"শামিকা বেবি.."
"ইট’স শাহমিকা। নট শামিকা।"
"শাহমিকা!!"
"ইয়েস।"
সানজির কোলে তোয়ালের মাঝে ফুটফুটে বাচ্চাটার দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখে তাসিন। এতো ছোট বাচ্চা আগে সে কখনো দেখেনি। এতো ছোট ছোট হাত, পা, আঙুল সবকিছু তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। নিজের হাতের দিকে বারবার তাকিয়ে বাচ্চাটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে থাকে গাঢ় নজরে।
"এতো ছোট কেন ও..?"
"বেবিরা তো ছোটই হয়। তুইও তো এইটুকু ছিলি।"
"আমিও?"
"হ্যাঁ।"
তাসিন গোল গোল চোখ করে ফু'মণির দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজ ভাবনায় মশগুল হয়ে উঠে সে। তার মানে সেও এমন ছোট বেবি ছিলো? তার হাত, পা, আঙুল ওরকম ছিলো? এখন তাহলে সে বড় হয়েছে? তাহলে সে বড় আর শাহমিকা বেবি ছোট !!
"কি ব্যাপার? তুই দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন বেবি মানকি? দু'দিন হলো দেখছি তুই বেবিটাকে একবারও ছুঁয়ে দেখছিস না, একটু কোলে নেওয়ার কথাও বলছিস না। কাহিনী কি হ্যাঁ?"
"আমার ভয় করে। আমি বেবিকে কোলে নিবো না..।"
"সত্যি নিবি না?"
"না।"
"একটুখানি নিয়েই দেখ।"
"না..না..আমি নিবো না..বলছি তো।"
তাসিন দু হাত, মাথা নেড়ে দৌড়ে গিয়ে তিথির গা ঘেঁষে বসে পড়ে সোফায়। মামণির শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে চোরা দৃষ্টিতে তাকায় ফু'মণির দিকে।
"তাকওয়া, ইয়ো পানির জন্য নতুন ইয়ো সানি খুঁজতে হবে মনে হচ্ছে।"
"তাইতো দেখছি। এতোবড় প্রত্যাখান মেনে নেওয়ার না। বেবি তুই মানকি বাদ।"
"টোটালি বাদ। ভাবি শুনো, তোমার ছেলে যেন শাহমিকাকে পরে ডিস্টার্ব করতে না আসে। আগেই সর্তক করে দিচ্ছি কিন্তু। না হলে, পরে ইভটিজিং মামলা ঠুকে দিবো।"
তিথি ছেলের দিকে এক নজর তাকিয়ে ফোনের দিকে মনোনিবেশ করে। টাইপিং করতে করতে শান্ত গলায় বলে,"ভয় পাচ্ছো কেন তুমি? ছোট বেবিদের তো সবাই আদর করে।"
"মামণি,ইয়ো পানি কোথায়?"
"আবার ইয়ো পানি? বলেছি না চাচিমণি বলে ডাকবে।"
সানজি হালকা কোল ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে হাঁটতে থাকে ফ্লোর জুড়ে। রাজকন্যা সাহেবা গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। সেদিক পানে এক পলক তাকিয়ে ভারী কন্ঠে বলে,
"ইয়ো পানির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। এখন থেকে ইয়ো পানি হচ্ছে এই বেবি। এর জন্য নতুন ইয়ো সানি খুঁজবো আমরা। তার সাথে বিয়ে দিবো।"
"ইয়ো পানি..?"
"হ্যাঁ।"
তাসিন মায়ের শাড়ির আঁচল হতে মুখ তোলে। বিস্মিত ভাব চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলে বলে,"কিন্তু ইয়ো পানি তো শুধু আমার।"
"কে বলেছে তোর? তোকে আমরা দিবো না। তুই তো বেবিকে দেখে ভয় পাস। এই ইয়ো পানিকে আমরা অন্য জায়গায় বিয়ে দিবো৷ লাল টুকটুকে শাড়ি পরবে সে। ঠিক যেমন করে আগের ইয়ো সানি এবং ইয়ো পানির বিয়ে হয়েছে, ওরকম করে বিয়ে হবে। মাঝখানে তুই হবি বাপ্পারাজ।"
"বাপরাজ কে?"
"বাপরাজ না বেবি মানকি, বাপ্পারাজ। তোর সিনিয়র ভার্সন।"
ফু'মণির এতো কঠিন কঠিন কথা তাসিনের বোধগম্য হয় না। সে উজবুঁকের ন্যায় ভাবতে থাকে সবকিছু। মনে পড়ে, ইয়ো পানির বিয়ের সময় ফু'মণি বলেছিলো নতুন আরেকটা ইয়ো পানি আসবে৷ তখন তাকে তার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে। তার মানে কি, এটাই সে নতুন ইয়ো পানি?? কিন্তু এটা নতুন ইয়ো পানি হলে কেন সবাই তাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিবে,বিয়ে তো সে নিজে করবে। কিন্তু আবার যদি কেউ কেড়ে নেয়..
"মামণিইইই..."
তাসিনের হুট করে চিৎকারে সানজি তিথি চোখ বড় বড় করে তাকায়। দাঁতে দাঁত পিষে শক্ত গলায় বলে,"চুপপ! চুপপ, চিৎকার করছিস কেন? দেখছিস না বেবিটা ঘুমিয়েছে।"
"আমি বিয়ে করবো..এক্ষুণি বিয়ে করবো মামণি।"
"আস্তে কথা বলো। কাকে বিয়ে করবে তুমি?"
"ইয়ো তাসিন.. ইয়ো পানিকে বিয়ে করবে।"
"কে তোর ইয়ো পানি..?"
ফু'মণির সরু চোখের দৃষ্টিতে বেবি মানকিটা আচানক লজ্জা পেয়ে যায়। ঠোঁট উল্টিয়ে লজ্জামাখা হাসিতে মামণির কাঁধে মুখ লুকায় সে। তিথির কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, "মামণি, ফু'মণির কোলে যে বেবিটা আছে না? "
"হু।"
"ওকে আমি বিয়ে করবো।"
"কেন?"
"ওহহো, তুমি বুঝতে পারছো না। ওটা তো আমার ইয়ো পানি।"
তাসিনের ফিসফিসানি সুরে বলা কথা শুনে সানজি তাকওয়া মুখ টিপে হাসে। যাক, এতোক্ষণে বেবি মানকিটার মাথায় তাহলে হিসেব ঠিকঠাক ঢুকলো। তারমানে সে এ দুদিন চিনে উঠতে পারেনি। আচমকা এতো ছোট বেবি দেখে ভয় পেয়েছিলো জন্য দূরে দূরে ছিলো।
"বেবিদের বিয়ে হয় না৷ বিয়ে করতে হলে আগে বড় হতে হয়।"
"না..না। আমি তো বড় হয়ে গিয়েছি। ফু'মণিকে বলো তুমি।"
"ফু'মণিকে বলে লাভ নেই। ফু'মণি শুনবে না। তুই বললি কেন, ভয় পাস বেবিকে দেখে। আর কাজ হবে না। তুই আউট।"
"একদম বোল্ড আউট।"
তাসিন কাঁধ হতে মাথা তোলে। তিথির গলা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সোফার উপরে। দু'হাত কোমড়ে ভাঁজ করে কপাল কুঁচকে বলে,"এটা আমার ইয়ো পানি। শুধু আমি বিয়ে করবো। আর কেউ বিয়ে করতে পারবে না। তোমরা কেউ বুঝতে পারছো না কেন ফু'মণি।"
"আস্তে কথা বল,বেবি মানকি। মাইক বাজাচ্ছিস কেন? উঠে পড়বে তো।"
"আমি তাহলে টুপি আর পাঞ্জাবি নিয়ে আসি?"
সানজি তাকওয়া পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তিথি ফোন হতে দৃষ্টি তুলে অবাক হয়ে তাকায়। একসাথে তিনজন আশ্চর্য কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, "কি করবি?"
তাসিন সোফা হতে নেমে নিঃসঙ্কোচ ভঙ্গিতে বলে,"ইয়ো পানিকে এক্ষুনি বিয়ে করবো।"
"সানজি, এই ছেলে বড় হলে নির্ঘাত পাগলা প্রেমিক হবে। তুই মিলিয়ে নিস আমার কথা।"
"মিলানোর কি আছে চোখের সামনেই তো দেখতে পাচ্ছি। ভাবি তোমার ছেলের ভবিষ্যত কি দেখতে পাচ্ছো?"
তিথি ফোন রেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পায়ের উপর পা তুলে বসে।নিরস গলায় বলে, "তোমরা সবাই মিলে আমার ছেলেটার মাথায় এসব ঢুকিয়েছো। বিয়ের ভূত মাথায় চেপেছে। এখন ম্যানেজ করো। আর তার ভবিষ্যত নিয়ে আমি নিজেও ডিপ্রেশন থাকি।"
"মামণি আমার পাঞ্জাবি আর টুপি কোথায়?"
"তাসিন, চুপ করো। এটা তোমার বাসা না। এটা শাহমিকদের বাসা৷ এখানে টুপি পাঞ্জাবি, বিড়াল প্যান্ট কিছু নেই।"
"আমাকে এনে দাও। এক্ষুনি এনে দাও.."
তাসিনের কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলা কথায় সানজি নিজের হাসি চাপায়। নিরেট স্বরে বলে,"বিয়ে এতো সহজ নয় রে পাগলা প্রেমিক৷ ইয়ো পানির মন না জুগিয়েই বিয়ে করবি? তোর চাচ্চু যেমন তার ইয়ো পানির পিছন পিছন ঘুরেছে। তোকেও সেরকম ঘুরতে হবে। হাতে পায়ে ধরে বলতে হবে, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।"
তাকওয়া গিয়ে তাসিনের সামনে দাঁড়ায়। ঘাড় নিচু করে বলে,"শোন বেবি মানকি, বিয়ে করার আগে কিছু টিপস ফলো করতে হবে তোকে। তোর ইয়ো পানির প'টি পরিষ্কার করতে হবে৷ গা ভাসিয়ে মুতু করে দিবে সেটা পরিষ্কার করতে হবে। কান্না করলে থামাতে হবে। পারবি?"
তাসিন অবোলা মুখোরেখায় আলতো করে ঘাড় নাড়ায়। ধীর কন্ঠে বলে,"পারবো।"
"সত্যি পারবি? বুঝিস কিন্তু।"
"তাহলে কি তোমরা আমাকে বিয়ে দিবে ইয়ো পানির সঙ্গে?"
"হু। যদি সব কাজ করতে পারিস তাহলে বিয়ে দিবো।"
"আমি পারবো তো।"
তাসিনের অকপটে জবাব শুনে তাকওয়া মৃদু গুঞ্জন তুলে বলে,
"সানজি রে..নাম পরিবর্তন কর কুইক। নিশ্চিত এই জেনারেশনের মজনু সে। লায়লার জন্য সব করতে পারবে।"
"তোর এতো সাহস কিভাবে হলো বেবি মানকি?"
"আমি বড় হয়ে গিয়েছি যে।"
তিথি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সানজির কোল হতে শাহমিকাকে নিজ কোলে নিয়ে ভিতরে যেতে যেতে বলে,"আপনি নিজেই এখনও বেডজুড়ে মুতু করেন। মামণি ছাড়া প'টি করতে পারেন না। সব কাজ আমার করে দিতে হয়। খুব শখ বিয়ে করার না? আবার বেবির পটি পরিষ্কার করবে !! পাকা পাকা কথা কম বলতে শিখুন।"
সানজি তাকওয়া একসঙ্গে মৃদু শব্দ করে হেসে উঠে। তাসিন চোখ ছোট ছোট করে মুখ লটকে দাঁড়িয়ে থাকে। বিয়ের কথা বললেই সবাই তার বিপক্ষে কেন চলে যায় বুঝতে পারে না সে। এখানেও নির্ঘাত কঠিন পলিটিক্স।
"ভাবি..ভাবি একটু ওয়েট।"
"আবার কি?"
"একটু।"
সানজি তাসিনকে একহাতে ধরে তিথির কাছে নিয়ে যায়। ছোট্ট বেবিটার দিকে ইশারা করে বলে,"ছুঁয়ে দেখবি?"
তাসিন নির্বিকারচিত্তে মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলে,
"হু।"
"ভয় পাবি না?"
"না।"
"ভাবি একটু নিচু করো।"
তিথি ঘুমন্ত পরীটাকে একটু নিচু করে তাসিনের সম্মুখে ধরে। তাসিন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে বেবিটাকে। কি সুন্দর নিরবে ঘুমিয়ে আছে সে। আলতো হাতে সে প্রথম স্পর্শ করে বেবিটার কোমল হাত। একদম নরম তুলোর মতো তুলতুলে। ধরলেই যেন হাওয়াই মিঠাই হয়ে গলে যাবে।
তাসিনের মুখে নির্মল হাসি ফোটে। ভয়গুলো তার উবে যায় মুহুর্তেই। সে ঘাড় তুলে স্বচ্ছ হাসি হেসে ফু'মণির দিকে তাকায়। উচ্ছ্বেসিত গলায় বলে,"আর ভয় করছে না ফু'মণি। এটা আমার ইয়ো পানি। আমি আজকে বাসায় গিয়ে পাঞ্জাবি আর টুপি নিয়ে আসবো। তুমি বিয়ে দিবে আচ্ছা?"
"বিয়ের চিন্তা পরে কর বেবি মানকি। ইয়ো পানির বাপ জানলে তোকে চ্যাপা শুঁটকি বানিয়ে রোদে শুকাবে। আগে মেয়ের বাপকে পটা। নইলে দরজা বন্ধ।"
______________________________________
দুপুরের শাওয়ার সেড়ে ধীর পায়ে ওয়াশরুম হতে বের হয় শেহরিন। মাথায় পাতলা একটা গামছা দিয়ে চুলগুলো খোঁপার মতো করে বেঁধে নিয়েছে উঁচু করে। কপালে মুখে বিন্দু বিন্দু জলকণাগুলো তার শুভ্র মুখটাতে দানা বেঁধেছে। মা হওয়ার পর হতে চেহারায় মলিনতা ভাব কমে হয়েছে বেশ টকটকে। মায়েদের গায়ে এক স্নিগ্ধ সুবাস এসে ভীড়েছে তার গায়ে।
আল্লাহর অশেষ শুকরিয়ায় নরমাল ডেলিভারির কারণে বেশ কম ঝক্কি সামলাতে হচ্ছে নাজুক এই রমণীকে। তিনদিন হতেই ভালোই নড়াচড়া, হাঁটাচলা করতে পারছে। শরীর কিছুটা দূর্বল হলেও নিজেকে ধাতস্থে রেখেছে। কারণ একটাই, কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছে সে । বুকের ভিতরে পাথর চেপে থাকলেও মুখে রেখেছে প্রশান্তির ছায়া। মা হয়েছে যে, মেয়েকে এই দূর্গম সময়ের আঁচ থেকে বাঁচাতে তাকে তো শক্ত হতেই হবে।
"আমাকে ক্ষমা করার জন্য হলেও যদি রাজি হতে.."
"এভাবে বলবেন না, আম্মা। ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কেন?"
"অন্যায় কম করিনি তোমার সঙ্গে। নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছে। মা হয়ে এমন অন্যায় মেনে নেওয়া যায় না। সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হচ্ছে আফসোস এবং অনুতাপ। অনেক বেশি কষ্ট এখানে। যেটাতে আমি ভুক্তভোগী। আমি একটু মুক্তি পেতে চাই? মুক্তি দিবে কি?"
শেহরিন ক্ষীণ হেসে মিসেস নাজনীনের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। নম্র চোখে তাকিয়ে বলে,"আমি মুক্তি দেওয়ার মতো কেউ নই আম্মা। আপনার অনুশোচনা বোধটুকু যে এসেছে নিজের মধ্যে ধরে নিন, এটাই আপনার মুক্তি। কলুষিত আত্মাকে দূরে সরিয়ে নিজেকে নিজেই মুক্তি দিন। আপনার ভালোটা আমি গ্রহণ করবো, আপনাকে সম্মান শ্রদ্ধায় আমি পরিপূর্ণ রাখবো। আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি তো এতটুকুই চেয়েছিলাম।"
"আমি একপাক্ষিক হয়ে মাতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছি। এই পাপ আমি কিভাবে নির্মোচন করবো জানা নেই।"
"পাপে কাটে পূণ্যতে। এজন্য তো পূণ্যের এতো দাম।"
মিসেস নাজনীন ঘোলাটে চোখে তাকায় শেহরিনের দিকে। ভেজা কন্ঠে বলেন, "আমি তোমার অনুমতি ব্যতিত একটা কাজ করে ফেলেছি। বলতে পারো অপরাধই করেছি। তোমার লেখা ডায়েরিতে আমাকে নিয়ে যে অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করেছো আমি সেটা পড়েছি এবং সেটা পড়ার পর হতে শুধু মনে হচ্ছে, আমি ভালো মা হতে পারিনি। আমি সন্তান মানে বুঝি না। আমি যে আর পারছি না। তোমার কলমের দুটো বাক্যের শক্তি আমার গোটা ভীতটাকে নাড়িয়ে তুলেছে। তোমার চোখে চোখ রাখতে আমার কার্পন্যবোধ হচ্ছে।"
"প্লিজ কান্না করবেন না আম্মা। আমার তো কোনো অভিযোগ নেই আপনার প্রতি৷ আমার নিজের অপারগতাও তো কম ছিলো না। আসার সময় তো বলেই এসেছিলাম আপনার মেয়ে হয়ে ভালোবাসা অর্জন করে নিবো। কিছুটা কাজ শিখে ফেলেছি আর একটু। আশা করি দ্রুত হয়ে যাবে।"
"আমার কিছু লাগবে না৷ আমি যতদিন বেঁচে আছি আমার সন্তানদের দেখভাল আমি নিজে করবো। তুমি ফিরে চলো আমাদের সঙ্গে মা। আমার সংসারটা তোমাদের ছাড়া অন্ধকার হয়ে আছে।"
শেহরিন নীমিলিত লোচনে তাকিয়ে দেখে মিসেস নাজনীনকে। একটা সময় এই মানুষটা তাকে সহ্য পর্যন্ত করতে পারতো না। কত অভিযোগ, কত আফসোস। এখনও কানে ভেসে বেড়ায়। তবুও একটুখানি ভালোবাসা পেতে তার কি নিরন্তর চেষ্টা ছিলো।
আর আজ সেই মানুষটার চোখে তার জন্য পানি! যা কল্পনার বাহিরে। সময় মানুষকে কোথায় থেকে কোথায় এনে দাঁড় করায়। জীবনের হিসেব সত্যি অনেক অদ্ভুত। আর পরিবর্তন যেন নিত্যসঙ্গী।
"আপনার ছেলের অনুমতি ছাড়া আমি কোথাও যেতে পারবো না আম্মা। আমাকে ক্ষমা করবেন ৷ উনার হাত ধরে আমি বাসা থেকে বের হয়েছি,তাকে ছাড়া কি করে যাই বলুন? আমি কখনোই সেটা পারবো না।"
"এখানে একা একা কিভাবে কি করবে তুমি? ছোট বাচ্চা সামলানো অনেক কঠিন কাজ। তুমি নিজেই তো ছোট মানুষ। তার উপরে সান্নিধ্য নেই।"
"উনার অনুপস্থিতি আমাকে শক্ত করে দিয়েছে। আমি এখন হয়তো আর আগের শেহরিন নেই। ভয় শব্দটা এখন আমার পরিচিত হয়ে গিয়েছে বারে বারে মুখোমুখি হতে হতে।"
মিসেস নাজনীন শেহরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের অশ্রু ঝরান। ভরাট কন্ঠে বলেন,"কষ্ট হচ্ছে তোমার অনেক তাই না? এসময়টাতে সান্নিধ্যেকে কাছে পেলে না।"
"মেয়ে আর মেয়ের বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছে বেশি। জন্মের পর বাবা মেয়ের সাক্ষাৎ এখনো পর্যন্ত হয়ে উঠেনি। জানি না সৃষ্টিকর্তা কবে সেই সুযোগ দিবেন। এই কষ্টটা হয়তো কখনো ভুলতে পারবো না৷
কিন্তু নিয়তি !! মেনে তো নিতেই হবে। দোয়া করবেন, আমাদের জন্য। আল্লাহ যেন আমাদের এক করে দেন আবারো।"
"মনে প্রাণে দোয়া করি তোমাদের জন্য মা। তোমার পরিস্থিতি আমি উপলব্ধি করতে পারছি, কারণ এই সবকিছু আমার চেনাজানা। এগুলোর অনেক কিছু আমিও পার করে এসেছি।
তবে আমি তোমার ধৈর্য্য দেখে নির্বাক। আমি এতোটা ধৈর্য্যশীল কখনোই ছিলাম না। মুখে বলা সহজ, কিন্তু এই সময় পার করাটা অনেক কঠিন। যে কঠিনটাকে তুমি এতো কষ্ট করে সহজ করে নিয়েছো। তোমাকে আমি নতুন করে চিনছি এবং বলতে আজকে বাধ্য হচ্ছি, সান্নিধ্য একটা রত্ন জীবন সঙ্গীনি হিসেবে পেয়েছে।"
"এই ভালোবাসাটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।"
"তাহলে, যাওয়া কি যাবেই না মা ?"
শেহরিন মিসেস নাজনীনের হাত সন্তপর্ণে ধরে। মুখে নরম হাসি বজায় রেখে বলে,
"আমি খুব নগন্য একটা মেয়ে। আমার ব্যর্থতার ঝুলি অনেক বড়। কিন্তু আত্মসম্মানের ক্ষেত্রে আমি অনেক বেশি সচেতন আম্মা। এটাই একমাত্র আমার শক্তি। সেই শক্তি ধরে আজও এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছি। আমি চাই না, আমার খারাপ সময়কে পুঞ্জিভূত করে আমি অন্য আশ্রয় খুঁজি। মাথা উঁচু করে তার হাত ধরে সুখনিবাস হতে বের হয়েছিলাম। ইনশাআল্লাহ মাথা উঁচু করে আবার তার হাত ধরে মেয়েকে নিয়ে সুখনিবাসে প্রবেশ করবো। তার মাঝের যুদ্ধগুলো আমার একান্ত। আমি আমার আত্মসম্মানটাকে খোঁয়াতে পারবো না। আমায় মাফ করুন।"
মিসেস নাজনীন শেহরিনকে দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। মেয়েটার অসম্ভব আত্মসম্মান তাকে নিশ্চুপ করিয়ে দেয়। যার ফলে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলতে সে বাধ্য হন। হাতের উপর হাত রেখে কোমল গলায় বলেন,
"ভালো থাকো তুমি। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে আমার বাড়ি আবার আলোকিত করো। অপেক্ষায় থাকবো তোমাদের।"
----------------------------------------------------
দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষে কিছুটা সময় কাটিয়ে প্রস্থান নেন মিসেস নাজনীন। ঠিক তার পর পরেই বিকেলের দিকে অ্যাপার্টমেন্টে বিশেষ দরকারে আসে সরফরাজ।
সান্নিধ্যের অফিসের কিছু নথিপত্র সংগ্রহ করে তা পরোখ করার মাঝে ফোনে কথা বলতে ভীষণ ব্যস্ত সে।
কপালে জমে আছে স্বেদকণা। মুখজুড়ে একরাশ ক্লান্তি ভাব। অবিরাম গতিতে চলছে তার ছোটাছুটি। এর মাঝে নজর রাখতে হচ্ছে আবার বিজনেসেও।
"ভাইয়া।"
সরফরাজ সানজির কন্ঠ পেয়ে পিছু ঘুরে তাকায়। কানে ফোন রেখে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকাতেই সানজি ধীর কন্ঠে বলে,
"কথা শেষ করে একটু ড্রয়িংরুমে এসো। দরকার আছে।"
"আচ্ছা যা আসছি।"
সানজি চলে যায়। সরফরাজ মিনিট পাঁচেক এর মাঝে প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে নথিপত্র গুলো গুছিয়ে নেয়। হাত ঘড়িতে সময় দেখে তড়িৎ পায়ে এগোয় ড্রয়িংরুমের দিকে।
সরফরাজের আগমন ঘটতেই শেহরিন বসা ছেড়ে উঠে পড়ে সোফা হতে। অপরদিকে তিথি চুপচাপ মাথা নিচু করে নখ খুঁটতে থাকে। সরফরাজ এক নজর সেদিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। শেহরিনের উদ্দেশ্য শান্ত গলায় বলে,
"উঠতে হবে না। বসো।"
"সমস্যা নেই ভাইয়া। আপনি বসুন প্লিজ।"
"কি দরকার?"
"আছে দরকার।"
"একটু তাড়াতাড়ি শেষ করবে। আমাকে বের হতে হবে আবার।"
শেহরিন সানজি পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করে। সানজি চোখের পাতায় কিছু একটা বুঝাতেই শেহরিন নরম গলায় বলে,"আচ্ছা বেশি সময় নিবো না।"
"ভাইয়া শেহরিন তোমাকে কিছু বলতে চায়।"
"জ্বি শুনছি বলো।"
"একটু ধৈর্য্য ধরে শুনবে প্লিজ।"
সরফরাজ সানজির দিকে চোখ তুলে তাকায়। ভারী কন্ঠে বলে,"আমার ধৈর্য্য কি কম হয়ে গিয়েছে?"
"না..না কমে হয়ে যায়নি। তবে হতে পারে। আগাম সাবধান বার্তা জানালাম আর কি।"
"আচ্ছা ধৈর্য্য ধরে শুনবো। শুরু করা যেতে পারে এখন।"
শেহরিন নিভৃতে লম্বা করে শ্বাস টেনে নেয়। কন্ঠ পরিষ্কার করে বলে,"ভাইয়া আমার নিজের প্রতি ভীষণ রিগ্রেট ফিল হচ্ছে।"
"কেন?"
"আমার কারণে আপনাদের মাঝে এতো দূরত্ব। বিষয়টা আমার অজানা ছিলো। কিন্তু যখন জানতে পারলাম তখন থেকে আমার নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।"
"সরি শেহরিন। আমি এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।"
"ভাইয়া আপনি কথা দিয়েছেন। আমাদের কথা শুনবেন।"
সরফরাজ বসা ছেড়ে উঠা মুহুর্তে শেহরিনের আকুল কন্ঠে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। ফের বসে হাত ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে বলে,"ঠিক আছে বলো।"
"কেন আপনি এতোটা হার্ড হচ্ছেন ভাইয়া?"
"অবশ্যই কারণ আছে।"
"কারণটা তো খোলাসা হয়ে গিয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি অন্যায় করে এবং পরে সেটা সে অনুধাবন করে নিজেকে সংশোধন করে তাহলে কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নয়? তিথি ভাবি, সানজি আপুর বিষয়ে অন্যায় করেছে, আমার ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা চড়াও হয়েছে। এটা আমি সানজি আপু দুজনেই তিথি ভাবির সঙ্গে ক্লিয়ার করে নিয়েছি। ভাবি আমাদের দুজনের কাছেই অনুযোগ করেছেন। বড় হিসেবে সে যে আমাদের কাছে ক্ষমা শব্দটা উচ্চারণ করেছে, নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে এতেই তো আমরা ভীষণ খুশি। আমাদের মধ্যে তার প্রতি আর কোনো নেগেটিভ বায়াস নেই। তাহলে আপনি কেন এখনো দূরে সরিয়ে রেখেছেন ভাইয়া?"
"কেউ স্বইচ্ছায় দূরে যেতে চাইলে তাকে বাঁধা দেওয়া উচিত না। আমি তিথিকে মোটেও দূরে সরিয়ে দিতে চাইনি। আমি ওকে ওয়ার্ন করেছি, বুঝিয়েছি। বাট সে আমার কথা রাখেনি। আমার বিশ্বাস ভেঙেছে। আর সে জানতো বিশ্বাস ভাঙার পরিণাম কি হতে পারে। এরপরেও কেন ভুল করলো? আমি কিভাবে এখন তার ভালোটা নিয়ে সবকিছু শুধরে নিবো? এর নিশ্চয়তা কতদিনের বলতে পারবে?"
"ভুল কি মানুষ শুধু না জেনেই করে ভাইয়া? আমরা তো জেনে শুনে কত ভুল করি। আমরা নিশ্চিত থাকি, এই কাজটা করলে আমাদের ক্ষতি হবে। তবুও আমরাও অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সেই ভুলটাই করি। এবং দিনশেষে যখন বুঝতে পারি এই কাজটা করা আমার ঠিক হয়নি তখন অনুশোচনায় ভুগি। আমি চাই নিজেকে সংশোধন করে নিতে। কিন্তু সংশোধনের দরজাই যদি বন্ধ থাকে,আমি নিজেকে কিভাবে প্রমাণ করবো ?"
"প্রভাবিত হওয়া জিনিসটাই খারাপ শেহরিন। এখন ভুলগুলো বুঝতে পেরেছে ঠিক আছে বাট যখন অন্য কেউ এসে আবার প্রভাবিত করবে তখন?"
"সেই সময়টুকু দিন আগে। যে বিশ্বাসটা তিথি ভাবি হারিয়েছে সেই বিশ্বাসটাকে ফিরিয়ে আনতে দিন। তারপরে দেখুন কি হয়। আমি অনুরোধ করছি ভাইয়া,প্লিজ এভাবে পবিত্র একটা সম্পর্ককে ভাঙবেন না। একটাবার তাসিনের কথা ভাবুন। ওই বাচ্চাটা মা বাবা কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না। তাকে আপনারা কেন এতোবড় শাস্তি দিবেন? ওর কি দোষ?"
"এই একটা জায়গাতেই আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে। এটা তিথি মা হয়ে বুঝতে পারেনি। সে ভাবেনি আমাদের বাচ্চাটার কথা। সে যে ন্যারো মাইন্ডে ছিলো, সেই মাইন্ডটা তাসিনের জন্য কতটা বিপদজনক হতো বুঝতে পেরেছো? বাচ্চারা বেশিরভাগ মায়ের গুণাবলীতে বড় হয়। তাসিন কি শিখতো?"
তিথি স্থিরচিত্তে চোখ বন্ধ করে নেয় নিরবে। কার্নিশে চিকচিক করে জলের কণা। সরফরাজের কথাগুলো তার অন্তরকে দাহ করে তোলে। এগুলো সে বুঝেছে টানা এক মাসের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। হ্যাঁ, একটু দেরিতে বুঝেছে, তবুও বুঝেছে তো।
"আপনার সার্থকতা তো এখানেই ভাইয়া। সৃষ্টিকর্তা আপনাকে সত্যিই ভালোবাসেন৷ আর ভালোবাসেন বলেই আপনার ভালোবাসাকে আবারো আপনার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে নতুন করে। আপনার মতো করে, যেমনটা আপনি চেয়েছিলেন। তাহলে এই ভুলটাকে ফুল হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয় কি বলুন? যেটা গোটা একটা মানুষকে ভিতর হতে পরিবর্তন করে দিয়েছে?"
সরফরাজ শেহরিনের যুক্তির পাল্টা জবাব দিতে চেয়েও দেয় না৷ থেমে যায় এবং প্রতিটি কথা অনুধাবন করে। মেয়েটা ভুল কিছু বলেনি। এটা সত্যি, এই ভুল না হলে তিথি কখনোই পরিবর্তন হতো না কিংবা তার ভিতরে যে কালো একটা ছায়া ছিলো সেটা দূর হতো না।
"আমি মা ছাড়া বড় হয়েছি। মায়ের অভাব আমাকে শত পূর্ণতার মাঝেও অভাবী করে রাখে। যেটা কোনোকিছুতে কোনোভাবেই পূর্ণ হয় না। আমি বুঝি একটা বাচ্চার জন্য বাবা মা দুজনেই কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাইয়া। আমি যে ভয়াবহ ফেজটা পার করে এসেছি, কোনোভাবেই চাই না আমার শত্রুও সেই ফেজটা পার করুক। এটার আলাদা একটা বেদনা থাকে। যেটা প্রকাশ করা যায় না, যেটা কেউ বোঝে না৷ সন্তানের জন্য বাবা এবং মা দুজনেই সৃষ্টিকর্তার হতে আশীর্বাদস্বরুপ। দুজনের ভূমিকা অনবদ্য। আমি তাসিনকে কোনো প্রকার ভয়াবহতার সম্মুখীন হতে দিবো না। দরকার হলে আমি আপনার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইছি ভাবির হয়ে..
" প্লিজ.. শেহরিন এসব বলবে না । তুমি আমার বোন। পায়ে ধরার মতো কেউ নয়। আমি তোমার কথাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই শুনছি৷"
"আমি কিভাবে বুঝবো আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন?"
সরফরাজ শেহরিনের দিকে তাকায়। যৎকিঞ্চিত হেসে বলে,
"ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে ল'ইয়ার হওয়া উচিত ছিল তোমার৷ কি করতে হবে?"
শেহরিন সানজি একসাথে উচ্ছ্বেসিত হয়ে উঠে। প্রফুল্ল গলায় বলে,"ভাবির সঙ্গে এই মুহুর্তে সব ক্লিয়ার করে নিতে হবে এবং ভাবিকে সসম্মানে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।"
"এখন তো আমি বাসায় যাচ্ছি না। আমার ভীষণ দরকারি কাজ পেন্ডিং এ।"
"আচ্ছা, আচ্ছা যখন বাসায় যাবেন তখন। আর এখন ভাবির কাছে গিয়ে দাঁড়ান। দু'জন দুজনকে সরি বলুন।"
সরফরাজ হাত ঘড়িতে আবারো সময় দেখে। দেরি হয়ে গিয়েছে অনেকটা৷ এর মাঝে আরো দেরি করলে সমস্যা। সে বসা ছেড়ে উঠতে উঠতে হতাশ গলায় বলে," লাইফের ফার্স্ট দেখলাম, আসামি আর ভুক্তভোগী এক হয়ে বিচারককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ তাই। এখন সরি বলো দু'জন দুজনকে।"
সরফরাজ তিথির সামনে গিয়ে সরাসরি হাঁটু ভাঁজ করে বসে। তিথি নিজের কান্নাকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টায় মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া মুহুর্তে সরফরাজ নিজ হাত বাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দেয়৷ ধীর কন্ঠে বলে, "সরি।"
তিথি এতোদিন পর স্বামীর আদুরে ছোঁয়া পেয়ে আপ্লুত হয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে। কিয়ৎক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সরফরাজকে সঙ্গে সঙ্গে জাপ্টে ধরে আষ্ঠেপৃষ্ঠে। চোখ বন্ধ করে কান্নাজড়িত গলায় বলে উঠে, "সরি.. সরি..সরি। রিয়েলি সরি.."
মে মাসের শেষ দিন আজ। কাঠফাটা রোদ যেন আকাশ থেকে আগুন ঝরাচ্ছে। তীব্র দাবদাহে চট্টগ্রামের রাজপথ তপ্ত লোহায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু আদালত চত্বরের বাইরের এই জনসমুদ্রে গরমের কোনো তোয়াক্কা নেই। শত শত মানুষ হাজির হয়েছে। পক্ষ বিপক্ষের সংঘর্ষে রক্তারক্তি, পুলিশের বাঁশির আওয়াজ, লাঠিচার্জ সব মিলিয়ে এক অগোছালো, উত্তপ্ত পরিবেশ।
ক্ষমতার জোরে শাহজাহান সাহেব সান্নিধ্যের রিমান্ড বাতিল করিয়েছিলেন। কিন্তু মাস পেরোতেই পুলিশ আজ পুনরায় চার্জশিট দাখিল করেছে। গুঞ্জন উঠেছে, সহযোগী আসিফকে ২৪ ঘণ্টার মাঝেই গ্রেপ্তার করা হবে। তাকে ধরা এখন সময়ের ব্যাপার। সমস্ত রাজনৈতিক মারপ্যাচ পেরিয়ে তাই সান্নিধ্যকে আজ করা হয়েছে আদালতে হাজির।
সমস্ত বিচারাধীন প্রক্রিয়া শেষে আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। নেতাসাহেবকে এখন তোলা হবে বিশেষ প্রটোকল সম্পন্ন প্রিজন গাড়িতে। পুলিশ, ক্যামেরা, সাংবাদিক সব সারি সারি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাম ছুটে যাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে। কেননা, সান্নিধ্যের সমর্থিত লোকজন অর্থাৎ পুরো ফটিকছড়ি উপজেলার মানুষ আজ রাজপথে নেমে আন্দোলন শুরু করেছে। তাদের দাবি যে কোনো মূল্যে তাদের এমপি সাহেবের মুক্তি চাই।
কয়েকদফা পাল্টাপাল্টি হামলা, কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়। ইট পাটকেল সহ রক্তারক্তি হামলায় পুলিশসহ বেশ কয়েকজন সমর্থিত জনগণ আহত হন। পুরো কোর্ট চত্বর জুড়ে মোতায়ন করা হয় বাড়তি পুলিশ।
উত্তাল সেই মুহুর্তে, পুলিশের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মাঝে আদালত হতে বের হয়ে আসে সান্নিধ্য। হাতে নেই কোনো হাতকড়া। হতে পারে ক্ষমতার খানিকটা প্রতিফলন মোটামুটি সব জায়গাতেই বিচরণ ঘটিয়ে রেখেছে ।
পড়নে তার সাদা শার্ট, কনুই অব্দি গুটানো হাতা। ক্রিম রঙের প্যান্ট। মুখে কালো মাস্ক। কপালে ছড়িয়ে আছে এলোমেলো চুলের রাশি। দীপ্ত, অগ্নিগর্ভ আর অটল চাহনিতে শিরদাঁড়া তার সবসময়কার মতো উঁচু। যেন হাজার প্রতিকূলতার মুখেও মাথা নোয়াবার নয় সে। দুর্নিবার তার চলন বলন।
সান্নিধ্যেকে দেখা মাত্র তার সমর্থিত লোকজন গর্জে উঠে।স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তোলে চারপাশ। পুলিশের বাঁধা অতিক্রম করে তারা এগিয়ে আসতে শুরু করে। যার ফলে মুহূর্তে পক্ষ বিপক্ষের সংঘর্ষে রূপ নেয় পরিস্থিতি। পুলিশ ফের হিমশিম খায় পরিবেশ শান্ত করতে।
সান্নিধ্য ডান হাত উঁচু করে তার সমর্থিত লোকজনদের উদ্দেশ্য হাত নাড়ে। মাস্কের আবরণের নিচে তার সুর্দশন মুখটাতে ফুটে ওঠে নিরব হাসি। দীপ্ত চাহনিতে সে সবাইকে শান্ত হওয়ার ইশারা দিলেও খুব একটা কাজে দেয় না৷ শত শত মানুষ তার পক্ষে উচ্চ গলায় স্লোগান ছাড়ে।
প্রখর এই উত্তেজনার মাঝে, ভিআইপি গাড়ির চারপাশ হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে আসে মাথায় হালকা নীল ওড়না টানা এক নারী। বাম হাতে তার ওড়না দ্বারা অর্ধ মুখ ঢাকা। পিছনে একাধিক মহিলা পুলিশ তাকে সমস্ত জনগণ হতে আলাদা রেখেছে। চোখজুড়ে তার ব্যাকুলতার সম্ভার।
সান্নিধ্যের গাড়িতে উঠার ঠিক আগ মুহূর্তে অনড় দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। দৃষ্টি কোটরে এসে বন্দি হয় তার উত্তাল বুকে ঢেউ তোলা হৃদয়দৌর্বল্য অর্ধাঙ্গিনীকে। তার শেহরিনকে। শত শত মানুষের ভিড়ে সমস্ত বাঁধা অতিক্রম করে যে কিনা ছুটে আসছে তার পানে।
সরফরাজ সান্নিধ্যের কথা রাখতে তৎপর। শেহরিনের অনুরোধে আজ সে নিয়ে এসেছে দেখা করাতে। কিন্তু এতো জনসমাগম যে হবে এটা তার ধারণার বাহিরে ছিলো। শেহরিনকে না করেছিলো এই মুহুর্তে দেখা না করতে৷ কিন্তু নেতাসাহেবের স্ত্রী তা শোনেনি। হাজার কষ্ট হলেও সে আজ দেখা করবেই। উপায়ন্তর না পেয়ে সরফরাজ তাৎক্ষণিক পুলিশের দারস্থ হয়। ক্ষমতার জেরে মহিলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে শেহরিনকে গাড়ির কাছে নিয়ে যায়। যাতে কোনো পুরুষের হাতের অশ্লীল ছোঁয়া শরীরে না লাগে।
সান্নিধ্য গাড়িতে উঠে তার হাত বাড়িয়ে দেয়। শেহরিন পাগলের মতো ছুটে আসে গাড়ির দরজার কাছে। দগ্ধ গরমে তার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। শক্ত বুটের পিষ্টে পায়ের পাতা তার রক্তাক্ত। সবকিছুকে অর্থহীন করে কাঁপতে থাকা হাতটা দিয়ে স্পর্শ করে তার নেতাসাহেবের হাত।
মুখ হতে ওড়না সরে যায় শেহরিনের। দীর্ঘ দূরত্বে চোখের তৃষ্ণা মেটায় পরম তৃপ্তিতে। ঠোঁটের কোণে ফোটে অদম্য এক হাসি।
চোখ হতে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে নোনাজল।
শেহরিন নেতাসাহেবের শক্ত হাতের পৃষ্ঠটাকে আগলে নেয়। ক্ষত কালসিটে হাতের তালুতে খুব যত্ন করে ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। একফোঁটা অশ্রুের কণা স্পর্শ করে সেখানে। নিরন্তর গলা উন্মোচন করে বলে,
"ডো'ন্ট ফিল ব্রেকডাউন নেতাসাহেব। শিরদাঁড়া উঁচু করে প্রত্যাবর্তন করুন। আপনার শেহরিন আপনার পাশে আছে।"
অগাধ বিশ্বাস। অদম্য সাহসের পরিস্ফুটন। যে কন্ঠে নেই নূন্যতম করুণা। শেহরিনের মুখনিঃসৃত দুটো কথা সান্নিধ্যের শ্রবণে গিয়ে বাড়ি খায়। সারা দেহে বিদ্যুৎ তরঙ্গ বইয়ে দেয় সঙ্গে সঙ্গে। ঠোঁটের কোণে ক্ষণিকের মৃদু হাসি ফুটে উঠে তার। যে হাসিতে সে খুঁজে পায় লড়াই করার সাহস।
সান্নিধ্য চোখের পাতায় আশ্বস্ত করে শেহরিনকে। নিরব বার্তায় একে অপরকে কথা দেয় দৃঢ় সংকল্পে আবদ্ধ হয়ে। এদিকে পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে পুলিশের নির্দেশে দ্রুত গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। শক্ত হাত হতে নরম হাত ছুটে যায় ধীরে ধীরে। গাড়ির দরজা লেগে যায় সেই সাথে।
মহিলা পুলিশগণ ঠেলে সরিয়ে দেয় শেহরিনকে। অধিক ভীড়ে তাল সামলাতে না পেরে সে হোঁচট খেতে খেতে নিজেকে সামলে নেয়। পা হতে সমানে রক্ত ঝরে জুতো ভিজিয়ে তোলে। তবুও সে স্তিমিত হয় না। ভেজা চোখমুখে দীপ্ত চাহনিতে দু'হাতে সবাইকে ঠেলে গাড়ির পিছু পিছু যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। কিন্তু মহিলা পুলিশগণ তাকে ফের আটকে ধরে।
"শেহরিনকে সরা তুই ...শেহরিনকে সরা। ওর পায়ে রক্ত.."
ভিতর হতে সান্নিধ্যের ক্রমাগত গর্জনে ভেসে আসে। হাত মুঠো করে শক্ত করে চেপে ধরে সে সরফরাজকে নির্দেশ দেয় শেহরিনকে সরিয়ে নিতে।
সরফরাজ ভীড় উপেক্ষা করে এসে মহিলা পুলিশদের জোরগলায় বলে শেহরিনকে ছাড়তে। দু'হাত প্রসারিত করে নূন্যতম দূরত্ব বজায় রেখে সে সবাইকে পিছু হটতে বলে।
আরহাম রিমন এসে পিছন হতে আশেপাশে সবাইকে সরিয়ে দেওয়া মুহুর্তে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
ধুলো উড়িয়ে চোখের পলকে অদূর হয়ে যায় গাড়ি। শেহরিন একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আপনাআপনি শূন্যে তোলা হাতটা তার নেমে যায়। নেতাসাহেব তার দৃষ্টি সীমানার বাহিরে চলে গিয়েছে। তবে, ক্ষণিকের হাতের স্পর্শ তাকে শক্তি সঞ্চার করে ভিতরে। নীল ওড়না ভেদ করে রোদের তীব্রতা তাঁর ভেজা চোখদুটোকে আরও জ্বলজ্বলে করে তোলে।
ম্লান দুপুরে সূর্যের তাপ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে কমতে থাকে মানুষের ভীড়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম গুলোতে প্রধান শিরোনামের পাশাপাশি স্থান পায়, এক ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতার কঠিন মুহূর্তের এক ফালি ভালোবাসা, আর তাঁর স্ত্রীর নিঃশর্ত সমর্থনের গল্প।