রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি

পর্ব - ৩৩

🟢

শুক্রবার পার করে শনিবারের এক স্নিগ্ধ বিকেল। পড়তে পড়তে বইয়ের মাঝে মুখ ডুবিয়ে অর্ধচৈতন্য হয়ে আছে এক রমণী। পিটপিট করে একবার চোখ মেলছে তো আবার একটু করে ঘুমিয়ে নিচ্ছে। সোনালি ঝকঝকে রোদ্দুর তার ফর্সা গালের ভাঁজে এসে লুটিয়ে পড়েছে এলোমেলো ছন্নছাড়া হয়ে। সেই সাথে নরম হাওয়ায় জানালার পর্দাগুলো দুলছে মৃদুছন্দে।

মনোরম এই ঘুমকাতুরে পরিবেশে হুট করে বেজে উঠে ফোন। রিংটোন এর জোরালো শব্দ কর্ণকুহরের জন্য হয়ে উঠে পীড়াদায়ক। শেহরিন কপাল কুঁচকে ফের চোখ খোলে তো বন্ধ করে। সে জানে এখন বাবা কিংবা নেতাসাহেব কেউই ফোন করেনি। দুজনের সঙ্গেই দুপুরে তার কথা হয়েছে। যার কারণে অদরকারী ফোন ভেবে আগ্রহ মাত্রা অতি নিম্নপর্যায়ে।

কিন্তু বেয়াড়া ফোনও নাছোড়বান্দা। শেহরিনকে বিছানা হতে না তোলা অব্দি যেনো সে তার কার্য থামাবে না। দৃঢ় পণ তার। একবার রিং হয়ে কেটে গেলে পুনরায় আবার শুরু করে বাজতে।

" ইশ্ একটু ঘুম চোখে এলেই অশান্তি। "

মুখের উপর হতে বইটা সরিয়ে বিরক্তিকর ধ্বনি নিঃসৃত করে উঠে পড়ে সে। ডেস্ক হতে ফোনটা তোলা মাত্র নজরে আসে ঋতমার কল।

" ঋতমা..? "

শেহরিনের কপালের ভাঁজসহ সমস্ত বিরক্তি এক লহমায় দূর হয়ে যায়। মেরুদণ্ড হতে বয়ে যায় ঠান্ডা শীতল স্রোত। বুকের ভিতরটা ধ্বক ধ্বক করতে শুরু করে। শুকনো ঠোঁটটা জিহ্বা দ্বারা ভিজিয়ে নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে সে। সঙ্গে সঙ্গে অপর পাশ হতে ধীর কন্ঠে ভেসে আসে চিরপরিচিত গলা।

" শেহরিন। "

" প্লিজ ঋতমা চলে যাওয়ার কথা বলবে না।"

এক নিসঃঙ্কোচ আবদার শ্রবণ হতেই ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটি চুপ হয়ে যায়। শেহরিনের হৃদপিণ্ডটা ক্রমান্বয়ে অস্থির হয়ে উঠে। সেই মারাত্মক ফোবিয়া তাকে ধীরে ধীরে আবারো জেঁকে ধরতে শুরু করে।

" আজ সন্ধ্যায় ফ্লাইট আমাদের শেহরিন। তুমি কি আসতে পারবে? "

ঋতমার কথাটা শেষ না হতেই শেহরিনের গা ঘেমে উঠে মুহুর্তেই। কিছু সময়ের ব্যবধানে চোখ এসে জমা হয় নোনাজল। দু পাতা ফেলে সেই কঠিন বাক্যগুলো হজম করে নেয় সে অনেক কষ্টে। মুখ হতে অজান্তে অস্পষ্ট স্বরে ক্রন্দনের শব্দ বের হওয়া মাত্র নিজেকে সামলে নেয়। এই দিনের ভয়টা মনের কোণে লুকিয়ে রেখেছিলো সে এতোগুলোদিন।

ভার্সিটির ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিলো তার ঋতমার সঙ্গে। পরিচয় পর্ব থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয়েছিলো মুখে মুখে গল্পকথা, সেই থেকে আঙুলের ভাঁজে আঙুল রেখে একসাথে চলা। দু'জনেই ছিলো দুজনের কাছে নতুন। আর সেই নতুন খোলস ছেড়ে পুরনো হতে না হতেই বেজে যায় বিদায়ের ঘন্টা। আজ তাহলে সেই অমোঘ কালো দিন? অথচ আকাশের বুকে আজ কোনো মেঘ নেই।

" পা..পারবো। এয়ারপোর্টে কখন যাবা? "

" একটু পরেই বের হবো।"

" আচ্ছা আমি আসছি।"

শেহরিন ফোন কেটে দেয়। দু'হাতের তালুতে চোখ মুছতে মুছতে আবার সে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলে। নিজেকে হাজারো সংবরণ করতে চাইলেও কেন জানি পারে না সে। মন চায় তার হু হু করে কাঁদতে। বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন হওয়ার কষ্টটাকে উগড়ে দিতে। কিন্তু সময় যে নেই। যেতে হবে।

" হ্যালো আপু।"

" হু বাচ্চা বলো। "

" রুমেই আছো? "

" না নিচে আমি। কিছু দরকার আসবো?"

" আপু ঋতমার একটু পরেই ফ্লাইট। ইউএসএ চলে যাচ্ছে ওরা। উনাকে ফোন দিলাম, আসিফ ভাইয়াকে ফোন দিলাম কেউই রিসিভ করলো না।আমি বের হচ্ছি।"

সানজি গার্ডেনে যাওয়া পথে পা থামিয়ে ফেলে। ফোনের অপর পাশ হতে স্পষ্ট ভঙ্গুর কন্ঠ ভেসে আসছে। তার মানে মেয়েটা কান্না করছে। তড়িঘড়ি করে সে আবারো ফিরে আসে বাসার অভ্যন্তরে।

" দু'মিনিট ওয়েট করো। আমি এক্ষুণি রেডি হয়ে আসছি। ভাইয়া হয়তো ব্যস্ত আছে এজন্য রিসিভ করছে না।"

" হতে পারে।"

শেহরিনকে কোনমতে বুঝ দিয়ে সানজি ঝটপট তৈরি হয়ে নেয়। বের হওয়ার মুহুর্তে মিসেস নাজনীনকে নিজ হতে সে বুঝিয়ে বলে যাতে মেয়েটার সামনে কোনো দ্বিরুক্তি না করে।

" সান্নিধ্যকে জানালে ভালো হতো না? সন্ধ্যা হয়ে আসছে তো।"

"আম্মা ভাইয়া ফোন রিসিভ করছে না। হয়তো কার্যালয়ে নেই। আউটডোরে কোথাও গিয়েছে।"

"আরহামকে ফোন করো তাহলে।"

" আম্মা আমি তো যাচ্ছি সাথে। এতো জনে জনে ফোন দেওয়ার দরকার নেই।"

" সাবধানে যাবে আর তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।"

" আচ্ছা।"

গৌধূলীর ছাঁপ মলিন হয়ে আসে। সন্ধ্যা নামে সবুজ অরণ্যের বুকে। শাই শাই করে ছুটে চলেছে গাড়ি। পিচ ঢালা রাস্তায় গাড়ির চাকার অবসর নেই। কেউ নতুন করে যাত্রা শুরু করছে তো কেউ গন্তব্যে ফিরছে।

সানজি শেহরিনের ডান হাতটা মুঠো চেপে ধরে আছে নিজ কোলের মাঝে। মেয়েটা উদাসীন চোখে তাকিয়ে আছে জানালার বাহিরে। এতো অল্প সময়ের মাঝে একটা সুন্দর বন্ধনের ইতি যেনো তাকে নাজুক করে তুলেছে ভীষণভাবে।

" শেহরিন।"

" হ্যাঁ।"

" ঋতমা বাদে তোমার জীবনে বেস্ট ফ্রেন্ড বলতে কেউ কি ছিলো?"

শেহরিন বাহির হতে চোখ সরিয়ে সানজির দিকে তাকায়। মুখোরেখায় ক্লিষ্টতার ছাপ নিয়ে শুধায়, " হঠাৎ এই প্রশ্ন? "

" জানতে ইচ্ছে হলো। পার্সোনাল কোনো ইস্যু হলে ইট’স ওকে।"

" ছিলো অতীতে। বর্তমানে সে নেই, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে না।"

" কত বছরের ফ্রেন্ডশীপ ছিলো তোমাদের? "

" ক্লাস টু থেকে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার।"

সানজি নয় দশ বছরের ফ্রেন্ডশীপের কথা শুনে অবাক হয়ে যায় বেশ খানিকটা। আগ্রহ মিশ্রিত চাহনিতে তাকিয়ে নরম গলায় বলে, " তারপরে কি হলো? "

" একটা থার্ড পার্সনের কারণে সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গেলো। আমাকে সে ভুল বুঝলো। হুট করে রিয়েল ভার্চুয়াল দুই জগত থেকেই আমাকে মুছে ফেললো।"

" তারপরে আর কখনো কথা হয়নি? "

" না। দূর হতে দেখেছি। আমাকে দেখেছে কি না জানি না।"

" তোমাকে যে ভুল বুঝলো তুমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করোনি? "

শেহরিন নির্নিমেষ চাহনিতে ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি ফুটিয়ে তোলে। সিটের মাঝে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে, " সে যখন আমাকে তার জীবন থেকে মুছে ফেলেছে আমি বিন্দুমাত্র চেষ্টা করিনি নিজ হতে যোগাযোগ করে তার ভুল ভাঙাতে। শুধু মাত্র আমার ডায়েরিতে তাকে নিয়ে কিছু কথা লেখা আছে যেগুলো আমি কেটে দিতে পারিনি। তাছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব নেই, কোনো স্মৃতি নেই। কেন আমি তাকে বুঝাবো? দশটা বছর কি কম ছিলো বোঝার? "

" তোমার খারাপ লাগতো না।"

" নিজের জন্য খারাপ লাগতো আপু। আমি খুবই বোকা ছিলাম। আমি মানুষ চিনতে ভুল করেছিলাম । দুইদিনের পরিচয়ে যে মেয়ে দশ বছরের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে সে কখনোই বেস্ট ফ্রেন্ড হতে পারে না। তাকে ভুলতে তাই আমার সময় লাগেনি খুব একটা। অথচ বাচ্চাকাল থেকে টিনেজ অব্দি আমরা ছিলাম সবচেয়ে আপন সবচেয়ে কাছের। পড়াশোনা সহ সব অ্যাক্টিভিটিস একসাথে করতাম। কতশত মুহুর্ত ছিলো..."

" ওগুলো ভেবে খারাপ লাগে বুঝি তোমার? "

শেহরিন চোখ খুলে কিছুটা দ্বিধা গ্রস্ত হয়ে থাকে। ভ্রু জোড়া বাঁকিয়ে বলে,

"বিশ্বাস করো আপু, ঋতমার জন্য আমার যতটা খারাপ লাগছে জাফরিনের সঙ্গে সম্পর্কটা শেষ হবার সময় এতো খারাপ লাগেনি। ইভেন দশ বছরের স্মৃতি আমি গ্রোগ্রাসে গিলে ফেলেছি। আমার মন আমাকে বলে, ওগুলো দশ বছরের জন্যই নির্ধারিত ছিলো। তার চেয়ে বেশি নয়। ভুলে যাও।

মানুষ অনায়াসে হয়তো ভাববে আমি স্বার্থপরের মতো কথা বলছি। আমি স্বার্থপরই হতে চাই আপু । যেখানে সে নির্দ্বিধায় নতুন ফ্রেন্ড তৈরি করতে পারে, পুরনো স্মৃতি বন্ধনগুলো পিষে ফেলতে পারে, নূন্যতম বিবেকবোধ কাজে না লাগাতে পারে সেখানে তাকে ঘিরে স্মৃতি কেন আমি মনে রাখবো?

আমি নিজেকে মূল্যহীন কখনোই ভাবি না। আমার কাছে আমার নিজের মূল্য অনেক বেশি, আমার কাছে আমার আত্মসম্মানটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। জীবনের শেষ সময়ে সে যদি তার ভুল বুঝতে পারে তাহলে সে আমার কাছে আসবে। আমি ইনশাআল্লাহ কখনোই যাবো না।"

" শেহরিন....

শেহরিন সানজির বিস্মিত চোখ দেখে মৃদু হেসে বলে," আপু তোমাকে যে মূল্য দিবে তাকে তুমি মাথায় তুলে রাখবা। তোমাকে যে পায়ের তলায় পিষে রাখবে তাকেও সেভাবে রাখবা। দেখবে খারাপ লাগবে না৷ হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে, এতো অল্প সময়ের মাঝে ঋতমার জন্য আমার এতোটা গভীর টান কিভাবে সৃষ্টি হলো। "

" সত্যি এই প্রশ্নটা এসেছে মনে।"

" আমি ঋতমাকে যে মূল্যটা দিতাম ঠিক সেটাই ফিডব্যাক পেতাম। ঋতমা আমার প্রত্যেকটা ব্যাপার খুব সুন্দরভাবে মূল্যায়ন করতো। আমি ওকে দেখে জাফরিনের কথা ভাবতাম। ঠিক এই জিনিসটা আমি ওর কাছে পেতাম না। আমার দশটা বছর গিয়েছে শুধু মাত্র ওর কথাই শুনতে, ওকেই হেল্প করতে। আমি নিজেকে উন্মুক্ত করার সুযোগই পাইনি। এগুলো কিন্তু তখন আমার কাছে স্বাভাবিক লাগতো। মনেই আসেনি কখনো যে, আমি তার সাথে এতো খোলাখুলি, এতো ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছি অথচ নিজস্ব প্রয়োজনে তার থেকে কোনো হেল্পই পাচ্ছি না। মামণি চলে যাওয়ার পর থেকে আমার জীবনটা অন্ধকারে তলানো ছিলো। আর সেই অন্ধকারে একমাত্র চাঁদের হাসি ছিলো আমার বাবা। আমি এতোটাই ডিপ্রেশনে ভুগতাম যে চৌদ্দ দিন পর পর আমাকে নিয়ম করে সাইকিয়াট্রিস্ট এর শরণাপন্ন হতে হতো। আর সেটা টানা কয়েকমাস কন্টিনিউ ছিলো । অথচ আমার কিন্তু একটা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো। আমি কোনো রকম তার থেকে সঙ্গতা পাইনি।

আমি সেই সময়টাতে একটা গোলকধাঁধার মধ্যে ছিলাম। যখন সম্পর্কটা শেষ হলো আমার জীবনের কোনো পরিবর্তনই হলো না। তখন বুঝলাম সে আসলেই আমার কেউ ছিলো না। তা নয়তো আমি কষ্ট পাচ্ছি না কেন?

তখন থেকেই একটা দারুণ জিনিস অনুধাবন করতে শিখলাম আপু,

তোমার জীবনে বিশেষ একজন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও যখন দেখবে তার অনুপস্থিতি তোমার হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারছেনা , তাকে ছাড়া তোমার দমবন্ধ লাগছে না, পুরনো স্মৃতি ক্ষত বিক্ষত করে তুলছে না। তখন বুঝে নিবে সে তোমার জীবনে বিশেষ কেউ নয় স্রেফ একটা মরীচিকা ছিলো। একটা নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গী ছিলো । সে তোমাকে প্রভাবিত করতে পারেনি, তার জীবনে তোমাকে মূল্য দিতে পারেনি জন্য তুমি তাকে অনায়সে ভুলে যেতো পেরেছো।"

সানজি চুপ হয়ে যায়। বাচ্চা মেয়েটার বাস্তববাদী কথাগুলো তার অন্তর স্পর্শ করে যায় অন্তরালে। এই মেয়েটা অল্প বয়সে এতো কঠিন কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে ভাবতেই তার অবাক লাগে। একই সাথে মা হারিয়েছে, এতো দীর্ঘ সময়ের একটা বন্ধুত্বকে হারিয়েছে, কঠিন ডিপ্রশনে ভুগছে। তারপরেও কতটা আত্মসম্মান ধরে রেখেছে নিজের মাঝে।

" জাফরিনের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ার দেড় বছরের মাথায় বাবা জানতে পারে ওর সাথে আমার যোগাযোগ নেই। বাবা অনেকটা শকড হয়ে পড়েছিলো। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো কেনো জানাইনি তাকে, আমি কাটকাট গলায় বলেছিলাম তোমাকে জানালে তুমি চেষ্টা করতো ঠিক করে দিতে।

যারা নিজ হতে চলে যায় তাদের নিজ হতেই ফিরে আসতে দেওয়া উচিত। কিন্তু আমি চাই না জাফরিনরা ফিরে আসুক। আমি চাই ঋতমার মতে বন্ধুগুলো ফিরে আসুক। যারা বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে জানে। যারা নিজেকে মূল্যায়নের পাশাপাশি অপরকে মূল্যায়নকে করতে পারে।"

" ঠিক বলেছো তুমি। কিন্তু তোমার কি কখনো আফসোস হয়নি বা অনুযোগ হয়নি। মানুষ তো আমরা। খারাপ তো অবশ্যই লেগেছে।"

" ভুল মানুষের প্রতি খারাপ লাগাটা সবসময় লুকিয়ে রেখে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিতে হয় আপু। এটাকে যত নিজের মাঝে পুষে রাখবে তত নিজেকে ছোট করবে। অবশ্যই খারাপ আমার লেগেছে। তবে আমি সেটাকে খুব একটা প্রশয় দেইনি। আমি ফিরে তাকাইনি। কখনো মনে হয়নি তাকে ভুল সংশোধন করে দেওয়া উচিত। তার কাছে গিয়ে অনুযোগ করা উচিত। বরং প্রত্যেকবার লম্বা করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলেছি, আই অ্যাম ওয়েল অন মাই ওয়ে। যেখানে আমি কোনো ভুল করিনি সেখানে আমি নিজেকে কখনোই ছোট করবো না। যে চলে গিয়েছে তার চেয়ে আমার আত্মসম্মানের মূল্য বেশি।"

" যদি কখনো তোমাদের সামনাসামনি দেখা হয় তখন কি করবে? "

"ভেবে দেখিনি। তবে চাই না দেখা হোক।"

" ঘৃণা করো? "

" সে আমাকে ভুল বুঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে জন্য যে তাকে ঘৃণা করবো মোটেও না। বাবা আমাকে মানবিকতা শিখিয়েছে। আমি চাই সে ভালো থাক।"

সানজি শেহরিনের কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে। অতঃপর আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে স্বতঃস্ফূর্ত হেসে সতেজ গলায় বলে, " ইয়েস, ইউ আর ওয়েল অন ইউর ওয়ে। আংকেল তোমাকে অনেক সুন্দর শিক্ষা দিয়ে গড়িয়ে তুলেছে।"

" ইয়েস। মাই ফাদার ইজ মাই ইন্সপিরেশন।"

_____________________________________________

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা, শাহ আমানত বিমানবন্দর।

গাঢ় সন্ধ্যায় ঢাকা পড়েছে বিমানবন্দর। আলোয় আলোকিত হয়ে গমগমে মানুষের ব্যস্ত পদযাত্রায় মুখোরিত হয়ে আছে চারপাশটা। দেশ ছেড়ে বিদেশ বিভুইয়ে পাড়ি দিতে নিজেদের করে নিচ্ছে শেষ বারের মতো প্রস্তুত। স্তব্ধ গুমটে বাতাসে ভাসে বিদায়ী বার্তার করুণ সুর। দেশের মাটির সুঘ্রাণ ছেড়ে, আপনজনেদের মমতা ছেড়ে চলে যেতে অগ্রসর হওয়া প্রতিটি মনুষ্য আত্মা নিরবে হাহাকার করে উঠে। কিন্তু জীবন এবং সময়ের কাছে মানুষ অসহায়। জৈবিক প্রয়োজন মেটাতে নাড়ির টানও অনেক সময় উপেক্ষা করে যেতে হয় সবকিছু ছাপিয়ে ।

" না গেলে কি হতোই না? "

ঋতমার বুকের ভিতরটা ছিঁড়েখুঁড়ে যায় শেহরিনের মুখে সেই ধরে রাখার নিরন্তর অনুরোধটা শুনে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকে সে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু গলার আওয়াজ আজ তার হারিয়ে গিয়েছে। অন্যান্য দিন কতো সহজেই সে এই অনুরোধটা কাটিয়ে দিতো। অথচ আজ মুখ দিয়ে কথাই বের করতে পারছে না।

" তোমাকে অনেক বেশি মিস করবো।"

ঋতমা পারে না নিজেকে আর ধরে রাখতে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে শেহরিনকে। ঝুরঝুরে মেঘহীন আকাশে বৃষ্টি মেদুর হয়ে

চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। কেঁপে ওঠে সমস্ত শরীর। এই আদুরে মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসে সে। এই ভালোবাসা পাগল মেয়েটাকে সবচেয়ে কাছের বন্ধু মনে করে সে। বন্ধুত্বের প্রতি ঋতমার নিরব বেদনার সাক্ষী একমাত্র তার বাবা মা৷ বিদেশ যাওয়ার প্রতি একরাশ উচ্ছ্বাসতা কত সহজেই নামিয়ে নিয়ে এসেছিলো তীব্র অনীহাতে। কিন্তু পারেনি সেটা পুরোপুরি উপেক্ষা করতে। জীবনের তাগিদে বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হতেই হ'য়েছে।

" আমাকে কখনো ভুলে যেয়ো না।"

" কখনো ভুলবো না।"

শেহরিনের সিক্ত চোখের জলগুলো গাল বেয়ে অবাধে নেমে যায়। চোখ বুঁজে সে তার জীবনের আরেকটা সুন্দর একটা মানুষকে বিদায় দেয়। তাদের মাঝে ছিলো না ধর্ম, বর্ণ নিয়ে কোনো ভেদাভেদ। বরং দুজনেই দুজনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলোকে সম্মান করে যেতো। সুন্দর সুঘ্রাণে বন্ধুত্বকে করেছিলো নব প্রস্ফুটিত ফুলের ন্যায় পবিত্র।

ঋতমার মা মিসেস সুনন্দা বসু ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন। শেহরিনের মাথায় হাত রাখেন আলতোভাবে। মেয়ে আর তার বান্ধবীর এইটুকু সময়ের মাঝে এতো দৃঢ় বন্ধন চোখ ছলছল করে তোলে তার। স্মিত হাসি টেনে বলেন,

" আর্শীবাদ করি ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন মা। ভালো থাকো সবসময়। "

শেহরিন ঋতমাকে ছেড়ে হাতের পৃষ্ঠে চোখ মুছে নেয়। অস্ফুটস্বরে আওড়ে বলে, " আপনারাও ভালো থাকুন আন্টি।"

" তোমার বাবার সাথে তো দেখা হলো না। তবে তোমার আংকেলের সাথে ফোনে কথা বলেছেন। যখন দেশে আসবো তখন নিশ্চয়ই দেখা হবে। তুমি কিন্তু পড়াশোনাটা ঠিকভাবে চালিয়ে যাবে কেমন।"

" আচ্ছা ।"

সময় বায়। সেই সঙ্গে বিদায়ী ঘন্টার আওয়াজ ভেসে আসে। শেষবারের মতো শেহরিন ঋতমাকে বিদায় জানায়। দু'জনেরই

বিজ্ঞাপন

চোখে জল কিন্তু ঠোঁটে এক অসহায় ম্লান হাসি। যে হাসিতে লুকিয়ে আছে বন্ধুর প্রতি বন্ধুর ভালোবাসা আর অপার আক্ষেপ।

চেকপোস্ট পার করে কাঁচের দেয়ালের বেষ্টনীতে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হওয়ার পথে ঋতমা। শেহরিন পাথরের মূর্তির ন্যায় নিষ্পলক চাহনিতে তাকিয়ে দেখতে থাকে তাকে। ঋতমা অন্তিম লগ্নে ঘুরে তাকায়। দুজনেই বিষাদের হাসি হেসে একসাথে হাত উঁচু করে বিদায় জানিয়ে দেয় আরো একবার।

সানজি শেহরিনের কাঁধ সন্তপর্ণে হাত রাখে। শরীর দুলে উঠে তার। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলে, " আপু, ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া প্রথম বর্ষেই আমার জন্য বন্ধ হয়ে গেলো। এই ছয় সাতটা মাস জানালার পাশে ছোট্ট টেবিলটা আমাদের দুজনের দখলে ছিলো। ওটা আজ থেকে মুক্ত। আমি কখনোই আর সেখানে যেতে পারবো না। ওটা শুধু শেহরিন ঋতমার জন্য। শুধু শেহরিনের জন্য নয়।"

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি বাংলা গল্প pdf সাহিত্য

সুখনিবাসের বড় দেয়াল ঘড়িতে তখন ঘড়ির কাঁটা এগারোটায়। উপর তলার দক্ষিণের কক্ষটা নিরব নিস্তব্ধ। ডেস্ক ল্যাম্পের আলো নিভু নিভু। কানে ফোন চেপে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শেহরিন। অপর পাশ হতে নম্রস্বরে ভেসে আসে,

" মা মন খারাপ? "

" পড়তে ইচ্ছে করছে না বাবা।"

" ইচ্ছে না করলে পড়ো না। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাও আজকে। সান্নিধ্য এসেছে? "

"এখনে আসেনি।"

দুপাশেই নিরবতা বয়ে যায়। শেহরিন কিছুটা সময় চুপ থেকে উদগ্রীব কন্ঠে বলে, " বাবা.. প্রিয় মানুষেরা চলে যায় কেন?"

" যার গন্তব্য যেখানে তাকে তো সেখানে যেতেই হবে মা। আমার প্রিয় মানুষ তুমি অথচ দেখো আমি কি পেরেছি তোমাকে ধরে রাখতে? তোমার গন্তব্য লেখা ছিলো যেখানে সেখানে তোমাকে যেতেই হয়েছে।"

" ধরে রাখার নিয়ম নেই তাই না? "

" জাগতিক নিয়মের বাহিরে কিছুই নেই। বাস্তবিক জীবনে বাস্তবিক ঘটনাগুলো তো মেনে নিতেই হবে। "

" অদ্ভুত সবকিছু !! "

" বি স্ট্রং মা। এতো কেন ভেঙে পড়ছো তুমি? "

"জীবনে বন্ধুত্বের চ্যাপ্টারে একবার ঠকে গিয়ে আবার নতুন করে সেটাকে ফিরে পেতে চলেছিলাম বাবা। এজন্যই হয়তো শূন্যতাটা বেশি ভোগাচ্ছে।"

রিজওয়ান সাহেব চাপা নিঃশ্বাস ছাড়েন মেয়ের কথায়। ধীর কন্ঠে বলেন, " বন্ধুত্ব সবার ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী হয় না। তোমার মতো অনেকেই ঠকে যায়, বিশ্বাস হারায় কেউ বা অদূরে চলে যায়। কিন্তু থেমে থাকে কি কিছু? কেউ একা টাকেই সঙ্গী করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, কেউ বা নতুন সন্ধানের খোঁজ করে।"

" ঠকলে মোটেও কষ্ট পেতাম না।"

" আমি জানি তুমি কষ্ট পেতে না। দূর হতেই তুমি তোমাদের বন্ধুত্বটাকে আগলে রাখো। যোগাযোগ একটা সম্পর্ককে সুস্থ রাখে। তুমি সেটা অবলম্বন করো। কোনো কষ্ট নেই মা। কোনো কষ্ট নেই। জীবনের পথে সৎ সাহস রেখে একা চলো সমস্যা কি্? আমি সান্নিধ্য তোমাকে খোলা উদ্যানে ছেড়ে দিয়েছি তুমি নিজেকে গড়ে তোলো শুধু । দেখবে, অনেক কঠিন সময়ে তোমার একা চলার সাহসটা তোমাকে দারুণ সাহায্য করছে।"

" হুম।"

" সবসময় মনে রাখবে সময়ের মতো মানুষের জীবনও গতিশীল। কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না। সেটা মাথায় রেখেই চলবে। তোমাদের বন্ধুত্বটা দূরত্বের হোক, কিন্তু মনের নয়। সম্পর্কটাকে যত্ন করো দু'জনে। যতদিন বেঁচে থাকবে অমলিন হয়ে থাকবে।"

শেহরিন বাবার কথায় বুক হতে ভারত্ত কমায়। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে সে ধীর বেগে মাথা নেড়ে সায় জানায় নিরবে প্রতিটি কথায় । জীবনে যত বড় হচ্ছে তত বাস্তবতার অভিজ্ঞতায় সম্মুখীন হচ্ছে। সবকিছু আদতে সহজ নয়।

" বাবা উনি এসেছেন।"

" আচ্ছা মা। গুড নাইট। স্টে অলওয়েজ হ্যাপি।"

"ধন্যবাদ বাবা । গুড নাইট। "

শেহরিন ফোন রেখে বেলকনিতে যেতেই আবারো ফোন আসে। নেতাসাহেবের ফোন। রিসিভ করা মাত্র পুরুষালি কন্ঠে ভেসে আসে,

" বাহিরে আসো।"

শেহরিন কোন রকমের দ্বিরুক্তি করে না। ফোনটা কান হতে নামিয়ে বিছানায় রাখা ওড়নাটা গলার সাথে পেঁচিয়ে নিচে নেমে যায় দ্রুত। ড্রয়িংরম ফাঁকা। বাবা হয়তো শুয়ে পড়েছেন আজকে তাড়াতাড়ি। নয়তো এসময়টা তার খবরের চ্যানেলের মাঝেই কাটে। উপর হতে ভেসে আসছে তাসিনের না পড়ার বাহানার চিৎকার।

মেইন ডোর অতিক্রম করে গ্যারেজের সামনে আসতেই শেহরিনের পদযাত্রা থেমে যায়। কালো রঙের বাইকে বসে আছে নেতাসাহেব। পড়নে তার স্কাই ব্লু শার্ট সাথে ক্রিম প্যান্ট। পিছন পিঠে হালকা স্বেদকণার কারণে শার্টটা হালকা ভিজে উঠেছে। দু-হাত তার ফোনে টাইপিং এ ব্যস্ত।

" কখন এসেছেন? "

সান্নিধ্য শেহরিনের কন্ঠ পেতেই এক নজর পিছু ঘুরে তাকায়। ফোনটা বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে নিতে নিতে বলে, "পাঁচ মিনিট আগে। বাইকে উঠো।"

" কার বাইক এটা? "

" আমার।"

" আপনি বাইক চালান কখন?"

" মাঝে মাঝে রাতে বের হই।"

শেহরিন খানিকটা অবাক হয়। বিয়ে পরবর্তী সময়ে কখনো নেতাসাহেবকে বাইক চালাতে দেখেনি সে। তবে গ্যারেজে দেখে ভেবেছিলো হয়তো সরফরাজ ভাইয়ার।

" উঠো। "

" এখন বাহিরে যেতে হবে না প্লিজ। সেই ভোরে বের হয়েছেন আজকে। সারাদিন শেষে এত রাতে বাসায় ফিরেছেন। এখন দয়া করে একটু রেস্ট করুন। আপনার কি ক্লান্ত লাগে না? "

" লাগে না।"

" অবশ্যই লাগে। আপনার চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনি ভীষণ ক্লান্ত।"

" কিছু হবে না। বেশি সময়ও লাগবে না। উঠো তুমি।"

সান্নিধ্যের তোড়জোড়ে অবশেষে শেহরিন বাধ্য হয়ে বাইকে উঠে বসে। এই লোক যখন বলেছে বের হবে তো হবেই। শত মানাও আর শুনবে না। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে তার নেতাসাহেবকে।

সান্নিধ্য শেহরিনের ওড়না জামার দিকে খেয়াল করে অতঃপর বাইক স্টার্ট করে।

অদূরে নাইট গার্ড গেট খুলে দিতেই এক নিমিষে সুখনিবাস হতে বের হয়ে যায় দুজনে।

গভীর রাত। চারপাশে নিস্তব্ধতা। সময় হয়তো বারোটা ছুঁই ছুঁই। সকল নীরবতা ভেঙে কেবল বাইকের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। রাতের ঠান্ডা বাতাসে বাঁধাহীনভাবে উড়ছে শেহরিনের চুলগুলো। নেতাসাহেবের পিঠের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে চোখ বন্ধ করে এক স্নিগ্ধ আবেশে ডুব দিয়েছে সে।

" কান্না কি একটু বেশিই করে ফেলেছো আজকে? "

" বেশি হয়ে গিয়েছে।"

" একদম চোখ মুখ লাল করে ফেলেছো। কালকে এক্সাম আছে?"

" আছে।"

বেয়াড়া চুলগুলো ঠোঁটের কোণে ঢুকে যেতেই শেহরিন চোখ খুলে চুলগুলো কোনমতে হাত খোঁপা করে বেঁধে রাখে। রাতের আঁধারে সে চিনতে অক্ষম হয় এটা ঠিক কোন রাস্তা। আশেপাশে যেসব দোকান দেখছে সেসব চেনা চেনা লাগলেও ঠিকভাবে ঠাহর করতে পারে না।

হালিশহর থেকে বেরিয়ে এসে তারা পৌঁছে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশমুখে। রাতের নিস্তব্ধতা মনে হচ্ছে এখানে আরো গভীর। কেবল দূরে জাহাজের মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে। বন্দরে শত শত কনটেইনার রাতের অন্ধকারে ঠাঁই হয়ে আছে।

" ওটা জাহাজ...? "

কাছে কূলে একটা জাহাজ ভিড়তেই শেহরিন উচ্ছ্বেসিত হয়ে উঠে। সান্নিধ্য বাইকের গতি কমিয়ে এনে বলে,"যাবা? "

" না থাক। দূর থেকেই ভালো লাগছে দেখতে।"

" জাহাজে উঠেছো কখনো?"

" না উঠা হয়নি।"

" ভাইয়াকে বলবে, জাহাজ ঘুরিয়ে দেখাবে।"

" আপনাদের বিজনেস আছে এখানে? "

" আসার পথে খান শিপইয়ার্ড লেখা দেখলে যে ওটা আমাদের।"

" আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করে কি?"

"অভ্যন্তরীণ রুটে।"

" বাহ। তাহলে তো ভাইয়াকে বলতেই হচ্ছে।"

বন্দর নগরী দেখা শেষে পতেঙ্গা অভিমুখী হয় সান্নিধ্য শেহরিন। সমুদ্র নগরীর পানে আসতেই শো শো বাতাসের শব্দ কানে এসে বাজে। নোনাজলের গন্ধে এসে লাগে নাকে। রাতের নীরব সমুদ্র সৈকতটা এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ঘেরা। নেই মানুষের ভিড় নেই, নেই কোনো কোলাহল। ঢেউগুলো অবিরাম তীরে আছড়ে পড়ছে। সেই সাথে চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে সমুদ্রের পানি।

" ভালো লাগছে ? "

" মন ভালো করার জন্য ন্যাচারাল থেরাপির উপরে হয়তো আর কিছু হয় না। অদ্ভুত রকমের ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আমার ভিতরের সব কষ্ট গুলো সমুদ্রের নীলরাশি ধুয়েমুছে নিয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা রাতের চট্টগ্রাম এতো সুন্দর কেন? "

সান্নিধ্য স্মিত হাসে। শান্ত কন্ঠে বলে," দিনের চট্টগ্রামও সুন্দর।"

" দেখুন ছোট ছোট নৌকোগুলো ফিরছে। "

"ফিরছে না ওরা। মাছ ধরছে। "

" ভয় করে না? "

" ভয় কেন করবে? "

" কুমির যদি ধরে?"

সান্নিধ্য ঠোঁট কামড়ে নিরব হাসে শেহরিনের কথায়। নির্মেদ কন্ঠস্বরে বলে," কুমির শব্দটা চিপ লাগছে অ্যাটলিস্ট জলদস্যু বলা উচিত ছিলো তোমার।"

" জলদস্যু কাদের ধরে?"

" শেহরিনকে ধরে।"

সান্নিধ্যের পিঠ খামচে ধরে শেহরিন । ভ্রু বাঁকিয়ে বলে," আমাকে কেন ধরবে? আমি তো পানিতেই নামি না।"

"এখন নামিয়ে দিয়ে আসবো তোমাকে।"

" ভয় দেখাচ্ছেন কেন?"

" আর কখনো কান্না করে চোখ মুখ ফুলাবে? "

" কান্না করলে কি জলদস্যুর কাছে দিয়ে আসবেন আমাকে? "

সান্নিধ্য খানিক সেকেন্ড চুপ থেকে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। চাপা স্বরে বলে," মোটেই নাহ। আমার বউকে কারো কাছেই দেওয়া যাবে না।"

শেহরিন দু'হাতে সান্নিধ্যের পেটের ভাঁজে হাত রেখে পিঠের উপর মাথা রাখে। ঠোঁট টিপে হাসতে থাকে তার নেতাসাহেবের উত্তরে।

" কিছু খাবে? "

"ফুচকা পাওয়া যাবে? "

" তোমরা কি ফুচকাওয়ালাদের রাতে ঘুমাতেও দিবে না।"

" ফুচকার উপরে কিছু নেই। আপনি খান না?"

" আমি এসব খাই না।"

" ভালো জিনিস খাবেন কেন।"

" বউ ছাড়া অতিরিক্ত ভালো জিনিস আমার সহ্য হয় না। মাথাটা এদিকে আনো একটু।"

সান্নিধ্যের কথামতো শেহরিন মাথাটা বাড়িয়ে দিতেই সান্নিধ্যে ছোট করে চুমু দিয়ে বলে, "এতোরাতে ফুচকা এনে দিতে পারছি না জন্য সরি। তার বদলে এটা সান্ত্বনা হিসেবে নাও ।"

অদূরে মাছ ধরার নৌকার টিমটিমে আলো সেই সাথে সমুদ্রের গর্জন ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে থাকে। বাঁধাহীনভাবে ছুটে চলছে বাইক। রাস্তার দুই পাশে সবুজ গাছ আর ল্যাম্পপোস্টের আলোর দিকে তাকালে মনে হচ্ছে তারাও তাদের সাথে ছুটছে দ্বিকবিদিক ভুলিয়ে। শেহরিন আকাশপানে তাকিয়ে থাকে। মনের ভিতরটা তার স্বতঃস্ফূর্ত ঢেউ খেলছে। এই অনাবিল সুখ তাকে সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। ঠোঁট নাড়িয়ে বিরবির করে বলে উঠে,

" কঠিন পুরুষ আপনি নেতাসাহেব। কঠিন সমীকরণে বাঁধা আপনার ভালোবাসা। প্রতিটা দিন আপনাকে আমি নতুন করে চিনে চলেছি। আর এই চেনাটা চলমান থাকুক জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অব্দি।"

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি গল্পটি মাহরিণ তৃণ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প