নির্বিঘ্নে কেটে যায় মাঝখানে দুটো দিন। ঘড়ির কাঁটার মৃদু ছন্দে পার হচ্ছে এখন রাতের মধ্যেভাগ। নিরিবিলি নিস্তব্ধ তার চারিপাশ। একমাত্র নাইট গার্ডগণ ছাড়া সুখনিবাসের সকল সদস্যই প্রায় গাঢ় নিদ্রায় আচ্ছন্ন।
তবে, সবকিছু ছাপিয়ে নিচতলার ড্রয়িংরুমে একটু ঢুঁ মারলে দেখা যাবে এক বিচিত্র চিত্র। যেখানে তিনজন মানুষ নিদ্রা ছাড়িয়ে নিজেদেরকে করেছে ব্যতিক্রম ধর্মী হিসেবে প্রকাশ।
আলে ডালে উড়ে বেড়িয়ে প্রেমে লুকোচুরি খেলা আসামীকে অবশেষে করা হয়েছে পাকড়াও। আরামের ঘুমকে হারাম করে দিয়ে সামনাসামনি তাকে বসিয়ে রেখেছে বাড়ির দুই বিশেষ বিচারপতি। দু’জোড়া তীক্ষ্ণের চোখের ভারত্ত সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে অবলা সেই প্রেমিকা রাণী। নড়বার চড়বার নেই কোনো উপায়।
" তুই প্রেম করিস? "
সাদা ফ্লোরে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আঁকিবুঁকি করে যায় সানজি। এই মুহুর্তে গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসা প্রশ্নের জবাব তার পেটে থাকলেও মুখে নেই। কারণ, প্রশ্নটা এসেছে বড়জনের দিক থেকে। মুখের উপরে কিভাবে উত্তর দিবে যে সে প্রেম করে? একটা ভদ্রতার ব্যাপার আছে না !! হাজার হোক বড় ভাই পিতা সমতুল্য।
" মুখে উত্তর দিতে সমস্যা হলে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ/ না জানাতে পারেন শাহজাহান সাহেবের কন্যা।"
ছোটজনের হতে মাত্র পাওয়া সরু বুদ্ধিটা দারুণ লাগে সানজির। এতো আতঙ্কের মাঝে থেকেও ঠোঁটের কোণে ফোটে তার সূক্ষ্ণ হাসি। ইশ্ বোকা মনে এতোক্ষণ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ/ না জানানোর উপায়টা কেনো আসেনি। নেতাসাহেবের মাথার ব্রেইন সমাজ যে বড়ই উন্নত এটা মানতেই হবে।
অকপটে অবলীলায় মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানায় সে। দ্বিধা দ্বন্দ্ব কিংবা ভয়ের লেশ খুব একটা তার মধ্যে প্রস্ফুটিত হয় না। কেনো হয় না সে নিজেও জানে না। এখন মনের মধ্যে ভয় না আসলে কি করবে সে। জোর করে তো আর আনা সম্ভব নয়।
" ভয় লাগছে না তোর? "
" চেষ্টা করছি ভয় আনার কিন্তু বেয়াদব ভয়টা আসছে না। "
" প্রেম করার সাহস পেলি কোথায় তুই? "
" সান্নিধ্য ভাইয়াকে দেখে।"
সান্নিধ্য ফোন হাতে টাইপিং করতে গিয়ে নিজের নাম শুনে হাত থামিয়ে ফেলে। ফোনটা বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে সে হেলান দিয়ে সোফায় বসে। কিয়ৎক্ষণ অটল চাহনিতে তাকিয়ে থাকে সানজির দিকে। নিখুঁত পর্যবেক্ষণ করা শেষে ভারী কন্ঠ ঠিকরে বলে, " আমাকে দেখে শিখেছিস? "
" হু।"
" আমার দিকে তাকিয়ে বল।"
" না। "
সরফরাজ হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, " আমাদের বংশে লাভ ম্যারেজ তুই নিয়ে এসেছিস সান্নিধ্য। তোকে দেখে বাদ বাকি সবাই এখন সেদিকেই ঝুঁকছে । পরিস্থিতি দেখছি খারাপের দিকে..। "
" সে আমাকে দেখে প্রেম করার সাহস পেয়েছে অথচ প্রেম শুরু করেছে এক বছর আগে। "
" মানে? "
সান্নিধ্য ভ্রু উঁচিয়ে সানজির দিকে ইশারা করে বলে,
" জিজ্ঞেস কর।"
সরফরাজ সানজির দিকে পূর্ণ নজর দেয়। কপাল ভাঁজ করে ভারী কন্ঠে বলে, " সান্নিধ্য যা বলছে সত্যি? একবছর ধরে প্রেম করছিস তুই? "
"কিভাবে কিভাবে যেনো একবছর হয়ে গিয়েছে। আমি নিজেও জানতাম না। "
" জানলি কিভাবে তাহলে? "
" ক্যালেন্ডার দেখে। "
সান্নিধ্য দু'হাত বুকের সাথে ভাঁজ করে শান্ত গলায় বলে, " কোন লেভেলের মাস্টার মাইন্ড এটা দেখেছিস ? এক বছর ধরে প্রেম করে আসছে অথচ না তুই, না আমি ধরতে পেরেছি। সিক্রেট এজেন্টের সহসভাপতি।"
" তুই বুঝলি কেমন করে ও এক বছর ধরে প্রেম করে আসছে?"
" উনার ভাবিজানের থেকে।"
" শেহরিনের থেকে?"
" হু। বাচ্চা মেয়েটাও পাকা হয়ে যাচ্ছে সঙ্গদোষে। উনার হয়ে আমার কাছে প্রক্সি দিতে এসে ধরা খেয়েছে । "
" বাহ। বাহ। "
সানজি কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে হাত মুঠো করে পুরে। পায়ের আঙুলে ফ্লোরে আঁকিবুঁকি থামিয়ে গলায় জোর আনার চেষ্টা করে বলে,
" প্রেমই তো করেছি কারো মতো তো আর বিয়ের জন্য পাগল হইনি। তাও কথা শুনতে হচ্ছে। "
" আমি যা করেছি সব প্রকাশ্যেই করেছি গোপনে কিছু করিনি। তুই যেটা করেছিস এটা কি ঠিক করেছিস? তোকে কি নতুন করে শেখাতে হবে সবকিছু? "
সানজি চোখ তুলে তাকায় আলতোভাবে। সান্নিধ্যের কন্ঠস্বরে হুট করে রাগের তেজ ফুটে উঠতেই হালকা দমে যায় সে। ভয় তো এই একজনকে নিয়েই তার। চোখ দুটো যদি ক্রোধে লাল হয়ে যায় তাহলে সর্বনাশ।
" ভাইয়া... "
" প্রশয়ের একটা লিমিট থাকে সানজি। তুই এখন এডাল্ট। ভালো মন্দ তোকে বুঝে চলতে হবে। প্রেম কর ঠিক আছে। তোর পার্সোনাল লাইফে অবশ্যই তোর পছন্দমতো পার্টনার চুজ করা হবে। আমরা কিছুই বলবো না। বাট তুই জানিস এখানে সীমাবদ্ধতা কোথায়? আমাকে না বললি ভাইয়াকে বললি না কেনো?"
" আমি বুঝতে পারিনি। "
" কেন বুঝতে পারিস না তুই? "
সান্নিধ্যের ধারালো কন্ঠে বলা কথায় শান্ত পরিবেশ হুট করে গরম হয়ে যায়। কপালের রাগের শিরা দৃশ্যমান হয়ে উঠে স্পষ্টভাবে। নিজেকে ক্রোধকে সংবরণ করার চেষ্টা করতে করতে বলে, " আমার শত্রুগুলোর চোখে আমি এমনভাবে পর্দা লাগিয়ে রেখে চলি যেনো তারা আমার ফ্যামিলির দিকে তাকাতে না পারে। ইভেন তুই যে আমার বোন অনেকেই কিন্তু জানে না। অন্যদিকে বাবার শত্রুগুলো ঠিকই জানে তুই কে আমি কে।
তোকে রাজনীতির অ্যালগরিদম বুঝাতে হবে কি আবার নতুন করে?? "
" ভাইয়াকে জানাতে চেয়েছিলাম। "
" চাইতেই থাক।"
সরফরাজ চোখের ইশারায় সান্নিধ্যেকে ঠান্ডা হওয়ার নির্দেশ দেয়। অতঃপর সানজির দিকে তাকিয়ে বলে," মানুষ মুখোশধারী সানজি। আমাদের শত্রু বেশি। আমি বা সান্নিধ্য দু'জন সবসময় চেষ্টা করি আমরা যার মধ্যে দিয়ে যাই সেটা যেনো কোনোভাবেই আমাদের ফ্যামিলির দিকে না আসে। সান্নিধ্যের শত্রু কিন্তু এমনি এমনি বেশি না। এখন আমাদের ক্ষতি করতে মানুষ নানান ও'য়ে নিতে পারে। হতে পারে কেউ সুযোগ নিতে চাইছে। "
" সুযোগ না ভাইয়া। মুহিদের ফ্যামিলিতে কেউ রাজনীতি করে না। ওদের ফ্যামিলি বিজনেস। "
" সান্নিধ্য তুই তো মনে হয় খোঁজ নিয়ে ফেলেছিস অলরেডি।"
" ফ্যামিলি বিজনেসই দেখেছি।"
" ছেলে কেমন?"
সান্নিধ্য চোখ তুলে সানজির দিকে তাকায়। নিজেকে শান্ত রাখার প্রয়াসে ধীর কন্ঠে বলে," খারাপ বললে তো একজন আবার কান্না শুরু করে দিবে। আছে ভালোই।"
" ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করছিস ? "
" ব্যাকগ্রাউন্ড ঠিকঠাকই আছে বাট ইনসাইডে কি আছে সেটা তো আর জানতে পারা সম্ভব না।"
সান্নিধ্যের হালকা ধমকানিতেই মুখ ভার করে রেখেছে সানজি।চোখের পানি এসে দাঁড়িয়েছে চোখের কোণে। আর একটু বকা দিলেই হয়তো তা আর আঁটকানো যেতো না।
" সানজি.. কথা বলছিস না কেন? "
" আমি কথা বলবো না কারো সাথে। "
" সান্নিধ্য বকা দিয়েছে। আমি দেইনি এখনো। আমার সাথে কথা বল। "
" তুমিও দাও তাহলে। তুমি বাদ থাকবে কেন? সবাই তো শুধু আমাকেই বকে। "
কথা বলতে বলতে গলার স্বর ভারী হয়ে উঠে সানজির। ঠোঁট কাঁপতে থাকে অনবরত। কান্নার বেগ অতি সন্নিকটে এসে হাজির হয়ে হয়েছে। এখন শুধু ভূমিতে আছড়ে পড়া বাকি।
সান্নিধ্য কনুই বাঁকা করে ঠোঁটের কোণে হাত ঠেকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে, " এদিকে আয়। "
" না। "
" আসতে বলেছি। "
" না।"
" আমি উঠবো? "
সানজির চোখ হতে নির্নিমেষ অশ্রু ঝরে যায়। কেঁপে ওঠে তার শরীর। নাক টেনে ওড়নার কার্নিশে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় সে। মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সান্নিধ্যের পাশে গিয়ে মাথা নিচু করে বসে চুপচাপ।
সান্নিধ্য বোনকে সস্নেহে একহাতে জড়িয়ে নেয়। মাথায় হালকাভাবে চুমু দিয়ে বলে, " সরি। "
" বকা দিয়েছিস তুই। "
" সরি বলেছি তো।"
" ধমক দিলি কেন?"
" বোকামি করিস কেন? "
" কোথায় বোকামি?"
" এগুলো বোকামি নয়? এক বছর ধরে প্রেম করে আসছিস। যার সাথে প্রেম করছিস সে যদি কোনোভাবে কোনো আক্রোশের কারণে তোর ক্ষতি করতো? এমন নয় তোর এসব সম্পর্কে কোনো আইডিয়া নেই। ছোটবেলা হতে দেখে আসছিস কত মুখোশধারী লোক আমাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। "
সানজি হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে ভেজা কন্ঠে বলে, " আমি সত্যি জানাতে চেয়েছিলাম ভাইয়া। কিন্ত সুযোগ হয়ে উঠেনি। আর মুহিদের সাথে আমার সম্পর্কটা ফোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ফার্স্ট মিটই হয়েছে গত কয়েকদিন আগে।"
" তার আগে কখনো দেখা হয়নি?"
" সামনাসামনি সেভাবে দেখা হয়নি।"
" ভালোবাসিস? "
" হু। "
" পড়াশোনা শেষ করে বিয়ে করবি নাকি এখনি করবি? "
" পড়াশোনা শেষ হতে অনেক সময়..।"
" সরাসরি বল বিয়ে করবি।"
সানজি চুপ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে হ্যাঁ বলতে তার কন্ঠে দ্বৈরথ ভাব ফুটে ওঠে। পড়াশোনা তো বরাবরই ছিলো তার বাহানা। আর করতে মন চায় না।
সানজির মৌনতা সম্মতিকে স্বাগত জানায়। সান্নিধ্য বুঝে নেয় বোনের সম্পূর্ণ মতামত বিয়েতে। সরফরাজের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময়ে করে স্থির গলায় বলে, " আমরা ছেলেটাকে দুদিন ধরে চিনি। তাকে আমরা সামনে যেরকম দেখছি এটা দেখেই ফিক্সড করছি বা সে আমাদের যেমন দেখাচ্ছে সেটাই দেখে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে আমাদের ইন্টারনাল বিষয়গুলো অজানা থাকলেও আই হোপ তুই এই এক বছরে কিছুটা হলেও তাকে চিনেছিস, জেনেছিস। আমাদের চেয়ে ভালো জানিস তুই তাকে। তাই আমরা তাকে কোনো রকম জাজ করছি না। করলে তুই হয়তো কষ্ট পাবি। এখন মেইন বিষয় হচ্ছে তুই কি তার সাথে লাইফ পার করার সাহস রাখিস? আই মিন কোনো একটা নেগেটিভিটি নিয়ে একটু ভয় বা চিন্তা আছে? "
" আমি এ পর্যন্ত তার মধ্যে কোনো নেগেটিভিটি পাইনি ভাইয়া।"
" কোনো নেগেটিভিটি নেই? "
" না।"
" এগুলো আর বেশি সন্দেহজনক। এই জেনারেশনে একদম স্বচ্ছ মানুষ হওয়া সহজ নয়। একটু ত্রুটি থাকেই।"
" সান্নিধ্য বাদ দে। অনেকেই ভালো আছে। আর ত্রুটি থাকলেও হয়তো সানজির চোখে সেটা মানিয়ে নেওয়া যায় এমনটাও হতে পারে। ওর যেহেতু অসুবিধা নেই.. "
" প্রেমে পড়া মানে অন্ধ হয়ে যাওয়া নয়৷ নিজের পার্সোনালিটিকে লো করে অন্যকে ইম্প্রেস করিস না। শেহরিন রাজনীতি পছন্দ করে না কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসি৷ ওকে ইম্প্রেস করার জন্য কিন্তু আমি রাজনীতি ছাড়িনি৷ নিজের পেশাকে অবমূল্যায়ন করিনি৷ দুটোকেই ব্যালান্স করেছি ও সেটা মেনে নিয়েছে।"
সানজি মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। নির্মেদ স্বরে বলে, " বুঝতে পেরেছি ভাইয়া। মুহিদ অনেকদিন হলো বিয়ের কথা বলে চলেছে কিন্তু আমি রাজি হচ্ছিলাম না জন্য সেও এগোয়নি। অনেকবার বাবার সাথে কথা ও বলতে চেয়েছে। এই এক বছরে আমি খেয়াল করেছি আমার মতামতকে যথেষ্ট সম্মান করে সে। গুরুত্ব দেয়।"
" ওকে। তোর যদি কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে আমাদেরও সমস্যা নেই। সিদ্ধান্ত তোর উপরে। তুই নিজের জন্য যেটা ভালো মনে করবি আমরা সেটাকেই প্রাধান্য দিবো ঠিক কিন্তু আশা করবো তুই চোখ কান খোলা রেখেই একজন সঠিক মানুষকে চুজ করবি। "
"হু।"
" সাহস আছে? "
" আছে।"
" কোনো কনফিউশান? "
" না।"
" আচ্ছা সানজি আপু এখন তাহলে এদিকে আসুন।"
সানজি বড় ভাইয়ের কাছে উঠে যায়। পাশে বসতেই সরফরাজ তার ভাগের ভালোবাসাটা টুকু বুঝিয়ে দেয় বোনকে। একইভাবে মাথায় চুমু দিয়ে স্নেহাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, " আমাদের অন্তঃপ্রাণ তুই। আমরা চাই তুই ভালো থাক। সুখী হ জীবনে। তোর একটুখানি কষ্ট কিংবা চোখের পানি আমাদের সহ্য করার ক্ষমতা নেই। এজন্য ভয়টা বেশি কাজ করে। তোর জন্য পাত্র সিলেক্ট করতে যদি আতশি কাঁচ ব্যবহার করা যেতো আমরা তাই করতাম। কিন্তু অলরেডি তুই তোর লাইফ পার্টনার চুজ করে ফেলেছিস। এক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য তার ভালো মন্দটুকু জেনে নেওয়া। সেইটুকু করে চলেছি । তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনোই কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ।"
" সরি ভাইয়া। আমি তোমাকে বলতে চেয়েও পারিনি। "
" আচ্ছা ঠিক আছে। তবে, এগুলো মাথায় রেখে চলতে হবে। আমরা জানি তুই সাহসী, স্পষ্টবাদী অনেক। একটা রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠা মেয়ে কখনো ভয় পায় না। জীবনের রেখা যদি কখনো কোনো কারণে পাল্টে যায় দমে যাবি না। ছোট থেকে যে অদম্য সাহসে বড় হয়েছিস সেটাকে ফলো করে যাবি। তুই সামনে এগিয়ে যা। পিছনে আমি আছি সান্নিধ্য আছে। খাঁদে পরতে দিবো না কখনোই তোকে ইনশাআল্লাহ। যদি কখনো মনে হয় জীবনে সবকিছু হারিয়ে ফেলেছিস তাহলে একবার শুধু পিছন ফিরে তাকাবি। ভাইয়ারা আছে। কেমন? "
সানজি বড় ভাইয়ার কথা শুনে তাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলে। সরফরাজ মৃদু হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, " ধুর পাগলি। কান্না করছিস কেন? "
" বিয়ের আগে প্রাকটিস করছে কান্নার। "
" যখন বিদায় দেই তখনকার জন্য কান্না তুলে রাখ। শেহরিন যেরকম কান্না করেছিলো সেরকমভাবে কান্না করবি। "
" মজা করছিস কেনো তোরা?"
" মজা হবে কেন ভালো টিপস দিলাম।"
সানজি মুখে তুলে ওড়না দিয়ে চোখ মুখ মুছে। অস্ফুটস্বরে বলে, " শেহরিনের জামাইয়ের মতো কি সবাই নাকি যে বউকে আদর যত্নে গাড়িতে তুলে বসাবে। আমি যদি ওরকম কান্না করি কেউ যদি আমাকে না ছাড়িয়ে গাড়িতে তোলে তাহলে তো সারাদিনই আমার কান্না করতে হবে। দেখা গেলো জামাই নিজেই লজ্জা পেয়ে আগে আগে গাড়িতে বসে আছে। "
" এমনও তো হতে পারে তোর কান্না দেখে তোর জামাই কান্না ও করছে। "
" ছিঃ। "
" ছিঃ?"
" জামাইরা কি কান্না করে? "
" করতেই পারে। এতো ভালোবাসা।"
সান্নিধ্যের পকেটে থাকা ফোনটা মৃদুভাবে ভাইব্রেট হতেই সে উঠে দাঁড়ায়। ফোনটা বের করে মাত্র আসা মেইলগুলো চেক করতে করতে বলে, " যা এখন ঘুমিয়ে পড়। কালকে ভার্সিটি নেই? "
" আছে। "
" ঠিক আছে যা। কালকে বাবা আম্মার সাথে এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। আজকে এখানেই শেষ হোক। তিনটা বাজে। "
" আম্মা যদি বকে? "
" বকা খাবি। সমস্যা কি? "
সানজি হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। দু কদম হেঁটে যাওয়া পথে থেমে আবারো ফিরে আসে। সরাসরি হাত বাড়িয়ে দেয় সান্নিধ্যের দিকে। সান্নিধ্য সানজির বাড়ানো হাত দেখেই বুঝে যায় তার উদ্দেশ্য। কপাল কুঁচকে বলে, " তোকে দিয়ে আমি কোনো কাজ করাইনি। "
" বকা দেওয়ার জন্য জরিমানা করা হয়েছে। তাড়াতাড়ি দিয়ে দে। আমি ঘুমাতে যাবো। "
" তোর বিয়ে কালকেই হবে। "
" কালকেই হোক বা আজকেই হোক। জরিমানা চাই আগে। "
" তোর কাছে এইটা বকা মনে হয় কিভাবে? "
" গলার টোন জোরে হয়েছিলো মানেই বকা। জরিমানা না দিলে যাবো না আমি। অনশনে বসবো। "
সান্নিধ্য ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলে। পকেট হতে ওয়ালেট বের করতে করতে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, " অনশন শব্দটার মান সম্মান বিলীন করিস না। বসবি তো ফ্রিজের কাছে গিয়ে। পাঁচশ টাকা হবে? "
" এক হাজারের নিচে কথা নেই। "
" বিয়ে করেছি আমি। একটা ছোট বউ আছে। কমিয়ে আন।"
" তোর বাচ্চা বউকে এখান থেকে ভাগে দিবোনি। সমস্যা নেই। বার্গেনিং করবি যত অ্যামাউন্ট বাড়বে তত।"
সান্নিধ্য এক হাজার টাকার নোট গছিয়ে দিয়ে সোফায় বসে পড়ে। অন্যদিকে সরফরাজ নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে কেটে পড়া মুহূর্তেই তার ডাক আসে পিছন হতে।
" দেখ বোন তোকে দিয়ে আমি কখনো কোনো কাজ করাইনি। বকাও দেইনি। বিনা কারণে জরিমানা করিস না। "
" তোমার ছেলে সেদিন রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুই টাকার বাহার দেখিয়ে হাজার টাকার খাবার অর্ডার করেছিল। তিন ঘন্টা তোমার গুণধর পুত্রকে দেখেশুনে রেখেছি। এমনি এমনি?"
" নিয়ে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিলো? "
" ফ্লোরে গড়াগড়ি করে কান্না শুরু করেছিলো। "
" কত? "
" এক হাজারই দাও।"
" এইটুকুতেই এক হাজার?"
" বারে আমার পাঁচশ শেহরিনের পাঁচশ। "
সরফরাজ অবাক চাহনিতে সান্নিধ্যের দিকে তাকিয়ে বলে,
" নেতাসাহেবের বউও চাঁদা তোলে? "
" সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে।"
" তোলেনা ভাইয়া । ট্রেনিং দিচ্ছি মাত্র।"
সানজি সরফরাজের হতে টাকা পাওয়া মাত্র গুণতে গুণতে উপরে চলে যায়। চারটা পাঁচশো টাকার নোট হতে দুটো তার দুটো শেহরিনের।
" খেলা আছে নাকি ? "
সান্নিধ্য টিভি চালু করে রিমোট দিয়ে চ্যানেল পাল্টাতে পাল্টাতে মাথা নাড়ায়। সরফরাজ সিঁড়ি পথে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে,
" সকালে অফ টাইম? "
" এগোরোটার দিকে বের হবো। "
" হিউজ টাইম। আমার সাতটার মধ্যে বের হতে হবে। "
" রাতে ফ্রি থাকলে আমার কার্যালয়ে আসিস। কিছু ফাইলে সাইন লাগবে তোর। "
" আবার কি করেছিস তুই ? "
সান্নিধ্য ভ্রু দ্বয় বাঁকা করে সরফরাজের দিকে তাকিয়ে বলে,
" ব্যাটা বন্দরের কাগজ পত্র। "
" তাও ভালো। আমি ভেবেছি এমপি সাহেব আবার নতুন করে কিছু অঘটন ঘটিয়েছে। "
ঘড়িতে বাজে ৩:২৩ মিনিট।
টিভিতে চলছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম চেলসির ম্যাচ। সোফায় বসে নেতাসাহেব আরামে উপভোগ করছেন তার পছন্দের ক্লাবের খেলা। হাজার কর্মব্যস্ততা থাকলেও খেলা দেখার প্রতি নেশাটা তার বেশ প্রখর। টিভিতে ল্যাপটপে কিংবা ফোনে যেকোনো কিছুতে একটু হলেও উঁকি দিতেই হবে তাকে।
প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন রুম। বেড সাইড ল্যাম্প হতে ভেসে আসা মৃদু আলোতে হাত দিয়ে বেডের এক পাশটা পরোখ করে নেয় শেহরিন। নাহ কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই। পিটপিটে চোখটাকে সময় নিয়ে সজাগ করে তোলে সে। খানিকটা মাথা তুলে আশেপাশে পুরো রুমটা দৃষ্টি বুলিয়ে ও কাঙ্ক্ষিত মানুষের দেখা পেতে সক্ষম হয় না ।
অবশেষে উপায়ন্তর না পেয়ে শোয়া ছেড়ে উঠে বসে। সাইড হতে ফোনটা নিয়ে অন করে দেখে সাড়ে তিনটা বাজতে চলেছে। এতো রাতে কোথায় গেলেন উনি? ওয়াশরুমের দরজাও তো সামনে হতে লক করা। তবে, কি বেলকনিতে??
খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে বেলকনি হতে কোনো মানুষের উপস্থিতির রেশ বুঝতে না পেরে শেহরিন সরাসরি কল করে তার নেতাসাহেবকে।
" কোথায় আপনি? "
" নিচে। ঘুমাওনি তুমি?"
"ঘুমিয়েছিলাম। ভেঙে গিয়েছে। নিচে কি করছেন? "
" খেলা দেখছি।"
শেহরিনের কপাল ভাঁজ হয়ে আসে। হালকা রাগান্বিত সুর তুলে বলে,
"ঘুমানো বাদ দিয়ে এতোরাতে খেলা দেখছেন কেন?এক্ষুণি উপরে আসুন।"
" পনেরো মিনিট পরে আসি? "
" পনেরো সেকেন্ডও নয়। সারাদিন চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচেতে ঘুরে বেড়ান। রাতে ঘুমটা ঠিকভাবে না হলে হবে?"
সান্নিধ্য বউয়ের কড়া শাসনে মৃদু হাসে। ধীর কন্ঠে বলে, "অভ্যাস আছে আমার ম্যাডাম।"
" আপনি আসবেন কি না বলুন? "
"আচ্ছা দশমিনিট পরে আসছি। "
" কোনো দশ মিনিট চলবে না।"
সান্নিধ্য সময়ের দিকে তাকিয়ে বলে, " আচ্ছা লাস্ট আট মিনিট।"
শেহরিন গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলে ফোন কেটে দেয়। কয়েকসেকেন্ড নিরবতা পালন করে চুপচাপ বসে থাকে সে। এর মাঝে হুট করে মস্তিষ্কে হানা দেয় তার দারুণ একটা বুদ্ধি । চোখযুগল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুদ্ধিটাকে কাজে লাগানোর জন্য সঠিক পদক্ষেপ বেছে নেয় মুহুর্তেই। অতঃপর স্ক্রিনের পানে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে, " ওয়েট। আপনাকে চার -পাঁচ মিনিটের মধ্যে উপরে নিয়ে আসছি। "
দ্রুত বেড হতে নেমে সে কাবার্ড খোলে। স্তরে স্তরে সাজানো শাড়িগুলোর মধ্যে হতে সেই বটল গ্রিন রঙের শাড়িটা বের করে এক পলক সেদিক পানে তাকিয়ে রহস্য মাখা হাসি হাসে শেহরিন। সময়ের দিকে একটাবার নজর বুলিয়ে চলে যায় ওয়াশরুমে।
অল্প সময়ের মাঝেই ফ্রেশ হয়ে বেশ সুন্দর কায়দায় শাড়িটা পরে বের হয় চতুর রমণী। কক্ষটাকে আলোয় আলোকিত করে আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দাঁড় করায়। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে চিরুনি করে গুছিয়ে নেয়।। হালকা লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁটটাকে করে তোলে রঞ্জিত । ব্যস ! এইটুকুই যথেষ্ট নেতাসাহেবকে ঘায়েল করার জন্য।
শেহরিন টিপটিপ পায়ে কক্ষ হতে বের হয়ে চারপাশটায় সূক্ষ্ণ নজর দেয়। বাড়ির কেউ যদি একবার তাকে দেখে নেয় তো একদম সর্বনাশ। লজ্জায় আর কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না সকালে। রাত বিরাতে তাদের এসব উদ্ভট কান্ড দেখে সবাই নিশ্চিত বলবে পাগল।
চরম আশঙ্কায় ভীত মনটাকে আড়াল করে সে সিঁড়ি হতে নামতে থাকে এক পা দু'পা করে। মধ্যে সিঁড়ি হতে নিচের ড্রয়িংরুমে নেতাসাহেবকে দেখতে পাওয়া মুহুর্তে পা থামিয়ে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে। হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা নিয়ে সরাসরি কল করে কানে ধরে। শ্রবণে এসে পুরুষালি কন্ঠস্বরে আঘাত হানে,
" আর তিন মিনিট। "
" ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান উপরে। "
সান্নিধ্য শেহরিনের ফিসফিস গলায় বলা কথাটা শোনা মাত্র সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় উপরে। সিঁড়ির পাশে লাগানো ওয়াল স্কন্সের মৃদু নরম আলোতে সে সবুজ রঙা এক মানবীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়। চোখে চোখ পড়তেই নারী কায়াটা ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির ঝংকার তোলে।
বসন্তের প্রথম সবুজ পাতার মতো দুলে উঠে সে আপনছন্দে। দূর হতে দেখে মনে হয় মায়াবী আলোর মাঝে কোনো অদেখা উপবনের পাতা হালকা হাওয়ায় দুলে চলেছে।
শেহরিনের চোখ দুটো হতে চতুরতার ছায়ার সঙ্গে মিষ্টি দ্যুতি বিচ্যুত হতে থাকে। যা সরাসরি এসে লাগে সান্নিধ্যের বুকের বা পাশটায়। স্তব্ধ দৃষ্টিতে মুখে অবিশ্বাস্য ভাব জুড়িয়ে সে দেখে চলে তার প্রেয়সীকে। টিভির অপর পাশ হতে ভেসে আসছে গ্যালারিজুড়ে সমর্থকদের চিৎকার। ধারাভাষ্যকরের আমেজমাখা কন্ঠস্বর। কি জানি হয়তো গোল হয়েছে। এখন সেটা পক্ষ নাকি বিপক্ষের দলের সেটা দেখার আগ্রহটুকু আর নেই নেতাসাহেবের। সে ব্যস্ত রয়েছে তার নারীর অপার্থিব দৃশ্যটাকে আত্মস্থ করতে নিতে।
শেহরিন প্রয়োজনীয় কার্যটুকু সম্পন্ন করা মাত্র দ্রুত উপরে চলে যায়। যা উদ্দেশ্য ছিলো মনে হচ্ছে হাসিল হয়ে গিয়েছে। আর দরকার নেই। নেতাসাহেব ইতিমধ্যে ঘায়েল হয়ে গিয়েছে। এখন এমনিতে সে কক্ষে উপস্থিত হতে বাধ্য হবে।
ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছেড়ে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় সান্নিধ্য। ঠোঁটের কোণে তার ক্ষীণ হাসির রেশ লেপটে আছে । তার গিন্নী তাকে একদম অন ফিল্ডে গোল দিয়ে দিয়েছে। নিখুঁত, পরিকল্পিত ছলনায় একটুখানির উপস্থিতিতে তাকে মোহিত করে তুলে দিয়ে গিয়েছে গভীরভাবে।
নারী হৃদয়ের গহীন কোণ হতে উঠে আসা এই ছলনা যে কোনও পুরুষকে বন্দী করে দিতে সক্ষম । নারী সে তো ছলনার আধার। তার একটি দৃষ্টিই যথেষ্ট পুরুষের শক্ত হৃদয়কে নরম করে দিতে। একটি হাসিই যথেষ্ট যুদ্ধ থামিয়ে দিতে। তার একটা নিখুঁত পরিকল্পনা আপন পুরুষের মস্তিষ্কে বিচরণ করতে সক্ষম।
খেলার তখনো চলছে অতিরিক্ত সময়। শেষ সময়ে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচটাকে উপেক্ষা করতে সান্নিধ্যের বিন্দু মাত্র অনুশোচনা মনে জাগে না। টিভিটা বন্ধ করা মাত্র ধুপধাপ পায়ে সিঁড়ি অতিক্রম করে সরাসরি চলে যায় নিজ কক্ষে।
মিঠে আলো আঁধারের উপখ্যানে বেলকনির সবুজ পাতায় এসে লাগছে শেষ রাতের হাওয়া। চাঁদের আলো মলিনতায় ছেয়ে আছে। হয়তো বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে তার। দক্ষিণের সেই মৃদুমন্দ বাতাসে খোলা চুলগুলো মুখে এসে খাচ্ছে লুটোপুটি শেহরিনের। কিছু সময় পেরোতেই শরীরের ভাঁজে পুরুষালি স্পর্শ পেতেই সে হালকা কেঁপে ওঠে। পিছন হতে কেউ একজন তাকে জড়িয়ে নেয় নিজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে। শক্ত হাতদুটো তার শাড়ি ভেদ করে উদরে গিয়ে বিচরণ করে।
শেহরিন নিজেকে ঘুরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। নেতাসাহেবের চোখে চোখ রেখে হাতদুটো দিয়ে টি শার্ট আঁকড়ে ধরে মুখ উপরিপানে তোলে। নির্মেদস্বরে বলে, " এসেছেন কেন? যান খেলা দেখুন।"
" ম্যাচ রেফারি লালকার্ড দেখিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে তোমার কাছে। বলেছে আগে বউ তারপরে খেলা।"
" হুহ নাটক কম করুন নেতাসাহেব। আমি যখন ফোন করলাম তখন আসলেন না কেন?"
" হলুদ কার্ড ছিলো ওটা। মানে ওয়ার্নিং আর কি । "
" চালাকি কম করে করুন। "
সান্নিধ্য শেহরিনের কোমড় দু-হাতে পেঁচিয়ে মাথা নিচু করে। গাঢ় নিঃশ্বাসের মাঝে কোমল গলায় বলে,
" আমার বউ আমার চেয়ে একধাপ এগিয়ে। একদম ডিরেক্ট অ্যাকশনে চলে গিয়েছে সে।"
"রাজনৈতিক পার্সনদের বাগে আনতে ডিরেক্ট অ্যাকশনই নিতে হয়। কারণ আপনারা তো সহজে পথ ভোলার যাত্রী নন।"
" মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই রাজনৈতিক সত্তা, রাজনীতি ছাড়া মানুষ অসম্পূর্ণ। আমার কথা নয় অ্যারিস্টটলের কথা। "
" জর্জ বার্নাড শ এর একটা কথা আছে জানেন, তিনি বলেছেন,
রাজনীতি হচ্ছে মিথ্যা এবং প্রভাব খাটানোর শিল্প।"
" সৎ রাজনীতি স্বাধীনতার রক্ষক।"
" অসৎ রাজনীতি স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে। এবং পৃথিবীতে অসৎ রাজনীতিতেই ঘেরা।"
সান্নিধ্য ঠোঁট কামড়ে হাসে শেহরিনের পানে তাকিয়ে। অতঃপর জ্বলমান দীপ শিখার নাকের ডগায় ঠোঁটের ছোঁয়া বসিয়ে দিয়ে বলে, " পৃথিবীতে একটা জিনিস যদি পুরোটাই অসৎ এ ঘেরা থাকে তাহলে সেটা কোনোভাবেই কালের বির্বতনে প্রবাহিত হতে পারবে না। তার ধ্বংস অনিবার্য। রাজনীতিতে অসৎ এর ভীড়ে সৎ শব্দটা আছে জন্যই এখনো টিকে আছে।"
" রাজনীতির মাঝে তাহলে এতো অস্থিতিশীলতা কেন? "
" স্থিতিশীলতা কোন জায়গায়? কর্মজগতের প্রত্যেকটা জায়গায় দূর্নীতি, ক্ষমতার প্রভাব আছে।"
শেহরিন দু-হাত ভাঁজ করে সান্নিধ্যের বুকের উপরে রেখে তার উপরে থুতনি ঠেকিয়ে বলে, " এগুলোরই শিকড় আপনারাই। শেয়ার হোল্ডার। "
" আমার প্রতিপক্ষ দলগুলো যদি জানতো আমার বউ ও আমার বিপক্ষে, ডেফিন্টলি তারা খুশিতে মিষ্টি বিলি করতো। "
" বাহ তাহলে তো তারা আমার দলের লোক। হাত মেলাতে হবে।"
" হাত মেলানো যাবে না। আপনি দূর থেকেই তাদের সমর্থক হয়ে থাকুন আর আমার বিপক্ষে যত পারুন যুদ্ধ ঘোষণা করুন। "
" আপনি সবসময় আমাকে এতো চোখে চোখ কেনো রাখেন নেতাসাহেব? "
সান্নিধ্য শেহরিনের উদর ছেড়ে দু'হাতের আজলে মুখটা তুলে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে,
" কারণ আপনি শুধু আমার। আপনার দিকে কেউ তাকালেও সেটা আমার সহ্য হয় না।"
" এতো পজেসিভ? "
" আপনার মতোই। "
"মোটেও আমি পজেসিভ নয়।"
"সিরিয়াসলি আপনি পজেসিভ না?"
"অবশ্যই না। "
"ঠিক আছে কালকে তাহলে আরহামকে সরিয়ে একটা নারী পিএ নিয়োগ দিবে। যেখানে যাবো...
" আলমারিতে আপনার কাপড় চোপড়ের সেকশানে দুটো পিস্তল রাখা আছে। কোন পিস্তলের গুলি খেতে চান বলুন। ডিরেক্ট শ্যুট করে দিবো আপনাকে। "
"ওহ আচ্ছা আপনি তাহলে পজেসিভ না? "
" চুপপ কথা বলবেন না।"
"হচ্ছে না সমঝোতায় আসতে হবে তাহলে।"
শেহরিন সান্নিধ্যের চোখে চোখ রেখে বলে," কি সমঝোতা? হ্যান্ডশেক করতে হবে? "
"উহু। লিপশেক করতে হবে। "
" আপনি... "
সান্নিধ্য শেহরিনের পাতলা ঠোঁটের মাঝে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। বাম হাতে শাড়ির আঁচল তুলে ঠোঁটে লেগে থাকা লিপস্টিক মুছে ফেলে সন্তপর্ণে। অতঃপর গোলাপি রাঙা ঠোঁটটা হালকা ভিজে উঠতেই মাথা নিচু করে সে তার শুষ্ক ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় গভীরভাবে। ঠোঁটের ভাঁজে ঠোঁট মিলতেই নিবিড় উচ্ছ্বাসে শুষে নিতে থাকে প্রিয়তমার সমস্ত আবেশতা। উচ্চতার খানিকটা ব্যবধান কমাতে নিজের পায়ের উপর তুলে নেয় শেহরিনকে। স্নিগ্ধ রমণীর উদর হতে পাতলা শাড়ির আবরণ সরিয়ে আঙুলের অবাধ বিচরণ ঘটায় সেখানটা জুড়ে। প্রবল উন্মাদনায় ডুব দেয় প্রেমোত্তাপ সেই লগ্নে।
শেহরিনের শরীর অসাড় হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে সে দু হাত খামচে ধরে নেতাসাহেবের প্রশ্বস্ত পিঠে নখ বসিয়ে দেয়। বে'সামাল মধুতৃষ্ণা মেটাতে নিজেকে করে আত্মসমর্পণ। লুকিয়ে নেয় তার একান্ত পুরুষের দেহের মধ্যেখানিতে।
চাঁদের আলো ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে আসে। ধরণীর বুকে দুটো মানব মানবীর ভালোবাসা ঘেরা মুহুর্তের সাক্ষী হয়ে মেঘের আড়ালে সেও নিজেকে নেয় মুড়িয়ে। অপরদিকে দমকা হাওয়া এসে দুলিয়ে দিয়ে যায় দুজোড়া কপোত কপোতীকে । নিগূঢ় রাতে নিগূঢ় মোহনীয়তায় শ্রাবণের মেঘের ছায়ায় ভাসতে থাকে দু'জনে প্রগাঢ়চিত্তে।