অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৭৩

🟢

ইনায়া ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশটা একদম পরিষ্কার। কিন্তু আকাশের থেকে বেশি পরিষ্কার আছে তার মন। একদম ফুরফুরে মেজাজ। বাড়ির সবাই অনেক হৈচৈ করছে তার রেজাল্ট নিয়ে। বিপদের সময় কেউ তার সঙ্গ না দিলেও তার খুশিতে সবাই মেতে উঠেছে।ইনায়ার মাও অনেক খুশি। তারপর ইরিনরা আসলেই তাদের বিয়ে হবে ঘটা করে এ কারণে বাড়ির সবাই খুব ব্যস্ত। ইনায়া জানে না সানিউল এসেছে সে তো দেখেই নি।

হঠাৎ তার কানে এলো এক পরিচিত কন্ঠ। খুবই পরিচিত কন্ঠ।কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকে উঠলো।কত কত বছর অপেক্ষা করেছিল ইনায়া এই পরিচিতি ব্যক্তির মুখ থেকে নিজের নাম শোনার জন্য। কিন্তু আফসোস একবারও শুনে নি।সে যদি এই পরিচিতি ব্যক্তির জন্য দোয়া করতো তাহলে তার দোয়ায় এই একটা ইচ্ছাও থাকতো। যেখানে সে তার রবের কাছে আর্জি করতো যে এই মানুষটির মুখ থেকে যেন সে নিজের নাম অন্তত এক বার যেন শুনতে পারে‌।আজ তার সেই আর্জি কবুল হলো। তার তো শুনে শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা অথচ তার কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না।অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে পেছনে তাকালো।তার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সানিউল।তার চোখে এক আকাশ সমান ইনায়া কে পাবার আশা এবং হারানো ভয়। কিন্তু এখন আর ইনায়ার এই সবে যায় আসে না।সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল ___

আরে সানিউল ভাইয়া যে।কি অবস্থা ভাইয়া?

সানিউলের ভেতর টা চিঁড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বুক ফেটে যাবে।এই মেয়েটি তাকে আগে যেই ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতো আজ সেভাবে দেখছে না। আগে এই মেয়েটির চোখে তাকালে দেখতে পেত তার জন্য এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসা। এখন কোন অনুভূতিই দেখতে পারছে না।সে হতাশ হয়ে বলল____

এখন আর ভালোবাসো না আমাকে?

ইনায়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরিস্থিতিতে পড়ে গেল। এমন কোন প্রশ্ন শোনার আশায় ছিল না। আর এই মুহূর্তে ছাদে কেবল সে এবং সানিউল।আর সে চায় না আরিশ তাকে ভুল বোঝুক।সে সানিউলের চোখে চোখ রেখে প্রখর কন্ঠে বলল_____

সেইটা আমার অতীত ভাইয়া। আর তুমি কিভাবে এখন এই কথা বলছো? জানো না আমি বিবাহিত। একজন বিবাহিত মেয়েকে কি এরকম প্রশ্ন করা মানায় তোমার মত শিক্ষিত ছেলের দ্বারা?

সানিউর হকচকিয়ে উঠলো। তাদের মাঝে কখনো তেমন কথা হয়নি। কিন্তু যখনই কথা হয়েছে মেয়েটা খুব নরম স্বরে তার সাথে কথা বলতো সবসময়। খুব মেপে মেপে কথা বলতো। তাকে খুব ভালোভাবে ট্রিট করত। অথচ আজ এই মেয়েটা তার সাথে এভাবে কথা বলছে বিষয়টা তাকে বড্ড পোড়াচ্ছে।সে আহত দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল___

এই ভাবে বলোনা ইনায়া কষ্ট হয়। আমি তো তোমার জন্য এসেছি।আমি তোমার ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পেরেছি অবশেষে। তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে তাতে আমার কোন সমস্যা নেই। এটাকে আমি তোমার অতিথি হিসেবে মনে করব।

ইনায়া শব্দ করে হেসে উঠলো।তাকে পরিস্থিতিতে হাসতে দেখে সানিউল কিঞ্চিত চামকালো‌।ইনায়া হাসতে হাসতে বলল _____

এটাই পার্থক্য তোমার আর আমার স্বামীর মধ্যে। তুমি আমার অতীতকে নাকি অতীত হিসেবে ধরবে। অথচ আমার এ বর্তমান জীবনে যেই অতীতের কলঙ্ক লেগেছিল তোমার জন্য সেই অতীতকে আমার স্বামী তুচ্ছ মনে করে। তার মতে আমার অতীত মনে করার কোন প্রয়োজন নেই। যেটা অতীত সেটা অতীত। বরং সে আমার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে ভাবে।তাই তোমাকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা আরিশ কে আমারে জীবনসঙ্গী হিসেবে দিয়েছেন। আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করবে তুমি নয়তো আমার প্রাণপ্রিয়, ভালোবাসার স্বামী তোমাকে ছেড়ে দিবে না।

সানিউল অবাক না হয়ে পারছেনা। এই ইনায়া কে সে চিনে না‌।সে যেই ইনায়া কে চিনতো সেই মেয়েটি নিতান্তই নরম স্বভাবের ছিল, তাকে ভীষণ ভালোবাসবো। মেয়েটির দৃষ্টি কেবল তার দিকে থাকতো। সবসময় তার পেছন পেছন ছুটাছুটি করতো। অথচ আজ সেই মেয়েটি তার সাথে অপরিচিতদের মত আচরণ করছে। সানিউল তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল _____

বাহ্ বিয়ে করতে না করতেই আমার জন্য ভালোবাসা, উড়ে গেল? স্বামী কি এতটাই ভালোবাসে? নাকি টাকা দেখে গলে পরেছো? কারণ তোমাদের মত মেয়েরা তো আর যাই হোক কাউকে ভালবাসতে পারে না। বিয়ে করেছিল তারপর ভেবেছিলাম হয়তো কোনো এককালে তুমি আমাকে ভালবেসেছিলে তাই তোমাকে গ্রহণ করব। কিন্তু ভাগ্যিস তুমি আমার জীবনে আসোনি। ইউ আর এ গোল্ড ডিগার।তো তোমার সেই স্বামী কি তোমার অতীতের সম্পর্কে জানে? তুমি যে কোন এক কালে আমাকে পাগলের মত ভালবাসতে সেই সম্পর্কে জানে নাকি আমি নিজে জানিয়ে দিব?

সানিউলের কথা শুনে আরিশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।চোখ রক্ত বর্ণ ধারণ করল। হাত আপনি আপনি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। আসলে সে ইনায়া কে ডাকার জন্য ছাদে এসেছিল। কিন্তু ছাদে এসে দেখল ইনায়া একটি ছেলের সাথে কথ বলছে। যখন তারা কথা বলতে শুরু করল তখনই আরিশ ছাদের সিঁড়িতে এসে পড়েছিল এবং সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনে বুঝতে পেরেছিল এই ছেলেটি সানিউল। তাই তার পা জোড়া সেখানেই থেমে গিয়েছিল। সে জানতে চেয়েছিল তার ইনু কি বলে, কি করে। তাই আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে তাদের সব কথা শুনতে লাগলো। কিন্তু সানিউলের বলা শেষ কথাগুলো সে মেনে নিতে পারল না। ও তার ইনু কে এত বাজে কথা শোনাবে তা সে বরখাস্ত করবে না। যেই না সে পা বাড়ালো তাদের দিকে যাওয়ার জন্য তখনই ইনায়ার কথা শুনে পা থমকে গেল তার।

ইনায় সানিউলের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করল _____

গোল্ড ডিগার এর কথা আর যাই হোক তোমার মুখে মানাচ্ছে না কারণ গোল্ড কিনার সমর্থ এখনো তোমার হয়নি। আর আমার স্বামী একজন ডায়মন্ড তাই আমার গোল্ডের প্রয়োজন হয় না।আর বললে না যে টাকা পয়সা দেখে আমার ভালবাসা বদলে গিয়েছে তাহলে একটা কথা পরিষ্কার করে দেই আমার এখনও যেই অর্থ সম্পদ আছে সেই তুলনায় তোমার কিছুই নেই। আমি কখনোই কাউকে ছোট করে কথা বলি না কিন্তু তুমি এমনিতেই ছোট মনের মানুষ তোমার সাথে আমি কথা বলছি এতেই তুমি কিছুটা বড় হয়ে উঠেছ তাই ভাবলাম আবার তোমাকে নিজের স্থান দেখিয়ে দেই আমি। থাকতে তো মাটির বাসায়। ও সরি ভুল বললাম এখনো থাকো। নিজের জমি ভিটা বলতে কিছুই নেই। তবুও তোমাকে ভালবেসেছিলাম। খুব বিলাসী জীবনযাপন না করলেও শুরু থেকে বড় হয়েছি ফ্ল্যাটে, রুমে ছিল বাথরুম, খাবার খেয়েছি ডাইনিং টেবিলে। আর তোমাদের তো সেইটুকু যোগ্যতা ও ছিল না তবুও তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। আসলে আমার মত মেয়েরা তোমার মত নির্লজ্জ, ছোটলোক, কাপুরুষ, চরিত্রহীন ছেলেকে ভালবাসতে পারে না। কয়জন মেয়ের সাথে সম্পর্কে গিয়েছো কি ভেবেছ আমি এসব জানিনা? তোমার স্ক্রিনশট নিয়ে ঘুরি আমি।যেই ক্যারিয়ার দাপট দেখাচ্ছো তোমার স্ক্রিনশট আর ভয়েস গুলো আপলোড দিলে সেই ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে। কেবল তোমার মত ছোট মানের মানুষ না বলে এমনটা করলাম না। আর সব থেকে বড় কথা হলো এইটা যাকে একসময় ভালবেসে ছিলাম, যার উন্নতির জন্য রোজা রেখেছিলাম, নামাজের দোয়ায় রেখেছিলাম আর যাই হোক তার ক্ষতি কখনো আমার দ্বারা হবে না। আর রইল বাকি তোমাকে ভালোবাসার কথা তাহলে স্পষ্ট শুনে নাও তোমাকে আমি ঘৃণাও করি না। তুমি আমার ঘৃণার যোগ্য না। একটা মানুষকে ঘৃণা করার জন্য হলেও তার অস্তিত্ব মনে এবং মস্তিষ্কে থাকা জরুরী। কিন্তু চুল পরিমান অস্তিত্ব তোমার নেই আমার জীবনে। আর তোমার এবং আমার আরিশের মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক। একটু আগে আমাকে ভয় দেখালে না যে আমার স্বামীকে তুমি আমার অতীত সম্পর্কে বলবে বিশ্বাস কর আমি যদি তাকে আমার অতীত সম্পর্কে নাও বলতাম তবুও যদি তুমি তাকে গিয়ে আমার নামে কিছু বলতে সে কখনোই তোমাকে বিশ্বাস করত না। আমি খারাপ হলেও কেবল আমাকে ভালবাসে এবং বাসবে। আমার মাঝে যদি কলঙ্ক থাকে তাহলে সেই কলঙ্ক সমেত সে আমাকে ভালবাসে। আমার মনে সে খুব গভীরভাবে ছুঁয়ে দিয়েছে, আমার সর্বাঙ্গে তার ছোয়া আছে।আমার অতীতকে আমার জীবন থেকে সে মুছে ফেলেছে। যদি তুমি সেই অতীত কে আবার মনে করিয়ে দিতে চাও তাহলে আমি নিজেও জানিনা তোমার সাথে কি হতে পারে। ভেবোনা তোমাকে আমি ভয় দেখাচ্ছি। মোটেও না।বরং আমি নিজের স্বামীর সুনাম গাইছি।আর তোমার উপর থেকে আমার ভালবাসা উঠে পড়বে না তো কি করবে? আমার খারাপ সময় একবারও তুমি আমার পাশে ছিলে? কই মনে পড়ছে না তোমার। বরং আমার জীবনে আরও যতগুলো খারাপ সময় এসেছিল সকল কিছু তোমাকে ঘিরে ছিল। আমার বাবার মৃত্যুর সময় একজন আত্মীয় হিসেবে তুমি কল করনি। আবার এখন আমার সামনে নিজের ভালোবাসা দাবি নিয়ে এসেছো? লজ্জা করছে না তোমার? অবশ্য লজ্জা নামক জিনিস যদি তোমার ভেতর থাকত তাহলে যেই ভাইয়ের টাকা দিয়ে পড়াশোনা করে ডাক্তার হয়েছো এই ভাইকেই তো তুমি এখন দেখনা। নিজের ফেসবুক একাউন্টে ইসলামিক পোস্ট দিয়ে ভরে রাখো অথচ ইনবক্সে মেয়ে দিয়ে ভরে রাখছো। মেয়েদের সাথে বিভিন্ন অশ্লীল মেসেজ তোমার। সকল কিছু স্ক্রিনশট আছে আমার কাছে। আমাকে কাঁচা খেলোয়াড় ভেবো না। ফেসবুকে ইসলামিক পোস্ট, পরণে পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে কেউ জান্নাত যেতে পারে না। যদি তুমি ভাবো এসব করলেই তুমি আল্লাহর প্রিয় পাত্র হয়ে যাবে তাহলে সেটা তোমার ভুল ধারণা। তোমার তো চরিত্রের কোন ঠিক ঠিকানা নেই। যেই হাত দিয়ে ইসলামিক পোস্ট করো, যেই হাত দিয়ে ওজু করে নামাজ পড়ো এ হাত দিয়েই নন মেহেরাম কে ছুঁয়ে আসো। যেই মুখ দিয়ে দোয়া পড়, কোরআন তেলাওয়াত করো সেই মুখ দিয়েই পর নারীকে ছুঁয়ে আবার তাকে ভয়েসে তার শরীর সম্পর্কে কমপ্লিমেন্ট দাও। কি ভেবেছ আমি কিছুই জানিনা? তোমার ভয়েসের স্ক্রিন রেকর্ড আছে আমার কাছে। তাই নিজেকে মহান ভাবা বন্ধ কর। তোমার মতন নিচু জাতের পুরুষদের জন্য পুরুষ মানুষ শব্দ টা কেই নারীরা বিশ্বাস করে না।আর আমার স্বামী আরিশ ইহতেশাম খানের মত মানুষ এখনো পৃথিবীতে আছে বলে পৃথিবীতে নারীরা ভালোবাসার অপেক্ষা করে এখনো। তুমি ঠিকই বলেছ ভাগ্যিস আল্লাহ আমাকে তোমার জীবনে নেয়নি নয়তো আমার জীবন নষ্ট হয়েছে তো। সবশেষে একটা কথাই বলবো___

আল্লাহ যেন তোমাকে হেদায়েত দান করে।

কথাটি বলে ইনায়া চলে এলো। পিছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না। সিঁড়ির কাছে আসতেই দেখলো আরিশ সেখানে দাঁড়িয়ে।ইনায়া থমকে গেল। মনের ভেতর অজানা ভয় জন্ম দিল। আরিশ কি তাকে ভুল বঝবে?

কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে আরিশ তাকে বুকে টেনে দিল এবং বলল____

আই প্রাউড অফ ইউ ইনু। এন্ড আই লাভ ইউ।

ইনায়ার মন থেকে সকল ভয়,চিন্তা হাওয়া হয়ে গেল।সেও আরিশ কে জড়িয়ে ধরল।আরিশ ইনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল _____

বউ রুমে চলো আদর করব। অনেকদিন হলো তোমার ছোঁয়া পাইনা। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার আগে বাসর করে নিব ।

ইনায়া লজ্জায় নুইয়ে গেল। এবং মিনমিনে বলল_____

আপনার দিন পে দিন লজ্জা কমে যাচ্ছে।

আরিশ শব্দ করে হেসে বলল_____

জি মেডাম আর রাতে আরো কমে যাবে এবং আমি তখন হবো নির্লজ্জ।চলো তাহলে রুমে গিয়ে ভালোবাসার সাগরে ডুব দেই।

ইনায়া শব্দ করে হেসে উঠলো।

২ বছর পর __________________

বিজ্ঞাপন

অপারেশন থিয়েটারের সামনে পায়চারি করছে আরিশ‌।তার সাথেই দাঁড়িয়ে আছে সাদমান।ইরিন আসে নি হাসপাতালে কারণ সে নিজেই ৬ মাসের প্রেগন্যান্ট।আর তার সাথে রয়ে গেল বাড়িতে তার মা। তার বাবা হসপিটালে এসেছে।ইনায়ার এইচএসসি রেজাল্টের কিছুদিন পরে আরিশ আর ইনায়ার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। আর সাদমান এবং ইরিনের ঘটা করে বিয়ে হয়। বিয়ের পরপরই তারা লন্ডনে চলে আসে। দেশের ব্যবসা আরিশ ইনায়ার ভাই ইশান কে বুঝিয়ে দিয়ে আসে। অবশ্য ইশানের বিয়েতে তারা আবার বাংলাদেশ এসেছিল। আর ইনায়া লন্ডনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে এবং সাইকোলজি বিষয় নিয়েই পড়ছে।আর সব থেকে বড় কথা হলো তাদের বিয়ের তিন বছর চলছে অথচ আরিশ একবারও তার অতীত নিয়ে খোটা দেয়নি তাকে। এমন না যে তাদের মাঝে ঝগড়া হয়নি। কিন্তু কখনো তাকে এমন কথা বলেনি যেই কথায় সে কষ্ট পাবে।ইরিন আর সাদমানের সম্পর্কও খুব ভালো যাচ্ছে।বিয়ের পর সব কিছু একদম উল্টো হয়ে গিয়েছে আগে সাদমান খুবই লাজুক এবং ভদ্র ছেলে ছিল। কিন্তু এখন সে নিজেই নির্লজ্জ মার্কা কথাবার্তা বলে ইরিনকে লজ্জায় ফেলে।

হঠাৎ অপারেশন থিয়েটার দিকে ডাক্তার বের হয়ে আসলো এবং আরিশের উদ্দেশ্যে ইংরেজিতে বলল _____

আপনার মে___

ডাক্তার নিজের কথা সম্পূর্ণ করার আগে আরিশ নিজে জিজ্ঞেস করে উঠলো____

আগে বলুন আমার স্ত্রী কেমন আছে? স্ত্রী সুস্থ আছে তো? তার কোন সমস্যা হয়নি তো?

ডাক্তার হেসে জবাব দিল____

হ্যাঁ আপনার স্ত্রী একদম সুস্থ আছে। তাই শুধুমাত্র রেস্টের প্রয়োজন। এবং আপনার মেয়ে সন্তান হয়েছে।

আরিশেল চোখ ছলছল করে উঠলো আনন্দে। আজ যেন তা আমাদের শেষ নেই। সে দ্রুত গতিতে ক্যাবিনে প্রবেশ করল।ইনায়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল বেডে। পাশে ছোট্ট একটি দোলনাতে কন্যা শিশুটি হয়েছিল। আরিশ প্রথম নিজের স্ত্রীর কাছে গিয়ে তার কপালে চুমু খেয়েছে এবং বলেছে______

অনেক চিন্তিত ছিলাম তোমাকে নিয়ে। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকোর যে তুমি সুস্থ আছো। তোমার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে কেউই না।

ইনায়া চোখ খুলে মুচকি হাসলো। এই লোকটির পাগলামি সে বিয়ের পর থেকে দেখে আসছে। আর যখন প্রেগন্যান্ট ছিল তখন তো এই পাগল প্রেমিক পুরুষের পাগলামি আরো হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছিল। পারলে তাকে সারাক্ষণ কোলো করে নিয়ে ঘুরে এমন অবস্থা।

আরিশ এইবার নিজের ছোট্ট মেয়ের কাছে গেল। খুব যত্ন সহকারে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। চোখ থেকে তার নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। মেয়েটির কপালে চুমু খেয়ে কেঁদে উঠলো।তার ১৫ বছরের ভালোবাসা পূর্ণতা লাভ করেছে। তারপর সেই ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে সে সংসার করছে এবং তাদের ভালোবাসার ছোট্ট একটি প্রতীক হিসেবে এই মেয়ে জন্ম নিয়েছে। আরিশের ভালোবাসা যেন আরো কয়েকশো গুন বেড়ে গেল ইনায়ার প্রতি।

সে নিজের মেয়েকে নিয়ে ইনায়ার বেডে পাশে বসলো। তারপর ইনায়ার হাতে আলতো করে ধরে বলতে শুরু করল _____

ধন্যবাদ আমার জীবনে দ্বিতীয় এক নারীকে এনে দেওয়ার জন্য। ধন্যবাদ পৃথিবীর সবথেকে দামি উপহার আমাকে দেওয়ার জন্য।

ইনায়ার চোখ থেকেও খুশির অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। শীতল কন্ঠে বলল_____

আচ্ছা ওর নাম কি রাখবো? দুজনের নাম মিলিয়ে রাখতে হবে কিন্তু।

আরিশ আলতো করে হাসলো। তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল____

আনায় ইফরাহ খান।আনায়া (Anaya) নামের আরবি অর্থ হলো যত্ন, সুরক্ষা, বা যত্নশীলতা, যা মূলত ইনায়া (Inaya) নামের একটি রূপ।আর আমার নামের প্রথম অক্ষর আছে। কেমন লাগলো নামটি?

ইনায়া মুখ ভরা হাসি নিয়ে বলল____

খুব খুব খুব সুন্দর মা শা আল্লাহ্।

আরিশ হাসলো। তারপর সাদমান আর ইমরান খান এসে ইনায়াকে এবং তার বাচ্চাকে কে দেখলো।সবাই তো ভীষণ খুশি।আজ ইনায়ার কে রিলিজ করে দেওয়া হবে।

আর আজকে ইনায়ার মা ভাই তার বউ সবাই আসবে লন্ডনে।

_____________

আনায়া বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছে। বয়স তার ১ বছর। ইরিনের ছেলে বাচ্চা হয়েছে। সে বাচ্চাটির নাম রাখা হয়েছে ইবাদ। নামটা সাদমান নিজেই রেখেছে।

আরিশ সবে অফিস থেকে ফিরল‌। বিছানায় শুয়ে থাকা ঘুমন্ত নিষ্পাপ শিশুটিকে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সকল ক্লান্তি দূরে চলে গেল। ইনায়া তখন পড়ছিল।আরিশ ওয়াস রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একবারে আসলো। ইনায়া ততক্ষণে তার জন্য গ্রিন টি নিয়ে এসেছে। এটা আরশির নিত্যদিনের চাহিদা।

আরিশ গ্রিন টি খেয়ে ইনায়া কে নিজের কাছে ডাকলো। ইনায়াও সময় নষ্ট না করে নিজের স্বামীর কাছে চলে এলো।আরিশ ইনায়াকে নিজের বুকে টেনে নিল।তারপর দুজনেই নিয়ে কিছু যখন নীরব থাকলো। এই নীরবতা ভেঙ্গে ইনায়া বলতে শুরু করল _____

অনেক ভালোবাসি আপনাকে। জানিনা কতটা প্রকাশ করতে পেরেছি। আপনার ভালবাসার বিনিময়ে কতটা ভালোবাসা আপনাকে দিতে পেরেছি। কিন্তু এতটুকুই জানি আপনাকে অনেক ভালোবাসি আমি আরিশ।আমার স্বপ্নে আশা #অচেনা_ছায়া_তুমি

আরিশ অবাক হলো। বিয়ের পর কখনো এই মেয়েটা তাকে তুমি করে বলেনি। আজ প্রথমবার তাকে তুমি করে সম্বোধন করল।সে ইনায়ার ঘাড়ে চুমু খেতে লাগলো তারপর বলল_____

আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি বউ।আমার জীবনে, আমার স্বপ্নে আসা অচেনা ছায়া তুমি।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস