আরিশ ইনায়ার সাথে আরো কিছু টুকিটাকি কথা বলে হঠাৎ তার ফোনে কল আসে।সে কল ধরার জন্য বাইরে যায় না বরং ইনায়ার সামনেই কল ধরে।ইনায়ার চোখ বইয়ে থাকলেও কান খাড়া করে রেখেছে আরিশের কথার দিকে।
আরিশ ফোন ধরল।অপর পাশের মানুষ কি বলছে ইনায়া তা শুনতে পারল না। আরিশ সে ব্যাক্তির কথা শুনে তড়িঘড়ি করে বলল,,,,
--"আমি এক্ষুনি আসছি।সব রেডি কর।"
ইনায়া অবাক হলো । আরিশ যেভাবে কথা বলছে মনে হচ্ছে যেন সে এই জায়গা খুব ভালো ভাবে চিনে। এখানকার মানুষ দের সে চিনে।
ইনায়ার চিন্তা ভাঙলো হঠাৎ আরিশের উঠে দাঁড়ানোতে।ইনায়া আরিশের দিকে তাকালো।দেখল তার চোখ মুখ লাল বর্ন ধারন করেছে। কপালের ও ঘাড়ের রগ ফুলে ভেসে উঠছে। Adam's apple (কন্ঠমণি) কাঁপছে।
এককথায় বলতে গেলে আরিশ কে এখন সবচেয়ে ভয়ংকর এবং আকর্ষণীয় দু'টোই একসাথে লাগছে।
আরিশের চোখের দিকে তাকিয়ে ইনায়া থমকে গেল। মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে আগুনের গোলা ঝড়ে পরবে এক্ষুনি। এবং এই আগুন দিয়ে সে সব পুড়িয়ে ফেলবে।
আরিশ ফোন কেটে দেয়।তার কিছু একটা মনে আসতেই সে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দেখে ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে আছে।
চোখেমুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
আরিশ তাড়াতাড়ি নিজেকে সংযত করে,চোখ বন্ধ করে বড় বড় নিশ্বাস নেয়।সে চায়না তার প্রিয়সী তার রাগ দেখে ভয় পাক।
তারপর সে নিজেকে সামলিয়ে ইনায়ার দিকে তাকায়।
এখন দেখল ইনায়া কৌতূহল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আরিশ বলতে শুরু করল,,,,
--"আসলে খুব একটা জরুরী কাজ এসেছে আমার এক্ষুনি যেতে হবে।"
ইনায়া শুধু মাথা নাড়ল। মনের প্রশ্ন মনেই রেখে দিল।
আরিশ আবার বলতে শুরু করল,,,,
--"আমি জানি তুমি কি ভাবছ। তুমি ভাবছ যে আমি যেভাবে কথা বলছি মনে হচ্ছে যেন সে এই জায়গা খুব ভালো ভাবে চিনি। এখানকার মানুষ দের সে চিনি। তাইতো?"
ইনায়া অবাক হলো।সে ভাবছে আরিশ কি করে বুঝলো।
আরিশ ইনায়ার উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বলতে লাগলো,,,
--"আমি এখানকার কিছু ভালোভাবে চিনি না এবং এখানকার কাউকেও চিনেনা। কোথায় যাচ্ছি এবং কেন যাচ্ছি সব তোমাকে পরে বলব। তোমার এই ছোট্ট মাথায় বেশি চিন্তা করতে হবে না। মাথায় চাপ নিও না।আমি তো আছি।আমি সব সামলিয়ে নিব।কাল তোমার পরীক্ষা ভালো করে পড়ো।"
এই কথাগুলো বলে আরিশ মুচকি হাসলো।
ইনায় অবাক হলো,,,
যেই লোক একটু আগে এত রাগী ছিল সেই লোক এখন তার সাথে এখন ঠান্ডা। আর আরিশ এমন ভাবে বলছে যেন তার উপর ইনায়ার অধিকার আছে। কেউ কখনো এভাবে বলেনি ইনায়াকে।
ইনায়া মাথা নাড়ল এবং আবার পড়ায় মনোযোগ দিল।
আরিশ রুম ত্যাগ করার জন্য সামনের দিকে পা বাড়ালো। তারপর আবার কিছু একটা ভেবে পিছনে ফিরে তাকালো এবং বললো,,,
--"আমারও কিন্তু কোনো গার্লফ্রেন্ড নাই।"
ইনায়া অবাক হলো। তারপর হেসে বলল,,,
--"আমি কিন্তু জিজ্ঞেসও করি নাই।"
আরিশ হেসে মাথা চুলকে বলল,,,
--"তখন তুমি বললে না যে তোমার কোন বয়-ফ্রেন্ড নেই, তুমি এসব হারাম সম্পর্কে নেই ।তাই ভাবলাম আমিও নিজেরটা ক্লিয়ার করে দেই।
ইনায়া হাসল।
আরিশ আবার সামনের দিকে পা বাড়ায়।তা পা থমকে যায় ইনায়ার শীতল কন্ঠে।
ইনায়া বলল,,,
--"সাবধানে যাবেন। এখানকার কিছুই আপনি চিনেন না। আর এইটা বাংলাদেশের শ্রীপুর। আপনার লন্ডন না। এ
দুই টার ভেতরে আকাশ পাতাল ফারাক।আর হঠাৎ এখানে ফিরে আসাতে অনেকেই ভাবছে হয়তো আপনি সম্পত্তিতে ভাগ বসাবেন। তাই সাবধানে থাকবেন। আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন আমি কি বোঝাতে চেয়েছি।"
আরিশ যেন খুশি আত্মহারা। তার প্রিয়শী তার জন্য চিন্তা করছে এর থেকে বেশি খুশির কিছু কি আদৌ পৃথিবীতে আছে?, আরিশের তা জানা নেই।
আরিশ বলল,,,
"ঠিক আছে।আসছি আমি। খুব শীঘ্রই তোমার কাছে ফিরে আসবো।
এই কথা বলে আরিশ জায়গা ত্যাগ করলে।
ইনায়া থমকে গেল।সে মনে মনে বলতে লাগলো,,,,
--"এই লোকটা এমন ভাবে কথা বলে যেন উনার উপর আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে। যেন উনি আমার মন পড়তে পারে।উনি কাছে থাকলে মনে হয় আমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষের সাথে আছি। নিজেকে নিরাপদ অনুভব হয়। নিজেকে হালকা লাগে।এ কিসের ইঙ্গিত? জানি না আমি। কিচ্ছু জানি না। উফ্ আমি আর নিতে পারছি না।"
এই কথা গুলো বলে ইনায়া নিজের মাথা চেপে ধরে বসে রইলো।
তারপর তার কানে আরিশের বলা একটা কথা ভেসে এলো __,,,,
--"তোমার এই ছোট্ট মাথায় বেশি চিন্তা করতে হবে না। মাথায় চাপ নিও না।আমি তো আছি।আমি সব সামলিয়ে নিব।"
ইনায়া কেমন এক অজানা আশ্রয় পেল।মনে হলো আসলেই এখন সব ঠিক করে দিবে আরিশ।ইনায়া কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু কেন জানিনা তার আরিশ এবং তার বলা কথাগুলো কে ইনায়ার খুব করে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। খুব খুব।
ইনায়া ভাবল,
একটু বিশ্বাস করলে তো আর কোনো ক্ষতি নেই।
তাই সে সব চিন্তা বাদ দিয়ে ভাবলো আরিশের কথা মতো নিজের জন্য লড়তে শিখবে। প্রতিবাদ করা শুরু করবে এবং এইসব বিষয়ে আর ভাববেনা। ভালো করে পড়বে।
এইসব ভেবে ইনায়া আবার পড়ায় মনোযোগ দিল।
_________________
আরিশ সেই ফোন করা ব্যক্তির সাথে দেখা করে তার কাজ মিটিয়ে বিকেলে ফিরে এলো।এর ভিতর তার এবং ইনায়ার আর দেখা বা কথা হয় নি।সে বিকেলে সরাসরি রেশমা খানের বাড়িতে গেল।সে সিদ্ধান্ত নিল রেশমা খানের দোতালায় ২টা ফ্ল্যাট খালি আছে। সে দুটোই ভাড়া নিবে।সে জানে তার বাবার হক আছে তার বাবার বাড়িতে। কিন্তু সে চায় না কেউ তার বাবাকে অপমান করুক। তাই সে রেশমা খানের দোতালার খালি ফ্ল্যাট ভাড়া নিবে।এতে সে তার ইনায়ায কাছাকাছি থাকতেও পারবে।
দুই ফ্ল্যাট নেবার কারণ হলো একটি ফ্ল্যাটে দুইটি রুম। একটি ফ্ল্যাটে তার মা বাবা এবং তার বোন থাকবে। এবং অন্যটি ফ্লাটে সে একা নিজে থাকবে।যেই ভাবা সেই কাজ।আরিশ রেশমা খান এবং তার স্বামীর সাথে কথা বলে ফ্ল্যাট নিয়ে নিল। তারপর তার এক লোকের সাথে কথা বলে ফ্ল্যাটের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনিয়ে দিয়ে ফ্ল্যাটে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে দিল। আজকেও তারা রেশমা খানের বাড়িতে থাকবে।রুম গোছানো হলে কালকে থেকে সেখানে থাকবে।
সব কিছু ঠিকঠাক করে আরিশ বিছানায় এসে গাঁ এলিয়ে দিল।চোখ বন্ধ করতেই ইনায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখ ভেসে উঠলো।আরিশ মুচকি হাসলো।
তারপর ইনায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখ এর পিছনে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় চেহারা ভেসে উঠলো।ইনায়ার মলিন হাঁসি, ইনায়ার বলা সেই কথা তার কানে ভেসে এলো
--"এইটা আমার থেকে ভালো আর কেউই বলতে পারবে না।"
আরিশ চোখ খুলে ফেলল।সে উঠে বসল।সে বুঝতে পারছে না ইনায়া কি এমন যন্ত্রনা বয়ে বেড়াচ্ছে। তার হাসির পিছনে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণা কষ্ট কী?সে কি খুব বাজে সময় কাটিয়েছে?
আরিশ কিছুই জানে না।
তার মনে অনেক প্রশ্ন কিন্তু কোনো উত্তর নেই।কে দিতে পারবে তাকে তার প্রশ্নের উত্তর।
হ্যাঁ একজনই দিতে পারবে তা হলো ইনায়া নিজে। কিন্তু ইনায়া তো এতো সহজে কিছু বলবেনা তা আরিশ খুব ভালোভাবেই জানে ।
আরিশ বিরবির করে বলল,,,
--"ইনায়া বিশ্বাস কর আমি জানি না তোমার অতীত কী, কী কষ্ট যন্ত্রণা তুমি সহ্য করেছ এবং এখনো বহন করছ। কিন্তু আল্লাহর কসম। তোমার প্রতি আমার ১৫ বছরের একপাক্ষিক ভালোবাসার কসম যদি আমার ভালোবাসা সত্যি হয় তাহলে তোমাকে আমি আপন করে পাব ইন শা আল্লাহ। তোমার সব কষ্ট যন্ত্রণা আমি ভুলিয়ে দিব।আমার ভালোবাসায় ভরিয়ে দিব।আর একটু অপেক্ষা আর একটু!!!