"মামণি বাবা আসে না কেন?"
"আমি জানি না।"
"আমি বাবার কাছে যাবো।"
"সাতদিন হয়নি বাবার কাছে থেকে এসেছো। এখনি আবার বাবা বাবা করছো কেন তাসিন?"
তিথির ধমকানিতে তাসিন খানিকটা ভীত চোখে তাকায়। গত দেড় দুই মাস ধরে সে বাবা, মা এর বদলাবদলির চক্করে পড়ে একদম নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে। বাবার কাছে তিন চারটা দিন ভালোভাবে কাটালেও তার পর পরেই মামণির জন্য কান্না শুরু করে দেয়। অতঃপর তাকে এনে রাখা হয় মামণির কাছে। এখানেও ঘটে একই ঘটনা। কোনো কিছুতেই সে পারছে না স্বাভাবিকভাবে থিতু হতে।
"নানু বাসায় ভালো লাগে না মামণি। চলো আমরা বাসায় যাই।"
"আমি আর বাসায় যাবো না।"
তাসিন এগিয়ে আসে তিথির কাছে। হাত পায়ে কলমের কালি দিয়ে তার ছড়াছড়ি। খেলতে খেলতে সে নিজেও নোংরা হয়েছে, পুরো ঘরটাকেও করেছে নোংরা।
"আমি বাবাকে বকে দিবো মামণি। আর তোমাকে বকবে না। চলো প্লিজ।"
ছোট একটা বাচ্চার মুখে অনুনয় মিশ্রিত কন্ঠে তিথি খানিকটা অবাক হয়ে তাকায়। মনের ভিতরটা কেমন তার হুহু করে উঠে ছেলের মুখের পানে চেয়ে। দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেদের মায়া যে বেশি হয় এটা সে তার ছেলেকে দেখে বেশ বুঝতে পারে।
"সরফরাজের ভুল আমি দেখছি না। সত্যি তুমি মা হওয়ার যোগ্য নও তিথি। আমি তোমার মা হয়ে নির্দ্বিধায় কথাটা বলতে পারছি। বাচ্চা ছেলেটার জীবনটাকে পরোয়া করছো না তুমি।"
"আম্মু তুমি সবসময় শুধু আমার দোষ খুঁজে বেড়াও। সবক্ষেত্রে শুধু আমার ভুলই দেখতে পাও।"
মিসেস রেহানা হাত হতে স্যুপের বাটিটা টেবিলে রেখে এগিয়ে আসেন। তাসিনের হাত থেকে কলমটা সরিয়ে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলেন,"ঠিক ভুল আমাকে শেখাতে এসো না। তোমার বাবার অধিক ঔদ্ধত্যর কারণে তুমি তোমার সংসার নিজ হাতে ধ্বংস করছো। তুমি একটা এডুকেটেড মেয়ে হয়ে এরকম মন মানসিকতা কিভাবে এনেছো নিজের মাঝে, আমি সত্যি বিশ্বাস করতে পারি না।"
"সরফরাজের প্রায়োরিটি লিস্টে আমি কখনোই ছিলাম না আম্মু। আমার কোনো দাম নেই তার কাছে। তার প্রায়োরিটি লিস্টে সবসময় ভাই বোন থাকে। সাথে নতুন যোগ হয়েছে আরও একজন।"
"আর ইউ ফিলিং জেলাস ওভার দিস লিটেল থিংকস? সিরিয়াসলি? এতো চিপ মাইন্ড তোমার? ভাই বোনের প্রতি ভালোবাসা কেন থাকবে না? তাদের গুরুত্ব কেনো টপে হবে না? তারা সরফরাজের পর?"
"অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না।"
"সানজি বা সান্নিধ্য অন্যায় কিছু করেছে তোমার সঙ্গে? তাদের কারণে তোমার পার্সোনাল লাইফে কোনো সমস্যা হয়েছে কি? হলেও এতোগুলো বছর হলো না, এখন হচ্ছে কেনো? কেনো তুমি আগে এগুলো বলোনি? নাকি কারণটা শুধুই শেহরিন?"
তিথি মিসেস রেহানার মুখে শেহরিন নামটা শুনে খানিকটা অবাক হয়। তার মায়ের মতো ব্যস্ত চাকুরিজীবী নারী তার সংসারের সব বিষয় জেনেছে গিয়েছে? নাকি কেউ তাকে কিছু বলেছে?
"লিসেন তিথি, কম্পেয়ার জিনিসটা আমি পছন্দ করি না। বাট আমাকে বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। তুমি এবং শেহরিন দু'জনেই কিন্তু ভাই বোন ছাড়া একাকী বড় হয়েছো। তোমাদের দুজনেরই ভাই বোনের ভালোবাসার ক্ষেত্রে ল্যাক ছিলো। আমি এবং তোমার বাবা সবসময় চেয়েছিলাম তোমাকে এমন একটা ফ্যামিলিতে বিয়ে দিবো যেখানে তুমি ভাই এবং বোন দুটোই পাবে। যাতে তোমার এই ল্যাকটা পূরণ হয়। তোমার পরে এসেও শেহরিন কি সুন্দর সরফরাজ সানজির সাথে সুন্দর একটা বন্ডিং গ্রো করে ফেলেছে অথচ তুমি সেটা পারোনি। বরং সান্নিধ্য সানজিকে শত্রু মনে করো। কেন তুমি শেহরিনের মতো তাদের আপন ভাবতে পারছো না? কেন জেলাসি নামক এই বাজে ওয়ার্ডটার মাঝে তোমার প্রতিফলন হচ্ছে? তোমার কমতি কিসে?"
"আম্মু.."
"প্লিজ আমাকে উল্টো বুঝ দিতে এসো না। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি নিজেকে সংশোধন করো তিথি। নিজেকে এসব জেলাসি ইগো থেকে মুক্ত করো। তোমার এসবের প্রয়োজন নেই। তুমি স্বইচ্ছায় অথবা কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করছো। যেটা টোটালি নিষ্প্রয়োজন। তোমার সব আছে। যাদের কিছু থাকে না তারা অন্যের সুখ সহ্য করতে পারে না। যাদের কাজ থাকে না তারা অন্যেকে নিয়ে পড়ে থাকে। তোমার এতো সময় কি করে হলো?"
"আমি ইগো নিয়ে থাকলে ওই বাসায় কিচেনে পর্যন্ত ঢুকতাম না আম্মু। আমি জীবনে যেসব কাজ করিনি সেসব ওই বাসায় করেছি।"
"তোমার সংসার তুমি করবে না?"
"আমার যথেষ্ট কোয়ালিফিকেশান আছে। আমি চাইলে ভালো জব ম্যানেজ করে নিতে পারি।"
"তাহলে তুমি বিয়ে কেন করলে? বাচ্চা নেওয়ার কি দরকার ছিলো? এই বাচ্চাটার কি ভবিষ্যত? সে কি তোমাদের মতো দোলাচলে দুলবে?বাচ্চাটার জন্য কষ্ট হচ্ছে না। তোমার বাবার বিজনেস এর সঙ্গে কার কোথায় কি সম্পর্ক আছে সেটা তোমাকে কেন দেখতে হবে? কেন তুমি এসব কিছু তোমার পার্সোনাল লাইফে জড়াবে? কি দরকার তিথি।"
"তুমি বাবার সাইডটা বুঝতে পারো না কেন আম্মু। জানো সান্নিধ্য বাবার বিজনেস পার্টনারের কি হাল করেছে?"
মিসেস রেহানা দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। শক্ত গলায় বলেন,"সো হোয়াট? তোমার কি এতে? তাসিনের চেয়ে বিজনেস পার্টনারের বিজনেস গুরুত্বপূর্ণ তোমার কাছে। তুমি কি বুঝতে পারছো না নিজের ভালোটা। তোমার বাবা তোমাকে এসবে ইনভলভ করাচ্ছে যাতে সে তার বিজনেসটা ধরে রাখতে পারে। অথচ তোমার সংসারটা কিন্তু সে দেখছে না। মানুষের ক্ষতি করে কখনো ভালো থাকা যায় না। সরফরাজ তোমাকে তোমার চাহিদার চেয়ে বেশি দিয়েছে। সবদিকে ব্যালান্স রেখে চলেছে। তুমি যখন যেটা চেয়েছো সে সেটাই দিয়েছে। তোমার শ্বশুর শাশুড়ী তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন। এগুলো কি যথেষ্ট নয় তোমার কাছে?
তিথি নিরুত্তর হয়ে থাকে। মনে মনে সরফরাজকে মিস করলেও নিজের জেদের কাছে তা দাবিয়ে রাখে। এতোদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। তাসিনের জন্য আসলেও একটাবার আসেনি তার জন্য। কথা পর্যন্ত বলেনি। তার ইগোটা কেনো কেউ দেখছে না?
"ডিভোর্স হওয়ার আগে সংশোধন হও তিথি। ডিভোর্স কোনো সলিউশন হতে পারে না। এতে তোমরা তিনজনের কেউ ভালো থাকতে পারবে না। নিজেদের দ্বন্দ্বে বাচ্চাটাকে বাবা মার স্নেহ থেকে দূরে করে দিও না। দেখছো তো ওর অবস্থাটা। আমি তোমাকে বারবার ওয়ার্ন করছি। নিজের সংকুচিত মনটাকে প্রসারিত করো। মানুষকে ভালোবাসতে শেখো। জেলাসি ইগোটাকে সরিয়ে ভিতরটা সুন্দর করো। দেখবে তুমি এতে ভালো থাকবে অনেক।"
মিসেস রেহানা তাসিনকে নিয়ে রুম হতে বের হয়ে যায়। তিথি স্থিরচিত্তে ফ্লোরের পানে তাকিয়ে থাকে। মস্তিষ্কে তার মায়ের কথাগুলো ভাবিয়ে তোলে। চোখের সামনে ভেসে উঠে ছেলের মুখোরেখা। কানে বাজে, "মামণি আমি বাবাকে বকে দিবো,আর তোমাকে বকবে না।"
নিরবতার মাঝে হুট করে তিথির ফোন বেজে ওঠে। গভীর ধ্যান ছেড়ে সে বেরিয়ে আসে হুট করে। স্ক্রিনে পানে তাকাতেই দেখতে পায় অন্বেষার ফোন।
তিথি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফোনের দিকে। ফোন ক্রমাগত বেজেই চলেছে। কিন্তু কেন জানি রিসিভ করে না সে। চাইলেও কোথায়ও গিয়ে তার কিছু একটা মনে হতে থাকে। বিবেকের কাছে হয় প্রশ্নবিদ্ধ। পরপর তিন হতে চারবার ফোন বাজা শেষ হতেই কলটি কেটে যায়। তিথি ফোনটা বন্ধ করে চুপ করে বের হয়ে যায় রুম থেকে।
_______________________________________
জানুয়ারির ২৬ তারিখ পড়লো আজ। কুয়াশা মাখা এক রাত। ঘড়িতে বাজে রাত একটা। বেলকনির গ্রিল গলে ঠান্ডা শীতল হাওয়া হু হু করে প্রবেশ করছে। ঘরের মধ্যে ও আধিপত্য জুড়িয়েছে বেশ। শিশিরের কণাগুলো সাজিয়ে রাখা গাছগুলোর সবুজ পাতার উপর ভারী হয়ে জমে আছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলেই যেনো টুপ করে গড়িয়ে পড়বে নিচে।
হালকা গোলাপি রঙা ঢিলেঢোলা কুর্তি পরিহিত রমণীটি ধীরে ধীরে বেলকনি জুড়ে পায়চারি করছে। এইটুকু শরীরে এতো গরম লাগে কেন তার বুঝতে পারে না। অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে। এই শীতের মাঝেও তার শীতবস্ত্র লাগছে না। সান্নিধ্যের জোরাজুরিতে গায়ে একখানা চাদর বিছালেও পরবর্তীতে সেটা আর রাখতে পারে না্। কপালে, নাকের ডগায় জমা বিন্দু বিন্দু ঘামগুলো জানান দেয়,এর প্রয়োজন নেই এখন আর।
" ফাইনালি ফিফটি থ্রি কেজি। তাও সেটা এক মাস সময় নিয়ে।"
"আপনি কি চাইছেন দশদিনে এক কেজি করে ওজন বাড়ুক?"
"মন্দ হতো না।"
শেহরিন হাঁটা থামিয়ে সান্নিধ্যের দিকে ঘুরে তাকায়। চোখ সরু করে বলে,"জানি তো এটাই বলবেন। কিন্তু আপনি এখানে কেন? ঘুমাচ্ছেন না কেন? কত রাত হয়েছে দেখেছেন?"
"তোমার ঘুম আসছে না?"
"আমি নিশাচর পাখি হয়ে গিয়েছি। রাত দু তিনটার আগে ঘুম চোখে আসে না। দিনে হাপুসহুপুস ঘুমাই। আমার পিছু লাগবেন না প্লিজ। আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন।"
"একসাথে হাঁটি চলো।"
"আপনি কি চান আমি রেগে যাই?"
"উহু।"
"তাহলে চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমি অল্প কিছুক্ষণ হেঁটে তারপরে শুয়ে পরবো প্রমিজ।"
"তোমাকে একা রেখে আমি ঘুমাতে পারি না। ঘুম আসবে না।"
শেহরিন নিস্তব্ধ চাহনিতে ঠোঁট চেপে তাকায় তার নেতাসাহেবের দিকে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে,
"আপনি কি রোবট? কেন এতো পাগলামি করেন বলুন তো? যত্নের পাহাড় গড়িয়ে দিয়েছেন আমার জন্য। আর কত করবেন? এই কাটা হাতের দিকে একটাবারও কি মায়া হয় না? এখনো অব্দি ক্ষতটা শুকায়নি। কোন নিয়ম মেনে চলেন না। অথচ আমাকে টাইম টু টাইম এটা ওটা নিয়ে পায়তারা করতে থাকেন। সারাদিন গাধার মতো খাটুনি করে রাতের ঘুমটুকুও আমার জন্য নষ্ট করেন। আমার কোনো কথা কখনো শোনেন না আপনি।"
"সরি ম্যাম এখন থেকে শুনবো।"
"চুপ করুন। এই এক কথা কতবার বলবেন আপনি আর? শোনেন কি একটা কথা?"
গিন্নীর কড়া গলায় আদেশ বার্তা কিংবা হুটহাট রেগে যাওয়া এমপি সাহেবের চেনা পরিচিত হয়ে গিয়েছে। প্রেগনেন্সি জার্নিতে মুড সুইংটা বেশ ভালোভাবেই চলছে তার। পরিস্থিতি ঠান্ডা রাখতে এজন্য সেও নিরব হয়ে সব কথা চুপচাপ শুনে যায়। তার ম্যাডামের বিপক্ষে একটা কথাও ভুলে বলে না।
"আমি কিচ্ছু বলবো না আর আপনাকে। যা খুশি করুন। হাতটাও সাড়াতে হবে না। আপনার তো আর ব্যথা লাগে না। আসলেই আপনি রোবট।"
সান্নিধ্য বাম হাত দিয়ে শেহরিনের কানের পৃষ্ঠে চুলগুলো গুঁজে দিতে দিতে মৃদু হাসে ৷ অবিচলিত কন্ঠে বলে,"শান্ত হও। অনেক তো বকলে এখন একটু রেস্ট নাও। রাতে খাওনি কেন?"
এক কথার পৃষ্ঠে অন্যকথায় শেহরিনের কুঁচকানো কপাল সমান হয়ে যায়। এই লোককে কখনোই সে তার কথার বাণে বিদ্ধ করতে পারে না। বোঝাতেও পারে না। ঠিক, অন্য এক কথা এনে তার উত্তপ্ত মেজাজকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাবে। অথচ এতোক্ষণ ধরে যে বকবক করলো সেসবে তার কোন ভ্রু'ক্ষেপ নেই।
"এমনি ।"
"এমনি কেন?"
"খেতে ইচ্ছে করছিলো না। চলুন ঘুমাবো।"
"ক্ষুধা লাগেনি?"
"উহু।"
শেহরিন সান্নিধ্যেকে টেনে কক্ষে নিয়ে যায়। ঘুমের বাহানা দেখিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। জানে এই লোক তার ঘুমানো অব্দি নিজেও ঘুমাবে না। যতক্ষণ জেগে থাকবে উনিও নিশাচর প্রহরী হিসেবে তাকে পাহারা দিয়ে চলবে।
------------------------------------
রাত একটা চল্লিশ মিনিট। এপাশ ওপাশ করতে করতে সময় পার করে শেহরিন। পঁচা অভ্যাস হয়েছে। দুইটা আড়াইটার আগে একটুও ঘুম আসবে না। বরং এই সময়টায় শুয়ে থাকলে আরো অস্থিরতা বাড়ে। ধীরে ধীরে চোখ তুলে সে সান্নিধ্যের দিকে তাকায়।
"ঘুমাননি?"
"এইতো ঘুমাচ্ছি। তুমি ঘুমাচ্ছো না কেন?"
"আমিও ঘুমাচ্ছি।"
শেহরিনের হুট করে পেটের ক্ষুধা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে্। সেই সন্ধ্যায় হালকা নাস্তা করেছিলো। এরপরে রাতে আর খেতে ইচ্ছে করেনি। বেচারা উচাটান পেট এখন চাইছে খাবার। কিন্তু সবজি কিংবা মাংস মনে আসতেই তার অরুচি এসে ভীড়ে মুখে। এজন্য ক্ষুধা লাগলেও খেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে এখন একটু ইলিশ মাছের কাটা দিয়ে ঝাল ঝাল কচু শাক ভাজি যদি খেতে পারতো। তাহলে খুব মজা করে খেতো।
শেহরিন নিজেই নিজেকে বুঝতে পারে না, চিনতে পারে না। এই সময়টায় কি অদ্ভুত অদ্ভুত খাবার খেতে ইচ্ছে করে তার। শেফালীর হাতে কাল খেয়েছিলো ঝাল শুটকি ভর্তা, কালিজিরা ভর্তা। গরম গরম ভাত দিয়ে কি যে মজা খেতে। অথচ এসব ভর্তাভাজি আগে সেরকম সে কখনো খায়নি,খেতে ইচ্ছেও করেনি। এখন এগুলোই মনে হয় অমৃত।
তবে, মামণির হাতে পেঁয়াজ শুকনো মরিচ দিয়ে ডাল ভর্তা তার ভীষণ ভালো লাগতো। এটা সে ছোটবেলায় অনেকবার খেয়েছে। মামণি বেঁচে থাকলে হয়তো কত রকম ভর্তা করে খাওয়াতো তো তাকে।
"আপনি কখনো কচু শাক ভাজি খেয়েছেন?"
"খেয়েছি।"
"কেমন লাগে?"
"তুমি খাওনি?"
"অনেক আগে খেয়েছি।"
"এখন খেতে ইচ্ছে করছে?"
"না..না এমনি বলছি। হুট করে মনে হলো তাই জিজ্ঞেস করলাম।"
"আচ্ছা।"
সান্নিধ্য ঘুম কাটিয়ে হাত বাড়ায় বেড সাইড ডেস্কে। সামান্য মাথা উঁচু করে ফোন অন করে সময় দেখে নেয়। অতঃপর উঠে পড়ে তৎক্ষনাৎ।
"ফ্রিজে কচু শাক আছে?"
"মানে?"
"কচুশাক আছে?"
শেহরিন গোল গোল চোখ করে তাকায়। বিস্ময় কন্ঠে বলে, "আছে। শেফালি এনেছিলো কালকে বাট আমি এখন খেতে চাই না। আপনি প্লিজ এখন কিছু করবেন না। ঘুমান।"
"বেশি সময় লাগবে না। ফ্রোজেন করা?"
" আমি তো এমনি একটু বলেছি। শেফালি করে দিবে তো।"
সান্নিধ্য বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। কিচেনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে,"কিন্তু আমার এখন ভীষণ খেতে ইচ্ছে করছে। চুপচাপ ওয়েট করো।"
শেহরিনকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সান্নিধ্য চলে যায় তার কাজে। ফ্রিজ হতে আগে থেকে সিদ্ধ করে রাখা ফ্রোজেন কচু শাক বের করে সে। অতঃপর তার সবচেয়ে মূল্যবান হাতিয়ার ইউটিউব ওপেন করে। যেটা তাকে গত পাঁচ সাত মাসে অনেক রান্নাই শিখেয়েছে। কচুশাকের রেসিপি বের করে সেই অনুযায়ী শুরু করে রান্না। এতোদিনে টুকটাক এটা সেটা করতে করতে মোটামুটি একটা ধারণা চলে এসেছে তার রান্নার প্রতি। অবশ্য স্বাদের ব্যাপারটাকে উহ্য রেখে মূল রান্নাটাকেই গুরুত্ব দেয় তারা দু'জনে বেশি। উপায় নেইও যে তাছাড়া।
রাত দুটো পার হতেই কিচেন হতে ভেসে আসা শব্দ থেমে যায়। গরম গরম কচুশাক ভাজি করে এনে কক্ষে হাজির হয় সান্নিধ্য। ডান হাতে ক্ষত থাকার কারণে এসব টুকিটাকি কাজ গ্লাভস পড়েই সাড়ে সে। তবুও হলুদ মরিচের ঝাঁজ একটু হলেও জ্বালাতন সৃষ্টি করে। কিন্তু এ মানবের তাতে কিছু আসে যায় না।
"একবার বেবিটাকে আসতে দিন। তারপরে আপনার সব ঋণ আমি শোধ করা শুরু করবো।"
"আমি ঋণ শোধ করার সুযোগ দিলে তো করবে।"
"সারাজীবন ঋণী করে রাখবেন?"
"ওয়াইফকে ভালোবাসা, তার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেওয়াটা ঋণের কিছু নয়। এগুলো হাসবেন্ডের রেসপনসেবলিটি। এখানে না তুমি ঋণী হবে আর না আমি তোমাকে ঋণী করবো। এগুলো সিম্পেল ইস্যু।"
"ওয়াইফদের রেসপনসেবলিটি বেশি পালন করতে হয়।"
"এই একপাক্ষিক দিকটা আমাদের সোসাইটিতে বেশি হাইলাইট হয়ে থাকে। এখানে শুধু কেয়ার মেয়েরা করবে, অথচ তারা কেয়ার পাবে না। পেলে সেটা নিয়ে জাজ করা হবে। এই বেঁধে দেওয়া সাইকোলজিক্যাল কনসেপ্ট তোমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়া হয় জন্য তোমরা সামান্যের চেয়ে বেশি কেয়ার পেলে ভীত হও, আনইজি ফিল করো। বাট ইট’স ওকে শেহরিন। আমাদের সন্তানকে পৃথিবী দেখাতে তুমি একা কষ্ট করছো, এটা বলছো না কেন? ভাগীদার তো আমরা দুজনেই। তোমার প্রতি তো আমার আরও যত্নশীল হওয়া উচিত। এখন এটা টেস্ট করো প্লিজ। সরি হাতের জন্য খাইয়ে দিতে পারছি না।"
শেহরিন স্বতঃস্ফূর্ত মুখোরেখায় কচু শাক টেস্ট করে। নিজে খেতে খেতে সান্নিধ্যের মুখে একটু তুলে দিয়ে একরাশ স্বচ্ছ হাসি টেনে বলে,"আমার নেতাসাহেবের রান্না পৃথিবীর সেরা রান্না। খারাপ হতেই পারে না। থ্যাংক ইউ সো মাচ স্যার, আমার এই নতুন জার্নিটাকে এতো সহজ করে দেওয়ার জন্য।"
"ইট’স মাই অবিডিয়েন্স ম্যাডাম।"
-----------------------------------------------------
মধ্যরাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে শেহরিনকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় সান্নিধ্য। তিনটা বেজে যায় ততক্ষণে। বিছানা ছেড়ে উঠে সে বেলকনিতে চলে আসে ফোন নিয়ে। রান্না করার সময় প্রায় পনেরো বিশটা কল এসেছিলো। বুঝতে পেরেছিলো দরকারি বা কিছু সমস্যা হয়েছে। কিন্তু ফোন রিসিভ করলে রান্নাটা করতে সময় লাগতো বেশি জন্য রিসিভ করেনি সে।
"আসসালামু আলাইকুম বাবা।"
"ওয়ালাইকুমুস সালাম। কোথায় আছো তুমি?"
"বাসাতেই।"
"কি হতে চলেছে গেস করতে পারছো?"
"মনে হচ্ছে।"
শাহজাহান সাহেবের বিক্ষুব্ধ কন্ঠস্বর ভেসে আসে। ধমকের ন্যায় সুরে বলেন,"তোমার অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি আমার ভীষণ অপছন্দের সান্নিধ্য। কেন তুমি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছো? সমস্ত অভিযোগ পত্র দায়ের করা হয়ে গিয়েছে। এবার কি করবে?"
"রজত সরাসরি আমাকে গুলি করতে চেয়েছিলো। সেদিন সিএনজিটা মাঝখানে না এলে ডিরেক্ট হয় গুলিটা আমার লাগতো নয়তো শেহরিনের মাথায়। আমি চুপ করে বসে থাকবো?"
"তাই বলে তুমি কেন?"
"এর মধ্যে অনেক কাহিনী আছে বাবা।"
"এখন কি করবে?"
"পুলিশ কি আসছে?"
"অতি শীঘ্রই পৌঁছে যাবে। সরফরাজ বের হয়েছে।"
"ওয়ারেন্ট আছে?"
"সব আছে।"
"আচ্ছা আমি একটু পরে কল করছি তোমাকে।"
--------------------------------------------
জারা কনকর্ডের সামনে এসে থেমেছে একাধিক পুলিশের গাড়ি। সেই সাথে উপস্থিত দেশের কিছু প্রধান চ্যানেলের সাংবাদিক।
ডেপুটি কমিশনার মো. জাহিদ হাসানের হাতে রয়েছে সেশন জাজের স্বাক্ষরকৃত গ্রেফতারি পরোয়ানা। অভিযোগ, প্রতিপক্ষ দলের নেতা রজত সমাদ্দারের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পিছনে সরাসরি এমপি সান্নিধ্য শাহজাদ খানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গিয়েছে।
জাহিদ হাসান তার ফোর্সকে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের ভিতরে প্রবেশপথে বাঁধা পায়। এমপি সাহেবের ব্যক্তিগত সিকিউরিটি গার্ড এবং পুলিশ সিকিউরিটি ফোর্স টিম লিডার সাব ইন্সপেক্টর নাশিদ বাঁধা দেন। ডিসি সাহেবকে সালাম দিয়ে বলেন,
"স্যার, আমরা সরাসরি হোম মিনিস্ট্রির অধীনে কাজ করি এমপি সাহেবের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দানে। এভাবে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।"
"আমি আপনাদের দায়িত্ব বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার হাতে সিআরপিসি এর 46 ধারা অনুযায়ী গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। এই পরোয়ানা সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।"
"আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত স্যার, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের দায়িত্বের বাহিরে যেতে পারবো না।"
ডিসি জাহিদ শান্ত চোখে তাকিয়ে ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলেন।অনুধাবন করেন, জবরদখলের পথে গেলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে এবং এমপির সিকিউরিটির সাথে সংঘর্ষ হতে পারে। যা অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে।
উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি তার সুপিরিয়র এবং হোম মিনিস্ট্রির সাথে সরাসরি ফোনে কথা বলেন। দীর্ঘ দু তিন মিনিটের কথা শেষে উচ্চ পর্যায় থেকে এমপির সিকিউরিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা যেন আইনানুগ দায়িত্ব পালনে পুলিশকে বাধা না দেন।
জাহিদ হাসান পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেন। এমপি ক্ষমতাশীল সেই হিসেবে অনাকাঙ্ক্ষিত যেকোনো ঘটনা এড়াতে তিনি তার ফোর্সদের নির্দেশনা দেন সঠিক স্থানে অবস্থান নেওয়ার জন্য। সাংবাদিকদের দেওয়া হয় একটা নির্দিষ্ট সীমা। যা মূল ঘটনাস্থল হতে বেশ খানিকটা দূরে।
"প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে, আমি একাই উপরে যাব। আমার দল নিচে অপেক্ষা করবে। এমপি সাহেবকে আমি ব্যক্তিগতভাবে পরোয়ানাটি দেখাব এবং এই পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করব।"
সিকিউরিটি গার্ডরা আশেপাশের পরিস্থিতি অবলোকন করে ডিসি সাহেবের পথ ছেড়ে দেয়। তবে সঙ্গে তাদের পক্ষ হতে দু'জন বিশেষ নিরাপত্তা কর্মীকে পাঠানো হয়।
"স্যার, আমি একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করছি। আমার হাতে সিআরপিসি এর 46 ধারা অনুযায়ী একটি বৈধ গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। রজত সমাদ্দার হত্যা মামলায় আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেফতার করার নির্দেশনা আছে।"
সান্নিধ্য শান্ত ভঙ্গিতে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সরাসরি জাহিদ হাসানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। তীক্ষ্ণ গলায় বলে,"সমস্যা নেই। নির্দেশনা যেহেতু এসেছে যেতে তো হবেই। বাট সময়টা খুবই আনফেভারেবল। রাত তিনটায় এসেছেন গ্রেফতারি পরোয়না জারি করতে?"
জাহিদ হাসান নম্রচোখে তাকায়। সম্মানীয় কন্ঠে বলে,"সরি স্যার, আমাকে প্রেশার ক্রিয়েট করা হয়েছে এক্ষেত্রে এবং বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং মিনিস্ট্রি সাহেব দিয়েছেন। তবে আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে এবং আপনার প্রতি সম্মান দেখানো হবে।"
"মিনিস্ট্রি সাহেবের বিশেষ নির্দেশনা?"
"জ্বি স্যার।"
"আপনি ওয়েট করুন আসছি।"
"থ্যাংকিউ স্যার।"
সান্নিধ্য বুকের সঙ্গে আড়াআড়িভাবে হাত ভাঁজ ছেড়ে ড্রয়িংরুমের দিকে কিছুটা এগিয়ে আসে। উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে তার মুখোরেখা দৃঢ় হলেও উপরে উপরে বেশ শীতল। হয়তো শুধু মাত্র শেহরিনের জন্য। মেয়েটা ঘুমিয়েছে মাত্র। এর মাঝে আবার নতুন করে ঝামেলা।
"বল।"
"কোথায় তুই?"
"অ্যাপার্টমেন্টেই আছি্। ডিসি এসেছে। শুয়ো*রের বাচ্চা মন্ত্রীর কাজ।"
"এর পিছনে যথেষ্ট কারণ আছে।"
"জানি৷ বাট এই মুহুর্তে আমার জন্য কোনো পথ খোলা নেই।আসিফ নিখোঁজ।"
সরফরাজ এক মুহূর্তের জন্য নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়। কপালের শিরাগুলো তার দপদপিয়ে জ্বেলে উঠে। আশ্চর্যান্বিত স্বরে বলে, "হোয়াট? আসিফ নিখোঁজ মানে??"
"কালকে সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ।"
"সান্নিধ্য হ্যাভ ইউ অ্যানি আইডিয়া? এর ইফেক্ট কি হতে পারে??"
"ইফেক্ট অলরেডি শুরু হয়ে গিয়েছে। শেহরিনকে এই অবস্থায় রেখে আমাকে এখন পুলিশি হেফাজতে যেতে হচ্ছে অর্নিদিষ্ট কালের জন্য। এতো বড় ট্রমার মধ্যে আমি মেয়েটাকে রেখে যাচ্ছি। এর চেয়ে খারাপ ইফেক্ট আর কি হতে পারে?"
"তুই রিলাক্স থাক শেহরিনকে নিয়ে। হয়তো ওকে সামলানো কষ্ট হবে বাট আমি সানজি আংকেল যে যেমনে পারি ওকে কন্ট্রোলে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।"
সান্নিধ্য ঠোঁট ফুঁড়ে নিঃশ্বাস ছাড়ে। চোখ বন্ধ করে উপরিপানে মাথা তুলে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,"তোর উপর একটা বিশাল দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি। আমার অনাগত সন্তান আর ওর মা'কে এসব থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করবি। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম আমি আর আমার শ্বশুর সাহেব ছাড়া ওকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করবে না। আমার কথাটা তুই যেকোনো ভাবে হোক রাখিস। আমি কথার বরখেলাপ করতে দিতে চাই না ৷ কোনো জানোয়ার যেন শেহরিনকে এক আঙুল স্পর্শ না করে। যদি করে আমার লোকদের বলবি ওরা...
"তোর লোকদের বলতে হবে না। আমি আছি। আই উই'ল ট্রাই মাই বেস্ট। তোর প্রতিশ্রুতি আমি ভাঙতে দিবো না।"
"থ্যাংকস।"
"সানজির পৌঁছাতে বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। রিজওয়ান আংকেলও হয়তো সকালের মধ্যেই এসে যাবেন। শেহরিন কি ঘুমিয়ে?"
সান্নিধ্য এক পলক নিজেদের কক্ষের দিকে সর্তক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, "হ্যাঁ। আমি বাইরে হতে লাগিয়ে দিয়ে যাচ্ছি।"
"বলে যাওয়া উচিত ছিলো না?"
"উচিত ছিলো বাট সম্ভব নয়। ওকে এই মুহুর্তে সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।"
সরফরাজ এক মুহূর্ত নিরব থেকে দীর্ঘ শ্বাস ঝেড়ে বলে,"ঠিক আছে। নিচে আয় তুই। আমি এসেছি।"
সান্নিধ্য কান হতে ফোন নামিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এদিকে সময়ের মতো সময় যাচ্ছে। আর অপেক্ষায় রাখা ঠিক হবে না ভেবে ধীর পায়ে কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়।
বেড সাইডের মলিন আলোতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন শেহরিন। পেট মন দুটো ভরতেই চোখ ভেঙে ঘুম নেমে এসেছিলো তার। অসম ক্লান্তিভাব ছেড়ে মুখোরেখায় কি পরিতৃপ্তির আভাস ফুটে আছে এখন। গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে কানে।
সান্নিধ্য হাঁটু ভেঙে বসে শেহরিনের সামনে। কিয়ৎক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মাথায় আলতো করে হাত ছুঁইয়ে দেয়।পুরু ঠোঁটে কপালের মাঝে একখানা গাঢ় স্পর্শ এঁকে দেয় পরম যত্নে। শেহরিন ঘুমের মাঝে তার প্রিয় পুরুষের স্পর্শে হালকা নড়েচড়ে উঠে। ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসি তার প্রসারিত হয়ে যায় আপনাআপনি। মেয়েটা নিশ্চিত কোন সুন্দর স্বপ্নের মাঝে বিভোর হয়ে আছে। যেখানে সান্নিধ্যের উপস্থিত অবধারিত।
------------------------------------------------
সান্নিধ্য লিফট হতে বেরিয়ে আসে। সেই সাথে পেছন পেছন আসে ডিসি সাহেব সহ দুজন সিকিউরিটি গার্ড।
এমপি সাহেবের আগমন ঘটতেই নিচে অপেক্ষারত সকলের ভিতরে উত্তেজনার পারদ বয়। সিকিউরিটি ফোর্স সহ আগত পুলিশ টিম নিজেদের ভীড় ঠেলে পথ বের করে দিতে তৎপর হয়ে উঠে। সেই সাথে শুরু হয় সাংবাদিকদের একের পর এক ক্যামেরা ঝলসানো ক্লিক। তারা একটাবার এমপির সাহেবের সঙ্গে কথা বলার জন্য তুমুল আগ্রহী হয়ে উঠে। এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হতেই সিকিউরিটি গার্ডরা তাদের প্রতিহত করে। কোনোভাবেই তারা এমপি সাহেবের সাথে সাংবাদিকদের সরাসরি কথোপকথনের সুযোগ দেয় না।
সান্নিধ্যের মুখে মাস্ক। পড়নে অ্যাশ টি শার্ট কালো প্যান্ট। শীতের মাঝে তার শরীরে নেই কোন উষ্ণতাদায়ক পোশাক। তার মস্তিষ্কের উত্তাপে সবকিছু আজ ফিঁকে।
একাধিক নিরাপত্তা কর্মীর ভীড় উপেক্ষা করে মাত্র এক মিনিট সময় সান্নিধ্য সামন সামনি সরফরাজের সঙ্গে কথা বলে। হাত দিয়ে কিছু একটা বুঝিয়ে দিয়ে অতঃপর দ্রুত উঠে পড়ে গাড়িতে।
সাংবাদিক গণ খানিকটা সুযোগ পেতেই গাড়ির চারপাশে জমায়েত করে। উইন্ডো উঠে গেলেও ভিতর হতে আবছা এমপি সাহেবের অবকায়ার ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা। ঠেলাঠেলিসহ এক মুহূর্তে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে উঠে।
সান্নিধ্যের ব্যক্তিগত লোকজন সরফরাজের আদেশে দ্রুত সবাইকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যায়। নিচে চলমান এই গ্যাঞ্জাম যেন কোনোভাবেই উপর অব্দি না পৌঁছায় সেদিকে থাকে বিশেষ নজর।
চোখের পলকে সকল কিছুকে উপেক্ষা করে এক মুহূর্তে ছুটে চলে যায় চার চারটে গাড়ি। গর্জানো সুরে আশেপাশে মুখরিত হয়ে উঠে। নিরব রাতে বেজে ওঠে অজানা আশঙ্কার করুণ সুর।
শীতের মধ্যেরাতে কুয়াশা জমে অস্পষ্ট হয়ে আছে চারপাশ। সেই সাথে অস্পষ্ট হতে শুরু করে দুটো মানুষের গতিশীল জীবন। শেহরিন সান্নিধ্য পড়ে যায় গোলকধাঁধায়। আসন্ন ঝড় তাদের স্বাভাবিক জীবনের বাঁককে ঘুরিয়ে দিয়ে নিয়ে যায় অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতিতে।