ফুলে ফুলে সেজেছে সুখনিবাস। সেই সাথে লেগেছে বিয়ের সমারোহ।শুক্রবারের সন্ধা গাঢ় হতেই আলোক রোশনাই এর ঝলকে পুরো হালি শহরের বুকে মাথা উঁচু বিল্ডিংটা জ্বলজ্বল করে উঠে। সাদা, সোনালি হলুদ রঙা বাতিতে চোখ ঝলসানো সৌন্দর্য নজর কাড়ে সবার। দূর হতেই যা চোখে পড়ার মতো।
শাহজাহান সাহেবের ইচ্ছেতে তার একমাত্র কন্যার আকদ মোটামুটি ভালো সমাগমের মাঝে আয়োজন করা হচ্ছে। সান্নিধ্যের বেলাতে করতে না পারার আক্ষেপটা তিনি মেয়ের বেলায় এসে ঘুচিয়েছেন। যদিও ইচ্ছা তার বিয়ের সময় আরো বড় করে আয়োজন করার। তবে আকদ জন্য সংখ্যাটা অর্ধেকে নামিয়েছেন।
এসব কিছুর ভীড়ে নিরাপত্তার দিকটাও বেশ জোরদার করা হয়েছে। এই দিকটা মূলত সান্নিধ্যের সব লোকজন সামলাচ্ছে। যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে মূল ফটকের সামনে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রেখেছে।
"সরফরাজ সব ঠিকঠাক আছে তো।"
" জ্বি বাবা।"
"গেস্টদের অ্যাপায়নে কোনো ত্রুটি যেনো না হয় বিষয়টা খেয়াল রেখো।"
" চিন্তা করো না। সবাইকে সমানভাবেই অ্যাপায়ন করা হচ্ছে।"
শাহজাহান সাহেব মাথা নাড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করার সময় আবার দাঁড়িয়ে পড়েন। দু-হাত পিছনে মুষ্টিবদ্ধ রেখে কপাল ভাঁজ করে জিজ্ঞেস করেন, " সান্নিধ্য কোথায়?"
"সান্নিধ্য বাহিরেই আছে। ওর লোকজনদের সাথে কথা বলছে হয়তো।"
"আজকের দিনটা যেন আবার কার্যালয়ে না ছোটে। তোমার আম্মা বার বার বলে দিয়েছেন। সে তো আর তার কাজ বুঝবে না। তবে ছেলেকে না পেলে চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিবে।"
সরফরাজ মৃদু হেসে ঘড়িতে সময় দেখে নেয়। সাতটা পার হচ্ছে। বরপক্ষ হতে জানিয়েছে তারা শীঘ্রই চলে আসবে। হয়তো এতোক্ষণে রওনাও দিয়ে দিয়েছে।
" আচ্ছা সমস্যা নেই। আমি ওকে বারণ করবো। তুমি ভিতরে গিয়ে রেস্ট নাও এখন। একটু পরেই হয়তো উনারা চলে আসবেন।"
" রওনা হয়েছে?"
" সম্ভবত।"
" আচ্ছা।"
বাবা চলে যেতেই সরফরাজ পকেট হতে ফোন বের করে লনের ধারের কাছে এসে দাঁড়ায়। কল লাগায় সান্নিধ্যেকে। এই ব্যক্তিকে ভরসা করা কঠিন। কার্যালয়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভবের কিছু নয়।
"কই তুই?"
" গেইটের পাশে রাস্তার উপরে।"
" কি করছিস?"
" দাঁড়িয়ে আছি।"
" ওই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাক। তার বেশি পা বাড়াস না। বাবা মাত্র তোর খোঁজ করে গিয়েছে। আজকের দিনটায় কোনো রকমের ঝামেলা করবি না। তোকে তো বিশ্বাস করা কঠিন। একটু পরেই ভিতরে চলে আসবি।"
" আসছি।"
সান্নিধ্য ফোন কেটে দিয়ে সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির সঙ্গে ফের কথা বলতে উদ্যত হয়। কালো বেঁটে ধরনের লোকটার মুখোরেখায় সামান্য উদ্বিগ্নতা ভর করলেও স্যারের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। সে নিজেও বিষয়টা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত।
" দশ তলা বিল্ডিং স্যার। দিনে রাতে শত শত মানুষ আসে যায়।"
" কালকে দুপুর একটা থেকে দুইটায় আপনি কোথায় ছিলেন?"
" আমি চার তলাতে ছিলাম তখন।"
" গ্রাউন্ড ফ্লোরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আছে?"
" চেক করতে হবে স্যার।"
" ম্যানেজারের সাথে কথা বলে ফুটেজটা আমাকে পাঠানোর চেষ্টা করবেন। আর হ্যাঁ যদি ফুটেজটা না থাকে তাহলে সত্যি কথা বলবেন। মিথ্যা বলে প্যাঁচাবেন না।"
" আমি এক্ষুণি গিয়ে বিষয়টা দেখছি। আপনি চিন্তা করবেন না স্যার।"
" আমি চিন্তা করছি না। আপনি যেতে পারেন এখন।"
লোকটা বিদায় নিতেই সান্নিধ্য হাতে থাকা ফোনটা বন্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়। আগাম কয়েক ঘন্টা সকল কল হতে বিরত থাকার চেষ্টা করবে। সানজির আকদে সম্পন্ন সময়টা সে দিতে চায়। কিন্তু বাসায় প্রবেশ করা মুহুর্তে ফোন সুইচ অফ করতে গিয়ে মস্তিষ্কে বাজে অন্য এক সুর। সমান্তরাল কপালের রেখা হয়ে উঠে বাঁকা। কিছু সময় নিজের সঙ্গে অমীমাংসিত হিসেব নিকেশ করে শান্ত মুখোভঙ্গিতে সে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। কোনো এক কারণে তা আর বন্ধ করা হয়ে উঠে না।
বাসার অভ্যন্তরে ড্রয়িংরুম জুড়ে শোরগোলে হয়ে আছে মুখরিত। বাচ্চা থেকে বয়স্ক সবাই একযোগে লেগেছে। সোফায় বসে আছেন সান্নিধ্যের মামা, শাহজাহান সাহেবের দুজন বন্ধু সহ বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন। বিস্তর আলাপে তারা একে অপরে ব্যস্ত। নেতাসাহেবের বাসায় এসেছে অথচ রাজনীতি নিয়ে কথা উঠবে না সেটা তো হতেই পারে না। দেশের রাজনৈতিক হালচালের কাটছাঁট বিচার বিশ্লেষণে তারা বেশ তৎপর এই নিয়ে।
" আরে এমপি সাহেব এদিকে আসুন। আপনাকেই প্রয়োজন।"
সান্নিধ্য উপরে যাওয়া পথে ডাক শুনে গতিপথ পরিবর্তন করে। ড্রয়িং রুমে গিয়ে উপস্থিত সবার সাথে করর্মদন করে নেয় ক্ষীণ হেসে। অতঃপর পায়ের পা তুলে একহাত ছড়িয়ে দিয়ে দিয়ে শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে পড়ে সোফাতে।
"কি অবস্থা এমপি সাহেব কেমন চলছে দিনকাল? আপনি তো বেশ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে রয়েছেন দেখছি। আজকে সকালের পত্রিকায় আপনার নিউজ দেখলাম। কালকে চার চারটা সাইট পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। নিজ হতে বেশ জোরেসোর ভাবেই তদারকি করছেন।"
" এইতো করতে হচ্ছে।"
" চারটা প্রকল্পের কাজ একসাথে চলমান রেখেছো। কিভাবে সামাল দিচ্ছো সান্নিধ্য? তোমাদের মধ্যে অনেক নেতারা তো চার বছরেও একটা প্রকল্পের কাজ সমাধা করতে পারে না। একবারে ভোটের আগে গিয়ে কাজ শেষ করে জনগণকে বোকা বানায়।"
" একসাথে চারটা প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়নি। সময় তারিখে ভিন্নতা রয়েছে। কাজগুলো সম্পূর্ণ করা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। কষ্ট হলেও আমি করছি। এখন কে কি করলো সেটা তো আমার দেখার বিষয় না। এজন্য সরকার মন্ত্রী রয়েছে।"
বড়মামা আলগোছে মাথা নাড়িয়ে বলেন," তাতো। কালকের খবরে ফটিকছড়ির গ্রামটা কি যেনো নাম মনে পড়ছে না। ওহ আচ্ছা ভুজপুর। মনে পড়েছে। সেখানে তো দূর্বিষহ অবস্থা যাতায়াতের। বর্ষার মৌসুমে কিভাবে কি করতো এতোদিন আমার তো ভেবেই মাথা খারাপ।"
" বোঝেন তাহলে। সান্নিধ্য এসে না হয় হাল ধরেছে বুঝলাম। কিন্তু এর আগে এমপিগুলো কি করেছে? এতো কোটি কোটি টাকা বাজেট পাস করিয়েও জনগণের দূর্ভোগ কমাতে পারেনি। উল্টো আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।"
" সবই দূর্নীতির অবক্ষয়।"
" সান্নিধ্য তোমার উচিত ছিলো এমপি পদে অভিষিক্ত হওয়ার পর পরেই এই বিষয়টার উপর নজরদারি করা। একটা টেন্ডার পাস করতে তো মোট সময়সীমা ১-৩ মাস লাগে। সেখানে গোটা একটা বছর পর? "
সান্নিধ্য স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলে, " বিষয়টাতে বেশ জটিলতা ছিলো। অস্থাবর জায়গায় তো চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায় না। এর জন্য অনেক প্রসেস মেইনটেইন করতে হয়। এর উপরে ওখানকার মাটিতে সমস্যা ছিলো। পাইলিং করতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের অভিযোগ সামলে এক্সট্রাভাবে মাটি ফেলা হয়েছে। সেটা মোটামুটি স্থায়ী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এখন মুখে বললেই তো সব কাজ সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায় না। আপনারা বাজেট দেখেন টেন্ডার পাস দেখেন অথচ কাজ দেখেন না। কিন্তু ফলাফলের সময় আমাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে দিন অনায়াসে।"
শেষের কথায় উপস্থিত সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে গলার স্বর টেনে পরিষ্কার করে। বড়মামা হালকা কেশে বলেন,"আরে না.. না কি যে বলো।"
"সমালোচনা একটু তো নিতে শিখতেই হবে বাবা। নেতা হলে আলোচনা সমালোচনা থাকবেই। সরকারের লোক তোমরা। পাওয়ারই আলাদা। সেখানে পাবলিক ফিগার হিসেবে এটা আমাদের বাক স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে।"
সান্নিধ্য হালকা হাসে। শান্ত দীপ্ত চাহনিতে তাকিয়ে বলে,
" শুধু সমালোচনাতে কি পোষায় আংকেল? মাইর না খেলে ঠিক জমে না।"
" আমি যতদূর জেনেছি তোমার সম্পর্কে, তুমি মেইবি একটু কমই মাইর খাও। মাইর দেওয়াতে একটু সক্রিয়তা বেশি তাই না?"
"সেরকম কিছু না। আমার বিপক্ষ দল বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার করে ফেলে মাঝে মাঝে তখন একটু সক্রিয় হতে হয়।"
" অধিক সক্রিয় হয়ে আবার খুন খারাবির মধ্যে যেয়ো না যেন কখনো। মাইর টাইর ঠিক আছে তবে খুন খারাবি ভালো জিনিস না।"
" না না ভাই..আমাদের সান্নিধ্যের রাগ বেশি থাকলেও এসব খুনে টুনের মাঝে কখনো যাবে না। ওকে দ্বারা এসব হবেও না আশা করি। স্বভাবে একটু গরম এই আরকি।"
বড়মামার নিঃসঙ্কোচ বার্তায় সান্নিধ্য চোখ তুলে তাকাতেই দেখে তার হতে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে সরফরাজ। ঠোঁট তার বেশ খানিকটা প্রসারিত হয়ে আছে । মুখোভঙ্গি দেখে অনুমান করা যাচ্ছে, মাত্র বলা কথাটা হজম করতে যদিও একটু বেগ পোহাতে হয়েছে তবে মজা পেয়েছে। খুন খারাবি ভালো জিনিস নয়। তবে নেতাসাহেবের ঝুলিতে প্রায় আটটার কাছাকাছি হয়ে গিয়েছে।
----------------------------------------------------------
তিথি এবং শেহরিনের পরনে আজকে একই ধরনের লাল খয়েরি মিশেল জামদানী শাড়ি। মিসেস নাজনীনের দেওয়া উপহারে বাড়ির দুই বউ এর সাজপোশাক আজকে মিলে গিয়েছে। ধরতে গেলে শাশুড়ী মায়ের ইচ্ছাতেই হয়েছে। নয়তো তিথি স্বইচ্ছায় কখনো শেহরিনের সঙ্গে মিলিয়ে পরতো না। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় তার মন মেজাজ আজ বেশ প্রফুল্ল। কিচেন হতে শুরু করে সব জায়গাতেই শেহরিনের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে। একসঙ্গে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্প করছে।
অন্যদিকে শেহরিনও আজকে নিজেকে বেশ ব্যস্ত রেখেছে সাংসারিক কাজে। শাশুড়ী মায়ের দিক নির্দেশনা মতো সকল কাজে হাত লাগিয়েছে সে। মনের মধ্যে এক অন্যরকম আনন্দ ধারা বইছে তিথি ভাবির ব্যবহারে। মনে মনে তো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করাও সাড়া তার। আল্লাহকে বলেছে, তিথি ভাবিকে এমনই রাখতে। আর যেনো তার প্রতি রেগে না থাকে।
"শেহরিন হয়েছে?"
" জ্বি ভাবি হয়েছে।"
" আচ্ছা আমি তাহলে তাসিনকে একটু রেডি করিয়ে দিয়ে আসি তুমি এদিকটা নজর রেখো। ধরে বেঁধে রেডি না করিয়ে দিলেই এই ছেলে কিছুই করবে না। আম্মা এখনই চলে আসবে।"
" সমস্যা নেই ভাবি। আমি এদিকটায় আছি। আপনি যেতে পারেন।"
তিথি কিচেন ছেড়ে চলে যেতেই শেহরিন ছোট করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। ঠোঁট জুড়ে তার নির্মল হাসি প্রস্ফুটিত হয়। আজকে সবকিছু কেনো জানি ভ্রমের ন্যায় লাগছে। তিথি ভাবির হুট করে আমূল পরিবর্তন তাকে বিস্মিত করে তুলছে প্রতিনিয়ত।
সানজি আর মুহিদের জন্য এতোক্ষণ দুই জা মিলে আলাদাভাবে প্লেট ডেকোরেশনের কাজটা সম্পন্ন করেছে। ডান হাত জুড়ে শেহরিনের কাবাবের তেল লেগে আছে। ধুতে যাওয়া মুহুর্তে হুট করে তার কান হতে সোনার ঝুমকাখানি খুলে ফ্লোরে পড়ে যায়। একহাতে সামলে উঠতে না পেরে কোনমতে হাতখানা ধুয়ে নেয় সে।
" এটা এখন কিভাবে লাগাবো আমি?"
স্বর্ণের ভারী ঝুমকাজোড়া পড়ার পর থেকে অস্বস্তি শুরু হয়েছে শেহরিনের। এতো ভারী ভারী গহনা পরার অভ্যাস নেই আবার পরতেও খুব একটা ভালো লাগে না। ছোট একটা দুল পরেছিলো কিন্তু শাশুড়ী মায়ের আদেশে আবার পরিবর্তন করে ফেলে। ভয়ে মুখ ফুটে বলতে পারেনি এসবে অভ্যস্ত নয় সে।
কান লাল হয়ে এসেছে। উপায়ন্তর না পেয়ে বাম কানের দুলটাও খুলে ফেলে।
" ইশ্ শান্তি। এতোক্ষণ মনে হচ্ছিলো কান ছিঁড়ে পড়বে আমার।"
" অস্বস্তি লাগছে দুল পড়ে?"
পিছন হতে শাশুড়ী মায়ের কন্ঠস্বর পেতেই মৃদুভাবে শরীর ঝাঁকিয়ে উঠে শেহরিনের। চোখ দুটো বড় বড় করে সে হাতের মুঠোয় চেপে ধরার চেষ্টা করে ঝুমকোজোড়া। প্রতিত্তুর দেওয়ার আগেই মিসেস নাজনীন সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেন,
" বলোনি কেন তাহলে?"
" আম্মা ডান কানের দুলটা খুলে পরে গিয়েছিলো।"
" লাগাওনি ঠিকমতো?"
" হয়তো ঠিকভাবে লাগানো হয়েছিলো না।"
" পরতে কষ্ট হলে জোর করার দরকার নেই। উপরে গিয়ে রেখে এসো। আর আখনী পোলাওটা প্লেটে মনে হচ্ছে কম হয়েছে।"
" আমি এক্ষুণি রেখে আসছি।"
কিচেন পেরিয়ে ড্রয়িংরুম হয়ে যাওয়া পথে শেহরিন সান্নিধ্যকে দেখে থেমে যায়। নেতাসাহেব সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনায় বেশ মগ্ন। এক পলক নিজের হাতে ঝুমকোজোড়ার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভেবে তড়িৎ পায়ে সে তার নেতাসাহেবের দিকে ছোটে।
চলমান আলাপ আলোচনার এক ফাঁকে একটু সুযোগ পেতেই শেহরিন সান্নিধ্যের বসারত জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। খানিকটা মাথা ঝুঁকে ফিসফিস করে কন্ঠ নামিয়ে বলে,
"এই দুলটা একটু রাখুন আপাতত। আমি একটু পরে এসে নিয়ে যাচ্ছি।"
সান্নিধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো মাত্র শেহরিন দুল জোড়া হাতের উপর দিয়ে দেয়।
" কোনো সমস্যা হয়েছে?"
" না কোনো সমস্যা হয়নি। রাখুন আপনি। আমি আসছি।"
শেহরিন ঝটপট চলে যায় কিচেনে। সান্নিধ্য হাতের তালুতে স্বর্ণের ঝুমকোজোড়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে আবারো আলোচনার মাঝে ডুব দেয়। কথার ফাঁকে এক পর্যায় পাশ কাটিয়ে যাওয়া মিসেস নিলুফা এবং ছোট মামি সান্নিধ্যের হাতে দুল দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন।
" কি ব্যাপার সান্নিধ্য হাতে এটা কার ঝুমকো?"
" ঝুমকো?"
" ইয়ারিংসটা কার?"
" ওহ আচ্ছা শেহরিনের।"
মিসেস নিলুফা সান্নিধ্যের ছোট মামির গায়ে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে হেসে হেসে বলেন,
"বাহ বাহ দেখুন আপা আমাদের ছেলের কি বউয়ের প্রতি ভালোবাসা। কি সুন্দর বউয়ের ঝুমকো হাতে রেখেছে। অথচ তার চাচ্চুকে কোনদিন আমি একটু ব্যাগও ধরাতে পারেনি।"
" তার মামাও একইরকম আপা। মেয়ে মানুষের জিনিসাদি ধরতে নাকি তার লজ্জা লাগে। ভাগ্নেকে দেখে একটু শেখাতে হবে।"
" ভালো ভালো.. বাবা। মামা চাচাদের মতো হওনি এই অনেক।"
মিসেস নিলুফা ছোট মামি হাসতে হাসতে প্রস্থান নিতেই বড়মামা পাশ হতে একটা ফাইল বাড়িয়ে দেন। এক হাতে চোখে চশমা পরতে পরতে বলেন,
" সান্নিধ্য এই ফাইলটা একটু দেখে দাও তো।"
" কিসের ফাইল এটা?"
"আমাদের নতুন কন্সট্রাকশনে নোটিশ দিয়েছে। হাতের ওটা টেবিলে রেখে দেখো।"
সান্নিধ্য বড়মামার কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে তার শার্টের বুকপকেটে ঝুমকোজোড়া রেখে দেয়। অতঃপর হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিয়ে দেখতে থাকে। এহেন কান্ডে বড়মামা যৎ কিঞ্চিত হেসে বলেন,
"মেয়েলি জিনিসপত্র আবার শার্টের পকেটে রাখার কি আছে?"
" বউ মূল্যবান, বউয়ের জিনিসপত্রও মূল্যবান। আর মূল্যবান সবকিছুকেই উপরে স্থান দিতে হয়।"
__________________________________________
আকদের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় অবশেষে বরপক্ষের আগমনে। ঘড়ি ধরে ঠিক সাড়ে আটটার দিকে প্রবেশ ঘটে তাদের সুখনিবাসে। একে একে তিনটে গাড়ি অভ্যন্তরে এসে দাঁড়ায়। নিচ হতে শোরগোল কানে ভেসে আসতেই বধূরূপী কন্যা নড়েচড়ে উঠে। ভারী লেহেঙ্গা আর গহনার ভারে এক প্রকার সে নুইয়ে পড়েছে।
" আপু ভাইয়ারা এসে পড়েছে।"
" জারিন একটু পানি এনে দে।"
" তুমি এতো পানি কেন খাচ্ছো আপু?"
সানজি নাজুক চোখে তাকায়। শুকনো গলায় বলে," বুঝতে পারছি না। শুধু পানি পিপাসা লাগছে।"
" ওহহো আপু তুমি বেশি নার্ভাস হয়ে পড়েছো।"
" তানিশা আপু শেহরিন ওরা কোথায়? "
" সবাই ব্যস্ত অতিথি আপ্যয়নে। তোমার শ্বশুর বাড়ির লোকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।"
" সবাই এসে গিয়েছে? "
" মনে তো হচ্ছে।"
জারিন পানি এগিয়ে দিতেই ঢকঢক করে পুরো পানি সাবাড় করে ফেলে সানজি। বুকের মধ্যে কেমন যেন অজানা অনুভূতি সয়লাব করে তুলছে তাকে। স্থির হতে পারছে না সহজেই।
" এই হলো তোমাদের?"
তিথি তানিশা শেহরিন একসঙ্গে প্রবেশ করে সানজির কক্ষে। এগিয়ে এসে শশব্যস্ত হয়ে বলে," এই মেয়ে চলো এখন নিচে যেতে হবে। "
"ভাবি দেখো না আপু ভীষণ নার্ভাস ফিল করছে।"
" বিয়ের সময় একটু নার্ভাস ফিল করেই মেয়েরা। সিরিয়াস কিছু না।"
" এখনি যেতে হবে?"
"রাত নয়টা বেজে চলেছে। আর কত দেরি করতে চাও?"
" না.. মানে। "
" কোনো মানে টানে নেই। চলো চুপচাপ।"
শেহরিন তিথি দু'জন সানজির দুপাশে দাঁড়ায়। আলতোভাবে হাত ধরে ধীরে ধীরে পদযাত্রা বাড়ায় বিয়ের আসরের দিকে। শেহরিন যাওয়া পথে কানে কানে ধীর কন্ঠে বলে,
" আমি তোমার ছোট হয়ে বিয়ে করেছি আর তুমি বড় হয়ে ভয় পাচ্ছো মেয়ে? "
" বিয়ে করে মনে হচ্ছে খুব সাহস হয়ে গিয়েছে আপনার।"
" হয়েছে তো।"
" ঠিক আছে দেখবো আপনার কত সাহস? "
" এসো এসো দেখাবো।"
" আপনার নেতাসাহেব যখন বাসায় থাকবে না তখন কিন্তু দেখাতে হবে সাহস।"
" উহু তাহলে হবে না।"
" হুহ সাহস দেখে ভয় পেলাম আপনার।"
সানজিকে নিচে এনে বসানো হয় নির্ধারিত আসনে। মুহিদের পরিবারের সকল আত্মীয় স্বজন একে একে সবাই কুশল বিনিময় করে নতুন বউয়ের সাথে। সানজিকে দেখে সবারই বেশ পছন্দ হয়। উষ্ণ আলিঙ্গন সঙ্গে আদুরে বার্তায় নাজুক নববধূকে আগলে নেয় প্রত্যেককে।
সান্নিধ্য দূর হতে বোনকে দেখে ক্ষীণ হাসে। ছোটোবেলায় আম্মা সানজিকে লাল শাড়ি পরিয়ে বউ সাজিয়ে ছবি তুলে রাখতো। পুতুলের মতো লাগতো দেখতে। সানজিকে সম্ভবত তাদের কোনো ছেলে আত্মীয় স্বজন কখনো কোলে নেয়নি কিংবা স্পর্শ করে আদর করেনি ছোটবেলায়। এক্ষেত্রে সরফরাজ সান্নিধ্যের কঠিন নিষেধাজ্ঞা ছিলো। দুজনেরই কেউই কোনোভাবেই তাদের বোনকে স্পর্শ করতে দিতো না। মনে পড়ে সানজির প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন বাবা কোলে তুলে আদর করে দিয়েছিলো। অতঃপর চাচ্চু কোলে নেওয়ার আগেই সান্নিধ্যে গর্জে উঠে না করেছিলো। টান দিয়ে সরিয়ে এনেছিলো বোনকে। এই নিয়ে অশান্তি বেঁধে যায়। বাবা ধমকে দফারফা করে দেয়। তবুও সে টলে না। কোনোভাবেই সে তার বোনকে ছুঁতে দিবে না।
সানজিও ছিলো একই রকম। ভাইয়ারা যেটা বলবে সেটাই সে শুনবে। এক্ষেত্রে বাবা আম্মা আদুরে অনুরোধ করলেও গলতো না। সেই স্বভাব তার আজও যায়নি। সান্নিধ্য বা সরফরাজ যেটা বলবে এক বাক্যে সেটা মেনে নেওয়া তার ধর্ম। কিন্তু বাবা কিংবা আম্মা হাজার বুঝিয়েও মানাতে পারে না।
পাথুরে বুকে কেমন যেন শূন্যতা অনুভব করে সান্নিধ্য। মনে হচ্ছে ভিতর হতে কেউ টেনে হিঁচড়ে তার ছোট্ট সানজিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের যত্নের পুতুলটাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই মেয়েকে ছাড়া তো এই বাড়ি শূন্যে খাঁ খাঁ করবে। থাকবে কিভাবে? জরিমানা করবে কে?
" কি ভাবছিস? "
" এই মেয়েটা এতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলো কেন?"
" মেয়েরা চোখের পলকে বড় হয়ে যায়।"
" ওকে দেখে আম্মার সাজানো সেই ছোট্ট পুতুলটার মতো লাগছে। অথচ আজ নাকি তার সত্যি বিয়ে। "
সরফরাজ মলিন হাসে। নিস্তব্ধ এক ব্যথায়, শূন্যতায় দুপুর হতে গলা দিয়ে খাবার নামছে না তার। শুধু মাত্র সৌজন্যেতার খাতিরে মুখে হাসি রেখে সব কাজ করে যাচ্ছে। বুকের ভিতরে বইছে তার অসমকালীন ঝড়।
" শক্ত হ সান্নিধ্য। ওর সামনে নরম হলে ভেঙে পড়বে।"
" সানজি যদি পছন্দ না করতো মুহিদকে,ওকে এখন কোনোভাবেই বিয়ে দিতাম না আমি । আজ যা কিছু হচ্ছে শুধু মাত্র ওর ইচ্ছায়।"
" আমার তো কখনোই মনে হয়নি সানজি বড় হয়েছে ওকে বিয়ে দিতে হবে। সেই সাত বছরের মাথায় দুই শিং বাঁধা সানজিই চোখে ভাসে শুধু।"
-------------------------------------------------
রাত নয়টা। হুট করেই বিয়ে বাড়ির আমেজ স্তম্ভিত হয়ে উঠে মুহিদের চাচার কথায়। সবাই আসলেও এখনও অব্দি পৌঁছায়নি মুহিদ। অথচ সে নাকি সবার আগে বের হয়েছে। এদিকে সবাই ভেবেছিলো হয়তো মুহিদই সবার শেষে রওনা দিয়েছে তাই এতোটা সময় লাগছে।
"আশ্চর্য? এতো সময় তো লাগার কথা নয়। মুহিদের বাবা মুহিদকে ফোন করো তো। ছেলে এখনো আসছে না কেন?"
" ফোন বন্ধ।"
" মুহিদ কি একাই ছিলো গাড়িতে? "
"জ্বি। নতুন গাড়ি কিনেছে কালকে। ওর ইচ্ছে ছিলো সর্বপ্রথম সানজিকে তুলবে গাড়িতে। এজন্য কাউকে সঙ্গে নেয়নি। আমরাও তাই আর জোর করিনি।"
সানজি দূর হতে সবার কথা বার্তা দেখে শেহরিনের হাত চেপে ধরে। আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে বলে, " কি..হয়েছে? মুহিদ আসেনি এখনো?"
" কিছু হয়নি আপু। ভাইয়া এসে যাবে এক্ষুণি। তুমি প্লিজ শান্ত হও। কোনো ভয় নেই ইনশাআল্লাহ।"
" এখনো আসছে না কেন তাহলে?"
"এইতো এসে যাবে। পথঘাটের ব্যাপার। একদম ঠিক সময়ে তো পৌঁছানো যায় না তাই না?"
"আমার ভীষণ ভয় লাগছে।"
সময়ের মতো সময় বয়। উপস্থিত অতিথিরা হয়ে উঠে অধৈর্য্য। বরের আত্মীয় স্বজন বাবা মা এসেছেন অথচ বরের কোনো খোঁজ নেই। শুরু হয়ে যায় কানাঘুষা। ফোনে ফোনে অস্থির হয়ে উঠলেও অপর পাশ হতে আসে না কোনো প্রতিত্তুর।
মিসেস নাজনীনের হাত পা কাঁপছে ভীষণভাবে। মেয়ের দিকে তাকাতে ভয় লাগছে তার। যদি কোনো দূর্ঘটনা কিংবা অন্যকিছু হয় তাহলে এই মেয়েকে সামলাবে কি করে সে। মনে মনে অনবরত আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকে।
সান্নিধ্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বাবার পাশে। সরফরাজ দ্বিকবিদিক ভুলে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। ইতিমধ্যে লোক লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে মুহিদের খোঁজে। সবাই দূর্ঘটনাজনিত কারণ আশঙ্কা করে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে।
"আমাকে এভাবে আটকে রাখার কি কারণ?"
" লোকজন তো গিয়েছে তুমি যেয়ে কি করবে? "
" আমি যেয়ে কিছু না করলেও বাহিরে বের হতে আপত্তি কিসে?"
" আপত্তি অনেক কিছু সান্নিধ্য বোঝার চেষ্টা করো। বাহিরে অলরেডি মিডিয়ার লোকজন এসে হাজির হয়ে গিয়েছে। পুরো হালিশহর জেনে গিয়েছে তোমার বোনের হবু বর নিখোঁজ।"
" মিডিয়া তো মিডিয়ার কাজ করবেই। আমার কাজ আমাকে করতে দিচ্ছো না কেন?"
" তুমি তো মুহিদকে পেলেই খুন করে ফেলবে। এটা তো আমি ভালো করে জানি। সেটা তো আমি হতে দিতে পারিনা তাই না?"
" আগে খুঁজে বেরটা তো করতো দাও।"
"চুপচাপ থাকো। পারলে বোনকে গিয়ে সামলাও।"
সান্নিধ্য নিজের ভিতরের জ্বলন্ত ক্রোধটাকে আধাঘন্টা যাবত নির্নিমেষ হজম করে যাচ্ছে। পারছে না নিজের নিকৃষ্ট রূপকে প্রস্ফুটিত করতে। সানজি শেহরিন না থাকলে এতোক্ষণ সেটা বেরিয়ে যেতো। ভাঙচুর করে ফেলতো সবকিছু। শুধু মাত্র এই দুইটা মানুষের জন্য ধৈর্য্যের চরম পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে সে চুপচাপ।
"স্যার। "
সান্নিধ্য পিছু ঘুরে তাকায়। ঘর্মাক্ত শরীরে রিমন তার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে নিস্তেজ গলায় বলে, "আসিফ ভাই।"
" হ্যালো।"
" হ্যালো ভাই, আফিকুর মুহিদ রাত আটটা পঁয়তাল্লিশে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্য ঢাকা ছেড়েছে।"
সান্নিধ্য এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। অতিরিক্ত রাগে তার কপালের শিরাসহ হাতের রগ স্পষ্টত হয় আসে। আগুনে ভস্মীভূত হতে থাকে সে। ক্ষুরধার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ডান হাত মুঠো পাকিয়ে বলে," শু*য়োরের বাচ্চা কয়দিন থাকবে পালিয়ে। দেশের মাটিতে পা দেওয়ার সাথে সাথে যেখানে পাবি চাপাতি দিয়ে ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে দিবি। কোনো কথা হবে না।"
" বলতে হবে না ভাই। ওর অপেক্ষায় থাকবো আমরা।"
সান্নিধ্য কান হতে ফোন নামিয়ে রিমনকে দিয়ে দেয়। তীক্ষ্ণ গলায় বলে," বাইরের অবস্থা কি?"
" যে যেমন পারছে নিজেদের মতো করে নিউজ তৈরি করছে।"
" সব সরিয়ে দাও। দরকার হলে থানায় কল করো। একটা কুকুরও যেনো না থাকে।"
"জ্বি ভাই।"
রিমন চলে যেতেই সান্নিধ্য সানজির কাছে যাওয়া মুহুর্তে তার ফোন জোরালোবেগে ভাইব্রেট হয়ে উঠে। পকেট হতে ফোনটা বের করে দেখে সেই আননোন নাম্বার হতে ক্ষুদে বার্তা।
" সুইটহার্ট,, মন ভাঙার চেয়ে বিয়ে ভাঙার কষ্টটা কি বেশি? মন খারাপ করো না হ্যান্ডসাম। আমি তো মন খারাপ করিনি। জাস্ট একটু কলিজায় ঘা দিলাম তোমার। হ্যাভ আ গুড নাইট।"