"ইয়ো..পানি তুমিই..?? "
"কেমন আছো বাবা?"
তাসিন দরজা সম্মুখে শেহরিনকে দেখা মাত্র উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে। এই স্থানে,এই মুহুর্তে সে যেন কল্পনাতেও ভাবেনি তার ইয়ো পানির দেখা পাবে। আজ প্রায় আড়াইমাস হয়ে গেলো তারা একে অপরের সাথে বিছিন্ন হয়ে আছে। বাবা মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়নে পড়ে সে চাইলেও পারেনি একটু দেখা করতে। কত বায়না করতো,কত কান্না করতো কিন্তু তাতেও কাজে দেয়নি। হাত হতে পানির পটটা ছুঁড়ে ফেলে সে দৌড়ে জাপটে ধরে শেহরিনকে।
"আমি তোমাকে অনেক মিস করি। ফু'মনিকে মিস করি। আমার এখানে ভালো লাগে না। আমি থাকবো না এখানে। নিয়ে চলো আমাকে প্লিজ তোমাদের কাছে।"
শেহরিন শরীরে চলমান বেদনাগুলোকে উপেক্ষা করে সামান্য ঝুঁকে তাসিনকে নিজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়৷ বাচ্চাটার কপালে মুখে চুমু খেতে খেতে ধীর কন্ঠে বলে,"আমিও তোমাকে অনেক মিস করি বাবা। খুব মিস করি।"
"তুমি কেন চলে গেলে তাহলে? আমাদের বাসা তো এখন ফাঁকা হয়ে আছে। মামণিও আর যাবে না বলেছে।"
"মামণি যাবে না মানে?"
"বাবা বকা দিয়েছে মামণিকে। সেজন্য মামণি রাগ করে বলেছে, আর বাসায় কখনো ফিরবে না। আমি তো এখন, এখান থেকে স্কুল করি।"
শেহরিন তাসিনের অনুযোগী কন্ঠে বলা কথাগুলোর অর্থ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে না। তিথি ভাবি সুখনিবাসে আর ফিরবে না মানে? কি হয়েছে? সে তো আসাপথে ভেবেছে,ভাবি হয়তো বেড়াতে এসেছে কিছুদিনের জন্য তার মায়ের বাসায়। কিন্তু তাসিন এখান থেকে স্কুল করে মানে..?
"বাবা তোমরা এখানে কবে এসেছো?"
"অনেকক দিন.. আমি মাঝে মাঝে বাবার কাছে যাই। ফু'মণি নিয়ে যায় আমাকে।"
"কি বলছো তুমি?"
"হ্যাঁ।"
শেহরিন ঠাহর করতে পারে না কিছু। তবে, তাসিনের কথা মতো মনে হচ্ছে, তিথি ভাবি আর সরফরাজ ভাইয়ার মধ্যে কোনো সমস্যা হয়েছে। তা নয়তো সুখনিবাস ছেড়ে অনেকদিন তো থাকার কথা নয়। কিন্তু হয়েছেটা কি? জটিল কিছু?
"শেহরিন?"
শেহরিন নিজস্ব ভাবনা ছেড়ে পাশ ফিরে তাকায়। মিসেস রেহানার আগমন হতেই সে নিজেকে ধাতস্থ করে নম্রসুরে বলে,"আসসালামু আলাইকুম আন্টি।"
"ওয়ালাইকুমস সালাম। এসো এসো ভিতরে এসো।"
"দুঃখিত আন্টি, আপনাদের অযাচিত কষ্ট দেওয়ার জন্য।"
"দয়া করে আর ছোট করো না। তুমি যে আমার বাসায় এসেছো এতে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি মা।"
মিসেস রেহানা এগিয়ে এসে শেহরিনকে ধরে লিভিংরুমে সোফায় নিয়ে গিয়ে বসায়। পিছু পিছু এসে দাঁড়ায় তিথি। মূলত সে ডাকতে গিয়েছিল মিসেস রেহানাকে তার কক্ষে।
"তোমার শরীর চেহারার একি বিধ্বস্ত অবস্থা শেহরিন? তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। কি হয়েছে??"
"হয়তো লাইফে কঠিন সময় পার করছি আন্টি। আমি কি একটু পানি পেতে পারি?"
মিসেস রেহানা পিছু ঘুরে তিথিকে বলতে গিয়ে থেমে যায়। মেয়ের মনোভাব খুব একটা স্বতঃস্ফূর্ত না দেখে বলতে সাহস পান না৷ হয়তো এতে তার আবার ইগোতে লেগে যেতে পারে। এমনিতে এই নিয়ে তো কম ঝামেলা যাচ্ছে না।
"বসো। আমি এক্ষুণি নিয়ে আসছি।"
"আমি নিয়ে আসছি।"
"না মামণি, ইয়ো পানির জন্য পানি আমি নিয়ে আসবো।"
"চুপচাপ বসে থাকো। পারবে না তুমি।"
তিথির ভারী কন্ঠে আদেশবার্তা শুনে তাসিন শেহরিনের কাছে গিয়ে চুপচাপ বসে। মিসেস রেহানা খানিকটা অবাক হন মেয়ের ভাবমূর্তি দেখে। বিশ্বাস করতে একটু কষ্ট হয়, শেহরিনের জন্য সে নিজে গিয়েছে পানি আনতে। অথচ এই মেয়েটাকে নিয়েই তার শত অভিযোগ, এমনকি ঘর ছাড়া। তবে মেয়ে যে তার একটু একটু করে আত্ম অহংকারগুলো মাটিতে পিষ্ট করছে এতেই তিনি অনেক খুশি।
"টিভি নিউজের মাধ্যমে সান্নিধ্যের খবরটা জানতে পারলাম। আসলে এসব পলিটিক্সে কখন কি হয় বলা কঠিন। ভালোর চেয়ে মন্দ বেশি থাকে। তবে,জীবনে সুসময় থাকলে দুঃসময় আসবেই। মানুষ হিসেবে আমাদের দুটোই মেনে নিতে হবে। তুমি নিজেকে শক্ত রাখো। এই কঠিন সময়ে তুমি যদি নিজেকে ঠিক রাখতে পারো, ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"দোয়া করবেন আন্টি।"
মিসেস রেহানা শেহরিনের ঘর্মাক্ত মুখোরেখায় এঁটে থাকা চুলগুলো নিজ হাতে সরিয়ে দেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে স্নেহমাখা কন্ঠে বলেন, "অবশ্যই দোয়া থাকবে। তোমার কি কষ্ট হচ্ছে শরীরে? তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আর কি।"
শেহরিন মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে ধরে। চোখ তার ঘোলাটে হয়ে আসে। উপরওয়ালা এবং সে ছাড়া জানে না একটু আগে কি মুহুর্ত পার করে এসেছে সে। শরীর এবং মন দুটোতেই তার এতোটা কষ্ট হচ্ছে যে, প্রকাশ করার মতো শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।তবে, নিজেকে দেখে সে অভিভূত। এতোটা ট্রমা, প্রেশার, ফোবিয়া নিয়ে সে কিভাবে টিকে আছে? ওই রামদা, চাপাতি, আজাদের মৃতদেহ, রক্ত এগুলো নিজ চোখে দেখার পরেও সে সজ্ঞানে দাঁড়িয়ে আছে? আদৌও কি সম্ভব? এই শেহরিনকে দিয়ে কখনো কি এমনটা আশা করা যায়?
"আমি আসলে নিজেই নিজেকে নিয়ে কনিফিউজড আন্টি। সত্যি কথা বলতে, আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি নেই। আমার মাথা, পিঠ, কোমড়ে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে। শারীরিক দিক দিয়ে আমি একদম ভঙ্গুর হয়ে পড়েছি। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারছি না। আমার ভয় হচ্ছে, প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে। কিন্তু কোথাও গিয়ে মনে হচ্ছে আমাকে আরো শক্ত হতে হবে। নিজের দূর্বলতাগুলোকে কাটাতে হবে। আল্লাহ আমাকে এতোটা মনোবল দিয়ে চলেছেন আমি কৃতজ্ঞতা জানিয়েও শেষ করতে পারছি না আসলে।"
মিসেস রেহানা সন্তুষ্টচিত্তে শেহরিনের পানে তাকিয়ে হাসেন। সুস্পষ্ট কন্ঠে বলেন,"আমার তোমাকে একারণেই এতোটা ভালো লাগে। তোমার বিবেকবোধ আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করে। মেয়ে হতে হয় এইরকমই। যে কিনা তার অর্জিত পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিকতা জীবনে চলার পথে সবসময় কাজে লাগাবে। নিজেকে স্ট্রং রাখবে প্রতিটি পদক্ষেপে। "
"পানি.."
তিথির বাড়িয়ে দেওয়া পানির গ্লাস কম্পনরত হাতে তুলে নেয় শেহরিন। চোখে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি রেখে সে নিমিষেই তার শুকনো গলা ভিজিয়ে নেয়। অন্তর শুকিয়ে এসেছিলো একদম। এতোক্ষণে পানির তৃষ্ণা মিটিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে।
"এখন ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিবে এসো।"
"আন্টি সানজি আপুকে একটু ফোন করতে হবে। আমার ফোনটা রেখে এসেছি।"
"আচ্ছা বলে দিবো সমস্যা নেই। তোমাকে দেখে আমার ভয় হচ্ছে মা, আর দেরি করো না। তোমার চোখ লাল হয়ে এসেছে। এই অবস্থায় এতো প্রেশার, ঝড় ঝাপটা....আল্লাহ মাফ করুক।"
"নানুমণি আমি ইয়ো পানিকে নিয়ে যাই?"
"আচ্ছা যাও। আমি খাবার রেডি করে আনছি।"
তাসিন শেহরিনের হাত ধরে ধীরে ধীরে ভিতরে নিয়ে যায়। বাচ্চাটার মুখে কালো মেঘ কেটে এতোদিনে যেন সূর্যরাঙা হাসি ফুটেছে। শেহরিনকে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা।
তিথি নিরবে ছেলের হাসিমুখ, উচ্ছ্বাসতা অবলোকন করে। মায়ের জেরা হতে নিজেকে মুক্ত করতে সেও পা বাড়ায় নিজ কক্ষে। মিসেস রেহানা মেয়ের যাওয়াপথের মাঝখানে নিরেট গলায় প্রশ্ন করেন,
"হঠাৎ এতো ন্যায়পরাণয়তা যে?"
"একদমই বেমানন?"
"তুমি নিজেকে কি সেটাই ভাবো? তোমার দ্বারা কি ভালো কাজ হতে পারে না?"
"আমি কি খুব খারাপ কাজ করি?"
"নিজেকে প্রশ্ন করো। উত্তর পাবে।"
"আমি আপাতত উত্তরহীন।"
মিসেস রেহানা মেয়ের কাছে ধীর কদমে এগিয়ে আসেন। তিথির কাঁধে আলতো করে হাত রেখে শান্ত গলায় বলেন,"তুমি কি নিজেকে বড় ভাবছো? শেহরিন নিজ হতে তোমার কাছে সাহায্য চাইছে জন্য?"
"সত্যি কথা বলতে, আমি এক মুহুর্তের জন্য সেরকমটা ভেবেছি কিন্তু সেটার স্থায়ীত্ব কাল খুব অল্প সময় ছিলো। তারপরে মনে হয়েছে, এখানে বড় ছোটের হয়তো কিছুই নেই। তাকে সাহায্য করাটা আমার দায়িত্বের মধ্যে এসে পড়েছে। সুতরাং আমাকে করতেই হবে।"
মিসেস রেহানা মৃদু হেসে বলেন, "আমার মনে হয় তোমার বিবেচনাবোধটা দেরিতে হলেও তৈরি হচ্ছে। আমি তোমার এই পরিবর্তনটা দেখে ভীষণ খুশি হয়েছি। এই ছোট্ট একটা বিষয়ে অনেক কিছু শেখার আছে তিথি। মানুষ মাথা নত করলেই ছোট হয়ে যায় না,যে মাথা নত করতে জানে সে দুনিয়া জয় করতে পারে। যে নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজের মধ্যে অনুধাবন করে এবং ক্ষমা চায় সে মনুষ্যত্বের তালিকায় উপরে উঠে যায়। মানুষকে মাঝে মাঝে নমুজ হতে হয়৷ নয়তো অহংকার এসে ভীড়ে তার মাঝে। ছোট্ট একটা উদাহরণই দেখো, প্রকৃতপক্ষে শেহরিন কিন্তু কোনো অন্যায় করেনি তোমার সাথে। তারপরেও সে নিজেকে নত করেছে আজ তোমার কাছে, বিনয় হয়েছে।
আর এতে সে ছোট হয়ে যায়নি। বরং নিজেকে কৌশলে তোমার উপরে রেখেছে।
আমি জাস্ট অবাক হয়ে যাচ্ছি, এই মেয়েটা তোমাকে কতটা ভরসা করেছে। সে বিশ্বাস করেছে যে তুমি তাকে সাহায্য করবে।
সে তোমাকে আসলেই আপন ভাবে। বাট দুঃখের বিষয়, তুমি তাকে আপন ভাবতো পারোনি।"
"এতোটাও পর ভাবিনি, ভাবলে হয়তো সাহায্য করতাম না।"
"সমস্ত অহংকার ঝেড়ে ফেলো তিথি। শেহরিন ইনডিরেক্টলি দারুণ একটা সুযোগ দিয়েছে তোমাকে। সে যদি বিনা অপরাধ কিংবা অন্যায়ে নিজেকে নত করতে পারে,তুমি এক আকাশ পরিমাণ ইগো, অন্যায় নিয়ে কেন অপরাধবোধে ভুগবে? কেন নিচে পড়ে থাকবে? ওর এই সুযোগটা তুমি লুফে নাও। বিনয় হও। ওকে দেখিয়ে দাও, তোমার ভিতরেও একটা প্রস্ফুটিত মন আছে। শুধু মাত্র অন্যের উস্কানি এবং নিজের ইগোর কারণে দূরে সরিয়ে রেখেছিলে সেটা।"
মিসেস রেহানার কথাগুলোর অর্থ,তিথির কর্ণকুহরে নির্বিঘ্নে পৌঁছায়। শুকনো মুখে নির্নিমেষ চাহনিতে তাকিয়ে থাকে সে মায়ের দিকে। যে চোখের চাহনিতে প্রকাশ পায় একরাশ নম্রতা। এতোদিন ধরে সে নিজের মনের সঙ্গে এক অদৃশ্য যুদ্ধ করে আসছে। নিজের অহমিকাগুলোকে কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে নিজেকে হালকা করছে। যেটার ফলাফল, আজ শেহরিনকে সাহায্য করা হয়তো।
"কেন তোমরা বোনের মতো হতে পারো না? তুমি একটাবার ওকে স্নেহ করেই দেখো,ও তোমার স্নেহগুলোকে সম্মান করে কি না? দিনশেষে রক্তের পরিচয়ই কিন্তু আসল তিথি। অন্বেষা কোনো কাজে আসবে না তোমার, সে শুধু হুল ফুটিয়ে যাবে। কোনো প্রয়োজন নেই আপন ছেড়ে পর কে মাথায় তোলার। বরং আপনকেই মাথায় তুলো,সে তোমাকে মাথায় তুলবে।"
"আমি চেষ্টা করবো।"
"শেহরিন আমাদের বাসার অতিথি। আমি চাই একটাদিনের জন্য হলেও সে বুঝতে সক্ষম হোক,এটা তার আপন বড়জা'য়ের বাসা। যেখানে সে নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত।"
তিথি যৎসামান্য ঠোঁট প্রসারিত করে মাথা নাড়িয়ে ভিতরে চলে যায়। মস্তিষ্কে চলমান বিবেচনাবোধের দরপত্তনে সে আবারো নাজেহাল। একটু নিজস্ব সময় প্রয়োজন তার।
_______________________________________
রাত নয়টা,সুখনিবাস।
"আমি কি এখন আসবো?"
"যদি আমাকে ভরসা করতে না পারো।"
সানজি এক মুহূর্তের জন্য নিরব হয়ে যায় তিথির কথায়। তাৎক্ষণিক কি জবাব দিবে বুঝে উঠতে পারে না। অস্থিরচিত্তের পায়চারি কমিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,"ভাবি,মাইন্ড করবে না প্লিজ। তুমি হয়তো নিজচোখে মেয়েটাকে দেখতে পারছো সে কোন কন্ডিশনে আছে। আর কি ঝড় তার উপর দিয়ে বইয়ে যাচ্ছে। তার নিরাপত্তাটা আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এতো সতর্কতা মেনেও আমরা পেরে উঠছি না...
"তুমি আসতে পারো তাহলে সানজি। শেহরিন ঘুমাচ্ছে।"
"আমি চাইছি তোমাকে বিশ্বাস করতে ভাবি। কিন্তু..
"তোমার ভাইয়া হয়তো মানছে না তাইতো?"
সানজি নিশ্চুপ হয়ে যায়। কি করে বলবে এখন, তোমার ধারণাটাই সত্য। সরফরাজ এই মুহুর্তে শেহরিনকে তিথির কাছে থেকে নিয়ে আসার আদেশ দিয়েছে। এবং সেটা কঠিনচিত্তে। সে কোনোভাবেই রাজি নয় শেহরিন তিথির কাছে থাকুক। নিজেই যেতো আনতে কিন্তু সে ব্যস্ত আসিফের খোঁজে, সান্নিধ্যের কেস সামলাতে। দম ফেলার নিঃশ্বাসটুকু নিতে পারছে না। এদিকে তো আবার আজাদের মৃত্যু..টিভি চ্যানেলে অ্যাপার্টমেন্টে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়েছে।
"আচ্ছা তুমি এসে নিয়ে যাও শেহরিনকে। যদিও পরিস্থিতি অনুযায়ী তোমার এখন একা বের হওয়াটা উচিত নয়। বাবা..
" ভাবি.."
"বলো।"
"ভাইয়ার মনে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারবে কি?"
"তোমার ভাইয়া আমাকে বিশ্বাস করবে না।"
"বিশ্বাস করার মতো কাজ করলে নিশ্চয়ই করবে।"
"সেই সময়টুকু তো দিতে হবে।"
সানজি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। মলিন হেসে বলে,"আমি কালকে গিয়ে শেহরিনকে নিয়ে আসবো। ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার আমানতে ওকে রেখে দিলাম। তুমি আমার বিশ্বাসটুকু ভেঙো না প্লিজ। নইলে সরফরাজ এবং সান্নিধ্য ভাইয়ার কাছে আমি মুখ দেখাতে পারবো না কোনদিনও। ধরতে পারো,একটা রিস্ক নিলাম বড়সড়।"
অপর পাশ হতে কিছুক্ষণের জন্য নিরব সুর ভেসে আসে। তিথি তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয় না। তবে, সানজির প্রতীক্ষা দীর্ঘ হওয়ার আগেই স্পষ্ট স্বরে বলে উঠে,"কালকে দেখা হচ্ছে।"
তিথি ফোন কেটে দেয়। সানজি কান হতে ফোন নামিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিক পানে। জীবন কিছু কেড়ে নিলে হয়তো কিছু ফিরিয়ে দেয় তার সঙ্গে। তিথির এই একটু একটু পরিবর্তন এতো প্রতিকূলতার মাঝে খানিকটা হলেও স্বস্তির আভাস দিচ্ছে।
"এখন বের হবে?"
"না।"
"তাহলে?"
"সমস্যা নেই।"
"একা একা.."
সানজি ফোন ছেড়ে সান্নিধ্যের কাবার্ড হতে কিছু ফাইলপত্র বের করার জন্য উদ্যত হয়। মিসেস নাজনীনের দিকে না তাকিয়েই নিরেট গলায় বলে,"হঠাৎ এতো চিন্তা?"
"জিজ্ঞেস করছি এমনি। খবরে তো পরিস্থিতি খারাপ দেখাচ্ছে।"
"তিথি ভাবির কাছে শেহরিন।"
"তিথির কাছে??"
"কেন অবাক হচ্ছো?"
মিসেস নাজনীন সত্যি অবাক হন। কিন্তু মেয়ের সামনে খুব একটা প্রকাশ করেন না। তিথির কাছে শেহরিন রয়েছে কথাটা শুনে মুখোভঙ্গির কিছুটা হলেও পরিবর্তন হয়ে যায়। ধীর গলায় শুধায়,
"ভালো আছে?"
"জেনে কি করবে? ভালো না থাকলেই তো তোমার ভালো। এখন তো খুশি হয়েছো। ছেলে, ছেলের বউ দুজনেই অথই সাগরে ভাসছে। এটাই তো চেয়েছিলে।"
"এভাবে বলছো কেন?"
"অন্যভাবে বলার তো পথ রাখোনি। মেয়েটার এই দূর্দশার পিছনে কি তোমাদের কোনো দায়ভার নেই?"
মিসেস নাজনীন চুপ হয়ে থাকেন। সানজির প্রশ্নের উত্তর তার অজানা। এই মুহুর্তে নিজেকে নির্দোষ দাবি করার মন মানসিকতা তার নেই। ছেলে পুলিশি হেফাজতে, ছেলের বউয়ের দূর্গম পরিস্থিতি। একটু হলেও তার শক্ত মনের ভীতটাকে নাড়িয়ে দিয়েছে সবকিছু। পারছে না একপাক্ষিক হয়ে আর বিচার করতে।
"শেহরিনকে সুখনিবাসে নিয়ে আসবে?"
" না। অ্যাপার্টমেন্টেই থাকবো।"
"নিরাপদ হবে না তো।"
সানজি ফাইল হতে দৃষ্টি তোলে। মুখে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে,"সুখনিবাসে নিরাপদ হবে তো?"
মিসেস নাজনীন স্তব্ধ চোখে তাকান মেয়ের দিকে। কঠিন গলায় বলেন,"তুমি কি আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ভালোবাসো?"
"নিজেকে যদি প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারো আম্মা, তাহলে জবাবদিহিতা করতে এতো কেন ভয়? আমি বলেছিলাম না, তুমি আফসোসে পুড়বে। দেখো সত্যি কিন্তু তাই হচ্ছে। তোমার সাজানো গোছানো সংসারে আজ কোনো প্রাণ নেই। নিজের সন্তানদের ভালো মন্দের চাইতে স্বজনপ্রীতির দিকটা তোমার কাছে অত্যাধিক গুরুত্বের। আজ কেন শেহরিনের খোঁজ নিচ্ছো? যা খুশি হোক মেয়েটার তাতে তোমার কি? তুমি তো আর মা নও। তুমি নিজে ওকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছো শাশুড়ী কখনো মা হতে পারে না।"
মিসেস নাজনীনকে স্থিরমূর্তি করিয়ে দিয়ে সানজি হাতের ফাইলগুলো নিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। সে জানে, তার বলা কথাগুলোর ভারত্ত অনেক। হয়তো শুনতে দৃষ্টিকটু লাগে। কিন্তু উপায় নেই, মানুষের বিবেক জাগ্রত করতে এটুকুর প্রয়োজন আছে। তবে,সে বুঝেছে তার আম্মার চোখেমুখে স্পষ্ট অনুশোচনার রেশ ভেসে বেড়াচ্ছে বেশকিছুদিন হলো। বিশেষ করে, শেহরিনের প্রেগনেন্সির বিষয়টা জানার পর হতে। সে চায় একটু খোঁজ খবর নিতে,একটু কথা বলতে। কিন্তু পারে না কোনো একটা পিছুটানের জন্য।
দরজার কাছে গিয়ে হাঁটা রোধ করে সানজি। পিছু ঘুরে তাকিয়ে বলে,"আম্মা তোমার কাছে একটা অনুরোধ। শেহরিন যে তিথি ভাবির কাছে আছে এই নিয়ে তিথি ভাবিকে কোনো কুমন্ত্রনা দিবে না বা কোনো থার্ড ক্লাস মেয়েকে জানাবে না৷ তিথি ভাবি নিজেকে সংশোধনের পথে পা রেখেছে। তুমি কাঁটা বিছিয়ে আর দিকভ্রান্ত করো না। একটু দয়া করো। বিশ্বাস করো, মেয়েটা খুব কঠিন একটা সময় পার করছে। আল্লাহ যে ওকে জীবনের শুরুতেই এতো কঠিন একটা পরীক্ষা নিবে,সেটা আমরা কেউই ভাবতে পারিনি।"
সানজি চলে যায়। মিসেস নাজনীনের দৃষ্টি শূন্য হয়ে উঠে। কানে বাজতে থাকে শেহরিনের বিদায়কালে বলে যাওয়া কথাগুলো। মাতৃত্বের দিকটা তাকে ভঙ্গুর করে তোলে। সে কি সত্যি পাষাণের মতো আচরণ করেছে? নিজের ক্ষোভটাকে কি বেশিই অগ্রহণযোগ্য করে ফেলেছে যা আজ নিজের ছেলে মেয়ে স্বামীর চোখে তাকে অপরাধী করে তুলেছে?
কাবার্ড হতে একখানা ডায়েরি সানজির ফাইল নেওয়াকালে ফ্লোরে পড়ে গিয়েছিল। মিসেস নাজনীন সেটা তুলতে ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। ডায়েরিটা তুলে যথাস্থানে রাখতে গিয়ে ডায়েরির উপরি পৃষ্ঠায় চোখ আটকে যায় তার । যেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, শেহরিন এবং তার একগুচ্ছ জীবনকথা।
_____________________________
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভিআইপি ভিজিটিং রুম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষটির দেয়ালে লাগানো রয়েছে ফ্যাকাশে ক্রিম রঙ, মাঝখানে একটি বর্গাকার টেবিল। দুপাশে দুটো চেয়ার। টেবিলের উপর প্লাস্টিকের ফুলদানিতে কৃত্রিম অর্কিড সাজানো। কক্ষের এক কোণে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে একজন প্রিজন গার্ড।
দরজা খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করেন শাহজাহান খান। পড়নে তার সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা। কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট নিজে তাকে কক্ষ পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যান।
শাহজাহান সাহেব ধীর সুস্থে চেয়ারে গিয়ে বসেন। একটুখানি অপেক্ষার পালাবদল ঘটিয়ে, কয়েক মিনিট পার হতেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করে সান্নিধ্য। পড়নে তার সাদা টি শার্ট ও ধূসর ট্রাউজার। কারাবাসের চিহ্নস্বরূপ তাঁর চুল কিছুটা এলোমেলো হয়ে থাকলেও চোখেমুখ তার ধারালো ফলার ন্যায় তীক্ষ্ণ। হাঁটার ভঙ্গিমায় তার অ্যাটিটিউড ঠিকঠাক থাকলেও বাবার সামনে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পায়না।
"শেহরিন কেমন আছে?"
"হুম ভালো আছে।"
সান্নিধ্য চেয়ার টেনে সামনাসামনি বসে৷ দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে টেবিলে রেখে ভারী কন্ঠে বলে,
"কি করছো তোমরা?"
"কি করছি মানে?"
"নাসিরের লোক সুযোগ পেলো কিভাবে? এতোবড় কলিজা কিভাবে হলো আমার বাসায় প্রবেশ করার?"
"তুমি জেনেছো?"
"জানাটা অস্বাভাবিক?"
শাহজাহান সাহেব স্থির চোখে তাকান। ছেলের জ্বলন্ত মুখোরেখা দেখে ধীর স্বরে বলেন,"অস্বাভাবিক পরিস্থিতি হয়ে আছে। সবদিকটা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে সান্নিধ্য। বুঝতে চেষ্টা করো। আজাদের মৃতদেহ, তদন্ত নিয়ে নতুন করে দৌড় ঝাঁপ সৃষ্টি হয়েছে। সরফরাজ দিন রাত এক করে তোমার জন্য আসিফকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, আইনি লড়াই লড়ছে। তোমার সমস্ত লোক কাজে লেগে আছে। কেউই হাত গুটিয়ে বসে নেই..
"আমি জবাবদিহিতা চাই না বাবা। আমি শেহরিনের নিরাপত্তা চাই। কেন এরকম হলো?"
"আই'ম সরি। বিষয়টা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটে গিয়েছে। নাসিরের লোকগুলো টাকা খাইয়েছিলো আপার্টমেন্ট মালিককে।"
"তো মালিক বেঁচে আছে কেন?"
সান্নিধ্যের কথায় শাহজাহান সাহেব বিরক্তবোধ করেন। রাগান্বিত স্বরে বলেন,"তো তুমি কি চাও আরেকটা মা'র্ডার কেস এসে গলায় ঝুলে পড়ুক। কম হয়েছে? অতিরিক্ত বেপরোয়া তুমি সান্নিধ্য। যার কারণে আজ এই অবস্থা।"
"আমার যা খুশি হোক, শেহরিনের কিছু হবে না। এটা মেনে কাজ করো।"
"তুমি নিজেকে যতো পাওয়ারফুল ভাবছো,তোমার অপনেন্ট তার চেয়ে কিন্তু কম নয়। তোমার পদটা এখনও অক্ষত রয়েছে জন্য যে দুদিন পরে এমনই থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তোমার দল তোমার সঙ্গে বিট্রে করে চলেছে। ট্রাকল দেওয়া এতো সহজ নয়। এর মধ্যে আসিফকে আমরা যদি না ধরতে পারি যদি পুলিশ কিংবা নাসিরের লোক ধরে তাহলে সবশেষ।"
"পুলিশ চার্জশিট জমা দিয়েছে কি?"
"অতি শীঘ্রই দিবে। আবার নতুন করে শুরু হবে আইনি লড়াই।"
" ল'ইয়ার কি করছে?"
"সবাই সবার কাজে ব্যস্ত।"
সান্নিধ্য মুষ্টিবদ্ধ হাত ছেড়ে চেয়ারের সাথে গা এলিয়ে দেয়। দু'হাতে চুলগুলো পিছনে ঠেলতে ঠেলতে ঠান্ডা গলায় বলে,"যদি এবার কোনোভাবে বের হতে পারি তাহলে...
"আবার জেলে ঢোকার পথ করবে?"
শাহজাহান সাহেবের কথায় সান্নিধ্য মৃদু হাসে। শীতল চোখে তাকিয়ে বলে,"আমার বাসা তছনছ করে ফেলেছে। ভাগ্যক্রমে শেহরিন বেঁচেছে। ক্যান ইউ ইমাজিন? আমি তো মাথা থেকে বের করতে পারছি না।"
"শান্ত হও সান্নিধ্য। আমি বাইরে থেকে সব চেষ্টা করছি। মিডিয়া, প্রশাসন... সব জায়গায় প্রেশার দিচ্ছি। কিন্তু তোমাকে এই সময় একটু স্থির থাকতে হবে। লং টাইমের ব্যাপার স্যাপার। পাগলা কুকুরের ন্যায় খেপেছে সবাই। কামড় দোওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। আমাদের বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে।"
"যত টাকা লাগে লোক লাগাও।"
শাহজাহান সাহেব ঘড়িতে সময় দেখে উঠে দাঁড়ান। নিজ পাঞ্জবি ঠিক করতে করতে ভারী কন্ঠে বলেন, "টাকা কোনো ফ্যাক্ট না। ফ্যাক্ট হচ্ছে মানুষে। এক্ষেত্রে আসিফ হচ্ছে ট্রাম কার্ড। ও যার জালে আটকাবে সে এই খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিবে। জাস্ট একটু চিন্তা করে দেখো, তোমার লোক, তোমার সবকিছু কিন্তু আজ এই সময় তুমি হয়ে গিয়েছো অপশন ৷ আর এটাই রাজনীতি। অভিজ্ঞতা কথা বলে। উত্তেজিত হলেই সবকিছু সমাধান করা যায় না।
"দেখা যাক কি হয়।"
"তোমাকে দেখে আমি আশ্চর্য হই।"
"আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। রাজনীতিতে পা রাখার পর হতে বলে চলেছো, হজম করতে শেখো। এখন তো হজম করছি।"
শাহজাহান সাহেব ছেলের দিকে এক নজর তাকিয়ে থেকে গম্ভীর মুখোরেখায় মাথা নাড়িয়ে বলেন,"আসছি তাহলে।"
"শেহরিনকে দেখে রেখো।"
"রাখবো।"
অতঃপর কেটে যায় দুই মাস। এপ্রিলে হাওয়া বদল ঘটে৷ প্রকৃতিতে আসে আমূল পরিবর্তন। ঋতুর পালাবদলের সাথে পরিবর্তন ঘটে মানুষের জীবনের চিত্ররেখা। বৈশাখের ঝড়ো হাওয়ার মতো ঝড় এখনও বয়ে চলেছে শেহরিনের উপরে।
মাতৃত্বের নয় মাস দুই সপ্তাহ চলছে তার। ভরা পেট একদম।
শরীরে এসেছে বেশ পরিবর্তনের ছায়া। শুভ্র মুখটাতে স্নিগ্ধতার ভাটা পড়েছে, নেই কোনো প্রফুল্লতা। সাড়ে তিন মাস হয়ে গেলো, সে তার নেতাসাহেবের থেকে আলাদা। সে জানতো নেতাসাহেবকে ছাড়া থাকতে পারবে না। তবে তার ধারণা ভুল হয়েছে। সে পারছে থাকতে। তবে, রাতের শান্তির ঘুমটুকু উবে গিয়েছে এই দূর্গম যাত্রায়। স্লিপিং পিলস তার নিত্যসঙ্গী। হাই পাওয়ারের পিলস খেয়ে সে চোখ বুজে অতলে বুঁদ হয়ে থাকে। ঘুমের মধ্যে চোখের কার্নিশ বেয়ে তার জল গড়িয়ে পড়ে। কখনো কখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে অজান্তেই।
বৃষ্টিমুখো এক রাত। ঝমঝমে বৃষ্টিতে গাঢ় শীতল হয়ে উঠেছে চারিপাশ। সন্ধ্যা হতে চিনচিনে অসহ্য ব্যথা শুরু হয়েছে শেহরিনের। শুয়ে বসে কোনো কিছুতেই কূল পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে পেটের নাড়ি ছিঁড়ে বের হয়ে আসবে। আকাশ ভেঙে নামা ধারাপাতের শব্দে সব অন্য শব্দ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। তীব্র যন্ত্রণায় তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে।
প্রসব বেদনায় কাতরানো নারীর ছটফটানো অবস্থা দেখে সানজির মনে খানিকটা ভয় সে ভীড়ে। অধিক অভিমানে সে মিসেস নাজনীনকে ভিড়তে দেয়নি শেহরিনের কাছে এতোদিনেও। অ্যাপার্টমেন্টের সমস্ত ঝামেলা চুকিয়ে সে আর শেফালী থাকে শুধু। এছাড়া সরফরাজ, তিথি শাহজাহান সাহেব, রিজওয়ান সাহেব সবার আসা যাওয়া লেগেই আছে।
"আপা ভাইজানরে কল করো তাড়াতাড়ি। পানি ভাঙা শুরু হইছে। আর দেরি করোন যাইবো না।"
শেফালীর চিৎকার স্বরে বলা কথায় সানজি তড়িঘড়ি করে সরফরাজকে কল করে। চোখ মুখ তার ঘেমেঘেটে অবস্থা খারাপ। শেহরিনের মুখোরেখা ব্যথায় নীল হয়ে এসেছে দেখে সে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ডাক্তার ম্যামের ডেট অনুযায়ী সে নিশ্চিন্ত ছিলো এই ভেবে যে,হাতে এখনও সময় রয়েছে কিছুটা দিন। কিন্তু এতো তাড়াতাড়িই যে...
"হ্যালো ভাইয়া শুনতো পাচ্ছে? ভাইয়া.. তাড়াতাড়ি আসো। শেহরিনের অবস্থা ভালো না। ও কান্না করছে খুব। তুমি প্লিজ এক্ষুণি আসো।"
ফোনের অপর পাশ হতে কি বলে শোনা যায় না। সানজি শোনার অবস্থাতেও থাকে না। তাড়াতাড়ি কল কেটে সে তিথিকে ফোন করে সেই সাথে রিজওয়ান সাহেবকে।
"একটু শান্ত হও সোনা। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
শেহরিন ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠে। লাল চোখদুটোতে টপটপ করে জল ঝরছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়েও ব্যর্থ হচ্ছে বারেবারে। নাক মুখ দিয়ে ক্রমাগত শ্বাস টানতে টানতে বলে,
"আপু..আমি মরে যাচ্ছি মনে হয়..একটাবার আমাকে উনার কাছে নিয়ে যাও। আমি সহ্য করতে পারছি না।"
"কিছু হবে না তোমার..একটু দাঁড়াও সোনা । শেফালী নিচের সব গেট খুলে দাও প্লিজ।"
শেফালী উঠে দৌড়ে চলে যায়। শেহরিনের অবস্থা দেখে তার রীতিমতো গা হতে ঘাম ঝরছে। জীবনে অনেক পোয়াতির মুমূর্ষু অবস্থা দেখেছে সে, কিন্তু এমন কঠিন অবস্থা কমই দেখেছে।
রাত সাড়ে আটটা। তুমুল বর্ষণের মাঝে ছুটে আসে সরফরাজ এবং রিজওয়ান সাহেব। রিজওয়ান সাহেব পথিমধ্যেই ছিলেন। মেয়ের জন্য প্রত্যেক সপ্তাহে সে চট্টগ্রামে আসেন এখন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, আজ একদম সময় মতো এসেছেন।
বৃষ্টির মাঝে পুরো গাত্র ভিজিয়ে শেহরিনকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হসপিটালে নেওয়া হয়। লাল রঙের আলো ফেলে ঘুরতে থাকা সাইরেন তীব্র শব্দ করে বের হয়ে যায় অ্যাপার্টমেন্ট থাকে। মেঘ বৃষ্টির দোলাচলে সেই করুণ সুর ভেসে বেড়ায় চারপাশজুড়ে।
তীব্র বেগে গাড়ি ছুটে চলে হাসপাতালের দিকে। ঝড়ো হাওয়ায় রাস্তার প্রতিটা বাঁক যেন শেহরিনের সহ্যসীমার পরীক্ষা নিয়ে চলে। হসপিটাল হতে মাত্র কয়েক কিলোমিটার আগে হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত বিভীষিকা পথ আটকে দাঁড়ায় তারই মাঝে।
সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় গাড়ির চাকা।
বৃষ্টির মাঝে রোড লাইটের আবছা আলোয় চোখের সামনে এসে ভীড়ে আড়াআড়িভাবে দাঁড়ানো দুটো গাড়ি। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সামনে। অ্যাম্বুলেন্সের ক্রমাগত হর্ন তাদের কর্ণকুহরে পৌঁছেও যেন পৌঁছায় না।
"রিমন রাস্তা ক্লিয়ার কর।"
"ভাই আপনার মামার লোক নেমেছে রাস্তায়।"
সরফরাজের মুখ শক্ত হয়ে ক্রোধাগ্নিতে তেতে উঠে। হাত মুঠো পাকিয়ে বলে,"মামা মাই ফুট। যেমনে পারিস সরিয়ে দে।"
রাজ্জাক সাহেবের ভাড়া করা গুন্ডা অনেকদিন হলো ওঁত
পেতে ছিলো মোক্ষম সুযোগের জন্য। আজ সেই সুযোগ মিলতেই হিংস্র হয়ে উঠে। অ্যাম্বুলেন্স সহ সরফরাজের গাড়িকে দুটো গাড়ি মিলে আটকে ফেলে।
ভিতরে শেহরিনের গা কাঁপিয়ে চিৎকারে রিজওয়ান সাহেব হতভম্ব হয়ে গাড়ি হতে নেমে আসেন। বর্ষণের প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে মেয়ের কষ্টের ছাপ তার চোখ হতে গড়িয়ে পড়ে।
"আমি রিকোয়েস্ট করছি, প্লিজ আপনারা রাস্তাটা ছাড়ুন। আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে দিন। এতোটা নির্দয় হবেন না।"
রাজ্জাক সাহেব গাড়ির কাঁচ নামিয়ে ক্রুর হাসি হাসেন। রিজওয়ান সাহেবের অনুনয় মাখা হাতে অনুরোধ তার কাছে বেশ মজা লাগে। আজ একদম প্রতিশোধের মোক্ষম সময়। এই সময়টার জন্য তার এতো অপেক্ষা।
"আপনার মেয়ের জামাই আমার বিজনেস ধ্বংস করেছে, আমাকে চট্টগ্রাম ছাড়া করেছে। আমার মেয়ের লাইফ হেল করেছে। পথ ছাড়ি কিভাবে বলুন?"
"সান্নিধ্যের সঙ্গে বোঝাপড়া আপনার। আমার মেয়ে কি দোষ করেছে? "
"আলাদা কোথায়? এক জায়গায় ঘা দিয়ে সুঁচ ফোটাতে না পারলে একটু তো জায়গা পরিবর্তন করতেই হয়।"
"তার মানে কি আপনি শক্তের সঙ্গে লড়াই না করতে পেরে দূর্বলতাকে বেছে নিয়েছেন? ভয় পান?"
রাজ্জাক সাহেবের জবাব দেওয়ার আগেই সরফরাজ বৃষ্টিতে ভিজে গাড়ি হতে নেমে আসে। চোখ তার ক্ষুরধারের ন্যায় জ্বলছে। হাতের মুঠো পাকিয়ে সে গাড়ির নিকটে আসে। তীক্ষ্ণ গলায় বলে,"রাস্তা ছাড়..।"
"তুই!!..মামাকে তুই করে বলছো? সান্নিধ্যের ছোঁয়া পেয়েছো? "
সরফরাজের বাঁকা ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি খেলে যায়। বৃষ্টির ফোঁটা তার কপালের ভাঁজ বেয়ে গড়িয়ে নেমে পড়ে।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে, "শুয়োরের বা'চ্চা রাস্তা ছাড়।"
" সরি ভাগ্নে পারছি ন..
রাজ্জাক সাহেব কথা শেষ করতে পারে না। এর মধ্যেই সরফরাজ পেশিবহুল হাতের কনুই দিয়ে গাড়ির কাঁচটা সজোরে আঘাত করে। ক্ষিপ্র গতিতে উইন্ডো গলিয়ে চেপে ধরে গলা।
সরফরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। শিরাগুলো ফুলে উঠে কপালের দু'পাশে। অপ্রত্যাশিত এই আক্রমণে রাজ্জাক সাহেবের মুহূর্তেই চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠে। গলার শিরায় শক্ত হাতের চাপ অনুভব করতেই দম আটকে আসতে শুরু করে। ককিয়ে উঠে সে।
"ছা..ছাড়।"
রাজ্জাক সাহেবের লোকজন পাল্টা আক্রমণের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেই সরফরাজ ঠান্ডা শীতল কণ্ঠে বলে,"জানে মেরে দিবো একদম।"
রাজ্জাক সাহেব কোনমতে হাত উঁচু করে তাদের থামতে বলেন। মুখ দিয়ে ফেনা বেরোবার উপক্রম হয়ে এসেছে তার। কপালে দৃশ্যমান কুটিল রেখাগুলো পাপের চরম মূল্য চোকাতে বসেছে।
দমবন্ধ হয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে দুর্বলভাবে হাত দিয়ে সরফরাজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেন।
একটানা দুই মিনিট ধরে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি চলার পর
রাজ্জাক সাহেবের গলা থেকে হাত সরিয়ে নেয় সরফরাজ। ইতিমধ্যে রিমনের ডাকে তার লোকেরা গাড়ি নিয়ে এসে হাজির। পুরোটা ঘিরে ফেলেছে। রাজ্জাক সাহেব প্রায় নিথর হয়ে গাড়ির কাঁচের সাথে হেলান দিয়ে হাঁপাতে থাকে।
সরফরাজ দু হাত ঝেড়ে নিঃশব্দে হাসে। শীতল কণ্ঠে বলে,
"আজ শেহরিনের কোনো ক্ষতি হলে শেষরাত হওয়ার আগেই তোর নামের আগে মরহুম রাজ্জাক চৌধুরী বসবে। মাইন্ড ইট।"
রাজ্জাক সাহেব কোনো শব্দ উচ্চারণ করে না। তার লোকদের দূর্বল হাতে ইশারা করে রাস্তা থেকে গাড়ি সরিয়ে নিতে।
মুহূর্তের মধ্যে পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। সেই সাথে কমে আসে বৃষ্টির বেগ। কিন্তু কমে না শুধু শেহরিনের মূর্ছিত কান্না। বৃষ্টির ঝমঝমানো শব্দ তার কান্নার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকে। অ্যাম্বুলেন্স আবার সাইরেন বাজিয়ে হসপিটালের দিকে ছুটতে শুরু করে। গাড়ির ফ্রন্ট লাইটের সাদা আলো অন্ধকারে টিপটিপ করে জ্বলতে জ্বলতে অদৃশ্য হয়ে যায়। একটি নতুন জীবনের ক্ষীণ আশার প্রদীপ জ্বালাতে কতকগুলো মানুষ খেঁই হারিয়ে ফেলে। নিরব প্রার্থনা নতুন সেই জীবনটি যেন পৃথিবীর আলো দেখতে পায়।
--------------------------------------------------
রাত দশটা একুশ মিনিট। হসপিটালে ছুটে এসেছে সুখনিবাস হতে শাহজাহান খান এবং মিসেস নাজনীন। এসেছেন শেহরিনের মামা শফিক সাহেব সেই সাথে তিথি এবং মিসেস রেহানা।
প্রত্যেকের চোখে মুখে আতঙ্কের রেশ। অন্যদিকে পাগলপ্রায় হয়ে পায়চারি করছেন রিজওয়ান সাহেব। তার শরীরে রক্ত হিম হয়ে উঠেছে। বুকের ভিতরে যে কষ্টটা হচ্ছে সেটা সে তার স্ত্রীর অন্তিমকালেও এতোটা অনুভব করতে পারেনি। কিন্তু আজ মেয়ের জন্য তার যেন সব আকাশ ফুঁড়ে ভেঙে পড়েছে।
ঠিক সাড়ে দশটার সময় ড:ফারজানা হাসিন লেবার রুম হতে বের হয়ে আসেন। হাতের তোয়ালেতে মোড়ানো একটা জীবন্ত অস্তিত্ব। পিছনে দুজন নার্সের মুখে নিরব হাসি।
"ইটস বেবি গার্ল।"
সানজি তিথি অস্ফুটস্বরে আওড়ে উঠে তাদের বাড়ির নতুন উত্তরাধিকারকে দেখে। খুশিতে চোখ জল এসে জমে। এক মুহুর্তে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে পশলা বৃষ্টি নেমে যায়। আপ্লুত হয়ে উঠে প্রত্যেককে। রিজওয়ান সাহেব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। ব্যস্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন,"আমার মেয়ে..? "
"মোটামুটি ভালো আছে। চিন্তা করবেন না। সময় লাগবে একটু।"
"আমার সুখনিবাসের সুখ এসে গিয়েছে।"
সাদা কুন্ডলীর মধ্যে পেঁচানো ফুটফুটে তুলতুলে নরম আত্মাটা নড়েচড়ে উঠে। মিসেস নাজনীন অশ্রু ভরা চোখে কোলে নেন। ছেলের অনুপস্থিতি তাকে পুড়িয়ে তোলে ভিতরটা। আফসোসে আফসোসে দগ্ধ হয়ে অবশেষে সে একটুখানি নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে ছুটে এসেছেন হসপিটালে।
শাহজাহান সাহেব নাতনীর সামনে দাঁড়িয়ে আযান দেন। এরপরেই একে একে রিজওয়ান সাহেব, তিথি, সরফরাজ সকলে কোলে নেয়। সবশেষে নেয় সানজি। দৃঢ়কণ্ঠে সদ্য জন্মানো বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
"ওয়েলকাম, সান্নিধ্য শাহজাদ খানের কন্যা শাহমিকা শাহজাদ খান। জীবন যুদ্ধের এই ক্রান্তিলগ্নে আপনি শান্তি হয়ে আমাদের কাছে এসেছেন। আপনার বাবার রাজকন্যা আপনি,আপনার বাবার শেরনি আপনি। বাবার সঙ্গে আপনার দেখা হওয়ার লড়াইটা যে এখনও অনেক বাকি। যেতে হবে অনেকটা দূর। প্রস্তুত হন।"