ঝিরিঝিরি বৃষ্টিস্নাত রাত। পাশাপাশি হেঁটে চলেছে দু'জন মানব মানবী। খুব সম্ভবত পাওয়ার কাট হয়েছে বৃষ্টির কারণে। সোলার পাওয়ারড লাইটে ম্লান আলো ঝরছে রাস্তাজুড়ে। নির্জন রাস্তায় সামনে হতে আগত যেসব পথচারী আসছে সবাই মোটামুটি এমপি সাহেবকে দেখে স্থির চক্ষু মেলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। কেউ মুখ ফুটে কিছু না বললেও হয়তো পিছনে ঘুরে তাকালে বোঝা যাবে তাদের দৃষ্টি সেই একই ব্যক্তির উপরেই রয়েছে।
কিন্তু এমপি সাহেবের সেদিকে বিশেষ একটা খেয়াল নেই। সে বুঝতে পারছে লোকজন তাকে দুচোখের ক্যামেরায় বন্দি করছে। একটু আগ অব্দি সমাবেশে ভাষণ দেওয়া নেতাকে হঠাৎ রাস্তায় একটা মেয়ের সঙ্গে দেখাটা অস্বাভাবিকের মতোই। সে জানে পাবলিকের এই চক্ষু দৃষ্টি তাকে আবারো তুমুল সমালোচনায় নিয়ে আসবে। বিরোধী দল রটাবে নানা ধরনের গুজব। মিডিয়ার লোকেরা এসে অফিসের দোরগোড়ায় ভিড় জমাবে। আরহামের ঘাম ছুটবে সবকিছু ম্যানেজ করতে। স্বল্প সময়ের জন্য মারপিটও হয়ে যেতে পারে আড়ালে অন্তরালে। কিন্তু এই পুরুষের পরোয়া কিসে ?? সে যেটা করতে চাইবে সেটা সে নিজের ক্ষতি হলেও করবে।
সাদা পাঞ্জাবি ভিজে সুঠাম দেহের পৃষ্ঠে লেগে রয়েছে, চুলগুলো হতে ঝরছে এক দু ফোটা করে পানি। শান্ত চক্ষুতে তার দৃষ্টি সামনে নিবদ্ধ। এক অদ্ভুত শীতলতায় সে নিজেকে মুড়িয়েছে নিদারুণ চিত্তে। সারাদিনের দৌড় ঝাঁপিতে এইটুকু সময় তার কাছে মনে হচ্ছে বিশেষ কিছু। তার জারুল ফুল আজকে হয়েছে নীলাম্বরী, নীল কামিনী। যার কারণে মেঘে ঢাকা এই রাতে অদ্ভুত স্নিগ্ধতায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছে সে। আর নিজেকে এই মোহ থেকে বের করে আনার সমস্ত পথও বন্ধ করে ফেলেছে অনেক আগেই। এখন শুধুই অপেক্ষা !!
অন্যদিকে আধভেজা শরীর, পায়ে কাঁদা মেখে চলা রমণী একটু আগে যে অনিশ্চয়তায় ভুগেছিলো এখন তা অনেকটাই উবে গিয়েছে। কিন্তু সে এই "উবে" যাওয়া শব্দটার সঙ্গে বিশেষ পরিচিতি লাভ করতে পারছে না। কারণ একঝুলি প্রশ্ন তার মস্তিষ্কে ঘটিয়েছে বিচরণ।
কেন মনে হচ্ছে পাশে থাকা পুরুষটা তার জন্য নিরাপদ? উনি পাশে থাকলে নিশ্চিত সে ঘরে পৌঁছাবেই? এতো ভরসা আত্মবিশ্বাস কোথা থেকে এলো? যেখানে এই মানুষটার হাজার অপরাধ। অথচ সমাজের চোখে যে মানুষটা সুশীল সে কোন বিবেকে...??
শেহরিন ভীষণ অনুতপ্ত অনুভব করে নিজের মনের ভিতরে। সমান্তরাল ধারায় তার পদরেখা চললেও বুকের ভিতরে অস্থির ঢেউ তোলে। কেন জানি মনে হচ্ছে সে এই মানুষটাকে বিপদে শুধুই ব্যবহার করছে। আর ভালো সময়ে প্রত্যাখান। আদৌতে এটা করা কি উচিত হচ্ছে ??
ঠোঁটের অগ্রপান্ত শুকিয়ে আসে। নিভৃতে ফেলে দীর্ঘ শ্বাস। এসব প্রশ্নের উত্তর সে বাসায় গিয়ে মেলাবে তার একমাত্র উত্তরদাতা বাবার কাছে । নয়তো মানসিক অশান্তি কিংবা আত্মগ্লানি তার পিছু ছাড়বে না।
" এপাশে আসো। "
" হু?"
সান্নিধ্য শেহরিনকে রাস্তার বাম পাশে রেখে ডান পাশে চলে যায়। সামনে একটা বেকারির দোকানে দু'জন মানুষের অবস্থান দেখে সে শেহরিনকে একটুখানি পিছনে রেখে এগিয়ে যায় নিজ হতে সামনে । বেকারি দোকানের সামনে থাকা দু'জন মধ্যেবয়স্ক লোক এমপি সাহেবকে দেখামাত্র এগিয়ে এসে। অতঃপর একে অপরে হ্যান্ডশেক করে কুশল বিনিময় করে।
" এমপি সাহেব রাস্তায়? তাও আবার পায়ে হেঁটে? এ জীবনে আর কতো কি দেখতে হবে। "
" মাঝে মাঝে হাঁটা ভালো।"
" সঠিক। আপনাদের মতো দাপুটে নেতারা সাধারণ জীবন যাপন করলে আমরা জনগণ খুশি হই।"
সম্মুখে দাঁড়ানো লোকটি হালকা পিছু ঘুরে তাকায়। শেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে, " আমাদের বউমা নাকি? "
" বিয়ে করেছেন কবে??"
সান্নিধ্য জানতো তাকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তাই সে সরাসরি উত্তর না দিয়ে মৃদু হাসে।
" বাহ্ বাহ। খুব ভালো করেছেন। চুপেচাপে হলেও বিয়েটা যে করেছেন এটাই অনেক। তাছাড়া তো আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রাজনৈতিক পাড়ায় বেশ চর্চা হয়। "
" এই তো কিছুদিন আগেই তো পত্রিকায় বেরিয়েছিলো। এমপি সাহেব বৃষ্টিতে ভিজে কোন মেয়ের জন্য নাকি ফুল কিনছে।"
" হাহা.. বিষয়টা আমরা তখন গুজব হিসেবে নিলেও এখন দেখছি সত্যি। নেতাসাহেব শুধু বৃষ্টিতে ফুলই কিনেন না, সস্ত্রীক বৃষ্টিবিলাস ও করেন। "
" ভালো ভালো। ইয়াং মানুষদের এনার্জি লেভেলই আলাদা। সারাদিন খাটুনি করে এসেও রাতে ফ্যামিলি টাইম বের করতে পারে। খুব ভালো। সবকিছুরই ব্যালান্স রাখতে হয়। এনিওয়ে, দেখি বউমার সঙ্গে একটু পরিচিত হই।"
শেহরিন শুকনো ঢোক গিলে। সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার। ব্যক্তি দুজন অনেকদূরে জল গড়িয়ে নিয়েছে। তাদের কথাবার্তার সঙ্গে বাস্তবিক যে কোনো মিল নেই সেটা এখন বলবে কি করে? সরাসরি না করলেও বিষয়টা অন্যচোখে দেখবেন তারা। বিশেষ করে এমপি সাহেবের ইমেজের উপর প্রভাব পড়বে। লোকটার থেকে এতো সাহায্য কুড়াচ্ছে সে, কৃতজ্ঞতাস্বরুপ একটু কিছু তার জন্য না করাটা খারাপ দেখায়।
তবে, এমপি সাহেব যেহেতু কৌশলে হ্যাঁ না কে এড়িয়ে গিয়েছে তাহলে তারও সরাসরি কিছু না বলে কৌশল অবলম্বন করা উচিত। এমপি সাহেবের চেয়ে বয়সে বড় আংকেল ক্যাটাগরির লোক হলেও কি সম্বোধন করবে বুঝতে পারে না সে। আলতো চোখে সান্নিধ্যের দিকে এক পলক তাকিয়ে ম্লান কন্ঠ ঠিকরে সালাম দেয়।
" আসসালামু আলাইকুম। "
" ওয়ালাইকুমুস সালাম। ভালো আছো বউমা?"
" জ্বি। আপনারা? "
" ভালো আছি। তোমাদের দেখে আরও ভালো লাগছে। যাক নেতাসাহেব যে রাজপথের পাশাপাশি সংসার সামলাচ্ছে এই অনেক। তা তোমার নাম? "
" জ্বি অনিভা। "
" সুন্দর নাম। আর আমি হচ্ছি আখতারুজ্জামান খন্দকার,আর ইনি হচ্ছেন আফজাল হোসেন। আমরা দু'জনই তোমার চাচা শ্বশুরের বন্ধু। "
শেহরিন জোরপূর্বক হাসে। পরিচয় পর্ব তাহলে চাচা শ্বশুর পর্যন্ত চলে গিয়েছে। অথচ আসল শ্বশুররেই খোঁজ নেই। কি আজব কারবার!!
" আচ্ছা আসি এখন।"
" এই দাঁড়াও দাঁড়াও এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে কতদূর যাবে তোমরা? হালিশহর এভাবে যাবে নাকি?"
সান্নিধ্য ধীর কন্ঠে প্রতিত্তুর দেয়,"দেখি সামনে কিছু পাওয়া যায় নাকি।"
" গাড়ি আনোনি? "
" আনলে কি ভিজে যেতাম? "
" তোমার সাঙ্গ পাঙ্গরা কোথায়? "
" আপনার গাড়ি আছে সাথে? "
আখতারুজ্জামান পাশ ফিরে তার পার্কিং করে রাখা গাড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, " হু আছে। কেন?"
" আধাঘন্টার জন্য নিচ্ছি। এখানেই ওয়েট করুন আপনারা আপাতত।"
" কিন্তু ড্রাইভার আছে তো।"
" গাড়িতে তো ড্রাইভার থাকবেই।"
সান্নিধ্যের বাঁকা কথায় আখতারুজ্জামান সাহেব নিরাশ গলায় বলেন, "এতোক্ষণ অপেক্ষা করবো?"
" বাসায় বিশেষ কোনো কাজ আছে?"
" না... সেরকম কিছু নেই।তবে.."
সান্নিধ্য আর দাঁড়ায় না। আখতারুজ্জামানের কথাকে উপেক্ষা করে শেহরিনকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি চলে আসে পার্কিং করা গাড়ির কাছে। ভিতরে বসারত ড্রাইভারকে উইন্ডোতে নক করে ঠিক হয়ে বসার ইশারা দেয় সে। অতঃপর দরজা খুলে শেহরিনকে ভিতরে বসতে বলে।
শেহরিন শাড়ি সামলে ভিতরে বসা কালে তার জুতোর সঙ্গে শাড়ি পেঁচিয়ে ধরে। গাড়িতে উঠা পথে বাঁধাগ্রস্ত হতেই সে চেষ্টা করে ছাঁড়ানোর। কিন্তু কর্মে ব্যর্থ হওয়ার আগেই সান্নিধ্য নির্দ্বিধায় এগিয়ে আসে সাহায্য করতে। কিছুটা নিচু হয়ে জুতোর সঙ্গে পেঁচিয়ে ধরা শাড়ি ছাড়িয়ে দেয় সে আলতো হাতে।
" ওকে? "
" হু।"
হালকা হাতের স্পর্শে শেহরিনের সমস্ত কায়া জুড়ে শিহরণ বয়ে যায়। বুকের ভিতরে অবাধ্য দোলাচলে সে নেতিয়ে পড়তেই নিজেকে ধাতস্থ করে নেয়। চুপচাপ বসে পড়ে এক কোণে।
সান্নিধ্য ভিতরে বসতেই সে আঁড়চোখে তাকায় একনজর তার পানে। লোকটার মুখোরেখায় কোনো হেলেদোল নেই। একদম শান্ত, স্বাভাবিক। তার মতো কোনো অস্থিরতা নেই।
অন্যদিকে সে ভুগছে কঠিন পিপাসায়। গলা ঠোঁট শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে। একটুখানি জল পেলে মন্দ হতো না। কিন্তু কিভাবে মুখ ফুটে বলবে ভেবে পায় না। বললে তো সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে আসবে এটা জানা কথা। কিন্তু বারে বারে লোকটাকে এতো সমস্যায় ফেলা। থাক্ প্রয়োজন নেই !!
" স্যার কোথায় যাবো?"
সান্নিধ্য শেহরিনের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, " খুলশীর কোথায় যেন ?"
" আবাসিক এলাকা রোড নম্বর ১/এ গেলেই হবে।"
গাড়ি চলতে শুরু করে। কিছু পথ যেতেই সান্নিধ্য হাত বাড়িয়ে সামনের সিট হতে ওয়াটার বোতল এনে শেহরিনকে দেয়। মরুর বুকে জলের কণা পেতেই শেহরিনের চোখজোড়ায় স্বস্তির ঢেউ খেলে। একরাশ বিস্ময়কে পাশে ঠেলে সে তড়িৎ হাতে বোতলের মুখ খুলে পানি পান করে। কয়েক ঢোকে পুরো পানি নিঃশেষ করে ফেলে নিমিষেই । নিজের ভিতরে খাঁ খাঁ করা তৃষ্ণাকে দমিয়ে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে অবশেষে ।
তবে, লোকটার কাজে সে অভিভূত না হয়ে পারে না। কৃতজ্ঞতা পূর্ণ চোখে তাকায় ফোনের ব্যস্ত হওয়া এমপি সাহেবের দিকে। বাবা বলেন, কিছু না বলেও মুখ দেখে অনুমান করে নেওয়া ব্যক্তিগুলো নাকি চমৎকার ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। এটা নাকি বিশেষ করে পুরুষ মানুষদের অন্যতম একটা গুণ। কেয়ারিং বিষয়টাকে খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।
নেতাসাহেবকে আজকে এতো সময়ের পর্যবেক্ষণে শেহরিন বুঝেছে উনার ব্যক্তিত্ব প্রখর। কোনো রকমের সুযোগী সন্ধানী নয় সে এটা স্পষ্ট বুঝেছে। কেননা, তার সংযত দৃষ্টি এখন পর্যন্ত শেহরিনের চোখ ছাড়া অন্য কোথাও যায়নি। আধভেজা শাড়িতে অস্বস্তিতে পড়লেও কারো সংযত দৃষ্টি তাকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে।
" মেয়েটা কে ছিলো ? "
" কোন মেয়ে? "
" সেই যে ফুলকান্ডে।"
সান্নিধ্য ফোন হতে দৃষ্টি তুলে শেহরিনের দিকে তাকায়। ঠোঁট চেপে ক্ষীণ হেসে বলে, " ছিলো একজন।"
" সে কি আমি? "
" মেইবি।"
" আমার ছবিও কি ছিলো? "
" একটাতে ছিলো। "
" আমি কেন দেখলাম না? কোন পত্রিকায় ছিলো? নাম কি? "
ফোনের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে সান্নিধ্য। এই প্রশ্নের উত্তর দুদিন আগে ছিলো তার কাছে কিন্তু এখন নেই। যেখানে পত্রিকার মালিকেরই দুনিয়াতে আর অস্তিত্ব নেই সেখানে পত্রিকার খোঁজ দিবে কিভাবে সে? পূর্বকোণ নামটাই তো মুছে দিয়েছে সে সারাজীবনের জন্য।
" ভয় নেই। তোমাকে কেউ চিনতে পারবে না।"
" আপনার কোনো ঝামেলা হয়নি?"
"ঝামেলা?? "
শেহরিনের হুট করে ঝামেলা শব্দটা শুনে তৌসিফের বলা কথাটা মনে পড়ে। তার ভাষ্যমতে, সকল প্রকার ঝামেলার মূল কারিগরই উনি। তাকে ধরবে ঝামেলা?? এটা অসম্ভব!
" না কিছু না।"
পাঁচ মিনিট মাত্র হয়েছে যাত্রার। এর মাঝেই চলন্ত পথে মিরর ঘেঁষে কারো অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি পড়ে শেহরিনের দিকে। একবার নয় দুবার নয় বার বার। একটুখানি সময় বিরতি দিয়েই তাকিয়ে থাকে তার দিকে। শেহরিন সামনের দিকে তাকাতে গিয়ে দু হতে তিনবার অযাচিত দৃষ্টির মুখোমুখি হয়। কপাল কুঁচকে সে উইন্ডোর বাহিরে নজর রাখে। মনে মনে অল্প স্বল্প কিছু গালি ছুঁড়ে ড্রাইভারের দিকে।
ফোনে নিজকার্যে ব্যস্ত হওয়া এমপি সাহেব প্রয়োজনীয় কাজটুকু সেড়ে দৃষ্টি তোলে সম্মুখে। লাইনে থাকা আসিফের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এসে ধরা পড়ে ড্রাইভারের চাহনি। অতঃপর সঙ্গে সঙ্গে মাঝপথেই কল কাটে সে। ফোনটা পকেটে রেখে গম্ভীর স্বর উন্মুক্ত করে বলে, " গাড়ি থামাও।"
" জ্বি স্যার? "
" গাড়ি থামাও।"
"কেন স্যার?"
শেহরিন পাশে থাকায় সান্নিধ্য মুখে আসা গালি হজম করে নেয় অনেক কষ্টে। নয়তো এতোক্ষণে হিব্রু ভাষায় গালাগালি দিয়ে উদ্ধার করে ফেলতো সে। ড্রাইভার এমপি সাহেবের কড়া চাহনি দেখে গাড়ি থামিয়ে ফেলে তৎক্ষনাৎ।
সান্নিধ্য দরজা খুলে নেমে ড্রাইভারকে বাইরে আসতে বলে। চলমান ঘটনায় শেহরিন ড্রাইভার দু'জনেই অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে এমপি সাহেবের দিকে।
" কি হয়েছে? "
শেহরিনের প্রশ্নে সান্নিধ্য কোনো জবাব না দিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ির বোনাটপার্টের দিকে নিয়ে যায়।
" চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হবে না। গালে হাত যাবে না। যদি এর একটাও হয় তাহলে আমি যেটা করবো সেটার রিপিট হবে।"
ড্রাইভার আহাম্মক চাহনিতে তাকাতেই সান্নিধ্য গোটানো পাঞ্জাবির হাতা আরেকটু উপরে তুলে সপাটে একখানা চড় গালে বসিয়ে দেয় তার। শক্তহাতের কষিয়ে দেওয়া চড়ের খানিকটা শব্দ হলেও শব্দ হয় না কারো মুখ থেকে। গালের উপর আগুন জ্বলে উঠলেও হাত যায় না তার সেখানে। বিশেষ শর্ত মেনে সে চুপচাপ থাকে। কেননা শর্ত বিঘ্নিত ঘটলেই আরেকখানা লৌহ দন্ডের আঘাত গালে এসে পড়বে।
" সময় থাকলে চোখে হাই পাওয়ারের চশমা লাগিয়ে দিতাম। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে সময় এবং পরিস্থিতি দুটোরই বিপরীতে। তাই আজকে এতোটুকুই। সোজা যে পথে এসেছিলে সেই পথে হেঁটে চলে যাও। স্যারকে গিয়ে বলবে, কালকে হালিশহর থেকে যেন গাড়িটা নিয়ে যায় ।"
ঠান্ডা গলায় নিশ্চুপ হুমকি। শার্টের কলার ঠিক করে ড্রাইভারের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে সান্নিধ্য তাকে পাঠিয়ে দেয় ফিরতি পথে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় ড্রাইভার কোনো প্রকার বাচন ছাড়াই দ্রুত দৌড় লাগায় খানিকটা পথ যেতেই। ভুলেও পিছু ফিরে তাকায় না একবারের জন্য।
" সামনে এসে বসো।"
"উনি চলে গেলেন কেন?"
" উনার সাফোকেটেড ফিল হচ্ছে ড্রাইভিং করতে।"
" সাফোকেটেড ফিল হচ্ছে?? "
"হু। এসো।"
সান্নিধ্য দরজা খুলে শেহরিনকে সামনে এনে বসায়। কিন্তু শেহরিনের বিস্মিত চাহনি তার নজর এড়ায় না। ভ্রু যুগল উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, " কি হয়েছে? "
" মেরেছেন উনাকে? "
" মারবো কেন?"
" আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছি।"
" তাহলে জিজ্ঞেস করছো কেন? "
" মুখে বললেও তো হতো এভাবে মারার দরকার কি্? একটু মারামারি কম করলে হয় না? "
সান্নিধ্য ড্রাইভিং সিটে বসে সিটবেল্ট লাগিয়ে নেয়। স্টিয়ারিং এ হাত রেখে গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বলে, " মুখে বললে ভুলে যাবে। ভুলে যেন না যায় সেই কাজটা করেছি।"
নেতা সাহেবের অকপটে স্বীকারোক্তিতে শেহরিন ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। চাহনি মেলে রাতের বৃষ্টিভেজা রাস্তার দিকে । গাছপালা গুলো কেমন নিঃসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দু'পাশে। পাতাগুলো গা ভিজিয়ে চুপচাপ ঝিমে আছে। স্তব্ধ, নিরবতায় ঢাকা ব্যস্ত সড়ক।
বাকি রাস্তাটুকু দু'জনেই চুপচাপ পার করে। কিছু সময়ের ব্যবধানে গাড়ি এসে থামে নিকুঞ্জ মহলের গেইটের সামনে। শেহরিন শেষ মুহুর্তে ঠিকঠাক বাসার সামনে আসতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। গাড়ি হতে নামার পূর্ব মুহুর্তে মনের মধ্যে চেপে রাখাগুলো প্রকাশ করতে কিছুটা সাহস সঞ্চার করে নিজের ভিতরে। অতঃপর সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে নির্মেদ স্বরে বলে, " আমি হয়তো ভুল করছি। অনিচ্ছায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আপনার মনে আশা জাগাচ্ছি। কিন্তু আমি মোটেও এরকমটা চাই না। আপনার অনুভূতিকে আমি ছোট করছি না। কিন্ত প্রশয় ও দিতে পারছি না। লাস্ট কিছুদিন হলো পরিস্থিতি সবসময়ই আমার প্রতিকূলে থেকেছে। দেখা গিয়েছে, আপনার কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া ছাড়া অন্য পথও নেই। আপনি হয়তো অনেক কিছু ধরে বসে আছেন। কিন্তু আমি... "
" তুমিই একমাত্র মেয়ে যে আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিয়ে চলেছো। আমি চুপচাপ সেই পরীক্ষা দিয়ে চলেছি। যেখানে আমি তোমাকে সময় বেঁধে দিয়েছিলাম একদিনের জন্য। আজ সেটা একুশ দিন হতে চলেছে। আর কি চাও তুমি? "
" আমি তো উত্তর জানিয়েই দিয়েছি। অপেক্ষা করছেন কেন?"
সান্নিধ্য স্টিয়ারিং এ রাখা হাত মুঠো চেপে ধরে। স্থির মুখোরেখায় শান্ত কন্ঠে বলে, " আমি চাইলেই হয়তো তোমাকে এই মুহূর্তে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিতে পারি। আমার নামে তোমাকে পরিচিত করাতে পারি। যেটা আসার সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হয়েছে। কিন্তু আমি সেটা করবো না। আমি ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করবো যতক্ষণ পর্যন্ত না, তোমার না হ্যাঁ হয়।"
" যদি শেষ পর্যন্ত না থাকে? "
" অপেক্ষা ইনফিনিটি হবে।"
"ধরুন আমি অন্য কোথাও সেটেল হলাম? আপনার কি অধিকার রয়েছে আমার লাইফে হস্তান্তর করার? কারণ, আমি তো আমার জীবনে যেটা ভালো হবে বা ভালো লাগবে সেটাই চাইবো বা করবো। "
সান্নিধ্য ঠোঁটের উপর চেপে আলতো হাসে। অতঃপর কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে,
" প্রেমে ব্যর্থ হওয়া পুরুষদের মতো বলতে পারছি না তোমার ভালো থাকাটাই আমি চাই, বা রবীন্দ্রনাথের সেই গানের লাইনে অনুযায়ী তুমি যাহা চাও তাই যেনো পাও আমি যত কষ্ট পাই। সরি, এতো সহৃদয়বান পুরুষ আমি না। প্রফেশনাল লাইফে যে হারে প্যারা খাই, পার্সোনাল লাইফে দেবদাস হলে সমস্যা। আমি একটু হলেও ভালো আছি। ড্রিংকস করি না। দেবদাস হলে তো আবার ড্রিংকস করতে হবে। "
" মানে?? "
"মানে, তোমার ভালো লাগা, ভালো থাকা সব আমার সাথেই হবে। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে যেতে চাইছি না জন্য তোমাকে সময় দিয়েছি আর আমি অপেক্ষা করছি। তোমার উচিত আমার প্রশংসা করা। কারণ, আমি এতো ধৈর্য্যশীল পুরুষ কোনো কালেই ছিলাম না। অন্য কিছু হলে এতোক্ষণে দফারফা হয়ে যেতো। বাট বিষয়টা যেহেতু শেহরিন, সান্নিধ্যেকে স্লো তো হতেই হবে। আর কিছু জানতে চাও ??"
নেতাসাহেবের ঠোঁটকাটা জবাবে শেহরিনের কুঞ্চিত কপালের রেখা মিলিয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,
" না মন ভরে গিয়েছে প্রেম বার্তা শুনে । তবে কষ্ট লাগছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য। এতো সুন্দর একটা গান লেখেছেন প্রেমিক সমাজের জন্য। যেনো সহজেই তারা সারেন্ডার করে দেয়। কিন্তু আপনার মতো প্রেমিক পুরুষের কথা শুনে ধারণা পাল্টে গিয়েছে। লাইনটার অন্য মিনিং বের করে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। কিছু বলার নেই আর।
ভালো থাকুন আসি।"
শেহরিন শাড়ির কুঁচি সামলে গাড়ি হতে নামতে থাকে। সান্নিধ্য এক হাতে তার শাড়ির আঁচলের শেষাংশটুকু আগলে ছাড়িয়ে দেয় সিট হতে। খানিকটা এগিয়ে এসে দরজা এক হাত ধরে যাওয়ার পথ সুগম করে বলে, " আবার দেখা হচ্ছে।"
তৎক্ষনাৎ জবাব দেয় না শেহরিন। বাসার অভ্যন্তরে প্রবেশ পথে একবার পিছু ফিরে চায়। সরু চোখে তাকিয়ে বলে, " হবে না। এবার ছাতা, ফোন, পার্স সব সঙ্গে রেখেই বের হবো। "
|নিকুঞ্জ মহল,রাত দশটা |
" আজকের সাক্ষাৎকার কেমন হলো অনিভা? "
" ভালো। "
" শুধুই ভালো? "
শেহরিন পানি নিতে এসে পড়ে বেকায়দায়। একেকজনের উৎসুক নজর তার কাছে বিরক্তি লাগছে । বিশেষ করে দুই কানা বগীর মায়ের। আজকের এইসব কিছুর জন্য এই দু'জন দায়ী। মেইন কালপ্রিট হচ্ছে এরাই। আবার শুনতে এসেছে সাক্ষাৎ কেমন হয়েছে? কচু হয়েছে! ভালো বলেও হচ্ছে না তাদের । একট্রিম লেভেলের ভালো বলতে হবে? বলবে না সে। হয়রানি কম হতে হয়েছে নাকি। বেক্কেল কানা বগীর ছা ধরিয়ে দিয়েছিলো সঙ্গে।
" কিছু বলছো না কেন অনিভা?ভালো লাগেনি? "
ওয়াটার পটটা ভরা শেষ হতেই শেহরিন পা বাড়ায় নিজ কক্ষে। অধিক কথা এবং জবাবদিহিতা এড়াতে ছোট করে বলে, " লেগেছে।"
" যাক তাহলে তো আর কোনো কথাই রইলো না। ওনাদেরকে কনফার্ম করো আমাদের বাসায় আসতে।"
একসঙ্গে সবার হৈ হৈ বাজে। শেহরিন দ্রুত কক্ষে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। পানির পটটা ডেস্কে রেখেই সরাসরি ফোন হাতে তুলে নেয়।
"হ্যালো বাবা টাইম আপ। আমি আর কিচ্ছু শুনবো না এখন এই মুহূর্তে। আমার ডাকা জরুরি মিটিং এ তোমার অংশগ্রহণ করতেই হবে।"
রিজওয়ান সাহেব অফিস হতে বাসায় ফিরে কোনমতে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে তাড়াহুড়ো করে। মেয়ে তার নির্দিষ্ট সময়ের আল্টিমেটাম দিয়েছে। আজ একটা জরুরি মিটিং করবে সে। সেখানে তাকে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকতেই হবে।
" জ্বি মা। আই এম ও'কে। শুরু করো এবার। "
অনুমতি পায় মেয়ে। এক মুহুর্ত কালক্ষেপণ না করে বিকেল হতে ঘটা সমস্ত কিছু সবিস্তরে তুলে ধরে সে।কাহিনীসংক্ষেপ করতে গিয়েও পারে না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত কথা বলতে থাকে এক এক করে।
" কর্মজীবি মানুষদের সচরাচর যে কোনো সময় ইমার্জেন্সি কল এসেই থাকে। এটাতে আমি দোষের কিছু দেখছি না বাট এমন দায়িত্ব জ্ঞানহীনতাও তার থেকে আশা করিনি। একটা মেয়েকে রাস্তায় একা ছেড়ে এভাবে কেউ চলে যায়? ওয়েদার ভালো থাকলে সেটা এক কথা ছিলো বাট এমন বৃষ্টির দিনে... না না বিষয়টা খুবই খারাপ হয়েছে। "
" উনি আমাকে একটাবারও বলেনি বাবা আমি কিভাবে বাসায় ফিরবো। মানুষ তো মুখের কথাও বলে। বাট এই কানা বগীর ছা সেটাও করেনি। আমি জাস্ট যেতে বলার সঙ্গে সঙ্গে সুরসুর করে চলে গিয়েছে। "
" হুম বুঝতে পেরেছি।"
" ভাগ্য ভালো উনি এসেছিলেন। না হলে আমার এতোক্ষণ রাস্তাতেই আটকে পড়ে থাকতে হতো। "
"উনি বলতে তোমার সেই নেতাসাহেব?? "
"ওহহো বাবা। তুমি স্পেসিফিকলি আমাকে বলো কেন শুধু? আমাদের নেতাসাহেব হবে।"
" না উনি যেভাবে তোমাকে হেল্প করছে সেই শুরু দিন থেকে আই মিন নাস্তার প্যাকেট দিয়ে। মনে হচ্ছে সে জনগণ বলতে শুধু তোমাকেই চিনেছে। বাট একটা জিনিস বুঝতে পারছি না তোমার সাথে এতো দেখা হয় কিভাবে? "
শেহরিন একহাতে সিটকিনি খুলে বেলকনিতে চলে যায়। গ্রিল ধরে উদাসীন গলায় বলে," জানি না বাবা। আমি চাই না তার সাথে আমার দেখা হোক। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার সাথেই বারে বারে আমার দেখা হয়। আজকে উনি আমাকে রাস্তায় একা দেখে সব প্রোটোকল ছেড়ে ছুঁড়ে চলে এসেছে। "
" সব প্রোটোকল ছেড়ে?"
" হ্যাঁ। আশেপাশে মানুষজন তো সব অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলো। "
" নেতা সাহেব বিষয়টা ম্যানেজ করেছে কিভাবে? "
"উনি বেশ স্বাভাবিকই ছিলেন। চলাপথে অনেকজনের সাথে হ্যান্ডশেক করেছেন, টুকটাক কথা বলেছেন। "
রিজওয়ান সাহেব কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করেন। অতঃপর নরম গলায় বলেন, " যারা সত্যিকার্থে পুরুষ মানুষ তাদের কাছে 'নারী ' 'মেয়ে' 'মা' এই শব্দগুলো ভীষণ দামি হয় জানো কি? একদম ঝিনুক মুক্তার মতো। যার মূল্য অগাধ। ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। সেই সাথে ভীষণ যত্নেরও। সেইসব পুরুষ নারীদেরকে এমনভাবে আগলে রাখে যেন কোনো ত্রুটি তাদের স্পর্শ না করতে পারে। এক্ষেত্রে নেতা সাহেবের কাজটাকে আমি আপ্রিশিয়েট করছি। সে কিন্তু জানতো তোমাকে সাহায্য করলে তার কর্মস্থলে ব্যাপক চর্চা হবে। তাকে অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হবে এমনকি উপরি পর্যায়ে জবাবদিহিতাও করতে হবে। টিভি নিউজে আলোচনা হবে। মোটকথা একটা ব্যাড ইমেজ ক্রিয়েট হলেও হতে পারে।"
" বাবা এরকম কিছু একটা অলরেডি হয়েও গিয়েছে। তোমাকে বলেছিলাম না ফুলকান্ড। এটা নিয়ে সম্ভবত নিউজ হয়েছিলো।
" তোমাকে কি এজন্য কিছু বলেছে সে? "
" উহু আমি তো জানলামই আজকে।"
রিজওয়ান সাহেব স্মিত হাসেন। ঠান্ডা গলায় বলেন," এগুলোকে বলে উচ্চ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ। আমি তাকে চিনি না জানি না। বাট যতটুকু তোমার থেকে শুনে বুঝলাম তার ব্যক্তিত্ব কঠিন। বিষয়টা একটু সহজভাবে ভেবে দেখো, সে চাইলে তোমাকে দায়ী করতে পারতো বা নিজের ইমেজ ভালো রাখতে মোটেও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতো না। কারণ সে কিন্তু জানতো না তুমি তাকে গাড়িতে আগেই দেখেছো। তার দিকে সে টোটালি নির্দোষ। বাট নেতাসাহেব সেসবকে পাত্তা দেয়নি ইভেন বুঝতে পর্যন্ত দেয়নি তোমাকে, এতো কিছু হয়ে গিয়েছে যে। বিষয়টা হয়তো তোমার অজানাই থেকে যেতো। সে যে দায়িত্বশীলের মতো কাজটা করেছি আমি ভীষণ খুশি। "
"বাবা আমি অস্বীকার করছি না তার উপকার। আমি উনাকে পুরোপুরি চিনি না জানি না কিন্তু যতটুকু চিনেছি তিনি মেয়ে শব্দটাকে যথেষ্ট সম্মানের চোখে দেখেন। আমরা দৃষ্টি দেখলেই বুঝতে পারি কার মনোভাব কেমন। কিন্তু বাবা আমি আয়রনি করে যাচ্ছি। এই বিষয়টা আমাকে খুবই অস্বস্তি দিচ্ছে। "
" কিভাবে? "
" এমপি সাহেবকে আমি একদিকে বারে বারে প্রত্যাখান করে যাচ্ছি আবার তার সাহায্যও অকপটে গ্রহণ করে যাচ্ছি। বিষয়টা খুবই দৃষ্টিকটু। মানে শুদ্ধ বাংলায় প্রয়োজন কিন্তু প্রিয়জন নয়।"
" তোমার বিষয়টা আমি অনুধাবন করতে পারছি মা। হেমোটোফোবিয়ার কারণে তুমি এতো ভীত হচ্ছো তাই তো?
ঠিক আছে, তুমি তাহলে আমাকে ক্লিয়ার করো, তুমি আসলে কি চাইছো? "
শেহরিন একহাতে গ্রিল চেপে ধরে। শূন্যতে দৃষ্টি রাখতেই ভেসে ওঠে এমপি সাহেবের ছোটো ছোট কেয়ারগুলো আর তার বলা কথাগুলো। কিন্তু হুট করে সেই মারের শব্দ কানে আসতেই সে সজাগ চক্ষু মেলে বলে, " আমি একটু শান্তি চাই, এমন একজনকে চাই যে আমাকে একটু শান্তি এবং সঙ্গতা দিবে। হানাহানি মারামারি থেকে দূরে রাখবে। সবকিছু মিলিয়ে আগে আমার একটু সময় প্রয়োজন। একসঙ্গে এতো চাপ নিতে চাইছি না।"
" ঠিক আছে। বাট একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছে। তৌসিফের বাবা আমাকে ফোন করেছিলেন। তারা ভীষণ উৎসাহী তোমাকে তাদের পরিবারে পুত্রবধূ করে নিতে। আমাকে এক প্রকার অনুরোধও করে ফেলেছেন। তারা যথাসম্ভব দেশে ফিরে বিয়েটা সম্পন্ন করতে চান। এক্ষেত্রে আমাকে না বলে যদি তোমার মামাকে জানাতো তাহলে আমি না করে দিতাম বা সময় চাইতাম কিন্তু এখন ফিরিয়ে দেওয়াটাও একটু খারাপ দেখায়।"
" বাবা এই লোকটার সঙ্গে ফার্স্ট মিটেই আমার খারাপ ইম্প্রেশন তৈরি হয়েছে। জানি না এর আদ্যপান্ত কেমন কি হবে। হুট করে বিয়েটা হলে পরিণতি কি খুব একটা ভালো হবে? "
" আমি আসলে নিজেও কনফিউজড। তবে কালকে আসছি চট্টগ্রামে। যেহেতু শুক্রবারে তৌসিফের ফ্যামিলির লোকজন আসবে তোমাকে দেখতে। বাবা হিসেবে আমার উপস্থিত থাকাটা জরুরি। তখন না হয় দু'জনের সঙ্গেই দেখা করবো।"
" দুজন কে কে?"
" নেতাসাহেব আর তৌসিফ।"
" নেতাসাহেবের সঙ্গে দেখা করে কি করবে তুমি? "
" তাকে সূক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করবো। জানবো অতঃপর তোমার সমস্যাটা তাকে খুলে বলবো। বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝবে। কারণ ছেলেটার কর্মকান্ডে বোঝা যাচ্ছে সে সত্যিই তোমার প্রতি একটা সফট কর্ণার তৈরি করেছে। কারো মন ভাঙার অধিকার আমাদের নেই।"
" আমি জানি না সে বুঝবে কি না। তবে বুঝলে হয়তো ভালোই হবে।"
" তার প্রতি একটুও কি তোমার পজিটিভ ইম্প্রেশন তৈরি হয়নি? "
" অস্বীকার করছি না। হু একটু তৈরি হয়েছে। বাট ক্যাডার বলেছে সে নাকি কর্মজগতে আসলেই ডেঞ্জারাস। "
" মা.. আমরা মানুষের বিবেচনায় মানুষকে বিচার করবো না। আমরা নিজেরা যেটা দোখবো জানবো বুঝবো সেইটা দেখে বিচার করবো। কেমন?"
" ঠিক আছে ।"
"আচ্ছা আমি আসছি চিন্তা করো না তুমি।"
" বাবা.."
" জ্বি মা.. "
" অন্যদিনের তুলনায় আজকে উনাকে নিয়ে আমি বেশি ভাবছি কেন? "
" হতে পারে তোমার তাকে একটু একটু করে ভালো লাগছে। "
" বুঝতে পারছি না। ভালো মন্দ দুটো মিক্সড হয়ে আমাকে হয়রানি করে তুলছে। ভালোবাসা ভালোলাগা সংসার নতুন জীবন এগুলো নিয়ে আমি অনেক ভয়ে থাকি বাবা। আমি তোমাকে ছাড়া নিজে একটা সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিতে পারি না। সেখানে এতকিছু মেইনটেইন করবো কিভাবে? "
" হাহা। এখন বলছো কিভাবে কি করবে কিন্তু দেখো দু তিনবছর পর তুমি কতটা পরিবর্তন হয়ে যাবে। সব পারবে ইনশাআল্লাহ। তখন বাবা ছাড়াও অনায়াসে চলতে পারবে।"
" প্লিজ বাবা! এই কথাটা বলো না। তোমাকে ছাড়া আমি চলতে চাই না। আমি সারাজীবন তোমার হাত ধরে এভাবেই চলতে চাই। তুমি ছাড়া আমাকে কেউ বোঝার নেই।"
" আমি বাবা হয়ে দোয়া করি তোমার জন্য, তোমার জীবনে যেনো সেই মানুষটাই আসে যে তোমাকে বাবার মতো আগলে রাখবে। তবে ভালোবাসা পায়ের তলায় এলে কখনো ঠেলে ফেলে দিয়ো না। এই ভালোবাসার অভাবে কত মানুষ নিজের জীবনকে শেষ করে দেয়, থামিয়ে ফেলে নিজের অস্তিত্ব। এটা এক অমূল্য জিনিস। নিজের প্রতি সৎ থাকবে কোনো ধরনের অবৈধতার মধ্যে যাবে না। যদি কখনো কাউকে মনে করো সে তোমার জন্য পার্ফেক্ট আমি নিজে বিবেচনা করে তার হাতে তুলে দিবো। তবুও কখনো নিজের সম্মানটাকে নষ্ট করবে না কেমন?
" জ্বি বাবা। অবশ্যই।"
" তুমি চিন্তা করো না উনারা দেখতে আসলেই তো বিয়ে হবে না। আর আমি তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও কখনো যাবো না। আমি তোমাকে সময় দিবো তুমি সুন্দরভাবে ভাবনা চিন্তা করে যেটা ঠিক মনে হবে আমাকে জানাবে। কারণ, আমি নিজেও চাইছি আমার মেয়েটা একটা নতুন জীবনে পদার্পণ করুক। একজন ভালো সঙ্গী আসুক। যে তার এই একাকিত্বগুলো ধুয়ে মুছে ফেলবে।"
শেহরিন অদূর পানে চেয়ে মলিন হাসে। যদি পৃথিবীতে সুখ শান্তি কেনাবেচা হতো সে নিশ্চিত, বাবা সর্বস্ব দিয়েও তার জন্য তা কিনে আনতো।
" বাবা একটা প্রশ্ন করি? "
"জ্বি করো্"
" আচ্ছা আমি এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে এতো কথা বলি, এতো সমস্যা তুলে ধরি তুমি কখনো কেন তার বিপক্ষে কথা বলো না? সবসময় তার পক্ষই নিয়েই কথা বলো? তুমি কি জানো, এটা রেয়ার একটা চিত্র। আমাদের সমাজে বেশিরভাগ বাবা মা -ই কিন্তু এরকমটা করবে না। ছেলে বা মেয়ের পক্ষেই থাকবে। তুমি বিপক্ষে কেন?"
রিজওয়ান সাহেব দীর্ঘ শ্বাস ছাড়েন। জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে নির্মল হাওয়ায় স্থির কন্ঠে বলেন, " আমি কেন তার বিপক্ষে যাবো মা ? আমি তার সম্পর্কে অজ্ঞাত। ভুল, খারাপ কাজ আমরা সবাই করি। নির্দোষ আমরা কেউই নয়। না জেনেশুনে আমাদের কারো উপরই কারো আঙুল তোলা উচিত নয়। হতেও তো পারে তার হাজার খারাপের ভীড়ে অনেক ভালো গুণ আছে। যেগুলো তোমার আমার অজানা। শুধু সে কেন তৌসিফের বিষয়টাও আমার কাছে একই। দূর থেকে কাউকে আমি জাজ করতে চাই না। তাদের সম্পর্কে না জেনে খারাপ মন্তব্য করতে চাই না। সুতরাং, আমি আমার মেয়েরও পক্ষে, তাদেরও পক্ষে। "
শেহরিন ফিক করে হেসে ফেলে বাবার কথায়। দাঁত দ্বারা নখ খুঁটিয়ে বলে, " হু বুঝলাম। আমার বাবা হচ্ছে নিরপেক্ষ ভোটার।"
রিজওয়ান সাহেব মেয়ের কথায় জোড়ালো শব্দে হেসে উঠেন।
অতঃপর কিছু সময় টুকটাক কথা বার্তা সম্পন্ন করে ফোন রেখে দেয় শেহরিন।
নিকষ কালো রঙের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে কতক্ষণ সে এক দৃষ্টিতে। দ্বিধা দ্বন্দ্বের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে। কি করবে কি সিদ্ধান্ত নিবে। নেতা সাহেবকে কি করে বুঝাবো সে কতটা দূর্বল চিত্তের একটা রমণী। আচ্ছা অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে উঠলে সে কি পথ ছেড়ে দিয়ে চলে যাবে? নাকি সত্যি তার অপেক্ষা অসংজ্ঞায়িত হবে??
___________________________________
হিসেব নিকেশের রাত্রি শেষে ধরণীতে আসে আলো। বেলা গড়িয়ে গড়িয়ে এসে ঠেকে এগারোটার কাছে। আজকের ক্লাস এগারোটা পঁয়তাল্লিশ হতে শুরু। দৌড় ঝাঁপের মধ্যে দিয়ে তৈরি হচ্ছে শেহরিন। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। আঠার মতো ঘুম লেগে রয়েছিলো চোখে। কোনমতে তা ছাড়িয়ে এখন দৌঁড়াচ্ছে সে ভার্সিটির উদ্দেশ্য।
ড্রয়িংরুমে দু বান্ধবীর গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর চলছে। থেকে থেকে টিভির পানে চেয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে একে অপরে। শেহরিন ব্যস্তপায়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় থমকে দাঁড়ায়। মাথায় বাঁধা পোনিটেলটা সজোরে টেনে নজর দেয় টিভির পানে। সেই সঙ্গে শ্রবণেন্দ্রিয় সজাগ করে চলমান তাদের কথা শুনতে।
সাদা পাঞ্জাবি পড়া একজন সুর্দশন পুরুষকে দেখা যাচ্ছে টিভিতে। মানুষটির চোখে কালো সানগ্লাস। মুখোরেখা নির্মল শান্ত হলেও রোদের তেজ এসে কপালে খানিকটা ভাঁজ তৈরি করে দিয়েছে । থুতনিতে ডান হাত রেখে বসে আছেন বেশ চুপচাপ। ঠিক তার দু'পাশে সারি সারি চেয়ারে বসেছে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাকর্মী। স্টেজে দাঁড়িয়ে কেউ একজন ভাষণ দিচ্ছেন জোরালো গলায়।
" দোস্ত ব্যাটার চাহনিটা একবার দেখ। মারাত্নক লেভেলের। আমি তো চোখই সরাতে পারি না। অ্যাটিটিউড তার শিরায় শিরায়। "
" বসার স্টাইলটা দেখেছিস। ব্যাটা যেমনে থাকে সেরকমই সুন্দর লাগে দেখতে। "
" বিলিভ মি মুমু। আমি যদি ক্লাস নাইনে না পড়ে ইন্টারে পড়তাম নিশ্চিত এর পিছনে ঘুরতাম।"
মুমু আরশির চলমান কথায় শেহরিনের চোখদুটো বড় বড় হয়ে যায়। কানে দিয়ে বের হয় গরম ধোঁয়া। টিভির স্ক্রিনে সম্ভবত কোনো একটা দলীয় সমাবেশ চলছে। সরাসরি সম্প্রচার করছে চ্যানেলটি। আর সেখানেই দৃশ্যমান হচ্ছে নেতাসাহেব। একটু পর পরই তাকে দেখাচ্ছে খাটাশ ক্যামেরা ম্যান।
" কুল শেহরিন কুল। তুই রেগে যাচ্ছিস কেন? তোর কী? তুই ভার্সিটি যা। তুই তো আর নেতাসাহেবকে পছন্দ করিস না! "
শেহরিন নিজেকে ধাতস্থ করে। তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি সরিয়ে দরজা খোলা মুহুর্তেই ভেসে আসে,
" ক্লিন শেভের চেয়ে এরকম খোঁচানো দাড়িতে বেশি ভালো লাগে আমার।"
" আজকের লুকটা একদম ঠিকঠাক।"
শেহরিন এক পলক ফিরে চায়। টিভির স্ক্রিনে আবারো নেতাসাহেব। কালো সানগ্লাসে আজকে একদম সত্যিকারে নেতা নেতা লাগছে। পায়ে জুতো পড়া বাদ দিয়ে সে হনহনিয়ে হেঁটে আসে সোফার কাছে। টেবিলে রাখা রিমোট চেপে ফট করে বন্ধ করে দেয় টিভি।
" পড়া নেই তোমাদের? টিভিতে কি এতো? যাও পড়তে বসো।"
হুট করে শেহরিনের উচ্চ গলায় বলা কথায় নিজেদের চলমান গসিপ থামায় মুমু আরশি। হতবাক দৃষ্টিতে তাকায় দু'জনেই তার পানে।
" কি হলো? আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন যাও? "
" হু যাচ্ছি।"
শেহরিন দু'জনকে থামিয়ে রিমোটটা টেবিলে রেখে আবারো চলে যায় দরজার কাছে। তড়িঘড়ি করে জুতো পড়ে বাইরে যেতেই মুমু আরশি আবারো টিভি চালু করে তৎক্ষনাৎ ।
দু সিঁড়ি পার হতেই শেহরিনের গতিরোধ হয়ে আসে। বুঝে যায় ইঁচড়েপাকা দুটো আবারো টিভি চালু করেছে। নিজেকে সে শান্ত করার চেষ্টা করে। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে টেনে বলে, " আমি কেন হাইপার হচ্ছি? আমার কি তাতে?? "
অবাধ্য মনকে নব্বই ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরায় সে। নিজেকে শান্ত করতে না করতেই পর মুহুর্তে কর্ণকুহরে এসে পৌঁছায় আবারো হাসির শব্দ। যা তাকে এক নিমিষেই তিনশো ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরিয়ে দেয়। নিজেকে আটকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হলে জুতো পড়েই মেইন ডোর খুলে সরাসরি ভিতরে প্রবেশ করে সে । ফের টেবিল হতে রিমোট তুলে টিভি অফ করে দেয়। অতঃপর রিমোটটা ব্যাগের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে চলে যায় ভার্সিটির উদ্দেশ্য।
শেহরিনের চুপচাপ এহেন কান্ডে মুমু আরশি একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলে, " কি হলো ব্যাপারটা? "
"জেলাসি। জেলাসি।"
" এমপি সাহেবের গার্ল ফ্রেন্ডও হয়তো এতো জেলাসি ফিল করতো না যতটা তোর বোন করছে মুমু।"
" ডাউট লাগছে আমার। "