উপসংহার—(শেষাংশ)
"মায়া কি?"
"খুব সহজ উত্তর। ছোট শব্দ কিন্তু ভারত্ব অনেক। মায়া হলো পরের জন্য নিজের এক টুকরো আত্মা রেখে দেওয়া। যেমনটা মা রাখে সন্তানের মধ্যে, বন্ধু রাখে বন্ধুর হৃদয়ে, কিংবা একজন প্রেমিক রাখে প্রেমিকার জীবনে।
কিন্তু সমস্যাটা হয় তখন, যখন আমরা ওই মায়ার সুতো দিয়ে নিজেকে বেঁধে ফেলি। মায়ার জালে এমনভাবে আটকে যাই যে, নিজের পাল ছেড়ে পরের নৌকার মাস্তুলে ঝুলতে থাকি। নিজের পথ ভুলে পরের চিহ্নিত পথে হাঁটি। তখন এই মায়াই হয়ে ওঠে এক বিষাদ মাখা কারাবাস।"
শেহরিন টের পায় সেই বিষাদ মাখা কারাবাসের অনুভূতি। যার ফলে চোখ দিয়ে টুপ করে ঝড়ে পরে তার এক ফোঁটা নির্মেদ পানি। নিজের মনের সঙ্গে কথোপকথনের মাঝে সে আবেগী হয়ে উঠে। ভিতরটা পুড়ে যায় নরম এক যন্ত্রণায়। হাতের লাগেজটা সে শক্ত করে চেপে ধরে পুরো রুমের কোণা চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে আরো একবার।
আজ তার ছোট্ট এই সংসার ছেড়ে যাওয়ার দিন। আসল নীড়ে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড়। কাল রাত হতেই প্যাকিং শুরু হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সব রাতেই স্থানান্তর করা হয়ে গিয়েছে সুখনিবাসে । এখন শুধু বাকি ঘরের সমস্ত ফার্নিচার। যেগুলো কালকে নিয়ে যাওয়া হবে। আজকের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে সব কাজ।
শাহজাহান সাহেব হুট করে কালকে রাতে ফোন দিয়ে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন নেতাসাহেবকে। জোরগলায় আদেশ দিয়ে বলেছেন, বউ বাচ্চা নিয়ে এক্ষুণি সুখনিবাসে ফিরতে। সে কোনো কথা, কোনো প্রকার এক্সকিউজ শুনতে চান না। যদি নেতাসাহেব সেই আদেশ অমান্য করে তাহলে,সে নিজে গিয়ে বউমা নাতনীকে নিয়ে আসবে।
সান্নিধ্য চেষ্টা করে বাবাকে শান্ত করে বুঝাতে। তারা অতি শীঘ্রই ফিরবে এই আশ্বাস অনেকবার দিলেও তা বিশেষ একটা কাজে দেয় না। শাহজাহান সাহেব নিজস্ব সিদ্ধান্তে অনড়। সে কোনোভাবেই কোনো কিছু মানতে নারাজ।
সান্নিধ্য বাবার হঠাৎ এমন একরোখা সিদ্ধান্তে প্রথমে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হলেও পরবর্তী সময়ে বুঝতে পারে এটা তার একার কাজ নয়। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাদেরকে বাসায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। এর পিছনে কাদের হাত রয়েছে সেটাও স্পষ্টতই বুঝতে পারে। বাবাকে দিয়ে তাকে কড়া হুশিয়ার দিচ্ছে যাতে সে মানা না করতে পারে কোনোভাবে।
অগত্যা নেতাসাহেব বাধ্য হয়ে রাজি হয় সুখনিবাসে ফিরতে। নির্বাচনের কথা ভেবে সে আর বাড়তি ঝামেলা করতে চায় না৷
শাহজাহান সাহেব ছেলের রাজি হওয়া মাত্র গাড়ি পাঠিয়ে দেন। কিন্তু নেতাসাহেব শেহরিন শাহমিকাকে নিয়ে ভোরে ফিরবে বলে জানিয়ে সেই গাড়িগুলোতে প্রয়োজনীয় সব জিনিস পাঠিয়ে দেয় আগে।
সেই থেকে শেহরিনের ঘুম নেই চোখে। আনন্দ, কষ্ট, চিন্তা তিনটার সংমিশ্রণে আবিষ্কার করে আজকের দিনটা। আজ ছেড়ে যাওয়ার দিন, আজ নতুনভাবে প্রত্যাবর্তনের দিন,আজ নেতাসাহেবের যুদ্ধের দিন।
একদম খালি হাতে এসেছিলো সে এই অ্যাপার্টমেন্টে। কিছু জানতো না বুঝতো না কত ভয়ে ভয়ে কেটেছে দিনগুলো। দীর্ঘ রাত্রির নিঃসঙ্গতা, প্রতি ভোরে আলো আঁধরির খেলা, কঠিন সেই সময়, কঠিন সেই মুহুর্ত। ইশ্!! ভাবলেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠে।
অতঃপর নিজেকে অল্প অল্প করে লোহার ছাঁচে গড়ে তোলা, নিজস্ব প্রচেষ্টায় সংসারের হাতেখড়ি নেওয়া, ধীরে ধীরে সবকিছু আয়ত্তে নিয়ে আসা। রক্তে মাংসে গড়া এক ভ্রুণকে বুকের মাঝে স্থান দেওয়া। কত কি!
এই ছোট্ট সংসার শেহরিনকে দুহাত ভরে দিয়েছে। তাকে একজন সংসারী নারী, একজন মা,একজন স্ত্রী হিসেবে স্বয়ং সম্পূর্ণা করেছে। যে হারের ব্যর্থতা নিয়ে সে এখানে হাজির হয়েছিলো সেই হারকে হারিয়ে দিয়ে আজ তাকে পরিপূর্ণ করে গড়ে তুলে দিয়েছে। কৃতজ্ঞ না হয়ে পারা যায়?
এই যে,বুকের ভিতরে অসম বেদনায় দগ্ধ হয়ে সে দ্বিগবিদিক হারিয়ে দেয়ালগুলো স্পর্শ করে যাচ্ছে। কি যে কষ্ট হচ্ছে সেটা সে প্রকাশ করতে পারছে না। শুধু চোখের পানিতে গাল ভিজিয়ে তুলছে চুপিসারে।
কিচেন হতে ভেসে আসা ব্যস্ততার সুর, প্রেশার কুকারের সিটি, শেফালীর তীক্ষ্ণ ধ্বনি। ড্রয়িংরুমে চায়ের আড্ডা, হাসির প্রতিধ্বনি, বারান্দার গ্রিলে চাঁদ দেখার অসংখ্য সন্ধ্যা। সব আজ স্মৃতির কৌটায় মুখবন্দি। এই অ্যাপার্টমেন্টে অন্য কেউ আসবে, অন্যকেউ পাতবে ছোট্ট সংসার। ঢেকে যাবে তার স্পর্শ, তার ভালোবাসা, তার আবেশিত কুন্ঠা।
মায়া এমনই এক শিকড়, যা শুধু মানুষে বা প্রাণে নয় জড় বস্তুর সঙ্গেও গেঁথে যায় অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে। আর যখন সেই মায়ার বন্ধন ছিঁড়ে যায়, তখন সৃষ্টি হয় শূন্যতা। আর এই শূন্যতা এতটাই গভীর হয় যে, নিজের কান্নার শব্দও গুঞ্জন হয়ে ফিরে আসে বারেবারে । ব্যথাটা শুধু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে চোখের দৃষ্টিতে, হাতের স্পর্শে, পায়ের চলায়। প্রতিটি শ্বাসে ধরা পড়ে সেই অনুপস্থিতির গন্ধ।
"শেহরিন.."
শেহরিন পুরুষালি গলার ব্যস্ত ডাক শুনে পিছু ঘুরে তাকায়। চোখ তার লাল টকটকে, জলে ভরা। চেহারায় নেমে এসেছে এক ধরনের বিধ্বস্ততা। সান্নিধ্য দরজা ছেড়ে ভিতরে প্রবেশ করা মাত্র শেহরিনকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। ব্যস্ত স্বর তার রুখে যায় মুহুর্তেই। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলে, "শেহরিন কি হয়েছে তোমার? কান্না করছো কেন তুমি?"
নেতাসাহেবকে দেখামাত্র শরীর কেঁপে ওঠে শেহরিনের। অজান্তেই মুখ হতে বেরিয়ে আসে অস্ফুট এক সুর। দুচোখে ভরা জল নিয়ে লাগেজ ফেলে সে ছুটে যায় সান্নিধ্যের কাছে। দৌড়ে গিয়ে দুহাতে জাপটে ধরে তার গলা। মুখ লুকিয়ে ফেলে সুঠাম বুকের মাঝে।
এক মুহূর্ত লাগে না তার নিঃশব্দ কান্নাকে শব্দে মুখোরিত করতে। ভিতরে জমানো ছেড়ে যাওয়ার কষ্টটা সে উগড়ে দেয় বাঁধাহীনভাবে। ভেঙে পড়ে সে কান্নায়।
সান্নিধ্য অবাক হয় শেহরিনের এই ভঙ্গুর রূপ দেখে। এমন বাচ্চাদের মতো উচ্চশব্দে কান্না সে আগে কখনো কোনো পরিস্থিতিতে তার অর্ধাঙ্গিনীকে করতে দেখে করেনি। ঝরঝরিয়ে কান্না করছে সে। মনে হচ্ছে তার অতীব প্রিয় জিনিস হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে নির্দয়ভাবে। এতোটা কঠিন মায়ায় সে আবিষ্ট হয়ে পড়েছে?
সান্নিধ্য একইভাবে স্থির থাকে। সময় দেয় শেহরিনকে। যদিও সময় নামক এই শব্দটা আজকের দিনে তার কাছে ভীষণ দূর্গম একটা বিষয়। প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মিনিট, প্রতিটা ঘন্টা আজ ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফোনের উপর ফোন আসছে, দল হতে নানান বার্তা আসছে। বিপক্ষ দল হতে চাপ আসছে। তবুও সবকিছু ছাপিয়ে সে নিরব থাকে তার জারুল ফুলের কাছে। কেননা এই ফুলের পাপড়িগুলো তার কাছে অতি মূল্যবান। সামান্য আঘাত লাগানোর সাহস কিংবা স্পর্ধা নেই তার।
স্ত্রী কন্যাকে সুখনিবাসে পৌঁছে দিয়ে তবেই সে যাবে তার যুদ্ধের ময়দানে।
"আমার কেন এতো কষ্ট হচ্ছে নেতাসাহেব? মনে হচ্ছে নিজের লালন করা বাচ্চাকে রেখে চলে যাচ্ছি। আল্লাহ কেন আমার মাঝে এতো মায়া দিয়েছে যে, ছেড়ে যাওয়ার কষ্টটা আমি মেনে নিতে পারি না।"
"নিজেকে শান্ত করো শেহরিন। তোমার এই কষ্টগুলোই প্রমাণ করে, তুমি সত্যি ভালোবেসেছিলে এই সংসারটাকে। মায়া চলে গেলে যে বেদনা থাকে, তা হলো ভালোবাসার ছায়া। যতক্ষণ ছায়া পড়ে ততক্ষণই প্রমাণ থাকে যে, কোথাও না কোথাও আলো ছিল। তুমি এই বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছো ঠিকই,কিন্তু তোমার ছায়া তোমার স্পর্শ তোমার সবকিছু এই বাসায় থেকে যাবে আজীবন।"
"মায়ার মাঝে এতো কেন গভীরতা?"
"আমার মনে হয়, মায়া হলো এক স্বর্গীয় অভিশাপ। যা ছাড়া বাঁচা যায় না, আবার যা নিয়ে বাঁচাটাও কঠিন। কিন্তু এর সৌন্দর্য্যই হলো এখানে, মায়ায় জড়িয়ে পড়ার সাহস আমাদের সংবেদনশীল করে তোলে, আর মায়া হারানোর বেদনা আমাদের আরও শক্ত করে তোলে। দু'টোরই প্রয়োজন আছে জীবনে। এভাবে ভেঙে পড়লে কি চলবে বলো?"
"উহু।"
সান্নিধ্য নিচু হয় হয়ে থুতনি ঠেকায় শেহরিনের চুলের মাঝে। এক ফাঁকে গাঢ় চুম্বন এঁকে দিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় সন্তপর্ণে। অতঃপর শান্ত কন্ঠে বলে,
"তাহলে যাওয়া যাক নতুন গন্তব্যে।"
গাড়ি ছুটছে ফাঁকা রাস্তায় অদম্য গতিতে। শেহরিন দু'হাত ভাঁজ করে উইন্ডোতে মাথা রেখে দেখে চলেছে ভোরেবেলার এক অপার্থিব সৌন্দর্য একচিত্তে।
কৃষ্ণবর্ণের আঁচল সরিয়ে পূর্বদিগন্তে ফিকে হলুদ ও কমলা রঙের আভা ছড়াচ্ছে ধীরে ধীরে। চোখ বুলালেই মনে হচ্ছে যেন, কোনো অদৃশ্য শিল্পী এক সুবিশাল ক্যানভাসে জলরঙের পরম মমতায় তুলি বুলিয়ে চলেছে। ভোরবেলার এই সঞ্জীবনী নিস্তব্ধতা ভেদ করে সূর্যের প্রথম রশ্মি স্বর্ণোজ্জ্বল করে তোলে চারিপাশ। গাছের পাতায়, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হীরের মতো করতে থাকে ঝলমল। এই সৌন্দর্য প্রত্যাহিক দিনের। এক অলীক স্বপ্ন যা প্রতিদিন সত্যি হয়, আবার হারিয়েও যায়, পরদিন ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
ভোরের মিষ্টি মধুর ভাবনার মাঝে দূরত্বের পরিধি ক্রমশ কমে আসে। হালিশহরের সেই মাথা উঁচু রাজকীয় বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বড় ফটকের দু পাল্লা খুলে যায় দু'দিক হতে। বাড়ির পাহারাদাররা সম্ভ্রমচিত্তে দু'ধারে দাঁড়িয়ে স্বাগতম জানায় নীড়ে ফিরে আসা আপন মানুষদের।
গাড়ি অভ্যন্তরে প্রবেশ করা মাত্র ভেতর হতে ছুটে আসে সানজি তানিশা, তাসিন, লতা । আনন্দ উচ্ছ্বাস উপচে পড়ছে প্রত্যেকের মুখোরেখায়। সান্নিধ্য প্রত্যেকের ভাবমূর্তি দেখে একদম নিশ্চিত হয়, এরাই শাহজাহান সাহেবকে গরম দুধের ন্যায় উতলিয়ে তুলেছিলো তাদেরকে ফেরাতে।
নেমে পড়ে সে গাড়ি হতে। অপরদিকে বাবার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমুচ্ছে শাহমিকা। রাতে দেরি করে ঘুমানোর দরুণ চোখে এখনও তার গাঢ় নিদ্রার আবেশ জড়িয়ে। যা ভাঙতে সময় লাগবে আরো দুয়েক ঘন্টা।
রাজকন্যার ঘুমন্ত মুখ দেখামাত্র মন খারাপ হয়ে যায় প্রেমিক পুত্র তাসিন সাহেবের। হাসি হাসি মুখটা উবে যায় মুহুর্তেই। শাহমিকার জন্যই আজ তার সকাল সকাল উঠা। নয়তো এতো সকালে তার তো ঘুমই নামে না চোখে হতে। ইচ্ছে ছিলো, সবার মতো সে নিজেও টুকটুকে গোলাপ দিয়ে রাজকন্যাকে বরণ করে নিবে। ফ্রেন্ডশীপ করবে। যাতে তাকে দেখে রাজকন্যা আর না ভয় পায়।
কিন্তু হলোটা কি!! রাজকন্যা নিজেই তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বুকের ভিতরে মজনু সাহেবের শুরু হয় ফের করুণ সুর। এতো কষ্ট রাখার জায়গা সত্যি হয়তো ফুরিয়ে এসেছে। আর মেনে নেওয়া যায় না!
শেহরিন সমস্ত বিষাদ ঝেড়ে ঠোঁটের কোণে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি আনে। মাথায় ওড়নাটা ঠিকঠাক টেনে ধীর পদস্থে নেমে আসে গাড়ি হতে। নামা মাত্র সবাই ঝেঁপে পড়ে তার উপরে। সকাল সকাল উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে উঠে নির্মল আত্মারা।
রাজকন্যা ঘুমাচ্ছে বিধায় সবাই মৌনতা অবলম্বন করে সাদরে সম্ভাষণ জানায় আগমনী অতিথিদের। সান্নিধ্যের কোল হতে শাহমিকাকে ধীর সুস্থে নিজের কোলে তুলে নেয় সানজি। তার পাশে পিছু পিছু ঘুরে তাসিন। পরনে প্যান্টের পকেটে ঝুলছে একখানা গোলাপ। কিন্তু বোকা প্রেমিক,গোলাপের মাথাটা ভিতরে ঢুকিয়ে ডালের অংশটা রেখেছে বাহিরে। কে জানে, শাহমিকার মতো গোলাপটাও বুঝে এতোক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে ঘুমে।
মূল অভ্যন্তরের সামনে আসতেই একগাদা গোলাপের পাপড়ি আর গাঁদার ঝুরো ফুল ছুঁড়তে থাকে তিথি তানিশা লতা। মুখে সবার প্রাণখোলা হাসি লেপটানো। মিষ্টি হাতে সামনে দাঁড়ানো মিসেস নাজনীন। সঙ্গে তার জা মিসেস নিলুফা।
শেহরিন অপ্রত্যাশিত এই আয়োজন দেখে বিস্তর অবাক হয়। বিশ্বাস হয় না সে সত্যি দেখছে কি না। স্বশরীরে উপস্থিত থেকেও সবকিছু ভ্রম মনে হয়। দুটো মানুষের অপছন্দের তালিকায় নাম লিখিয়ে সে এই বাসা হতে বের হয়েছিল এক সময়। যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, একদিন সে নিজের ব্যর্থতাগুলোকে জয় করে আবারো মাথা উঁচু করে ফিরবে রেখে যাওয়া নিজ সংসারে।
সময় কিভাবে চলে যায়, কোথায় দিয়ে চলে। আজ সেইদিন, আজ সেই মুহুর্ত। শাশুড়ী মা আর বড় জায়ের শূলবিদ্ধ চোখ আজ তার প্রতি প্রসন্ন, স্নিগ্ধ। চোখেমুখে অপার স্নেহ মমতা ছেয়ে আছে।
শেহরিনের ছুটে যেতে ইচ্ছে করে এক নিভৃত কোণে ডায়েরি হাতে। তার ভিতরের অব্যক্ত কথাগুলোকে পরিস্ফুটন করে বলতে, "ওহ সময় তুমি এতো কেন অদ্ভুত বলো তো? কম্পাসের কাঁটায় বৃত্ত এঁকে জীবন ঘুরিয়ে আনো মুহুর্তেই? এইতো বের হলাম সেদিন কাঁচা হাতে, কিছুই পারি না অজুহাতে। অথচ, আজ তুমি আমাকে সব পাইয়ে দিচ্ছো বিনা পয়সার মূলধনে।"
মিষ্টি মুখ করিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় শেহরিনকে অভ্যন্তরে। হাতে দেওয়া সুখনিবাসের বাগানে ফুটন্ত একখানা টকটকে গোলাপ। মিসেস নাজনীন নিজ গলা হতে একখানা স্বর্ণের চেইন খুলে পরিয়ে দেয় তার বউমার গলায়। শেহরিন আপত্তি জানালেও শোনেনা তার কথা।
অন্যদিকে, সান্নিধ্যেকে মিষ্টি মুখ করাতে নিলে সে তো মুখে তোলেই না মিষ্টি উল্টো অসহায় কণ্ঠে বলে,"এসব করে সময় নষ্ট করার কি দরকার?"
" তোকে কে আটকিয়েছে? আমরা তো বরণ করছি আমাদের বউকে। তুই সাথে দাঁড়িয়ে আছিস, মিষ্টি অফার না করলে খারাপ দেখায় জন্য করলাম। তোর কোনো কাজ নেই এখানে। যেতে পারিস।"
তানিশার বেকায়দা কথায় সান্নিধ্য কপাল ভাঁজ করে। উপস্থিত সবাই হেসে উঠে শব্দ করে। মিসেস নাজনীন ছেলের দিকে তাকিয়ে কোমল গলায় বলেন,"আজেবাজে কথা বলবি না তানু। আজকে আমার ছেলের জীবনে বিশেষ দিন। সান্নিধ্য তুমি বের হও, সরফরাজ তোমার অপেক্ষায় থেকে থেকে বেরিয়ে পড়েছে।"
সান্নিধ্য অর্ধাঙ্গিনীর প্রতি দায়িত্ব পালন শেষে সবার থেকে বিদায় নিয়ে ছুটে যায় নিজ কাজে। আর এক মুহূর্ত নষ্ট করার সময় নেই তার হাতে। ভোটগ্রহণ শুরু হতে আর মাত্র দুই ঘন্টা বাকি। চোখের পলকে বাড়ির বাহিরে অপেক্ষীয় মান তিনটে গাড়ি ধূলো উড়িয়ে ছুটে যায় সে নির্বাচনের প্রাঙ্গনে।
________________________________________
সাংবিধানিক নিয়ম মেনে সকাল ৮ টার আগেই সান্নিধ্য নির্বাচনী বুথের কার্যালয় থেকে বের হয়ে যায়। গন্তব্য তার নিজস্ব ভোটকেন্দ্রে। দলীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদেরকে নিয়ে ভোটকেন্দ্রের দিকে রওনা হয় সে। পরনে সাদা রঙের পরিচ্ছন্ন পাঞ্জাবি, চোখে কালো সানগ্লাস। চোখে মুখে অস্থিরতার ভাজ বুঝেও যেন বোঝা যায় না তার।
নিয়ম মেনে ঠিক সকাল ৮ টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে সাবেক এমপি সাহেব পা রাখতেই চারপাশ হতে উপচে পড়ে গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। কেউ কেউ মাইক্রোফোন হাতে ভোট শুরুর আগে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চায় তো কেউ কেউ ভোটাধিকার প্রয়োগের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে মরিয়া উঠে।
নিরাপত্তা কর্মীদের সহযোগিতায় গণমাধ্যম এড়িয়ে সান্নিধ্যেকে বিশেষ নিরাপত্তায় নিয়ে যাওয়া হয় অভ্যন্তরে। কেন্দ্রে প্রবেশ করা মাত্র সেখানে নিয়োজিত প্রিসাইডিং অফিসারদের সাথে হ্যান্ডশেক করে সে। সেই সাথে অনুরোধ করে তাদের ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে নির্বাচন কমিশনের যাবতীয় নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে কার্যক্রম চালাতে।
ভোটার হিসেবে নিজের কাঙ্ক্ষিত ভোট প্রদান করে সান্নিধ্য। আঙ্গুলে অমোচনীয় কালির চিহ্নে গোপন কক্ষে গিয়ে ব্যালট বক্সে পুরো দেয় তার কাগজ।
ভোট শেষ হওয়া মাত্র মিনিট কয়েকের মাথায় বেরিয়ে আসে সে। সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়াতেই আবারো প্রশ্নের সম্মুখীনে পড়ে। কিছুটা সময় হাতে রেখে একে একে জবাব দিতে থাকে সকল প্রশ্নের। গম্ভীর মুখোরেখায় দৃঢ় কণ্ঠে বলে,"আমি চাই ভোটাররা ভয় ভীতি উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক। আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন সংবিধান ও আইন অনুযায়ী একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করেন। জনগণের রায় আমি মাথা পেতে নেব।"
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোদমে শুরু হয়ে যায় ভোটগ্রহণ। সাধারণ জনগনের ভীড় ঠেলে সান্নিধ্যের একাধিক গাড়িবহর ছুটে যায় একের পর এক কেন্দ্রে। পরপর পতেঙ্গা, খুলশী, চন্দনপুরা তার আসনের বিভিন্ন কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করে।
প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি সরব থাকায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। নাসির চৌধুরীর অনেক লোককেই তার চোখে পড়েছে কেন্দ্রের বাহিরে। অকাজ করার সম্ভবনা কমাতে সে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সংক্ষেপে কথা বলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার অনুরোধ করে।
বেলা দুটো। নাজিরহাট পরিদর্শন শেষে লাঞ্চের ব্রেকে সান্নিধ্য এসে থিতু হয় কেন্দ্রীয় নির্বাচনী কার্যালয়ে। লম্বা সময় ধরে ছোটাছুটি শেষে অফিসে বসতেই তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট এবং দলীয় নেতাদের সাথে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আসা ভোটের গতিপ্রকৃতি ও বিভিন্ন কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু করে। প্রতিটি কেন্দ্রে নিয়োজিত নিজস্ব এজেন্ট রেখেছে সে। যাদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত রিপোর্ট আসতে থাকে সেখান হতে।
"হ্যালো।"
"জাফরিন তালুকদার বলছি স্যার।"
"জ্বি বলুন।"
"স্যার, আমি আমার কাজ করে ফেলেছি। সেই সাথে আপনার পিছনে লেগে থাকা একটা কাঁটাও উপড়ে ফেলেছি।"
সান্নিধ্যের সমান্তরাল ভ্রু'দ্বয় কুঁচকে উঠে মুহুর্তেই। হাত ঘড়িতে সময়ের দিকে নজর রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,"কোথায় এখন আপনি?"
"আর পাঁচ মিনিট পরেই সমস্ত নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো। খুঁজে পাবেন না আমায়। আমি কোথায় আছি।"
"আমি খুঁজতেও চাই না আপনাকে। বাট আপনি যে কাজটা করেছেন সেটার প্রসঙ্গে বলুন।"
"আনোয়ারুল আজিমের একমাত্র পুত্রকে আমি হত্যা করেছি আজ ভোরে। প্রাক্তন শ্বশুর সাহেব নির্বাচন বাদ দিয়ে এখন ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন। নাসির চৌধুরীর সাথে আপনাকে নির্বাচনে হারানোর একটা বিরাট প্ল্যান আমি ভেস্তে দিয়েছি। নাসির চৌধুরী একা এখন আর কিছু করার সাহস পাবে না। কারণ তার সঙ্গী এখন ব্যস্ত ছেলের দাফনে। ধন্যবাদ নেতাসাহেব। আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আজকে রাত থেকে আমার শান্তির ঘুম হবে। শুভকামনা আপনার জন্য, আপনার ওয়াইফের জন্য।"
সান্নিধ্য শরীর এলিয়ে দেয় চেয়ারে। স্থির মুখোরেখায় ভরাট কন্ঠে বলে,"আমার ওয়াইফের ফ্রেন্ড ছিলেন এককালে আপনি৷ সেই হিসেবে আপনার চাওয়ার চেয়ে অতিরিক্ত সাহায্য করেছি আমি। নয়তো করতাম না। কারণ এখানে আমার লাভ নেই কোনো। উল্টো আপনি যা করেছেন তাতে আমার ফেঁসে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। বাট আউ'ইল ম্যানেজ ইট।"
ফোনের অপর পাশে মানবীটি নিরব হয়ে যায় কয়েক মুহুর্তের জন্য। ধপ করে নিভে যায় তার গলার কঠিন সুর। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে,
"আপনি জানতেন আমি শেহরিনের বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলাম?"
"আমার অ্যাপার্টমেন্টে আপনাকে প্রবেশের অনুমতি আমি এমনি এমনি দেইনি। আমার সঙ্গে যারা পার্সোনালি দেখা করতে আসে আমার লোকেরা আগে তার নাড়ি নক্ষত্র উদঘাটন করে। তারপরে মেলে পারমিশন।"
"কঠিন মস্তিষ্কের মানুষ দেখছি আপনি। অথচ আপনার সঙ্গে সেদিন কথা বলার সময় আপনার ভঙ্গিমা, প্রশ্ন করার ধরণ দেখে আমি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি আপনি আমাকে চেনেন। তবে একটা অনুরোধ, ক্ষণস্থায়ী এই পরিচয়ে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে শেহরিনের তা অজানা থাকুক ।"
সান্নিধ্যে কান হতে ফোন নামিয়ে ফেলে। আরহামকে তৎক্ষনাৎ জাফরিন সম্পর্কিত সংগ্রহকৃত সকল তথ্য এবং তার রেফারেন্সে সে যে চাকুরিটা করেছে সেটাও বাতিল করার নির্দেশ দেয়।
"একটা সিঙ্গেল এভিডিয়েন্স ও যেন না থাকে।"
"ওকে স্যার।"
অধিক উত্তেজনা কিংবা চাপে সান্নিধ্য লাঞ্চ করতে পারে না। শুধু মাত্র পানি পান করে সে তার শুকনো গলা ভিজিয়ে রাখে।
প্রতিপক্ষ নাসির চৌধুরীর উপর সে যেমন গতিবিধি রেখেছে তেমনি তার উপরেও নাসির চৌধুরী গতিবিধি রেখেছে এটা সে বুঝতে পারে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। তবে,সান্নিধ্য নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে অন্তত আজকের দিনের জন্য।
ঠিক বিকেল ৪টায় প্রিসাইডিং অফিসারদের নির্দেশে ভোটকেন্দ্রের প্রবেশদ্বার বন্ধ করা হয়। নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী শেষ হয় ভোটগ্রহণ।
বিকেল পাঁচটার দিকে সমস্ত কার্যক্রম মেনে প্রিসাইডিং অফিসারের উপস্থিতিতে, প্রার্থীর এজেন্টদের সামনে ব্যালট বাক্স খোলা হয়। প্রতিটি ভোটকক্ষে শুরু হয় ভোট গণনা। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের পর্দায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীরা কত সংখ্যক ভোট পাচ্ছে সেটার উপাত্ত সরাসরি দেখানো হয়।
---------------------------------------------------
গ্রামীণ ও ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল দশ এলাকার কেন্দ্রগুলোর ভোট গণনা শেষ হয়। সেখানে সান্নিধ্য শাহজাদ খানের নামের পাশে যুক্ত ৫৮৭৬ ভোট এবং নাসির চৌধুরীর পাশে যোগ হয় ৭৯২০ ভোট।
সুখনিবাসে ড্রয়িংরুমে টিভির সামনে বসারত সকলে নিরব হয়ে যায় মুহুর্তেই। চোখে মুখে অস্থির উৎকন্ঠা সবার। সানজি হঠাৎ করে এতো ব্যবধান সৃষ্টি হওয়াতে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।শেহরিনের স্থির মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে পায়চারি শুরু করে। কেমন যেন বুক ধ্বক ধ্বক করে কাঁপছে তার।
"বুঝতে পারলাম না। এতো ব্যবধান সৃষ্টি হলো কেন? সান্নিধ্যের কি এই এলাকাগুলোতে পরিকল্পনা দূর্বল ছিলো?"
"স্থির হন বাবা। এটা মাত্র ১০ কেন্দ্রের ফল। শহরের কেন্দ্রগুলো আসতে শুরু করলে পার্থক্যটা কমে যাবে।"
সময় যত গড়াতে থাকে গণনার পারদ তত চড়তে শুরু করে। শহরের আধুনিক এবং তরুণ ভোটার অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোর ফলাফল আসতে থাকে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ৭০ কেন্দ্রের ভোটের ফলাফল এসে দাঁড়ায়, সান্নিধ্য শাহজাদ খান ৪০৮৫০ ভোট, নাসির চৌধুরী ৩৯,৩৫০ ভোট।
১৫০০ ভোটে এগিয়ে থাকাতে সুখনিবাসে সবার মধ্যে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস আসে। সানজি গিয়ে বসে শেহরিনের পাশে। শেহরিনের জমে যাওয়া ঠান্ডা দুটো হাতের মাঝে হাত রাখে সে। কিন্তু স্বস্তি টিকে না বেশিক্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের পাদদেশের জনবহুল ও নাসির চৌধুরীর প্রভাবাধীন কেন্দ্রগুলোর ফলাফল এসে যোগ হয়।
রাত সাড়ে ৮টায়, মোট ১৩০ কেন্দ্রের ফলাফলে এসে দাঁড়ায়,
সান্নিধ্য শাহজাদ খান ৭৮৬০০, নাসির চৌধুরী ৭৯৯০০ ভোট।
"আমি আগেই জানতাম, এই নির্বাচনের কৌশল নিয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়নি সান্নিধ্যের। রাজনীতি আবেগের জায়গা নয়,
যে স্মার্টনেস দেখালেই ভোট নিজের দখলে আসবে।"
শাহজাহান সাহেবের রাগান্বিত স্বরে বলা কথায় মিসেস নাজনীন আতঙ্কের মাঝে বিরক্ত গলায় বলেন,"এসব কি উল্টাপাল্টা কথা বলছো তুমি? আমার ছেলের দরকার পরেনি চেহারা দেখিয়ে রাজনীতি করার। তুমি দেখো না কত পরিশ্রম করে ছেলেটা? ও ওর যোগ্যতা দিয়ে রাজনীতি করে।"
"তোমার ছেলের ধৈর্য্য নেই। বাছবিচার করে না কোনোক্ষেত্রেই ৷ এই এলাকার ভোট ওর পক্ষে না থাকার কারণ সে মেম্বারকে ধরে পিটিয়েছিলো। বলেছিলাম মারতে হবে না পুলিশে দাও। না, সে তো কারো কথা শুনবে না। মারামারি না করলে তো পেটের ভাত হজম হয় না। তারউপর মাঝখানে এতোবড় দূর্ঘটনা। শুরুতে যে পজিশন ছিলো সেটা সে ধরে রাখতে পারেনি নিজের কাজকর্মে।"
"উফস বাবা, চুপ করবে তুমি। এখনও তো কাছাকাছি আছেই। এতো টেনশন দিচ্ছো কেন?"
মিসেস নাজনীন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন,
"শুধু তো আমার ভুল ধরো। এখন তোমার বাবাকে দেখে বলো,সান্নিধ্য কিভাবে এতো অধৈর্য্যশীল হয়েছে। প্রমাণ পাচ্ছো তো? এই মানুষটার কারণে আমার ছেলে ওরকম হয়েছে। নয়তো সরফরাজের মতোই হতো।"
"হ্যাঁ এখন ছেলের দোষ আমার ঘাড়ে দাও।"
"বাবা আম্মা প্লিইইজ...."
শেহরিনের অনুরোধে মিসেস নাজনীন শাহজাহান সাহেব চুপ হয়ে যান। একে অপরের উপর দোষ চাপানো শেষে মনোযোগ দেন আবারো টিভির স্ক্রিনে। আর মাত্র ২০টি কেন্দ্র বাকি। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে শেহরিনের। তবুও নিজেকে সে স্থির রাখার চেষ্টা করে। চোখের সামনে সব ঘোলাটে হয়ে আসছে কেমন। এতো প্রচেষ্টা, এতো পরিশ্রম সব কি তবে বৃথা যাবে?
সর্বশেষ কেন্দ্রের ফলাফল যুক্ত হতে হতে রাত নয়টা পার হয়ে যায়। চূড়ান্ত বিজয়ী ফলাফল আসতে আসতে শেহরিন সানজি বসা ছেড়ে উঠে পড়ে। একজন অতিরিক্ত অস্থিরতায় ডুবে গিয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকে। অন্যজন লাগামহীন কাঁপুনিতে চোখ মুখ ফ্যাকাশে করে ফেলে। অপরদিকে,মিসেস নাজনীন অদূরে গিয়ে বসে দুহাত তুলে ছেলের জন্য শুরু করে দোয়া।
সান্নিধ্য শাহজাদ খান প্রাপ্ত ভোট ১,০২,৯০০।
নাসির চৌধুরী ৮৮২৪৫ ভোট।
সুখনিবাসে এক মুহুর্তের জন্য বিদ্যুৎ গর্জন করে উঠে। বজ্রপাতের ন্যায় গলার স্বর ভেঙে জোরালো ধ্বনিতে মেতে উঠে সবাই উল্লাসে। যে ধ্বনি দেয়ালের সঙ্গে প্রতিধ্বনি হয়ে পৌঁছে যায় বাহির পর্যন্ত। শেহরিন সানজি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠে। সুখের কান্নায় ভেঙে পড়ে দুজনে।
বাঁধনহারা আনন্দে দিশেহারা হয়ে উঠে সুখনিবাসের প্রতিটি হৃদয় স্পন্দন।
-----------------------------------------------------
রাত সাড়ে বারোটার দিকে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে চট্টগ্রাম-২ আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়।যেখানে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন সান্নিধ্য শাহজাদ খান। দলীয় নেতাকর্মী থেকে সমর্থকেরা ব্যাপক উচ্ছ্বাসে হতবিহ্বল হয়ে উঠে এই বিজয়ে। স্লোগানে স্লোগানে মুখোরিত হয়ে উঠে চারপাশ। মধ্যেরাতে তাদের জয়ী উল্লাস দিনের উজ্জ্বলতাকেও হার মানিয়ে দেয়।
সান্নিধ্য আনঅফিশিয়ালি রেজাল্ট শিট রিটার্নিং অফিসারের হাত হতে গ্রহণ করে সরাসরি চলে আসে সরফরাজের কাছে। শত শত নেতাকর্মীর মাঝেই নির্বিকারচিত্তে জাপ্টে ধরে বড় ভাইকে, তার অভিভাবককে, তার সকল কাজের সমাধান দাতাকে। ঘামভেজা সিক্ত তার পাঞ্জাবি, চোখ রাজ্যের ক্লান্তি। সুর্দশন মুখখানিতে নেই কোনো গম্ভীরতার আভাস। নিয়মের বাহিরে নির্দ্বিধায় নিজেকে সে ভাঙে এই কঠিন জয়ের লড়াইয়ে।
সরফরাজের চোখের কোণে এক ফোটা অশ্রু এসে ভীড়ে। হঠাৎ এমন দৃশ্য দেখে তার মনে পড়ে, কোনো এক সময় ক্লাস টেনের বোর্ড পরীক্ষায় এই মাথা গরম ছেলে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে তাকে এইভাবে জড়িয়ে ধরেছিলো। তখন তার হাতে ছিলো এরকম নাম্বারের শিট৷ আজ সময়ের ব্যবধানে সবকিছু বদলে গেলেও ভালোবাসা বদলায়নি একফোঁটাও।
"কংগ্রাচুলেশন এমপি সাহেব।"
"আমার ছায়া হয়ে থাক তুই।"
"আছি সবসময়।"
সান্নিধ্যের চোখের কোণে খুব সামান্য জল। শত শত ক্যামেরার ফ্লাশের আড়ালে সে কনিষ্ঠ আঙুলে খুব নির্বিঘ্নে মুছে ফেলে তা। অতঃপর আসিফ আরহাম রিমনের সঙ্গে করে আলিঙ্গন। এই মানুষগুলো তার আস্থার মানুষ, বিশ্বাসের মানুষ, ভরসার মানুষ। সৃষ্টিকর্তা তাকে হয়তো কোনো বড় পূণ্যের বিনিময়ে এই মানুষগুলোকে তার জীবনে পাঠিয়েছেন। এদের জন্যই রাজনৈতিক জগতে এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খান এতো পরিচিত, এতো আলোচিত। চট্টগ্রাম -২ আসনে এমপি পদের মুকুটটার পিছনে এদের অবদান জীবন থাকতে ভুলবে না সে।
_______________________________
২১শে জুন, সকাল দশটা।
বিজয়ের দ্বিতীয় দিনে আয়োজন করা হয়েছে বিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। স্থান চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রাণকেন্দ্র, ঐতিহাসিক কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠ।
মাঠের এক কোণে প্রায় ১৫ ফুট উঁচু এবং ৬০ ফুট প্রশস্ত এক বিশাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। মঞ্চের পাশে বিশাল এলইডি স্ক্রিন জুড়ে রয়েছে সান্নিধ্য শাহজাদ খানের ছবি, পাশে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তার প্রতীক সঙ্গে নির্বাচনী স্লোগান।
অনুষ্ঠান শুরুর ঘণ্টাখানিক আগে থেকেই মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা রাজি করা হয়েছে চারদিকে। নিশ্ছিদ্র এই নিরাপত্তা বেষ্টনী বহন করে বিজয়ী নেতার ক্ষমতা ও অবস্থানের সুস্পষ্ট বার্তা।
মাঠের অর্ধেক জুড়েই সারিবদ্ধভাবে পাতা হয়েছে চেয়ার। মঞ্চের এক পাশে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য সংরক্ষিত আসন।
মঞ্চের ঠিক সামনে, আলাদা ব্যারিকেড দিয়ে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে ভিআইপি এবং বিশেষ অতিথিদের বসার স্থান। যেখানে বসেছে সদ্য নির্বাচিত এমপি সাহেবের পরিবারবর্গ।
"শাহমিকা।"
মিসেস নাজনীনের কোলে বসা রাজকন্যা ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। মাথায় বাঁধা তার দুটো ঝুঁটি, পরনে সাদা রঙের ফ্লোরাল অ্যাপ্লিকের লেয়ার নেট ফ্রক। চোখ দুটো ঈষৎ ছোট করে সে তাকিয়ে থাকে বেবি মানকির দিকে।
রাজকন্যার চাহনি নিজের দিকে পরতেই বেবি মানকির ফোকলা মুখে ফোটে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সে তৎক্ষনাৎ। বাম পকেট হাতড়ে বের করে শুকিয়ে মচমচে হয়ে যাওয়া সেই গোলাপ ফুলের ডাল। রাজকন্যার দিকে বাড়িয়ে দিতেই রাজকন্যা ডালের দিকে কিয়ৎক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । অতঃপর কোমল হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডালটা মুঠো পুরে নেয় নিজ হাতে।
তাসিন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শাহমিকার দিকে। এই প্রথম ইয়ো পানি তার কথা একটু শুনেছে। তার দেওয়া কিছু একটা হাতে নিয়েছে। অন্যসময় তো ফিরেও তাকায় না। দেখলেই দৌড়ে পালায়। খুশিতে বেবি মানকি লাফিয়ে উঠে। দু-হাতে তালি বাজাতে বাজাতে সে পাশে বসা ফু'মণিকে জড়িয়ে ধরে।
"বেবি মানকির মতো লাফাচ্ছিস কেন?"
"ফু'মণি ইয়ো পানি আমার গোলাপ ফুল নিয়েছে।"
সানজি তড়াক করে পাশ ফিরে চায়। আম্মার কোলে সাদা পরীটার হাতে কিছু একটা দেখে সে কপাল কুঁচকে বলে,"কই গোলাপ?"
"ওহহো.. ইয়ো পানির হাতে দেখো।"
"আমি তো শুকনো লাকড়ি দেখতে পাচ্ছি।"
"লারকি কি?"
সানজি দৃষ্টি সরিয়ে এনে বেবি মানকির দিকে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে," শুকনো ডাল রে পাগলা। এটা তুই কি দিয়েছিস? ছিঃ ছিঃ.. তুই যে গরিব আলাভোলা প্রেমিক এটা কি বড়লোক রাজকন্যার সামনে প্রমাণ না করলেই নয়? গোলাপের জায়গায় ডাল দিয়েছিস?"
তাসিন ফু'মণির কথায় পকেট হাতড়ানো শুরু করে। আশ্চর্য!! সে তো পুরো একটা ফুল পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলো পকেটে। তাহলে শুধু ডাল হলো কিভাবে? আর পাপড়ি গেলো কোথায়?
"তুই এই ফুল কোথায় পেয়েছিলি?"
"ওইযে..চাচি মণি বাসায় আসার দিনে তুমি যে বাগান থেকে তুলেছিলে।"
"তুই সেদিনকার ফুল পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলি?"
তাসিন নিষ্পাপ চাহনিতে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানায়। সানজি দীর্ঘ শ্বাস ঝেরে কপালে হাত রেখে বলে,"তাইতো বলি আজ তোর মামণি অন্য প্যান্ট পরানোর জন্য এতো চেষ্টা করলো কিন্তু তুই নাছোড়বান্দা হয়ে এটাই পরলি। বাসায় পরার প্যান্ট পরে এখানে আসলি তবুও খুললি না। এসব কিছু এই ফুলের জন্য তাই তো? হায় খোদা, তুই তো দেখছি মজনু ফরহাদকেও হার মানিয়ে দিবি রে বেবি মানকি।"
"এটা শুধু আমার ইয়ো পানি।"
"তো তোর ইয়ো পানিকে একটা সুন্দর ফুল দিতে পারলি না?"
"উফ্ ফু'মণি আমি কি এতো বুঝি নাকি।"
"তোর প্রেম হওয়া কঠিন বেবি মানকি। ভালো বেগ পোহাতে হবে দেখছি।"
-----------------------------------------
ঘড়িতে বাজে এগোরোটা পনেরো। চারদিকে শুরু হয় প্রবল শ্লোগান আর করতালি। জনগনের ভীড় ঠেলে মঞ্চে উঠার আগ মুহুর্তে নেতাসাহেব বিশেষ কারণ দেখিয়ে কিছুটা আড়ালে চলে যায়। আসিফ আরহামরা সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়ার ফোকাস মঞ্চের দিকে রাখার নির্দেশ দিয়ে সেদিকে সবাইকে রাখে ব্যস্ত।
ভাঁজবিহীন শুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত নেতাসাহেব চোখ হতে সানগ্লাস খুলে ফেলে। ধীর পায়ে শীতল মুখোয়বে মঞ্চের পিছনে বাবা মেয়ের মোলাকাতের মাঝে করে অংশগ্রহণ।
রিজওয়ান সাহেব ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছেন একটু আগেই। এসেছেন শুধু মাত্র সান্নিধ্যের অনুরোধে। কিন্তু সেটা অজানা ছিলো শেহরিনের। এই জমজমাট ভীড়ের মাঝে বাবাকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে মেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। সব নিয়ম ভেঙে দৌড়ে চলে যায় সে বাবার বুকে।
সান্নিধ্য রিজওয়ান সাহেবের কাছাকাছি আসতেই শেহরিন সরে গিয়ে দু'জনকে জায়গা করে দেয়। সান্নিধ্য কিঞ্চিত ঠোঁট প্রসারিত করে সরাসরি আলিঙ্গনের মাধ্যমে কুশলাদি বিনিময় করে এই বিশেষ মানুষটার সঙ্গে।
"কংগ্রাচুলেশান চ্যাম্প। খুব খুশি হয়েছি। ইউ ট্রু'লি ডিজার্ভ ইট। প্রাউড অফ ইউ।"
"ভিতরে থেকে শ্রদ্ধা আসছে আপনার প্রতি, বাবা হিসেবে আপনি অতুলনীয়। থ্যাংকিউ সো মাচ ফর এভরিথিং। সুসন্তান হিসেবে নিজের মেয়েকে গড়ে তুলেছেন আপনি। যাকে পেয়ে আমি ভাগ্যবানের লিস্টে সবার উপরে আছি।"
রিজওয়ান সাহেব সান্নিধ্যের পিঠ চাপড়ে অভিবাদন জানান। অধিক সম্মান আর সুখে সে নিরব হয়ে থাকেন। আলিঙ্গন সেড়ে করমর্দন করে স্মিত হাসেন সে। মেয়েকে শিরদাঁড়া সম্পন্ন কঠিন ব্যক্তিত্বের ছেলের হাত তুলে দিয়ে বলেন," মা, একটা প্রশ্ন। ক্লিয়ার উত্তর চাই।"
"জ্বি বলো।"
"তুমি সুখী?"
শেহরিন উত্তর দিতে সময় নেয় না এক সেকেন্ডও। ঠোঁটের কোণে প্রজ্বলিত হাসি বজায় রেখে মাথা নাড়িয়ে বলে,"ভীষণ সুখী।"
"আলহামদুলিল্লাহ।"
"কিন্তু আমার তোমাকে লাগবে জীবনে চলার পথে । আমার সরল জটিল সব সমস্যার সমাধান তুমি বাবা । কখনোই ভেবো না তুমি দায়িত্বমুক্ত। তোমাকে দায়িত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ রেখে আমি নিজের কাছে ধরে রাখবো। পালানোর পথ খুঁজে লাভ নেই। মামণির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে মনে মনে। মামণিও জানিয়েছে তোমাকে না ছাড়তে।"
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের কথায় হেসে ফেলেন। সত্যি সে মনে মনে চেয়েছিলেন দায়িত্বমুক্ত কথাটা সামনে আনতে। কিন্তু মেয়ে তার আগেই নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিয়েছে। মামণিকে মনে মনে জানিয়েও দিয়েছে। পাগলি মেয়ে তার। তবে, এখন থেকে যতদিন বাঁচবে সে, মেয়ের সুখেই বাঁচবে। বাবা হিসেবে সন্তানের সুখ নিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দই তো আলাদা।
ধবধবে সাদা কুর্তি, সঙ্গে সাদা ওড়নায় ঢাকা অর্ধমাথা। চোখে নেতাসাহেবের মতো সানগ্লাস। দু পাশ হতে চুলগুলো বেরিয়ে মুখের উপর খাচ্ছে লুটোপুটি।
সান্নিধ্যের হাতের ভাঁজে হাত রেখে জীবনের প্রথম কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে উঠে শেহরিন। চারপাশে অসংখ্য নেতাকর্মীকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে নেতাসাহেব তাকে আগলে রাখে একদম নিজের কাছে। দুচোখ যতদূর যাচ্ছে শুধু জনতার ঢল চোখে পড়ছে। এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খানের সঙ্গে মিসেস সান্নিধ্যেকে দেখামাত্র নারী পুরুষ সকলে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে। ভোট প্রচারণায় শেহরিন যে সমস্ত মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলো তার অর্ধেকেই আজ উপস্থিত হয়েছে। সে নিজেও উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে তাদের দেখে। নেতাসাহেবের মতো সবাইকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানায় হাসিমুখে।
মঞ্চে নেতাসাহেবের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত নেত্রীসাহেবার একসঙ্গে হাত নাড়ার মুহুর্তটা ক্যামেরায় ক্যাপচার করে রাখতে ভোলে না সানজি৷ ফট করে কয়েকখানা ফটো ক্লিক করে ফেলে সে। কি দারুণ লাগছে দেখতে। ঠিক যেন, বাঘের পাশে রায় বাঘিনী দাঁড়িয়ে আছে। তেজই অন্যরকম।
সানজি সান্নিধ্যের হোয়াটসঅ্যাপে ফটোগুলো সেন্ট করে। দ্রুতহাতে টাইপ করতে করতে লিখে,"এই অমূল্য তিনটা ছবির জন পারিশ্রমিক হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হইলো। আপত্তি জানাইলে আরো এক হাজার বাড়ানো হবে। আর হ্যাঁ আপনাকে ভোট দিয়েছি সেটার মূল্য কত নির্ধারণ করা হইবে সেটা নিয়ে এখনো ভেবে চলেছি। তবে, অতি শীঘ্রই জানানো হইবে। চিন্তা লইয়েন না। মনে রাখবেন, শাহজাহান সাহেবের শেরনি বিনা পয়সায় কাজ করে না।"
ফিক করে হেসে উঠে সানজি। টেক্স খানা পাঠিয়ে টুপ করে সে ফোন বন্ধ করে ফেলে। এমপি সাহেব এখন না দেখুক পরে তো ঠিকই দেখবে। কড়ায় গন্ডায় হিসেবে চুকিয়ে নিবে তখন।
সান্নিধ্য শেহরিনের স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে পাশ ফিরে তাকায়। শান্ত গলায় বলে,"মিসেস সান্নিধ্য আপনার সমর্থকদের দেখে জেলাস ফিল হচ্ছে। এতো অল্প সময়ে পপুলারিটি তো আমি নিজেও পাইনি।"
"বুঝতে হবে না বউটা কার।"
"রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি তাহলে এবার বাদ দেওয়াই যায়?"
"রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি সারাজীবন ধ্রুবক হিসেবে থাকবে।"
"আপনি এখনও রাজনীতি পছন্দ করেন না বলবেন?"
শেহরিন আশেপাশে তাকিয়ে সান্নিধ্যের কানের কাছে মুখ রেখে ধীর কন্ঠে বলে,"প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবসময় যে ক্ষতিই করে এমনটা কিন্তু নয়,চরম বিপদেও অনেক সময় নিয়মের বাইরে গিয়ে সাহায্য করে। ধরুন,আমিও তাই করেছি।"
"পৃথিবীতে তাহলে তুমিই একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী যে কি না প্রতিপক্ষের বিজয়ে তারই হাত ধরে জয় উদযাপন করতে এসেছো।"
"এক্সকিউজ মি,এমপি সাহেব। ঢাকা হতে চট্টগ্রামের ভোটার বানিয়ে ছেড়েছেন। এইটুকু ফায়দা লুটবো না?"
"ঠিক আছে আমারও হিসেব তাহলে তোলা রইলো রাতের জন্য।"
"হুঁশ।"
শেহরিন নখ দ্বারা নেতাসাহেবের হাতের তালু খামচে ধরে সামনের দিকে দৃষ্টি তাক করে। এতো এতো ভালোবাসা পেয়ে সিক্ত হয়ে উঠে মুহুর্তেই। সামনে ভিআইপি আসনে বসে থাকা দু'জন বিশেষ মানুষের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে উঠে,"ধন্যবাদ সানজি আপু আমার জীবনে বোন হয়ে আসার জন্য। তোমাকে আমি একটু বেশিই ভালোবাসি।
ধন্যবাদ সরফরাজ ভাইয়া আমার জীবনে বড় ভাই হয়ে আসার জন্য। আপনাকে দেখলেই আমার ভিতর থেকে সম্মান আসে। আপনি সত্যিকার অর্থে একজন ভালো মানুষ।"
অনুপস্থিত আরও দুজনকে ধন্যবাদ দিতে ভোলে না সে। অদূরে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে মৃদু স্বরে বলে,"ধন্যবাদ শেফালী,তোমাকে আমি খুব খুব স্নেহ করি। সেই সাথে ধন্যবাদ ঋতমা আমার জীবনে সত্যিকারে বন্ধু হয়ে আসার জন্য। তোমাকে আমি খুব মিস করি। মনে প্রাণে দোয়া করি,তোমরা ভালো থাকো সবসময়। আমার জীবনে সেরা শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকো এভাবেই।"