অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৭০

🟢

সাদা কমফোর্টের নিচে ঘুমে আচ্ছন্ন আছে এক দম্পতি।মুখে স্পষ্ট ফুটে আছে সুখের ছায়া। সূর্যের আলো এসে চোখে মুখে পরলো আরিশের। বিরক্তে কপাল কুঁচকালো সে। যেন সে বলছে সে এখন উঠতে চায় না আরো ঘুমাতে চায়।সে নড়ে চড়ে উঠলো। তার নড়াচড়াতে ইনায়ার ঘুম ভেঙে গেল। এমনিতেই মুখের উপর চুল এসে তাকে বিরক্ত করছিল তখনই ঘুম হালকা হয়ে গিয়েছিল।এখন আরিশের নড়াচড়ায় তার ঘুমের রেশ কেটে গেল। পিটপিট করে তাকালো সে। বুকের উপর ভারি কিছু অনুভব করতেই উপলব্ধি করল আজকের দিনটা অন্যান্য দিনের থেকে ভিন্ন। সবসময় তার ঘুম ভাঙে আরিশের বাহুডোরে। কিন্তু আজ তার ঘুম ভাঙলো আরশি কে নিজের বাহুডোরে নিয়ে। কিন্তু রোজকারের মত আরিশ কে তার কাছেই পেল।গতরাতের কথা মনে পড়তেই লজ্জা এসে ভর করলো তার মুখশ্রীতে।কি পাগলামি টাই না করেছিল আরিশ। আবার হঠাৎ হঠাৎ অন্তরঙ্গ মুহূর্তে থেমে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল___

"ইনু কষ্ট হচ্ছে? কষ্ট হলে বলো জান। আমি চাইনা তোমার কোন কষ্ট হোক।"

ইনায়া তো লজ্জায় কিছু বলতেও পারছিল না। তার কষ্ট হয়েছিল কিন্তু আরিশের এতোটুকু কষ্ট তো সে সহ্য করতেই পারে।

ইনায়া রাতের চিন্তাম মগ্ন ছিল তখনি আরিশের ঘুম সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেল। সে ইনায়ার বুক থেকে মাথা তুলে ইনায়ার মুখের দিকে তাকালো।ইনায়ার লজ্জায় রঙিন মুখশ্রী দেখে তার আবার নেশা ধরে গেল যাকে বলে শুভ প্রাতঃকালের প্রেম।সে ইনায়ার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। হঠাৎ ইনায়ার চিন্তায় ছেদ ঘটলো কারোর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অনুভব করতে পেরে।সে সামনাসামনি তাকাতেই আরিশের চোখে চোখ পড়ে গেল‌। সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় সে নিজের চোখ বন্ধ করে নিল।আরিশের চোখের ভাষা পড়তে সক্ষম সে।তাই এখন আরিশের দৃষ্টি কি বলছে তা তার বুঝতে অসুবিধা হলো না। এবং এই নিরব ভাষা পড়ার পর এই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা তার জন্য অসম্ভব।আরিশ ইনায়া কে চোখ বন্ধ করে থাকতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তারপর ইনায়ার মুখের কাছে গিয়ে ফুঁ দিয়ে ইনায়ার মুখের উপর থেকে চুল গুলো উড়িয়ে দিল।সব চুল না গেলেও কিছু চুল ইনায়ার মুখের উপর থেকে সরে গেল। এবং অবশিষ্ট চুল গুলো সে খুব যত্ন সহকারে নিজের হাতের আঙুল দিয়ে স্লাইড করে কানের পেছনে গুঁজে দিল।ইনায়া আরিশের এমন নরম স্পর্শে কেঁপে উঠলো।চোখ খিচে বন্ধ করে নিল।আরিশ তা বাঁকা হাসলো তারপর ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল _____

সারারাত আদর করেও কি লজ্জা কাটাতে পারিনি ইনু?আমি কী তাহলে ব্যর্থ হলাম? তুমি বললে আবার রিপিট করতে পারি। আমার কিন্তু কোন সমস্যা নেই।

ইনায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। কোনো রকম নিজেকে সামলিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল _____

আপনি আপনি দূ,,, দূরে যান তো।আমি উঠ,,উঠবো।

আরিশ নিঃশব্দে হাসলো। কিছু না বলে ইনায়ার কপালে ভালোবাসার পরশ দিয়ে ইনায়ার পাশেই শুয়ে পরলো।আরিশ ইনায়ার উপর থেকে সরেছে বুঝতে পেরেই ইনায়া চোখ খুলল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে বসলো।পুরো শরীরে ব্যাথা অনুভব করছে সে।চোখ বুজে ঠোঁট কামড়ে ব্যাথা সহ্য করে নিল সে। পরনে তার কেবল আরিশের শার্ট যা হাঁটু সমান হবে।গত রাতে আরিশ নিজেই তাকে পরিয়ে দিয়েছিল।আরিশ শুয়ে ইনায়া কি করছে এবং করবে তা দেখছে। মুখে তার তৃপ্তির হাসি।ইনায়া আস্তে বিছানা থেকে নামার জন্য পা বাড়ালো কিন্তু হঠাৎ তলপেটে ব্যথা অনুভব করল।সে গোঙিয়ে উঠলো।আরিশ আর অপেক্ষা না করে শোয়া থেকে উঠে বসলো এবং ইনায়ার কাছে গিয়ে নরম সুরে বলল___

খামোখা জেদ কেন করছো ইনু? তোমার আরিশ আছে তো নাকি।পেট বেশি ব্যাথা করছে কি? আচ্ছা আগে শাওয়ার নিয়ে নেও তারপর আমি মালিশ করে দিব।

কথাগুলো বলেই আরিশ ইনায়া কে পাজা কোলে তুলে নিল।ইনায়া বরাবরের মতো এবারও আরিশের কাঁধ খামচে ধরলো শক্ত করে।আরিশ ইনায়া কে নিয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেল। তারপর খুব সাবধানতা অবলম্বন করে বাথটাবে শুইয়ে দিল।ইনায়া আমতা আমতা করে বলল ____

আপনি যেতে পারেন এখন।

আরিশ কপাল কুঁচকে বলল___

গত রাতের পরেও এত লজ্জা?

ইনায়ার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।আরিশ তা দেখে শব্দ করে হেসে উঠলো।

ইনায়া কে কোলে করেই বাথরুম থেকে নিয়ে এলো আরিশ।এখন দুজনের পরনেই সাদা রঙের বাথরোব।আরিশ ইনায়াকে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে টাওয়াল দিয়ে তার চুল মুছে দিতে লাগলো।ইনায়া কেবল বসে বসে স্বামীর সেবা গ্রহণ করল।

আরিশ ইনায়ার চুল শুকিয়ে দিয়ে বলল___

এইটা পরেই বসে থাকো একদম নড়বে না। রাতেও কিছু খাওয়া হয়নি কেবল আমার ভালবাসা এবং আদর ছাড়া।আমি কল করে খাবার অর্ডার করছি। এই পোশাকে এখানে বসে থাকবে। আমি এসে মালিশ করে দিব। এবং হে খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে আগে পেইন কিলার দিব সেগুলো খেয়ে নিবে। এবং ভুলেও এ কথা বলার চেষ্টা করবে না যে তুমি পেইন কিলার খাওনা।

ইনায়াও আরশের কথার প্রেক্ষিতে কিছু বলল না। কেবল লক্ষী মেয়ের ন্যায় মাথা নাড়ল।আরিশ মুচকি হাসলো। তারপর সে টাওয়াল বারান্দায় নেড়ে রুমে এসে টেলিফোন দিয়ে খাবার দেওয়ার জন্য অর্ডার করলো। তারপর লাগেজ থেকে ওয়েল এবং কিছু পেইন কিলার বের করল। তারপর সেগুলো টেবিলের উপর রেখে ইনায়া কে বলল____

বিজ্ঞাপন

ইনু বিছানায় সোঐজা হয়ে শুইয়ে পরো। এবং হ্যাঁ আর কোনো কথা না।

ইনায়াও আর কোনো কথা বলল না। আসলেই তার পেট ব্যাথা করছে।সেও সোজা হয়ে শুয়ে পরলো।আরিশ তার পাশে বসে বাথরোবের ভেতর দিয়ে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে তেল মালিশ করতে লাগলো।ইনায়ার যেমন লজ্জা করছে ঠিক তেমনি কিছুটা আরাম পাচ্ছে।

দুজন মিলে খাবার খেয়ে নিল। তারপর আরিশ ইনায়াকে পেইন কিলার দিল ইনায়াও তা খেয়ে নিল। তারপর আরিশ বলল___

এখন রেস্ট নাও যদি শরীর ভালো লাগে তাহলে মার্চিসন ফলস ন্যাশনাল পার্কে যাব।

ইনায়া খাটের হার্ড বোর্ডে নিজের পিঠ হেলান দিয়ে বসে ছিল। ঘুরতে যাওয়া কথা শুনেই লাফিয়ে উঠলো। তারপর উৎফুল্ল হয়ে বলতে শুরু করল _____

আমি একদম সুস্থ চলুন এক্ষুনি যাই। জানেনই তো উগান্ডা ঘুরার স্বপ্ন ছিল আমার।

আরিশ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে তারপর হেসে দিলো এবং হাসতে হাসতে বলল ___

হ্যাঁ মেম জানি। কিন্তু এখন না আরেকটু রেস্ট নাও তারপর যাই?

ইনায়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

_______________

বাড়িল সব বড়রা মিলে মিটিংএ বসেছে।যা সবসময়ের মতই রেশমা খানের বাড়ি। ইমন খান নিজের বড় ভাই ইমরান খান কে বলল___

তাহলে সত্যি বলছিস তো যে তোর কোন লোভ নেই এই সম্পত্তির প্রতি? পরে দেখা যাবে আমাদের নামে মামলা করবি এবং বলবি যে আমরা তোকে তোর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছি।

ইমরান খান স্মিত হেসে বলল___

আরে না আমার যথেষ্ট আছে। আমার এই সম্পত্তির প্রতি কোন লোভ নেই। এগুলো তোরা নিজেদের মতো নিয়ে নে।

ইমন খান এবং রেশমা খান নিশ্চিত হলেন।তারা তো ভেবেছিলেন ইমরান খান এই সম্পত্তিতে নিজের ভাব চাইবেন তাহলে তো তাদের সম্পত্তি পরবর্তীতে কম পরবে। কিন্তু এখন যেহেতু ইমরান খান বলেছেন তিনি এই সম্পর্কে চান না তাই এখন আর এ দুই ভাই বোনের কোন সমস্যা নেই। তাদের নিজেদের সম্পত্তি বেশি পেলেই হবে।

___________

মার্চিসন ফলস ন্যাশনাল পার্ক (Murchison Falls National Park) উগান্ডার একটি বিখ্যাত সাফারি গন্তব্য, যেখানে নীল নদের বুকে বিশ্বের শক্তিশালী জলপ্রপাতটি দেখা যায়, যা সংকীর্ণ গিরিখাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এখানে গেম ড্রাইভ, বাঘের খেলা, নৌকা ভ্রমণ (নাইল নদীতে), পাখি দেখা ও প্রকৃতি ভ্রমণ করার সুযোগ আছে, যেখানে হাতি, সিংহ, জিরাফ, জলহস্তী ও কুমিরের দেখা মেলে। কাম্পালা থেকে যেতে হলে দক্ষিণ বা উত্তর গেট ব্যবহার করা যায় এবং এটি উগান্ডার প্রাচীনতম ও বৃহত্তম সংরক্ষণাগার। সেখানেই আরিশ আর ইনায়া আজ ঘুরতে এসেছে।আরিশ তখন ইনায়াকে বলেছিল যে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে তারপর আসবে কিন্তু সে কিছুক্ষণ বলে ঘন্টাখানেক দেরি করেছে। যার ফলে ইনায়া মুখ ফুলিয়ে বসে ছিল। কিন্তু এখনই সুন্দর জায়গা দেখে তার মন ভালো হয়ে গেছে। উগান্ডা নাম টা যেমন ভিন্ন এবং কিছুটা হাস্যকর তেমনি এই খানের জায়গাগুলো অদ্ভুত সুন্দর ‌যা ইনায়া কল্পনা করতে পারেনি। হানিমুন তাও উগান্ডা আসলেই এইটা হাস্যকর। কিন্তু আরিশ তার ইচ্ছা কে প্রাধান্য দিয়েছে এটাই তার জন্য অনেক।

তারা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল এমন সময় ইনায়ার হিল ভেঙে যায়।শক করে জামার সাথে মিল রেখে সে হিল পড়েছিল। কিন্তু হিল তার সাথে বেইমানি করল। হিল ভেঙ্গে যাওয়ার কারনে সে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে যেই না পড়ে যেতে নিবে ওমনি অনেক শক্ত পোক্ত হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরল। ফলস্বরূপ সে মাটিতে পড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গেল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস