অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৭১

🟢

আরিশ আর ইনায়া আজ তিন দিন পর বাংলাদেশে ফিরে এলো।এই তিন দিন তারা যেমন ঘুরা ঘুরি করেছে তেমনি আরিশ ইনায়ার সেবাও করেছে।আজ দুপুরে তারা বাংলাদেশে এসে পরেছে।হাত ভর্তি ব্যাগ।সবার জন্যই কিছু না কিছু কিনেছে আরিশ।ইনায়া ঘরে এসেই বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। সে কখনোই এত জার্নি করে নি। ছোটবেলায় সর্বোচ্চ দূরে যদি গিয়ে থাকে তাহলে পাবনা গিয়েছে। সে জায়গায় ফ্লাইট দিয়ে এত ঘন্টার জার্নি তার জন্য অনেক বড় একটি বিষয়। তাই বাড়ি ফিরে নিজের মা, শশুর শাশুড়ি এবং ননদের সাথে দেখা করেই রুমে এসে ঘুম দিয়েছে।

আরিশও নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলো।সে নিজেও খুব ক্লান্ত। কিন্তু সে আগে শাওয়ার নিয়ে তারপর এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।ইনায়া এক পাশেই শুয়ে ছিল।আরিশ ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে নিল। গোসল নেওয়ার কারণে তার চুল ভেজা ছিল। সেই ভেজা চুল থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গিয়ে পড়ল ইনায়ার মুখে। ফলস্বরূপ তার ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে তাকালো না। আরিশ তা লক্ষ্য করেনি।সে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিজে নিজেই বলল____

আমি জানিনা ইনু তোমার মতোন এত মায়াবী মানুষ কে কেউ কি করে কষ্ট দিতে পারে? তোমার দিকে যে তাকাবে সে তো নিজের কষ্ট ভুলে যেতে বাধ্য হবে। সেই জায়গায় তোমাকে কষ্ট দেওয়া তো অনেক দূরের কথা। তুমি অতীতে যে কষ্টের দিনগুলো কাটিয়েছিলে সেগুলো শোনার পর থেকে যতবার সে কথাগুলো মনে পড়েছে ততবারই আমার রুহু কেঁপে উঠেছিল। আর সেই জায়গায় তো টিনেজারে তুমি সেগুলো একা একা ফেস করেছ। ভাবলেই কষ্ট হয় যে আমার ইনু এতটা যন্ত্রণা ভোগ করেছিল নিজের অতীতে। আমি যদি পারতাম তোমার অতীতের সকল যন্ত্রনা ভুলিয়ে দিতাম। কিন্তু আফসোস আমার একটাই যে আমার কাছে সেই ক্ষমতা নেই। মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় কেন আমার কাছে এমন কোন ক্ষমতা নেই যে ক্ষমতা দিয়ে তোমার পুরনো ক্ষতকে আমি মুছে ফেলতে পারব। মন বলে তোমাকে আরো ভালবাসতে। তোমাকে ভালবাসতে বাসতে আমার মৃত্যু হোক তবু আমার দ্বারা যেন তুমি কখনো আঘাত না পাও, এতোটুকুই চাওয়া আমার আল্লাহর কাছে। যদি পারতাম তাহলে তোমাকে নিজের ভেতরে ভরে ফেলতাম। যাতে এই দুনিয়ার কেউ তোমাকে আঘাত করার চিন্তা ভাবনাও করতে না পারে। কিন্তু আফসোস আমার সেই ক্ষমতা নেই। তোমাকে আমি এত ভালবাসবো যে আমার ভালবাসায় তুমি ক্লান্ত হয়ে পরবে।

আরিশের কথা গুলো শুনে ইনায়ার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল‌ যা আরিশের গলায় পরল।আরিশ সাথে সাথে বুঝে গেল যে তার ইনু জেগে আছে।সে ইনায়ার মুখ কে নিজের দিকে ফেরালো।ইনায়া অশ্রুসিক্ত নয়নে আরিশের পানে চাইলো।সে এখন জানে তার স্বামী বরাবরের মতন এখনো তার চোখের পানি শুষে নিবে।আরিশও তার বিপরীত কিছু করল না। সব সময় যা করে এখনো তাই করল। যত্ন সহকারে নিজের অর্ধাঙ্গিনী চোখের পানি নিজের মুখের ভেতর শুষে নিল।ইনায়া গলা ধরে উঠলো। মুখ দিয়ে তার কোন কথা বের হচ্ছে না। তারপরও ইনায়া আরিশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল..

আপনি কি আমাকে অনেক ভালোবাসবেন? যা আগে কখনো কেউ বাসেনি?

আরিশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গাইতে লাগল,,,

এত ভালবাসা,দেব তোমায়,

যে ভালবাসা পৃথিবীতে নাই।

এইবার ইনায়ার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আরিশ কে।আরিশও‌ নিজের অর্ধাঙ্গিনী, বাচ্চা বউকে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ইনায়ার মনে হচ্ছে এখন সে নিজের সবথেকে নিরাপদ স্থানে আছে।ইনায় মিনমিনে গলায় বলল____

আইম সরি আরিশ।

আরিশ কিছুটা অবাক হলো। সঙ্গে সঙ্গে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল ___

কি হয়েছে ইনু? সরি বলছো কেন তুমি?

ইনায়া মাথা নত করে যেই না কিছু বলতে যাবে ওমনি আরিশ আবার ইনায়ার মুখ আলতো করে ধরে নিজের দিকে করে বলল____

মনে আছে যখন আমাদের প্রথমবার দেখা হয়েছিল তখন আমি তোমাকে বলেছিলাম

“আমি যতদিন বেঁচে আছি, তোমাকে কখনো কারো সামনে মাথা নত করতে দেব না।”

ইনায়ার মনে পরে গেল অতীতের সেই দিনের ঘটনা।

ইনায়া সাফিকে কোল থেকে নামিয়ে দিল।

তারপর নিচে পড়ে থাকা চেপাঁ তুলতে নিচের দিকে ঝুঁকতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আরিশ বাধা দিল।

আরিশ ধীর, কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল—

“দাঁড়াও।”

সে নিজেই নিচে ঝুঁকে চেপাঁ তুলে ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।

তারপর গভীর কণ্ঠে বলল—

“আমি যতদিন বেঁচে আছি, তোমাকে কখনো কারো সামনে মাথা নত করতে দেব না।”

বিজ্ঞাপন

ইনায়ার তখন প্রথমবার মনে হয়েছিল __

কেউ কোনোদিন তাকে এমনভাবে বলেনি…

এত সম্মান?

এত মর্যাদা?

আদৌ কি সেই সব পাওয়ার যোগ্য?

অথচ এখন আরিশ তাকে ক্ষণে ক্ষণে উপলব্ধি করাচ্ছে যে সে কেবল এত সম্মান,এত মর্যাদাই নয় বরং অনেক ভালোবাসা পাওয়ারও যোগ্য এবং সে পাচ্ছেও।আসলেই সে এতদিন মরিচিকার পিছনে পরে থেকে নিজের জীবন নষ্ট করছিল।

আরিশ আবার বলতে লাগলো ____

কখনোই কারোর সামনে মাথা নত করবে না ইনু।এখন বলো সরি কেন বললে?

ইনায়া আমতা আমতা করে বলল _____

না মানে হানিমুনে গিয়ে আমি ওই আসলে আমার,,,

আরিশ বুঝতে পারলো তার ঘোমটা ওয়ালি কি বলতে চাচ্ছে।সে ঠোঁট কামড়ে হাসলো তারপর নরম সুরে বলল____

এটাই বলতে চাচ্ছ তো যে হানিমুনে গিয়ে তোমার পি*রি*য়*ড হয়ে গিয়েছে আর আমরা ঘনিষ্ঠ হতে পারি না তাই তো? আর ভাবছো যে আমি হয়তো তোমার উপর রেগে আছি?

ইনায়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।সে আসলেই সেদিন থেকে এইসব কথাই ভেবে যাচ্ছিল। একেই তো বিয়ের মাসখানেক পর সেদিকে স্বামীকে তার কাছে আসতে দিয়েছে। তার উপর প্রথম দিন কাছাকাছি হবার পরে এই ঘটনা ঘটলো। আরিশ এর জায়গায় অন্য কোন পুরুষ থাকলে হয়তো রেগে যেত। অথচ আরিশ তার উপর রেগে না গিয়ে বরং তার সেবা যত্ন করলো। এমনকি ইনায়া প্রথম যেই জামা পরেছিল সেই জামাতে রক্তের দাগ লেগেছিল। আরিশ সেই জামা নিজ হাতে ধুয়ে দিয়েছে। ইনায়া ধুতে আসলেই সে বলেছে পেট ব্যাথা নিয়ে কিছু করতে হবে না তুমি বিছানায় বসে থাকো। এবং সে নিজে সবকিছু করেছে। ইনায়া আসলেই অবাক না হয়ে পারে না।

আরিশ ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে বলতে লাগলো ____

শা*রী*রি*ক মেলামেশা কে না চায় বলতো? এটা যে বৈবাহিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু খুব প্রয়োজনীয় যে এমনটা নয়। গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজন দুইটার ভেতর আকাশ-পাতাল ফারাক আছে ইনু। যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা সব সময় না হলেও চলে। কিন্তু যেটা প্রয়োজন সেটা প্রয়োজনই। এটা না হলেই চলে না। আমার তোমাকে প্রয়োজন যা না হলে আমার চলবেই না। আর তুমি আমার কাছে থাকলে এই শা*রী*রি*ক সম্পর্কটা এগুলো গুরুত্ব পূর্ণ যা না হলেও চলবে। পুরুষ মানুষ বলেই যে সারাক্ষণ এইসব নিয়ে ভাবব এতটাও কা পুরুষ না আমি। যেটাকে এখন তুমি নিজের সমস্যা ভাবছো সেটা কিন্তু আল্লাহর দান। আল্লাহ বুঝে শুনে সেটা নারীদেরকে দিয়েছে। তারমানে অবশ্যই পুরুষদেরকে আল্লাহ ধৈর্য দিয়েছে।যারা ধৈর্য ধরে থাকতে পারে না তারা পুরুষ না। আর এই শা*রী*রি*ক সম্পর্কে কামনা কতদিন থাকবে তুমি বলো? ৪০বছর,৫০ বছর সর্বোচ্চ ৬০ বছর হয়তো এটা বেশি হয়ে গিয়েছে। মানুষ বাঁচে কয়দিন? ধরো ধরলাম ৭০ কি ৭৫ বছর। এবং এর ভেতর শা*রী*রি*ক চাহিদা থাকে ৫০ কি ৫৫ বছর পর্যন্ত। তারপরেও আরো ১০-১৫ বছর থাকে। তখন তো কোন শা*রী*রি*ক চাহিদা থাকে না। তখন শুধু ভালোবাসা, যত্ন এবং বিশ্বাসের প্রয়োজন থাকে। তোমার মাঝে আমি নিজের ভালোবাসা খুঁজে পাই নিজের শান্তি খুঁজে পাই আর কি চাই আমার? কখনোই ভাববে না শা*রী*রি*কভাবে মেলামেশা করতে না পারলে আমি তোমার কে ভালোবাসবো না। বুঝেছো?

ইনায়া মুচকি হাসলো।সে এখন খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে আরিশ তার পড়া তাহাজ্জুদ নামাজের ফল। হ্যাঁ হয়তো সে অন্য কাউকে পাবার আশায় তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েছিল রোজা রেখেছিল, মোনাজাতে হয়তো অন্য কেউ ছিল। কিন্তু সবগুলো নামাজের মোনাজাত শেষ করার আগে সে সবসময় একটা কথাই বলতো "আল্লাহ তুমি যা ভালো বুঝো তাই করবে আমার সাথে নিশ্চয়ই তুমি উত্তম পরিকল্পনাকারী"। হ

য়তো সেই এক লাইনের ফলস্বরূপ আজ সে আরিশ কে পেয়েছে।

_____________

সময় আর স্রোত কখনোই কারো জন্য অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে ইনায়ার টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। কয়েক মাস পর তার এইচএসসি পরীক্ষা।দিন রাত এখন খাওয়া, পড়া এবং ঘুমের উপর আছে সে। তারা হানিমুন থেকে এসেছিল তার সপ্তাহখানেক পরেই আরিশের মা বাবা বোন এবং সাদমান লন্ডনে চলে গিয়েছিল। অবশ্য সবাই এখন ইরিন আর সাদমানের সম্পর্কে জানে।আরিশে মা-বাবার এতে কোন আপত্তি নেই। সবাই সাদমান কে খুব ভালোভাবেই চিনে। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের এইচএসসি এক্সাম শেষ হলেই ইরিন এবং সাদমানের বিয়ে হবে আর আরিশ এবং ইনায়ার বিয়ের ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করা হবে। ব্যাস এতে সবাই খুশি। অবশ্য এর মাঝে আরিশ লন্ডনে দুইবার গিয়েছিল। কিন্তু ইনায়ার যাওয়া হয়নি। যেহেতু তার পড়াশোনার চাপ তাই সে কোথাও যায়নি। তখন সে নিজের মায়ের সাথে থেকেছে। অন্যদিকে তার ভাই ছুটিয়ে প্রেম করছে এক মেয়ের সাথে। তার ভাইয়ের কলেজেই পড়তো মেয়েটি।ইনায়ার পরীক্ষা শেষ হলে তার ভাই ঈশান সেই মেয়েটিকে বিয়ে করবে। আর ইনায়ার রিফাত ভাই সে তো এক মাস হল ফিনল্যান্ড চলে গিয়েছে স্কলার্শিপ নিয়ে। অবশ্য ফোনে তাদের সব সময় কথা হয়।

কিন্তু ইনায়ার কাছে সব থেকে ভালো একটি বিষয় লেগেছিল যে এই ২-৩ মাসের ভেতর আরিশ তার সাথে শা*রী*রি*ক সম্পর্কে জড়িয়ে ছিল দুইদিন কি তিনদিন।

কারণ তার প্রিটেস্ট পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই কয়েকদিন পর আবার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছিল। আরিশ তো তার বিষয়ে খুব বেশি প্রোটেকটিভ। আরিশের একই কথা___

"তোমার মানুষকে দেখিয়ে দিতে হবে যে তুমিও কারো থেকে কম না। তোমাকে নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে হবে। যাতে কেউ তোমাকে এইটা না বলে যে তুমি আরিশ ইহতেশাম খান এর স্ত্রী বরং সবাই যেন এইটা বলে যে ইনায়া ইফরাহ খান এর স্বামী আরিশ ইহতেশাম খান। আশা করি তুমি আমার নাম বড় করবে।"

এর পর থেকে ইনায়া আরো মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করে দিয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় যে ভুল করেছে এইচএসসি পরীক্ষায় সে একই ভুল করতে চায় না। এখন তাকে খুব ভালো একটা রেজাল্ট আনতে হবে। প্রি টেস্ট এবং টেস্ট পরীক্ষায় মোটামুটি ভালো ফলাফল করেছে সে। সব টাই হয়েছে আরিশের ভালোবাসা এবং ভরসাতে। কিন্তু সব থেকে অবাক করার বিষয় একটাই যে এখন ইনায়ার আর মাথা ব্যথার মলম নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে হয় না, ঘুমানোর আগে মাথাব্যথার মলম লাগাতে হয় না। এখন তার যেন কোন টেনশন নেই। সব ব্যাথা, যন্ত্রণা দূর হয়ে গিয়েছে অচেনা ছাড়া এসে নিয়ে গিয়েছে। অথচ আগের দিন থাকলে তার এই তিন চার মাসে কম হলেও দুই তিনবার ডাক্তার দেখানো লাগতো। আর ঝান্ডু বাম বল হয়তো তিন-চারটা বলুন শেষ হয়ে যেত। অথচ এখন আগের গুলো পড়ে আছে। আসলেই সে একজন ভাগ্যবতী নারী।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস