রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৩৭

🟢

ক্যালেন্ডারের পাতায় কেটে যায় বিমর্ষ সাতটা দিন। সুখনিবাসে গাঢ় কালো মেঘের ছায়ায় দেখা পাওয়া যায় না রোদ্দুরের হাতছানি। মনের ভিতরে একরাশ চাপা কষ্ট নিয়ে সবাই যে যার কাজে মত্ত। কেননা কাজ যে অবধারিত। হাজার সুখ দুঃখের মাঝেও তা হতে মেলে না ছুটি। জীবনের ক্যানভাসে রঙিন রঙের মাঝে সাদা কালো আস্তরণ পড়বে ঠিক কিন্তু তুলির বিচরণ চলবেই।

শেহরিনের পরীক্ষা শেষ হয়েছে দুদিন হলো। এদিকে সান্নিধ্যের বেড়েছে আরো ব্যস্ততা। তার যেনো দম ফেলে নিঃশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও দেখে শুনে নিতে হচ্ছে অনেক। দলীয় কাজে আগামীকাল সকালে আবার যেতে হবে ঢাকায়।

সকালের নাস্তা শেষে অর্ধাঙ্গিনীর কপালে টুপ করে গাঢ় চুমু এঁকে দিয়ে বের হয় নেতাসাহেব। অন্যদিকে স্বামীকে বিদায় দেওয়া মাত্র নাজুক লতিকা ছুটে যায় বেলকনিতে। এখান হতে নেতাসাহেবের যাওয়ার দৃশ্যটুকু সে মিস করে না। সারাদিন শেষে সেই তো মধ্যেরাতে তার বাড়ি ফেরা। লম্বা সময় ধরে তার দেখা না পাওয়া। তাই যতটুকু সময় কাছে থাকে ততটুকু সময় শেহরিনের মনে হয় নির্নিমেষ চাহনিতে লোকটাকে দেখে যেতে।

চোখে সানগ্লাস কানে ফোন এঁটে ব্যস্তভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে বের হয় সান্নিধ্য। তার গম্ভীর কণ্ঠের ক্ষীণ আওয়াজ কানে এসে পৌঁছায় শেহরিনের। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে মানবটাকে। সারাদিন ছোটাছুটি, চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে পদচারণা, সভা সেমিনার, নানান কাজ সামলে যখন তার সামনে আসে কোনো ধরনের বিরক্তি কিংবা ক্লান্ত ভঙ্গি প্রকাশ করে না। বরাবরের ন্যায় থাকে শান্ত নির্মল। কি সাবলীলভাবে দুটো আলাদা জগত এক হাতে সামলিয়ে চলে লোকটি।

আসিফ তৎক্ষণাৎ গাড়ির দরজা খুলে দেয়। সান্নিধ্যে গাড়িতে প্রবেশ করা মুহুর্তে ফোনে কথা বলার মাঝেই হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পিছন পানে। শেহরিনের প্রতীক্ষিত নয়ন জোড়ার সাথে তার দৃষ্টি বিনিময় হয় স্বল্প ক্ষণের। শেহরিন হুট করে নেতাসাহেবের চাহনিতে অপ্রস্তুত হয়ে উঠে। গাল হতে হাত সরে আসে তার সঙ্গে সঙ্গে।

সান্নিধ্য অল্প বিস্তর ঠোঁট প্রসারিত করে বামহাতখানা হালকা উঁচু করে হাত নাড়ায় তার প্রিয় কামিনীর উদ্দেশ্য। শেহরিনের মুখে ফোটে প্রস্ফুটিত হাসি। একইভাবে সেও হালকা হাত নাড়িয়ে দেয় বিদায়।

চোখের পলকে ধূলো উড়িয়ে গাড়ি চলে যায় সুখনিবাসের মূল ফটকের বাহিরে। লেগে যায় লোহার গেইটের পাল্লা। শুরু হয় আরো একটা নতুন দিনের কর্মব্যস্ততা।

" বউমণি খালাম্মা আপনারে ডাকে।"

" আম্মা ডাকছে?"

" হয়। আজকে দুপুরের রান্না আপনারে করতে হইবো।"

শেহরিন লতার কথা খানিকটা বিস্মিত হলেও স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে। সানজি আপুর সঙ্গে ঘটা সেই দূর্ঘটনার পরদিন হতে এক নিমিষেই সবকিছু কেমন বদলে গিয়েছে। বাসার পরিবেশের সঙ্গে বদলিয়ে গিয়েছে দুজন মানুষের সম্পূর্ণ আচার আচরণ। শাশুড়ী মা, তিথি ভাবির তার প্রতি বিরূপ মনোভাবের কারণ ঠাহর করতে পারে না। কথার মাঝে আঘাত দিয়ে দিয়ে কথা বলাটা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। তবুও শেহরিন চুপচাপ সবকিছু সহ্য করে আসছে। এসব সে মনে ধরে রাখতে চায় না। যেহেতু সাংসারিক কাজকর্মে অপটু তাই কথা শোনাটাকে সে খুব বেশি অস্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না।

"আম্মা বা তিথি ভাবি কি কিচেনে থাকবে না আজকে?"

" না। কইছে আজকে সম্পূর্ণ কিছু আপনার করোন লাগবো৷"

" তুমি কি একটু আমাকে সাহায্য করতে পারবে? আমি নিজেই সব করবো। তুমি একটু আমাকে মশলার পরিমাণগুলো বলে দিবে শুধু। বুঝতেই পারছো দুপুরের রান্না। এদিক সেদিক হলে খাওয়াটাই নষ্ট হয়ে যাবে।"

লতা ধীর কদমে এগিয়ে আসে। গায়ের সঙ্গে ওড়না শক্ত করে বেঁধে মুখ বাঁকিয়ে বলে," বউমণি আমার সাহায্য করতে কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু তোমার শাশুড়ী আর তিথি ভাবি হইলো ডাইনির ডাইনি। কল্যার কল্যা। কামের বেডি আমরা। আমাগরে রান্নাঘরে দেখলে জাত চইলা যায় তাগোরে।"

" এভাবে বলতে হয় না লতা। আম্মা আসলে রান্নার বিষয়টা নিয়ে খুব সচেতন।"

" আমারে বুঝ দিতে হইবো না বউমণি। আমি সাত বছর ধইরা এই বাসায় আছি। কার মন কেমন ধারা সব বুঝবার পারি। অঢেল টাকা থাকলেই হইলো না মন থাকোন লাগে। এই বাড়িতে সানজি আপা আর আপনে ছাড়া কোনো মাইয়া মানুষের মন ভালো না৷ আত্মীয় স্বজন গুলোনও ওইরহম। সব কাজ করায় আর একটু রান্নার হাড়ি পাতিলে হাত পড়লে আপনার শাশুড়ীর মন বেজার হইয়া উঠে। এতোই ঘিন্না আমাগরে দেইখা?"

শেহরিন চুপচাপ লতার কথা শুনে কাঁধে আলতোভাবে হাত রাখে। নরম গলায় বলে," রাগ করোনা প্লিজ। ধরতে গেলে তোমাদের জন্যই আমরা বাঁচি। এতোগুলো মানুষ এই বাসায় কাজ করো। বেশি না শুধু মাত্র একদিন তোমরা কাজ বন্ধ রাখো দেখবে আমরা আর চলতেই পারছি না। কোনো কাজই গুছিয়ে উঠতে পারছি না। তোমাদের ঘৃণা করার প্রশ্নই আসে না।"

" মূল্য পাই না বউমণি। নিজের মনে কইরা কাম করি। একটা জিনিসও নষ্ট হইতে দেই না তাও পান থেইকা চুন খসলে আমাগরে গুষ্টি উদ্ধার কইরা দেয়। বাদ দেন আমাগরে কথা।

আচ্ছা আপনারে কাইল তিথি ভাবি এতো কথা শুনাইলো, আপনার শাশুড়ী মা আপনার শিক্ষা নিয়া কথা তুললো আপনি চুপচাপ সব হজম কইরা নিলেন? একটা কথাও কইলেন না? জানেন কাইলকা আমার কত খারাপ লাগছিলো।"

" ওসব কিছু না। বড়রা একটু বকেই। এক্ষেত্রে দোষ তো আমারই বলো।"

" কি দোষ করছিলেন আপনে? কি সুন্দর হাতে হাতে কাজ করতেছিলেন। তিথি ভাবি ইচ্ছা কইরা আপনার শাশুড়ীরে দিয়া আপনারে কথা শুনাইছে।"

শেহরিন জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে লতার হাত ধরে বলে,

"আচ্ছা না শোনায়। সমস্যা নেই্। বড় বোনরা ছোটদের সাথে এমন একটু করেই। এখন চলো তো তুমি। দেরি হলে কিন্ত আরো বকবে।"

" আপনার ছুটি কয়দিনের?"

" বেশি না। তাড়াতাড়িই দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।"

"পড়াশোনা কইরা চাকরি করেন বউমণি৷ এসব সংসারের দায়িত্ব ঝামেলা সামলানো মেলা কঠিন। হাজার কইরাও মন পাইবেন না। আগে বুঝি নাই এহন বুঝতেছি পড়াশোনার কি দাম। আইজ যদি কয়েক পাশ দিতাম মানুষের বাড়ি কাজ কইরা খাওয়া লাগতো না্। কিছু একখান ঠিকই করতাম।"

" মেয়েদের পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের কাজ শেখাটাও অনেক জরুরি লতা। সবকিছুই টুকটাক জানতে হয়। এক্ষেত্রে তুমি ভুল করেছো পড়াশোনা না করে আর আমি ভুল করেছি সংসারের কাজ না শিখে। আমি আসলে কখনো জানতামই না বিয়ের পর মেয়েদের জগতটা অন্য রকমের হয়। এসব নিয়ে কোনো ধারণাই ছিলো না৷"

" আপনার মা'য়ে থাকলে ঠিকই পারতেন বউমণি। মা না থাকলে দুনিয়া আন্ধার।"

"হু।"

শেহরিন লতা নিজেরা নিজেদের দুঃখ বিলাস করতে করতে নিচে নামে। মিসেস নাজনীনের কক্ষের সম্মুখে আসতেই লতা শেহরিনের হাত টেনে ধরে শুকনো গলায় বলে,"আপনে যাইয়া কথা শুনাইনা আসেন আমি আমার কামে যাই। খালাম্মা যদি অনুমতি দেয় আমারে ডাক দিয়েন আপনারে সাহায্য করমুনি। হেই অনুমতি না দিলে তো রান্নাঘরে পা থুয়ানের সাহস নাই।"

" আচ্ছা ঠিক আছে।"

লতা চলে যেতেই শেহরিন বুকে হাত দিয়ে লম্বা করে শ্বাস টেনে নেয়। বুকের ভিতরে হৃদপিণ্ড তার সজোরে আঘাত করে চলেছে। নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে নেয় কথা শোনার জন্য। মাথায় ঠিকঠাক ওড়না টেনে নিজের ভিতরে প্রয়োজনীয় সাহস জুগিয়ে মিসেস নাজনীনের কক্ষে প্রবেশ করা মুহুর্তে মৃদুভাবে দরজায় কড়া নাড়ে।

" আম্মা আসবো?"

" এসো।"

মিসেস নাজনীন বিছানায় বসে কাপড় ভাঁজ করতে ব্যস্ত। শেহরিন কক্ষে প্রবেশ করতেই আঁড়চোখে একবার দৃষ্টি তুলে তাকান। অতঃপর রুষ্টচিত্তে বলেন, " দুপুরের রান্নাটা আজকে তুমি করবে। আশা করি তোমার বা সান্নিধ্যের এতে কোনো সমস্যা নেই। যদি সমস্যা থাকে তাহলে আগেই বলে দাও। আমি কোনো ঝামেলা চাই না৷ কারো কথাও শুনতে চাই না।"

" সমস্যা নেই আম্মা।"

" ঠিক আছে যাও।"

" আম্মা একটা কথা ছিলো।"

" দয়া করে কোনো বাহানা খুঁজো না আর। পরীক্ষার দোহাই দিয়েই তো এতোদিন পার করলেই। আর কি বলতে চাও?"

শেহরিন ভয়ার্ত চোখে তাকায় শাশুড়ী মায়ের দিকে। মিসেস নাজনীনের বিমর্ষ মুখোরেখা তার বুকে আরো ভয় জাগিয়ে তোলে। কালকের চেয়ে মনে হচ্ছে আজকে তার উপর রেগে আছে বেশি। গলার স্বর তো তাই বলছে। তবুও নিজের নমনীয় কন্ঠ ভেদ করে বলে," আম্মা লতাকে একটু সঙ্গে রাখি কিচেনে?"

" লতা কিচেনে কেন যাবে?"

" আমার সঙ্গে একটু থাকবে। যদি কোনো ভ..ভুল করি?"

" ভুল কেন করবে তুমি? আজ দুদিন হলো রান্না দেখছো না? পড়াশোনা জানা মাথায় রান্না ঢুকতে এতো সময় লাগে কেন তোমার? এতো আহ্লাদী তো আমি বরদাস্ত করবো না। যা করবে সব নিজ হাতে করবে। মিনু সব কাটা বাছা করে দিয়ে গিয়েছে রান্নাটা শুধু নিজ হাতে করবে। এইটুকুতেই আবার লতাকে ডাকছো? তুমি সত্যি সংসার করতে এসেছো তো? নাকি এমপির বউ হয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে হুকুমজারি করতে এসেছো?"

" আ..আম্মা লতা কিছু করবে না। শুধু মশলার পরিমাণটা একটু দেখে দিবে।"

" তাহলে লতাই রান্না করুক। তোমার কিছু করতে হবে না। যাও উপরে গিয়ে ঘুমাও। আমার ভুল হয়েছে তোমাকে রান্না করার কথা বলে। কপাল করে একটা বউ পেয়েছি সংসারে মেনে নিতে তো হবেই। বললে তো ভাববে খারাপ কথা বলছি। কিন্তু শোনো দুনিয়াতে তোমার মা একা মারা যাইনি। দুধের শিশু রেখেও অনেক মা মারা যায়। অনেক মেয়ে সম্পূর্ণ মা ছাড়া বড় হয়েও সব কাজ শেখে। এক্ষেত্রে ইচ্ছেটা লাগে। এই এক দোহাই আর কতো দিবে? জীবনে কখনো দু'হাত নেড়ে খেয়েছো?"

শেহরিন ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে নিজেকে ধাতস্থ করতে থাকে। মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। নিজের প্রতি তার আক্রোশ জমে ভীষণ। মনে মনে সে শাশুড়ী মায়ের কথাই সমর্থন জানায়। ঠিক তো জগতে কি শুধু তার মামনিই মারা গিয়েছে নাকি। আরো অনেকের তো মা নেই। তবুও তারা সব দক্ষ হাতে শেখে। সব কাজ পারে। সে কেন শিখলো না? কেনো বুঝলো না?

মিসেস নাজনীনের সব কথা ঠিক থাকলেও একটা জায়গায় শেহরিনের একটু মন খারাপ হয়। মামণির দোহাই সে কোথাও আজ অব্দি দিয়ে আসেনি। সবক্ষেত্রে সবজায়গায় নিজের ব্যর্থতাকে দায়ী করে এসেছে। তবুও এই কথাটা তাকে বারে বারে শুনতে হয়। সবাই তাকে এই কথা দিয়ে আঘাত করে।

" সবাইকে সান্নিধ্য ভেবে ভুল করবে না। সবাই সান্নিধ্য না যে তোমাকে মাথায় তুলে রাখবে। আমার ছেলে ভালো জন্য বেঁচে গিয়েছো। অন্য কোথাও হলে পাড় পেতে না।"

" আম্মা আসবো?"

শাশুড়ী বউমার চলমান কথার মাঝে হুট করে আগমন ঘটে তিথির। ব্যস্ত উৎকন্ঠা মাখানো স্বর তার। মিসেস নাজনীন সঙ্গে সঙ্গে অনুমতি দেন ভিতরে প্রবেশ করতে।

" আম্মা বড় মামা ফোন করেছিলেন মাত্র। রাদিন মামার অবস্থা তো ভীষণ খারাপ। বাঁচা মরার লড়াইয়ে আছেন।"

" কি বলছো তুমি?"

" মামা বললেন।"

মিসেস নাজনীন হাতের ভাঁজকৃত কাপড় ছুড়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। শেহরিনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলেন,

"হয়েছে তোমার শান্তি? আমার ভাইটা মরে যাচ্ছে। এবার শান্তি পাচ্ছো তো?"

" আম্মা.. "

শেহরিন একরাশ বিস্ময় নিয়ে মেঝে হতে দৃষ্টি তুলে মিসেস নাজনীনের দিকে তাকায়। ধরে আসা গলা উপেক্ষা করে নিস্তেজ স্বরে বলে, "আম্মা আমি সত্যি চাইনি উনার এই অবস্থা হোক।"

" চাওনি মানে? কি দরকার ছিলো সান্নিধ্যকে বলার? জানো না ওর রাগ কি পর্যায়ের। তোমার সাথে যদি কিছু হয়েই থাকে সেটা আমাকে বলতে আম্মাকে বলতে। তুমি কেন সান্নিধ্যেকে বলতে গিয়েছিলে? তুমি দেখি একটু কিছুও সহ্য করতে পারো না। কিছু হতে না হতেই সান্নিধ্যের কানে পৌঁছে দাও। এতো বাচ্চামি করলে সংসার হয় না বুঝতে পেরেছো। কথা হজম করতে শিখতে হয়। এখন এই মানুষটা যদি মারা যায় এর দায়ভার নিতে পারবে?"

"আমাকে বলতে হয়নি ভাবি। উনি নিজেই স্বচক্ষে দেখেছিলেন।"

" তুমি বুঝাতে পারোনি সান্নিধ্যেকে ? বলতে পারোনি সেরকম কিছু নয়। পরে না হয় আমরা বিষয়টা দেখতাম। গায়ে কি তোমার ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল?"

শেহরিনের চোখের কোণে আবছায়া জল জমে। তিথি ভাবির কথা গলাধঃকরণ করতে তার বেগ পোহাতে হয়। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের মান ইজ্জতের ব্যাপারে এতোটা হেলা নিয়ে কথা বলতে পারে? প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে? অন্যায় তো সে করেছে। বাবার বয়সী হয়েও নোংরা কথা বলেছে । এই ঘটনাটা তো তিথি ভাবির সাথেও ঘটতে পারতো? তখন কি একই কথা বলতো?

" অপয়া মেয়ে সংসারে এলে বুঝি এইরকমই হয়। একটার পর একটা দূর্ঘটনা ঘটে চলেছে। আমার মেয়েটার এতো বড় ক্ষতি হলো। আমার ভাইটা জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে। জানি না সামনে আর কত কি সহ্য করতে হবে। সান্নিধ্য ঠিক বুঝবে মায়ের কথা না শুনে কি ভুল করেছিলো। এখন বুঝতে পারছে না তো।"

" বিশ্বাস করবেন আম্মা অন্বেষাকে দেখে কালকে আমার শুধু আফসোসই হয়েছে। মেয়েটা কি লক্ষী হয়েছে। মামিমা বললেন রান্না বান্নাতেও বেশ দক্ষ। সবদিকেই পার্ফেক্ট।"

" তোমার দেবর ভালোটা বুঝলো না।"

তিথি এক নজর শেহরিনের দিকে তাকিয়ে অনুযোগের সুরে বলে, "যাই হোক কিছু বলতে চাই না। আপনিও কিছু বলবেন না আম্মা। আপনার ছোটো ছেলের কানে এসব গেলে আবার ঝড় উঠবে। সে তো বউ ছাড়া কারো কথা মানে না্।"

" যা বললাম এগুলোও নিশ্চিত কানে যাবে। ছেলের কাছে আমাকে আর আমার সংসারে বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে।"

" শোনো শেহরিন একটা উপদেশ দেই। সংসারের সব কথা সব কাজ বাড়ির পুরুষদের জানাতে হয় না। কিছু কথা নিজেদের মধ্যে গোপন রাখতে হয়৷ সব বিষয়ে তাদের জড়ানোর এই বাজে অভ্যাসটা দূর করবে আশা করি।"

শেহরিন ঠোঁট চেপে নিজের কান্না দমায়। নিজেকে বোঝাতে থাকে অবিরামভাবে। এই ভুল ধারণাটা সে কিভাবে ভাঙবে তাদের সামনে যে, সে নেতাসাহেবকে কিছুই বলেনা সংসার সম্পর্কে। এই যে আজ তিনদিন হলো তার উপর দিয়ে কথার বাণ ছুটছে সে ঘুণাক্ষরেও তাকে বুঝতে দেয়নি। হাসি মুখ করে সবসময় থেকেছে।

" আমি বিকালে হসপিটালে যাবো দেখতে। তোমার বাবাকে বলে দিবে আমাকে যেনো কৈফিয়ত দিতে না হয়। তারা না মানুক ভাই তো আমার।"

" ঠিক আছে আম্মা।"

" দুপুরের রান্নাটা কি হবে আজকে?"

শেহরিন ধীর পদস্থে ঘর হতে বের হয় যায়। চোখ হতে টুপ করে ঝরে পড়ে একফোঁটা পানি। অতি সন্তপর্ণে মুছে নিয়ে পা বাড়ায় কিচেনের উদ্দেশ্য।

" আম্মা আপনাকে একটা কথা বলার ছিলো।"

তিথি শেহরিনের চলে যাওয়া পানে তাকিয়ে থেকে দরজা হালকা টেনে দিয়ে শাশুড়ী মায়ের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। ধীর কন্ঠ ঠিকরে বলে," আম্মা আপনি প্লিজ সানজিকে শেহরিনের কাছে থেকে দূর রাখবেন। সানজি অনেক সহজ সরল মেয়ে। যে যা বুঝায় সেটাই বুঝে নেয়। আমার কেনো জানি না মনে হচ্ছে এসবের পিছনে শেহরিনেরও হাত রয়েছে। এই মেয়ে কিন্তু আগে হতেই সানজির সম্পর্কের কথা জানতো। দেখাও করেছে। সানজি ওই ছেলের হাবভাব বুঝতে না পারলে এই ধুরন্ধর মেয়ে কিন্তু ঠিক বুঝতে পেরেছিলো। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বলেনি।"

" কি বলছো তুমি এসব বউমা। শেহরিন জেনেও বলবেন না কেন? ওর সাথে তো সানজির ভালো সম্পর্ক।"

" আম্মা সম্পর্ক ভালো হলে কি। ভালো সব উপরে উপরে। আর হিংসা মনে মনে। হিংসা করেই বলেনি।"

"কিন্তু হিংসাই বা করবে কেন? "

" অনেক কারণ আম্মা। হতেই পারে ভাই বোনের এতো মায়া মমতা তার সহ্য হচ্ছে না।"

মিসেস নাজনীন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কপাল ভাঁজ করে মাথা নাড়ান। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন,"কথাটা মন্দ বলোনি। এটা নিয়ে আমার মনে ভয় ছিলো। সবাই তো আর তোমার মতো নয়।এটা আমার বোঝা উচিত ছিলো। যাই হোক, সানজি আপাতত তানিশার কাছে কিছুদিন থাকছে। থাকুক। পরবর্তীতে বাসায় এলে আমি আলাদা করে দিবো একদম। কোনো ছাড় হবে না।"

" বিষয়টা খেয়ালে রাখবেন আম্মা।"

"অবশ্যই। এক ভুল বারবার করছি না।"

________________________________________

বিজ্ঞাপন

আনাড়ি হাতে দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত শেহরিন। ফর্সা মুখোরেখা তার লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। কপালজুড়ে বিন্দু বিন্দু স্বেদকণা। মোবাইলে এক জিনিস দশবার দেখে দেখে সে মশলাপাতির পরিমাণ হিসেব করে দিচ্ছে। একটা আইটেম হলে তাও একটু সুবিধা হতো। দুপুরের জন্য পাঁচ পাঁচটা আইটেম নির্ধারণ করা। এর মধ্যে ভাজাভুজিটা কোনমতে পার করে এলেও আটকা পড়েছে মাছ রান্নাতে এসে। ঝোল চেখে সে কিছুতেই মনোঃতৃপ্তি পাচ্ছে না।

" বউমণি মশলা বাটা এইখানে রাইখা গেলাম।"

শেহরিন পিছু ঘুরে মিনু খালাকে দেখতেই যেনো প্রাণ ফিরে পায়। চামচটা রেখে পিছু ঘুরে হাত মুছতে মুছতে জড়ানো গলায় বলে, " খালা একটু হেল্প করুন প্লিজ।"

" কি কইরতে হইবো?"

" একটু ঝোল চেখে দেখুন না ঠিক হয়েছে কি না? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে ভালো হয়নি।"

" ও খোদা চিংড়ি মাছ তুমি বাটা মশলা ছাড়াই রান্না কইরা ফালাইছো? তাইলে কেবল যে বাটা মশলা কইরা আনলাম এডা দিয়া কি করবা?"

শেহরিন কপাল কুঁচকে মিনু খালার কথা বোঝার চেষ্টা করে। মন ভালো না থাকলে বুঝি রান্নাতেও মন বসে না। রান্না ভালোও হয় না। আজকে সবকিছু কেমন উল্টাপাল্টা হয়ে চলেছে। চিংড়ি মাছ ভুনার সময় খেয়ালেই ছিলো না সে মিনু খালাকে মশলা বাটতে দিয়েছে। বারে বারে তিথি ভাবির মুখে অন্বেষার কথাগুলো মন পড়ছিলো।

" আমি কি করছি, কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না খালা। কি করবো এখন তাহলে? খাওয়া কি যাবে না?"

" খাওয়া যাইবো তয় স্বাদ কম লাগবো।"

" এখন দিয়ে যদি অল্প আঁচে একটু রান্না করি হবে না?"

" উহু। তরকারি হইয়া আইছে এহন আর দেওন যাইবো না। দিলে কাঁচা মশলার গন্ধ কইবো।"

শেহরিন ডান হাত কপাল ঠেকিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। নিজের উপর রাগে দুঃখে তার চোখ ঘোলাটে ভাব ধরে আসে। সব উল্টা পাল্টা কি তার সাথেই হতে হবে? সব ব্যর্থতা কি তার কপালেই?

মিনু খালা হতাশা চোখে তাকিয়ে কিচেন হতে বের হয়ে যায়। বেশিক্ষণ থাকলে আবার এটা নিয়ে কথা শুরু হবে। মিসেস নাজনীনের ভয়ে বাড়ির সব সহযোগীদের এমনি তটস্থ হয়ে থাকতে হয় সবসময়।

বিষন্ন মনে দুপুরের রান্না শেষ করে শেহরিন। সবকিছু পরিষ্কার করে বের হয়ে সে ডাইনিং এ খাবার সাজিয়ে রাখে। আসন্ন ঝড় সামলানোর মতো মন মানসিকতা তার আজ আর নেই। তবুও সে নিশ্চিত কথা তাকে শুনতেই হবে। যা রান্না করেছে কারোই মনমতো হবে না। ইশ্ একটু যদি লতাকে কাছে রাখার অনুমতি পেতো তাই আর এতো গন্ডগোল হতো না। একদিন দুদিন সাথে থাকার পর ঠিকই সে একা একা সামলে নিতে পারতো। এইটুকু অন্তত মনে বিশ্বাস আছে কেউ যদি তাকে একটু ভালোভাবে শিখিয়ে বুঝিয়ে দেয় সংসারের দায়িত্ব, তিথির ভাবির মতো দক্ষ হয়ে উঠতে সময় লাগবে না বেশি।

" হয়েছে রান্না?"

" জ্বি.. ভাবি।"

" আজকে কি আমার বউমা রান্না করেছে নাকি? "

" জ্বি বাবা। আজকে আপনার ছোট বউমা রান্না করেছে। খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে।"

শাহজাহান সাহেব প্রফুল্ল মনে চেয়ার টেনে বসেন। সন্তুষ্টচিত্তে বলেন," খাওয়ার আগেই বলে দিচ্ছি আমার ছোট বউমার রান্না হবে দশে দশ।"

তিথি খাবার বাড়তে বাড়তে বাঁকা হেসে বলে," বাহ বাহ।"

" সরফরাজ সান্নিধ্য কেউ লাঞ্চে আসবে না?"

" সান্নিধ্য হয়তো আসবে না। তাসিনের বাবার তো আসার কথা রয়েছে।"

"ওয়েট করি তাহলে। একসঙ্গে খাই।"

" না.. না বাবা আপনার ছেলের ঠিক নেই। আসতে আসতে চারটা পাঁচটা বাজাবে।"

মিসেস নাজনীন ভারী মুখে খাবার টেবিলে এসে বসেন। শেহরিন এগোয় শাশুড়ী মা'কে খাবার সার্ভ করতে। অন্তর তার শুকিয়ে খা খা করছে। ভয়ে জড়তায় হাত কাঁপছে মৃদুভাবে।

"মাছটা মনে হচ্ছে বেশি ফ্রাই করে ফেলেছো শেহরিন। একদম কালো হয়ে গিয়েছে। তাসিন এখন খেলে হয়।"

" খাবে খাবে।শুধু বলবে শেহরিন রান্না করেছে। ব্যস্ চেটেপুটে খাবে। তা সে নিচে নামবে না?"

" কার্টুন দেখছে। বললাম নিচে আসতে, আসবে না বলছে। তাই নিয়ে যাচ্ছি। স্কুল থেকে এসে কিচ্ছু খায়নি।"

" বলো কি নিয়ে যাও তাহলে তাড়াতাড়ি।"

তিথি তাসিনের খাবার প্লেটে বাড়ার বাহানায় ইচ্ছেকৃতভাবে দেরি করে। তার অপেক্ষা বাড়ির ছোট বউয়ের রান্না কেমন হয়েছে আজকে সেটা জানার। শশুর শাশুড়ীর প্রতিক্রিয়া দেখতে ব্যাপক উৎসাহী সে।

মিসেস নাজনীন এবং শাহজাহান সাহেব মুখে এক লোকমা তুলতেই কিছুটা ধীর গতিতে গিলে ফেলেন খাবারটা। মুখোরেখা দেখেই অনুমান করা যায় রান্নার স্বাদ কেমন হয়েছে। শাহজাহান সাহেব তৎক্ষনাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও মিসেস নাজনীন এক সেকেন্ড সময় ব্যয় করে না কথা শুনাতে। শব্দ করে হাত দ্বারা প্লেট সরিয়ে দিয়ে তিক্ত গলায় বলেন,

"এগুলো কি অখাদ্য রান্না করেছো তুমি?? মুখেই তো দেওয়া যাচ্ছে না। ছিঃ।"

" কি হয়েছে আম্মা? খাওয়া যাচ্ছে না?"

"আহহা নাজনীন এতো উত্তেজিত হচ্ছো কেন তুমি? মেয়েটা ধীরে ধীরে শিখছে একটু এদিক সেদিক তো হবেই। মা হয়ে মেয়ের ভুল মেনে নিতে পারছো না? "

" আপনার দোহাই আমি। দয়া করে আর আদরের বউমার সাফাই গাইতে আসবেন না আমার সামনে। অনেক তো হলো। আর কতো? কবে শিখবে সে?"

" সাতদিনও হয়নি এক্সাম শেষ হয়েছে। শিখবে আস্তে আস্তে। আর সান্নিধ্য তো বলেই দিয়েছে শেহরিনের না রান্না করলেও চলবে। তোমার অসুবিধা হলে বলো।"

তিথি হাতের প্লেটটা সন্তপর্ণে টেবিলে রাখে। শাহজাহান সাহেবের দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বলে," এমপি মিনিস্টারের বউরা রান্না করবে না স্বাভাবিক। বাট তাই বলে কি সব দায়িত্ব আমার বাবা? আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও কিন্তু হাই ক্লাসের। তবুও কিন্তু আমি রান্না করি। এতোটা ফেবার নিয়ে চলি না।যতটা না শেহরিন সান্নিধ্যের হতে পেয়ে আসছে।"

"সরি মা ভুল বুঝবে না। সবকিছুরই একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। আমার জানামতে তুমি তাসিনের তিন বছরের মাথায় সর্ব প্রথম কিচেনে প্রবেশ করেছিলে। এর আগে স্টাডি কম্পিলিট করেছো। দেড় বছর জব করেছো। তারপরে তো এসেছো সংসারে। মনে আছে প্রথম প্রথম রান্নায় তুমি নিজেও লবণ দিতে না। আমরা কিন্তু কখনো এটা নিয়ে তোমাকে কিছু বলিনি। বরং উৎসাহ দিয়েছি। তুমি খুশিমনে সেটা অ্যাকসেপ্ট করে নিতে জন্যই তো ভালো রান্না শিখেছো। এক্ষেত্রে শেহরিনের কি একটু ফেবার পাওয়া উচিত না?"

রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাথায় যে বেশ ভালোই ঘিলু থাকে তার আরো একবার প্রমাণ পেয়ে যায় তিথি। শ্বশুর সাহেবের কথাতে একদম চুপসে নিরুত্তর হয়ে যায় সে। মনে মনে রাগ উঠে ভীষণ। পুরনো ইতিহাস চাপড়াতে এসেছে।

" ঠিক আছে আপনি আর আপনার ছেলেরা আপনার ছোট বউমাকে ননীর পুতুল হিসেবে তৈরি করে রাখুন। কিচ্ছু করতে হবে না তাকে। "

শাহজাহান সাহেব বিরক্তিতে কপাল ভাঁজ করে খেতে খেতে বলেন," নাজনীন সান্নিধ্যের কথা ভুলে যেও না। আমি কিন্তু কখনো তোমার প্রতি বিরুপ আচরণ করিনি। ইভেন এতো বড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও চুপ আছি।"

" মানে..? "

" মানে খুব সিম্পল। আমার বাসায় এসে আমার ছেলের বউকে তোমার ভাই নোংরা কথা বলেছে। সাহস হয় কি করে তার? আমাকে আমার ছেলেদেরকে কি চেনে না সে? সান্নিধ্য সরফরাজ যদি চুপ থাকতো আমি নিজে একদম মাটিতে পুঁতে দিতাম। এসব কিন্তু আমি বরদাস্ত করি না। তোমাকে কিন্তু আমি এই নিয়ে বিন্দুমাত্র কথা শুনাইনি। ভুলটা যেহেতু তোমার ভাইয়ের তাই তারই একমাত্র কথা শোনা প্রাপ্য। আমি অযথা কখনোই তোমাকে অসম্মান করিনি করবোও না।"

মিসেস নাজনীন থমথমে মুখোরেখায় খাবার টেবিল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। খিদে মিটে গেছে তার। আর খাওয়ার ইচ্ছে নেই।

" ছোট বউমার বন্দনা কম করে করুন। এখন বুঝতে পারবেন না ঠিক, কিন্তু একদিন সময় হলে ঠিক বুঝবেন যাকে আদর দিয়ে মাথায় তুলেছিলেন সেই আপনার সংসারের সর্বনাশ করেছে। আপনার মেয়ের সর্বনাশ করেছে।"

" মেয়ের সর্বনাশ করেছে মানে?"

"কিছু না।"

মিসেস নাজনীন খাবার ফেলে হনহনিয়ে ছুটে যান নিজকক্ষে। শাহজাহান সাহেব নিজের পাতের অর্ধেক খাবার ফেলে উঠে দাঁড়ান। নিকটস্থে দাঁড়ানো ছোট পুত্রবধূর মাথায় আলতো করে বাম হাত রেখে বলেন, " মন খারাপ করো না বউমা। তোমার শাশুড়ী মা ভাই বলতে পাগল। তাই তার দোষ ত্রুটি দেখেও দেখছে না। তোমার উপর বাড়তি রাগ ফলাচ্ছে। তবে চিন্তা করো না সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আমি সান্নিধ্য কিংবা সরফরাজ কেউই অন্যায়কে প্রশয় দিবো না। আমাদের কাছে তোমরা হচ্ছো রত্ন।"

শেহরিন মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ধীর বেগে মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। গলার ভিতরে সমস্ত কান্না তার দলা পাকিয়ে আসছে। শরীর মৃদু কম্পনে কম্পিত হচ্ছে। প্রবলচিত্তে নিজেকে ধরে রাখে সে।

শাহজাহান সাহেব চলে যেতেই তিথি শব্দ করে প্লেট রাখে টেবিলে। গলার স্বর বাড়িয়ে লতাকে ডাকে সে।

" কি হইছে বউমণি।"

" আমিনকে তাড়াতাড়ি বাহিরে থেকে খাবার আনতে বল। আমি মেনু আর রেস্টুরেন্টের নাম লিখে দিচ্ছি সেখান থেকে আনতে বলবি। আমার ছেলেটা না খেয়ে আছে। এগুলো তো খেতেই পারবে না। যা অবস্থা।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

" পৃথিবীতে মা না থাকলে মেয়েদের জীবন থেমে থাকে না বাবা। বরং সেই হারানোর সময় থেকে তাকে সবকিছু শিখে নিতে হয়, জানতে হয়। এই কঠিন দুনিয়ার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য সবকিছু আয়ত্তে আনতে হয়। কেন তুমি আমাকে কিছু শেখাওনি বাবা, কেন বোঝাওনি মেয়েদের বিয়ের আগের জীবন আর বিয়ের পরের জীবন আলাদা৷ আমার যে নিজের প্রতি নিজের ধিক্কার জমছে ।"

রিজওয়ান সাহেব নিশ্চুপ থেকে মেয়ের কান্নার শব্দ অতি কষ্টে সহ্য করে যান। কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। কি বললে মেয়ে তার শান্ত হবে? কি বললে মেয়ে তার কান্না থামাবে?

" বাবা.. মেয়েরা যতই আদরে বড় হোক না কেন, যত বড় ফ্যামিলিতেই বিয়ে হোক না কেন তাকে সাংসারিক বিষয়টাতেও কিছু ধারণা রাখতে হয়। আমি এক্ষেত্রে একদম জিরো বাবা৷ একদম জিরো। আমার এতো ব্যর্থতা আর ভালো লাগছে না।"

" মা একটু শান্ত হও তুমি। বাবা তোমার কান্নায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। তুমি যদি কান্না না থামাও আমি তোমার প্রব্লেম সলভ কিভাবে করবো বলো?"

বাবার মুখে সমস্যা সমাধানের কথা শুনে শেহরিন নিজের কান্না দমানোর চেষ্টা করে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বা হাতের তালুতে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, "আমাকে এমন কিছু টিপস দাও যাতে বাসার সবাইকে আমি একটু ভালো রাখতে পারি। আমাকে অপছন্দ করুক ঠিক আছে কিন্তু আমি তার চোখে চক্ষুশূল হয়ে থাকতে চাইনা।"

" এটা অসম্ভব মা। দুনিয়াতে তুমি আলাদাভাবে সবার কাছে ভালো হতে পারবে না। হ্যাঁ পারবে তবে অন্যায়কে সমর্থন দিতে হবে। তুমি কি অন্যায়কে সমর্থন করে সবার কাছে ভালো হতে চাও?"

" চাই না।"

" মা আমি মানছি আমার ভুল হয়েছে। আমার উচিত ছিলো তোমাকে টিনেজ থেকেই এ সম্পর্কে একটু ধারণা দেওয়া। এক্ষেত্রে আমি আমার ব্যর্থতা মেনে নিচ্ছি। কারণ আমি যেহেতু চেয়েছিলাম তোমার একটা সুন্দর জীবন হোক, একটা সুন্দর সংসার হোক। সেক্ষেত্রে সেই সংসার সম্পর্কে তোমাকে ধারণা দেওয়াটা ম্যান্ডেটরি ছিলো। আমি অযুহাত দিবো না। তবে আমি ভীষণ অসহায় ছিলাম মা। আমি একসাথে সবকিছু সামলে উঠতে পারিনি সেসময়। তোমার মামণি চলে যাওয়ার পর থেকে তোমার আমার জীবন উলটপালট হয়ে গিয়েছিলো। সাজানো একটা পরিবার ধ্বসে গিয়েছিল। তুমি কঠিন ডিপ্রেশনে নিমজ্জিত ছিলে। আমার কর্মজীবনে ব্যস্ততা ছিলো। সবকিছু মিলিয়ে আমি নাজেহাল হয়ে পড়েছিলাম। আমি এর মধ্যে বাড়তি কিছুই ভাবতে পারিনি।"

" ডলি বুবু যখন ছিলো তখন কেন শেখালো না? সে তো জানতো আমাকে একটা সময় এগুলোর সম্মুখীন হতে হবে।"

" মা আমরা কখনোই নিজেদের দায়ভার অন্যের উপর চাপাবো না। আমাদের ব্যর্থতা আমাদের মেনে নিতে হবে। আমি নিজে এ সম্পর্কে যেহেতু তোমাকে সচেতন করতে পারিনি তাহলে কেন অন্যে কারো উপর আশা করবো। মূল দায়ভার শুধু আমার।"

" উহু তোমার না বাবা। আমার। তুমি আমার বেস্ট বাবা।"

রিজওয়ান সাহেব মৃদু হাসেন মেয়ের কথায়। নরম স্বরে বলেন,

" আচ্ছা আমাদের বাপ মেয়ে দু'জনেরই কেমন? আমরা এটা বাদ দিয়ে বরং ভাবি কিভাবে কি করলে এই সমস্যা থেকে তুমি মুক্তি পাবে।"

" জ্বি বলো।"

" তুমি কি তাদের জানিয়েছো তুমি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অপরিপক্ক?"

" জানাতে হয়নি বাবা। তারা আমার কাজ দেখেই বুঝতে পেরেছে।"

" আচ্ছা পরীক্ষা কেমন হয়েছে?"

" আলহামদুলিল্লাহ ভালো ।"

" পড়াশোনার দিকটাতে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।"

" না বাবা। এক্ষেত্রে উনি ভীষণ সিরিয়াস।"

রিজওয়ান সাহেব লম্বা করে শ্বাস নিয়ে শান্ত গলায় বলেন,

"আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি তোমার অনেক ধৈর্য্য। আল্লাহ তোমাকে এই গুণটা বেশ ভালোভাবে দিয়েছেন। তোমার পার করে আসা এতোবছরের জীবনে ক্রাইসিস মোমেন্টগুলোতে অনেক ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়েছো এবং প্রত্যেকটার একটা পজিটিভ ফলাফল পেয়েছো। তুমি তোমার নতুন এই জীবনটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নাও মা। মনে করো তুমি মাত্র শেখার ধাপে পা দিয়েছো। একটা বাচ্চা যখন নতুন নতুন পড়া শুরু করে তখন কিন্তু সে অজস্র ভুল করে। তাই বলে ছেড়ে দেয় না কিন্তু। ধীরে ধীরে সেই বিষয়টা সে রপ্ত করেই ছাড়ে।"

" সেক্ষেত্রে একটা স্ট্রং গাইডলাইন থাকে বাবা। আমার যে এই শেখার ধাপে কোনো স্ট্রং গাইডলাইন নেই। আমি শিখতে চাই যাদের থেকে তাদের হতে প্রয়োজনীয় সার্পোট টুকু পাই না।"

" আমি অভিযোগ আনছি না কিন্তু বিষয়টা আমাকে ভীষণ অবাক করছে।"

" আমার নিজেরও অভিযোগ নেই। আমার দোষ ভুল আমি স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু মানবিকতা দেখিয়েও মানুষ কিন্তু অনেক কাজে সাহায্য করে।"

" তোমার ভাগ্যে হয়তো এই জিনিসটা ল্যাক ছিলো।"

শেহরিন ঠোঁটের উপর ঠোঁট চেপে মাথা নাড়ায়। ধরে আসা গলা উপেক্ষা করে বলে," আমার এটা মেনে নিতেই কষ্ট হচ্ছে বাবা। যদি উনার ক্ষেত্রে কোনো ল্যাক পেতাম তাহলে তো আমি টিকেই থাকতে পারতাম না। মানুষটা অতিরিক্ত হেল্পফুল, কাইন্ডনেস আমার প্রতি। যতক্ষণ সে বাসায় থাকে আমার কোনো ভয় কাজ করে না, কোনো ওভারথিংকিং মাথায় আসে না। আর কান্না করা তো মহা অপরাধ তার কাছে। এসব কিছুর কারণে আমি নির্বিঘ্নে সবকিছু সহ্য করে যেতে পারি বাবা। আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি একটু জাস্ট সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে চাই।"

" পারবে মা। নিশ্চয়ই পারবে। জীবনে চলার পথে মানুষ কখনো এক জায়গাতে আটকে থাকে না। অদৃশ্য এক ঢেউ তাকে এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করে নিয়ে যায়। তোমারও একসময় মৌসুম পরিবর্তন হবে্। আজকের এই অবস্থান ক্ষণস্থায়ী। এটা নিয়ে ভেবো না। আজ যে ভুলগুলো করেছো কালকে তুমি নিশ্চয়ই সেটা করবে না। ধীরে ধীরে নিজেকে গ্রো করো। ইনশাআল্লাহ কোনো একদিন আমার শেহরিন এক হাতে পোলাও রোস্ট রান্না করবে অপর হাতে ফাইলে সিগনেচার করবে। এটা আমার বিশ্বাস।"

শেহরিন বাবার আত্মবিশ্বাসী কথার সুরে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে।

হুট করে বাঁধা ভাঙা কান্নায় মুষড়ে পড়ে সে । বাবার তার প্রতি এখনো একই বিশ্বাস রয়েছে যে তার মেয়ে পারবে। অথচ মনস্তাত্বিক দিক থেকে সে ভীষণ দূর্বল।

" সত্যি কি আমি পারবো বাবা নাকি মাঝ পথেই সব চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে?"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প