|বিকেল চারটা, স্যানমার ওশেন সিটি শপিংকমপ্লেক্স|
গোধূলিকালে শ্রাবণের দূর পাল্লার মেঘকে সরিয়ে সানজির প্রণয়ের সাক্ষীদাতা হিসেবে আজ হাজির হয়েছে বিশেষ দু'জন অতিথি। তন্মধ্যে একজন সে সম্পর্কে অবগত না থাকলেও আরেকজন অবগত থেকেও বেশ কুন্ঠায় জর্জরিত। হয়তো খানিকটা লজ্জায় আসক্ত হয়ে আছে। নব পরিচিত মানুষটার সঙ্গে আজ সামনাসামনি প্রথম দেখা হবে বলে কথা।
" ভাবিজান আমার চেয়ে দেখছি তুমি বেশ নার্ভাস ফিল করছো।"
" আপু.."
" বলুন।"
" আমি আর তাসিন প্লে জোনে যাই। তুমি ভাইয়ার সাথে কথা বলে এসো না হয়।"
" দেখা করবে না?"
" আজকে না করি? "
সানজি সরু চোখ করে তাকায় শেহরিনের পানে। হাঁটা থামিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে দু হাত কোমড়ে চেপে বলে, " এসব উল্টো পাল্টা কথা বাদ দাও মেয়ে। আজকে তোমাদের সঙ্গে মিট করাবো জন্য উনাকে আসতে বলেছি। উনি নিজেও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তোমাদের সঙ্গে মিট করবে বলে। ফুড কোর্টে যেতে লাগবে আর মাত্র পঞ্চাশ সেকেন্ড। এখন বলছেন আপনি প্লে জোনে যাবেন? "
" ভয় লাগছে একটু.. "
" উনি কি তোমাকে বকা দিবে? "
শেহরিন সঙ্কোচিত দৃষ্টি নিয়ে সানজির পানে তাকায়। মৃদু স্বরে জবাব দেয়, " না। "
" তাহলে?? নেতা সাহেবের বউ হয়ে আপনি এতো ভীতু কেন হ্যাঁ?"
" ভীতু নয় আপু আসলে একটু হেজিটেড ফিল করছি।"
" মিট করেই দেখো একবার। সব হেজিটেড কেটে যাবে। আসো।"
" ফু'মণি ইয়ো পানি আমরা কোথায় যাচ্ছি? চাইনিজ খাবো না?"
" হু চাইনিজ খেতেই যাচ্ছি।"
"আমি কিন্তু ক্রিসপি চিকেন খাবো। "
"টাকা এনেছিস সাথে? "
তাসিনের ডান হাতটা শেহরিনের হাতের মাঝে আবদ্ধ। বাম হাত দিয়ে সে চলাপথে পরনে জিন্সের হাফ প্যান্টের পকেট হাতড়াতে থাকে। টাকা খোঁজার উদ্দেশ্যে অভিযান সম্পন্ন করে উদ্ধার করে দুই টাকার নোট। সঙ্গে সঙ্গে মুখে ফোটে তার অদম্য হাসি।
" আছে টাকা।"
" রেখে দে। আজকে বিল তুই দিবি।"
রুফটফে বিশাল ফুড কোর্টে এসে উপস্থিত হয় তিনজনে। বিকেলের সময়টাতে মোটামুটি ভিড় কম রয়েছে। সন্ধ্যার পর হতে জনসমাগের আমেজ লাগবে। ফাঁকা দেখে একটা সুন্দর জায়গা সিলেক্ট করে সেখানে বসে পড়ে সানজি আর তার দুই বিশেষ অতিথি।
" বেবি মানকি আশেপাশে তাকিয়ে দেখ তোর সমান ফুটফুটে কতগুলো সুন্দরী মেয়ে এসেছে। কোনটা পছন্দ হয় দেখে জানা।"
তাসিন মাথা ঘুরিয়ে উৎসুক নজরে পুরোটা চক্কর দিয়ে দেখে। অদূরে সিটে তার ক্লাসমেট আদিবাকে চোখ পড়লেও তা এড়িয়ে যায় সে । কতক্ষণ বাছ বিছার করে জোরগলায় বলে, "একটাকেও নয়। আমার ইয়ো পানিকেই পছন্দ হয়েছে শুধু।"
" আমাকেই পছন্দ হয়েছে তোমার? "
" হু তোমাকেই।"
শেহরিন সানজি মুখ টিপে হাসে। পিছন ঘুরে আদিবা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে, " আদিবাকে পছন্দ হয় না? "
" হয়। কিন্তু ও তো আমার মতো বেডে মু'তু করে। "
" হুঁশ কে বলেছে তোকে? "
" স্কুলে আদিবার মামণি আমার মামণিকে বলেছে। আমি শুনেছি।"
"খারাপ কি? নিজে যে মু'তু করিস সেটা কিছু না আদিবা করলেই দোষ? "
" ওহহো ফু'মণি তুমি বুঝবে না এসব। বড় হও আরো। "
চলমান খুঁনসুটির মাঝে ওয়েটার এসে হাজির হয়। মেনু কার্ড উল্টে পাল্টে বেশকিছুক্ষণ সময় নিয়ে অবশেষে দেওয়া হয় অর্ডার।
"তুই যে গণহারে অর্ডার দিচ্ছিস খেতে পারবি? "
" পারবো। ইয়ো সানি বলেছে বেশি বেশি খেলে আমি তার মতো ইয়ে বড় হয়ে যাবো।"
" এতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে কি করবি তুই ? "
"কেনে ইয়ো পানিকে বিয়ে করবো।"
শেহরিন টেবিলে হাত রেখে হালকা কপাল চাপড়ে। শ্রান্ত কন্ঠে বলে, " বাবা ইয়ো পানিকে বিয়ে করার ভূতটা মাথা থেকে নামিয়ে ফেলো। তোমার ইয়ো পানির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। আর বিয়ে একবারই করতে হয় সবাইকে।"
" বিয়ে একবার করতে হয়? "
" হ্যাঁ একবার করতে হয়।"
" দুই বার করলে কি হবে? "
" দুইবার করলে সবাই পঁচা বলবে। বকা দিবে।"
তাসিন গোল গোল চোখ করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শেহরিনের কথা শ্রবণ করে। অতঃপর কিছু একটা ভেবে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। দু-হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দু'দিকে ছড়িয়ে প্রফুল্ল গলায় বলে,
" তাহলে আমি দুইবার বিয়ে না করে অনেক বার বিয়ে করবো। অনেকবার বিয়ে করলে তো কেউ পঁচা বলবে না। বকা দিবে না তাই না?? ইয়েএএ.."
অখন্ড যুক্তি। যার নেই কোনো ব্যাখা। দু প্রান্তে বসা দুই রমণী প্রগাঢ়চিত্তে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। তাদের বুঝানোর সব ধাপ পার হয়ে গিয়েছে। আর কিছু বলার নেই। এখন একমাত্র উপায় নেতাসাহেব। শুধু মাত্র তার ট্রিটমেন্টেই এই বান্দা সোজা হবে। নয়তো সব পথ অন্ধকার।
" থাক বাদ দাও। ওকে এসব বুঝিয়ে কিছুই হবে না।"
" তাইতো দেখছি। কিন্তু তোমার সে এখনো আসছে না কেন আপু ? "
" এসে গিয়েছে প্রায়।"
" কে আসছে ফু'মণি?"
" নতুন একটা আংকেল আসছে তোর বাবা। "
" নতুন আংকেল? "
" হু।"
" পুরাতন আংকেল কেন আসছে না ? "
"এই ব্যাটা চুপ। খালি আজে বাজে বকা। যা তোর ফ্রেন্ডের সাথে মিট করে আয়।"
" যাবো না। আমার ক্ষুধা লেগেছে ফু'মণি।"
শেহরিন তাসিনকে টেনে নিয়ে নিজের কোলে বসায়। ফর্সা গালে আদুরে চুমু দিয়ে চুলে আলতো হাত নেড়ে দিয়ে বলে, " আহারে ক্ষুধা পেয়েছে তোমার? এইতো ওরা খাবার দিয়ে যাবে এক্ষুণি। একটু ওয়েট করি? "
তাসিন শেহরিনের হাতে পরিহিত গোল্ডেন স্ট্রাপের ঘড়িটার ডায়ালে আঙুল দিয়ে খুঁট খুঁট করতে থাকে। ঘড়ির কাঁটাগুলোর চলনক্রিয়ায় তার পূর্ণ মনোযোগ। একটা কাঁটা স্থির হয়ে আছে তো আছেই। আরেকটা জোরগতিতে ছুটছে।
" ইয়ো পানি এটা শুধু লাফাচ্ছে কেন? "
শেহরিন ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার দিকে নজর দেয়। হেসে বলে," কারণ এটা হচ্ছে তাসিন। তাসিন তো সবসময় এমন করে লাফায়।"
" আমি? "
" হ্যাঁ তুমি।"
" তাহলে এটা তুমি। সবসময় চুপ হয়ে থাকো।"
" আচ্ছা এটা আমি।"
সানজি ফোন হতে দৃষ্টি তুলে পিছু ঘুরে তাকায়। অবশেষে যার জন্য অপেক্ষায় সময় গুণে চলছিলো সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি এসে ধরা দেয়। সাদা টি শার্ট কালো প্যান্ট পরিহিত মানবটি তাকে দেখা মাত্র হালকাভাবে হাত নেড়ে অভিবাদন জানায়। ধীর পায়ে এগিয়ে আসে তাদের টেবিলের কাছে।
" হ্যালো এভ্ররিবডি।"
শেহরিন তাসিন একযোগে মাথা তুলে তাকায় পুরুষালি কন্ঠস্বর পেয়ে । সামনে দাঁড়ানো মানবটাকে দেখা মাত্র কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে উঠতেই সানজি ধীর কন্ঠে বলে, " মুহিদ।"
শেহরিন অল্পবিস্তর হেসে জবাব দেয়, "হ্যালো। "
গোলাকার টেবিলে মুহিদ চেয়ার টেনে বসে সানজির পাশে। এতোক্ষণ উৎফুল্ল মেজাজে থাকা রমণী প্রিয় পুরুষ আসাতে হুট করে কিছুটা দমে যায়। পরিচয় পর্ব সাড়তে নমুজ কন্ঠে বলে, " সান্নিধ্য ভাইয়ার ওয়াইফ। "
" তুমিই শেহরিন? সরি নাম ধরে বললাম, বয়সে অনেক ছোট হবে। "
" জ্বি। সমস্যা নেই ভাইয়া।"
" আর এটা নিশ্চয়ই তাসিন? "
" হ্যাঁ।"
" তুমি নতুন আংকেল? "
মুহিদ একনজর সানজির পানে তাকায় তাসিনের কথা বুঝতে না পেরে। সানজি ঠোঁট চেপে হেসে বলে, " আপনাকে নতুন আংকেল বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি।"
" ওহ আচ্ছা। এবার বুঝতে পেরেছি।"
মুহিদ বিস্তর হেসে তাসিনের দিকে হাত বাড়ায় করর্মদনের জন্য। হাসিমুখে বলে, " হ্যাঁ আমিই তোমার নতুন আংকেল।"
তাসিন বাড়ানো হাতে হাত রেখে হ্যান্ডশেক করে। কপাল ভাঁজ করে বলে, " তাহলে পুরাতন আংকেল কে জানো তুমি? "
" আহ্ পুরাতন আংকেল? "
" হু।"
" পুরাতন আংকেল যে কে.. "
" ওর কথা ধরবেন না প্লিজ। রাজ্যের উদ্ভট কথা শুধু ওর মুখ দিয়েই বের হয়। যাই হোক, আপনার এতো সময় লাগলো কেন আসতে? "
" সরি। একটু আটকে গিয়েছিলাম কাজে।"
শেহরিন তার সূক্ষ্ম নজরে সানজি আর মুহিদকে কিছুটা সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে যায় । সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে। যেমনটা ভেবেছিলো সেরকমটা নয় ভেবে ভালো লাগে । আসাপথে সানজি জানিয়েছিলো মুহিদ বেশ ওপেন মাইন্ডেড। সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে। কথা বার্তায় একদম অল্প সময়ের মাঝেই পরিচিত করে তোলে নিজেকে।
আর এতেই শেহরিন একটু ঘাবড়ে যায়। অতিরিক্ত ফ্রি মাইন্ডেড তার পছন্দ নয়। তাও সেটা প্রথম সাক্ষাৎতেই। স্বল্প সময়ে পরিচিত হয়ে গায়ে পড়া বা লাগামহীন কথাবার্তা শুনতে সে অভ্যস্ত নয়। মনে মনে ভেবেছিলো হয়তো মুহিদও এমন ধরনেরই হবে। সেজন্যই সে একটু হেজিটেড ফিল করছিলো সাক্ষাৎ নিয়ে। তবে এখন ধারণাটা মোটামুটি কেটে গিয়েছে। কথা বার্তায় বা দৃষ্টিতে শালীনতা রয়েছে বেশ।
" আচ্ছা আমরা নিজেদের কথা রাখি। এই যে আমার অতি আদুরে ভাবিজানের সঙ্গে আলাপচারিতা সম্পন্ন করুন। সে তো আসতেই চাচ্ছিলো না।"
" ভাবিজান? "
" বয়সে ছোট কিন্তু সম্পর্কে তো বড়।"
"তাহলে তো আমাকেও ভাবিজান বলে ডাকতে হচ্ছে। অবশ্য নাম ধরে ডাকার চাইতে ভাবিজান ডাকটা বেশি শ্রুতিমধুর। এটাই লক করি তাহলে? "
শেহরিন বুঝতে পারে না কি প্রতিত্তুর দিবে। নিজেকে একটু হালকা করার চেষ্টা করে সে। মুখে ক্ষীণ হাসি রেখে তার স্বভাবসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ছোট করে বলে, "আচ্ছা।"
" ভাবিজান কাইন্ডলি আমাকে একটা হেল্প করুন।"
" জ্বি? "
মুহিদ সানজির দিকে তাকিয়ে বলে," উনাকে একটু বিয়ের বিষয়টাতে রাজি করান প্লিজ। আমি বলতে বলতে ক্লান্ত। "
" আবার? আচ্ছা আপনার কি বিয়ে ছাড়া আর কোনো কথা নেই? সারাক্ষণ শুধু এই কথা জঁপে বেড়াচ্ছেন? "
" দেখেছেন ভাবিজান? বিয়ের কথা বলা কি অন্যায়? "
" বিয়ে? "
তাসিন নিজমনে খেলা ছেড়ে চক্ষু মেলে তাকায়। অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে, " ফু'মণি তুমিও বিয়ে করবে? "
" না বাবা। তোর এই নতুন আংকেল বিয়ে করবে।"
" কাকে বিয়ে করবে? "
মুহিদ অকপটে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, " তোমার ফু'মণিকে।"
তাসিন খানিক সেকেন্ড নিরব থেকে পুরো বিষয়টা মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। অতঃপর নিরস স্বরে বলে, " যাকে খুশি বিয়ে করো তোমরা কিন্তু আমার ইয়ো পানির দিকে কেউ তাকাবে না। এমনি ইয়ো সানি তাকে বিয়ে করে ফেলেছে। আর কাউকে বিয়ে করতে দেওয়া যাবে না। বুঝতে পেরেছো? "
"পেরেছি।"
" তাসিন বাবা তুই মুখটা বন্ধ করে গেম খেল আয়।"
" তোমার ফোনটা দাও তাহলে। "
বেবি মানকিটার এলোমেলো কথা এড়াতে সানজি ফোন বের করে দেয় তাকে। শেহরিনের কোল হতে নেমে সে পাশের চেয়ারটায় দুপা ছড়িয়ে আরামে গেম খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আপাতত সময়ের জন্য ক্যাসেটটা বন্ধ করতে পেরে সানজি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
অন্যদিকে শেহরিন ও কিছুটা সময়ের ব্যবধানে খাপ খাইয়ে নেয় সবার মাঝে। মুহিদের বলা কথায় ফিরে গিয়ে সরল কন্ঠে বলে,
"অন্যায় নয় তবে আপনারা কি দু'জন দুজনকে পর্যাপ্ত চিনেছেন বা জেনেছেন?"
" আমার দিকে কোনো সমস্যা নেই ভাবিজান। আমি যতটুকু চিনেছি ততটুকুতে পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারবো অনায়াসে। কিন্তু ম্যাডামের হয়তো এখনও আমাকে পুরোপুরি চেনা হয়নি। অপরিচিতই রয়ে গেলাম।"
" মোটেও নয়। আমি কি তাই বলেছি নাকি?"
" তাহলে দয়া করছেন না কেন? "
" আপনার সাথে আমার যে রিলেশন এটা একমাত্র ভাবিজান ছাড়া পরিবারের আর কেউ জানে না৷ এখন আমি কি তাদের গিয়ে হুট করে বলতে পারবো পাত্র রেডি বিয়ে করতে চাই। আমার যে দুইভাই। তাদের তো আপনি চিনেন না৷ বিয়ের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে এক সেকেন্ডের মাঝে পাতাল ফুঁড়ে বের করে নিয়ে আসবে। "
" তাহলে তো আরো ভালো। সামনাসামনি একদম সাক্ষাৎ হয়ে গেলো। "
সানজি দাঁতে দাঁত পিষে বলে, " এতো কনফিডেন্স পাচ্ছেন কিভাবে? "
" এমপি সাহেবকে দেখে। সরি ভাবিজান কিছু মনে করবেন না, একটু ওপেনলি কথাটা বলছি। আপনার আর আপনার এমপি সাহেবের প্রেমের গল্প উনি আমাকে শুনিয়েছে। ইভেন এমপি সাহেব আপনার জন্য কতটা ডেস্পারেট ছিলো সেটাও বলেছে। প্রেমসেম হতে না হতেই সে আপনাকে একদম নিজের করে নিয়ে ফেললো। বলুন এটা দেখে কি আমার ইন্সপায়ার হওয়া উচিত নয়? "
শেহরিন ক্ষীণ দৃষ্টিতে সানজির দিকে তাকায়। মুখোরেখায় তার হালকা লাজের ভার এসে জমে। তার নেতাসাহেব তো হিতে বিপরীতে চলা এক মানব। তাকে নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর এখন সে কি দিবে?
সংকটপূর্ণ এই পরিবেশে হাজির হয়ে যায় ওয়েটার। হাতে খাবারের প্লেটার। একে একে সার্ভ করে দিয়ে যায় নানান রকম চাইনিজ আইটেম। আর এতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে নাজুক কায়া। তাসিনের জন্য প্লেট নিয়ে সে খাবার তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
" শুনুন ভাবিজানকে বলে লাভ নেই। এতো উতলা হওয়ারও প্রয়োজন নেই। "
" অবশ্যই প্রয়োজন আছে। এক বছর হতে চললো।"
" ওহ তার মানে আজকে ভাবিজানের সঙ্গে মিট করার এটাই ছিলো আপনার মেইন উদ্দেশ্য? "
মুহিদ সানজিকে খাবার সার্ভ করে দিয়ে হাসতে হাসতে বলে, " বলতে পারেন। ভাবিজানের মতামত শোনার অপেক্ষায় আছি৷ পজিটিভ সাইন পেলেই আপনার বাসায় গিয়ে হানা দিবো। "
" ভাইয়া আমার মতামতের উপর দয়া করে ডিপেন্ড করবেন না প্লিজ। আমিও আপনার মতো নতুন সদস্য। তার চেয়ে বরং বড় ভাইয়াকে বলতে পারেন। ভাইয়া ঠান্ডা মাথার মানুষ। আই থিংক আপনার জন্য উনিই বেটার।"
" এমপি সাহেব? "
" শুধু শুধু আগুনে ঘি ঢালার কি প্রয়োজন? উনাকে সময়মতো জানালেই হবে। "
" আচ্ছা আপনার কথাই গ্রাহ্য করলাম। তবে প্লিজ ভাবিজান এই ম্যাডামকে একটু বোঝান।"
বিয়ে বিষয়াদি নিয়ে আলাপচারিতায় কেটে যায় অনেকটা সময় ।সেই সাথে চলতে থাকে খাওয়া দাওয়া নানান গল্প গুজব। গোধূলির আকাশে এখন সন্ধ্যার আঁধার জমতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে চারদিকে বাড়তে থাকে জনসমাগমের অস্তিত্ব। ভেসে আসতে থাকে গমগমে কথা বার্তা আর হালকা মিউজিকের সুরেলা শব্দ।
সুখনিবাস হতে এসেছে ফোন। সানজি রিসিভ করা মাত্র অপর পাশ হতে মিসেস নাজনীন কড়া গলায় বলে উঠেন, " বেরিয়েছো তিনটার দিকে এখন বাজে ছয়টা। বাসায় আসার পথ কি ভুলে গিয়েছো? "
মায়ের কড়া ধমক খেয়ে সানজি থতমত খায়। নরম গলায় বলে, " এইতো আসছি।"
" আমার যেনো দ্বিতীয়বার ফোন করতে না হয়।"
" আচ্ছা।"
আজকের মতো পরিচয় পর্ব সাক্ষাৎসহ বিয়ে নিয়ে সমস্ত কথাবার্তা শেষ হয়। মুহিদের হতে বিদায় বার্তা নিয়ে শেহরিন তাসিনকে নিয়ে উঠে পড়ে। সানজি নিজেও আর ব্যক্তিগতভাবে সময় নেয় না মুহিদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার। একই সঙ্গে পা বাড়ায় প্রস্থানের উদ্দেশ্য। আসলেই অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে কথা আড্ডার মাঝে । ফলপ্রসূ মা জননী গিয়েছে ক্ষেপে। আর দেরি করা যাবে না মোটেও।
পার্কিং লট হতে গাড়িতে উঠা মাত্র তাসিন কপাল চাপড়ে বলে,
" ওহহো ইয়ো পানি তোমাকে তো একটু শপিং করে দেওয়াই হলো না। "
" শপিং?? "
" হ্যাঁ। বাবা তো মামণিকে নিয়ে আসে এখানে। অনেক শপিং করিয়ে দেয়।"
" তোর এটা নিয়ে ভাবতে হবে না। ইয়ো পানির শপিং করিয়ে দেওয়ার জন্য ইয়ো সানি রয়েছে। বাসায় চল আগে। "
" আমি একটু শপিং করে দিবো না? "
" কতটাকা আছে তোর কাছে? "
তাসিন একটু বাঁকা হয়ে তার প্যান্টের বাম পকেট হতে দুটাকার চকচকে নোটটা বের করে। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে, " এই যে দুই টাকা। বাবা দিয়েছে। "
শেহরিন সানজি দুই টাকার নোটটা দখা মাত্র খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়া দেখে বেবি মানকি মুখ ভারী করে। চোখ পাকিয়ে বলে, " হাসছো কেন তোমরা? "
" এতোটাকা নিয়ে চলিস কিভাবে বেবি মানকি? ভয় করে না? চোর দেখলে তো নিয়ে যাবে। দুই টাকা আল্লাহ !! "
"এজন্য তো পকেটে লুকিয়ে রাখি।"
" দুটাকা দিয়ে ইয়ো পানিকে কি কিনে দিবি তুই?"
" ইয়ো পানি যেটা কিনতে চায়।"
শেহরিন আদুরে কন্ঠে তাসিনের কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলে," তোমার কিছু কিনে দিতে হবে না বাবা। তুমি যে বলেছো এতেই তোমার ইয়ো পানি অনেক খুশি হয়েছে। তুমি এই টাকাটা তোমার কাছে যত্নে রেখে দিও ঠিক আছে? "
" তাহলে হাসলে কেন তোমরা? "
" এমনি একটুখানি হেসেছি। আর হাসবো না সরি।"
তাসিন দুইটাকার নোটটার দিকে মনোনিবেশ করে। হরিণটা দেখে তার মনে বেশ কৌতূহল জাগে। নিজমনে ঠোঁট নাড়িয়ে বিরবির করে কিছু একটা বলতে থাকে সেদিকে তাকিয়ে।
" ভাবিজান এবার বলো কেমন দেখলে। লাইফ পার্টনার হিসেবে কি ঠিক আছে? "
শেহরিন সানজির দিকে গাঢ় নজর দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে, " দেখার কথা বললে বলবো ঠিক আছে। আমার কাছে তোমাদের দু'জনকে একসাথে বেশ ভালো লেগেছে। মানিয়েছে বেশ। কিন্তু লাইফ পার্টনার হিসেবে কেমন সেটা নিয়ে কোনো কথা বলার রাইট আমার নেই। এটা শুধু মাত্র তুমি ভালো বুঝতে পারবে আপু। কয়েক ঘন্টার আলাপনে গোটা মানুষটাকে অবজার্ভ করে তাকে নিয়ে মতমত দেওয়াটা ঠিক নয়। তোমার কাছে কি মনে হয় লাইফ পার্টনার হিসেবে সে ঠিক আছে তোমার জন্য ? "
" আমি এখনো পর্যন্ত ওর ভিতরে সেরকম নেগেটিভিটি পাইনি৷ এক বছরের পরিচয় আমাদের। এর মধ্যে সেদিন ফার্স্ট মিট হয়েছে। আর আজকে হলো সেকেন্ড মিট। এর আগে শুধু ফোনে কথাবার্তার মাঝেই সীমিত ছিলো। যতদূর চিনেছি জেনেছি আমার পজিটিভই লাগছে।"
" ভাইয়াও এমপি সাহেবের মতো বিয়ে করতে ব্যাপক ইচ্ছুক।"
" গত দুই মাস হলো সে বিয়ে নিয়ে পরেছে। এর মাঝে তোমাদের পরিণতি দেখে এখন দ্বিগুণ জোরাজোরি চেপেছে। "
" ভাইয়ার ফ্যামিলি জানে? "
"হ্যাঁ আন্টি আংকেল জানে। এমন কি আন্টির সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে একদিন।"
" ওরে বাবা তাহলে তো ওদিকটা একদম ক্লিয়ার।"
"মোটামুটি বলা চলে। "
" আচ্ছা আগে তো দেখতাম লং টাইম রিলেশন করে সবাই বিয়ের দিকে ধাবিত হতো। এখন দেখছি রিলেশন যেনো তেনো বিয়ের দিকটায় সবাই ফোকাস করছে বেশি। "
" হতে পারে। জেনারেশন চেঞ্জেবল? "
" হতেও পারে আবার ব্যক্তিবিশেষ কিংবা পরিস্থিতিভেদেও হতে পারে। যাদের যেমনটা ইচ্ছে।"
" হু্ কিন্তু আমি ভাবছি বাসায় কিভাবে বলবো? আম্মা তো শুনেই বকা দেওয়া শুরু করবে শিউর। তোমার স্বামীর কথা বাদই দিলাম। সে শোনা মাত্র বলবে বিয়ে ক্যান্সেল। "
শেহরিন ভ্রু কুঁচকায় সানজির কথায়। জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, "কেন? ক্যান্সেল বলবে কেন?"
" বেশ কিছু কারণ আছে। তুমি তো রাজনীতির পরিবারে নতুন তাই বুঝতে পারছো না। ধীরে ধীরে বুঝে যাবে।"
"কিন্তু মুহিদ ভাইয়া যদি ভালো হয় তাহলে না করবে কেন? "
" দেখা যাক কি হয়। আগে কি তাহলে বড় ভাইয়াকে বলবো?"
"বড় ভাইয়া বাবা উনারা কোনো সমস্যা করবে না আমার মনে হচ্ছে। একটা কাজ করি বরং তুমি একদিকটা সামলাও আমি একদিকটা সামলাই। বড় ভাইয়াকে তুমি বলো আর আমি নেতাসাহেবকে একটু হালকা ইঙ্গিত দেই। তোমার বিষয়টা খোলাসা করবো না জাস্ট হিন্টস দিয়ে দেখবো তার এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া কেমন। তারপরে না হয় পরিস্থিতি বুঝে সময় নিয়ে বলা যাবে। "
" হু এটা দারুণ বলেছো। তুমি জাস্ট একটু টেস্ট করে দেখো কেমনভাবে নেয় সে । পুরোটা খোলাসা করার দরকার নেই। "
" আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি ভয় পেয়ো না। ভালো কিছুই হবে। "
"তাই যেনো হয়।"
_______________________________________
|সুখনিবাস, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা|
শপিংমল হতে বাসায় আসা মাত্র শেহরিন উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে অতঃপর আবার নিচে নামে। নেতাসাহেব কিচেনে যেতে মানা করেছে ঠিক কিন্তু সন্ধ্যার নাস্তা তৈরিতে টুকটাক কিছু কাজ তো করাই যায়।
পরীক্ষার বাহানায় একদম হাত গুটিয়ে বসে থাকাটা খারাপ দেখায়। হাজার হোক বাড়ির বউ সে৷ সংসারের কাজে একটু হাত স্পর্শ না করলে কেমন হয় ?
কিচেনে চা তৈরি করছেন মিসেস নাজনীন। সঙ্গে তিথি করছে ভেজিটেবল চাউমিন। শেহরিন ধীর পায়ে প্রবেশ করে সেখানে। কেনো জানি শাশুড়ী মা আর ভাবিকে দেখলেই তার মনের ভিতরে ভয় এসে জেঁকে ধরে। সহজ হতে পারে না কোনোভাবেই তাদের সামনে। সবসময় মনে হয় এক্ষুণি হয়তো বকা দিবে। বলবে, এখানে এসেছো কেন? তুমি তো কিছুই পারো না।
" তুমি? "
হঠাৎ শাশুড়ী মায়ের কন্ঠে অবচেতন মনের ভাবনা হতে বেরিয়ে আসে নববধূ। ঈষৎ কেঁপে উঠে তার পানে তাকায়। একই সাথে তিথিও পিছু ফিরে চায়।
" আম্মা.. আমি একটু কিছু করি? "
"কি করবে তুমি? "
"একটু হেল্প করি আপনাকে? "
"হেল্প লাগলে তো করবে। আর আপাতত কোনো হেল্পের প্রয়োজন নেই। সবকিছু রেডি প্রায়।"
তিথি মনোব্রত পালন করে নিজ কাজে মনোযোগ দেয়। মনে মনে বিদ্রুপস্বরে বলে, " কাজ শেষ এখন এসেছে হেল্প করতে। যতসব অজুহাত। "
" আমি নিয়ে যাবো এগুলো টেবিলে? "
" না গরম সবকিছু পারবে না তুমি। লতা নিয়ে যাচ্ছে। "
শেহরিন চারপাশে খুঁজেও আর তেমন কোনো কাজ পায় না। সবশেষে তিথির দিকে তাকিয়ে বলে, " ভাবি কিছু করে দিতে হবে আপনাকে? "
তিথি মুখফুটে একটা ভারী কাজের কথা বলতে যাওয়া মুহুর্তে মিসেস নাজনীন সুস্পষ্ট কন্ঠে বলেন," তোমাকে এখন কাজ করতে হবে না৷ তোমার পরীক্ষা কবে থেকে শুরু?"
" জ্বি পরশুদিন হতে। "
" ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসো। নাস্তা করে নিজ রুমে চলে যাও। পরীক্ষা চলাকালীন কোনো কাজের মধ্যে আসতে হবে না তোমাকে।"
শাশুড়ী মায়ের কথায় একসঙ্গে দুই বউ দু'কারণে অবাক হয়ে যায়। বাড়ির বড় বউ বিস্মিত নয়নে শাশুড়ী মায়ের শেহরিনের প্রতি আজকে এতো দরদি কথা শুনে চোখের পলক ফেলতে ভুলে যায়। অপরদিকে নববধূ একটুখানি স্নেহের আভাস পেয়ে আরো নাজুক হয়ে উঠে।
" কি ভাবছো? "
" না কিছু না।"
শেহরিন কিচেন হতে প্রস্থান নেওয়ার জন্য পা বাড়ায়। মনের মধ্যে তার অজস্র প্রশ্ন। নেতাসাহেব কি তাহলে উনাকে বলেছেন কিচেনের নিষেধাজ্ঞার কথা? যার কারণে বারণ করলেন। কিন্তু যদি করেই থাকেন তাহলে তো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। মনোক্ষুণ্ণ হওয়াটাও তো প্রায় স্বাভাবিক। হলো না কেন?
" শেহরিন।"
হঠাৎ পিছু ডাকে শেহরিন চোখ বড় বড় করে তাকায়। এই প্রথম মিসেস নাজনীন তাকে নাম ধরে ডাকলেন। এই প্রথম। এতোদিন তো ঠিকভাবে কথাই বলতেন না। নাম ধরে ডাকা তো অনেক দূরে। শেহরিন প্রথমে বিষয়টি ধরতে পারিনি। তবে, সংসারে কিছুদিন যেতেই সে বিষয়টা লক্ষ্য করেছে। তিথি ভাবিকে যেমনভাবে সমাদর করে সেটা সে নিজে পায় না। যার কারণে মনে মনে ধরেই নিয়েছিলো হয়তো শাশুড়ী মা তাকে কোনো কারণে পছন্দ করেন না।
অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে পিছু ফিরে চায় সে। জড়িয়ে আসা কন্ঠস্বর উন্মুক্ত করে বলে, " জ্বি আম্মা।"
" দুধ বা বয়েল ডিম খাও? "
শেহরিনের মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে আসে। অবলা মুখোরেখায় তাকিয়ে থাকে শুধু। সে কি দুধ বা বয়েল ডিম খায়? খেয়েছে কি কখনো? নাকি আজকেই প্রথম শুনছে এই নামগুলো?
" খাও?"
" জ্বি..খাই।"
" আচ্ছা সকালে লতা গিয়ে উপরে ব্রেকফাস্ট দিয়ে আসবে। তোমার নিচে নামার প্রয়োজন নেই। তোমাদের বয়সের অনেক ছেলে মেয়েরাই তো দুধ ডিম খেতে পছন্দ করে না। তাই জেনে নিলাম।"
" আচ্ছা।"
এই মুহুর্তে শেহরিনকে যদি কেউ জিজ্ঞেসা করতো , সে যে দুধ ডিমের কথায় একবাক্যে রাজি হলো আদৌও সে কি জেনে বুঝে উত্তরটা দিয়েছে নাকি আবেগের বশে। তাহলে নিশ্চিত সে সত্য স্বীকারোক্তি দিতো জেনে-বুঝে উত্তরটা দেইনি তবে এই প্রথম শাশুড়ী মায়ের যত্নের লোভ সামলাতে পারেনি। এটা যে তার কাছে আমাবস্যার চাঁদের ন্যায় মহামূল্যবান এক প্রাপ্তি। হারায় কি করে সে? এইটুকু পাওয়াই যে তার সকল চাওয়া পূর্ণ করে।
সন্ধ্যার নাস্তার পুরোটা সময় আজ অন্যরকম কাটে শেহরিনের। এক মনোমুগ্ধকর আবেশে সে ভেসে বেড়ায় আকাশে বাতাসে।
মুখ হতে তার হাসি যেনো সরেই না। কোনমতে চা টা শেষ করেই সে কক্ষে এসে নিজেকে বন্দি করে নেয়। কারণ, সবার সামনে নিজের এই ভালো লাগাটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হচ্ছিলো না । এখন নিজকক্ষে আপন ভাবনায় ডুব দিবে সে নিজের মতো করে।
------------------------------------------------------
রাত তখন এগারোটা। প্রতিদিনের মতো আজকেও টেবিলে বসে বইয়ের পাতায় ডুব দিয়ে আছে শেহরিন। তবে মনোযোগটা একটু অন্যদিকে তার। কলম হাতে নোটপ্যাডে আনমনে আঁকিবুঁকি করে যাচ্ছে সে।
পিছন সোফায় বসে আছে সান্নিধ্য। দু পা ছড়িয়ে কোলের মাঝে ল্যাপটপ নিয়ে নিজস্ব কিছু কাজে সে বেশ ব্যস্ত। বাসায় ফিরে শাওয়ার সেড়েই মগ্ন হয়েছে কাজে। পড়নে তার পছন্দের ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি সঙ্গে ধূসর ট্রাউজার।
শেহরিন এক পলক পিছু ফিরে তাকায় তার নেতাসাহেবের দিকে। সৌম্য চেহারার পুরুষ মানুষটার মুখজুড়ে শীতলতার ছায়া বিরাজ করে আছে। কপালে নেই কোনো রাগ কিংবা ক্রোধের ভাঁজ। এক ধ্যানে সে তার আপনকাজে নিজেকে রেখেছে ব্যস্ত। ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ঝুলিয়ে শেহরিন কিয়ৎক্ষণ তার নেতাসাহেবকে দেখা শেষে ঘাড় ঘুরিয়ে নেয়। পরিবেশ পরিস্থিতি ঠান্ডা। সানজি আপুর কথাটা বলার মোক্ষম সময় হলেও একটা কাজ আগে সম্পাদন করবে বলে সে মনস্থির করে নেয়।
স্তরে স্তরে সাজানো বইয়ের ভাঁজ হতে তার পিংক কালারের ডায়েরিটা বের করে নেয়। সাত হতে আট বছর হতে চললো ডায়েরিটার বয়স। বাবা জন্মদিনে গিফট করেছিলো তাকে। সেই থেকে এই ডায়েরিটা তার অমর সঙ্গী। সঙ্গোপনে হাজারো কথা, হাজারো স্মৃতি লিপিবদ্ধ করে রেখেছে সে এখানটায়।
ধীর হাতে পৃষ্ঠা উল্টায় শেহরিন। আজকের তারিখ অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠা বের করে নেয়। টেবিল ল্যাম্পের ঝকঝকে আলো দ্বিগুণহারে তার মুখোরেখাকে উজ্জীবিত করে তোলে। হাতে কলম খানা নিয়ে শুরু করে তার লেখা,
❝ আম্মা ❞
অধিক খুশিতে সূচনা ভুলে যাচ্ছি। সন্ধ্যা থেকে আপনাকে নিয়ে মনের মধ্যে অজস্র কথা সাজিয়ে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু খেঁই হারিয়ে ফেলছি অকারণেই। আমি কৃতজ্ঞতা শব্দটুকুর মাঝে কেনো জানি, সীমাবদ্ধ হতে পারছি না। শেষ অস্ত্র হিসেবে তাই কলম আর ডায়েরিকে তুলে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও খুঁজে পেলাম না। আপনার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে ভালোবাসা জাহির করার মতো সাহস আমার নেই। তবে, আজকে আপনি আমাকে যে স্নেহটা দিয়েছেন, আমাকে নাম ধরে ডেকেছেন সেই খুশিটা আমি নিজের মাঝে আবদ্ধ করে রাখতে পারছি না কোনোভাবেই। আমার চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরে পড়ছে খুশিতে। ব্যস্ত হয়ে হাত দিয়ে শুধু মুছে যাচ্ছি নিভৃতে। আজকের দিনটা আমার জন্য এতোটা ভালো ছিলো যে, মনে হচ্ছে সবকিছু হয়তো কল্পনা। আমার মতো নগন্য অদক্ষ ছেলের বউকে আপনি যে এইটুকু ভালোবাসা দিয়েছেন আমি বিড়ম্বনায় পড়ে যাচ্ছি কি করা উচিত আমার !!
আমার নিজেকে ভীষণ লোভী মনে হয় আজকাল। আপনাকে দেখে মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার লোভটা আমাকে আরো যেনো ছন্নছড়া করে তুলছে । আমার ইচ্ছে আছে, ভাবির মতো সব কাজ শিখে আপনার থেকে ভালোবাসা স্নেহ আদর কুড়িয়ে নিবো। মায়ের মমতায় অন্যসবার মতো আমিও ভাগ বসাবো। আমি শুধু একটুখানি আপনার মাঝে আমার মামণির প্রতিচ্ছবি আঁকতে চাই। স্বতঃস্ফূর্তভাবে "আম্মা " ডাকটা ডাকতে চাই। চ্যালেঞ্জ নিতে চাই শাশুড়ী মা ও মা হয় নিজের মায়ের মতো।
আজকে যখন আপনি খাওয়ার বিষয়টা আমাকে বললেন, আমি এক মুহূর্তের জন্য আমার ছোটোবেলায় ফিরে গিয়েছিলাম। যেখানে মামণি আমাকে দুধ খাওয়ার জন্য কতো কি বলে মানাতো। কত গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে আহ্লাদিত করে তুলতো। কতগুলো বছর পর আবার এমনটা শুনলাম। আমার মন প্রাণ ভরে গিয়েছে আপনার এক ডাকেই।
আমি জানি না, মায়েদের আদর, মায়েদের কন্ঠ এতো কেনো সুমধুর হয়? আল্লাহ এতো কেনো মধুরতা ঢেলেছেন মায়েদের মাঝে? যেখানে বাবা কিংবা স্বামীর এতো অগাধ ভালোবাসা পেয়েও আমি লোভ সামলাতে পারছি না। আমি জানি না শুধু মাত্র আমিই এমন নাকি আমার মতো অনেকেই এমন আছে !!
The creator has bestowed a special grace upon the word ❝ Mother ❞.A small name but carries a heavy weight. The fragrance of a mother's body is enought to make a child emotional.
আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ হায়াত দান করুক। ভালো থাকুন সবসময়।
------- ❝শেহরিন❞
লেখা শেষে এক নজর সেদিক পানে তাকিয়ে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ফেলে শেহরিন। লম্বা করে শ্বাস টেনে নিজেকে সুস্থির করে নেয়। চোখের কোণে আনন্দ অশ্রুগুলো খুব সমাধানে মুছে সে ডায়েরিখানা বন্ধ করে ফেলে। অতঃপর যথাস্থানে রেখে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয় পরবর্তী কাজে। নেতাসাহেবকে সানজি আপুর প্রসঙ্গটা নিয়ে হালকা টাচ দিবে এখন । মুখে প্রফুল্ল হাসি বজায় রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
ঘড়ির কাঁটা বারোটার কাছাকাছি। সোফায় বসে কর্মরত নেতাসাহেবকে পিছন হতে দু'হাতে গলা জড়িয়ে ধরে শেহরিন। কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে মিহি কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, " কি করছেন? "
" একটা ডকুমেন্ট তৈরি করছি। তোমার পড়া শেষ হয়েছে? "
" হয়েছে আবার হয়নি। "
" ঘুমাবা? "
" না ঘুমাবো না।"
কিছু একটা বলতে গিয়ে শেহরিন থেমে যায়। থুতনিসহ গাল ভিজে উঠেছে তার সান্নিধ্যের ভেজা চুলে । সূক্ষ্ণ নজর দিতেই দেখে নেতাসাহেবের চুল এখনো শুকায়নি। পানির কণা গুলো এখনো হালকা জ্বলজ্বল করছে। গলা হতে দুহাত ছাড়িয়ে সে চুলগুলো নেড়ে দেয় আলতো করে। অতঃপর সোজা এসিটা বন্ধ করে ফ্যান চালু করে।
অব্যক্ত কথা উন্মোচন করতে শেহরিন নেতাসাহেবের পাশ এসে গুটিশুটি হয়ে বসে। হেলান দিয়ে সুঠাম বুকের পৃষ্ঠে মাথা রাখে সে।
সান্নিধ্য ডান হাত খানা কিবোর্ডের মাঝে রেখে বাম হাত দিয়ে তার জারুল ফুলকে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। ল্যাপটপের দিকে দৃষ্টি রেখেই মাথায় গাঢ় চুমু এঁকে দেয়।
" কতক্ষণ লাগবে কাজ শেষ হতে?"
"একটু সময় লাগবে।"
"ওহহো রাখুন আপনার কাজ। আমার ভীষণ দরকারী কথা আছে আপনার সঙ্গে।"
"আচ্ছা আমি শুনছি বলো তুমি।"
"না এভাবে হবে না। কাজ বন্ধ রাখতে হবে। "
"আচ্ছা পাঁচ মিনিট?"
"হুহ তাড়াতাড়ি করুন।"
ঘড়ি ধরে দেড়মিনিট পার হতেই শেহরিন ধৈর্য্যহারা হয়ে উঠে। নানানরকম ডকুমেন্টারি ফাইল পত্র হাবিজাবি দেখে সে কপাল কুঁচকে নেয়। সান্নিধ্যের বুকের মাঝে মুখ ডুবিয়ে বলে, " আজকে আমরা শপিংমলে গিয়েছিলাম। তাসিনকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম জানেন। বাচ্চাটা তো অনেক খুশি। কিন্তু ওকে আজকে কিছুই কিনে দিতে পারিনি। খালি হাতে বাসায় এসেছে। ভেবেছি এক্সাম শেষে কিছু একটা গিফট করবো।"
" হু "
"কি গিফট করা যায় বলুন তো? "
" হু।"
শেহরিন মুখ তুলে কপাল ভাঁজ করে তাকায়। বিরক্তিকর সুর তুলে বলে,
" হু হু করছেন কেন? আমার কথা শুনছেন না? "
সান্নিধ্য শিথিল চোখে তাকায় তার রাগিনী কামিনীর দিকে। নরম গলায় বলে, " ম্যাডাম পাঁচ মিনিট পরে আপনার সব কথা শুনছি। কথা বললে আমি কাজ করতে পারি না। প্লিজ।"
"আপনার পাঁচ মিনিট দশ মিনিট আগেই পার হয়ে গিয়েছে। পাঁচ মিনিট করে করে আপনি সারা রাত পার করবেন সেটা আমি ভালো করেই জানি। আর আমি চুপ করে থাকলে ঘুমিয়ে যাই। মুখ আমার চলবেই..
শেহরিনের চলমান কথায় সান্নিধ্য বহুকষ্টে দুই মিনিট কাজ করে হাল ছেড়ে দেয়। সামনে ছোট কাচের টেবিল হতে ফোনটা নিয়ে সে কল করে আরহামকে।
" আমি তোমাকে কিছু ডকুমেন্ট মেইল করেছি। ওগুলো আপাতত চেক করে সাবমিট করো। বাকিটা পরে দেখছি।"
" ওকে স্যার।"
সান্নিধ্য ফোন রেখে ল্যাপটপটা বন্ধ করে সরিয়ে রাখে। অতঃপর তার বক্ষস্থলে আশ্রয় নেওয়া রমণীর দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে , " দেখি এখন বলুন আপনার দরকারি কথা।"
" একটু পরে বলি। ভয় লাগছে।"
" দরকারি কথা যদি দরকারি না হয় তাহলে পানিশমেন্ট পেতে হবে। "
" এটা আবার কি নিয়ম?"
সান্নিধ্য পিঠের পিছন হতে কুশন সরিয়ে মাথার কাছে নিয়ে শুয়ে পড়ে। বুকের উপর তার নীমিলিত লোচনে তাকিয়ে থাকা রমণীকে স্থান করে দেয় সযত্নে। শেহরিন নেতাসাহেবের বুকের উপর শুয়ে গলার ভাঁজে মুখ লুকায়। ধীর কন্ঠে বলে,
" ভাইয়া ভাবীর বিয়েটা কি অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ?"
" হ্যাঁ। "
" আচ্ছা আপনার তো লাভ ম্যারেজ।"
"মোটেও আমার লাভ ম্যারেজ না। বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত গিয়েছে আমার তোমাকে রাজি করাতে।"
" আচ্ছা হাফ অ্যারেঞ্জ হাফ লাভ ম্যারেজ।"
সান্নিধ্য ভ্রু দ্বয় বাঁকা করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, " এগুলো তোমার দরকারি কথা? "
"রেগে যাচ্ছেন কেন? রেগে গেলে কিন্তু বলবো না।"
" রাগছি না। বলো তুমি।"
" হয়নি। ভালো করে বলুন।"
" আপনার উপর রেগে যাওয়া আমার জন্য কঠিনভাবে মানা ম্যাডাম। প্লিজ আপনি বলুন।"
" আচ্ছা হয়েছে এবার বলছি।"
শেহরিন কিছুটা সময় নিয়ে লুকানো মুখ তুলে তাকায় নেতাসাহেবের দিকে। ধীর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,"সানজি আপুরও কি অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হবে? "
" ভাগ্য থাকলে হবে। কেন?"
" এমনি জিজ্ঞেস করছি। ভাইয়ার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ, আপনার হাফ অ্যারেঞ্জ হাফ লাভ ম্যারেজ সেই হিসেবে কিন্তু সানজি আপুর লাভ ম্যারেজ হওয়া উচিত তাই না?"
সান্নিধ্য স্থির দৃষ্টিতে তাকায় শেহরিনের দিকে। দু'জোড়া চোখের মিলন ঘটতেই শুকনো ঢোক গিলে নিজের অভিব্যক্তি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায় রমণী। যে করেই হোক, নেতাসাহেব কে কোনোভাবেই বুঝতে দেওয়া যাবে না।
" ছেলেটা কে? "
"হু?"
" সানজির যাকে পছন্দ হয়েছে ছেলেটা কে?"
"হু?"
শেহরিনের মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে এক মুহুর্তে। বিস্ফোরিত নেত্রে সে তার নেতাসাহেবের দিকে তাকিয়ে থাকে। নির্নিমেষ চাহনিতে বুঝে উঠতে পারে না উনি বুঝে গেলেন কিভাবে। সে কি খুব খোলামেলাভাবে হিন্টস দিয়ে ফেলেছে?
" আ..আপনি বুঝলেন কিভাবে? শপিংমলে আপনার লোক ছিলো?"
"আমি বা আমার লোক আজকে চট্টগ্রামেই ছিলাম না। ইভেন এটাও জানতামই না তোমরা শপিং এ গিয়েছিলে আজকে । "
" তাহলে? "
" ব্যাসিক সেন্স।"
শেহরিন তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ে। ধূর্ত মস্তিষ্কের মানুষের বেড়াজালে কায়দা করে এসেও সে ফেঁসে গিয়েছে। উনার ব্যাসিক সেন্স স্ট্রং এটা সে জানে কিন্তু এতো যে অ্যাডভান্স সেটা তো জানতো না।
" আমার ঘুম পেয়েছে। আমি ঘুমাই। সরি আপনি আপনার কাজ করুন। "
" সরি বলে লাভ হবে না। আমার কাজের যে ক্ষতি করছো সেটার এখন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।"
" ক্ষতিপূরণ? "
"হ্যাঁ।"
" টাকা দিতে হবে? "
" উহু। অন্যকিছু। "
সান্নিধ্যের ইঙ্গিত বুঝতে পেরেই শেহরিন চোখ নামিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। ফের গলার মাঝে মুখ লুকিয়ে লজ্জায় আবিষ্ট হয়ে বলে, " মার্জনা করুন।"
" এক্ষেত্রে মার্জনা করতে হয় না ম্যাডাম।"