অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৬৯

🟢

আরিশ ইনায়ার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে আছে এখনো। দু'জনের চোখ বন্ধ। এভাবে কিছুক্ষণ থেকেই আরিশ বলল____

ইনু তোমার কাছে আসলেই আমি পাগল হয়ে যাই।

ইনায়া দুষ্টুমি করে বলল___

এইতো উগান্ডা যাচ্ছি আপনাকে উগান্ডা মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসব চিন্তা করবেন না।

আরিশ শব্দ করে হেসে উঠলো।ইনায়াও শব্দ করে হেসে উঠলো।আরিশ ইনায়ার কপালের সামনে পড়ে থাকা ছোট চুল গুলো খুব যত্ন সহকারে কানের পিছনে গুঁজে দিলো। তারপর ইনায়ার কপাল গভীর চুম্বন দিয়ে ইনায়ার চোখে চোখ রেখে বলল____

আমি জানি ইনু তোমার ভালবাসাতে অনেক ভয় । কাউকে বিশ্বাস করাতে অনেক ভয়, আমি জানি তুমি রাগী না, কখনোই নিজের জন্য প্রতিবাদ করো না। কিন্তু তার মানে এই না যে তুমি দুর্বল,শুধু এর মানে এটাই যে তোমার মন অনেক বেশি ভালো। তার জন্যই তুমি কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলতে চাও না। কিন্তু এতেই সকলে তোমাকে দুর্বল ভাবে এবং তোমাকে বেশি বেশি আঘাত করে। হ্যাঁ আমি জীবিত থাকতে কেউই তোমাকে আঘাত করতে পারবে না। কিন্তু আমি চাই তুমি সব সময় নিজের জন্য নিজেই প্রতিবাদ করো। যেমন সেদিন ফুফুদের প্রতিবাদ করলে। এরকম সাহসী থেকো। কাউকেই নিজেকে আঘাত করতে দিও না।আমি আজীবন তোমার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াবো ঠিকই কিন্তু পেছন থেকে আমাকে ভরসা দেয়ার জন্য তোমার খুব প্রয়োজন। আমার মত এই শক্তপোক্ত মানুষও তোমার সামনে নরম হয়ে যায় কেবল তোমার ভালোবাসার জন্য। ভীষণ ভালোবাসি আমি তোমাকে ইনু আমি কখনো বলে বোঝাতে পারবো না। আমি দিন গুনছিলাম তোমাকে দেখার আশায়, কেবল তোমার কন্ঠ শোনার আশায়, কেবল তোমাকে নিজের করবো এই আশায়। আমার নামাজের প্রত্যেকটি মোনাজাতে তুমি ছিলে। এবং এখন আমার ভাগ্যেও তুমি আছো আমার সাথেও তুমি আছো। তুমি আমার জীবনে না আসার আগ পর্যন্ত কেবল তোমার শূন্যতাই ছিল। মানুষ বলে শূন্য ঘর নাকি কখনোই পূর্ণ হয় না। কিন্তু তুমি এসে সেই শূন্যতার স্থান নিয়ে নিলে এবং শূন্যস্থান পূরণ করে দিলে। তোমার অতীতের যন্ত্রণা কতটা ভুলিয়ে দিতে পেরেছি তা আমার জানা নেই। কিন্তু হ্যাঁ কখনোই তোমাকে আর কোন যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে হবে না এতোটুকু কথা দিতে পারব।

ইনায়া শীতল দৃষ্টিতে আরিশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ জলে ছল ছল করছে। মেয়েটার অল্প কিছুতেই চোখে পানি এসে পড়ে। হয়তো অতীতে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে এবং তখন তাকে সামলানোর মত কেউ ছিল না বলে এখন কেউ সামলাতেই তার চোখ দিয়ে পানি বের হয়। চোখের পানি আর চোখে ধরে রাখতে পারল না গাল গড়িয়ে পড়লো। আরিশ তা দেখে ইনায়ার মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ল এবং বিনা দ্বিধায় ইনায়ার চোখের পানি মুখ দিয়ে শুষে নিল।ইনায়া বুঝে পায় না লোকটা কি তার চোখের পানি পান করতে ভালোবাসে নাকি। তাকে কাঁদতে দেখলেই তার চোখের লবণাক্ত জল মুখ দিয়ে চুষে ফেলে। যেন তার চোখের পানির উপরও কেবল আরিশের অধিকার আছে।

ইনায়া আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল____

ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য। ধন্যবাদ আমাকে এত এত ভালোবাসা দেওয়ার জন্য। ধন্যবাদ আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখানোর জন্য। ধন্যবাদ আমার জীবন থেকে সকল অন্ধকার সরিয়ে দেওয়ার জন্য। আপনার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থেকে যাব।

আরিশ স্মিত হেসে বলল___

তোমাকে ভালোবেসেছি কোনো ঋণ দান করিনি যে তুমি আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। আগেও বলেছি এখনও বলছি তোমাকে ভালোবাসাও আমার জন্য ফরজ।

ইনায়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আরিশের দিকে। আরিশ তা লক্ষ্য করে মুচকি হেসে বলল___

এভাবে তাকিও না ইনু কেমন কেমন জানি লাগে।

ইনায়া ভ্রু জোড়া কুচকে জিজ্ঞেস করল____

কেমন লাগে?

আরিশ সবগুলো দাঁত বের করে একটি হাসি দিয়ে বলল_____

এসব কথা বলতে নেই বুঝে নিতে হয়।

ইনায়া শব্দ করে হেসে উঠল।আরিশ মাঝে মাঝে যা করে এতে তার মনে হয় দুই পাগলেরই একসাথে বিয়ে হয়েছে। ও যেমন পাগল ঠিক তার স্বামী ও তার মতোই পাগল।

আরিশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল___

এখন নামো তো ইনু আমি শাওয়ার নিতে যাব।

ইনায়া কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল___

কত বার শাওয়ার নেন? সকালেই না নিলেন?

আরিশ দুষ্টু হেসে বলল____

তোমাকে দেখলেই মন গরম হয়ে যায় তাই শাওয়ার না নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ইনায়া লজ্জায় আরিশের বুকে কিল বসালো। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল___

আপনার লজ্জা শরম বলতে আসলেই কিছু নেই। সারাক্ষণ খালি উল্টাপাল্টা কথা। যত্তসব।

কথাটি বলেই ইনায়া আরিশের কোল থেকে নেমে পরলো।আরিশ ইনায়ার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে বলল___

আজিব তো আমি নির্লজ্জের মত এমন কি কথা বললাম? যা সত্যি তাই তো বলেছি। আসলেই তোমাকে দেখে আমার কেবল তোমাকে আদর করতে ইচ্ছে করে। তাই নিজের মনকে বোঝানোর জন্য শাওয়ার নিতে হয় যাতে মাথা থেকে তুমি কিছুক্ষণের জন্য দূরে থাক। এই এক মিনিট,,, তুমি কি ভেবেছো? হুঁ?

ইনায়া শুকনো ঢোঁক গিলে বলল___

আমি আমি আর কি ভাববো?

তারপর কথা কাটানোর জন্য বলল ___

এ সরুন তো বেশি কথা না বলে গিয়ে শাওয়ার নেন। আমি বাড়ি থেকে ঘুরে আসছি।

কথাগুলো বলেই ইনায়া রুম থেকে বের হয়ে এলো।আর আরিশ আর যাওয়ার পানি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জামা কাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল।

____________

ইনায়া ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলো। উদ্দেশ্য এখন তার নিজের বাড়ি যাবে। কিন্তু নিচতলায় এসেই মেন গেটের সামনে দেখল তার ফুফু এবং চাচা দাঁড়িয়ে কথা বলছে।ইনায়ার এখন তাদের একদম সহ্য হয়না। আগে ওদের খুব সহ্য হতো এমনটা নয় কিন্তু তার স্বামীর সম্পর্কে যখন তারা কান ভরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল এরপর থেকে আর তাদেরকে সে সহ্য করতেই পারে না। তাই চুপচাপ তাদের সামনে দিয়ে চলে গেল। ইমন খান কিছু বলতে গিয়েও আর বললেন না। কিছুটা সামনে গিয়ে ইনায়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো তার চাচাতো বোন রূকসানা।সে টিটকারি মেরে বলল____

তোর স্বামী তো এত টাকা পয়সা।তো দিনশেষে হানিমুনে কিনা উগান্ডা যাচ্ছিস? তো খারাপ দিন এসে পড়লো তোদের?

কথাগুলো বলেই হাসতে লাগলো। ইনায়ার কথাগুলো গায়ে লাগলো না বরং সে শান্ত কন্ঠে জবাব দিল___

হানিমুন জিনিসটা তোমরা কখনো বুঝতে পেরেছো?নাকি উপভোগ করেছ বলতো আপু? বিয়ের পর তো শুধু স্বামীর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি আর বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি এই তোমাদের যাতায়াত। আর এর উর্ধ্বে গেলে শুধু আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি তোমরা ঘুরতে গিয়েছো। আর বাইরে ঘুরতে যাওয়া মানে সেটা পিকনিকে অন্যদের সাথে যাওয়া। থেকে বেশি তো তোমাদের স্বামীদের মুরোদ হয়নি। তো আমার স্বামী অন্তত বিমান দিয়ে আকাশে উড়িয়ে উগান্ডা তো নিয়ে যেতে পারবে।

রুকসানাল মুখ চুপসে গেল।ইনায়া আর সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে ছোট গেট দিয়ে তার বাড়ি চলে এলো। তার নিজেরও কাউকে ছোট করে কথা বলতে ভালো লাগে না। কিন্তু তার স্বামীকে ছোট করবে তাকে আর যাই হোক সে ছেড়ে দেবে না। যে যেমন তার সাথে তেমনি আচরণ করতে হবে। অনেক ছাড় দিয়েছে নিজেকে কষ্ট দিয়েছে এখন আর দিবেনা। কারণ সে নিজেই সম্পূর্ণরূপে আরিশের। তাই এখন তাকে কষ্ট দেওয়া মানে আরিশ কে কষ্ট দেওয়া।

ইনায়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরের দরজা লাগানো ছিল না। ঘরে ঢুকে দেখল তার মা বিছানার উপর বসে আছে।সে গিয়ে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরল। শারমিন কেউ তাকে জড়িয়ে ধরেছে এটা বুঝতে পেরেই স্পর্শ অনুভব করে বুঝতে পারলেন যে এটা তার মেয়ে। তিনিও নিজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর কপালে চুমু খেয়ে বললেন___

ভালো সময়ের মুখ দেখতে হলে সব সময় খারাপ সময় পার করতে হয়। তুই নিজেই দেখ কত কত খারাপ দিন তুই পার করেছিলি। হয়তো তোর ভালো করতে গিয়ে অনেক সময় তোর খারাপ করে ফেলেছিলাম। তুই যত নিজের কষ্ট আড়াল করতি হাসির মাঝে তার পরেও বুঝতে পারতাম যে তুই কতটা কষ্টে বেঁচে ছিলি। কিন্তু এখন তোর মুখের হাসি দেখে বোঝা যাচ্ছে তুই সত্যি কারের অর্থে খুশি আছিস। তোর খুশিতে যেন কারো নজর না পড়ে।

বিজ্ঞাপন

ইনায়া নীরব হয়ে শুনল মায়ের কথা। শারমিন মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে মেয়েকে নিজের পাশে বসালেন। মা মেয়ে মিলে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলেন।

_______________

আরিশ আর ইনায়া সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। সাদমান এবং ইরিন তাদেরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিয়ে আসবে। সাদমান এবং ইরিন সামনের সিটে বসলো আরিশ এবং ইনায়া পিছনের সিটে বসলো।আরিশ সাদমানের উদ্দেশ্যে বলল____

অনেক তো সিঙ্গেল থেকে জীবনের মজা নিয়েছিস এখন বিয়ে করে নে।

আরিশের এমন কথা শুনে ইরিন লজ্জায় শেষ। ভাই হয়ে কি করে এমন কথা বলছে তা জানা নেই ইরিনের।ইনায়া মিটি মিটি হাসছে। সাদমান গাড়ি চালাতে চালাতে জবাব দিল___ তোর আগে দুজন থেকে তিনজন হো। তারপর আমি একজন থেকে দুজন হবো।

এইবার ইরিন শব্দ করে হেসে উঠলো।আর ইনায়ার লজ্জায় জান যায় যায় অবস্থা।আরিশ একদিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল___

আমার বউই একা ১০০ জন বাচ্চার সমান। ওকে আগে সামলে নেই তারপর ভবিষ্যতের কথা ভাববো।

আরিশের কথাটি শুনে গাড়িতে হাসি রোল পড়ে গেল।ইনায়া কটমট দৃষ্টিতে আরিশের দিকে তাকালো। আরিশ সেই দৃষ্টি লক্ষ্য করে শুকনো ঢোঁক গিলল। এবং মনে মনে বলল___

আরিশে রে বেশি কথা বলিস না নয়তো উগান্ডা গিয়ে হানিমুন করার স্বপ্ন তোর স্বপ্নই থেকে যাবে।

তারপর ইনায়া কে জড়িয়ে ধরে নিজের কাছে এনে বলল__

আরে বউ আমি তো মজা করছিলাম।

ইনায়া আরিসের বুকে খিল মারলো। তাদের

এমন মিষ্টি প্রেম দেখে গাড়ির সামনের সিটে বসা দুইজনের মনেও অনুভূতির দোলা দিয়ে গেল।

এয়ারপোর্টের সামনে এসে গাড়ি থামল। এক এক করে সবাই গাড়ি থেকে নামলো। ইনায়া ইরিনকে জড়িয়ে ধরে তার কাছ থেকে বিদায় নিলো।আরিশও সাদমান এবং নিজের বোনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইনায়া কে ধরে এয়ারপোর্টের ভেতরে চলে গেল। আধ ঘন্টা পরই তাদের ফ্লাইট।

________________

ইনায়া আরিশের হাত শক্ত করে খামচে ধরে বিমানে উঠলো। এই প্রথমবার সে বিমানে উঠেছে তার অদ্ভুত লাগছে।আরিশ ইনায়ার অস্বস্তি বুঝতে পেরে তাকে খুব যত্ন সহকারে সিটে নিয়ে বসালো।ইনায়া কে জানলার পাশে বসালো। এবং সে ইনায়ার পাশে বসল।ইনায়া কে কমল কন্ঠে জিজ্ঞেস

করল ___

ইনু ভয় করছে?

ইনায়া মাথা উপর নিচে নাড়ালো। আরিশ ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে তাকে আশ্বস্ত দিয়ে বলল___

ভয় পাবার কিছুই নেই আমি আছি তো তাই না।

ইনায়া আবার মাথা নাড়ল।আরিশ মুচকি হেসে নিজের হাত ইনায়ার কাধের উপর রেখে ইনায়ার মাথা নিজের বুকে রাখলো।ইনায়া ও ঘাপটি মেরে আরিশের বুকে শুয়ে রইলো।

বিমান আকাশে উড়তে শুরু করল। প্রথম প্রথম ইনার খুব ভয় লাগলো। সে আরিশের পরনের শার্ট খামছে ধরে রাখল।আরিশ ইনায়া কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।যাতে ইনায়ার ভয় কিছুটা কমে যায়। এবং বার বার ইনায়ার কানে আস্বস্ত বাণী দিতে লাগলো।যাতে ইনায়া কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এরকম ভাবেই ঘন্টাখানেক কেটে গেল। এর মাঝেই ইনায়া অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেল তার ভয় অনেকটা কমে গেল। সে আস্তে আস্তে আরিশের থেকে মাথা তুলে জানলা দিয়ে বাহিরে তাকালো। জানলার গ্লাসে হাত রেখে রাতের সুন্দর আকাশ দেখতে লাগলো। মনে হচ্ছে যে সে যেন আকাশে উড়ছে। তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। এবং তার হাসি দেখে আরিশের মুখ প্রসারিত হলো।

__________

দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টা জার্নি করে তারা পৌঁছাল উগান্ডা। এন্টেবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে এলো দুজন।

সময় দুপুর ১ টা। চারিদিকে রোদের তাপে তাকানো মুসকিল।ইনায়া আরিশের হাত জরিয়ে ধরে চারদিক দেখতে পারলো। আর আরিশ নিজের ইনু কে দেখতে লাগলো।

আরিশ ক্যাব বুক করল। গাড়িতে উঠে ইনায়া আরিশের কাঁধে মাথা রাখলো। এখন প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। বিমানে জেগে ছিল এবং বাহিরে দৃশ্য দেখেছিল। তার ওপর পুরো রাস্তা হিজাব পরার কারণে তার মাথাও ভীষণ ব্যথা করছে। আগে হোটেলে গিয়ে সে ঘুমাবে।

কাম্পালা সেরেনা হোটেল এর সামনে ক্যাব থামলো।আরিশ ইনায়া কে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল।ইনায়া ঘুমে চোখ খুলে তাকাতে পারছে না। তাদের এই হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর ২ টা বেজে গেল। আরিশ পেমেন্ট করে ইনায়া কে নিয়ে হোটেলের ভেতর চলে গেল। আগে থেকেই রুম বুক করা ছিল। ফর্মালিটিজ কমপ্লিট করে চাবি নিয়ে নিজেদের রুমে উদ্দেশ্যে চলে গেল। এর ভেতর দুজনের মাঝে কোন কথা হলো না। কারণ ইনায়ার ঘুম পাচ্ছিল এবং সে নিজের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তাই সেই চোখ খুলে রাখাতে ব্যস্ত ছিল। আর আরিশ তার কর্মকাণ্ড দেখে মিটিমিটি করে হাসতে ব্যস্ত ছিল। তাদের ফ্ল্যাটে সামনে এসে আরিশ চাবি দিয়ে রুমের দরজা খুলে ইনায়া কে আগে ভেতরে প্রবেশ করতে দিল।সে ভেবেছিল হয়তো হোটেল দেখে ইনায়া কিছু বলবে। কিন্তু ইনায়া কিছু না বলেই বিছানায় শুয়ে পরল।আরিশ তা দেখে শব্দ করে হেসে উঠলো।সেও ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করে দরজা লক করে দিল। লাগেজ পরে চলে আসবে। প্লেনে খাবার খাওয়া হয়েছিল বলে এখন আর তাদের ক্ষুধা নেই। সে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো।এসে দেখলো ইনায়া এইভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছে। পায়ে জুতা আছে এখনো। মাথার হিজাবও খুলেনি।সে ঠোঁট কামড়ে হেসে ইনায়ার দিকে গেল।আরিশ ইনায়ার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে খুব যত্ন সহকারে ইনায়ার পা থেকে জুতা খুলে ফেলল। তারপর ইনায়াকে খুব যত্ন সহকারে পাজা কোলে তুলে নিল যাতে তার ঘুম না ভাঙে। আর ইনায়ার ঘুম তেমন পাতলা না যে অল্পতেই ঘুম ভেঙে যাবে। আরিশ ইনায়াকে নিয়ে বিছানার উপর বসে ইনায়ার মাথা নিজের বুকের উপর রেখে খুব যত্ন সহকারে হিজাবের পিনগুলো খুলতে লাগলো। তারপর আস্তে আস্তে মাথায় হিজাব খুলে ফেলল। ইনায়ার পরনের বোরকা চেইন সিস্টেমের তাই আলগস্তে ইনায়ার পরনের বোরকা খুলে ফেলল। তারপর খুব যত্ন সহকারে ইনায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কিছুক্ষণ ইনার ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে চেয়ে রইল। তারপর ইনায়ার মুখের উপর ঝুঁকে তার কপালে গভীর চুমু এঁকে সে নিজেও শুয়ে পড়ল। যতক্ষণ বিমানে ছিল ততক্ষণ সে কেবল ইনায়া উৎফুল্ল মুখশ্রী দেখতে ব্যস্ত ছিল। সাধারণত সে বিমানে ঘুমায় যেহেতু ১৫ ঘণ্টার জার্নি ছিল। কিন্তু এইবার আর ঘুমোনো হয়নি। এখন তারও ঘুম পাচ্ছে। ইনায়া কে জড়িয়ে ধরে সেও ঘুমিয়ে পরলো।

বিমান থেকে নেমে আগে আরিশ বাড়িতে কল দিয়ে নিজের এবং ইনায়ার মাকে জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা পৌছে গেছে।

____________

সন্ধ্যা সাতটার দিকে আরিশের ঘুম ভেঙে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখলো ইনায়া নেই। সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলো। চারদিকে তাকিয়ে ইনায়াকে খুঁজতে ব্যস্ত তার চোখ। এমন সময় ওয়াশরুম থেকে পানি শব্দ কানে আসতেই সে বুঝতে পারল ইনায়া ওয়াশ রুমে। পরক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। ইনায়া শাওয়ার নিয়ে বের হলো। মাথার চুল পেঁচানো টাওয়াল দিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই নিজেকে সব সময়ের মতো আরিশের বাহুডোরে পেয়েছে। মাথায় হিজাব এবং পরনের বোরখা দেখতে না পেরে বুঝতে পেরেছে আরিশের কাজ এইগুলো।মাথা তার ভার হয়ে ছিল।তাই শাওয়ার নেওয়া বেটার মনে করে আগেই শাওয়ার নিল।

চুল মুছতে মুছতে বারান্দায় চলে গেল। বিছানায় বসে যে কেউ তাকে এক নজরে দেখে যাচ্ছে এটা যেন সে খেয়ালই করল না। সে তো ভাবছে আরিশ এখনো ঘুমাচ্ছে। সে বারান্দায় গিয়ে রাতের আকাশ দেখতে ব্যস্ত হয়ে গেল।আরিশ বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল তারপর ফ্রেশ হয়ে বের হল। ইনায়া তখনও বারান্দায়।আরিশ নিঃশব্দে বারান্দায় চলে গেল এবং ইনাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।ইনায়া কেঁপে উঠলো এবং পরক্ষণেই নিজেকে মনে মনে গালি দিতে লাগলো। বলল____

উফ্ ইনু তোর তো এতদিনে অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা। এই লোক তো শুরু থেকেই তোকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। তারপর তুই কেন এত ভয় পাস।

কিন্তু মুখ দিয়ে কোন কথা বলল না সে।

আরিশ ইনায়ার ভেজা চুলে মুখ ডুবিয়ে দিল। ঘ্রাণ শুঁকে নিল সে। তার এহেন কান্ডে ইনারা কেঁপে উঠলো।

আরিশ যেন উম্মাত হয়ে উঠলো ইনায়ার মাঝে হারিয়ে যাওয়ার জন্য। ঘাড়ে ছোট ছোট চুমু খেতে লাগলো।ইনায়ার হাত থেকে টাওয়াল মেঝেতে পড়ে গেল। ইনায়া নিজের গায়ের ভর আরিশের বুকের উপর ছেড়ে দিল। আরিশ ইনায়ার কানে ফিসফিস করে বলল ____

অনুমতি চাই তোমার মাঝে হারিয়ে যাওয়ার জন্য। অনুমতি চাই তোমাকে মন ভরে ভালবাসার জন্য। আমাকে কি অনুমতি দেওয়া যাবে? তোমার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত।

ইনায়া মুখ ফুটে কিছু বলল না কেবল চোখ বন্ধ করে রইল।

আরিশ এঅই নীরবতা কেই সম্মতি মনে করে ইনায়াকে পাজা কোলে তুলে নিল এবং বারান্দা থেকে রুমের ভেতর চলে এলো। তারপর খুব যত্ন সহকারে বিছানার উপর শুয়ে দিল।

ইনায়ার এখনো চোখ বন্ধ। ভয় লজ্জা একসাথে দুটোই কাজ করছে।আরিশ সময় নষ্ট না করে নিজের পরনের শার্ট খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। তারপর বিছানার শুয়ে থাকা ইনায়ার কাছে চলে গেল। তার মুখের নিঃশ্বাস ইনায়ার মুখের উপর পড়ছে।ইনায়া ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগলো।আরিশ কিছু না বলে হঠাৎ নিচে ঝুঁকে এলো এবং ইনায়ার বাম হাতের সেই কাঁটা দাগে মন ভরে চুম খেতে লাগলো।ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল। তার চোখে বিস্ময়।আরিশ ইনায়ার হাতে চুমু খেতে খেতে বলল___

নিজের অতীত নিয়ে কখনো আফসোস করবে না। যেটা অতীত সেটা কেবল অতীত। তুমি অতীতে যেই জ্বালা যন্ত্রণা পেয়েছো তা হয়তো কখনোই মুছে দিতে পারব না। কিন্তু যত যাই হোক বর্তমান এবং ভবিষ্যতে সেই জ্বালা যন্ত্রণার কথা মনেও করতে দেব না। তোমাকে ভালোবাসি মানে তোমার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবটাকেই ভালোবাসি। যতবার নিঃশ্বাস ত্যাগ এবং নিঃশ্বাস নেই ততবার তোমাকে ভালোবাসি। যতবার চোখ পলক ফেলে ততবার তোমাকে ভালোবাসি। যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন তোমাকে ভালোবাসবো। মরে গেলেও কেবল তোমার হয়ে থাকবো।

ইনায়ার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো।আরিশ ইনায়ার হাতে আরো কয়েকটা চুমু খেয়ে ইনায়ার মুখের দিকে তাকালো। চোখ দিয়ে পানি ঘুরিয়ে পড়তে দেখে ইনায়ার মুখের কাছে চলে গেল। সময়য়ের মতো এবারও ইনায়ার চোখের পানি নিজের ঠোঁট দিয়ে শুষে নিল। এবং কমল কন্ঠে বলল___

আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি ইনু।

বলেই ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিল। আস্তে আস্তে তার স্পর্শ গভীর হতে লাগলো। ইনায়ার এই উম্মাত আরিশ কে সামলাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তারপরও সে সামলিয়ে নিল‌।আরিশের সাথে সাথে সেও তাল মিলাতে লাগলো। চোখ দিয়ে তার সুখের অশ্রু গড়িয়ে।রাতটা হয়ে ভালোবাসাময়। দুজন মানুষের পাশাপাশি দুই আত্মার মধ্যেও মিলন ঘটলো।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস