ইনায়া দেখল আরিশ তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি।
ইনায়া বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। সে তার চোখ সরিয়ে নিল।
আরিশ তারপর লাগেজ থেকে Samsung Galaxy S24 Ultra একটি ফোন বের করল,
ওয়াইএসএল, লুবউটিন ব্রান্ডের হিল বের করল,
একটি সাদা গ্ৰাউন বের করল,
কিছু চকলেটের বক্স, কিন্ডার জয় বের করল।
ইনায়া অবাক হয়ে দেখছে। এগুলো সব তার স্বপ্নের জিনিস।
সে সব সময় এইসব জিনিস ইন্সটা, টিকটক, ফেসবুকে ভিডিও দেখতো এবং ভিডিও সেভ করে রাখত ফোনে।
সে ভাবতো যেদিন সে ইনকাম করতে পারবে তখন একটা একটা করে সব জিনিস কিনবে।
কারণ সেই জিনিসের অনেক দাম।
আরিশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,,,
— এই গুলো তোমার।
ইনায়ার মা বলল,,,
— বাবা এতো কিছু… আর ওর তো একটা ফোন আছে। আর হিল এনছো, তাও এই বেহুঁশ মেয়ের জন্য?
শারমিন হাসলো তারপর আবার বলতে শুরু করল,,,
— এই মেয়ে তো নরমাল জুতা, সেন্ডেল পড়ে সমান রাস্তায় হাঁটলেও ধাপুস-ধুপুস পড়ে যায়।
সবাই হেসে উঠল।
ইনায়া লজ্জা পেল।
তারপর আবার ভাবল,,,
— কথা টা সত্যিই তাই… লজ্জা পেয়ে লাভ কি।
শারমিন আবার বলতে লাগলো,,,
— আর এনেছো সাদা জামা…
এই মেয়ে আমাকে কয়েক বছর ধরে পাগল করে দিচ্ছে তাকে যেন আমি সাদা জামা কিনে দেই।
কিন্তু আমি জানি, সে এদিক-সেদিক পড়ে যায়।
আর শুধু পড়ে যায় বিষয়টি এতোটুকু না… পড়ে যাবার পর নয় জুতা ছিড়বে, আর নয় জামা ছিড়বে।
তাই ওকে সাদা জামা কাপড় কিনে দিই না।
নয়তো দুদিনেই মেয়ে নষ্ট করে দিবে।
সবাই আবার হাসে।
আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,
— আমি তো আছি… এখন থেকে সামলে নিব।
সবার হাসির শব্দের কারণে কেউ আরিশের বলা কথা সম্পূর্ণভাবে শুনতে পেল না।
ইনায়া কিছুটা শুনল।
শারমিন বলল,,,
— কি বললে বাবা?
আরিশ বলল,,,
— না মানে… বলছি আরকি… আস্তে আস্তে সামলে নেবে সবকিছু।
শারমিন বলল,,,
— এই মেয়ের দ্বারা হবে না।
শারমিন আবার বলল,,,
— আর এই হিল… ৫-১০ মিনিট এর বেশি পড়তে পারে না, নয়তো পায়ে ঠোসা পড়ে যায়, পা ছিলে যায়।
তারপরও প্রতিবার হিল দেখলে কিনবেই।
ব্যান্ডেজ পরে তারপর হিল পড়বে এই মেয়ে।
আরিশ একটু থমকাল, তারপর ভাবলো…
সে তো আছেই… সে সব কিছু সামলে নিবে।
তারপর মুচকি হাসলো।
শারমিন বলল আরো,,,
— কিছু হলেই এই মেয়ে ঘুষ চায়।
কোনো কাজ করে দিলেই বলে, চকবিন খাওয়াতে হবে… মানে জেমস।
ঘরে আবার হাসির রোল পড়ে গেল।
আরিশ ও এবার হাসল।
ইনায়া বলল,,,
— উফ্… আম্মু।
ইমরান খান বলল,,,
— হয়েছে হয়েছে, অনেক হয়েছে। আর কেউ হাসবে না আমার ইনায়া মামুনিকে নিয়ে।
ইমরান খানের মেয়ে ইরিন বলল,,,
— কিন্তু বাবা, তুমি তো নিজেই হাসছ।
এইবার ইনায়া ও হেসে উঠলো সবার সাথে।
আরিশ যেন নিজের হাসি ভুলে গিয়ে ইনায়ার হাসির মাঝে হারিয়ে গেল।
কিন্তু সে হয়তো অজানা…
তার প্রিয়সীর এই হাসির আড়ালে কত যন্ত্রণা, কত কষ্ট, কত কান্না, কত নির্ঘুম রাত লুকিয়ে আছে।
যদি সে জানতে পারত… তাহলে হয়তো দুনিয়া জ্বালিয়ে দিতে না পারলেও, যে তার প্রিয়সীর কষ্টের কারণ—তাকে ঠিকই তিলে তিলে জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে শেষ করত।
আরিশ ইনায়ার দিকে ফোন বাড়িয়ে দিল।
ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,,,
— দুঃখিত… কিন্তু আমি তো দামি জিনিস গ্রহণ করতে পারবো না।
এই সব জিনিস ব্যবহারে আমি অভ্যস্ত না।
আমি সাধারণ মেয়ে, সাধারণভাবে চলতে ভালোবাসি।
সত্যিকার অর্থে আমি এত দামি জিনিস ব্যবহার করা তো দূরের কথা, কখনো চোখে দেখিনি।
সেই জায়গায় এত গুলো দামি জিনিস একসাথে গ্রহণ করা আমার দ্বারা হবে না।
— আপনি আমার কথা ভেবে আমার জন্য এনেছেন, এটাই আমার জন্য অনেক।
প্লিজ কিছু মনে করবেন না।
আরিশ, ইমরান খান, তার স্ত্রী, ইরিন—
সবাই ইনায়ার ভদ্রভাবে করা প্রত্যাখ্যান দেখে অবাক এবং মুগ্ধ হলো।
আরিশ ভাবলো,,,,তার ইনায়ার,তার সপ্তদর্শীর ভাবনা-চিন্তা এত সুন্দর। এই মেয়েকে ভালো না বেসে পারা যায়।
শারমিন নিজের উপর গর্ববোধ করছে…
সে মনে মনে ভাবছে— “আমি আমার মেয়েকে ভালো শিক্ষা দিতে পেরেছি।”
আরিশ মুচকি হাসলো।
তারপর ধীরে, গভীর স্বরে বলল,,,
— শোনো মেয়ে,উপহার সবসময় উপহার হয়…
তা টাকা-পয়সা দিয়ে কখনো তুলনা করতে নেই।
ভালোবেসে তোমার জন্য এই জিনিসগুলো এনেছি।
আশা করি তুমি আমার ভালোবাসা গ্রহণ করবে।
ইনায়া থমকে গেল।
তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল—
মুহূর্তের জন্য যেন নিঃশ্বাস আটকে গেল।
আরিশ তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,,,
— মানে… আমার, মার, বাবার সবার ভালোবাসা মনে করে এগুলো গ্রহণ করো।
ইমরান খান এবং তার স্ত্রী একসাথে বললেন,,,
— হ্যাঁ মা, এগুলো নাও… আর না করো না।
শারমিনও বলল,,,
— যেহেতু আরিশ বাবা নিয়ে এসেছে, তুই নিয়ে নে ইনায়া।
ইনায়া আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেল না।
আরিশ একে একে ইনায়ার দিকে সব জিনিস এগিয়ে দিল।
ইনায়া জিনিসগুলো নিল এমনভাবে, যাতে তার হাতের সাথে আরিশের হাতের ছোঁয়া না লাগে।
আরিশও ঠিক তেমনভাবেই জিনিসগুলো ধরল—
যেন ইনায়া তার হাত ছুঁয়ে নিতে না পারে।
ইনায়া আগে চকলেট খুলল,
তারপর পুচুকে খাইয়ে দিতে লাগল।
সাফিও খুব সুন্দরভাবে ইনায়ার হাত থেকে খাচ্ছে।
চকলেট খাওয়া শেষে, মুখে লাগা চকলেট সাফি নিজ থেকে ইনায়ার ওড়না নিয়ে মুছে ফেলল।
সবাই হেসে উঠল।
আরিশ অবাক হয়ে দেখছে— তার চোখে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা।
আয়েশা খানম (আরিশের মা) শারমিনকে জিজ্ঞেস করলেন,,,
— ইনায়া বাচ্চা পছন্দ করে?
শারমিন হাসি দিয়ে বলল,,,
— পছন্দ করে মানে? বাচ্চাদের সাথে নিজেই বাচ্চা হয়ে যায়। সারাক্ষণ সাফির পিছনে দৌড়ায়। ছোট থাকতে সাফির নাম আদর করে পুচু রেখেছিল।
এখন ছেলেটা তিন বছরের হয়ে গেছে, তবুও তাকে পুচু বলেই ডাকে।
আমরা বলি, বড় হলে তো নাম ধরে ডাকতে হবে। তখন ম্যাডাম বলেন— পুচুর যদি নিজেরও পুচু হয়, মানে বড় হবার পর তার বাচ্চাকাচ্চা হয়, তখনও সে নাকি পুচুকে পুচু ডাকবে। মানে সে সাফি ডাকবে না।
সবাই হেসে উঠল।
ইনায়া বলল,,,
— তোমরা বসো… আমি একটু আসছি, পড়তে হবে আমার। কাল থেকে ভালো করে পড়া হয়নি।
সবাই সম্মতি জানাল,
এবং সে পাশের রুমে চলে গেল।
যতক্ষণ দেখা যাচ্ছে আরিশ তাকে দেখছে
ইমরান খান শারমিনকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুরু করলেন,,,
— যদি ছোট ভাই তখন এমন বোকামি না করত, সবার কথা চিন্তা না করে অন্তত নিজের কথা একটু ভাবত, স্বার্থহীনভাবে সবাইকে সাহায্য না করত, তাহলে হয়তো আজ তোমাদের এত কষ্ট করে থাকতে হতো না।
শারমিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,,
— কি আর করার বলেন… আপনার ভাইকে তো আপনি আমার থেকে ভালো জানেন। সব সময় মানুষের কথা ভাবত, সবাইকে সাহায্য করত। কিন্তু সবার কাছ থেকে ঠকে গেছে বারবার।
ঠিক তখনই আরিশের ফোনে একটা মেসেজ এল।
মেসেজ ওপেন করে পড়তেই আরিশ থমকে গেল।
তারপর ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি ভেসে উঠল…
আরিশ মেসেজের জবাবে টাইপ করল—