রাউজান উপজেলার চুয়েট সংলগ্ন 'কনকর্ড জারা' অ্যাপার্টমেন্টের দ্বিতল ভবন করা হয়েছে নির্ধারিত। শেহরিন সান্নিধ্যের নতুন সংসারের যাত্রা মূলত এখান হতেই শুরু। মোট ছয়তলা ভবন। নিরিবিলি এবং অধিক সিকিউরিটি সিস্টেম থাকায় সরফরাজ এই ভবনটাকেই সিলেক্ট করেছে। এখান হতে চুয়েট গেট স্পষ্টতর দেখা যায়। বিশেষ করে শেহরিনের জন্যই এদিকটায় আসা। নয়তো নাসিরাবাদ কিংবা জিইসি মোড়ে যে কোনো একটা অ্যাপার্টমেন্ট ঠিক করা হতো।
সুখনিবাস হতে আসা সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসাদি গোছানো প্রায় শেষ। সেই সাথে আনা হয়েছে নতুন বেশ কিছু ফার্নিচার। চোখের সামনে সবকিছু নতুনত্বে মোড়ানো। নতুন সংসার, নতুন স্থান, নতুন পরিবেশ। শেহরিনের ভিতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বয়ে চলেছে। কেনো জানি স্বাভাবিক হলেও সে স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারছে না। বিয়ের পর স্বামীর আশ্রয়স্থল হিসেবে সুখনিবাসটা এই সাড়ে পাঁচমাসের যাত্রায় বেশ আপন হয়ে উঠেছিলো। অদ্ভুত এক মায়ায় আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলো সেখানে। বিশেষ করে তাসিন সানজি আপুর সাথে এতোটা দূরত্ব কেনো জানি তার মন মানছে না। একাকিত্বের জীবন হতে জয়েন্ট ফ্যামিলিতে অ্যাটাচড হয়ে যাওয়ার পর নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার হাজার চেষ্টাতেও আজ সে ব্যর্থ।
"শেহরিন আপাতত ফার্নিচার গুলো এভাবেই সেটআপ করা হয়েছে। তোমার যদি পরিবর্তন করতে ইচ্ছে হয় বা নিজের মতো করে সেটআপ করতে চাও তাহলে করতে পারো।"
সরফরাজের কন্ঠে শেহরিনের উৎকন্ঠা ভাব দূর হয়। ভাবনার জগত হতে বেরিয়ে সে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। সবকিছু কেমন দেখতে দেখতে সাজানো গোছানো হয়ে যাচ্ছে। গ্রে রঙের নতুন সেকশনাল সোফাটা স্থান পেয়েছে ড্রয়িংরুমের মধ্যে প্রান্তে। সামনে মার্বেল টপ কফি টেবিলটা চকচকে আয়নার ন্যায় ঝলক দিয়ে চলেছে। টিভি কেবিনেটের পাশে রয়েছে মাঝারি উচ্চতার কাচের ফুলদানি। সাদা মেজেন্টা রঙের মিশেলে ডাবল লেয়ারিং পর্দাটা ফ্লোর ছুঁই ছুঁই। নরম বাতাসে মৃদুছন্দে দুলে চলেছে তা। সব মিলিয়ে স্নিগ্ধতায় ভরপুর।
"সব ঠিক আছে ভাইয়া।"
"মন খারাপ হচ্ছে?"
শেহরিন নির্জীব চোখে তাকায় সরফরাজের দিকে। ভেজা কন্ঠ উন্মুক্ত করে বলে,"ভাইয়া একটা আবদার করি?"
"আবদার? সিরিয়াসলি? শেহরিন আবদার করবে আমার কাছে?"
সরফরাজের বিস্মিত কন্ঠের স্বতঃস্ফূর্ত ভাব দেখে নরম হাসে শেহরিন। এই মানুষটা সাক্ষাৎ দেবদূত। বড় ভাই কিংবা বড় বোনের আদর স্নেহ বাইশ তেইশ বছরের জীবনে কখনো অনুধাবন করতে না পারলেও এখন এসে সেটা নির্দ্বিধায় পেয়ে যাচ্ছে এবং প্রতি মুহুর্তে অবাক হয়েই চলেছে।
"তাসিনকে সপ্তাহে অন্তত একবার কিছু সময়ের জন্য হলেও আমার কাছে রাখতে চাই।"
"এটা আবদার হলো?"
"সময়টা বিবেচনা করলে অনেক বড় আবদার ভাইয়া। ওকে একটু না দেখলে আমার ভালো লাগবে না।"
সরফরাজ মৃদু হাসে। আশ্বস্ত চাহনিতে তাকিয়ে ভারী গলায় বলে,"সানজিকে শুধু আসতে দাও বাসায়। তাসিনের শক্তি হচ্ছে সানজি। ওরা দুজন এক হলে সব অঘটন ঘটে যায়। সপ্তাহে কেন? প্রতিদিন এসে হাজিরা না দিলে হয়।"
"সানজি আপুর আসতে কি দেরি হবে?"
"দু একদিনের মধ্যেই হয়তো এসে যাবে। ভার্সিটি মিস যাচ্ছে।"
সানজি আপুর আগমন বার্তা শুনে মনে মনে খুশি হয় শেহরিন। এতোদিনের দূরত্বে অনেক কথা জমে গিয়েছে। সেগুলো না উগড়ে দিতে পারলে শান্তি হবে না তার। তবে, ভয় একটা জায়গাতেই। সানজি আপুর মনের অবস্থা। আল্লাহ জানেন কতটা ইম্প্রুভ করতে পেরেছে নিজেকে। পুরোপুরি তো কখনোই সম্ভব না। কেননা, যার অন্তরে বিশ্বাসঘাতকতার আঁচড় লাগে তার জন্য দুনিয়া বিষাক্ত হয়ে উঠে। ক্ষত স্থান হতে ঝরে পড়া
এক ফোঁটা রক্ত, উত্তাল সমুদ্রের জলরাশির সমান ভালোবাসাকে ম্লান করে দিতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনে পা রাখা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
"আচ্ছা আমার একটা আবদার আছে তোমার কাছে শেহরিন।"
শেহরিন প্রশ্নাত্মক মনোভাব নিয়ে সরফরাজের দিকে তাকায়।নিস্তেজ গলা ভেদ করে বলে, " জ্বি বলুন।"
" তোমাকে কিছু দায়িত্ব নিতে হবে।"
"দায়িত্ব?"
"হ্যাঁ।"
" কি দায়িত্ব ভাইয়া?"
" সান্নিধ্যেকে সামলাতে হবে। এতোদিন কাছে থেকে আমি ওকে সামলিয়ে এসেছি। এখন যেহেতু দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে আমার এই দায়িত্বটা তোমাকে নিতে হবে।"
"আমি কিছু বুঝতে পারছি না আসলে। উনার দায়িত্ব মানে?"
সরফরাজ স্নেহাতুর দৃষ্টিতে শেহরিনের জড়তাগ্রস্ত মুখোরেখা অবলোকন করে যায়। ঠান্ডা কন্ঠস্বরে স্পষ্ট গলায় বলে,
"রাজনীতি কঠিন একটা জিনিস। যারা রাজনীতি করে তাদের জীবনটা আরো কঠিন। স্বাভাবিক চোখে হয়তো রাজনীতির ব্যাসিক বিষয়গুলোই নজরে পড়ে কিন্তু এর গভীরে অনেক কিছু থাকে। তুমি যেটা কল্পনাও কখনো করতে পারবে না সেটাই রাজনীতিতে হয়। এতোদিনে হয়তো বুঝতে পেরেছো সান্নিধ্য কেমন প্রকৃতির মানুষ। সময়ের বিপরীতে চলে, কোনো বাছ বিছার করে না, ওর কাছে যেটা ঠিক মনে হবে সেটাই করবে। এতে কেউ মরলে মরুক, বাঁচলে বাঁচুক সেটা ও দেখে না। তবে হ্যাঁ, আমি এতটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি ও এখন অব্দি মনুষ্যত্ব বিক্রি করেনি। ভবিষ্যতেও হয়তো করবে না। ওর মেইন সমস্যাটাই হচ্ছে অতিরিক্ত রাগ। সান্নিধ্য যদি কখনো রেগে তোমার সাথে খারাপ বিহেভ করে তুমি সরাসরি আমাকে বলবে। আমি ওকে শাসন করবো তবুও প্লিজ ভুল বোঝাবুঝিটা আনবে না নিজেদের মধ্যে। বাইরের জগতটা ভীষণ কঠিন শেহরিন।
অজস্র শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে এসে ঘরে থিতু হওয়া, মন মেজাজ ভালো রাখা একজন রাজনীতিবিদের জন্য দূর্ভেদ্য বিষয়। তবুও আমি আমার ভাইকে যতটুকু চিনি জানি ও তোমার বিষয়ে ভীষণ সেনসিটিভ। যেটা আমি হয়তো বলেও বুঝাতে পারবো না। এরপরও যদি কখনো কোনো বিষয় নিয়ে সমস্যা হয়..
"আপনাকে জানাবো।"
শেহরিনের বুঝদার দৃষ্টিতে সরফরাজ স্বতঃস্ফূর্ত হাসে। শান্ত গলায় বলে,"তোমার মধ্যে যথেষ্ট ম্যাচিউরিটি এবং ধৈর্য্য রয়েছে শেহরিন। আমি চাইবো ওর খারাপ সময়গুলোতে তুমি একটু পাশে থাকবে, জাস্ট মেন্টাল সাপোর্ট টুকু দিবে। আমি চাই না তোমাদের মধ্যে কোনে ধরনের বিভেদ সৃষ্টি হোক কোনো কিছু নিয়ে। রাজনীতিবিদদের স্ক্যাম, ফেইক নিউজ, প্রোপাগান্ডা বেশি ছড়ে। তোমার সামনে দিনের আলোর মতো যে কেউ ওর বিরুদ্ধে অপরাধ তুলে ধরবে, তুমি দেখবে একদম নিখুঁত সত্য সবকিছু। কিন্তু সেই নিখুঁত সত্যের আড়ালে অনেক খুঁত থাকে। যেটা সবার অজানা।
তুমি একটু জাস্ট যাচাই-বাছাই করার সময়টুকু রাখবে। ভুল অপরাধ হবেই। রাজনীতি যারা করে তারা কেউই হান্ড্রেড পার্সেন্ট সৎ, নির্ভুল, আর্দশবান হয় না। সান্নিধ্যেও নয়। ও নিজেও সেটা স্বীকার করে। "
"সংসার জীবনে আমি সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো উনাকে সবরকম পরিস্থিতিতে সঙ্গ দেওয়ার। কিন্তু ভাইয়া আমি নিজেও যে রাজনীতি বিষয়টা পছন্দ করি না। উনার রাজনৈতিক জগতে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না কোনোভাবেই। এই রাজনীতি জিনিসটা আমার জন্য ভীষণ পীড়াদায়ক।"
"একজন নামকরা এমপির ওয়াইফের মুখ থেকে এই কথাটা শুনতে বেশ অদ্ভুত লাগে। বাট ব্যাপারটা সত্যি।"
সরফরাজ হেসে ফেলে। শেহরিন খানিকটা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। বিষয়টা তার কাছে অদ্ভুত লাগলেও সে নিরুপায়। মানুষটাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ফেললোও তার পেশাটাকে সে ভালোবাসতে পারেনি।
"আচ্ছা তুমি জাস্ট ওকে একটু নিয়ন্ত্রণে রাখবে। একটু শান্ত রাখার ট্রাই করবে। নতুন জীবনের এই সুন্দর শুরুটা যেনো শেষ পর্যন্ত একই থাকে এটাই মূলত আমার আবদার।"
শেহরিন মৃদুভাবে মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। ধীর কন্ঠে বলে,
"ইনশাআল্লাহ ভাইয়া আল্লাহ যেনো আমাকে সেই সক্ষমতাটুকু দান করেন।"
"ধন্যবাদ আপু। ভালো থাকো তোমরা।"
"ভাইয়া একটা অনুরোধ।"
" বলে ফেলো।"
"আজকে আমাদের সাথে ডিনারটা করবেন প্লিজ?"
সরফরাজ হাত ঘড়িতে সময় দেখে। বিকেল পাঁচটা পার হচ্ছে। আজকে নিজস্ব কাজ ফেলে পুরোটাদিন ব্যয় করেছে ছোট ভাইয়ের সংসার গুছিয়ে দিতে। ফোনটা পর্যন্ত বন্ধ রেখেছে। জানে ফোন খুললেই অজস্র বিজনেস কল এসে তাকে ব্যস্ত করে তুলবে। বিকেলের মিটিংটা বাতিল করে সন্ধ্যায় দিয়েছে সময়। লম্বা সময় পর এই প্রথম কাজে এতো বড় গ্যাপ। এটা ম্যানেজ করতে আবার বেশ চাপের সম্মুখীন হতে হবে।
"আজকে একটু টাফ। অন্যদিন নিশ্চয়ই করবো আপু। তুমি ততদিনে ইঞ্জিনিয়ারের পাশাপাশি পার্ফেক্ট হোমমেকার হয়ে উঠো। তবে প্রেশার নিবা না। আস্তে আস্তে নিজেকে শেখাবে, শিখবে। এরপরও যদি দেখছো হচ্ছে না সমস্যা নেই। দরকার হলে সান্নিধ্যই রান্না করে খাওয়াবে তোমাকে।"
-------------------------------------------------
গ্রাউন্ড ফ্লোরে দু'জন সিকিউরিটির তত্ত্ববধানে সান্নিধ্য সরফরাজ সবকিছু বুঝিয়ে দিতে থাকে। সুর্নিদিষ্ট নিয়মধারা মেনে বিশেষভাবে আরও একজন সিকিউরিটিকে এক্সট্রাভাবে রাখা হয় শুধু মাত্র দোতলার জন্য। মূলত সে সান্নিধ্যেরই লোক কিন্তু জনসম্মুখে সেটা গোপন রেখে সাধারণভাবে পরিচয় করে দেওয়া হয়। সান্নিধ্যের উপস্থিতিতে পুরুষ মানুষ হিসেবে শুধু মাত্র সরফরাজ এবং শাহজাহান সাহেব প্রবেশ করার অনুমতি পায়। অনুপস্থিতিতে রিজওয়ান সাহেব, সানজি এবং তাসিন। এই ব্যতিত অন্য যেকোনো আত্মীয় স্বজন হলেও অ্যালাউ করা হবে না। এমনকি সান্নিধ্যের অনুপস্থিতিতে সরফরাজ কিংবা শাহজাহান সাহেবও পারমিশন পাবেন না। একান্ত প্রয়োজনে গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।
" অল ওকে?"
" ওকে।"
" আজাদকে দিয়ে ভরসা আছে তোর?"
" আছে।"
" তাহলে সমস্যা নেই। এরপরেও বাইরের দিকে সিসি ক্যামেরাগুলো খেয়াল রাখবি। "
সান্নিধ্য রেজিস্ট্রার খাতায় সাইন করা শেষে আশেপাশে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে দেখে। অতঃপর দুপকেটে হাত ঢুকিয়ে সরফরাজের সাথে তাল মিলিয়ে মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়ায়। শান্ত স্থির কন্ঠ উন্মোচন করে বলে,"সিসি ক্যামেরা এগুলো কোনো বিষয় না। মূল বিষয় শেহরিনকে সাহসী করে তোলা। ওর যদি সানজির সমান সাহস হয় এটুকুই এনাফ আমার জন্য। বাকিটুকু আমি নিজেই সামলে নিতে পারবো। আইনী দিকটা শুধু তুই দেখবি।"
সরফরাজের কপাল কুঁচকে আসে। শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করে বলে," আইন কি শাহজাহান সাহেবের? তুই মানুষ মারবি আর আমি বাপের সম্পত্তি ভেবে নিষ্পত্তি করবো।"
"আইন যদি শাহজাহান সাহেবের হতো বিশ্বাস কর ভাবিকে আমি সর্বপ্রথম পুলিশ কাস্টাডিতে পাঠাতাম। অন্বেষাকে করতাম ডিরেক্ট খুন। রাদিন শুয়োরের বাচ্চা'টার গলা কাটতাম।"
" তিথির জন্য আমিই যথেষ্ট।"
"বুঝা ভাবিকে। সে তার বাবার জোর দেখিয়ে এসব করতে সাহস পাচ্ছে। তাসিনের কথা তোর কথা ভাবছে না কেন? সে যদি আমার পিছনে লাগে আমি কিন্তু তাকে ছাড়বো না। দেখবোও না সে আমার কি হয়। আমি এখন ছাড় দিয়ে চলবো ঠিকই কিন্তু হঠাৎ করে এমনভাবে ধরবো পালানোর পথ পাবে না।"
"আমার শ্বশুর সাহেব হয়তো পিছন থেকে খেলছে। রাজ্জাক সাহেবের ব্যবসায় ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিস এতে তো তারও ক্ষতি হয়েছে। বিজনেস পার্টনার বলে কথা। তিথিকে সেই নিয়ন্ত্রণ করছে জন্য এতোটা ডেস্পারেট হয়ে উঠছে। সাথে আম্মা দিচ্ছে সঙ্গ। সব মিলিয়ে বউ আমার নিজেকে পাওয়ারফুল ভাবতে শুরু করেছে।"
" আমি ভাবছি শুধু তাসিনকে নিয়ে।"
" আমাকে নিয়েও ভাবা উচিত।"
" আরও তিনটা বিয়ে করতে পারবি রিলাক্স থাক। আর যতসম্ভব মনে হচ্ছে তোর দ্বিতীয় বিয়ের সময় আসছে সামনে।"
সরফরাজ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হাসে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলে,
"ভাই গুন্ডা মাস্তান, বউও ধীরে ধীরে মাফিয়া মাস্তানে পরিণত হচ্ছে। আমি বাদ থেকে কি করবো। আমারও ট্রেনিং নেওয়া উচিত মনে হচ্ছে।"
" তোর চেয়ে সানজি সাহসী বেশি। এইটা কি মানিস?"
"অপমান করছিস?"
"অপমান না সত্যি। সানজিকে দেখলে মনে হয় এটা সান্নিধ্যের বোন৷ তোকে দেখলে মনে হয় স্টেপ..
সরফরাজ ধারালো চোখে তাকাতেই সান্নিধ্য অল্প বিস্তর ঠোঁট প্রসারিত করে। ঠোঁটের কোণে যৎসামান্য হাসি লুকিয়ে বলে,
"আই মিন জীবনে তোরে রাগতে দেখি নাই।"
"শুকরিয়া কর ব্যাটা। আমার জন্যই বাসার নাম হয়েছে সুখনিবাস। নয়তো তোর কারণে বাসার নাম হতো জ্বালাও পোড়াও নিবাস।"
" এটা অবশ্য ঠিক কথা। যাই হোক, সানজিকে দিয়ে অন্বেষাকে একটু ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করাতে হবে। সুখনিবাসে যাওয়ার পথটা বন্ধ করতে হবে। আম্মাকে তো একদম ব্রেইন ওয়াশ করিয়ে ফেলছে। এটা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে।"
"দেখা যাক কতদূর কি হয়৷ তোর সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ সান্নিধ্য। এটার দিকে ফোকাস কর। যাই হোক, এখন আসি। মিটিং আছে।"
সান্নিধ্য পকেট হতে হাত বের করে সরফরাজের সাথে করমর্দন করে। গম্ভীর মুখোরেখায় স্মিত হেসে টেনে বলে,"থ্যাংকস সবকিছুর জন্য।"
" সবকিছুর জন্য থ্যাংকস দিয়ে কি করবি। বড়লোক ভাইয়ের একটা টাকাও তো ব্যয় করতে দিলি না।"
"শেহরিনের সংসার তৈরি করে দিতে শেহরিনের হাসবেন্ডই যথেষ্ট। বহিরাগত নট অ্যালাউড। ইউ গো।"
" ব্যাটা ভন্ড এমপি।"
সবকিছু গুছিয়ে উঠতে উঠতে বিকেল পার হয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। প্রথম প্রথম উচাটন মনে নিয়ে শেহরিনের হাতে কাজ না উঠলেও নেতাসাহেবের নতুন সংসারের প্রতি আগ্রহ দেখে নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারে না। যদি কষ্টের কিছু হয়ে থাকে তাহলে সেটা তার চেয়ে উনারই বেশি। মা, বাবা, ভাই বোন, চেনাপরিচিত কক্ষ সবকিছু ছেড়ে এসেছে সে। শুধু মাত্র তার জন্য। নিজেকে খানিকটা অপরাধী লাগলেও এখন সে পুরোদস্তুর গৃহিনী হয়ে উঠেছে। নিজ হাতে বেডরুম, কিচেন, ডাইনিং গুছিয়ে নিয়েছে। মনের মতো করে তৈজসপত্র দিয়ে সাজিয়েছে।
"ঠিকঠাক?"
"একদম।"
"শুনুন।"
সান্নিধ্য ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় ল্যাপটপ নিয়ে বসতে বসতে বলে," শুনছি বলুন।"
"রাতের ডিনারটা আমি তৈরি করি আজকে?"
"কালকে থেকে তোমার ক্লাস শুরু?"
" সেকেন্ডে ইয়ারের ফার্স্ট ক্লাস। প্যারা নেই তেমন।"
"ডান হাতের তালুতে দেখো জায়গা আছে কি না নতুন করে পোড়ানোর।"
শেহরিনের কপাল ভাঁজ হয়ে আসে। গায়ের ওড়না সে কর্মরত নারীর মতো শক্তপোক্তভাবে বেঁধে নিয়েছে। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে তার ভিতরে গৃহিণী গৃহিণী একটা ভাব চলে এসেছে। মনে হচ্ছে সংসারের সবকিছু তার হাতে গড়া। কেমন মায়া মায়া ভাব সৃষ্টি হচ্ছে। চোখ সরু করে সে সান্নিধ্যের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। থমথমে গলায় বলে," শুনুন।"
"শুনছি বলো।"
"আমার দিকে তাকান।"
"তাকিয়েছি।"
"তাকাননি।"
"একটু দাঁড়াও।"
শেহরিন নেতাসাহেবের ল্যাপটপের দিকে দৃষ্টি দেখে তেড়েফুঁড়ে যায়। সান্নিধ্যের থুতনি চেপে মুখ উঁচু করে ধরে। কড়া গলায় বলে," এই সংসারের মেইন কে?"
" নিঃসন্দেহে আপনি।"
" আমি যেটা বলবো সেটা মেনে চলবে কে?"
"আমি।"
"তাহলে আজকে ডিনার আমি রেডি করবো মানে করবো। আর আমি যা রান্না করবো আপনাকে সেটাই খেতে হবে।"
" আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু যদি হাত পুড়ে যায় তাহলে বকা কে খাবে?"
শেহরিনের ভাঁজকৃত কপাল সমান্তরাল হয়ে যায়। থুতনি চেপে রাখা হাতটা খানিকটা শিথিল হতেই সান্নিধ্য একহাতে ল্যাপটপটা সরিয়ে তাকে কোলের মাঝে নিয়ে বসায়। উত্তরের আশায় দৃষ্টি তার নাজুক কামিনীর দিকে রাখতেই শেহরিন কন্ঠ পরিষ্কার করে বলে," হাত আর পুড়বে না। পুড়লেও বকা দেওয়া নিষেধ। কারণ এই বাসার কর্ত্রী আমি।"
" অন্বেষাকে একটা চড় মেরেই এতোটা সাহস গেইন করে ফেলেছেন আপনি?"
"মনে হচ্ছে একটু সাহস হয়েছে।"
"আচ্ছা নেক্সট ওকে সামনে পেলে আরো একটা চড় মারবেন।"
শেহরিন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সান্নিধ্যের পানে। উৎসুক কন্ঠে বলে, "আপনি সঙ্গে থাকবেন?"
" না। ট্রায়ালের দিনে তো আমি ছিলাম। এবার সলো মিশনটা তুমি কম্পলিট করবে।"
"আল্লাহ। আপনি পাগল হয়েছেন? আমাকে দ্বারা সলো ট্রিপ, সলো ট্রেনিং, সলো মিশন কিছু হবে না। সবকিছুতেই ফেইল মারবো। অন্বেষাকে চড় মারতে গিয়ে আরো দু চারটা চড় আমি খেয়ে আসবো। আর আমার তো ওতো সাহসই নেই।"
"সাহস ছাড়া তো সংসারের কর্ত্রী হওয়া যায় না ম্যাডাম।"
শেহরিন সান্নিধ্যের দু-হাত নিজের কোলের মধ্যে আবদ্ধ রেখে পিঠ এলিয়ে দেয় সুঠাম বুকের সাথে। মুখে মৃদু হাসি বজায় রেখে ধীর কন্ঠে বলে,"আপনার সাথে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে মারামারিটাও শিখে ফেলবো অতি তাড়াতাড়ি। আর সেখানে তো মাত্র সাহস। আমি জাস্ট নিজেকে দেখে অবাক হই জানেন, চট্টগ্রামে আসার আগে শেহরিন আর চট্টগ্রামে আসার পরে শেহরিনের আকাশ পাতাল পার্থক্য। আমি পুরোই ভিন্ন একটা পরিবেশে বড় হয়েছি। সেখানে এসব কিছুই ছিলো না। ফার্স্ট টাইম এগুলোর সাথে পরিচয় আমার। নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলছি যেন।"
" যাক এতে তাও আমার একটা ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে।"
" আমি তো ভোটই দিবো না।"
" তোমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে দেওয়াবো।"
শেহরিন চোখজোড়া উপরিপানে তুলে সান্নিধ্যের চোখে চোখ রেখে বলে," তার মানে কি আপনি আমাকে ভোট দেওয়ানোর জন্য বিয়ে করেছেন?"
" তোমার মনে হয় এরকমটা?"
" মনে আছে বিয়ের আগে আপনি সেই চা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে বলেছেন, তোমাকে আমি পার্মানেন্ট ভোটার করবো। আমি তখন না করেছিলাম কিন্তু আপনি মানেননি। তাহলে কি এমন ভাবাটা যায় না?"
"ভোটের জন্য বিয়ে করলে তো যে কোনো মেয়েকেই বিয়ে করতাম। তবে, একটা করতাম না চারটা বিয়ে করতাম। তাহলে ভোটার বেশি হতো। তোমার যদি এমনটাই ভাবনাতে আসে তাহলে আরো তিনটা বিয়ে করি?"
শেহরিন ঝট করে বুকের উপর হতে মাথা তুলে বসে। সম্পূর্ণ ঘুরে দু'হাতে সান্নিধ্যের গাল খামচে দিয়ে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে,"সাহস তো কম না আপনার? আমার সামনে তিনটা বিয়ের কথা বলেন আপনি। ভয় পান না আমাকে দেখে?"
"ভোটের কথা..
" চুপ তিনটা বিয়ের কথা শুনে একটাতে আমার অন্বেষার কথা মনে পড়ছে। ওকে তো আম্মা পুত্রবধূ করতে চায় এখনো। তিথি ভাবিও চায় আপনার সাথে বিয়ে হোক। আচ্ছা ও যদি আমার সতীন টাইপের কেউ হয়..আল্লাহ ওকে আমি মেরে ফেলবো, খুন করে ফেলবো।"
"ম্যাডাম ঠান্ডা হন ঠান্ডা হন। বর্ডার ক্রস করে ফেলেছেন আপনি। এতোদূর যেতে হবে না। ফিরে আসুন।"
" ঠান্ডা হতে পারছি না। রাগ লাগছে। ওকে দেখলেই আমি সলো চড়টা গালে বসিয়ে দিয়ে আসবো এবার সত্যি সত্যি। "
"এটাতে কোনো আপত্তি নেই। এটাতে সাকসেস হলে আপনাকে আরো গিফট দেওয়া হবে। প্রতি চড়ে একটা করে গিফট কনফার্ম।"
" যদিও ভয় পাচ্ছি তবুও গিফটের আশায় ওকে ডান বললাম নিন।"
_______________________________________
নবোদিত এক সকাল। শান্ত স্নিগ্ধ ঘেরা মুহুর্ত। কিচেনের জানালার সামনে সুন্দর একখানা কৃষ্ণচূড়া গাছ । যার চিরল সবুজ পাতা ডালপালা গুলো দোতলা অব্দি এসে থেমেছে। দু একটা চড়ুই পাখি পাতাগুলোর মধ্যে চিড়চিড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে মেরে লুকোচুরি খেলছে আপনছন্দে।
ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি রেখে নাস্তা তৈরি করছে শেহরিন। আজ কোনো ভয় নেই, কোনো জড়তা নেই তার মধ্যে। বিষাক্ত কথার বাণ হজম করতে হচ্ছে না। নিজের মতো করে সব কাজ প্রাণোচ্ছল মনে করে যাচ্ছে। আচ্ছা নিজস্ব সংসারের সুখটা কি তবে এখানেই?
শেহরিন স্যান্ডউইচ মেকারে ব্রেডগুলো সাজিয়ে দিতে দিতে ভাবে, একক সংসারে সুখ থাকে যৌথ সংসারে কি তবে সুখ থাকে না?
"কেনো থাকবে না? আম্মা যদি আমাকে একটু ভালোবাসতেন, তিথি ভাবি যদি একটু আমার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন। আমাকে যদি একটু সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতেন তাহলে তো আর কোনো সমস্যা হতো না। আমি ভয় পেতাম না তাদের দেখে, নিঃসঙ্কোচভাবে এখনকার মতো করে কাজ করতে পারতাম। একক যৌথ বলতে কিছু নেই, পরিবারের সবাই ভালো হলে সুখ সবখানেই ধরা দিতে বাধ্য। কিন্তু আমরা মেয়েরাই মেয়েদের বড় শত্রু। অতিরিক্ত হিংসা, অহংকার আক্রমণাত্মক মনোভাব আমাদের সব সুখ কেড়ে নেয়। ধ্বংস হয়ে যাই তবুও নিজেদেরকে সংশোধন করি না। "
একা মনে বিরবির করতে করতে নাস্তার প্লেট গুছিয়ে নেয় শেহরিন। দু-হাতে দুটো প্লেট নিয়ে সে ডাইনিং এ রাখে। ঘড়িতে বেজে চলেছে সাড়ে আটটা। নেতাসাহেব তার কাজে বের হলে তারপরে সে বের হবে ভার্সিটির উদ্দেশ্য। ঋতমা ছাড়া দ্বিতীয় বর্ষে প্রথম ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে তার। জানে না কিভাবে এই মুখোশধারীদের সাথে মানিয়ে চলবে এতোগুলো বছর।
ফ্রুট জুস ফ্রিজ হতে বের করতে গিয়ে হুট করে হাত থামিয়ে ফেলে শেহরিন। মনের মধ্যে ঋতমা চলে যাওয়ার দিন গুণতে গুনতে কিছু একটা ভেবে সে স্থির হয়ে যায়। বুকের মধ্যে ধড়ফড় শুরু হয় অজানা আতঙ্কে। নিজেকে কোনমতে সুস্থির করে এগোয় সে বেডরুমে।
কনসোল টেবিলের উপরে রাখা ফোনটা নিয়ে কিছু একটা ঘাটে ৷ তীব্র মনোযোগে কতক্ষণ তাকিয়ে দেখতে দেখতে তার চক্ষুদ্বয় আপনা আপনি বড় হয়ে যায়। কপালে হাত রেখে বসে পড়ে বেডের উপর। শরীর তার ঘেমে উঠে তৎক্ষনাৎ।
"কোনো সমস্যা?"
সদ্য শাওয়ার নিয়ে বের হওয়া নেতাসাহেবের দিকে চোখ তুলে তাকায় শেহরিন। ফোনটা দু-হাতের মুঠোয় চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায় সে। সান্নিধ্যের ঠান্ডা শীতল চাহনির দিকে তাকিয়ে শুকিয়ে আসা ঠোঁট উগড়ে বলে, "আ..আমি মনে হচ্ছে কনসিভ করে ফেলেছি।"
সান্নিধ্য শেহরিনের জড়িয়ে আসা কথা স্বর প্রথমে স্পষ্টভাবে বুঝতে না পারলেও কিয়ৎক্ষণ পর ঠিক অনুধাবন করতে পারে। টাওয়েল দ্বারা মাথা মুছতে থাকা হাতটা তার সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে, "কি বলছো তুমি?"
শেহরিন দু'হাত নিজের মুখের উপর রেখে তটস্থ চোখে তাকিয়ে বলে, "আমার.. আমার পি'রিয়ড মিস গিয়েছে। আজকে এক মাস সাতাশ দিন চলছে মানে দুই মাসের কাছাকাছি। কিন্তু এর মধ্যে পি'রিয়ড হয়নি।"
"বলোনি কেন তুমি?"
"আমি যেসময়টায় অতিরিক্ত ডিপ্রেশনে ভুগেছিলাম তখন সাইকিয়াট্রিস্ট এর সাজেস্টে অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট মেডিসিন নিতাম। এর ইফেক্টের কারণে বছরে আমার দু এক বার ইরেগুলার হয়ে যেতে। লাস্ট মান্থ হতে অতিরিক্ত প্রেশারে আমার সেই পুরনো ডিপ্রেশন কিছুটা ফিরে এসেছিলো। ডেট পার হয়ে যাওয়াতে ভেবেছিলাম হয়তো ডিপ্রেশনের কারণে ইরেগুলার হবে। কিন্তু নানান ঝামেলায় এর মধ্যে যে এতোগুলো দিন পার হয়ে গিয়েছে আমি বুঝতে পারিনি। আমি মনে হয় ডো'জ ভুল করে ফেলেছি সবকিছুর চাপে পড়ে।
"আচ্ছা রিলাক্স হও। তুমি যেরকমটা ভাবছো সেরকমটা নাও হতে পারে। হয়তো ওভারথিংকিং এর কারণে লং গ্যাপ হয়ে গিয়েছে। আমি ডক্টরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিচ্ছি।"
" আমি শিউর নেতাসাহেব। আমি..আমি শিউর। গত কয়দিন হলো আমার ভিতরে কেমন যেনো খারাপ লাগে। আমি ভেবেছিলাম হয়তো পরিস্থিতির কারণে এমন হচ্ছে। যেহেতু আমার ফোবিয়া আছে। কিন্তু..
সান্নিধ্য শেহরিনের কান্না জড়ানো মুখটা বুকের সাথে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। শীতল কণ্ঠে বলে," আচ্ছা সমস্যা নেই। এটার তো সলিউশন আছে। ডক্টরের কাছে গেলে সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে।"
"আমি এখন বেবি নিতে চাই না নেতাসাহেব। আমি একটু গুছিয়ে নিয়ে উঠতে চাই আগে। আমি মেয়ে হিসেবে অপদার্থ কিন্তু মা হিসেবে অপদার্থ হতে চাই না।"
"আমি জোর করছি না শেহরিন। আমি নিজেও এখন চাই না।
তুমি তো ছোট্ট একটা মেয়ে। সংসার চিনতে শুরু করেছো মাত্র। আমরা আরো একটু সময় নেই। তুমি যে সিদ্ধান্ত নিবে আমার সেখানে সম্পূর্ণ সমর্থন থাকবে।"
শেহরিন চোখ বন্ধ করে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়। নিস্তেজ গলায় বলে উঠে,
" মা ছাড়া মেয়েদের সংসারী হয়ে উঠাই যেখানে এতো কঠিন সেখানে মা ছাড়া আমার নিজের মা হয়ে উঠাটা অনেক কঠিন। আমি তো কিছুই জানি না বুঝি না এসবের। তারপরে এখন সম্পূর্ণ একা। আমার ভীষণ ভয় লাগছে।"
সান্নিধ্য বোঝে শেহরিনের ভিতরে ভয়ের কারণ। আজ যদি সুখনিবাসে সবকিছু ঠিক থাকতো তাহলে হয়তো এতোটা ভয় পেতো না৷ এটা সত্যি মা ছাড়া মেয়েদের মা হয়ে উঠা অনেক কঠিন। সেখানে তো এই মেয়েটা সম্পূর্ণ একা। জীবন, বাস্তবতা সম্পর্কে কেবল জানতে শুরু করেছে। নিজ হাতে মাত্র সংসারের ভার নিয়েছে৷ এর মধ্যে বেবি নেওয়াটা হয়তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
" ভয় নেই। চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে। এটাও একটা সলো মিশন হয়ে গেলো তোমার জন্য দেখেছো। নিজেকে আগে প্রস্তুত করো তুমি। মানসিকভাবে স্ট্রং হও। আমার পার্সোনালি তোমার উপর কোনো প্রেশার নেই।"
" আপনার কি খারাপ লাগছে আমার এ সিদ্ধান্তে?"
সান্নিধ্য আলতো হেসে শেহরিনের মাথায় চুমু খেয়ে বলে,
"খারাপ লাগবে কেন? আমরা তো আগে হতেই এ বিষয়টা নিয়ে ক্লিয়ার ছিলাম৷ আমাদের দুজনেরই সম্মতি ছিলো সময় নিয়ে তারপরে বেবি প্লানিং করা। কিন্তু জীবন সবসময় যে প্লান মাফিক চলে না এটাই হয়তো তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। হাজারো নিশ্চয়তার মাঝেও অনেক সময় অনিশ্চিয়তা ঢুকে যায়। হাজারো সর্তকতার মাঝেও ভুল ত্রুটি হয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে নানানভাবে বাস্তবতার সম্মুখীন করে। কেউ হয়তো ঘটে যাওয়া সেই ভুলে সাড়া দেয় কেউ হয়তো পিছিয়ে আসে সেখান হতে। আমরাও না হয় পিছিয়ে আসলাম।"