রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৫৪

🟢

অন্তিম পাতা -০১

সময় এক অদৃশ্য নদী। যার স্রোতে ভাসমান মনুষ্য প্রজাতি। এক বসন্তের পলাশ রাঙানো তীর ছেড়ে যখন ভেসে চলা হয়, তখনই সামনে দেখা দেয় আরেক বসন্তের কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা। বছর কেটে বছর আসার এই চক্রে আমরা বদলে যাই,বদলে যায় আমাদের জীবন ধারা। সেখানে ঘটে সংযোজন, হয় বিয়োজনের পালাবদল।

বসন্তের এই আগমন প্রত্যাগমনের মাধ্যমে বছর পার হয়ে যায় নিমিষেই। নতুন সুরে নতুন উন্মাদনায় আবারো মেতে উঠে প্রকৃতি। আমগাছে ফুলের মৌমাছির গুঞ্জন শেষ হতে না হতেই কেওড়া বনে নতুন কুঁড়ির মেলা শুরু হয়ে যায়।

লাল টুকটুকে কৃষ্ণচূড়া ফুলের সমারোহে চোখে ধাঁধা লেগে যাওয়ার জোগাড়। চিরল সবুজ পাতার ঠাঁই মেলেছে তাতে কোনমতে। আভিজাত্যপূর্ণ সেই অ্যাপার্টমেন্টের সামনে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি। দোতলার সেই চিরচেনা কিচেন হতে যা চোখে পড়ে সহজেই। সকাল সকাল পাখির কলতানের সুরের সঙ্গে কানে ভেসে আসে এক মিষ্টি মাখা সুর।

"বাবা...বাবা..বাবা.."

"আসছি মা.."

"বাবা আতো.. বাবা"

"শেহরিন..ওকে নাও।"

ওয়াশরুমের দরজা পৃষ্ঠে অনবরত নক করার শব্দ ভেসে আসছে। বার্বিডলের ছবি আঁকা টি শার্ট সঙ্গে ডেনিম শর্টস পরনে টুকটুকে এক রাজকন্যা ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সেই কাজ সম্পাদন করে যাচ্ছে একচিত্তে।

মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুলগুলো তার এখন কাঁধ ছুঁই ছুঁই। গোলাপি ঠোঁটে চকলেট শেক ছড়িয়ে গাল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। একহাতে প্যানকেকের একটা স্লাইস অন্য হাতে সে ওয়াশরুমের দরজা খোলার জন্য হম্বিতম্বি শুরু করে দিয়েছে। কারণ একটাই, ভিতরে বাবা আছে। বাবা তাকে সঙ্গে না নিয়েই একা একা শাওয়ার নিচ্ছে। যা সাবেক এমপি সাহেবের কন্যার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।

সময়ের সঙ্গে জোরশোর পাল্লা দিয়ে শাহমিকা এসে পৌঁছেছে এক বছর সাত মাস বয়সে। হাজারো আধোবুলির মাঝে সে স্পষ্ট করে বাবা আর মা শব্দটা উচ্চারণ করতে শিখেছে। হামাগুড়ি দিয়ে, হাঁটু ছিলে ছুঁলে, অনেক কাটা ছাঁটার পর অবশেষে পূর্ণাঙ্গভাবে হাঁটা শিখেছে এগারো মাস বয়সেই। এখন সে পুরো বাসা মাথায় করে নাচে। অপরদিকে চোখে হারায় বাবাকে। বাবা বলতে অজ্ঞান সে।

"মা..আসো। বাবা এখনি আসবে তো।"

" বাবা..আতো..বাবা"

"তুমি কি করেছো এগুলো?"

শেহরিন কিচেন হতে ব্যস্তপায়ে কক্ষে এসে শাহমিকাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। হাতে তার এখনও আটার গুঁড়ো লেগে আছে। সকালের নাস্তাতে রুটি আর সবজি তৈরি চলছে। একটু পরেই নেতাসাহেব বের হবেন তার কাজে। তাই তাড়াহুড়োও লেগেছে বেশ।

হাত দিয়ে টুকটাক খাওয়া শিখেছে জন্য মেয়েকে বসিয়েছিল ব্রেকফার্স্ট করাতে। কিন্তু সে খাওয়া বাদ দিয়ে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে এসেছে বাবাকে ডাকতে। ড্রয়িং রুমের সোফা জুড়ে চকলেট শেক ঢেলে একাকার করে ফেলেছে। আজ শেফালী এলে আর রক্ষা নেই। মা মেয়ে দুজনকেই ঝাড়ি দিবে আচ্ছা করে।

"আসো.. তুমি। বলছি তো বাবা আসবে এখনি।"

"না.."

"ছোট ভূতূকে ডাক দিবো?"

শেহরিনের মুখে ছোট ভূতূর নাম শুনে রাজকন্যা একটু দমে যায়। পিটপিট চোখ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। বাবার কাছে না যেতে পেরে এমনিতে তার ছোট্ট বুকে অসম বেদনা, এর মাঝে আবার ছোট ভূতূকে ডাকার কি প্রয়োজন! সে তো ভয় পায় তাকে দেখে।

"উজি..ভূ..তূ"

চোখ গোল গোল করে সে এক আঙুল তুলে জানালার দিকে তাক করে। আধোবুলিতে 'ওই যে ভূত' দেখানোর চেষ্টা করে মা'কে। শেহরিন মেয়ের ভীতরূপ দেখে কোনমতে একহাতে কোলে তুলে নিয়ে সরাসরি বের হয়ে যায় কক্ষ হতে।

অনেক কাজ পরে রয়েছে তার। আজকে ভার্সিটি অফ। সমস্ত কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। শাহমিকার কাপড়চোপড় গুলো সব এলোমেলো হয়ে আছে কাবার্ড জুড়ে, সেগুলো ভাঁজ করতে হবে। আগাম সাতদিনের জন্য তার মিল প্রেপ করে রাখতে হবে। ফিডিং বোতলগুলো সব ফুটিয়ে নিতে হবে। ফুসরত নেই কোনোকিছুতে।

"খাবার শেষ করছো না কেন মা? ক্ষুধা পায়নি তোমার?"

শাহমিকাকে ফিডিং চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে হাত হতে কেকের স্লাইসটা নিয়ে ছোট ছোট পিস করে রিমুভেবল ট্রেতে দেয় শেহরিন। সঙ্গে ঝটপট কিচেন হতে কিছু স্ট্রবেরি স্লাইসও যোগ করে দেয়। টিস্যু দিয়ে গালে লেগে থাকা চকলেট শেক মুছে দিয়ে মিষ্টি একটা চুমু দিয়ে উঠে পড়ে সে।

"সবটা খাবে কিন্তু।"

শেহরিন নিজের দৃষ্টি সীমার মধ্যে মেয়েকে রেখে ফের চলে যায় কিচেনে। নাস্তা রেডি করার কাজে লেগে পরে আবারো। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দিনরাত কম্পিটিশন চলে তার । আর এই কম্পিটিশনে কেউ কাউকে একচুল ছাড় দিতে নারাজ। এই অবুঝ, অপটু, অদক্ষ মেয়েটা এখন গোটা একটা সংসারের রাণী। পুরোদস্তুর গৃহিনী হয়ে রান্নাঘর সামলায়, মেয়ে সামলায়, আবার পড়াশোনা সামলায়। সবদিকেই যতটুকু সম্ভব ব্যালান্স রাখার চেষ্টা করে।

তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টার চলছে। পড়াশোনা এগোচ্ছে মোটামুটি গতিতে। দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনালের ফলাফল এক্সপেক্টশনের চেয়ে ভালো এসেছিলো তার। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম থাকলেও নবজাতক মেয়ে নিয়ে কখনোই সিজি থ্রি পয়েন্ট ফাইভ তোলা সম্ভব ছিলো না। এর পিছনে সম্পূর্ণ ক্রেডিট নেতাসাহেবের। কি করেনি সে? সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে হাজারো ক্লান্তির মাঝে রাত জেগে মেয়েকে কোলে রেখে শেহরিনকে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। সকালে নাস্তা আর রাতের ডিনার নিজেই তৈরি করেছে। মেয়ে আর অর্ধাঙ্গিনীর কোনো প্রকার সমস্যা যেন কিছুতে না হয় সেদিকে ছিল তার কঠোর নজরদারি।

সুখনিবাসে তাদের ফেরার কথা থাকলেও শাহমিকার কারণে তা হয়ে উঠছে না। ভার্সিটি একদম কাছাকাছি থাকায়, শেহরিন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ব্রেক টাইমে ছুটে আসে বাসায়। এসে শাহমিকাকে খাওয়ায়, মাঝে মাঝে ঘুম পাড়ায়। রাজকন্যার খাবারের প্রতি তীব্র অনীহা। শেফালীর মতো চটপটে স্বভাবের মেয়েও হার মেনে যায় তাকে খাওয়াতে। তাই শেষমেশ শেহরিনকেই ছুটে আসতে হয়। এদিকে হালিশহরে গেলে এমন আসা যাওয়া কঠিন হয়ে যাবে ভেবে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেয়ে আর একটু পরিপক্ব হলেই নিজ বাসায় ফিরবে ।

"বাবা.."

সান্নিধ্য টাওয়েল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে কক্ষ হতে বের হতেই শাহমিকা চিৎকার করে উঠে। দু'হাতে ডানা মেলে বাবাকে বোঝায় কোলে নিতে। অথচ, মামণি যে খাবার দিয়েছিল তাকে সেটার কিছু খায়নি সে। হাতের মুঠোয় চেপে সবগুলো খাবার পিষে নষ্ট করে ফেলেছে।

সান্নিধ্য মেয়ের কাছে এসে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ে। ঠান্ডা শীতল মুখোরেখায় মৃদু হেসে গালে টুপ করে চুমু বসিয়ে দিয়ে বলে,

"একটু ওয়েট মা। রেডি হয়ে আসি?"

শাহমিকা বাবার কথা বোঝে কি না বোঝা দায়। সে একনাগাড়ে বাবা বাবা ডাকে অস্থির হয়ে আছে তো আছেই। হাতের নখে তালুতে স্ট্রবেরির রঙে ছড়াছড়ি। সেই রঙে মাখা দু'হাত উঁচু করে বাবার কোলে যেতে অস্থির হয়ে উঠেছে সে।

"আপনি রেডি না হয়ে আগেই ওর সামনে এসেছেন কেন? এই মেয়ে কি এখন থামবে? যান তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসুন।"

"তুমি ওর হাতটা পরিষ্কার করে দাও। আমি কোলে নিয়ে যাচ্ছি।"

শেহরিন ডাইনিং এ সমস্ত নাস্তা গুছিয়ে হাত ঝেড়ে বাবা মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। কপাল কুঁচকে দু হাত কোমড়ে রেখে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,"মেয়ের অবস্থা দেখেছেন? এই অবস্থায় কোলে নিয়ে আবার শাওয়ার নিতে চান? আমার সময় নেই নেতাসাহেব, আপনাদের কারসাজি দেখার। কিচ্ছু খায়নি আপনার মেয়ে। আবার ঘন্টা ধরে তাকে এখন খাওয়াতে হবে। আপনি তাড়াতাড়ি নিজের কাজ করুন। আমাকেও করতে দিন।"

সান্নিধ্য তার নেত্রী সাহেবার কড়া বার্তায় মেয়ের ডাক উপেক্ষা করে উঠে দাঁড়ায়। সময় তো তারও নেই। একেবারেই নেই। আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে তার আকাশসম কাজ তালিকায় যুক্ত হয়ে আছে। এর মাঝে আবার সামলাতে হবে নানান রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ। সম্প্রতি দলীয় এক তিক্ত বৈঠকে এমপি পদ হতে ইস্তফা ঘোষণা দিয়েছে সে । আর এতেই বিপক্ষ দলসহ নিজ দলের সাথে তৈরি হয়েছে বিভেদ। বলা চলে,এক প্রকার রাজনৈতিক দাঙ্গা শুরু হয়েছে। অস্থিতিশীল এই পরিবেশের মাঝে ও ঘরে বাহিরে প্রখর নজর এমপি সাহেবের। পার করছে ভীষণ ব্যস্ত সময়।

"মা..এক্ষুণি আসছি।"

সান্নিধ্য কক্ষে যেতেই শাহমিকা ঠোঁট উল্টে শুরু করে কান্না। এতো কষ্ট সে আর মেনে নিতে পারছে না। বাবা কাছে এসে তাকে কোলে না নিয়ে আবার চলে গেলো? তার মানে কি বাবা তাকে আর ভালোবাসে না? এতো অনাচার এই ছোট্ট মনে আর সইছে না তার।

মেয়ের চিৎকারের স্বরে কান্নায় শেহরিন ফের কোলে তুলে নেয় তাকে। এটা ওটা বুঝাতে বুঝাতে নিয়ে যায় ডাইনিং এর কাছে। কান্নায় লালচে আভা ফুটে উঠেছে ফর্সা মুখটায়। মামণিকে হাত দিয়ে ইশারা করে দেখায় বাবার কাছে নিয়ে যেতে।

"এতোকষ্ট করে জন্ম দিলাম আমি। বমি,পটি সব পরিষ্কার করি আমি। অথচ, বাবা ছাড়া আপনার প্রাণ বাঁচে না তাই না? মামণি না হলেও দেখছি চলবে আপনার।"

মেয়েকে কোনমতে কান্না থামিয়ে কোলে রেখেই নাস্তা সার্ভ করে শেহরিন। এর মাঝে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আসে সান্নিধ্য। ভেজা চুলগুলোর মাঝে এখনো জল চিকচিক করছে তার। মেটাল ফরেস্ট শার্ট সাথে ক্রিম প্যান্টে হাতা ফোল্ড করতে করতে এগিয়ে আসে মেয়ের কাছে। শেহরিন হাতটা পরিষ্কার করে দেওয়ার সময়টুকু পায় না এর মাঝেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সে তার বাবার কোলে।

"এতো বাবা ভক্ত হলে তো মহামুশকিল। আপনার মেয়েকে সামলানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে নেতাসাহেব। এখনই এরকম করে, বড় হলে কি করবে?"

সান্নিধ্য মেয়েকে নিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। নিজ প্লেটে দুটো রুটি তুলে নিতে নিতে শান্ত কন্ঠে বলে,

"ভাবছি মেয়েকে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যুক্ত করাবো। আমি শিউর সে তার বাবার পেশাটাকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করে নিবে।

মেয়ের মা'কে তো পারলাম না পলিটিক্সের প্রতি ভালোবাসা আনাতে৷ এখন মেয়েই ভরসা।"

"আপনার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে পারি না। কতদূর ভেবে ফেলেছেন আপনি হ্যাঁ? নিজে তো রাজনীতির কবলে পড়ে অলটাইম ঝামেলা পাকিয়ে থাকেন। এখন আবার মেয়েকে টানছেন। ওসব আশা ঝেড়ে ফেলুন। মেয়ের মা কখনোই তা হতে দিবে না।"

"যদি শাহমিকা নিজে হতে চুজ করে।"

শেহরিন তৈরি করে রাখা ওটস নিয়ে মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে। মেয়ের মুখে এক স্পুন তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলে,

"ওর চয়েস লিস্ট থেকে পলিটিক্স ওয়ার্ডটা রিমুভ করে দেওয়া হবে। দরকার হলে সে মায়ের মতো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে তবুও পলিটিক্স নয়। ছোট থেকেই ওকে আমি পলিটিক্স থেকে ইউ টার্ন নেওয়া শেখাবো। "

সান্নিধ্য রুটির মাঝে সবজি নিয়ে নিজে খাওয়ার আগে প্রথমে শেহরিনের মুখে তুলে দেয়। ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিত হাসি বজায় রেখে বলে,"জোর যার রাজ্য তার। কথাটার সত্যতা পাচ্ছি হয়তো।"

"জোর আর দেখাতে পারি কই?"

"এই কথা বললে পাপ হবে শেহরিন। তুমি ফোনে যেভাবে ধমকা ধমকি করো আমাকে, সবাই ভাবে তুমি ভীষণ রাগী আর আমি তোমাকে দেখে ভয় পাই।"

"ভয় পান না আমাকে দেখে?"

শেহরিনের সরু চোখের চাহনি দেখে সান্নিধ্য খেতে খেতে মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে বলে, "একটু তো পাই।"

"একটু?

"একটুর থেকে আরেকটু।"

"ভয় পাওয়া ভালো।"

"অথচ দেখো সবাই আমার আড়ালে বলে আমি রাগী,আমার মাথাগরম, তারছেঁড়া, তার কাঁটা। আমার মতো নিরীহ মানুষকে এসব অপবাদ দেওয়া ঠিক?"

শেহরিন চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। কিঞ্চিত ঠোঁট উল্টে বলে,"ঠিক বেঠিক যারা মার টার খায় আপনার হাতে তাদের থেকে জেনে বলতে হবে নেতাসাহেব। তাছাড়া এভাবে আপনাকে নিরীহ বলাটা অনুচিত হবে।"

"আল্লাহ না করুক, কেউ যেনো কোনদিন জানতে না পারে, আমার বউয়ের অবস্থান আমার বিপক্ষে।"

"জানলে কি হবে?"

"গৃহযুদ্ধ ঘটার সম্ভবনা থাকবে।"

পারস্পরিক আলোচনা সমালোচনা, তর্ক বির্তক এবং যুক্তিতে দুজনের অবস্থান সবসময় দু'মেরুতে। আর এসবের মাঝখানে পরে গিয়েছে বেচারা শাহমিকা। সে বড় হয়ে বাবা নাকি মা এর পক্ষে যাবে সেটা এখন চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার চেয়ে বরং নিরপেক্ষ থাকাই ভালো। পলিটিক্সও করবে না, ইঞ্জিনিয়ারও হবে না। সে হবে ব্যারিস্টার। আড়ালে আবডালে যাতে বাবাকে একটু হেল্প করতে পারে, আবার এদিকে মায়ের মনও রক্ষা করতে পারে।

কপোত কপোতীর ডাইনিং টক শো এর ফাঁকে ফাঁকে চলমান থাকে তাদের খাওয়া দাওয়া পর্ব। শেহরিন খাইয়ে দিতে থাকে মেয়েকে, আর তাকে খাইয়ে দিতে থাকে তার নেতাসাহেব। এই সুপুরুষ ভদ্রলোক বাসায় কখনো নিজে আগে খান না। তার প্রথম সবকিছুতেই থাকে শেহরিন। সবসময় প্লেটের খাবারের হাফ সে খাবে বাকি হাফ শেহরিন কে খাওয়াবে। না খেতে চাইলেও জোর করে একটু মুখে তুলে দিবেই। শেহরিন প্রথম প্রথম না করলেও এখন তার বেজায় অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। নেতাসাহেবের হাতে না খেলে তার ও পেট ভরে না।

___________________________________

বিজ্ঞাপন

বসন্তের সাথে সাথে নতুন নির্বাচনের হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাস বাকি। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থী ঘোষণা করতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। নির্বাচন নিয়ে এবার জনগণের মাঝে রয়েছে বেশ উত্তেজনামূলক ভাব।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসের বাইরে অবস্থান নিয়েছে অসংখ্য জনতা। কারো কারো হাতে জাতীয় পতাকা তো কারো হাতে সান্নিধ্যের ছবি সংবলিত পোস্টার। সাদা পাঞ্জাবি পড়নে সাবেক এমপি সাহেব দৃঢ় পায়ে অফিস কক্ষে প্রবেশ করেন। মনোনয়ন ফর্ম জমা দেওয়ার মুহূর্তে সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেন তাকে চারপাশ হতে।

"স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়াই করার মতো কঠিন কাজে অংশগ্রহণ করেছেন? হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে নৈপথ্যে কি জানতে পারি?"

"সম্পূর্ণ নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি। এর পিছনে বিশেষ কোনো কারণ নেই।"

"দলীয় জোটের সঙ্গে কি কোনো সংহতি সৃষ্টি হয়েছে?"

"না।"

"খালাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমপি পদ হতে ইস্তফা দিয়েছেন। কিছুটা হলেও কি দলীয় ঐক্য জোটের বিরুদ্ধে চলছেন?"

"দলের সঙ্গেই চলতে হবে এমন কি কোনো কথা সংবিধানে উল্লেখ আছে?"

প্রশ্নকারী সাংবাদিক থেমে যায়। পাশ হতে অপর সাংবাদিক তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করেন,"স্যার এই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কি চাপ অনুভব করছেন না?"

সান্নিধ্য ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি বজায় রেখে শান্ত গলায় জবাব দেয়," কাজে চাপ থাকাটাই স্বাভাবিক।"

"নির্বাচনী মাঠে জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী?"

"নির্বাচনের আগেরদিন অ্যাকচুয়াল উত্তরটা দিতে পারবো। মাত্র তো শুরু হচ্ছে। দেখা যাক, জয়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী হতে পারি।"

"আপনার প্রতিপক্ষ নাসির চৌধুরীকে কিভাবে নিচ্ছেন? তিনি তো বর্তমানে বেশ উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে জনগণের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন।"

"প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষের মতোই নেওয়া উচিত। আর তিনি তো ভালো কাজই করছেন। জনগণের কাছে পৌঁছানোটাই তো একজন রাজনৈতিক নেতার আসল বৈশিষ্ট্য।"

সাংবাদিকগন একের পর এক প্রশ্নের ঝুড়ি খোলা মুহুর্তে সান্নিধ্য তাদের থেকে বিদায় নেয়। তার বডিগার্ড তাকে সরিয়ে নিয়ে যায় ভিতরে। মনোনয়ন পেপার জমা দেওয়া শেষ হলে বাইরে বেরিয়ে সে তার জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে। তেজালো কন্ঠে বলে,

"আজ থেকে শুরু হলো আমাদের নতুন যাত্রা। আপনাদের ভোটের ম্যান্ডেট কখনো বৃথা যেতে দেব না।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

দুই মাসের কৌশলগত রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। যার প্রথম

৩০ দিনের মধ্যে কোর কমিটি গঠন করেছে সান্নিধ্য। যেখানে স্থান পেয়েছে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সমর্থকেরা।

ক্যালেন্ডারে চলছে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়। প্রকৃতিতে গরমের দাবদাহ এখন পর্যন্ত অনুকূলেই রয়েছে। দুপুর তিনটের আগ হতেই ফটিকছড়ি কেন্দ্রীয় মাঠে দখলে নিয়েছে সাধারণ জনগন। পুরো মাঠ হয়ে আছে লোকারণ্য। তৈরি করা হয়েছে বিশাল বড় মঞ্চ। সাজানো হয়েছে রাজকীয় কায়দায়।

একপাশে চলছে মাইক্রোফোন টেস্টের শব্দ। সেই সাথে মাঠজুড়ে হাজার হাজার মানুষের গুঞ্জন। সাংবাদিকসহ, স্থানীয় টিভি চ্যানেলগুলোর ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে রেডি করে রাখা হয়েছে। সেই সাথে ফটোগ্রাফাররা অপেক্ষায় রয়েছে কাঙ্ক্ষিত মুহুর্তের জন্য।

ঠিক তিনটা বিশে দুটো সাদা ল্যান্ড ক্রুজার সহ একাধিক গাড়ি এসে প্রবেশ করে মাঠে। জনসমর্থনের ভীড় চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে মঞ্চের কিছুটা সামনে। গাড়ির চারপাশটা ঘিরে রেখেছে ব্যক্তিগত সুরক্ষা দল। গাড়ি থামতেই বের হয়ে আসে সান্নিধ্য। সর্বদা সময়ের মতো পরনে সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা,চোখে কালো ফ্রেমের সানগ্লাস আঁটানো। চোখদুটো শান্ত, মুখোয়াব শীতল।

আসিফ রিমন আগে আগেই মঞ্চের দিকে চলে যায়। সান্নিধ্যের সঙ্গে থাকা আরহাম সহ ব্যক্তিগত আরো কিছু সহকারী তাকে ঘিরে ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

দৃপ্ত পায়ে মঞ্চে উঠেই সান্নিধ্য এক হাতে শুভেচ্ছা জানায় উপস্থিত সবাইকে। সানগ্লাসের আড়ালে চোখ দুটো তার তীক্ষ্ণভাবে জ্বলজ্বল করে। অন্যদিকে উপস্থিত জনস্রোত তাকে নতুন সম্ভবনার দ্বার খোলার স্বপ্ন দেখায়।

আনুষ্ঠানিক বক্তৃতাসহ সব কার্যকলাপ শেষ হয়। বিকেল চারটা ছুঁই ছুঁই সময়ে ইশতেহার ঘোষণার জন্য মাইক্রোফোনের নিকটে আসে সান্নিধ্য। চোখ হতে সানগ্লাস খুলে কথা বলা শুরু করতেই পুরো মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। হাতে ইশতেহারের নথিটি নিয়ে শক্ত চোয়াল, গমগমে পুরুষালি ভরাট কণ্ঠস্বর উন্মুক্ত করে বলে,

"আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি একটি অঙ্গীকারনামা নিয়ে। এটি কোনো নির্বাচনী ইশতেহার নয়, এটি আমার আপনাদের সাথে একটি বিশেষ চুক্তি। ফটিকছড়ির সম্মানিত ভাই ও বোনেরা, আপনারা আমার পরিবারের মতো। আপনাদের জন্যই আমি আজ আবারো এই ময়দানে।

আমি জানি হয়রানির কষ্ট কী। তাই নির্বাচিত হলে প্রথম তিন মাসের মধ্যে ফটিকছড়িতে একটি 'ন্যায়বিচার ও আইন-সহায়তা সেল' তৈরি করব। যেকোনো নিরীহ মানুষ যেন বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ পায়, তা নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।

'প্রতি ছয় মাসে একবার করে আমি আপনাদের সামনে দাঁড়াবো। আপনারা আমাকে প্রশ্ন করবেন, আমি জবাব দেব। কোনো দলের নেতার কাছে নয়, আমি থাকব আপনাদের সেবক হিসেবে।'

​'আমরা আমাদের মাটিকে বাঁচাবো। অবৈধভাবে টিলা কাটা বা বনাঞ্চল ধ্বংস কঠোর হাতে বন্ধ করা হবে। পরিবেশ বাঁচাতে যুবকদের সমন্বয়ে বিশেষ 'গ্রিন টাস্ক ফোর্স' গঠন করা হবে।'

​'অনেক প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে এখনও রাস্তা পৌঁছায়নি, আগামী তিন বছরের মধ্যে তার নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা হবে। নাগরিক সুবিধার অংশ হিসেবে গ্যাস সংযোগের জন্য জাতীয়ভাবে চাপ সৃষ্টি করা হবে। আমি যখন ক্ষমতায় ছিলাম অনেক গুলো প্রকল্প আমি সমাধা করেছি। আশা করি,এটা আপনাদের কাছে সুস্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে থাকবে।'

'যুব সমাজকে স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা হবে, যা স্থানীয় শিল্প ও কৃষির চাহিদা মেটাবে।'

ক্রমান্বয়ে ইশতেহার পাঠ করে যায় সান্নিধ্য। মূল বিষয়বস্তু গুলো উত্থাপিত করা শেষে সে কিছু সময়ের জন্য বিরতি নেয়। অতঃপর ঠান্ডা নির্মেদ কন্ঠস্বরে বলে,

​"আপনারা হয়তো ভাবছেন, একটি স্বতন্ত্র প্রার্থীর শক্তি কোথায়? আমার শক্তি কোনো দলীয় প্রতীক নয়, আমার শক্তি আপনারা। আমি মুক্ত, আমি স্বতন্ত্র, আমার কোনো নেতার কাছে জবাবদিহি নেই। আমার জবাবদিহি শুধু আপনাদের কাছে।ক্ষমতা নয়, সম্মান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আপনারা ভোট দিবেন।"

সান্নিধ্যের দৃঢ় গলার বক্তব্য শেষ হতেই ​জনতার হর্ষধ্বনি ভেসে উঠে। তার প্রতিটি বাক্যের সাথে সাথে জনতা করতালি দিয়ে, স্লোগান দিয়ে সাড়া প্রদান করে ।বক্তব্য শেষ করে সান্নিধ্য আবারো দুহাত উঁচু করে। ক্যামেরা ফ্ল্যাশের আলোয় আত্মবিশ্বাসী মুখোরেখা অদম্য প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে ওঠে তার।

--------------------------------------------

সন্ধ্যার চাদর গাঢ় হয়ে ধরণীতে ঢলে পড়ে রাত। আবছা অন্ধকারে আবৃত ড্রয়িংরুমে সোফায় দু পা মেলে হেলান দিয়ে বসে আছে শেহরিন। চোখ দুটো তার টিভির স্ক্রিনে আবদ্ধ। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই খেলে যাচ্ছে এক নির্মল হাসি।

বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে ঘুমুচ্ছে শাহমিকা। পিঠে আলতো করে চাপড়ে দিতে দিতে কোমল কান্তা দেখে তার নেতাসাহেবকে। টিভি চ্যানেলে আজকে বিকেলে ফটকছড়িতে সংগঠিত সমাবেশের নিউজ দেখাচ্ছে। আলোচিত কিংবা সমালোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত থাকার কারণে মিডিয়াগুলোও যেন বেশ তৎপর থাকে খবর প্রকাশ করতে।

শেহরিনের ঠোঁটে আচমকা হাসি প্রসারিত হয় পুরনো এক কথা মনে পড়ে। বিয়ের আগে প্রথম প্রথম নেতাসাহেবের সঙ্গে যখন তার দ্বৈরথ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিলো, তখন কোনো একদিন মুমু আর আরশি এমনই করে টিভিতে তাদের এমপি সাহেবকে চোখে হারাচ্ছিলো। চোখ, মুখ, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে কি বিশদ বর্ণনাই না করছিলো দুজন। আর তাদের এক একটা কথা অকারণে গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিলো এই রমণীকে। ভস্মীভূত হয়ে শেষমেশ কি না টিভির রিমোট ব্যাগে পুরে চলে গিয়েছিল ভার্সিটিতে। কেন কি কারণে এমন করেছিলো তখন সে উত্তর অজানা থাকলেও এখন ঠিকই তার জানা।

"হুহ নেতাসাহেব, জেলাসি জেলাসি।"

টিভির সাউন্ড লো তে রেখে নিজমনে বিরবির করে শেহরিন। সময় কত দ্রুত চলে যায়। এইতো সেদিন সিআরবি এলাকায় বটের ধারে চায়ের দোকানটায় নেতাসাহেবের সাথে তার পরিচয় হলো। আর আজ সে তার অস্তিত্বকে বুকে আগলে রেখে ঘুম পাড়াচ্ছে। কি অদ্ভুত!!

ভাবনা বিলাসীর ভাবনার সমাপ্তি ঘটে ফোনের ভাইব্রেটে। টিভি অফ করে দিয়ে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নেয় সে। ফোনের স্ক্রিনে নেতাসাহেবের কলিং লেখা দেখে ভিতরটা তার উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে।

"হ্যালো।"

"কি করছো?"

"আপনার মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছি।"

"ঘুমিয়েছে?"

"এইতো ঘুমালো।

"সব ঠিকঠাক?"

"ঠিকঠাক। লেট হবে ফিরতে?"

"একটু হবে। তুমি টাইমলি ডিনারটা করে নিও।"

"দেখা যাবে।"

চলন্ত গাড়ি পথে সান্নিধ্য কানে ফোন চেপে ক্ষীণ হাসে। সে জানে যত রাতই হোক না কেন তার নেত্রীসাহেবা তার বাসায় পৌঁছানোর আগ অব্দি ডিনার করবেই না। হোক রাত দেড়টা কিংবা আড়াইটা তাতে, সে খাইয়ে দিবে অতঃপর সে খাবে।

"আচ্ছা আমি তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করবো।"

"আচ্ছা। অপেক্ষায় থাকবো।"

সারাদিনের নির্বাচনী সভা, হ্যান্ডশেক, জয়ধ্বনি শেষে এমপি সাহেব এখন ফিরছে তার কার্যালয়ে। জরুরি মিটিং রয়েছে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে। ক্লান্তি ভরা দু'চোখ সে জানালার বাইরের নিবদ্ধ করে। গাড়ি ছুটছে ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে।

দুধারে সলিট লাইটগুলো ঝলকানিতে ছুরির মত কেটে যাচ্ছে অন্ধকার। হঠাৎই তার চোখ আটকে যায় অদূরে। ইমারজেন্সি লেনে দাঁড় করানো একটা গাড়ি। যার পাশে দাঁড়িয়ে হুডের উপর ভর দিয়ে সিগারেট টানছে এক মানব।

মুহুর্তেই সান্নিধ্যের মুখোরেখায় বিস্তর পরিবর্তন এসে যায়। ক্লান্তিময় মুখোরেখা হয়ে উঠে ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ়। বজ্রগলায় উচ্চারণ করে,

"রিমন স্পিড বাড়াও"

"স্যার, প্লিজ এইসময় কিছু করার দরকার নেই।"

"স্পিড বাড়াও।"

"স্যার.."

সান্নিধ্য নির্বাক থেকে রিমনকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে গাড়ির গর্জন তুলে ছুটে যায় দাঁড় করানো সেই গাড়িটির দিকে।

"নিজের ব্যালান্স রেখো।"

গতি ঘণ্টায় একশ কিলোমিটারেরও বেশি। দূরত্ব ক্রমেই কমে আসতে থাকে পঞ্চাশ গজ, ত্রিশ, দশ গজ করে। লিয়াকত কিছু আঁচ করার আগেই প্রচণ্ড ধাতব শব্দে মুখোরিত হয়ে উঠে চারপাশটা। সান্নিধ্যের গাড়ি লিয়াকতের গাড়ির পেছনের দিকে এমনভাবে আঘাত করে যে সঙ্গে সঙ্গে কাঁচ ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়। সামনের দিকে ঝাঁকুনি দিয়ে এক লহমায় তার জায়গা থেকে সরে যায়। প্রয়োজনীয় ব্যালান্স ধরে না রাখতে পারার কারণে সোজাসুজি পড়ে যায় গভীর খাদে।

সান্নিধ্য কোনো ফ্লাশব্যাক ছাড়াই দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নেয় জোরেশোরে। সেই সাথে নেয় ওভারস্পিডে ইউটার্ন ।

উদ্দেশ্য সফল। অনেকদিনের মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে। এই লিয়াকত তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর উপর অ্যাটাক করতে অ্যাপার্টমেন্ট অব্দি পা বাড়িয়েছিলো। তার বোনকে হয়রানি করেছিলো। আর সে এতো সহজেই ছেড়ে দিবে? এতোদিন তো চোখে চোখে রেখেছিলো শিকারীকে ধরার জন্য। অবশেষে আজ তাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হলো। যেখানে পড়েছে সেখান হতে লাশ ব্যতিত জীবন্ত মানুষ উঠে আসা সম্ভব নয়।

কিন্তু আলোকিত এই রোশনাই এর মাঝে সান্নিধ্যের ভাগ্য হাসে ভয়ংকর এক হাসিতে। উল্টো লেন থেকে তার মতোই স্পিডে সামনে এসে পড়ে এক ট্রাক, যার হেডলাইটের হাই বিমে নেতাসােহবের চোখ ঝলসে উঠে। এতো উজ্জ্বল আলো হাইওয়ের মাঝে ব্যবহার করা আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু ট্রাক ড্রাইভার যথাসম্ভব অজ্ঞাত এ বিষয়ে।

সান্নিধ্য তৎক্ষনাৎ ব্রেক করার চেষ্টা করে, কিন্তু অতিরিক্ত আলোর কারণে সে সামঞ্জস্য করতে পারে না। দেরি হয়ে যায়। সেই সাথে থমকে যায় সময় মুহুর্তের মাঝেই।

মুখোমুখি সংঘর্ষ। সান্নিধ্যের গাড়ি উল্টো দিকে ছিটকে গিয়ে রাস্তার ধারের ধাতব রেলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। সামনের অংশ সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে কালো ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উড়তে শুরু করে। অন্যদিকে মালবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের লেনে গিয়ে ঠেকে। লোড করা সমস্ত মালপত্র রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার হয়ে পড়ে যায় ।

রাতের অন্ধকারে হুট করে ব্যস্ত হাইওয়ে নিঃশব্দতায় ভরে উঠে ।দুর্ঘটনায় ভাঙা লোহা, কাঁচ, আর জমাট বাঁধা রক্তের এক করুণ প্রতিকৃতিতে ছেয়ে যায় চারপাশটা। দূর হতে আসন্ন গাড়িগুলোর হর্ণের করুণ সুর ভেসে আসে। পাসিং হওয়া গাড়িগুলো একে একে থেমে যেতে শুরু করে অনাকাঙ্ক্ষিত সেই দূর্ঘটনায়। তরল রক্তে ভিজে উঠে পিচ ঢালা রাস্তা। গাড়ির চাকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে থিতু হতে থাকে কারো জীবনের গতিরেখা।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প