আজ ইনায়ার রেজাল্ট দিবে এইচএসসি পরীক্ষার।ভয়ে রিতিমত কাঁপছে সে।এই কয়মাসে কম খাটনি যায়নি মেয়েটির উপর। কিন্তু ভাগ্য করে একজন স্বামী পেয়েছে যে তাকে বুঝতেই দেয়নি যে তার বিয়ে হয়েছে। তার তো মাঝে মাঝে মনে হয় সে এখনো অবিবাহিত। সিঙ্গেল লাইফ ইনজয় করছে। বিবাহিত জীবনের কোনো প্যার নেই।না তার ননদ জ্বালায় আর না শাশুড়ি। আসলে যেই নারী স্বামী দিয়ে সুখ পায় সেই নারীকে দুঃখ কখনো ছুঁতে পারে না।ইনায়ার এখন সেই কপাল হয়েছে। যেখানে তার স্বামী এতটা ভালো সেখানে বাকিরা ভালো না হয়ে কি করে পারবে। ইনায়া আগে দুঃখে কান্না পেত আর এখন সুখে কান্না করে। আরিশ তো মাঝে মাঝে তার কান্না থামানোর জন্য মজা করে বলে_____
তোমার নাম ইনায়া না দিয়ে কাঁদনী দেওয়া উচিত ছিল। কোথায় কোথায় খালি কাঁদো।
কথা শুনে ইনার রাগ উঠে পড়তো এবং কান্নার কথা সে ভুলে যেত। তারপর আর কি দুজনের মাঝে দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া হয়।আর সব চেয়ে বড় কথা ইনায়াই বেশি রাগ করে।আরিশ কখনো তার উপর জোড়ে চিৎকার করে কথা বলেনি। সবসময় নরম সুরে কথা বলেছে। কারণ সে তো জানে তার ইনু কতটা সেনসেটিভ।আরিশের তো ইনায়ার পরীক্ষা শেষ না হওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকা থেকে শ্রীপুর আবার শ্রীপুর থেকে ঢাকা আসা যাওয়া করেছে।আবার লন্ডনেও তাকে যেতে হয়েছিল কয়েকবার তার সিক্রেট কাজের জন্য।যা কেবল ইনায়া, সাদমান এবং ইরিন জানে।
হ্যাঁ এখন ইরিন ও জেনে গিয়েছে যে তার ভাই এবং বাগদত্তা একজন সিক্রেট এজেন্ট। সাদমান নিজেই বলেছিল কথাটি। তাদের এখনো বিয়ে হয়নি সেপ্টেম্বর মাসে তারিখ ফিক্স করা হয়েছে।আরিশ ইনায়া এবং তাদের দুজনের এক সাথে বিয়ে হবে।আরিশদের অনুষ্ঠান হবে আর তাদের বিয়ে।আর ইরিনেরও পরীক্ষা শেষ এবং রেজাল্ট ও দিয়ে দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো গ্রেট পেয়েছে এখন সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার জন্য অপেক্ষা করছে। এখনো এপ্লাই করার ডেইট পাবলিস্ট হয়নি।
__________
ইনায়া ঘরে বসে নখ কামড়াচ্ছে আর ফোনের স্ক্রিনে টাইম চেইক করছে।সকাল ১১ টা বাজে এখনো রেজাল্ট বের হয়নি।হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই রেজাল্ট চলে আসবে।আরিশ হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরল হাত ভর্তি তার মিষ্টির প্যাকেট।আরিশের হাতে মিষ্টির প্যাকেট দেখে ইনায়ার চোখ ছানাবড়া।সে রাগী দৃষ্টিতে আরিশের দিকে তাকাতেই আরিশ নিজের সবগুলো দাঁত বের করে হাসি দিল এবং মিষ্টির প্যাকেট টেবিলের উপর রাখার পর ইনায়ার কাছে এসে বসে বলল____
এত রাগ করার কি আছে ইনু? আমি তো জানি তুমি ভালো রেজাল্ট করবে। এবং ভালো রেজাল্ট করার পর যখন সবাইকে বলব তখন সবাই মিষ্টি চাইবে। এবং সেই মুহূর্তে আমার দোকানে গিয়ে মিষ্টি কিনতে হবে তোমার সাথে টাইম স্পেন্ড করতে পারবো না। তাই আগে মিষ্টি নিয়ে চলে আসলাম।
ইনায়া কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল____
আমি আপনার মতন ব্রিলিয়ান্ট না আমি খুব ভাল রেজাল্ট করব।
আরিশ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল_____
আমার মতন এত ব্রিলিয়ান না হলেও আমার ছোঁয়া তো পেয়েছো। এখন দেখবে এমনিতেই ভালো রেজাল্ট করেছো। আর খারাপ রেজাল্ট করলেও সমস্যা নেই ।এখন আর ভয় যে খারাপ রেজাল্ট করলে তোমার রিক্সাওয়ালার সাথে বিয়ে হবে। কারণ আগেই তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে আমার সাথে। সো রিলেক্স।
ইনায়া আরিশের বুকে আলতো করে চাপড় দিয়ে বলল___
মজা নিচ্ছেন তাই তো?
আরিশ হাসতে হাসতে ইনায়া কে নিজের বুকে টেনে নিল এবং কপালে ভালোবাসার পরশ একে নরম সুরে বলল_____
আমি নিজ চোখে দেখেছি তুমি কথাটা পরিশ্রম করেছ, কতটা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছ। খাওয়া ঘুম ভুলে কেবল পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছো। মাঝে মাঝে তো ভয় পেয়েছি কি আমার আর তোমার মাঝে না এই পড়াশোনা চলে আসে এবং আমার সতীন হয়ে যায়। আমার মন বলছে তুমি খুব ভালো রেজাল্ট করবে। আর তাছাড়াও তুমি তো সব সময় ভালো আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। যদি তোমার পরিশ্রমের পরেও ফল ভালো না হয় তাহলে অবশ্যই আল্লাহ উত্তম কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছে। এতে ভেঙে পড়ার কিছুই নেই। আর আমি জানি আমার ইনু কতটা স্ট্রং। তুমি তো এর থেকেও কঠিন সিচুয়েশন একা একা সামলে এসেছো কিন্তু এখন তো আমি আছি তোমার সাথে তাহলে এত কিসের ভয়?
ইনায়া ওটা নিশ্চিন্ত হল নিজের স্বামীর কথায়। এখন তার আসলে আর ভয় করছে না। আরিশ ফোন হাতে নিয়ে দেখল ১১:৩০ টা বেজে গেছে। এতক্ষণে হয়তো রেজাল্ট চলে এসেছে। তার ইনায়ার রোল নাম্বার এবং রেজিস্ট্রেশন নাম্বার মুখস্থ।ইনায়ার প্রত্যেকটি পরীক্ষার সময় আরিশ সঙ্গে গিয়েছিল। যতক্ষণ না তার পরীক্ষা শেষ হয়েছে ততক্ষণ সে অপেক্ষা করেছে। একদম পরীক্ষা শেষে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। আর ইনায়াকে সবথেকে বেশি ভরসা তো আরিশ দিয়েছে। এবং জোর করে কাছে এত দূরের কথা ভুলেও এই কয়দিন সে ইনার কাছে আসেনি।তার একটাই কথা ছিল___
ইনু আমি তোমাকে নিয়ে কোন রিস্ক নিতে চাই না। তোমার স্বপ্ন আমার কাছে বেশি প্রাধান্য। এখন কেবল পড়াশোনায় মনোযোগ দাও। তোমাকে কিছু মানুষকে দেখিয়ে দিতে হবে যে তুমিও পারো।তুমি ফেলনা না।আর আমার জন্য তোমাকে এইটা করতেই হবে। আমি শুধু তোমাকে নিয়ে গর্ববোধ করতে চাই।
তারপর আবার চো টিপ দিয়ে ঠোঁটে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলল____
তুমি আমাকে গর্ববোধ করালে আমি তোমাকে গর্ভবতী বানিয়ে দিব কথা দিলাম।
ইনায়া তো সেই দিন বেশ লজ্জায় পড়েছিল। কিন্তু তবুও আরিশের কথায় সে অনেক মোটিভেটেড হয়েছিল। তাই তো তার পড়া আগের থেকে তিনগুণ বেড়ে গিয়েছিল। তাই তো এ কয়েকটি মাস এসে ঘুম হারাম করে পড়াশোনা করেছে।
আরিশ ইনায়ার রেজাল্ট দেখলো । ঠোঁটে তার হাসি ফুটে উঠলো। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের হাসি বজায় রেখে বলল____
আলহামদুলিল্লাহ জিপিএ ফাইভ।
ইনায়া স্তব্ধ হয়ে গেল। সে যেন নিজ কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না এইমাত্র আরিশের বলা কথাটি শুনে।তার চোখ ভিজে এলো। ঠোঁটে বিজয়ের হাসি ফুটো হলো। বিন বাক্যে সময় নষ্ট না করে আরিশের বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো। এমন কিছুর জন্য আরিশ প্রস্তুত ছিল না তাই ভর সামলাতে না পেরে ইনায়া কে নিয়ে বিছানায় পড়ে গেল।ইনায়া তার উপর শুয়ে আছে মুখ আরিশের গলায় ডুবিয়ে রেখেছে।আরিশ খুব যত্ন সহকারে ইনায়াকে জরিয়ে ধরলো।ইনায়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো এবং কান্না করতে করতে বলল____
ধন্যবাদ আমার জীবনে আসার জন্য।আমি এত স্ট্রং না যতটা দেখাই মানুষকে।বাবা মারা গিয়েছিল তখনো মন ভরে কাঁদতে পারিনি এই ভেবে যে আমি কাঁদলে আমার মা এবং ভাই ভেঙে পড়বে। সব সময় অন্যদের কথা ভেবে নিজেকে কষ্ট দিয়েছি। নিজের মনের ভিতরে কষ্ট লুকিয়ে রেখেছি। কান্না করতে না পেরে কেবল প্যানিক অ্যাটাক হতো। শ্বাস নিতে কষ্ট হতো, মাথা ব্যথার কারণ যন্ত্রণায় মাথা ফেটে যাচ্ছে এমন মনে হতো। অতীত থেকে বের হতে পারতাম না মনে হতো সে অন্ধকারে বসে আছি আমি। তারপর এক অচেনা ছায়া এলো আর সেই অচেনা ছায়া ছিলেন আপনি। ধন্যবাদ আরিশ অনেক অনেক ধন্যবাদ। অনেক ভালোবাসি আমি আপনাকে। অনেক।
বলেই আবার কেঁদে দিল।
আরিশেরও চোখ ভিজে এসেছে।তার ইনু কতটা কষ্ট করেছে তা কেবল তার ইনুই জানে।সে এই মেয়েটিকে আর কষ্ট দিতে চাই না। এই মেয়েটিকে পৃথিবীর সকল সুখ দিতে চায়।
আরিশ ইনায়ার মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে গান গেয়ে বলল_______
খোলা খুলি বলতে গেলে
পড়ে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন, ভীষণ রকম
অথৈই জলে
খোলা খুলি বলতে গেলে
পড়ে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন, ভীষণ রকম
অথৈই জলে
সাঁতার কেটেছি, ঘুমিয়ে হেঁটেছি
এতোটা ডুবেছি
তোর ই তো কারণে
তোকেই তো ভালোবাসতে গিয়ে
খোলা খুলি বলতে গেলে
পরে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন, ভীষণ রকম
অথৈই জলে।
বলেই আরিশ থামলো।ইনায়া আরিশের গলা থেকে মুখ বের করে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাইলো। তারপর গলা পরিষ্কার করে মুচকি হাসি দিয়ে গাইতে লাগলো____
কপাল গুণে
পেয়েছি তোকে সেই সব দিনে
যখন খালি বৃষ্টি ছাড়া
ছিল না উপায়
ও... এক সাথে চল
পেরিয়ে যাব জমানো জল
পথের ধারে পা ডুবিয়ে
কোথায় কোথায়
আরিশ মিষ্টি হেসে ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে আই লাভ ইউ টু বলে আবার গাইতে শুরু করল____
সাঁতার কেটেছি, ঘুমিয়ে হেঁটেছি
এতোটা ডুবেছি
তোর ই তো কারণে
তোকেই তো ভালোবাসতে গিয়ে
খোলা খুলি বলতে গেলে
পড়ে গেছি তোর কবলে
তলিয়েছে মন, ভীষণ রকম
অথৈই জলে।
______________
সানিউল আজ শ্রীপুর এসেছে।তার উদ্দেশ্য ইনায়া কে বিভ্রান্ত করা।ইনায়া তো তাকে পাগলের মত ভালবাসত। তাহলে অবশ্যই তাকে কখনো ফিরিয়ে দিবে না। তাই সে আশা নিয়ে সে এসেছে।এখন সে উপলব্ধি করতে পারছে ইনায়া তাকে কতটা ভালোবাসতো।তার এখন ইনায়া কে চাই।ইনায়া বিয়ে হয়েছে কিনা হয়নি এ বিষয়ে সে মাথা ঘামাতে চায়না। তার লক্ষ্য একটাই ইনায়া ম্যানিপুলেট করে নিজের করে নিবে।আর তার না হতে চাইলে ইনায়ার সংসারে ঝামালে পাকিয়ে তারপর এইখান থেকে যাবে।
আজ অনেক মাস হলো ইনায়ার কাছ থেকে কোনো রকম রেসপন্স পাচ্ছে না।আগে ইনায়া ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে তাকে স্টক করত। এবং সানিউল তা খুব ভালো করে বুঝতে পারত। আননোন একাউন্ট থেকে মেসেজ আসলেই সে বুঝে ফেলত এইটা ইনায়ার ফেইক আইডি। আগে তার কাছে অনেক ফেক কল যেত এবং সে অনায়াসে বুঝতে পারত এইটা ইনায়ার কাছ।আসলে ইনায়া কেবল সানিউলের কন্ঠ শোনার জন্য নিজের বান্ধবীদের দিয়ে তাদের ফোন থেকে ফেক কল দেওয়াতো।আর সানিউল তা বুঝতে পেরে পৈশাচিক আনন্দ পেত। এতে তার কাছে নিজেকে খুব বড় মনে হতো। তার কাছে ইনায়া হয়ছ গেল কেবল এক অপশন। কিন্তু ডাক্তারি পড়াশোনা করার পরে উপলব্ধি করতে পারলো এখন যারা তাকে ডাকছে সবাই তার স্ট্যাটাস দেখে তার সাথে আসছে। অথচ ইনায়া তখন থেকে তাকে ভালোবাসতো যখন থেকে তার কিছুই ছিল না। তাই তো এখানে এসেছে। আর সে জানে ইনায়া তাকে কতটা ভালোবাসে। অবশ্যই তার কথা শুনবে।