|সেন্ট'স ক্যাফে, বিকেল চারটা|
মধ্যাহ্নের ঘোর কেটে অপরাহ্নের দিকে ধাবিত হচ্ছে বেলা। সূর্যরশ্মির সোনালি আলো কাঁচের জানালা ভেদ করে উপচে পড়ছে টেবিলজুড়ে, হাতের রেখায়। শেহরিন হাত মুঠো করে চেপে ধরছে গায়ে মাখা রোদের কণাগুলো। আবার মুঠো খুলে ছেড়ে দিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে। নিজমনে নিজ ছন্দে সে বেখেয়ালি কাজে মত্ত। বেশ খানিকটা সময় ধরে সে এমন চুপচাপ হয়ে বসে আছে। কারণ সামনে বসারত ব্যক্তির সময়ই হচ্ছে না তার সাথে কথা বলার।
" দুঃখিত। অনেকটা সময় অপেক্ষায় রাখলাম। আসলে কাজের ভীষণ চাপ এসেছে। সামনে এইচএসসি শিক্ষার্থীদের বোর্ড এক্সাম। এজন্য আর কি... যাই হোক হঠাৎ জরুরি তলব যে? "
তৌসিফের নিজকার্যে ব্যস্ততা শেষ হতেই শেহরিন বেখেয়ালিপনা ছেড়ে পূর্ণ মনোযোগী হয়ে বসে। নিজেকে ধাতস্থে রেখে পরিষ্কার কন্ঠে বলে, " জরুরি তলব নয়। আমি আপনাকে বলেছিলাম যদি ফ্রি টাইম থাকে তাহলে মিট করতে পারি। কাজে প্রেশার রেখে অবশ্যই আসতে বলেনি।"
তৌসিফ ফোনটা বন্ধ করে টেবিলে রাখে।শব্দবিহীন হেসে বলে, " হবু বউ ডেকেছে। কাজ থাকুক আর না থাকুক আসতে তো হবেই। আমার চাচা বলেন, গৃহিণীরা নাকি বাড়ির কর্ত্রী। তারা তাদের বাড়ির লোককে যেটা আদেশ করবেন সেটা করতেই হবে। কোনো ছাড় নেই।"
" আচ্ছা। চা বা কফি? "
" আহঃ কফি ।"
শেহরিন হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডাকে। দুটো ব্ল্যাক কফির অর্ডার দিয়ে তৌসিফের দিকে তাকিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলে, " তা কালকে রাতে আপনার কাজটা ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হয়েছিলো? ".
" সরি কোন কাজ? "
" আপনার হুট করে গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল এসেছিলো যে.. "
সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদে তৌসিফ খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে উঠে। মুখোরেখা দেখে অনুমান করা যায়, হয়তো প্রশ্নটা তার জন্য আশানুরূপ ছিলো না । জোরপূর্বক হেসে বলে,
" হ্যাঁ হয়েছে। আসলে সরকারি আমলাদের গাধার খাটুনি খাটতে হয়। কখন কোন সময় উপর থেকে নির্দেশনা আসে বলা মুশকিল। আপনি ঠিকঠাক বাসায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন? "
" না পৌঁছালে আজকে এখানে কিভাবে এলাম?"
" সরি? "
শেহরিন মৃদু হাসে। দম ছেড়ে বলে,
" আ পার্ট অফ জোক। নাথিং টু বি সিরিয়াস। আপনার কাছে তো আমার ফোন নাম্বার রয়েছে। মেইবি মনিকা আন্টি আপনাকে দিয়েছিলো সেদিন তাই না ? "
" হ্যাঁ আছে। কেনো? "
" আপনার কি উচিত ছিলো না একটাবার খোঁজ খবর নেওয়া আমি কিভাবে বাসায় ফিরলাম? "
" সরি। আসলে আমার কাজটা ভীষণ গুরুতর ছিলো। চাইলেও ফোনকল করা হয়ে উঠেনি ।"
" মানুষ কাজ করবেই। কাজের মাঝে থাকবেই । এটা খুব স্বাভাবিক। তবে, আমার মনে হয় আপনার ব্যাপারটা মাথাতেই আসেনি যথাসম্ভব।"
তৌসিফ শেহরিনের দিকে পলকহীন চোখে তাকায়। নিরেট স্বরে বলে, " জাজ করছেন?"
" বিষয়টা জাজ করার মতোই। যদি একটু মাথা খাটিয়ে বিবেচনা করতে সক্ষম হন তাহলে হয়তো বুঝতে পারবেন। অন্যথায় নয়। "
" আপনার প্রব্লেম হয়েছিলো যেতে? "
" ওই যে বললাম বিবেচনা করুন, বুঝতে পারবেন। যাই হোক, এসব বাদ দেই। আচ্ছা আপনি তাহলে বিয়েটা নিয়ে সত্যি সিরিয়াস? "
" অবশ্যই। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। ইভেন ভালোও বেসে ফেলেছি। বিয়ে নিয়ে সিরিয়াস হবো না? কেনো আপনি সিরিয়াস নন? "
" আমারটা পরে বলছি। তবে আমি বেশ অবাক জানেন, আপনি এক দেখাতেই আমাকে কিভাবে এতো পছন্দ করে ফেললেন? বাসায় বিয়ের প্রস্তাব অব্দি নিয়ে এসেছেন। হোয়াট দ্যা রিজন? "
তৌসিফ বাঁকা ঠোঁটে হাসে। ধীর কন্ঠে বলে, " রিজনটা হচ্ছে - আপনাকে শাড়িতে সেদিন অত্যাধিক মোহনীয় লেগেছিলো আমার কাছে ।চোখদুটো আটকে গিয়েছিলো জাস্ট ।
বিশ্বাস করুন, আপনি স্টেজে যতক্ষণ গান গাইছিলেন আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম আপনার দিকে। তখনই বুঝেছি আপনার প্রতি আমার অসম্ভব ফিলিংস তৈরি হয়ে গিয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব দিতেই হবে। "
কথা শেষ হতেই ওয়েটার আসে মাঝখানে । কফি সার্ভ করে দিয়ে চলে যেতেই শেহরিন নিজ কফি মগটা হাতে নিয়ে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, " আমি শাড়ি বিশেষ কোনো প্রোগ্রাম ছাড়া পড়ি না। সাজসজ্জা একদমই করি না। ধরুন আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হলো, তখন আপনি ব্যাপারটা পজিটিভলি নিতে পারবেন তো? আই মিন সাজসজ্জা দেখেই যেহেতু পছন্দ করেছেন সিম্পলিসিটি কিভাবে নিবেন সেটা জানতে চাইছি। "
" একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার বউ সাদামাটা হয়ে থাকবে কেনো? সত্যি কথা বলতে বিষয়টাকে আমি সমর্থন করি না। সমাজে আমাদের আলাদা একটা আইডেন্টিটি রয়েছে। সাধারণের কাতারের চেয়ে অবশ্যই আলাদা। আপনি যদি আমার কোনো প্রোগ্রামে আজকে যেমন সিম্পল লুকে এসেছেন সেভাবে অ্যাটেন্ড করেন দৃষ্টিকটু দেখাবে সেটা। আমি চাইবো না সেরকমটা হোক।"
" বুঝতে পেরেছি, আপনার ন্যাচারালের চেয়ে আর্টিফিসিয়াল ব্যাপারটা অধিক পছন্দের।"
গরম কফির মগে হালকা চুমুক টেনে টেবিলে রাখে তৌসিফ। খানিকটা শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে বলে, " আপনি একজন উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও ক্লাস মেইনটেইন করতে জানেন না? সবার সাথে নিজেকে মেলাবেন কেনো? আপনি একজন ভার্সিটি স্টুডেন্ট। পোশাকে ব্যবহারে অবশ্যই অন্যদের চেয়ে নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করবেন। যেনো মানুষ বোঝে আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড কি। "
শেহরিনের হুট করে কথায় এবং কফি উভয়তেই বিতৃষ্ণা জাগে। প্রথম কয়েক দফা তা পান করলেও এখন তার আর ইচ্ছে জাগ্রত হয় না। ডান হাতে কফি মগটা ধরে বাম হাতের আঙুলগুলো দিয়ে ঠকঠক শব্দ করতে করতে বলে,
" ঠিক বলেছেন। আপনার মতো এভাবে ভেবে দেখিনি। অবশ্যই ব্যাকগ্রাউন্ড শো করা উচিত। যাতে মানুষ বোঝে আমি উপরি লেভেল থেকে এসেছি।"
" ইয়েস্। মানুষ হিসেবে নিজের অবস্থান শো করানো জরুরি।"
" আচ্ছা বিয়ে পরবর্তী আপনার পরিকল্পনা কি? প্লিজ টেক ইট নরমাল। আমি জাস্ট ক্লিয়ার হতে এসেছি। যেহেতু শুনছি কালকে এনগেজমেন্ট এর একটা কথা বার্তা চলছে। তো এসব বিষয়ে একটু আগে হতে ক্লিয়ার হওয়া উচিত।"
" ওকে নো প্রব্লেম। আমি বুঝতে পেরেছি। এজন্যই আপনি আমাকে কল করেছেন।"
" ধন্যবাদ। বিষয়টা বোঝার জন্য। "
তৌসিফ তর্জনী আঙুল গালে ঠেকিয়ে কিছুটা ভাবুকসুরে বলে, " আমি চাই আপনি গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে পড়াশোনাটা অফ করে দিন। একটা মেয়ের জন্য গ্রাজুয়েশনই এনাফ। এমবিএ করা, সংসার বাচ্চা কাচ্চা সামলানো ভীষণ টাফ্। কি দরকার এতো চাপ নেওয়ার? রিলাক্সে সংসার করবেন, স্বামীর মন যুগিয়ে চলবেন। দ্যাটস ওকে।"
শেহরিন কিছুক্ষণ স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে তৌসিফের দিকে। এসি চললেও শরীরটা তার ঘামতে থাকে। গরম অনুভূত হয়। হাতের কফিটা টেবিলে রেখে শান্ত কন্ঠে বলে, " একজন ক্যাডারের স্ত্রী শুধু মাত্র গ্রাজুয়েটেড হবে? আপনার মান সম্মানে লাগবে না। "
" মান সম্মানে কেনো লাগবে? চুয়েটের ট্যাগ তো লাগিয়েই রেখেছেন নিজের সঙ্গে। মানুষ জনের মুখ বন্ধ করতে এইটুকু হলেই চলবে। আর বিশেষ করে আমাদের ফ্যামিলিতে কোনো মেয়েই জব করে না। প্রয়োজন হয় না আর কি। আমাদের পুরুষদের ইনকামই যথেষ্ট।"
" আচ্ছা। কিন্তু ধরুন, গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর আমি চাইলাম জব করবো এমবিএ কমপ্লিট করবো। আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন। মানবেন না? "
তৌসিফ এলিয়ে দেওয়া শরীর টেনে সোজা হয়ে বসে। টেবিলে দু-হাত মুঠো করে কিছুটা শেহরিনের দিকে ঝুঁকে মুখে হাসি টেনে বলে, " ভেরি ক্লেভার গার্ল ইউ আর। ডিরেক্ট ইমোশনালি হিট করতে চাইছেন? "
" সরি ! আপনার কাছে সিরিয়াস ম্যাটারটা ইমোশনাল লাগলো কেনো বুঝতে পারলাম না। "
" সেরকমটাই মনে হচ্ছে। যাই হোক, আমি বুঝতে পারছি না আপনি কেনো এই কথা বলছেন। আপনি আপনার বাবার একমাত্র সন্তান। সমস্ত প্রোপ্রাটি আপনার নিজের। ফাইন্যান্সিয়াল দিকে কোনো ঘাটতি নেই। হোয়াই ডু ইউ ওয়ান্ট টু টেক আননেসেসারি প্রেশার?"
শেহরিন তাচ্ছিল্য মাখা হাসি হাসে। শীতল কণ্ঠে বলে, " এই বিষয়টা আমার মানতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, একজন বিসিএস ক্যাডার হয়ে আপনি এই ধরনের কথা বলছেন। শিক্ষাকে মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে আপনি এই পর্যায়ে এসেছেন অথচ সেই শিক্ষাকে তুলনা করছেন বাবার সম্পত্তির সঙ্গে?
রিয়েলি দ্যাট সাউন্ডস স্ক্যারি টু মি। তাহলে, স্কুল কলেজে পরিদর্শনে গিয়ে বাচ্চাদের আপনি কি শিক্ষা দিয়ে আসেন? যাদের বাবার সম্পত্তি আছে তারা যেনো শুধু গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেই থেমে যায় তাই তো?? "
তৌসিফ শেহরিনের তাচ্ছিল্য মাখা হাসি আর কথায় মুখে আঁধার নামায়। থমথমে গলায় বলে, " বিষয়টার ভুল ডেফিনেশন বের করেছেন আপনি।"
" প্লিজ আমার ভুল ধরতে আসবেন না এই ব্যাপারে অন্তত। আমাকে আমার মতো করে বুঝে নিতে দিন। আচ্ছা এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথায় আসি। আপনি তো আমার সৌন্দর্যতা দেখে পছন্দ করেছেন। অ্যাকচুয়াল আমিটা কি সেটা তো জানেন না তাই না? "
" না। এখনো জানার সুযোগ হয়ে উঠেনি। "
" ওকে ক্লিয়ার করি তাহলে। প্রথমত, আমি রোমান্টিসিজম শব্দটার সঙ্গে ভীষণ অপরিচিত। যেমন ধরুন, এই যে আপনার আমাকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছে, ভালোবেসে ফেলেছেন। অথচ পরপর দুইবার মিটেও আমার মনে আপনার জন্য কোনো ফিলিংস তৈরি হয়নি। কোনো ভাবনা চিন্তা আসেনি। বিষয়টা শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি। আমি এক্ষেত্রে দূর্বল্।
দ্বিতীয়ত, আমি ইন্ট্রোভার্ট এক্সটোভার্টের কম্বাইন্ড প্যাক। সবসময় হৈ হুল্লোড় বা আমাদ প্রমোদের মধ্যেও থাকি না আবার একদম চুপচাপও থাকি না। পরিস্থিতি পরিবেশ অনুযায়ী নিজেকে প্রকাশ করি। আপনার কাছে বিষয়টা হয়তো আনইজি লাগতে পারে যেমন, আপনি আমাকে বলছেন এই জায়গায় উচ্ছ্বসিত হও বা চুপ থাকো আমি সেটা করতে পারলাম না। একটা ওকোয়ার্ড সিচুয়েশন ক্রিয়েট হবে আর কি!
তৃতীয়ত, আমি খুব আনাড়ি এবং ঘরোয়া কাজে অপটু একটা মেয়ে। সংসারের নাইনটি পার্সেন্ট বিষয়ই জানি না। আপনার কথানুযায়ী যেটা বুঝলাম আপনি সংসারী মানুষ। এক্ষেত্রে হয়তো বিরাট সমস্যা তৈরি হবে।"
শেহরিনের কথা শেষ হতেই তৌসিফ লম্বা করে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে । পুনরায় চেয়ারে হেলান দিয়ে হেসে বলে, " আপনি তো দেখছি জটিল মানুষ। চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। এজন্যই কিন্তু বলেছি, গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা শেষে সংসার ধর্মে মন দিন। এগুলো সমস্যা দূর হয়ে যাবে। বাট বিষয়টা তো আপনি ক্রিটিসাইজ করে দেখলেন।"
" আপনি বিষয়টা সহজ করছেন না কেনো? একটা ভালো ঘরোয়া মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিন। সমস্যা সলভড।"
" সরি। তৌসিফ যাকে পছন্দ করেছে তাকেই সে বিয়ে করবে। আফটার অল এমন জিরো ফিগার সাথে সুন্দর মেয়ে পাওয়া কঠিন। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, আপনি এখনো পর্যন্ত সিঙ্গেল আই মিন...
শেহরিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তৌসিফের দিকে। তৌসিফ শেহরিনের শক্ত চাহনি দেখে উচ্চশব্দে হেসে বলে, " আই মিন কোনো পিছুটান নেই এটা বুঝাতে চেয়েছি। প্লিজ ডো'ন্ট থিংক অ্যাবাউট এনিথিং ইলস্।"
" আপনার আর কিছু জানার আছে? "
" না আর কিছু জানার নেই। বিয়ের পর সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে। এসব নিয়ে আপনার মোটেও ভাবতে হবে না। আপনার কিছু জানার আছে কি আর? "
" না এনাফ জেনেছি। আর কিছুর প্রয়োজন নেই।"
" ওকে তাহলে কালকে আসছি আপনাকে নিজের করে নিতে। "
শেহরিন ঘড়িতে সময় দেখে উঠে পড়ে । ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে হাসিমুখে বলে, " দেখা হবে। "
" চলুন ড্রপ করে দেই আপনাকে? "
" নো থ্যাংকস্। আমি যেতে পারবো।"
" শিউর। "
" হোয়াই নট। গুডবাই।"
শেহরিন বিল মিটিয়ে পা বাড়ায় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। স্লাইডিং ডোর টেনে বাহিরে পা দেওয়া মুহুর্তে এক পলক ফিরে তাকায় তৌসিফের দিকে। বেচারা ফোন নিয়ে ব্যস্ত। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি বজায় রেখে সে কিঞ্চিত মাথা নাড়িয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় তৎক্ষনাৎ। বের হয়ে যায় ক্যাফে হতে।
_______________________________________
| রাত নয়টা, নিকুঞ্জ মহল |
আর মাত্র পনেরো বিশ মিনিটের মাঝেই বাবার আগমন ঘটতে চলেছে নিকুঞ্জ মহলে। সেই খুশিতে শেহরিন বারে বারে পথ দেখছে ছটফটিয়ে । বেলকনি হতে নিচের গেইটটায় রেখেছে সূক্ষ্ম দৃষ্টি। কখন গাড়ির শব্দ হবে, কখন ফ্রন্ট লাইটের আলো প্রবেশ করবে ভিতরে।
হাতে পড়নের জামায় তার মশলার গুঁড়ো মাখানো। প্রায় দু'ঘন্টার চেষ্টায় বাবার জন্য সে স্পেশাল চিকেন কারি রান্না করেছে। যদিও ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে কাজু বুয়া। তবুও নিজ চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি। কাজু বুয়া স্বয়ং তাকে ক্রেডিট দিয়েছে। আর এতেই মেয়ে মহাখুশি।
অপেক্ষায় নিমজ্জিত রমণী এবার পায়চারি শুরু করে নিজ ঘরে, বেলকনিতে। হাতে ফোন চেপে ধরে সে একটু পর পর সময় দেখে আর গণনা করে। আর এভাবেই কাটে কিছুক্ষণ।
ঘড়ির কাঁটা হেলেদুলে যখন পনেরো মিনিট পার করে সতেরো মিনিটেে চলে আসে ঠিক তখনই নিচ হতে আওয়াজ আসে গাড়ি প্রবেশের। শেহরিনের কর্ণকুহরে পৌঁছায় তা। আর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে হাতে থাকা ফোনটা বিছানায় ফেলে সোজা দৌড়ে চলে যায় নিচে।
" বাবা..."
রিজওয়ান সাহেব গাড়ি হতে নামতে না নামতেই কন্যা এসে তাকে পাঁকড়াও করে ধরে। নিজেকে সামলে স্নেহাতুর কন্ঠে বলেন,
" ওরে.. পাগলি মা আমার। আস্তে আস্তে পড়ে যাবে তো।"
" কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য। এতো দেরি করলে কেনো? "
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের কথা শুনে অবাক হন। হাতের শার্ট তুলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেন, " কই দেরি মা? সময় তো ঠিকই আছে। "
" উহু দেরি করেছো। আমি অপেক্ষা করেছি মানে তুমি দেরি করেছো।"
অবুঝ কন্যার কথা শুনে রিজওয়ান সাহেব অল্পবিস্তর হাসেন। কপালে আলতো চুমু এঁকে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, " আচ্ছা, বাবা সরি তার জন্য। এবার চলো ভিতরে।"
"চলো।"
রাতের খাবার সাজানো হয়েছে বেশ আয়োজন করে। স্বয়ং শাহিদা বেগম আজ নিজ হাত লাগিয়েছেন কাজে। তবুও সেটা টুকটাক প্লেটিং এর ক্ষেত্রে শুধু। বাকি রান্নাবান্নার দিকটা কাজু বুয়াই সামলিয়েছে পুরোটা। আর শেহরিন তৈরি করেছে একটা আইটেম। অন্যদিন হলে মিসেস শাহিদা এটুকুও করতেন না কিন্তু আজ শেহরিনের বাবার উপস্থিতিতে নিজেকে কর্মমুখী নারী হিসেবে পরিচিত করতে তার এই টুকটাক নড়াচড়া।
" হয়েছে হয়েছে আর দিতে হবে না।"
" অনিভা তুমিও বসে যাও।"
" না মামি আপনি বসুন। আমি সার্ভ করছি।"
" বাচ্চা মেয়ে বলে কি? তুমি পারবে নাকি সার্ভ করতে। বসো বসো।"
শেহরিন বাবার সামনে মামির আজকে এতো ভালো রুপ দেখে কিঞ্চিৎ ঠোঁট কামড়ে হাসে। মনে মনে উচ্চারণ করে, " কানা বগীর মা গিরগিটির মতো রঙ এতো তাড়াতাড়ি পাল্টে ফেলো কি করে? আমি সার্ভ করতে পারি না তাই না? কালকে রাতে কি যমের ভূত এসে তোমাকে সার্ভ করে দিয়েছিলো? এতো নিখুঁত অভিনয়ের জন্য তোমাকে অস্কার দেওয়া উচিত।
" মামণি তুমি অনিভা আপুকে বলছো কেনো সার্ভ করতে পারে না? আপু নিজেই তো প্রতিদিন খাবার সার্ভ করে দেয় আমাদের। "
আরশের মুখ ফুলিয়ে কথায় শাহিদা বেগমের ঘাম ছোটে। কড়া চাহনি নিক্ষেপ করতে গিয়েও যেনো করতে পারেন না। তার সহযোদ্ধা মনিকা আন্টি পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে হাসিমুখে বলেন, " আরশ বাবা বড়দের মাঝে কথা বলতে হয় না। মুমু দেখছো না চুপচাপ খেতে বসেছে তুমিও সেভাবে খাও।"
" বাচ্চারা কখন কি যে বলে না। অনিভা বসো তুমি।"
মনের কথা এভাবে অলৌকিকভাবে প্রকাশ হয়ে যাওয়াতে শেহরিনের ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত হয়। তবে সেটা সে কৌশলে চেপে রাখে। মনে চাইছে একটু জোরে শব্দ করে হাসতে কিন্তু সবার কথা ভেবে সে ঠোঁট চেপে হাসে।
" বাবা এটা আমি আজকে রান্না করেছি। "
রিজওয়ান সাহেব খাওয়া থামিয়ে মেয়ের পানে তাকান। উচ্ছ্বসিত কন্ঠ উগড়ে বলেন, " তুমি রান্না করেছো? বাহ্ বাহ্। দেখি দাও দাও।আগে বলবে না ! "
শেহরিন তার স্পেশাল চিকেন কারি প্রথমে বাবাকে এরপরে একে একে সবাইকে সার্ভ করে দেয়। মুখ হতে তার হাসি সরেই না। কারণ আজ আর তাকে রান্না নিয়ে প্রশংসাসূচক বাণী শোনার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকতে হবে না। আজকে তার বাবা রয়েছেন। প্রশংসার বন্যা এমনিতেই বইয়ে যাবে নিশ্চিত।
রিজওয়ান সাহেব চিকেন কারি দিয়ে ভাত মেখে প্রথম লোকমা মুখে নেন। অতঃপর খেতে খেতে মেয়ের দিকে পরম তৃপ্তির সহিত তাকিয়ে বলেন, " অসাধারণ হয়েছে মা। অসাধারণ। "
"ধন্যবাদ বাবা। "
" কি শফিক আমার মেয়ের হাতের জাদু দেখেছো তো !! মেয়ে কিন্তু আমার আর ছোটো নেই। বড় হয়ে গিয়েছে। রান্না শিখে ফেলেছে।"
" দুলাভাই আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না আমাদের অনিভা মামণির হাতের রান্না এটা। খুব ভালো হয়েছে। "
একে একে বাবা মামা আরশ মুমুর হতে রান্নার প্রশংসা কুড়িয়ে শেহরিন আনন্দে হাওয়ায় ভাসে। আজ সেদিনের মতো তার আর কষ্ট লাগছে না, মন খারাপ লাগছে না। যদিও সে রান্না বিষয়টাকে মোটামুটিও আয়ত্ত্বে আনতে পারিনি। অন্যের সাহায্য ছাড়া ধরতে গেলে সম্ভব হয়ে উঠেনা একা একা। তবে এখন হতে তার ভীষণ শখ জেগেছে সে রান্না শিখবে। বাবার জন্য রান্না শিখবে সে। কত মেয়েরা বাবাকে মজার মজার রান্না করে খাওয়ায় তাহলে সে কেনো বাদ রইবে? দরকার হলে কোনো কোর্সে ভর্তি হয়ে সে এই গুণটা নিজের মাঝে আনবে।
" শাহিদা তোমরা বসো। আমার মেয়ের হাতের চিকেন কারি টেস্ট করো।"
" দুলাভাই আপনারা খেয়ে নিন তারপরে আমরা বসবো সমস্যা নেই।"
" আরে সমস্যা নেই মানে্ একসঙ্গে সবাই মিলে খাবো। শেহরিন মা, মামি আন্টিকে বসতে বলো। উনাদের খাবার সার্ভ করে দাও।"
" জ্বি বাবা। "
শাহিদা বেগম মিসেস মণিকা মন হতে খুশি হতে না পারলেও ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখেন। শেহরিনের ব্যাপক প্রশংসা তাদের গায়ে আগুন জ্বলানোর মতো রেশ দেয়। কিন্তু উপায়ন্তর না পেয়ে রিজওয়ান সাহেবের চাপে বাধ্য হয়ে বসেন খেতে।
অন্যদিকে শেহরিন তাদের এমন অন্ধকার মাখা মুখ দেখে নিঃশব্দে হেসে খাবার সার্ভ করে।
" আরে খেয়েই চলেছো তোমরা শুধু ? আমার মেয়ের রান্না প্রশংসা করছো না কেনো? "
" মামণি আন্টির ভালো লাগেনি হয়তো।"
" ভালো লাগেনি অথচ অনেকটাই তো খেয়ে ফেলেছে দেখছি। কি শাহিদা ব্যাপার কী? "
" না.. না দুলাভাই ভালো হয়েছে। "
মুমু মায়ের আমতা আমতা স্বরে প্রশংসা শুনে মুখ টিপে হেসে বলে," ফুপাজান আসলে মামণির রান্না ভালো হয় না জন্য সে কারো রান্না প্রশংসা করে না। "
" তাই নাকি?"
" কি বলছো মুমু। মায়ের সম্পর্কে কেউ এভাবে বলে? এটা কিন্তু বেয়াদবি।"
" ওকে ওকে তোমরা থামো। আমি র্যাংকিং করে ঝামেলা মিটিয়ে দিচ্ছি। আমাদের বাসায় এখন সেরা রাঁধুনীর তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে আমাদের সবার প্রিয় অনিভা আপু। দুই নাম্বারে আমাদের সবার প্রিয় কাজু বুয়া। "
" আর তিন নম্বরে?"
আরশ খাওয়া থামিয়ে বাম গালে হাত রেখে বলে, "ফুপাজান মামণি আর আন্টিকে মিলে তিন নম্বরে স্থান দেই?? ওমম.. না..না তিন নম্বরে তো বাবা থাকবে। চার নম্বরে মামণি আর আন্টি।"
" এবার ঠিক আছে। "
" দুজন মিলে চার নম্বরে কেনো? "
" কারণ মামণি আর আন্টির রান্না একদম সেইম। মোটেও ভালো লাগে না।"
রিজওয়ান সাহেব স্মিত হেসে বলেন, " এভাবে বলতে হয় না আম্মু সাহেবা। মামণিদের রান্না কখনো খারাপ হয় না। তাদের হাতে স্পেশাল জাদু থাকে। সেটা হচ্ছে তাদের ছোঁয়া। যেটা খাবারকে অমৃত করে তোলে।"
"কিন্তু ফুপাজান মামণি আর আন্টি তো সবসময় সাজুগুজু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। হাতের নখ নষ্ট হয়ে যাবে জন্য নিজ হাতে রান্নাই করে না। স্পর্শ পাবে কি করে? এজন্যই হয়তো রান্না মজা লাগে না।"
দুভাই বোনের চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণে খাবার হজম করতে অসুবিধা হয় শাহিদা বেগম আর মিসেস মণিকার। থমথমে মুখে চেয়ে থাকেন ছেলেমেয়েদের দিকে।
" এমন ছেলে মেয়ে আমি আগে কোথাও দেখিনি আপা বিশ্বাস করো। তোমার ছেলে মেয়েকে দেখে অবাক না হয়ে পারছি না।
" আমার ঘর শত্রু বিভীষণ তৈরি হয়েছে ।"
রিজওয়ান সাহেব শফিক সাহেবের দিকে তাকান। গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, " বাচ্চাদের অভিযোগ ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বিষয়টার উপর গুরুত্ব দাও। এখন ওদের প্রোপ্রার যত্নের বয়স। মায়ের হাতের রান্না মজা করে খাবে, সারাজীবন মনে রাখবে। এগুলো শুনতে হচ্ছে কেনো?"
"জ্বি দুলাভাই আসলে... "
" আসলে নকলে কিছুই নয়। তোমাকে দ্বারা হইবে না। শাহিদা তুমি শোনো.. বাচ্চাদের অভিযোগ গুলো আমার খারাপ লাগলো ভীষণ। তুমি নখের যত্নের জন্য ওদেরকে এভাবে তোমার মমতা থেকে দূরে রাখবে? এই যে খারাপ একটা মনোভব তৈরি হয়েছে তোমার প্রতি শুনতে কি ভালো লাগছে? আমরা না হয় কাছের মানুষ বিষয়টাকে একভাবে দেখছি। বাইরের মানুষদের সামনে এসব বললে মান সম্মান থাকবে তোমাদের?? বাবা মা হয়েছো বাচ্চাদের রান্না করে খাওয়াতে পারবে না এটা কেমন কথা? বাচ্চাদের চেয়ে নখের গুরুত্ব বেশি নাকি।"
" দুলাভাই.. "
"প্লিজ এক্সকিউজ দেখাতে আসবে না। যদি দেখাও সেটা যুক্তি সংগত হতে হবে। পারবে কি?"
শাহিদা বেগম চুপচাপ খাবার নাড়তে থাকেন। তার মাথা নিচু সঙ্গে নিরবতা দেখে রিজওয়ান সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন,
" এই বাচ্চাগুলো একটা গোল্ডেন ফেজের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা মুহুর্ত পার করছে । যেখানে তাদেরকে এখনো কোনো চিন্তা ভাবনা স্পর্শ করতে পারেনি। যখন ওরা বড় হয়ে একেক জায়গায় চলে যাবে তখন মন চাইলেও ভালো রান্না করে খাওয়াতে পারবে না। তখন হয়তো আজকের কথা ভেবে আফসোস করবে। তাই যত্ন নাও, ভালোবাসো। তোমাদের বাচ্চারা লাকি যে তারা বাবা মা দুজনকেই পাচ্ছে। আমার বাচ্চাটা কিন্তু পায়নি। আমি যতই আমার মেয়েকে ভালো রাখি না কেনো মায়ের সমতুল্য ভালোবাসা কখনোই দিতে পারবো না। এটা সৃষ্টিকর্তা হতে আলাদা একটা নিয়ামত। বুঝতে পেরেছো কি আমার কথা? "
" জ্বি..। "
" গুড নাও এখন খাওয়া শুরু করো সবাই। "
শফিক সাহেব স্তম্ভিত নয়নে খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন। হাত দানা স্পর্শ করলেও গলা দিয়ে খাবার তার নামে না। এক অজানা অস্বস্তিতে সে ভুগতে শুরু করেন। রিজওয়ান সাহেবের প্রতিটি কথা তার অন্তরে গিয়ে লেগেছে। চাক্ষুষ কেউ এভাবে তাদেরকে প্যারেন্টিং এর ল্যাকটা ধরিয়ে দিবেন ভাবতে পারেননি কখনো। এই বিষয়টা নিয়েও কখনো গভীরভাবে ভাবেননি। কথাগুলো শুনতে কষ্ট লাগলেও সত্যি। অস্বীকার করার উপায় নেই।
__________________________________
রাত বাজে সাড়ে দশটা। এবার ভার্চুয়ালি মিটিং ছেড়ে বাবা মেয়ে বেলকনিতে বসেছে স্বশরীরে মিটিং এ। যদিও রিজওয়ান সাহেব ব্যস্ত মেয়েকে খাইয়ে দিতে। এরপরও তাদের আলাপচারিতা থেমে নেই। হাতে থাকা প্লেটে সেই বিখ্যাত চিকেন কারি দিয়ে সে মেয়েকে সাদরে খাইয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে শেহরিন হাতে পানির পট নিয়ে বাবার হাতে খাবার খেতে খেতে সংক্ষিপ্তভাবে কথা গুছিয়ে নেয় নিজের মতো করে।
" সেকেন্ড মিটের এক্সপেরিয়েন্স কেমন হলো? "
" বাবা।"
" জ্বি মা।"
" আমি আজকে তোমাকে পুরো ঘটনার কিছুই বলতে চাইনা। খুব ছোট করে জাস্ট দুটো কথা বলতে চাই। আশা করি তুমি এতেই বুঝবে।"
রিজওয়ান সাহেব ভাত মাখতে গিয়ে হাত থামিয়ে ফেলেন। যে মেয়ে তাকে কোনো কিছু হলেই সেটার আদি অন্ত সবিস্তারে বর্ণনা করে সে কি না শুধু মাত্র আজকে দুটো কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? বিষয়টা কি জটিলতার পর্যায়ে চলে গিয়েছে? নাকি মেয়ে হেজিটেড ফিল করছে? এর মধ্যে হয়তো কিছু একটা হবে। নরম গলায় মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন, " ঠিক আছে মা আমি চেষ্টা করবো তোমাকে বোঝার। বলতে পারো তুমি।"
শেহরিন দু ঢোক পানি খেয়ে নেয়। ওয়াটার পটটার মুখ লাগাতে লাগাতে ঠান্ডা গলায় বলে, " জনাব তৌসিফ সাহেব একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। তবে তার মনুষ্যত্ব বোধ, বিবেচনাবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত নিম্ন এবং অগ্রহণযোগ্য। তিনি বইয়ের জ্ঞানে শিক্ষিত কিন্তু মানুষ হিসেবে নয়। আর.."
" না টা কি এখনই করে দিবো ?"
শেহরিন কথা শেষ করার আগেই থেমে যায়। বাবার দিকে তাকিয়ে সে নির্মল হাসি হাসে। সুপারম্যান বুঝে ফেলেছে তাকে ইতিমধ্যেই । রিজওয়ান সাহেব মেয়ের মুখে লোকমা তুলে দিতে দিতে বলেন, " কালকে না করে দিলেই হয়ে যেতো না? উনাদের শুধু শুধু আসাটা.."
" কি করে না করতাম বাবা কালকে? উনি আমাকে বাসায় পৌঁছে দেয়নি বিকজ কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলো। আমাদের চোখে এটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কিন্তু মামা মামি কিংবা আরাফাত আংকেলের চোখ কি তাই ? তারা তো ক্যাডার সাহেবকে পীর মনে করেন। আর তোমার কাছে থেকে যখন রিজন শুনতে চাইবে তুমি মোটেও এই একটা কারণ দেখিয়ে তাদের দমাতে পারবে না বাবা। আমি একটু হলেও চিনেছি তাদের। "
" তুমি আজকে উনাকে ডেকে কি..
" আমি উনাকে আজকে ডেকেছিলাম মূলত সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে। প্রথম দিনেই তার প্রতি আমার নেগেটিভিটি জন্মেছিলো। আমি সেটাকে উহ্য অবস্থায় রেখে আবারো দেখা করেছি। অ্যাজ আ রেজাল্ট আমি ক্যাফে হতে বের হওয়া মাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছি এটা এখানেই শেষ করা উচিত। আর কোনোভাবেই সামনে আগাতে দেওয়া সম্ভব নয়।
এখন যদি সবাই আমাকে কারণ জিজ্ঞেস করে আমি যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারবো। আমি তার সাথে আজকে দেখা হওয়ার আগ মুহুর্ত অব্দি একটা দায়বদ্ধতার মধ্যে ছিলাম। এক, মামি মণিকা আন্টি আমাকে বারবার বলেছিলেন মামার সম্মান জড়িয়ে আছে আমি যেনো সেটা বিঘ্নিত না করি। এমনকি মামা নিজেও তাই বলেছিলেন।
দুই, উনার বাবা তোমার সাথে কথা বলেছেন প্রচন্ড আগ্রহী হয়ে সো আমি একটা মাত্র কারণ দেখিয়ে না করে দিতে পারি না। এটা লজিক্যালিও যায় না। বহু মিনিং বের করতে পারবেন তারা। "
" গুড ওয়ার্ক। বাট তুমি শুধু আমাকে এইটুকু বলো তোমার যে তার প্রতি খারাপ একটা ইম্প্রেশন তৈরি হয়েছিলো সেটার মাত্রা কি আজকে আরো বেড়ে গিয়েছে। "
শেহরিন স্তব্ধ চোখে তাকায় বাবার দিকে। শান্ত গলায় বলে, " একজন মানুষের প্রতি একজন মানুষের সামান্য কারণেও খারাপ ইম্প্রেশন তৈরি হয় বাবা। আমারও কালকে সেটাই হয়েছিল জাস্ট উনার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেখে। বাট আজকে আমি এই খারাপ ইম্প্রেশন টাকে সরিয়ে মেইন তিনটা রিজন বলছি যেটা আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হেল্প করছে -
এক.ইমোশনাল ইনকম্প্যাটিবিলিটি। তার সাথে আমার মানসিক বোঝাপড়া, চিন্তাধারা এবং মূল্যবোধ টোটালি ভিন্ন।
দুই. কমিনিউকেশন ডিসকম্ফোর্ট।
তিন.মিসলাইনমেন্ট অফ ফিউচার গোলস।মানে সে ভবিষ্যত নিয়ে যে চিন্তাধারায় আছে আমার পক্ষে সেটা মেনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"
মেয়ের প্রখর চিন্তাধারা দেখে অভিভূত হন রিজওয়ান সাহেব। অবাক কন্ঠস্বরে বলেন,
" তুমি তো দেখছি বাবাকে ৩-০ তে গোল দিয়ে দিলে মা। গড ব্লেস ইউ। অনেক বড় হও সেই সাথে এমন চিন্তাধারা বজায় রাখো। যেনো মানুষ তোমার করা "না" তে দ্বিতীয় কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে না পারেন।"
" ধন্যবাদ বাবা আমাকে বোঝার জন্য।"
বাবা মেয়ের চলমান কথা প্রবাহমান নদীর ন্যায় বইতে থাকে। সম্পূর্ণ ভাতটুকু পরম যত্নে খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে শেহরিন। আজ কতদিন পরে বাবার হাতে ভাত খেলো সে। চট্টগ্রামে আসার পর এই প্রথম তার মনে হচ্ছে পেট মন দুটোই ভরলো অবশেষে। এতোদিন তো সে শুধু ক্ষুধার নিবারণ করেছে। তৃপ্তি পায়নি কোনো কিছুতেই।
" বাবা তুমি মোটেও ভাববে না কালকের বিষয় নিয়ে । বিয়ের বিষয়টা এসেছে পারিবারিক ভাবে মামা মামির মাধ্যমে। তাই আমি চাই পারিবারিক ভাবেই এটার সমাপ্তি ঘটুক। শুধু পরিবর্তন হিসেবে মামা মামির জায়গায় তুমি থাকবে। যদি উনার সাথে আমার এমনি কোনো ভালো সম্পর্ক থাকতো তাহলে আমি নিজেই বলতাম। নিজেই না করে দিতাম। বাট সেরকম কিছু হয়নি। আর বেশিকিছু না তুমি শুধু পড়াশোনার বিষয়টা তুলবে। এটাই এনাফ নাকচ করে দেওয়ার জন্য। "
" হাহা আচ্ছা ঠিক আছে। তবে, শোনো আজকে তুমি যেমন নিয়েছো ক্যাডারের এক্সাম কালকে আমি নিবো নেতাসাহেবের এক্সাম।"
নেতাসাহেবের কথা উঠতেই শেহরিন একদৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকায়। রিজওয়ান সাহেব চোখ হতে চশমা খুলে পরিষ্কার করতে করতে বলেন, " আজকে দেখা হয়েছিলো কি?"
" উহু।"
" মিস্ গিয়েছে? "
" হু।"
"এক্সকিউজ মি..? "
" ইয়ে মানে.. না মানে ভালো হয়েছে দেখা হয়নি।"
" শিউর? "
" নয়তো কি!! "
" আজকে দেখলাম আসা পথে তাকে।"
শেহরিন খানিকটা কৌতূহলী চোখে তাকায় বাবার দিকে্। অতঃপর অন্যমনস্ক ভাব ধরে জিজ্ঞেস করে, "কোথায়?"
" তোমাকে বলবো কেনো? "
" এক্সকিউজ মি আমি কি শুনতে চেয়েছি নাকি? আমি এমনি জিজ্ঞেস করেছি।"
রিজওয়ান সাহেব বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। চোখে চশমা পড়ে শার্ট টান করে বলেন, " এমনি জিজ্ঞেস করেছো জন্য বললাম না। সত্যি সত্যি জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই বলতাম। কি যে দেখলাম..."
" কি দেখেছো? "
" এমনি এমনি জিজ্ঞেস করলে আমি উত্তর দেই না।"
শেহরিন বাবার চালাকিতে পড়ে গ্যাঁড়াকলে। বেহুদা মন শুধু শুধু তাকে বিরক্ত করছে। সে জানতে চায় না কিন্তু তার মন তাকে ছাড়ছে না। শুনতেই হবে যেনো? কি দেখেছে বাবা? আরশি মুমুদের মতো কোনো মেয়ে...
" উফ্ বাবা সত্যি সত্যি জিজ্ঞেস করেছি এবার বলো। "
রিজওয়ান সাহেব ঠোঁট চেপে নিজের হাসি দমান। যাওয়া পথে পিছু ঘুরে বলেন, " দেখলাম নেতাসাহেব একখানা সুর্দশন পুরুষ। "
বাবা চলে যেতেই শেহরিন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে পড়ে্। এভাবে বোকা বানালো বাবা তাকে। ছিঃ ছিঃ কি ভাবলো। হুট সব দোষ এই মনের।
" বেশি বাড়াবাড়ি তাই না?"
কল্পনায় অবাধ্য মন তাকে উসকে দিয়ে বলে,
" বারে জেলাসি ফিল করো নিজে আর দোষ হয় আমার? আয়রনি!! "