রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৪৫

🟢

"হ্যালো।"

"যাক ফোনটা তাহলে ধরলেন এমপি সাহেব।"

"কে?"

"তাওফিক রহমান বলছি।"

সান্নিধ্য খানিকটা কপাল কুঁচকে কান হতে ফোন নামিয়ে এক নজর নাম্বারের দিকে চায়। মুখোরেখায় কিছুটা বিরক্তি ভাব এলেও নিরেট গলায় বলে,"সিম কম্পানির বিজনেস দিয়েছেন নাকি। প্রত্যেক মাসে নাম্বার পরিবর্তন করেন যে।"

"গলার স্বর শুনে চিনতে পারোনি?"

"না। গাড়ির মধ্যে আমি।"

"কার্যালয়ে যাচ্ছো?"

"হ্যাঁ। কিছু দরকার?"

ফোনের অপর পাশ হতে তাওফিক রহমানের কথার স্বর পালটে যায় মুহুর্তেই। গম্ভীর মুখোভঙ্গি করে বলেন,"তোমার কারণে সুখনিবাসে ঝামেলা হয়েছে। আমার মেয়ে তিথি বাসায় চলে এসেছে। সরফরাজ কিসব ডিভোর্স ডিভোর্স করছে। এসব পাগলামি করার মানে কি?"

"ভাবি সুখনিবাস ছেড়েছে?"

"হ্যাঁ।"

সান্নিধ্য ইশারায় রিমনকে একটু আস্তে ড্রাইভিং করার নির্দেশ দেয়। মুখে চওড়া হাসি টেনে বলে,

"বাহ। এতো ভালো একটা খবর আমাকে জানানো হয়নি? এটা কোনো কথা হলো?একবারে গিয়েছে নাকি?"

"তুমি কি ফান করছো আমার সাথে সান্নিধ্য? আমি ফান করার মতো কিছু বলেছি?"

"শত্রুর কিল গুঁড়ি খেতে খেতে জীবন বিতৃষ্ণা হয়ে গিয়েছে আংকেল। আর ফান টান আসে না। সবক্ষেত্রেই এখন সিরিয়াস আমি।"

"তার মানে তুমি এটাকে ঠিক মনে করছো?"

"ভুল তো কিছু দেখছি না। সরফরাজ বাঘের বাচ্চা। কোনো কন্ট্রোভার্সি না রেখে ডিরেক্ট ডিভোর্সে চলে গিয়েছে।"

"তুমি নিজে কখনো সোজাপথে চলো না, তোমার ভাইকেও চলতে দিচ্ছো না। এসব কিছু হচ্ছে তোমার প্ল্যান। তুমি সরফরাজকে উস্কিয়েছো। তা নয়তো সরফরাজ এরকমই ছেলেই নয় যে, আমার মেয়েকে ডিভোর্স দিবে।"

সান্নিধ্য চোখ হতে সানগ্লাস নামিয়ে ঠোঁট উল্টে হাসে। শান্ত কন্ঠ ঠেলে বলে, "ভাগ্য ভালো আমি সরফরাজকে উস্কিয়ে দেইনি। উস্কালে তো মার্ডার কেস হয়ে যেতো। আপনার মেয়ে তো সুবিধার না। স্বভাব চরিত্রে থার্ড ক্লাস। একদম আপনার মতো। ভাবিকে দেখলে কেনো জানি মনে হয় আপনাকে দেখছি। বাট এটা সত্যি ভাগ্যগুণে একটা ভালো বউ পেয়েছিলেন আপনি। ছোটবেলায় হয়তো ভুলে একটা ভালো কাজের ফল হিসেবে পেয়েছেন। বাট দুঃখের বিষয় তার ভালো, কোন কাজেই আসেনি। স্বামী আর মেয়ে দুটোই হয়েছে ফোর টুয়েন্টি লম্পট। এক্ষেত্রে ভাবির দোষ একটু কমই। কারণ তাকে কন্ট্রোল করেন তো আপনি।"

তাওফিক সাহেব গলার টাই টেনে হালকা করে নেন। শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে শক্ত গলায় বলেন,

"ফালতু কথা বলবে না সান্নিধ্য। নিজের দোষ আমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছো? আমার মেয়ের চোখের পানি কিন্তু আমি বরদাস্ত করবো না বলে দিলাম। ভালোই ভালো বলছি সরফরাজকে বোঝাও। নয়তো এর পরিণতি ভীষণ খারাপ হবে। আমাকে খেপিয়ো না।"

"আপনি কি পাগলা কুকুর? খেপালেই খেপে যাবেন। বুঝিনা এসব উটকো ঝামেলা আমার কাছেই কেনো আসে। আপনি আপনার মেয়ে জামাইকে নিজে না বুঝিয়ে আমার কাছে কেনো এসেছেন? আপনি ভাবলেন কি করে আমি আপনার কথা শুনবো? উল্টো এখন সরফরাজের কাছে আপনার নামে আমি উল্টো পাল্টা বলে ওকে আরো জ্বালিয়ে দিবো। ডিভোর্স যাতে আরো তাড়াতাড়ি হয় সেই ব্যবস্থা করবো।"

"সান্নিধ্য বেশি বাড়াবাড়ি করবে না বলে দিচ্ছি। মনে করো না, আমি রাজ্জাক। ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালাবো। তোমার বিরুদ্ধে মাঠে নামার কিন্তু আমার হাজার অপশন রয়েছে।"

"আপনি নামেননি এখনো? মেয়েকে দিয়ে যেসব করাচ্ছেন এগুলো তাহলে কি? নিজেদের ব্যবসা বাঁচাতে পার্টনারশিপ স্ট্রং করতে আপনার মেয়ে আর অন্বেষাকে লেলিয়ে দিয়েছেন।"

"তুমি কি ভাবছো তোমাকে আমি বশ করতে পারবো না?"

সান্নিধ্য সিটে গা এলিয়ে দেয়। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, "আসেন তাহলে বটতলায়। সামনাসামনি বসে বশীকরণ খেলা খেলি। কিছু জাদুবিদ্যাও শেখা হয়ে যাবে।"

"তুমি ভালো হবে না কখনো।"

"নিজে খারাপ হয়ে আমাকে ভালো হতে বলছেন?"

"আমি বেশি কথা বলতে চাই না সান্নিধ্য। বিষয়টা ক্লিয়ার করো। সরফরাজকে বোঝাও এবং আমার মেয়ের কাছে এসে সরি বলে সবকিছু মিটিয়ে নিতে বলো।"

"এই মুহুর্তে আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে একটা খারাপ ওয়ার্ড দ্বারা আপনাকে অ্যাখায়িত করতে। বাট বড় ভাইয়ের শ্বশুর জন্য পার পেয়ে গেলেন। তবে যদি ডিভোর্স হয় তাহলে অবশ্যই বলবো আপনি একটা মাদা***।"

আসন্ন গালি শুনে তাওফিক সাহেব কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিরব হয়ে যান। অতঃপর ফোন কেটে দেন সরাসরি। সান্নিধ্য ফোন কাটার শব্দে কান হতে ফোন নামিয়ে নেয়। স্ক্রিনের পানে চেয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে সে সানগ্লাস এঁটে নেয় চোখে।

এমপি সাহেবের কথা শেষ হতেই রিমন গাড়ির গতি তোলে। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারে না। আগরতলা রোডে হঠাৎই গাড়ির গতি আস্তে আস্তে কমে একদম থেমে যায় । রিমন পিছু ঘুরে সান্নিধ্যের দিকে দৃষ্টি রেখে নম্রসুরে বলে,

"স্যার সামনে নাসির চৌধুরীর সমাবেশ শুরুর প্রস্তুতি চলছে।"

সান্নিধ্য হাত ঘড়িতে সময় দেখে নেয়। সাড়ে দশটার কাছাকাছি ঘন্টার কাঁটা। এতো সকালে রাস্তা ব্লক করে জনসমাবেশের আয়োজন দেখে মেজাজ তার গরম হতে থাকে। গাড়ির কাঁচ

নামিয়ে সে চুপচাপ পরিস্থিতি অবলোকন করে।

নাসির চৌধুরীর দলের নেতারা মাইক্রোফোনে জোরালো বক্তৃতা দিয়ে চলেছে আর তাদের সমর্থকেরা দিচ্ছে স্লোগান। রাস্তা সম্পূর্ণরূপে অচল। অদূরে অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য রাস্তা ধরছে সামনে এগুবার পথ না পেয়ে। একে তো ওয়ার্কিং টাইম তার উপরে স্কুল কলেজের ইউনিফর্ম পরা কিছু শিক্ষার্থীও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে হতাশ হয়ে।

"আরহাম এখানকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করো। এখনই।"

"জ্বি স্যার।"

আরহাম তৎক্ষণাৎ মোবাইল ফোনে ওসি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিজস্ব কথা বলা শেষে ফোনটি সে সরাসরি সান্নিধ্যকে ধরিয়ে দেয়।

"এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খান বলছি।"

"জ্বি স্যার।"

"দিনের বেলায় চোখ খোলা রেখে ঘুমালে তো সমস্যা। কানের কাছে কি এ্যালার্ম বাজিয়ে উঠাতে হবে? টের পান না কিছু?"

"স্যার.."

"আগরতলা রোডে আটকে আছি। রাস্তা ব্লক করে ওয়ার্কিং টাইমে সমাবেশ করার পারমিশন কে দিয়েছে? পাবলিকের চলাচল, অ্যাম্বুলেন্স, স্কুল কলেজের বাচ্চাদের রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছে। এটা কি বাপের সম্পত্তি? নাকে তেল দিয়ে ঘুমান? নিয়মনীতি কি সব গুলিয়ে খেয়েছেন? হলে বলুন, আপনার তেল ছাড়ানোর ব্যবস্থা করছি আমি।"

সান্নিধ্যের ধারালো স্বরে পুলিশ অফিসার শুকনো ঢোক গিলে। হাত দিয়ে ফোর্সদের বের হওয়ার নির্দেশ দিতে দিতে নিজেও ক্যাপটা একহাতে নিয়ে দৌড়ে বের হয় যায়।

"সরি স্যার আসলে.."

"আমি আপনাকে সরাসরি এবং স্পষ্ট নির্দেশ দিচ্ছি,দশ মিনিটের মধ্যে সমাবেশ যেকোনো ভাবে ছত্রভঙ্গ করুন। রাস্তা একদম ক্লিয়ার করুন এন্ড নেক্সট টাইম যদি এরকম দেখেছি আপনাকে আমি নিজ দায়িত্বে অবসরে পাঠাবো।"

ফোন রেখে দশ মিনিটের মাথায় পুলিশের জিপ হাজির হয়ে স্পটে। ওসি আকবার করীমের নেতৃত্বে পুলিশ সমাবেশ ভেঙে দেওয়ার জন্য এগোতেই অবস্থা উত্তপ্ত হয়ে উঠে।

"এটা গণতান্ত্রিক অধিকার। সমাবেশ ভাঙার নিয়ম নেই আপনাদের।"

"জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করে কোনো অধিকার খাটে না। পিছিয়ে যান।"

নাসির চৌধুরীর লোকজন খেপে যায়। পুলিশ তাদের জোর করে সরানোর জন্য এগোলে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। কিছু দলীয় নেতা কর্মী রাস্তা হতে পাথর উঠাতেই পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। এক মুহুর্তে পরিবেশ হয়ে উঠে অস্থিতিশীল। দূর হতে সান্নিধ্য চুপচাপ গাড়িতে বসে দেখতে থাকে এই উত্তপ্তময় দৃশ্য। কপালের রগগুলো তার স্পষ্ট দৃশ্যমান। হাতের মুঠো শক্ত করে চেপে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।

গাড়ির ভাঙা কাঁচ, ইট পাথরের টুকরো, টিয়ারশেল সব মিলিয়ে আগরতলা রোডে নামে ধোঁয়াশা। সাধারণ জনগন সহ অগণিত যানবাহন আটকে পড়ে তাতে। কিন্তু পুলিশের সংখ্যা ও প্রস্তুতি বেশি থাকায় তারা দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে, লাঠিচার্জ করে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে তোলে প্রিজন ভ্যানে ।

সবমিলিয়ে প্রায় পনেরো বিশ মিনিটের মতো সময় ব্যয় হয় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আয়ত্তে আনতে। সেই সাথে ঘটে এই ক্যাচাল হ্যাঙ্গামার অবসান। অবশেষে রাস্তা ক্লিয়ার হয়। যানজট কেটে যাওয়ার সাথে সাথে গাড়িগুলো আবারও চলাচল শুরু করে।

সান্নিধ্য গাড়ির উইন্ডো দিয়ে একপলক দেখে নেয় চারপাশটা। চোখ পড়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা নাসির চৌধুরীকে। যিনি হতাশ ও রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে দাঁড়িয়ে চিল্লাপাল্লা করে চলেছেন।খুব সম্ভবত তিনিও বেত্রাঘাত খেয়েছেন। পুলিশ তাঁকেও জোর করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

সান্নিধ্যের ঠোঁটে তীক্ষ্ণ বাঁকা হাসির দোল খেলে। রিমনকে ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দেয় গাড়ি স্টার্ট করতে। রিমন নির্দেশ পাওয়া মাত্র তার কাজে মনোনিবেশ করে।

এক নিমিষে নাসির চৌধুরীকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় কালো সানগ্লাস পরিহিত এমপি সাহেব। ঠোঁটের কোণে তখনও তার বাঁকা হাসি জ্বলজ্বল করছে। পিছনে ফেলে যায় শত্রুর প্রতি তার একরাশ অবজ্ঞা এবং হিংস্রতাকে।

____________________________________

শীতের মধ্যাহ্নকাল। ঘড়িতে খুব সম্ভবত তিনটে বেজে চলেছে কিংবা তার একটু বেশি। কনকর্ড জারা অ্যাপার্টমেন্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে থামে রিজওয়ান সাহেবের গাড়ি। সান্নিধ্যের ব্যক্তিগত পাহারাদার আজাদ এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দেয়। হাসি মুখে প্রদান করে সালাম।

"আসসালামু আলাইকুম স্যার।"

"ওয়ালাইকুম সালাম। আজাদ?"

"জ্বি স্যার আমিই আজাদ।"

"ওকে। গুড।"

রিজওয়ান সাহেব একাহতে ব্যাগ সমেত গাড়ি হতে নামেন। যার মধ্যে রয়েছে হাইড্রো ফ্লাস্ক লাঞ্চ বক্স। পড়নের কালো স্যুটটা হালকা টেনে ঠিক করে আজাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বলেন,"কাজের প্রেশার কেমন?"

"খুব একটা নয় স্যার। ম্যাডাম তো এক ভার্সিটি ছাড়া বাসা থেকে বেরই হননা। আপনি উপরে যেতে পারেন স্যার।"

"আচ্ছা সমস্যা নেই। একটু নিচে বসি আসো।"

"নিচে বসবেন স্যার?"

রিজওয়ান সাহেব হাত ঘড়িতে সময় দেখে মৃদু হেসে বলেন,"মেয়ে এই সময় ঘুমায়। ডিস্টার্ব করতে চাচ্ছি না। একটু ওয়েট করি।"

আজাদ প্রথম দফায় অবাক হলেও পর মুহুর্তে নিজেকে সামলে নেয়। অ্যাপার্টমেন্টের নিচে গেস্ট রুমে সে সাদরে নিয়ে যায় রিজওয়ান সাহেবকে। সেখানে ঠিকমতো বসার ব্যবস্থা করে দিয়ে বলে,"স্যার চা বা কফি।"

"এখন কিছু লাগবে না। ধন্যবাদ। তুমি বসো। তোমার সঙ্গে আলাপ করি।"

"স্যার..আপনি এতো বড় মাপের মানুষ হয়ে আমার সাথে..?"

"মানুষ মাপো তুমি?"

"না..মানে।"

"হাহা। এসো তুমি, আমার পাশে বসো। সৃষ্টিকর্তার কাছে সব সমানে সমান। মানুষ হয়ে আমরা অসমান করবো কেন?"

আজাদ সাহস পায়। মুখে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি টেনে রিজওয়ান সাহেবের সঙ্গে গল্প জুড়ায়। নানান আলাপ আলোচনায় মত্ত হয়ে উঠে মুহুর্তেই। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সম্মানীয় কন্ঠে সে প্রতিত্তুর দেয় প্রতিটি কথায়। এমন নামধারী বড়লোক মানুষ সে শতকে দু একটা করে পায়,যাদের সৃষ্টিকর্তা সত্যিকারে মানুষ হিসেবে দুনিয়াতে পাঠায়।

বিকেল চারটা পায় হয়। আজাদ উশখুশ করে এতোক্ষণ ধরে স্যার অপেক্ষা করছে দেখে। মেয়ের প্রতি বাবা হিসেবে ভালোবাসা যত্ন চোখে পড়লেও এতোটা গভীরতা তাকে অবাকের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে গিয়ে পৌঁছায়।

বিজ্ঞাপন

"স্যার ম্যাডামকে ফোন করুন। এতোক্ষণে হয়তো ঘুম ভেঙেছে।"

"সম্ভবত ভাঙেনি। আর একটু ওয়েট করি।"

রিজওয়ান সাহেবের মুহুর্তেই কল আসে ফোনে। রিসিভ করা মাত্র অপর পাশ হতে কারো ভগ্ন কন্ঠে বলা কথায় সে কিছুটা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। স্থির গলায় বলেন,"আচ্ছা আমি আসছি। তুমি হসপিটালে নিয়ে যাও।"

"স্যার কোনো সমস্যা?"

"একটু সমস্যা। আহ, আমাকে একটু হেল্প করতে পারবে?"

আজাদ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সম্ভ্রম কন্ঠে বলে, "জ্বি স্যার অবশ্যই।"

"আমার একটা পেন এবং একটা কাগজ লাগবে।"

"এক্ষুণি আনছি।"

আজাদ এক মিনিট সময় ব্যয় করে একটা কলম সাথে একটা নোটপ্যাড নিয়ে আসে। রিজওয়ান সাহেবকে দিতেই তিনি নোটপ্যাড উন্মুক্ত করে কিছু একটা লিখতে শুরু করেন। আজাদ প্রাইভেসি রক্ষার্থে কিছুটা দূরে গিয়ে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

মিনিট দশেক এর মধ্যে লেখা হয়ে যায় রিজওয়ান সাহেবের। নোটপ্যাড হতে পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে সুন্দর করে ভাঁজ করে তিনি ব্যাগের ভিতরে রেখে দেন।

"এই ব্যাগটা পৌনে পাঁচটার দিকে শেহরিনের কাছে পাঠিয়ে দিবে। আমি আসছি।"

"কিন্তু স্যার... "

রিজওয়ান সাহেব আজাদের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে স্মিত হেসে বলেন, "কাজটা গুরুত্বপূর্ণ। আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।"

--------------------------------------------

জানালার কাঁচে শিশির জমেছে। কুয়াশা পড়েছে দূর পর্বতে। সারি সারি ল্যাম্পপোষ্টের মলিন আলো জ্বেলে উঠতেই বোঝা যায় ধরণীতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামছে।

শিশিরভেজা সেই জানালার পাশে সিঙ্গেল সোফাটায় স্থির হয়ে বসে আছে শেহরিন। সামনে ছোট সাইড টেবিলে বাবার পাঠানো লাঞ্চ বক্স খুলেছে সে। ফুলকপি, শিম, আলু দিয়ে কাতল মাছ রান্নার সুঘ্রাণ ছড়িয়েছে। সুদূর ঢাকা হতে চট্টগ্রামে এসেছে বাবার হাতে রান্না। পেটে খিদে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে তার। কতোদিন পরে চিরচেনা সেই রান্নার সুবাস নাকে ভেসে আসছে। কত মিস করেছে সে।

শেহরিন বাবার পাঠানো চিরকুটটা উন্মুক্ত করে ধীর হাতে। কাগজের ভাঁজ খুলে ঠোঁটে নাড়ে সে,

আমার মা,

তোমার জন্য ছোট্ট একটা উপহার। জানি না রান্না কেমন হয়েছে। খুব ভালো হবে না এটা নিশ্চিত তবে আশা করছি একটু ভালো লাগবে। দীর্ঘদিন রান্না থেকে দূরে থাকার কারণে সবকিছু হয়তো ঠিকমতো ব্যালান্স করতে পারিনি। তবে,কাদের টেস্ট করে বলেছে ভালো হয়েছে। এতেই সামান্য সাহস সঞ্চার করে তোমার জন্য নিয়ে এসেছি।

তুমি সেদিন বলার পর হতে তোমার পাগল বাবার কেন জানি গলা দিয়ে সে খাবার আর নামেনি। কাদের রান্না করলেও সে স্পর্শ করতে পারেনি তা। রাজকন্যাকে না খাইয়ে বাবার যে সাধ্য নেই খাওয়ার।

আমি ভীষণ, ভীষণ ভাবে দুঃখিত মা। তোমার সঙ্গে দেখা হলো না। কাদেরের হঠাৎ অসুস্থতার খবর পেয়ে আমাকে ছুটতে হচ্ছে আবারো ঢাকায়। এই মুহুর্তে তার পাশে থাকাটা আমার কর্তব্য। সারাদিন ভার্সিটি করে এসে তোমার ক্লান্ত ঘুমটাকে নষ্ট করা অর্থহীন। ইনশাআল্লাহ আমি আমার রাজকন্যাকে দেখতে আবার আসবো। আমার মায়ের হাতের রান্না টেস্ট করবো তখন। আর হ্যাঁ মাছ খেতে সমস্যা হলে জোর করে খাওয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি চাইলে সেটা স্কিপ করতে পারো। বাদ বাকি আইটেম দিয়ে বাবার হাতের রান্নাটা উপভোগ করতে পারো।

আচ্ছা যাই হোক এখন তবে আসি, অনেক অনেক ভালোবাসা এবং দোয়া তোমার জন্য। ভালো থাকো,সুস্থ থাকো, হাসিখুশি থাকো সবসময়। গড ব্লেস ইউ।

ইতি,

তোমার বাবা

শেহরিনের চোখ দিয়ে অনবরত টুপটাপ বৃষ্টি ঝড়ে। ঠোঁট কাঁপছে তার সমানতালে। হাতে ধরা চিরকুটটা ভিজে উঠে তার অশ্রুর ফোঁটায়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে সে। এই মানুষটার মধ্যে কি আল্লাহ মায়ের সমস্ত গুণ ঢেলে দিয়েছে? সে কি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তার মায়ের ভূমিকা পালন করে যাবে? ক্লান্ত হবে না কখনো? তার তো এখন বাবাকে 'মা' বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, বাবা তুমি এবার থামো। আর কত করবে আমার জন্য? মায়ের অভাব পূরণে ছোট থেকে যা যা করে আসছো আমি তো মামণিকে এখন তোমার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে মামণি আমার সঙ্গেই আছে,বেঁচে আছে তোমার হৃদয়ে। এতোটা জীবন্ত করো না বাবা। হারানোর শোক সামলে উঠতে পারবো না। তুমি শুধু এমনই ভেবে বেঁচে থাকো শেহরিনের বাবা হয়ে।

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

এক আবেগমাখা সন্ধ্যা পার হয়। শেহরিন কনসিভ করার পর আজ প্রথম পেট ভরে পুরোটা ভাত খেয়েছে। বাবার রান্নাটা এতো মজা লেগেছে, এতো স্বাদ পেয়েছে যে হাতেও সেই সুঘ্রাণ লেগে আছে এখনো। এতো তৃপ্তির খাবার তার অরুচি মুখটাকে একদম রুচিতে ভরিয়ে দিয়েছে।

কালকে ক্লাস টেস্ট রয়েছে। খেয়ে দেয়ে ভরা পেটে সে প্রায় মনোযোগ সহকারে টানা দু'ঘন্টা পড়েছে। তিনঘন্টার মাঝামাঝি সময়ে এসে শরীরে ধীরে ধীরে খারাপ লাগা শুরু করে। বুঝতে পারছে অধিক খেয়ে ফেলেছে, এর পরিণতি এখন একটাই। তার উপরে খেয়েছে মাছ। পড়ার মাঝে দু একবার উঁকি এলেও পানি খেয়ে কোনমতে নিজেকে সামলিয়েছে। কিন্তু এখন এই শীতের মাঝে শরীর ঘামা সেই সাথে মাথা ব্যথায় কেমন অস্থির লাগছে।

সাড়ে এগারোটার সময় শেহরিন বাধ্য হয়ে উঠে পড়ে টেবিল ছেড়ে। বই হাতে কিছুক্ষণ বেলকনিতে হাঁটাহাঁটির মধ্যে সে পড়াগুলোকে চোখ বুলিয়ে নিতে থাকে। কানে ভাসছে নেতাসাহেবের শাওয়ারের শব্দ। এসেছে কিছুক্ষণ আগে। এই লোকটা শীতের মধ্যেও রাতে শাওয়ার নেওয়া ছাড়ে না। প্রত্যেকদিনই দু'বার করে তার শাওয়ার নিতেই হয়।

খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে বই নিয়ে পড়তে পড়তে সময় কেটে যায়। কিন্তু গলার কাছে আঁটকে থাকা দানাগুলো শেহরিনকে স্বস্তি দেয় না। এর কারণে পুরো শরীর তার অস্থিরতা কমছে না কোনোভাবেই। বমিটা হলে তাও বেঁচে যেতো।

"এখনো পড়ছো? ঘুমাবে না?"

সান্নিধ্য শাওয়ার শেষে ভেজা চুল একহাতে ঝারতে ঝারতে শেহরিনের কাছে এসে দাঁড়ায়। শান্ত শীতল চাহনিতে শেহরিনকে কাছে টানা মুহুর্তে শেহরিনের পেট উগড়ে আসে। বই ছেড়ে গলার নিচে হাত রাখতে রাখতে গড়গড়িয়ে বমি করে দেয় সে সান্নিধ্যের বাম হাতের উপর। পুরো হাত, ফ্লোরজুড়ে একাকার হয়ে যায়। কাশতে কাশতে নাজেহাল হয়ে উঠে সে।

"রিলাক্স রিলাক্স।"

"আ..আপনার হাতে.."

"কোনো সমস্যা নেই। তুমি বমি করো।"

সান্নিধ্য শেহরিনের পিঠ আলতো হাতে চাপড়ে দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। পাশে রাখা বেতের সোফা হতে ওয়াটার বোতল থেকে পানি নিয়ে শেহরিনের মুখে ঝাপটা মারে।

"আর বমি হবে?"

"নাহ।"

"পানি খাও একটু।"

শেহরিন হয়রান হয়ে উঠে। যা যা খেয়েছিলো সব বের হয়ে গিয়েছে মনে হচ্ছে। শরীর হাঁপিয়ে উঠেছে এক লহমায়। এদিকে চোখে জল এসে হাজির।

"ঠিক আছি।"

সান্নিধ্য শেহরিনকে পানি খাইয়ে টাওয়েল দিয়ে মুখ গলা মুছে দেয়। নরম গলায় বলে, "ড্রেস চেঞ্জ করবে কি?"

"করতে হবে মনে হচ্ছে।"

"আচ্ছা ওয়াশরুমে চলো।"

"এগুলো.."

"আমি পরিষ্কার করছি।"

সান্নিধ্য শেহরিনকে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দিয়ে সমস্ত ফ্লোর পরিষ্কার করে ফেলে নিজহাতে। শেহরিনের বইসহ ওয়াটার বোতল টিস্যু দিয়ে মুছে যথাস্থানে রেখে অতঃপর নিজে যায় ফ্রেশ হতে।

"খারাপ লাগছে কি আর?"

"শুধু শুধু কষ্ট দিলাম আপনাকে।"

সান্নিধ্য ফ্রেশ হয়ে নতুন একটা টি শার্ট পড়ে এসে শেহরিনের পাশে বসে। মৃদু হেসে ধীর কন্ঠ বলে,"হাসবেন্ড ডিউটি পালন করছি ম্যাডাম। তাছাড়া তো অভিযোগ করবেন শুধু জনগণেরই ডিউটি করি।"

" এতো ডিউটি পালন করতে গিয়ে ক্লান্ত লাগে না? মনে হয় না আর পারছি না। এবার ছেড়ে দেওয়া উচিত?"

" শেহরিন এবং রাজনীতি দুটোই আমার ভালোবাসার জায়গা৷ ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নেই উঠে না। জীবন থাকতে সান্নিধ্য এ দুটোকে ছাড়বে না।"

শেহরিন সান্নিধ্যের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে। ক্ষীণ হেসে বলে,"শেহরিনের দ্বৈরথ হচ্ছে রাজনীতি। অথচ প্রেমনীতি মানতে গিয়ে সে রাজনীতি করা মানুষটাকে অতিরিক্ত ভালোবেসে ফেলেছে।"

"রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি। মাঝখানের এই বনাম শব্দটাকে কি তুলে দেওয়া সম্ভব না?"

"মনে হয় না।"

"হলেও হতে পারে কোনো একদিন।"

"এক্সপেক্টেশন জিরোতে রাখুন নেতাসাহেব।"

সান্নিধ্য হেসে ফেলে। শেহরিনের কপালে চুমু খেয়ে বলে,"আচ্ছা। এখন ঘুমাবে চলো।"

"উহু একটু বসে থাকি। মাথা ব্যথা করছে।"

"মাথা ব্যথা করছে?"

"একটু।"

"মেডিসিন খেয়ে ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।"

"তেল দিবো একটু।"

"এতোরাতে তেল?"

শেহরিন কাঁধ হতে মাথা তুলে নিরস গলায় বলে,"মনে হচ্ছে তেল দিলে মাথা ঠান্ডা হবে।"

সান্নিধ্য আর কথা বাড়ায় না। সোজা গিয়ে উঠে তেলের বোতল নিয়ে আসে। বেড সাইডের ল্যাম্পের আলো খানিকটা বাড়িয়ে দিয়ে এসে বলে,"পারি না বাট ট্রাই করে দেখি।"

শেহরিন ঠোঁট চেপে হেসে সোজা ফ্লোরে দু পা ভাঁজ করে বসে পড়ে। ক্লেচার দিয়ে আটকানো চুলগুলো খুলে দিয়ে বলে,"আপনি মাথায় হাত রাখলেই আমার শান্তি।"

সান্নিধ্য হাতের তালুতে অল্প একটু একটু করে তেল নিয়ে শেহরিনের নির্দেশনা মতো মাথায় দিয়ে দিতে থাকে। খানিকটা এলোমেলো অগোছালো হলেও শেহরিন চোখ বন্ধ করে অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করে। লাস্ট এসএসসি এক্সামের সময় বাবা তার মাথায় এমন করে তেল দিয়ে দিয়েছিলো। আজ এতো বছর পর আবার মাথায় হাত পড়েছে। তাও তার স্বামীর হাত।

"বিনুনি গাঁথতে পারেন?"

"সাপের মতো যে?"

"হুঁশ। আমি বলছি সেভাবে করুন।"

"ঠিক আছে বলো।"

"চুলগুলো তিনটা সেকশনে ভাগ করুন।"

"ওকে।"

"রাইট সাইডটা ওয়ান, মিডেল টু,লাস্ট ওয়ান থ্রি। ওয়ান এন্ড থ্রি উঁচু করে টু টা থ্রি এর নিচে দিয়ে ঘুরিয়ে ওয়ান এর সাথে কানেক্ট করুন তারপরে আবার টু কে ওয়ানের নিচে দিয়ে ঘুরিয়ে তুলে..

"কিছুই বুঝতে পারছি না। থ্রি বাদ। শুধু ওয়ান টু দিয়ে পেঁচাবো।"

" হবে না তো তাহলে।"

"ওমনি হবে।"

সান্নিধ্য কাঁচা হাতে চুলগুলো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একদম গোড়ালি পর্যন্ত নিয়ে আসে। অতঃপর একটা হেয়ার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে দিয়ে বলে,"মিশন সাকসেসফুল হয়েছে। এতো সিম্পল একটা জিনিস শুধু শুধু জটিল করো কেন তোমরা?"

শেহরিন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। একহাতে চুলগুলো সামনে নিয়ে দেখে তার নেতাসাহেবের করা দেওয়া ভয়াবহ বিনুনি গাঁথুনি। যা ইতিমধ্যে খুলে আসছে। এটাকে বিনুনি বললে ভুল হবে বরং দড়ি পাকানো বললে একদম পার্ফেক্ট হবে। তবুও ভীষণ খুশি হয় সে। উচ্ছ্বাস মাখা কন্ঠে বলে, "ইউ পাস নেতাসাহেব। গুড জব।"

"থ্যাংকিউ থ্যাংকিউ ম্যাডাম।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প