাবেক ম্যাডাম? আমাদের কাছে তিনি এখনো এমপি হিসেবেই আছেন। তার সঙ্গে সাবেক শব্দ যায় না৷ আমরা তাকে চাই যে কোনোভাবে।"

"ম্যাডাম লিখিত আকারে তিনি হয়তো সাবেক, কিন্তু মৌখিক স্বীকারোক্তিতে তিনি আমাদের এমপি সাহেব।"

শেহরিনের ভিতরে স্বতঃস্ফূর্ত ভাব ফুটে ওঠে। ভিতরে চলমান দ্বিধা দ্বন্দকে সে হার মানায়৷ তাদের এমন বক্তব্য তাকে আরো সাহস জোগায় মনে। নেতাসাহেবের এদিক জুড়ে অবস্থান তাহলে বেশ শক্ত।

"আপনাদের এমপি সাহেব ভালো আছেন। আপনাদের দোয়া এবং ভালোবাসা যদি অটুট থাকে তাহলে নিশ্চয়ই তাকে পাবেন। আমি আপনাদের কোনো দুঃসংবাদ দিতে আসেনি বরং সাহায্য চাইতে এসেছি। মূলত তার প্রতিশ্রুতির ভার বহন করতে আজ আমার এখানে আসা। তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন, আপনাদের জন্য লড়বেন।"

শেহরিনের কথা শেষ হতে না হতেই একসঙ্গে সবাই উচ্ছ্বসিত হয়ে করতালি দেয়। আশেপাশে অনেকেই হৈ হৈ করে উঠে। পিছন হতে কেউ কেউ স্লোগানও শুরু করে। আসিফ দু'হাতের ইশারায় সবাইকে একটু শান্ত হতে বলে মিসেস সান্নিধ্যের কথা শুনতে বলে মনোযোগী হয়ে।

"ময়দানের যুদ্ধ কখনো একা সংগঠিত হয় না। এক্ষেত্রে অধিক সৈন্য লাগে। বিপক্ষ দলের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সাহস লাগে। এমপি সাহেব যদি সেনাপতি হয়ে থাকেন তাহলে আপনারা হচ্ছেন সৈন্য। সৈন্য ছাড়া কিন্তু সেনাপতি অচল। তার অতি দামি চকচকে তলোয়ারও তখন হয়ে যাবে মলিন। এক্ষেত্রে দরকার আপনাদের সঙ্গ,আপনাদের দেওয়া সাহস। আমি কি আশা করতে পারি আপনারা সেই সঙ্গ এবং সাহসটুকু আপনাদের এমপি সাহেবকে দিবেন?"

"জ্বি.. জ্বি আমরা সবাই প্রস্তুত।"

"আমি জানি না,উনি এমপি পদে থাকাকালীন সময়ে কি কি করেছে আপনাদের জন্য। তবে, আপনাদের একাগ্র সমর্থন দেখে আন্দাজ করতে পারছি একটু কিছু হলেও করেছেন৷ নয়তো এমন নিরন্তর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব নয়। তার হয়তো কিছু ব্যাড ইমেজ রয়েছে। অতিরিক্ত রাগ কিংবা ধৈর্য্যহীনতার পরিচয় দিয়েছে। যতটুকু আমি শুনেছি সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আর কি। তবে, আমি এগুলোতে বেশি অ্যাক্টিভ নয়,তাই জাজ করছি না। কিন্তু আমার অনুরোধ, আপনারা তার কাজকে অবমূল্যায়ন করবেন না।"

"আমরা বেইমান না ম্যাডাম। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত, গরিবদের জন্য যে একটু করে তাকে আমরা মাথায় তুলে রাখতে ভুলি না৷ আমাদের টাকা পয়সা না থাকলো, কিন্তু আমরা নিখুঁত ভালোবাসা এবং সমর্থন দিতে পারি। আমি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক। পাশের গ্রামে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করি। পেশাগত জীবনে আমি অনেক হ্যারাসমেন্ট হয়েছি দূর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে। সিন্ডিকেটের মধ্যে পড়ে গিয়েছি বারবারে।

এলাকার কিছু প্রভাবশালী এবং সেই স্কুলের ক্ষমতাবান হেড মাস্টার আমাকে নানানভাবে হয়রানি করেছে। আমি অনেকের কাছেই বিচার চেয়েছি কিন্তু পাইনি। উল্টো আমাকে এই কারণে ত্রিশ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে চাকরি বাঁচাতে হয়েছিল সেসময়। তবে,আমি ভিতরে ভিতরে মেনে নিতে পারছিলাম না এই অপকর্ম। অতঃপর একসময় সিদ্ধান্ত নেই এমপি স্যারের সঙ্গে স্বয়ং নিজে দেখা বা কথা বলবো। আমি তার কার্যালয়ে দুদিন গিয়েছি,প্রথম দিন তিনি কার্যালয়ে ছিলেন না। দ্বিতীয় দিন চেষ্টা করেছি। স্যারের লোকেরা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন কথা বলিয়ে দিবে।

তারা কথা রেখেছিলো। স্যারের সঙ্গে আমি দেখা করে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেছি প্রমাণ সহ। এখন মজার বিষয় হলো, স্যারের সঙ্গে দেখা করতে আমার দু'দিন লাগলেও স্যার আমার সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন দু'ঘন্টার মধ্যেই। স্যারের ক্রোধ আমি নিজের চোখ দেখেছি। তবে,গর্ব করে বলতে পারি,আমাদের ভালোর জন্য তিনি যদি খারাপ হন। তাহলে সেই খারাপ টাকেই আমরা ভালো হিসেবে গ্রহণ করে নিবো। আমাদের কোনো সমস্যা নেই।"

শিক্ষক মনজুর আলমের কন্ঠে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। শেহরিন সহ উপস্থিত সবাই তার কথা মুগ্ধ হয়ে শোনে। তন্মধ্যে সেই বয়স্ক লোকটা হাতের ইশারায় দেখায়," ওই যে ব্রিজ দেখতেছেন না মা? আগে কইল ব্রিজ আছিলো না৷ হাঁটু সমান ক্যাঁদো মাইখা হাট করবার আইছি, পোলাপান ইশকুলে গেছে। রোগী নিয়া হাসপাতালে যাওয়া সহজ আছিলো না। আরেক গাঁও দিয়া ঘুইরা আইছি। এহন দেহেন ব্রিজ হইয়া গেছে। আমাগো, এমপি সাব কইরা দিছে। এমনে এমনে তো আর চাই না তারে। হেই আমাগরে জন্য করে জন্যই তো তারে আমরা চাই।"

"অল্প বয়সী এই ছেলে যখন প্রথম এমপি পদে এলো। আমরা নিজেরা বেশ শঙ্কিত ছিলাম। নিজেরা নিজেরা সমালোচনা করতাম, হাঁটুর বয়সী ছেলে উন্নয়নের আর কি বুঝবে। অন্যসবার মতো সেও পকেট ভারী করে আসন দখল করে খাবে। মিথ্যা বলবো না,সত্যই আমরা এমনটা ভেবেছিলাম। এটা নিয়ে বেশ সমালোচনার ঝড়ও উঠেছিলো শুরুতে। কিন্তু এমপি সাহেব নিজ হতে এ সম্পর্কে কোনো বিবৃতি দেয়নি, সে কোনো টু শব্দ করেনি। বরং, সে কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছে,ভুল ভেঙেছে আমাদের। পরপর দু'বার ক্ষমতায় থাকা আজমতউল্লাহ সাহেব একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সময় নিয়েছিলো সাড়ে ছয় বছর। সেখানে এই অল্প বয়সী ছেলে াচার বছরে এমন এমন কাজ করেছে যেখানে আমরা তাকে সমর্থন দিতে বাধ্য। এটা নায্য অধিকার। আমাদের নিজেদের দরকারে তাকে প্রয়োজন। "

শেহরিন ভিতরে ভিতরে আপ্লুত হয়ে উঠে। নেতাসাহেবের প্রতি সাধারণ মানুষের এমন আস্থা, ভালোবাসা দেখে সে মুগ্ধ হয়। নিজেকে ধন্যবাদ জানায়, তার নেওয়া সিদ্ধান্তটা একদম সঠিক ছিলো। নেতাসাহেবকে যদি এই মুহুর্তে হেরে যেতো দিতো, তাহলে হয়তো এই মানুষগুলোও হেরে যেতো।

উপস্থিত জনতার সঙ্গে কথা শেষ করে এবার শেহরিনরা

নাজিরহাট বাজার এলাকার যুব উন্নয়ন ক্লাব ও চায়ের দোকানগুলোতে সবার সঙ্গে মতবিনিময় করে।

'যুব উন্নয়ন ক্লাব' এ প্রবেশ করে ভেতরে জনা পঁচিশেক তরুণদের ভোটের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

"ম্যাডাম,আমাদের প্রথম দাবি, বাজারের পাশে পরিত্যক্ত জমিতে একটি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান কেন্দ্র চাই। আমরা নিজস্বভাবে থিতু হতে চাই একটা জায়গায়। এছাড়া আমাদের নাজিরহাট মানিকপুর সংযোগ সড়কটা ভাঙা তা নিয়ে কেউ কথা বলে না। আমাদের চলাচলের খুব কষ্ট।"

"ইনশাআল্লাহ আপনাদের নায্য চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য আপনাদের এমপি সাহেব সর্বদা তৎপর থাকবেন। এছাড়া ফটিকছড়ির প্রথম ফোর লেন গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে সে অবশ্যই পদক্ষেপ নিবেন।"

"আপনাদের এই দাপটু প্রচারণাকে সম্মান জানাই। আমরা মাঠে নামব আপনাদের জন্য অবশ্যই।"

"ধন্যবাদ।"

নাজিরহাটের কার্যসম্পাদন করে শেহরিনরা এবার যাত্রা শুরু করে হারুয়ালছড়ি ও ভুজপুরের উদ্দেশ্য। এলাকা দুটোর রাস্তা কিছুটা দুর্গম। চারপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত, দূরে পাহাড়ের আবছা রেখা। প্রান্তিক কৃষকেরা নিজস্ব জমিতে ধানচাষে ব্যস্ত। দুচোখ ভরে শেহরিন সবকিছু দেখে যায়। কি নির্মলতায় ঘেরা সবকিছু। গ্রামীণ সৌন্দর্যে সে বিমোহিত হয়ে পড়ে।

"ভাইয়া এখানেই গাড়ি থামানো হোক। আর যেতে হবে না। "

"পায়ে হেঁটে যাবেন?"

শেহরিন মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে মৃদু হেসে বলে," হ্যাঁ।"

"আল্লাহ..আজ তুমি কি দিন দেখাচ্ছো? আমি যে আর সইতে পারছি না। রাজনীতির প্রতি আমার ভাবিজানের মনকে তুমি কিভাবে নরম করেছো? এ যে অসম্ভবের ছিলো। আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। ঘাম ঝরছে।"

"সানজি.. আপু.."

"মিথ্যে নয় মেয়ে। এ যে সত্যি অসম্ভবের। আপনার দ্বারা এতোকিছু মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না আমার পক্ষে। এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলছেন,সবার সঙ্গে মিশছেন। জিরো পার্সেন্ট রাজনৈতিক জ্ঞানকে তুড়ি মেরে হ্যান্ড্রেড পার্সেন্ট ইফোর্ট দিচ্ছেন। কিভাবে??"

"সব প্রশ্নের উত্তর বাসায় গিয়ে দিবো। এখন নামো তুমি আগে।"

"ভালোবাসার কবলে পড়লে জলদস্যুকেও নাদান বাচ্চা মনে হয়।"

শেহরিন তৎক্ষনাৎ আসিফের দিকে এক পলক তাকিয়ে সানজির দিকে ঘুরে বলে,"একদম ঠিক কথা বলেছো। জলদস্যুকেও নাদান বাচ্চা মনে হয়। তা নয়তো কি আর একা একা বিয়ে করার সাহস হয় কারো? তাও দুটো রাগী গম্ভীর ভাই থাকতে।"

আসিফ মৃদু কেশে উঠে। সানজি নিজের কথায় নিজে ফেঁসে গিয়ে আঁড়চোখে তাকিয়ে থাকে শেহরিনের দিকে। শেহরিন সানজির ভঙ্গিমা দেখে ফিক করে হেসে উঠে বলে,"হয়েছে হয়েছে আর লজ্জা পেতে হবে না। চলো এবার।"

মূল সড়কে গাড়ি রেখে নেমে পড়ে তারা গ্রামের মেঠো পথে।

নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে অধিকাংশকে রেখে মাত্র তিনজনকে বলে তাদের সঙ্গে আসতে। শেহরিন জীবনের এমন প্রথম সরু মাটির পথে হাঁটছে। রোদের আলোতে জ্বলজ্বল করছে চারপাশের জমিজমা। কি অপূর্ব সুন্দর। প্রখর রোদের মাঝেও বিশুদ্ধ হাওয়া তার আত্মশুদ্ধি করে। খুঁজে পায় সে শহুরে জীবনের সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের আকাশ পাতাল পার্থক্য।

গ্রামের এই মেঠো পথের ধারে ছোট ছোট মাটির বাড়ি। ঘরের দাওয়ায় বসে থাকা শ্রমজীবী নারীরা তীব্র গরমে হাতপাখা দিয়ে বাতাস খাচ্ছেন। হঠাৎ একসঙ্গে এতো মানুষের আগমন দেখে তারা হকচকিয়ে উঠেন।

"আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছেন আপনারা?"

মিষ্টিমুখের সুদৃশনা দুটো মেয়েকে দেখে বসারত নারীরা উঠে দাঁড়ানোর উদ্যত হয়। কিন্তু শেহরিন সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাত ধরে উঠতে মানা করে। আসিফ সহ বাকি সব পুরুষ মানুষ কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে।

"আমনে কেডায় মা?"

"বলুন তো কে আমি?"

"চিনবার হারি না।"

সানজি উৎসাহী গলায় বলে," আপনাদের আগের এমপি সাহেবকে তো নিশ্চয়ই চেনেন তাই না?"

একাধিক মহিলাগণের মধ্যে মধ্য বয়স্কা মহিলাটি তৎক্ষনাৎ জবাব দিয়ে বলেন," হ চিনি তো। এসকিডেন্ট হইছে হুনলাম।"

"নাম কি বলুন তো?"

মহিলাটি পাশের মহিলার দিকে তাকিয়ে নমুজ কন্ঠে বলে,

"সানিত্তো না কি জানি নাম, কইবার পারি না৷ মেলা কঠিন।"

সানজি শব্দ করে হেসে উঠে। মহিলাটির দিকে প্রফুল্ল গলায় বলে," হলেই হলো এক নাম। ইনি আপনাদের সেই সানিত্তো সাহেবের স্ত্রী। উনার হয়ে সে আপনাদের কাছে ভালোবাসা নিতে এসেছেন।"

সানজির কথা শোনামাত্র আশেপাশে সবাই শেহরিনকে আগ্রহ চোখে তাকিয়ে দেখতে থাকে। পাশে বসা মহিলাটি অবাক গলায় বলেন," ওমা..ওকি কতা। আমাগের এমপি সাহেবের বউ আমনে? তাও আবার আমগের কাছে?"

"আপনাদের জন্যই তো উনি এমপি হয়েছেন। আপনাদের কাছে না এসে পারি?"

রোদতপ্তে ঘামে ভেজা এক শুভ্রবর্ণা রমণীর দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে সবাই। কি সুন্দর নরম হাসি,কি সুন্দর তার কথার বচন। চোখে একরাশ নম্রতা। এতো ভদ্রসুলভ আচরণ। সবাই মুগ্ধ হয়ে যায় এক নিমিষেই।

মধ্য বয়স্কা মহিলাটি আপ্লুত চোখে তাকিয়ে শেহরিনের থুতনিতে হাত রাখেন। দ্বিধাহীন কন্ঠে বলেন," চান্দের টুকরা একখান। বাঁইচা থাক মা তুই। স্বামীর জন্যি আমাগরে দুয়ারে আইছাস। আমরা ক্যামনে ফিরাইয়া দিমু?"

"আমার স্বামীর জন্য দোয়া করবেন। উনি যেনো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আপনাদের মাঝে আবারো ফিরে আসতে পারেন। আপনাদের সমস্ত সুযোগ সুবিধা, সমস্যা গুলো দেখতে পারে। আপনাদের সমর্থনই আমাদের ভালোবাসা।"

একে একে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে শেহরিন। সব মহিলারা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। শেহরিন নিজেকে তাদের মাঝে নিঃসঙ্কোচে নিবেদন করে। মুখে সর্বদা সুলভ হাসি বজায় রেখে মাথা খানিকটা নুইয়ে তাদের আশীর্বাদ গ্রহণ করে নেয়।

ভুজপুরের আশেপাশে বাড়িতে গিয়ে দুয়ারে দুয়ারে দেখাসাক্ষাৎ সহ প্রয়োজনীয় প্রচারণা শেষ করে তারা যায়

বাগানবাজারের একটি জনসভাস্থলে। সময় তখন মধ্যাহ্ন ছাড়িয়েছে, তীব্র দাবদাহের মাঝেই উপস্থিত হয়েছে এই এলাকার সকল স্তরের মানুষ।

শেহরিনের মুখ লাল হয়ে উঠলেও কণ্ঠে ছিল না কোনো ক্লান্তি।

বরং সুস্পষ্ট স্বরে উপস্থিত সবার সঙ্গে বিনয়ী ভঙ্গিতে কথা বলে যায়।

"ম্যাম আমরা কিছু প্রশ্ন করতে চাই।"

"জ্বি।"

ভিড়ের মাঝে তিনজন সাংবাদিক সম্মুখে এসে দাঁড়ান।

হাতে থাকা মাইক্রোফোনটা শেহরিনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

"সাবেক এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খান বর্তমানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হসপিটালে ভর্তি। এই অবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের মতো দূর্গম সিদ্ধান্ত আপনারা কিভাবে নিয়েছেন?"

" আমাদের বিশ্বাস উনি কাঙ্ক্ষিত সময়ের আগেই সুস্থ হয়ে উঠবেন। সঠিকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হবেন।"

"তাহলে কি তার প্রার্থীতা বাতিল করা নিয়ে যে গুঞ্জন উঠেছে সেটা মিথ্যা?"

"প্রার্থীতা বাতিল নিয়ে মিডিয়ায় কোনো কথাই বলা হয়নি। গুঞ্জন সৃষ্টি হলো কিভাবে? আমরা কেউ তো এই নিয়ে কোনো প্রকার কথা বলিনি।"

"ম্যাম বিপক্ষে দলের পদপ্রার্থী নাসির চৌধুরীর পক্ষ হতে আমরা এমনটা শুনেছি। তার দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন,সাবেক এমপি সাহেব আসন ছেড়ে দিচ্ছেন।"

"এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট কথা। এমন কিছুই হচ্ছে না।"

"ম্যাম তাহলে কি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আপনিই প্রচারনার কাজ চালিয়ে যাবেন?"

"ইনশাআল্লাহ, যতটুকু পারি। চেষ্টা করে যাবো।"

"জয়ের ব্যাপারে কতটুকু আশাবাদী।"

" পজিটিভই ধরে রাখছি। আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ ভরসা।"

"আজকে প্রচারণার অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো?"

শেহরিন মুখে হাসি রেখে ধীর কন্ঠ বলে,"জ্বি খুবই ভালো।"

"সাবেক এমপি সাহেব উন্নয়নের দিকটা কেমনভাবে দেখছেন ম্যাম?"

"এটার উত্তর সাধারণ জনগনের কাছে রয়েছে । তবে,আমি যতটুকু দেখেছি আজকে,তিনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন আমার মনে হয় উনি সৎভাবে কাজ করে গিয়েছেন। এতোগুলো প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ কথা নয়। আমি অবশ্যই তার উন্নয়নমূলক সকল কাজকে সমর্থন করি। ধন্যবাদ।"

বিজ্ঞাপন

পড়ন্ত বিকেলের আবছা আলোতে জনসমর্থনের কার্য শেষ করে আজকের মতো প্রচারণার সমাপ্তি ঘটে। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় বাগানবাজার। নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝে দাঁড়িয়ে সান্নিধ্যের যোদ্ধারা জনতার অভিবাদন গ্রহণ করে। ফুটে ওঠে শেহরিনের স্বতন্ত্র নেতৃত্ব ও অদম্য সাহস।

"স্যালুট ভাবিজন, নেতাসাহেবের যোগ্য নেত্রীসাহেবা আপনি। রাজনীতিবিদের সঙ্গে বসবাস আপনার, না চাইলেও রাজনীতির হাওয়া গায়ে তো লাগবেই। আপনার আজকের সমস্ত দক্ষতাই প্রমাণ করে, আপনি সান্নিধ্যের অর্ধাঙ্গিনী।"

______________________________________

নির্বাচনী তোড়জোড়ের মাঝে দেখতে দেখতে মার্চ পেরিয়ে আসে

এপ্রিল। প্রচার প্রচারণা, লিফলেট, পোস্টারে পুরো শহর ছাপিয়ে গিয়েছে। বিপক্ষে দলেরও আয়োজন কম নয়। বেশ শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে নাসির চৌধুরী নিজেও। জনগণের মাঝে কান পাতলে শোনা যায়, এবার বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে চলেছে। কে কাকে হারিয়ে মূল আসন দখল করবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ভার্সিটি শেষ করে বাসায় পৌঁছায় শেহরিন। শাওয়ার শেষে মেয়েকে খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় সে। অতঃপর শেফালীকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে ঝটপট রেডি হতে শুরু করে।

"ভাবি তুমি ক্লান্ত হইতাছো না? এতোকিছু ক্যামনে কি করো?তোমারে দেইখাই আমার মাথা ঘুরান্টি দিতাছে।"

"ক্লান্ত মনে করলো ক্লান্ত। না মনে করলে কিছুই না।"

"তারপরেও দু'দন্ড বসার জো নাই তোমার।"

"দুপুরে সবচেয়ে প্রিয় ছিলো আমার ভাতঘুম। ছোটবেলার অভ্যাস। এখন যদি আমি বেডে শুয়ে পড়ি সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে যাবো। একারণে তাই বেড থেকে দূরে আছি। কাজের মধ্যে থাকলে ঘুম ভাবটা আর আসবে না।"

"আপনারে শুরুতে যা দেখছিলাম আর এহন বছর না ঘুরতেই আপনারে যা দেখতাছি, সত্য কথা মিলাইতে পারতেছি না। তবে, মেয়ে মানুষের ধর্মই এইডা।

"যখন যে পরিস্থিতি আসে সেই পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়ার নামই মেয়ে মানুষ তাই তো?"

"হয়.. হয়।"

শেহরিন রেডি হয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নেয়। হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বলে,"সানজি আপু একটু পরেই আসবে। শাহমিকাকে আজকে বাইরে নেওয়ার দরকার নেই। রাতে ওর বাবার কাছে নিয়ে যাব।"

"আইচ্ছা।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

পুরো বিকেল কেটে যায় ব্যস্ততায়। নানান মানুষের সাথে নতুন করে ঘটে পরিচিতি। সুয়াবিল, দৌলতপুর হতে প্রচারণার কাজ সেরে হসপিটালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেজে যায় রাত সাড়ে আটটা। মাঝখানে পড়েছিলো আবার ঘনঘটা জ্যাম। সব কিছু পেরিয়ে শেহরিন শাহমিকাকে নিয়ে অবশেষে এসে থামে তার মানুষটার কাছে।

মিসেস নাজনীন ছেলের কাছে এসেছিলেন বিকেলে। তার কাছে কিছুটা সময় কাটিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন রিমনকে। সেখানেও বেশ কিছুক্ষণ পার করে রাত হয়ে যাওয়ার কারণে সে বিদায়ী পথে যাত্রী হন। কিন্তু মাঝপথে দেখা হয়ে যায় তার আদুরে নাতনীর সঙ্গে।

"আল্লাহ..আমার দাদুমণি এসেছে?"

"আর রাখতে পারছি না। বাবা..বাবা বলে অস্থির করে ফেলছে।"

"যাও..যাও নিয়ে যাও।"

"আপনি আসেন আম্মা।"

"অনেকটা সময় থেকেছি। কালকে সকালে ইনশাআল্লাহ আবার আসবো।"

"ড্রাইভারকে বলি তাহলে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে?"

"ব্যস্ত হতে হবে না মা। মোজাম্মেল গাড়ি নিয়ে এসেছে।"

"আচ্ছা সাবধানে যাবেন।"

শেহরিন শাশুড়ীকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসে সামনে। অতঃপর উষ্ণ আলিঙ্গন সেরে বিদায় দিয়ে মেয়েকে নিয়ে যায় সরাসরি কেবিনে। সান্নিধ্য রিমন দুজনকেই দুদিন আগে কেবিনে শিফট করা হয়েছে। সম্ভবনা রয়েছে কালকের মধ্যে ডিসচার্জ করে দেওয়ার।

শব্দবিহীন দরজা টেনে শেহরিন প্রথমে উঁকি দেয় ভিতরে। সান্নিধ্যেকে শুয়ে থাকা দেখে সে আবার মাথা বের করে নেয়। মেয়েকে কোলে রেখে তার মাথাটা এগিয়ে দেয় দরজার ফাঁকে।

শাহমিকা উঁকি দিয়ে বাবাকে দেখে প্রথমেই ঠাহর করতে পারে না কিছু।

অন্যদিকে সান্নিধ্য চোখ বন্ধ করা মুহুর্তে কিছু একটা ভেবে সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে তাকায়। দরজা সম্মুখে ঘাড় ঘুরাতেই দেখতে পায় কুচকুচে কালো মার্বেলের মতো গোল গোল দুটি চোখ তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

সান্নিধ্য এই মুহুর্তে আচানক শাহমিকাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে উঠে। শীতল চোখদুটো তার স্থির হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। আজ কতদিন পর মেয়ের টুকটুকে মুখটা দেখছে সে। শোয়া ছেড়ে আধশোয়া হয়ে বসতেই ভেসে আসে সেই মধুর ডাক।

"বাবা.."

ঠোঁট দুটো বিরবির করে নেড়ে ডেকে উঠে শাহমিকা। কিছু সময়ের বিচার বিশ্লেষণে অবশেষে সে নিশ্চিত হয়েছে এটাই তার বাবা। শেহরিন মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে উঁকি দিয়ে ক্ষীণ শব্দ করে হেসে উঠে। শাহমিকা দু'হাত বাবার দিকে প্রসারিত করতেই মা মেয়ে দুজনেই ছুটে যায় তাদের বটবৃক্ষের কাছে।

সান্নিধ্যের ডান হাতে অপারেশন করার কারণে পুরো কবজি ব্যান্ডেজে মোড়ানো। সেজন্য সে আগত অতিথিদের জন্য

বাম হাত প্রসারিত করে। সাদরে সম্ভাষণে শেহরিন শাহমিকা দু'জনেই এসে ঝড়ের বেগে তার বুকের বাম পাশে লুটে পড়ে। মেয়ে বাবাকে পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বেসিত হয়ে উঠে। গলা ধরে বাবা বাবা ডাকে মুখোরিত করে তোলে পুরো কেবিন রুম।

সান্নিধ্য মা মেয়ের গালে কপালে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে তোলে। নিজের বুকের উষ্ণতার মাঝে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দুটো রত্নকে আগলে নেয় পরম যত্নে।

শেহরিন তার নেতাসাহেবের বুকের মাঝে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে সুস্থির নিঃশ্বাস ছাড়ে। সারাদিনের ক্লান্তি তার উবে যায় মুহুর্তেই। প্রশান্তিতে নিজের শক্ত খোলস ছেড়ে নরম মোমের ন্যায় গলে যায় সে। তার নেতাসাহেবের কাছে সে এক অবলা, কোমল, ছন্নছড়া নারী। যে শুধু ভালোবাসা আদর আর যত্ন ছাড় কিছুই বোঝে না। সে নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দেয় এই মানুষটার অধীনে। এই মানুষটা তার মনের কথা সব জানে, সব বোঝে,ঝরঝর করে পড়ে ফেলে একদমে।

আদর আহ্লাদের পর্ব চলতে থাকে অনেকক্ষণ ধরে। অতঃপর সান্নিধ্যের ডান হাতে কনুইয়ের মাঝে শাহমিকা নিজের স্থান করে নেয়। এটা ওটা টেনে নিয়ে সে আপনমনে খেলতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। সান্নিধ্য সাবধানে মেয়েকে ধরে বাম হাতে শেহরিনকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখে।

শেহরিন গুটিশুটি পাকিয়ে নেতাসাহেবর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থেকে আজকে দিনে দিনে কি কি করেছে সব কুটুর কুটুর করে বলতে শুরু করে। সারাদিনের সব জমানো কথা সে একদম গুছিয়ে নিয়ে উগড়ে দিতে থাকে তার ব্যক্তিগত শ্রোতার নিকটে। অপরদিকে সান্নিধ্যও চুপচাপ মনোযোগ সহকারে তার সবকথা শুনে যায়।

"রাজনীতি সম্পর্কে তাহলে আপনার বর্তমান অভিব্যক্তি কি?

" অভিব্যক্তি..উম্ একটু কনফিউজড। রাজনীতির এতোগুলো খারাপ দিকের মধ্যে একটা ভালো দিক হচ্ছে এখানে সরাসরি সাধারণ মানুষদের সঙ্গে কানেক্টেড হওয়া যায়। সবার সাথে মেশা যায়, কথা বলা যায়। তাদের জীবনের সুখ কিংবা দুঃখের অংশীদার হওয়া যায়। আমার এই বিষয়টা খুব ভালো লেগেছে।"

" তুমি তাদের ভালোবাসা পেয়েছো?"

"অফুরন্ত ভালোবাসা পেয়েছি। অভিয়েসলি, সেটা আপনার কারণে।"

"নেগেটিভ কিছু ফেস করেছো?"

"পজিটিভের পাশাপাশি নেগেটিভ থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

হ্যাঁ কিছু নেগেটিভ ফেজ ছিলো বাট আমি যখন পজিটিভ রেসপন্স বেশি পেয়েছি তখন আর নেগেটিভ ফেজটাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। বরং এটা থাকা জরুরি মনে করেছি।"

সান্নিধ্য শেহরিনের মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে শান্ত গলায় বলে,

"অ্যাটলিস্ট তুমি এখন এটা মানতে বাধ্য যে,তোমার নেতাসাহেব শুধু ভাষণই দেয় না,কিছু কাজও করে।"

"হু।"

"হয়নি জোরে বলো।"

"কি বলবো?"

"স্বীকার করতে কষ্ট হচ্ছে?"

"আমাকে রাজনীতি ভালোবাসতে বলবেন না।"

"বলিনি। জাস্ট স্বীকারোক্তি চেয়েছি।"

"দিতে বাধ্য নয়।"

"তার মানে,তোমার ধারণা পুরোপুরি কাটেনি।"

"নাইন্টি পার্সেন্ট পলিটিশিয়ানরা এই কাজগুলোই করে।"

"তাহলে বাকি টেন পার্সেন্টে আমি আছি?"

"হু।"

"তাও স্বীকারোক্তি দিবে না?"

"না।"

"ভাবছি,সামনের ইলেকশনে তোমাকে এমপি পদে দাঁড় করাবো।"

"যদি তাতে আপনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হন,ড্যামেন শিউর, আপনার চেয়ে ভোট আমি বেশি পাবো।"

সান্নিধ্য কিঞ্চিত ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে ফেলে। শেহরিন মুখ তুলে তার নেতাসাহেবের শীতল চোখে চোখ রাখে। দু'জনের চোখের দৃষ্টি খানিক সেকেন্ডর জন্য স্থির হয়।

"ধন্যবাদ নেতাসাহেব, আপনার সততা আপনার ওয়াইফকে সম্মানিত করেছে। মানুষের ভালোবাসা পাইয়ে দিয়েছে। এটা অনেক অনেক বড় একটা পাওয়া। কাজের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অ্যালিগেশন ছাড়া মানুষের ভালোবাসা পাওয়া মানে অসাধ্য সাধণ করা। এটা অর্জন করা মুখের কথা নয়। আপনার লয়ালিটি আমাকে কম্ফোর্ট করেছে। আমি মাথা উঁচু করে মানুষের সঙ্গে মিশতে পেরেছি,তাদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। ওভারঅল,থ্যাংকিউ সো মাচ ফর এভরিথিং।"

ঘন্টাদুয়েক এর মতো সময় ব্যয় হয়। বাবা মেয়ের মোলাকাত শেষ হতে হতে রাত দশটার বেশি বেজে যায়। শেহরিন তার কথার ঝুলি ফাঁকা করে অবশেষে উঠে দাঁড়ায়। শাহমিকা বাবাকে ছেড়ে যাবে না,এই নিয়ে কান্নার রোলও বইয়ে যায় তার মধ্যে। কোনমতে এটা সেটা বুঝিয়ে সুঝিয়ে শেহরিন কৌশলে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

তাদের যাওয়া সাড়া,এদিকে আসিফ হন্তদন্ত পায়ে ছুটে আসে কেবিনে। ব্যস্তগলায় বলে, "ভাই আমার শ্বশুর সাহেব আসছে আপনাকে দেখতে।"

"তোমার শ্বশুরের এসময় আসার কি দরকার?"

"জানি না।"

"বলো যে, আমি ঘুমিয়েছি।"

"নিচে ভাবির সাথে দেখা হয়েছিলো।"

সান্নিধ্য দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বেডে শুয়ে পড়ে। গায়ের উপর কভার শিটটা টেনে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, "দুই মিনিট পর কোনো সিস্টারকে পাঠিয়ে দিবে। তাকে বলবে, বাবার সামনে এসে যেন বলে,পেশেন্টের সঙ্গে বেশি কথা বলা যাবে না।"

"ঠিক আছে।"

শাহজাহান খান যখন কেবিনে প্রবেশ করেন সান্নিধ্য তখন ডান হাত ছড়িয়ে রেখে বাম হাত চোখের উপরে রেখে ঘুমের ভাণ করে। কিন্তু চতুর সাবেক মেয়র সাহেব সেটা ঠিকই ধরে ফেলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে একটা চেয়ার টেনে পাশে বসেন। থমথমে গলায় বলেন,

"ঘুমাওনি এটা জানি। শুধু শুধু অভিনয় করার প্রয়োজন নেই।"

"আমি অভিনয় করি না৷ এমনি চোখ বন্ধ করে আছি।"

"চোখ খুলে আমার দিকে তাকাও।"

" বলো শুনছি।"

"কেমন বোধ করছো এখন?"

"ভালো আছি।"

"এ যাত্রায় বেঁচে গিয়েছো। সাহস তো আরো বাড়লো মনে হচ্ছে। সামনে আরেকটা দূর্ঘটনাতে তাহলে ইজিলিই অংশগ্রহণ করা যায় তাই না?"

"মানে?"

শাহজাহান সাহেব কপাল কুঁচকে তাকান। উঁচু কন্ঠে বলেন,"মানে বুঝতে পারছো না তুমি? রিমন না করার পরেও কেন শোনোনি তুমি ওর কথা ? লিয়াকতকে কি অন্যভাবে শায়েস্তা করা যেতো না? সবসময় তোমার মাথা গরম হয়েই থাকে না? অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি না করলে তোমার পেটের ভাত হজম হয় না? সব জায়গায়তেই তোমার হিরোগিরি দেখাতে হবে।"

সান্নিধ্য বুঝতে পারে বাপজান রিমনের থেকে সমস্ত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে এসেছে। হাতের আড়ালে কপাল ভাঁজ করে সে চোখ বন্ধ রেখেই ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে ধরে। এদিকে দুমিনিট পার হয়ে চার মিনিট হয়ে যাচ্ছে তাও আসিফের পাঠানো সিস্টারের খবর নেই।

"লাগাম টানো নিজের সান্নিধ্য। এতোটা ডেস্পারেট হওয়ার ফলভোগ করেও তোমার শিক্ষা কেন হয় না আমি বুঝি না৷ ছোটবেলা হতে মারামারি কাটাকাটি করে এসে এসে এটা তোমার রক্তে মিশে গিয়েছে। তা নয়তো এতোকিছুর পরেও তুমি কেন নিজেকে শুধরাও না। এই যে এখন কথাগুলো বলছি, এগুলো আমি বেকার বলছি। তোমাকে হাজার বুঝানোর পর যদি নাসিরের সামনে দাঁড় করানো যায়। তুমি সব গিলে খেয়ে তার গলা চেপে ধরবে। আমি যে কথাগুলো বললাম সেগুলোতে তোমার কোনো ভ্রু'ক্ষেপই থাকবে না। আমার গোটা বংশে তোমার মতো এমন অধৈর্য্য অস্থিতিশীল মাথাগরম মানুষ কেউ ছিলো না। তুমি কিভাবে এমন হলে সত্যি বুঝতে পারি না।"

"তুমি হয়তো এমন ছিলে আগে সেজন্য আমি এমন হয়েছি। এখন ভালো হয়ে গিয়েছো।"

ছেলের লাগামহীন কথায় শাহজাহান সাহেব তেঁতে উঠেন। রাগান্বিত স্বরে বলেন,"শাট আপ..আমি কখনোই তোমার মতো ছিলাম না। এসব আমার সঙ্গে যায় না।"

মিনিট দশেক এর মতো শাহজাহান সাহেব ইচ্ছেমতো সান্নিধ্যেকে ধুতে থাকেন তার মতো করে। দু একটা ঝাড়িও মারেন রয়ে সয়ে। ছেলের বেপরোয়া ভাবটার প্রতি তার যেসব ক্ষোভ ছিলো সব একে একে উগড়ে দেন তিনি।

তার ঠিক পনেরো মিনিট এর মাথায় আসিফ সিস্টার নিয়ে এসে হাজির হয়। সিস্টার আসিফের শেখানো মতো নম্র গলায় বলেন,

"স্যার পেশেন্টের সঙ্গে বেশি কথা বলা যাবে না। উনার রেস্ট প্রয়োজন।"

শাহজাহান সাহেব বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলেন,"পেশেন্টের রেস্ট নামে মাত্র। তাকে বলুন, এক জায়গায় গন্ডগোল লেগেছে যেতে হবে। এখনই রিভলবার নিয়ে ছুটবে। যদি পারেন, ডক্টরকে একটু বলবেন, মাথা ঠান্ডা করার কোনো মেডিসিন থাকলে সেটা যেন তাকে সাজেস্ট করা হয়।"

সান্নিধ্য আসিফ এবং সেই সাথে নার্সটি চুপ করে শাহজাহান সাহেবের হনহনিয়ে বের হয়ে যাওয়া দেখে। আসিফ কাচুমাচু ভঙ্গিতে শুকনো ঢোক গিলে বলে,

"শ্বশুর সাহেব কি বেশি বকাবকি করেছে আপনাকে ভাই?"

" উনাকে নিয়ে কি রেস্টুরেন্টে চাইনিজ খেতে গিয়েছিলে তুমি?"

আসিফ এক নজর নার্সের দিকে তাকিয়ে জ্বিব কেটে বলে,"ছিঃ ছিঃ। না ভাই, আমার তো বউ আছে। এরকমটা ভাবছেন কেন?"

" দুই মিনিটের জায়গায় বাইশ মিনিট লাগালে ভাবাটা কি স্বাভাবিক নয়? এখন আসার প্রয়োজন কি?"

"আসলে.."

"কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাই না। অতিরিক্ত রেস্ট নিয়ে ফেলেছি হজম করতে পারছি না। রুম ক্লিয়ার করো। নয়তো দুজনকেই শ্যুট করে দিবো।"

আসিফ ফিসফিস কন্ঠে নার্সটির দিকে তাকিয়ে বলে,"চলুন। মাথা গরম হয়ে গিয়েছে আবারো। আর হ্যাঁ ডক্টরকে কিন্তু অবশ্যই বলবেন মাথা ঠান্ডা করার মেডিসিন সাজেস্ট করতে। মেডিসিন না থাকলে তেল টেল হলেও চলবে।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প