মধ্যেরাত। ঘড়িতে টিক টিক করে সময় বইছে রাত একটার ঘরে। ওয়াশরুম হতে স্পষ্টত কানে ভেসে আসছে শাওয়ারের ঝিরিঝিরি শব্দ। সান্নিধ্য ফিরেছে কিছুক্ষণ হলো। সারাদিনের ক্লান্তি বিনাশ করতে কক্ষে আসা মাত্র ঘুমন্ত বধূর দিকে দৃষ্টিপাত করে গিয়েছে শাওয়ারে।
অন্যদিকে মৃদুমন্দ আবছায়া আলোতে শেহরিনের চোখ অর্ধবোজা। ঘুম বলতে এইটুকুই। আজ দুদিন হলো সে নেতাসাহেব বাসায় প্রবেশের আগেই ঘুমের অভিনয় করে যাচ্ছে। সারাদিনের ঝড় ঝাপটার ক্ষত রাতের বেলা গাঢ় হয়। একাকী আকাশ পাতাল চিন্তায় চোখ দিয়ে গড়ায় অনবরত জল। চোখের মণিকোঠা হয়ে উঠে রক্তবর্ণ। নিজের দুঃখ বেদনাগুলো লুকাতে সে এই পন্থা অবলম্বন করে। চোখের পানি দমাতে না পারলেও নেতাসাহেবকে দমানোর জন্য গাঢ় ঘুমের বেশে নিজেকে নিমজ্জিত করে। যাতে তিনি কোনোভাবেই তার বুকের ভিতরে বহমান ব্যথাগুলো বুঝতে না পারে।
ছন্দহারা এই নিঝুম রাতে খুট করে শব্দ হয় ওয়াশরুমের দরজা খোলার। মাথা মুছতে মুছতে বের হয় সান্নিধ্য। একরাশ ঝঞ্ঝাট দূর করে শান্ত ভঙ্গিতে সে সোফায় বসে পড়ে। দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে শরীর এলিয়ে দিয়ে উপরিপানে তাকায় চোখ বন্ধ করে। কপাল যৎ কিঞ্চিত ভাঁজ করে ঠোঁট গোল করে ছাড়ে চাপা নিঃশ্বাস। অধিক ব্যস্ততা আর কাজ একদম জোরালোভাবে পিছু লেগেছে তার। একাধিক প্রকল্পের কাজ সমানতালে দেখাশোনা, সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা, মিটিং আবার সেমিনার। এমপি পদে দুই বছর শেষ হয়ে তিন বছরে পা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এইতো হাতে গোনা আর কয়দিন পরেই সেটা পূর্ণ হবে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে যে সমস্ত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিলো সেগুলোর প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছে সে এতোদিনে। বাকি দুই বছর ৯০ শতাংশের কাছাকাছি হলেও পৌঁছাতে হবে। যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে ক্ষমতায় বসেছে সেই প্রতিশ্রুতি যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতেই হবে।
ওদিকে সকাল সাতটার মধ্যেই আবার রওনা দিতে হবে ঢাকার উদ্দেশ্য। সান্নিধ্য মাথা হতে কাজের চিন্তা ঝেড়ে চোখ খুলে। বেডে ঘুমন্ত নারীর দিকে দৃষ্টি রাখে আবারো। সম্ভবত সকালে দেখা হওয়াটা কঠিন হয়ে পড়বে তার সঙ্গে। ফোনটা সুইচ অফ করে উঠে দাঁড়ায় সে। ঘরের আনাচে কানাচে জ্বলন্ত বাতিগুলো নিভিয়ে সরাসরি চলে যায় বেডে।
কিছুটা দূরে শোয়ারত নারী কায়াকে নিজের কাছে আলতো হাতে টেনে আনে সান্নিধ্য। মুখের উপর তার উপচে পড়া চুলগুলো সন্তপর্ণে সরিয়ে দেয় সে। শরীরের উপর ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পড়তেই আনমনে কেঁপে ওঠে শেহরিন। ভ্রু জোড়া তার কিঞ্চিৎ বেঁকে আসতেই পুরুষালি স্থির গলায় ভেসে আসে,
"ঘুমাওনি?"
শেহরিনের আত্মা শুকিয়ে আসে ভয়ে। ধরা পড়ে যাওয়ার হাত হতে নিজেকে বাঁচতে সে মুখ গুঁজে দেয় নেতাসাহেবের বুকের মাঝে। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টায় ঘুম জড়ানো গলায় বলে, " ঘুমিয়েছিলাম। শব্দ পেয়ে ভেঙে গিয়েছে।"
" এভাবে মুখ লুকাচ্ছো কেন?"
" চোখে আলো লাগছে। বেড সাইডের ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিন।"
" আচ্ছা একটু আমার দিকে তাকাও আগে।"
" সকালে দেখবেন প্লিজ। এখন না। আমার সত্যি ঘুম পাচ্ছে। চোখ লেগে আছে একদম।"
সান্নিধ্য আর কথা বাড়ায় না। বাম হাত বাড়িয়ে বেড সাইডের ল্যাম্পটা বন্ধ করে দিয়ে শুয়ে পড়ে। বুকের উপর আধিপত্য বিস্তার করায় তার নারীকে। সেপ্টেম্বরের শেষে এসির হালকা পাওয়ারে কভার শিটটা টেনে নিজেদের করে নেয় আবৃত।
শেহরিন গুটিশুটি পাকিয়ে নেতাসাহেবের বুকে সম্পূর্ণ জায়গা দখল করে নেয়। অন্ধকারের মাঝে নিজের মুখোরেখা তুলে ধীর কন্ঠে বলে, " ভোরে ঢাকা যাচ্ছেন?"
" হ্যাঁ।"
"থাকবেন?"
" সম্ভবত না। কাজ শেষ হলেই ব্যাক করবো।"
" ওহ।"
সান্নিধ্য শেহরিনের ভেজা কন্ঠ পেয়ে ভ্রু বাঁকায় খানিকটা। ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, " তুমি কি কারণে কান্না করেছো?"
"ধ্যাৎ কান্না করবো কেন?"
"কোনো সমস্যা হয়েছে ?"
" কোনো সমস্যা হয়নি। সব ঠিক আছে।"
" সানজি তো বাসায় নেই এখন । সময় কাটাতে কি বোর ফিল করছো?"
শেহরিন নিভৃতে মলিন হাসে। সময় তার তীর্যক কথা আর কাজেই সারাদিন কেটে যায়। বোর ফিল করবে কখন। বরং এক রাশ মন খারাপ আর অসম বেদনা নিয়ে কক্ষে এসে হাজির হতে হয়। নিজের ভিতরে জমানো কান্নাগুলো বালিশ চাপা দিয়ে উগড়ে দিতে দিতে রাত ভারী হয়। অতঃপর আপনার থেকে সবকিছু লুকানোর চেষ্টায় রাত পার হয়।
" তাসিন আছে। ওর সাথে সময় কাটে৷ তিথি ভাবি আম্মার থেকে টুকটাক রান্না শিখি৷ সব মিলিয়ে ভালোই যাচ্ছে সময়। আপনার প্লিজ এসব নিয়ে এতো ভাবতে হবে না৷"
" রান্না শিখছো?"
" এইতো টুকটাক।"
" প্লিজ প্রেশার নিবে না। আগে সবকিছুর সাথে পরিচিত হবে তারপরে ধীরে ধীরে শিখবে। হুট করে রান্না করে হাত পুড়িয়ে নিবে না।"
" ইশ নেতাসাহেব আমি জানি কি কি করতে হবে। ছেলেদের সংসারের কাজ নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না।"
সান্নিধ্য শেহরিনের চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু হাসে। শান্ত গলায় বলে, " তো ছেলেরা কি সংসার করে না?"
" করে বাট এটা মেয়েদের সাইড। মেয়েদের আধিপত্য থাকতে হয় বেশি। আমরা কি আপনাদের কাজে কোনো কথা বলি বলুন?"
" আধিপত্য তোমাদের বেশি এটা ঠিক আছে বাট দেখেশুনে রাখার দায়িত্বটা তো আমাদের থাকে। আর কর্মক্ষেত্র আমাদের যেহেতু বাহিরে সেহেতু তোমাদের হস্তক্ষেপ না থাকাটাই স্বাভাবিক। আমার কাজ যদি ঘরে হতো তখন তুমি অবশ্যই দেখতে, মতামত দিতে। আমি সেটা গুরুত্ব দিতাম।"
শেহরিন পড়ে যায় বিপাকে। এর পৃষ্ঠে কি উত্তর দিবে বুঝতে সক্ষম হয় না। নেতাসাহেবের কথা আর যুক্তির সঙ্গে তার পেরে উঠা সবসময় কঠিন কার্য। উপায়ন্তর না পেয়ে কথার বাঁক পরিবর্তন করে সে।
" আচ্ছা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি সম্পূর্ণ ঠিক আছি। ভালো আছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে এবার ঘুমান। ভোরে উঠেই তো আবার রওনা দিতে হবে।"
" তোমার তো ছুটি আছে। বাবার কাছে যাবে?"
" বাবা নারায়ণগঞ্জ আছে। ঢাকায় নেই।"
" সরি ঢাকা আর নারায়ণগঞ্জ কি আলাদা রাষ্ট্র?"
শেহরিন মন খারাপের ভীড়ে হালকা হাসে। নেতাসাহেবের ঠান্ডা শীতল গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলে," আপনারা আগে আপনাদের কাজ শেষ করুন। তারপরে যাবো৷ কাজ হাতে রেখে আপনাদের মতো যান্ত্রিক মানুষদের সঙ্গে বের হওয়া বা কোথায় যাওয়া আর না যাওয়া সমানই। ওয়েটিং লিস্টে পড়ে থাকতে হয় সবসময়।"
" তবুও ভেবে দেখতে পারো।"
" এই সময় আম্মার মন ভালো নেই। সানজি আপুও বাসায় নেই। পরিস্থিতি একটু ঠিক হোক তারপরে যাবো।"
"পরিস্থিতি অস্বাভাবিক কোথায়? "
" আপনার এতো শক্ত মনে কেন নেতাসাহেব? কি দরকার ছিলো উনাকে এভাবে মারার? আম্মা ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। বাঁচা মরার লড়াই লড়ছে।"
সান্নিধ্যের কন্ঠ শক্ত হয়ে আসে। গম্ভীরচিত্তে বলে,"অন্যায়ের কোনো ছাড় নেই। এগুলোর জন্য কষ্ট পাওয়া মানে সে যে অন্যায় করেছে সেটা সমর্থন করা। আম্মার অতিরিক্ত স্বজনপ্রীতি বিষয়টা আমি পছন্দ করি না। এগুলো আননেসেসারি। হারামির বা'চ্চাকে যে আমি ডিরেক্ট মেরে ফেলি নাই এটা ওর সৌভাগ্য।"
" আবার বাজে কথা বলছেন আপনি? জানেন আপনার উপর আম্মা রাগ করে আছে?"
" আমি যদি আমার জায়গায় ঠিক থাকি শুধু আম্মা কেনো অল রিলেটিভস ও যদি আমার উপর রেগে থাকে তাহলেও আমি সেটা কেয়ার করবো না। কারো মন রক্ষার্থে আমি নিজেকে ভালো সাজাই না। প্রশয় দেই না। এজন্য আমার শত্রু সংখ্যা বেশি।"
" আম্মা আপনার সাথে কথা না বললে ভালো লাগবে?"
" আমি কথা বললেই হবে।"
শেহরিন ফিক করে হেসে উঠে। গলা হতে মুখ তুলে বলে," ধরুন আপনি আর আম্মা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। আপনি কথা বলছেন কিন্তু আম্মা বলছে না। একা একাই কথা বলবেন?"
" কথা না বললেও হবে। আমি যেটা বলছি সেটার প্রতিত্তুরে সামান্য রেসপন্স কিংবা ইশারা করলেই হবে। মোটকথা আমি বুঝতে পারলেই এনাফ।"
" এটা ঠিক না নেতাসাহেব। আম্মার সাথে অন্তত এতো কঠিন হবেন না।"
" মন শক্ত করো শেহরিন। ভুল সবাই করে। নরম হয়ে সেটা সহ্য করে যেতে হয় না। তাকে সেই ভুলটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য কঠিন হতে হয়। মা, বাবা কিংবা বউ বলে ভুল ধরা অপরাধ এটা কোনো নীতির মধ্যে পড়ে না।"
" তাহলে কি প্রতিবাদ করা উচিত ভুল বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে?"
সান্নিধ্য বেলকনি হতে আগত আবছায়া আলোতে শেহরিনের মুখোরেখায় সম্পূর্ণ দৃষ্টি রেখে বলে,
" সিরিয়াসলি শেহরিন?"
শেহরিন সান্নিধ্যের চাহনি দেখে খানিকটা ভয় পায়। নিজেকে ধাতস্থ করে নেতাসাহেবের মুখোরেখার উপর হাত রেখে চোখ ঢেকে বলে,"ইশ্ কথার কথা। জানি তো আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়।"
" একটা পুরোদিন আমি বাসায় থাকবো না। হয়তো ফিরতে পরদিনও হতে পারে। কোনো ধরনের সমস্যা হলে তুমি সর্ব প্রথম আমাকে জানাবে। বাই এনি চান্স যদি কোনো কারণে আমি ব্যস্ত থাকি তোমার সাথে কানেক্ট করতে না পারি তাহলে নির্দ্বিধায় ভাইয়াকে জানাবে। কোনো ধরনের হেজিটেড ফিল করবে না। ট্রাস্ট মি শেহরিন, আমি শুধু মাত্র এই একজনকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি।"
" আচ্ছা।"
__________________________________________
দুজন মানব মানবীর আলাপনে কেটে যায় শেষ রাত। গতিশীল সময় চাকার ন্যায় ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছায় সকাল সাতটার ঘরে। সূর্যের কড়া রোশনাই তে বেলা ছুটতে থাকে অদম্য গতিতে। সেপ্টেম্বর শেষের পথে তবুও নেই বিন্দুমাত্র শীতের দেখা।
সান্নিধ্য ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে কিছুক্ষণ হলো। তাকে বিদায় দিয়ে সকালের নাস্তার আয়োজন করছে শেহরিন। ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে তার তেমন অসুবিধা হয় না। এগুলোতে মোটামুটি সে অভ্যস্ত ছিলো। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় দুপুরের ভারী রান্না করতে গিয়ে। এতো এতো আইটেম তার কাছে ভীষণ কঠিন লাগে। সব এলোমেলো হয়ে যায়।
" লতা এগুলো টেবিলে রেখে এসো। আমি চা নিয়ে আসছি।"
"বউমণি আপনার হাত ধীরে ধীরে পাতল হইতাছে। এমনেই একদিন পাকা হইয়া যাইবেন দেইখেন।"
শেহরিন মিষ্টি হাসে। কড়ির কেটলিতে চা ঢালতে ঢালতে বলে,
"দোয়া করো আমার জন্য একটু। আমি যেনো তাড়াতাড়ি সব শিখে ফেলতে পারি।"
"আমি সত্যি আপনার জন্য দুয়া করি বউমণি। আপনি তাড়াতাড়ি এই কথার বাণ থেইকা মুক্তি পান সেইডাই চাই। তয় আপনার অনেক ধৈর্য্য। আপনারে যা সব কয় আমি অন্য মানুষ হইয়া হজম করবার পারি না। আর আপনে চুপচাপ সহ্য কইরা যান। আচ্ছা আপনে কিছু কন না ক্যা?"
" কি বলবো বলো? কাজ না পারা ব্যর্থতা তো আমারই।"
" শুধু কাজ না। আপনার ফ্যামিলি তুইলাও কথা কয়। অনেক কথা কয়। শোনেন বউমণি নরম হইয়েন না। এই দুনিয়ায় নরমগারে ভাত নাই। যাতা চেনেন? সুপারি কাটে যে। ওই যাতা দিয়া কাটে ইচ্ছামতো যে যেমন পারে। নারিকেলের খোলের মতো শক্ত হইয়া থাকেন। আপনারে ভাঙ্গাইতে ঘাম ছুইটা যাইবো।"
" তুমি বয়স আন্দাজে বেশ বাস্তববাদী লতা। তোমার কথাগুলো সত্যি আমাকে ভাবায়।"
লতা ট্রে খানা হাতে তুলে দরজা পানে যেতে যেতে বলে,
"মানুষের লাত্থি গুড়ি খাইয়া বাস্তববাদী হইছি বউমণি। বয়স অল্প হইলেও দুনিয়া চিনা ফালাইছি। নিজেরে বয়স্ক মনে হয় এহন। মানুষের কাঁচা কথা তাই আর শুনবার মন চায় না।
আপনারে আমি অনুরোধ করি বউমণি নিজেরে শক্ত করেন। খারাপ মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার কইরা কখনো তাগরে ভালো বানাইতে পারবেন না। তারা আরও সুযোগ পাইবো। যারা যেমন তাগের সাথে তেমনই করবেন।"
লতা চলে যায়। শেহরিন কেটলি হাতে নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে তার প্রস্থান দেখে। এইটুকু অশিক্ষিত মেয়ের মধ্যে সে যে বিবেকবোধ, যে বাস্তব শিক্ষা দেখতে পায় সেটা অনেক উচ্চ নামধারী শিক্ষিত মানুষের মধ্যে সে পায় না খুঁজে। তাহলে কি জীবনে খাতা কলমের শিক্ষাই মূল শিক্ষা নয়? মনুষ্যত্বের বিস্তার ঘটাতে না পারলে কি মূল্য এতো ডিগ্রির? তার চেয়ে তো এমন লতারাই সমাজের জন্য আশীর্বাদস্বরুপ।
কিচেন হতে বের হয়ে চা এর ট্রে নিয়ে ডাইনিং এরিয়ায় আসতেই শেহরিনের চক্ষুজোড়া অবাক হয়ে যায়। সকাল সকাল অপছন্দের ব্যক্তির আগমন তার নিস্তেজ মনকে আরো বিষিয়ে তোলে। অন্বেষা এসেছে। মিসেস নাজনীন এবং তিথির সাথে জুড়িয়েছে বিস্তর আলাপ।
শেহরিন চা নিয়ে চুপচাপ সবাইকে সার্ভ করে দেয়। প্লেটে নাস্তা সাজাতেই মিসেস নাজনীন বাঁধা দিয়ে বলেন," অন্বেষা নিজ হাত আজকে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করে এনেছে। ওটাই খাওয়া হবে এখন।"
শেহরিন শাশুড়ী মায়ের কথা শুনে বিস্ময়ে চোখের পাতা ফেলতে যেনো ভুলে যায়। এতো কষ্ট করে ফোস্কা পড়া হাত উপেক্ষা করে সে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করলো। অথচ সেটা খাবে না কেউ। এমনি এমনি তৈরি করা হলো? তাহলে আগে বললেই তো হতো।
" আম্মা.. এতোগুলো আইটেমের নাস্তা কি করবো?"
"তিথি তুমি বলোনি আমি ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে মানা করেছিলাম?"
তিথি অন্বেষার হতে দৃষ্টি সরিয়ে বলে, "ওহহো আম্মা সরি সরি। আমি ভুলে গিয়েছিলাম বলতে। আসলে সাতটা থেকে আটটা সময়টা এতো ব্যস্ততায় কাটে তাসিনকে নিয়ে। অন্যকিছু মাথায় আসে না। এই ছেলেকে কি সহজভাবে স্কুলে পাঠানো যায়? সরি শেহরিন।"
শেহরিনের এই প্রথম কষ্টের পরিবর্তে তিথি ভাবির উপর রাগ হয়। সে জানে ইচ্ছেকৃতভাবে তাকে খাটিয়েছে। তার মনে ঠিকই ছিলো। মিথ্যে বলছে। মানুষের চোখ মুখ দেখেই বোঝা যায় সত্য মিথ্যা কথার বলার ধাঁচ। তাকে খাটাবে ঠিক আছে তাই বলে এতোগুলো খাবার নষ্ট করবে?
" বাহ শেহরিন। তুমি রান্না শিখে ফেলেছো? ফুপি আপনার তো তাহলে আর কোনো চিন্তাই রইলো না। দুই ছেলের বউই পাকা রাধুনী?"
তিথি অন্বেষার কথায় বিদ্রুপ হেসে বলে," সিরিয়াসলি পাকা রাঁধুনী?"
" কেন?"
" শেহরিন তো এখনো লবণ মশলা এগুলোর পরিমাণই ঠিকভাবে জেনে উঠতে পারেনি। তোমার রান্নার টেস্টের এক তৃতীয়াংশও ওর রান্নার মাঝে পাবে না।"
" ব্যাপার নাহ শিখে যাবে।"
মিসেস নাজনীন অন্বেষার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন,
"আমার মা টা কত লক্ষী। পড়াশোনার পাশাপাশি রান্নাবান্নাতেও কি দক্ষ।"
অন্বেষা বন্দনায় মুখোরিত হয়ে উঠে মিসেস নাজনীন। সেই সাথে তাল মেলায় তিথি। শেহরিনের তৈরি করা সমস্ত নাস্তা অগ্রাহ্য করে তারা অন্বেষার আনা নাস্তা খেতে শুরু করেন।
শেহরিনের খারাপ লাগে মিসেস নাজনীনের কার্যকলাপে। সে এতোদিন জেনেছে মায়েরা হয় মমতাময়ী। সন্তানদের প্রতি আলাদা একটা সফটনেস থেকেই থাকে মনের কোণে। তিথি বড় জা হিসেবে প্রতিপক্ষ হতেই পারে তাই বলে তিনিও এমন করবেন। তার ভালোবাসার সীমারেখা কি সে বাদ দিয়ে বাকি সবাই। মেয়ে হিসেবে কি তার স্থান নেই মনে? নাকি ভাইয়ের এরূপ অবস্থার জন্যই এমম করছেন? নিজের জড়তা কাটিয়ে শেহরিন মুখ খোলে। সুস্পষ্ট কন্ঠে বলে,
" আম্মা নাস্তাগুলো কি করবো তাহলে? ভাবি যদি কষ্ট করে একটু মনে করতেন তাহলে এতোকিছু করতাম না। খাবারও নষ্ট হতো না।"
" ফ্রিজে রেখে দাও।"
" বাব্বাহ শেহরিন। এইটুকুতেই এতো রাগ করছো? মনে হচ্ছে নাস্তা তৈরি করে অনেক ভুল করে ফেলেছো?"
" রাগ না ভাবি। খাবার নষ্টের কথা বলেছি।"
" সেটা তোমার ভাবতে হবে না। এমনিতে তো কোনো কাজ গুছিয়ে উঠতে পারো না। আমার মতো বাচ্চা সামলে সংসার করতে এসো মনে থাকে কি থাকে না তখন দেখবো।"
" আচ্ছা থামো হয়েছে। ফুপি আমার তৈরি নাস্তা কেমন হয়েছে?"
মিসেস নাজনীনের গুমোটে মুখোরেখা যেনো অন্বেষাকে পেলেই কেটে যায়। আদুরে কন্ঠে বলেন," আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি মা। এতো ভালো রান্না করো তুমি? ভীষণ ভালো হয়েছে।"
"ইশ এতো সুন্দর নাস্তা যদি প্রতিদিন সকালে পেতাম মন্দ হতো না।"
অন্বেষা শেহরিনের পানে চেয়ে আলতো হাসে। নমনীয় কন্ঠে বলে," এসব বলে আর কি হবে ভাবি।"
" হবে না কিছুই বাট আফসোস আর কি।"
" আম্মা আমি কি ঘরে যেতে পারি?"
" যাও। কিন্তু দুপুরের রান্নার সময় কিচেনে আসবে।"
শেহরিন সামান্য মাথা দুলিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যায় ঘরে। আজকে দুপুরের রান্না তিথি ভাবির। তবুও তাকে আসতে হবে। যদিও আসতে তার কোনো সমস্যা নেই তবে কথা শোনাটাই তার কাছে খারাপ লাগে বেশি। একটা কাজে হাজারটা বাঁকা কথায় জর্জরিত করে তোলে। সেই সাথে যুক্ত হয় মিসেস নাজনীনও। সব কাজে ভুলে ধরে ইচ্ছেমত কথা শুনিয়ে ছাড়বে। অন্বেষার সঙ্গে তুলনা করবে। আজকে তো আরো নাস্তা তৈরি করে এনেছে রান্নার সুখ্যাতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আজকে আরো বেশি কথা শুনতে হবে নিশ্চিত।
শেহরিন ক্লান্ত হয়ে উঠে। মন চায় একটু মুখ খুলে কিছু বলতে। একটু অনুরোধ করতে এই মানসিক নির্যাতনগুলো থামাতে। কিন্তু চেয়েও সে পারে না বিবেকে বাঁধে। যদি বেয়াদবি হিসেবে মনে করে।
আলাপনের মাঝে অন্বেষার ফোনে মেসেজ আসে রাহাদের। তিথির চোখ এড়িয়ে কথা বলতে বলতে সে মেসেজটা ওপন করে সন্তপর্ণে ।
" হেই সুইটি,, তুমি কি ফ্রি আছো? আমরা কি আজকে একসঙ্গে শপিং এ যেতে পারি?"
অন্বেষার মুখোরেখা চকচকে হয়ে উঠে বার্তা দেখে। দ্রুতহাতে টাইপিং করে লিখে, " ইয়েস। হোয়াই নট? কখন বের হতে হবে বলো?"
" উমম এগারোটায়?"
"ওকেহ। নো প্রব্লেম দেখা হচ্ছে।"
তিথি এক নাগাড়ে কি কথা বলে যায় সেটা বোধগম্য হয় না অন্বেষার। হাত ঘড়িতে সময় দেখে উঠে পড়ার পায়তারা করে সে। এখান হতে বাসায় গিয়ে তাকে আবার রেডি হতে হবে রাহাদের জন্য।
" আহ.. ভাবি আমার একটু কাজ রয়েছে। এখন তাহলে উঠি?"
" একি!! তুমি তো কিছুই খেলে না। ব্রেকফার্স্ট করে যাও?"
" আজকে না ভাবি। অন্যদিন শিউর করবো।"
"ওকে মনে থাকে যেনো।"
অন্বেষা হাসিমুখে মিসেস নাজনীন এবং তিথির থেকে বিদায় নিয়ে তড়িৎ পায়ে বের হয়ে যায়। এ কয়দিনেই রাহাদের সঙ্গে তার একটা সুন্দর বন্ডিং তৈরি হয়ে গিয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় একসাথে আড্ডা দেয়, ঘোরাঘুরি করে, লং ড্রাইভে যায়। যদিও এসবকিছু তে সে বুঝতে পারছে রাহাদ তার প্রতি অলরেডি দূর্বল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে এখনো নিজেকে ধরা দেয়নি। তবে নিজেকে দেখে বুঝতে পারছে অতি শীঘ্রই রাহাদের মাঝে সে ফেঁসে চলেছে।
নিজের সমস্ত আগাম ধারণার সত্যতা হাতে হাতে পেয়ে যায় শেহরিন। দুপুরে কিচেনে থাকাকালীন আড়াই ঘন্টা তার কেটে যায় তীর্যক বাণী শুনে। মিসেস নাজনীনের অন্বেষার প্রতি এতো ভালোবাসা এবং তাকে বউ করে নিয়ে না আসতে পারার আক্ষেপ শেহরিনের নাজুক মনকে ক্ষত বিক্ষত করে তোলে। ঘোলা হয়ে উঠে চোখ। এতোটাই সে মূল্যহীন যে তাকে মেনেই নেওয়া যাচ্ছে না। সহ্যই করা যাচ্ছে না?
সব কাজ সেড়ে কিচেন হতে বের হতে হতে তিনটা বেজে যায় তার। ঠিক একই সময় বাসায় প্রবেশ করে সরফরাজ। যদিও আজকে লাঞ্চ তার ক্লায়েন্টদের সাথে করার কথা ছিলো কিন্তু বাসায় কিছু ডকুমেন্ট রেখে যাওয়ার কারণে আসতেই হয়েছে।
" শেহরিন।"
সরফরাজের ডাকে শেহরিন চোখের কোণে জমা পানি মুছে মুখে হাসি টানে। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পিছু ঘুরে তাকিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলে, " জ্বি ভাইয়া।"
" কেমন আছো তুমি আপু? তোমার সাথে তো দেখাই হয় না। এক্সাম শেষ হয়েছে?"
" আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ভাইয়া। হ্যাঁ এক্সাম শেষ হয়েছে। আপনি কেমন আছেন?"
সরফরাজ শেহরিনের মুখোরেখা দেখে সামান্য কপাল ভাঁজ করে। হাত ঘড়িতে সময় দেখে নরম গলায় বলে," তুমি কি মাত্র কিচেন থেকে বের হলে?"
" একটু কাজ ছিলো।"
" লাঞ্চ করেছো?"
" এইতো করবো।"
" তিনটা বাজে তুমি এখনো লাঞ্চ করোনি। কিচেনে কাজ করছো। বাসায় কেউ নেই?"
শেহরিন সরফরাজের তীক্ষ্ণ গলায় বলা কথায় মিইয়ে যায় ভয়ে।
জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে আমতা আমতা স্বরে বলে,"আছে। আমার নিজস্ব কিছু কাজ ছিলো ভাইয়া এজন্য একটু লেট হয়ে গিয়েছে।"
" তুমি কি কান্না করেছো?"
" না ভাইয়া কান্না করবো কেন?"
" তোমার চোখ লাল কেন?"
" পেঁ..পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে চোখ দিয়ে পানি বের হয়েছে এই কারণে হয়তো।"
সরফরাজ শেহরিনের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অবলোকন করে যায়। মুখোরেখায় তার স্পষ্ট সন্দেহপ্রবণতা জেগে উঠেছে। স্থির গলায় বলে,
"পেঁয়াজ কাটা তোমার নিজস্ব কাজ? তাও এই সময়?"
শেহরিন সরফরাজের কথার প্যাঁচে আটকে যায়। এলোমেলো দৃষ্টি ছুঁড়ে দ্বিকবিদিক ভোলে। কি বলবে এখন সে? তাকে করা প্রতিটা প্রশ্নই তো দূর্গম। উত্তর দিবে কি!
" এ..এমনি শিখছিলাম ভাইয়া।"
" কোনো সমস্যা হয়েছে আপু তোমার? সত্যি কথা বলো। ভেবো না তুমি অস্বীকার করলে বিষয়টা আমি ছেড়ে দিবো। তোমার চোখ মুখ দেখে অনেক কিছুই আমি অনুধাবন করতে পারছি। তবুও আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাচ্ছি সান্নিধ্যের অনুপস্থিতিতে তোমার কি সমস্যা হচ্ছে কোনো কিছুতে?"
সরফরাজের স্নেহময় দৃষ্টিতে শেহরিন নমুজ হয়ে পড়ে। চোখে খানিকটা ঘোলাটে ভাব ধরলেও সে মুখ খুলতে পারে না। চেষ্টা করে বলতে, ভাইয়া আমি আর সত্যি সহ্য করতে পারছি না। আমার ধৈর্য্যসীমা হয়তো আর আগের মতো নেই। আমি ক্লান্ত এতো ভারী কথা নিতে নিতে।
সরফরাজ কিছুটা সময় অপেক্ষা করে শেহরিনের থেকে প্রতিত্তুরে আশায়। ঠান্ডা মস্তিষ্ক তার জট পেকে গিয়েছে ইতিমধ্যে শেহরিনের মুখোয়ব দেখে। কাঙ্ক্ষিত উত্তর না পেয়ে শান্ত কন্ঠে বলে, " খুব সমস্যা ফেস করছো? জাস্ট এক বাক্যে উত্তর দাও।"
" এ..একটু।"
সরফরাজ কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিরব হয়ে যায় উত্তর শুনে। নিজের ভাবনার সঙ্গে কিছু একটার মিল পেতেই তার কপালের রেখাগুলো স্পষ্ট প্রতীয়মান হতে থাকে। নিজেকে ঠান্ডা রাখার প্রয়াস চালিয়ে যায় অবিরামভাবে।
" উপরে যাও। ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে নিবে।"
শেহরিন চুপচাপ সিঁড়ি কাটিয়ে উপরে চলে যায়। সরফরাজ হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে ড্রয়িংরুমে এসে বসে। শরীর এলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ নিজ মস্তিষ্কের সঙ্গে বোঝাপড়া শুরু করে। লম্বা সময় ধরে সেই বোঝাপড়া চলতে থাকে। ঘড়িতে তখন বেজে চলে চারটার কাছাকাছি। পকেট হতে ফোনটা বের করে কল লাগায় সান্নিধ্যেকে।
" ব্যস্ত?"
" বল।"
" আলাদা ফ্ল্যাটে শেহরিনকে নিয়ে থাকতে পারবি? "
" আলাদা ফ্ল্যাটে কেন?"
" থাকতে পারবি কি তুই?"
ফোনের অপর পাশ হতে সান্নিধ্য দ্বৈরথ কন্ঠে বলে," থাকতে না পারার কিছু নেই। বাট হঠাৎ বাসা ছেড়ে ফ্ল্যাটে কেন উঠবো?"
" মাইগ্রেশন করবি।"
" অতিথি পাখি হলাম কবে?"
সরফরাজ ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছুঁড়ে বলে,
" তোকে আমি বাসা থেকে বের করে দিয়েছি। এই বাসাটা বাবার থেকে আমি লিখে নিয়েছি। তোর এইখানে জায়গা নেই। তুই কালকেই শেহরিনকে নিয়ে সুখনিবাস ছাড়বি।"
" তোর মতো আমি বড়লোক না। সরকারের খেটে খাওয়া কর্মচারী মাত্র। নির্দয়গিরি কম করে কর।"
" অনুদান চাস?"
" কারণ শুনতে চাই।"
" আই'ম সিরিয়াস সান্নিধ্য। তোর কোনো আপত্তি আছে বাসা ছাড়ার?"
" আপত্তি নেই বাট কারণটা অন্তত বলবি তো। হুট করে বাসা ছাড়তে হচ্ছে কেনো?"
সরফরাজের চোখের সামনে শেহরিনের মুখোয়ব ভেসে ওঠে। মেয়েটার কষ্টের প্রতিফলন স্পষ্ট। না পারছে বলতে, না পারছে সহ্য করতে। নিজের উপর রাগ সৃষ্টি হয় তার। বাসায় থেকেও কেনো বিষয়টা খেয়াল করিনি সে। এর পিছনে কারণটাও তো ছিলো সুস্পষ্ট। চোখ বন্ধ করে নেয় সে। কঠোর গলায় বলে,
"আমি চাই না তুই এবং শেহরিন এই বাসাতে থাক। আমি তোকে নির্দেশ দিচ্ছি তুই ফ্ল্যাটে উঠবি। কোনো কথা আছে তোর আর??"
সরফরাজের ক্রোধান্বিত স্বরে ফোনের অপর পাশের ব্যক্তি খানিক সেকেন্ড নিরব থাকে। অতঃপর শীতল গলায় বলে,
"আচ্ছা ঠিক আছে।"
"শেহরিনের ভার্সিটির কাছে ফ্ল্যাট নিবি এবং ভালো দেখে নিবি। কাজের বুয়াসহ যাবতীয় যা যা লাগবে সেটা আমি ব্যবস্থা করে দিবো। তুই জাস্ট শেহরিনকে নিয়ে ফ্ল্যাটে উঠবি। কিছু করতে হবে না তোকে।"
" আমার সিকিউরিটেড ফ্ল্যাট লাগবে। তুই শুধু খুঁজে দে। বাকিটা আমি সামলে নিতে পারবো।"
" তুই তোর কাজ কর।"
সরফরাজ কান হতে ফোনটা নামিয়ে কেটে দেয়। সামনের টেবিলে ফোনটা ছুঁড়ে আবারো মাথা এলিয়ে দেয় সোফাতে। তাৎক্ষণিক সেই মুহুর্তে পিছন হতে রাশভারী কন্ঠে ভেসে আসে, " কি দরকার ছিলো সান্নিধ্যেকে সরানোর?"
" আম্মার ভাই কোমা তে চলে গিয়েছে বাবা।"
শাহজাহান সাহেব স্থির মূর্তিতে দাঁড়িয়ে পড়েন। রাদিন সাহেব কোমাতে চলে গিয়েছে এটা শুনে তার ভাবভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসে না। সে বিচলিত হয়ে পড়েন কেনো সান্নিধ্যেকে স্থানান্তর করা হচ্ছে বাসা থেকে।
" কি চাইছো তুমি?"
সরফরাজ সোজা হয়ে বসে। ভারী কন্ঠ ঠেলে বলে,"আমি চাই না শেহরিন আম্মার স্বজনপ্রীতির কারণে আক্রোশে পড়ুক। ঐ লোক কোমা'তে চলে গিয়েছে। ঠিক হবে কি না জানি না। দীর্ঘ একটা সময়ের ব্যাপার। আম্মা তার ভাইয়ের শোকে শেহরিনকে দায়ী করে চলবেই যতদিন না সে ঠিক হয়। আর আম্মার এই একমুখী ব্যবহারে শেহরিনকে যারা পছন্দ করে না তারাও সুযোগ খুঁজে নিবে। একটা বাচ্চা মেয়েকে এভাবে মানসিকভাবে বিভ্রান্ত করার রাইট কারো নেই। নির্দোষ হয়ে সে কেন এসবের দায়ভার নিবে? তার চেয়ে বরং দূরে থাকুক। ওরা নিজেরা সংসার গড়ুক। ওদের ভালো মন্দ যাবতীয় সব দেখার দায়িত্ব আমার।"
" তোমার আম্মা ছেলেকে ছাড়তে রাজি হবে?"
" আম্মাকে হয় তার ভাইকে বেছে নিতে হবে নয়তো সান্নিধ্যেকে। একজন মানুষ অন্যায় করার পরেও কেন সে তাকে সমর্থন করবে? আম্মা নিজে একজন মা হয়ে কেন একটা মেয়ের প্রতি দ্বৈতরূপ দেখাতে পারছে? সান্নিধ্যকে ছাড়তে সে বাধ্য। আমরা আম্মাকে সম্মান শ্রদ্ধায় হয়তো কিছু বলতে পারবো না। বুঝালেও বুঝবে না। এর চেয়ে বরং বিকল্প পথ খোঁজা ভালো। মানুষের অনুপস্থিতি মানুষকে দূর্বল করে। জীবনের কিছু কিছু সময় নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হয় বাবা। এতে অপর মানুষটা হারানো মানুষের গুরুত্ব বুঝতে পারে। তার শূন্যেতা অনুভব করতে পারে। এটা জরুরি।"
" এতোটা গভীরভাবে ভেবে ফেলেছো তুমি?"
" পরিস্থিতি ভাবতে বাধ্য করে । মানুষ মানুষকে সঠিক সময়ে মূল্য দেয় না। আম্মাকে আমি পরিস্থিতির মাধ্যমে বুঝাতে চাই সে যে ভাবনা চিন্তায় আছে সেটা ভুল। শেহরিনকে যতদিন না পর্যন্ত সে মন থেকে ভালোবাসতে পারবে ততদিন পর্যন্ত দূরত্বই শ্রেয়।"
শাহজাহান সাহেব মলিন মুখে মাথা নাড়িয়ে সায় জানান। অস্পষ্ট স্বরে বলেন," বড় সন্তান হয়ে তুমি ছোট থেকে যা যা দায়িত্ব পালন করে আসছো আমি বাবা হয়ে তোমার প্রতি সন্তুষ্ট সরফরাজ। আমার অবর্তমানে সান্নিধ্য সানজির জন্য তুমিই যথেষ্ট।"
সরফরাজ উঠে দাঁড়ায়। বাবার সাথে ম্লানমুখে করমর্দন করে বলে," আমি যেনো ওদের দেখে রাখতে পারি। দোয়া করো।"
" অবশ্যই ইনশাআল্লাহ।"
শাহজাহান সাহেব ধীর পায়ে চলে যান নিজরুমে। সরফরাজ টেবিলে রাখা ফোন ওয়ালেট ঘড়ি নিয়ে উপরে উঠে যায়। কক্ষে প্রবেশ করা মুহুর্তে তিথির সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে দরজার কাছে।
" বাসায় এসেছো কখন। এতোক্ষণে উপরে আসছো?"
" বাবার সাথে কথা বললাম।"
" আমি তো ভেবেছি আবার হয়তো চলে গিয়েছো অফিসে। সেজন্য দেখতে বের হয়েছি।"
" কি করছিলে তুমি?"
তিথি সরফরাজের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। দু-হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বলে," তোমার ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম।"
"ঘুমিয়েছে?"
" এইতো ঘুমালো। শোনো না, একটা কথা আছে তোমার সাথে।"
" বলো।"
তিথি সরফরাজের চোখে চোখ রেখে মুখটা আরো নিকটে আনে। আদুরে কন্ঠে বলে," বিকেলে অন্বেষার সঙ্গে একটু শপিং এ বের হবো। আমার কিছু কেনাকাটা আছে। তোমাকে দেখিয়েছিলাম না গোল্ডের একটা ইয়ারিংস পছন্দ হয়েছে? ওটা কিনতে চাচ্ছি।"
" আচ্ছা ঠিক আছে।"
তিথি সরফরাজের একবাক্যে রাজি হয়ে যাওয়াতে খুশিতে উপচে পড়ে। নাকের ডগায় চুমু দিয়ে বলে, "থ্যাংকিউ সো মাচ স্যার।"
"ওয়েলকাম।"
" ওয়েট অন্বেষাকে জানিয়ে দেই।"
তিথি সরফরাজকে ছেড়ে ব্যস্ত হয়ে উঠে অন্বেষাকে ফোন করতে। সরফরাজ কক্ষে প্রবেশ করে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের টপ বোতাম খুলতে খুলতে তিথির দিকে দৃষ্টি রাখে। ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি বজায় রেখে বলে, " তিথি।"
" বলো।"
" আমার দিকে তাকাও।"
তিথি কললিস্টে অন্বেষার নাম্বার বের করে আয়নার মধ্যে সরফরাজের দিকে তাকায়। সামান্য কপাল কুঁচকে হেসে বলে, "তাকিয়েছি।"
" পারিবারিক বিষয়ে তোমার মাস্টার প্ল্যান যদি আমি একবার ধরতে পারি তাহলে ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে কিন্তু আমার দশ সেকেন্ড সময়ও লাগবে না। আই মিন যেদিন আমি জানবো সব অঘটনের অংশবিশেষ তুমিও ছিলে সেইদিন সেই মুহুর্ত থেকে তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হবে। তোমাকে আগে আমি সাবধান করেছি। আজ কিন্তু পরিণাম বললাম। সো বি কেয়ারফুল মাই ওয়াইফ। আমি কিন্তু আমার কথা অবশ্যই রাখবো। সেই সাথে আমার শ্বশুরের সমস্ত বিজনেস লাইন আমি নিজ হাতে ধ্বংস করবো। আমার নমনীয়তাকে প্রশয় হিসেবে নিও না প্লিজ। তুমি যত নিচে নামবে, তত কঠিন আমি হবো।"