ইনায়া সাফিকে কোল থেকে নামিয়ে দিল।
তারপর নিচে পড়ে থাকা চেপাঁ তুলতে নিচের দিকে ঝুঁকতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আরিশ বাধা দিল।
আরিশ ধীর, কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল—
“দাঁড়াও।”
সে নিজেই নিচে ঝুঁকে চেপাঁ তুলে ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।
তারপর গভীর কণ্ঠে বলল—
“আমি যতদিন বেঁচে আছি, তোমাকে কখনো কারো সামনে মাথা নত করতে দেব না।”
ইনায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
কেউ কোনোদিন তাকে এমনভাবে বলেনি…
এত সম্মান?
এত মর্যাদা?
জবাবে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল সে।
ইনায়া আরিশের হাত থেকে চেপাঁ নেওয়ার আগেই সাফি এগিয়ে এসে সেটি ইনায়ার হাতে দিল।
ইনায়া হাসিমুখে পুচুকে চুমু খেল।
আরিশের ভেতরে যেন আগুন জ্বলে উঠল—
যার প্রাপ্য সে নিজে, সেই হকটুকু কিনা একটা বাচ্চা ছেলে পেয়ে গেল!
ঠিক তখনই ইনায়ার মা রুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
“এ কী আরিশ বাবা! তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভেতরে আসো।”
তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“আর তুই বলিহারি! তোর কান্ড-জ্ঞান আর কবে হবে? ছেলেটাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস?”
ইনায়া লাজুকভাবে মুচকি হাসল।
তারপর সরে দাঁড়িয়ে আরিশকে ভেতরে আসার জন্য জায়গা দিল।
আরিশ, যেটুকু সিঁড়ি অবশিষ্ট ছিল, তা বেয়ে উপরে উঠে এল এবং ইনায়ার ঠিক সামনাসামনি দাঁড়াল।
দু’জনের উচ্চতার পার্থক্য স্পষ্ট—
আরিশ ৬ ফুট ২ ইঞ্চি, আর ইনায়া ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি।
ইনায়া পুচুকে নিয়ে আগে আগে হেঁটে রুমের ভেতর ঢুকল,
তার পিছনেই ধীর পদক্ষেপে আরিশ।
ভেতরে ঢুকে ইনায়া মায়ের কানে কিছু একটা ফিসফিস করে বলল।
তার মা সঙ্গে সঙ্গে পাশের রুমে চলে গেলেন।
আরিশ ভেতরে এসে রুমটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
ইনায়া পুচুকে নিয়ে অন্য রুমে চলে গেল—
আসলে সে অপরিচিত মানুষের সামনে থাকতে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে।
রুমটি আরিশ ধীরে ধীরে চোখে ভরল।
জানালার পাশে একটি বড় খাট, মাঝখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা, তারপর একটি খাবার টেবিল।
পাশে একটি ড্রেসিং টেবিল ও একটি ওয়ারড্রোব, যার উপরে রাখা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আর বেশ কিছু বই।
সে বইগুলোর দিকে এগিয়ে গেল—
বাংলা, উর্দু (রোমান ভার্সন), ইংরেজি…
রোমান্টিক উপন্যাস থেকে শুরু করে সাইকোলজি, self-employed, self-improvement—সব রকমের বই।
আরিশের ঠোঁটে ধীর এক মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
“বুঝতে পারছি… আমার প্রিয়শী বই পড়তে ভালোবাসে,” মনে মনে বলল সে।
পাশেই টিভি স্ট্যান্ড, যেখানে একটি টিভি রাখা।
ঠিক তখনই ইনায়ার মা শারমিন একটি বড় বাটিতে পানি আর সঙ্গে হ্যান্ডওয়াশ নিয়ে রুমে এলেন।
আরিশ অবাক হলো—
তার খেয়ালই ছিল না, সে চেপাঁ ধরেছিল…
হাতে নিশ্চয়ই এখনও গন্ধ লেগে আছে।
এখন সে বুঝতে পারল, ইনায়া রুমে ঢুকে মায়ের কানে ঠিক কী বলেছিল।
তার মনে এক ঝটকা অনুভূতি—
ওহে ঘোমটা ওয়ালি… এত কেয়ার করো না, মরে যাব! তোমার এই যত্ন দেখে ইচ্ছে করছে এখনই তোমাকে নিজের করে নেই…
শারমিনের ডাক তার ঘোর ভাঙল।
“বাবা, হাতটা ধুয়ে নাও।”
আরিশ সামান্য মুচকি হেসে বলল—
“এত কষ্ট করে এগুলো এখানে আনতে গেলেন কেন মামনি? আমি না হয় নিজেই বাথরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে আসতাম।”
শারমিন হাসিমুখে জবাব দিলেন—
“আসলে ইনায়া বলল… তুমি লন্ডনে বড় হয়েছো, তোমাদের পরিবেশ আলাদা, আমাদের পরিবেশ আলাদা… হয়তো তোমার অসুবিধা হবে। তাই আমাকে বলল এগুলো নিয়ে আসতে।”
আরিশের হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল।
তার প্রিয়শী তাকে নিয়ে একটু ভেবেছে—
এটাই তার কাছে অমূল্য।
বাকি জায়গাটা… সে নিজেই দখল করে নেবে।
হাত সুন্দরভাবে ধুয়ে নেওয়ার পর আরিশ মুচকি হেসে বলল—
“আমি কি এসে বিরক্ত করলাম আপনাদের, মামনি?”
আরিশ আসলে এই কথাই ইচ্ছে করে বলেছে যাতে সামনে ইনায়াকে এই রুমে পাঠিয়ে দেয়।
শারমিন লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়লেন।
“আরে না না বাবা… ছি ছি, কি যে বলো তুমি! তুমি তো আমার নিজের ছেলের মতোই।”
আরিশ ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে রাখল, চোখে যেন এক ঝিলিক খেলে গেল।
শারমিন তারপর গলা তুলে ডাকলেন—
“কিরে ইনায়া! ছেলেটা এই রুমে একা বসে আছে, আর তুই ওই রুমে বসে আছিস?
কালকেও তো বড় চাচ্চু, চাচিমার সঙ্গে দেখা করতে যাসনি!”
ইনায়া ও রুম থেকে “চ্…” শব্দ করে উঠল।
তার মুখের ভঙ্গিমা আর অভিমানী সুর শুনে কেবল পুচুই হাসছে—
সে কী বুঝতে পারছে, সে নিজেও জানে না।
শারমিন হালকা হেসে আরিশকে বললেন—
“বাবা, কিছু মনে করো না… এই মেয়েটা কারোর সামনে আসে না, বিশেষ করে ছেলে বা পুরুষদের সামনে।
কথা তো বলেই না! কিন্তু যদি কারোর সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে তাকে পাগল বানিয়ে ছাড়ে।”
আরিশও হাসল…
কিন্তু মনে মনে বলল—
অথচ আমি তাকে না দেখেই পাগল হয়ে গিয়েছিলাম…!
অল্পক্ষণ পর ইনায়া পুচুকে কোলে নিয়ে ও রুম থেকে এলো।
মাথা সুন্দরভাবে ঘোমটা দিয়ে ঢাকা।
সে এসে বিছানার একপাশে চুপচাপ বসে পড়ল।
আরিশ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল… যেন চোখ সরাতে ভুলে গেছে।
শারমিন বললেন—
“বাবা, আমি তো জানি না তুমি কি খেতে পছন্দ করো। বলো না, কীভাবে তোমাকে আপ্যায়ন করব?”
আরিশ সামান্য হেসে উত্তর দিল—
“এত ভাববেন না, চাচিমনি… আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না। এখানেই আছি।
আপনাকে সম্পূর্ণ সুযোগ দেব আমাকে আপ্যায়ন করার।
আপনার মেয়ের জামাই হব—অবশ্যই আপনাকে আমাকে আপ্যায়ন করতেই হবে।”
শেষের কথাগুলো সে এত আস্তে বলল যে কেবল নিজের কানেই পৌঁছাল।
শারমিন হেসে মাথা নাড়লেন—
“আচ্ছা বাবা, কিন্তু বলো তো কী খাবে? আমি তো জানি না তুমি কি খাও।”
আরিশ সোজাসাপ্টা জবাব দিল—
“মামনি, আপনি নিজের হাতে যা রান্না করবেন, তাই খাব।”
শারমিন সন্তুষ্টির হাসি দিয়ে ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন—
“অন্যান্য চাচাতো, ফুফাতো ভাইদের মতো আরিশও তোর ভাই। ওর সঙ্গে বসে গল্প কর।”
এই কথায় আরিশ যেন আকাশ থেকে পড়ল—
ভাই? আমি? তাও আমার প্রিয়শীর?
আসলাম হতে তার সাইয়া… আর সবাই আমাকে বানিয়ে দিল তার ভাইয়া!!
তার মনে তোলপাড়—
তওবা!
আস্তাগফিরুল্লাহ!
নাউযুবিল্লাহ!
আল্লাহ মাফ করুন…
এই কথাগুলো সে বারবার মনে মনে বলতে লাগল।