২৮ বছর পর লন্ডন থেকে নিজের বাড়ি ফিরছে খান বংশের বড় পুত্র—#আরিশ_ইহতেশাম_খান।
বাড়ি ফিরছে বললে হয়তো অবিচার হবে...
বলা যায়, এই প্রথম সে ফিরছে নিজের শিকড়ে,যেখানে তার হয়তো জন্ম হয়নি কিন্তু তার বাবার জন্ম। অথচ তার নিজ বাড়িতে তার কোনো স্মৃতি নেই। শুধু কল্পনায় আঁকা ছবি।
অচেনা_ছায়া
(প্রথমবার আবার কেউ কি করে নিজের বাড়িতে ফিরে? গল্পের ভেতর জানতে পারবেন।)
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
প্রবেশদ্বারের স্বচ্ছ কাঁচের দরজাটি ঠেলে বেরিয়ে এলো একজন দীর্ঘদেহী, ছিপছিপে গড়নের যুবক। তাঁর পরনে নিখুঁতভাবে কাটা একখানা কালো টেইলার্ড স্যুট, যার প্রতিটি সেলাই যেন বলে দিচ্ছে — সে একজন উচ্চমানের রুচিসম্পন্ন মানুষ। স্যুটের নিচে পরা ছিল ধবধবে সাদা কটনের শার্ট, যা নিঃশব্দেই আলো কেড়ে নিচ্ছে।
তাঁর ত্বক ফর্সা। অবশ্যই লন্ডনে বড় হবার প্রভাব— লন্ডনের শীত ও সূর্য মাখা স্কিনটোন, যেন এক নিখুঁত আরব-ইউরোপিয়ান মিশ্রণ। চওড়া কাঁধ, শক্ত হাতে ধরা ছিল কালো একটি leather duffle bag।
চোখজোড়া যেন এক বিস্ময়কর রহস্য। ধূসর মিশ্রিত গভীর বাদামী— ঠান্ডা, নির্ভার কিন্তু তীক্ষ্ণ। সেই চোখে একটানা তাকিয়ে থাকলে মনে হবে, সে তোমার আত্মার ভেতর পর্যন্ত সব পড়ে ফেলছে। সোজা ও ঘোড়া নাকটি ছিল তাঁর মুখের ভারসাম্য রক্ষাকারী এক নিখুঁত ভাস্কর্য — একবার দেখলেই চোখ ফেরানো যায় না।
তার নাম — আরিশ ইহতেশাম খান।
বয়স — আটাশ।
লন্ডনের অভিজাত এলাকা Kensington (কেনসিংটন)-এ বেড়ে ওঠা এই মানুষটি Cambridge University (ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি) থেকে Business & Management (বিজনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট)-এ গ্র্যাজুয়েশন করেছে।
সাম্প্রতিক এক ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস সামিটে বাংলাদেশে একটি ব্রাঞ্চ খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আর সেই কারণেই প্রায় ২৮ বছর পর এই প্রথম...আরিশ বাংলাদেশে ফিরলো। কিন্তু এছাড়া আরো একটি কারণ আছে বাংলাদেশে ফেরবার।
নিজের ভালোবাসা। যাকে আজ পর্যন্ত সে দেখেনি। শুধু অনুভব করে গেছে। তার মনে এবং ঠোঁটে শুধু একটাই কথা,,, #অচেনা_ছায়া_তুমি
এবং আরো একটি কারণ আছে বাংলাদেশে ফেরবার তা হলো তার বাবাকে নিজের বাড়িতে ফিরে আনার,তার মাকে তার অধিকার ফিরিয়ে দেবার।
তার বাবার নাম ড. ইমরান খান, কিং’স কলেজ লন্ডনের প্রাক্তন স্কলার ও লন্ডনের এক নামকরা সাইকোলজিস্ট।
মা আয়েশা খানম, একজন গৃহিণী এবং লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা।
আর একমাত্র ছোট বোন ইরিন খান, লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে বায়োমেডিকেল সায়েন্সের শিক্ষার্থী, যার স্বপ্ন ভবিষ্যতে নিজের একটা রিসার্চ ফাউন্ডেশন তৈরি করা।
তারা সবাই মিলে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে এল। কিন্তু তাদের কে কেউ নিতে আসেনি। এবং এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারা আগে থেকেই এখানে কন্টাক্ট করে গাড়ি কিনে রেখেছিলেন। হাইস মাইক্রোবাস কিনে রেখেছিলেন।
সবাই একে একে গাড়িতে বসল।
পিছনের সিটে বসল আরিশ এবং ইরিন।
তার পিছনের সিটে বসল ইমরান খান এবং আয়েশা খানম।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে যাবার।
তাদের গ্ৰামের বাড়ি মূলত নয়ানগড় বাঙ্গলা বাজার।
যা মূলত শীতলক্ষ্যা নদী পার করে।
গাড়িতে নিরবতা। সবার মনেই অস্থিরতা।
আরিশের মনে অস্থিরতা শুধু মাত্র তার প্রেয়সীকে দেখার জন্য।যাকে সে না দেখেই ভালোবেসে এসেছে।
আয়েশা খানম এর মনে অস্থিরতা কারণ সে প্রথম বার নিজের শশুর বাড়ী যাচ্ছে।
এবং ইমরান খান এর মনে অস্থিরতা ও ভয়। সে জানে সবকিছু এত সহজ হবে না।
অন্যদিকে_________________
বাড়িতে ভীষণ হইচই। খুশিতে? না একদম না।সবাই চিন্তিত যদি বাড়ির বড় সদস্য এসে তার ভাগের সম্পত্তি চায়। হাস্যকর ব্যাপার আমাদের বাড়ির। সবাই অন্যের সম্পত্তি ভোগ করতে পারবে কিন্তু অন্যের অধিকার অন্যকে ভোগ করতে দিবে না।
আমার নাম #ইনায়া_ইফরাহ_খান।
বাড়ির একমাত্র ছোট মেয়ে। বয়স ১৭। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার এ পড়ি।
বাবা: ইফতেখারুল খান (মৃত) আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়তাম তখন তিনি মারা গিয়েছিলেন।
মা: সুবর্না শারমিন।
ভাই: ইশান ইফরান খান। পড়াশোনা করছে এবং পাশাপাশি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। কি আর করার সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও নিজেদের অধিকার ভোগ করতে না পেরে সংসার চালানোর জন্য এই বয়সে সে কাজে নেমে পড়ে। নিজেও পড়ালেখা করে আমাদের সংসার চালায় এবং আমাকেও পড়াশোনা করায়।
বাবা যখন মারা গিয়েছিল তখন সে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল।সালটা ছিল ২০২২।
গল্পের ফিরে যাওয়া যাক,,
ইনায়া তার মাকে ডাকতে লাগলো এবং বলল,,,
--"আম্মু,,,ও আম্মু,,,কৌই তোমার তো আগে কখনো বলেনি এই চাচার কথা?আমি তো জানতাম আব্বু সবার ছোট এবং তার দুই বড় ভাই আছে। এবং এক বোন।কিন্তু ইনার কথা তো আগে কখনো শুনিনি।"
তার মা একটু থেমে বললেন____
"সত্যি বলতেই তোর এই চাচার কথা আমিও তেমন ভালো করে জানি না। শুধুমাত্র একবার তোর বাবার কাছে শুনেছিলাম। আসলে অনেক আগের কথা তো তাই তোরা জানিস না। তোর এই চাচা তখন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পড়ালেখার প্রতি তার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অভাবের তাড়না ছিল তাদের ঘাড়ে। তোর বাবা তখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। তোর বাবার সাথে তোর এই চাচার সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই গভীর। তোদের দাদা তোর এই চাচার সাথে গ্রামের মেম্বারের মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক করে। কিন্তু তোর এই চাচা বিয়ে করতে চাইনি। সে পড়ালেখা করে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিল। তাই বিয়ের আগেই সে পালিয়ে যায়। কোথায় চলে গেছে তা কেউ জানতো না শুধুমাত্র তোর বাবা ছাড়া। কিন্তু তোর বাবা তখন কাউকে কিছু বলেনি। তোর দাদার রাগে দুঃখে অপমানে তোর এই চাচাকে একটা ত্যাজ্যপুত্র করে দেয়। তারপর থেকে নাকি তোর এই চাচার কথা কেউ তুলেনি।"
ইনায়া জিজ্ঞেস করল,,,
--"আচ্ছা আব্বু কি কখনো তোমাকেও বলেনি যে আব্বুর উনার বড় ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক আছে কিনা অথবা ওনার বড় ভাই এখন কোথায় আছে?"
তার মা বলল,,,,
--"নারে তোর বাবা কখনো আমাকে এ সম্পর্কে কিছু বলেনি। এবং আমি বেশি কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে তিনি শুধু বলেছেন সময় আসলে জানতে পারবে।আজকে তোর ফুফু বলল উনারা নাকি আবার দেশে ফিরছেন। তাই তো দেখছিস না বাড়ি ভরা কত ঝামেলা।"
ইনায়া অবাকের শেষ পর্যায়ে চলে গেল।
তারপর তার মাকে জিজ্ঞেস করল,,
--"কিন্তু মা ওদেরকে কেউ এয়ারপোর্ট থেকে আনতে গেল না কেন?যত যাই হোক উনি তো এ বাড়ির মানুষ। কারো না কারো তো উচিত ছিল।"
তার মা জাবাবে বললেন,,
--"তোর চাচা এবং ফুপিরা নিজেদের জমি জমা নিয়ে ব্যস্ত। তারা ভাবছে এখন তাদের সম্পর্কে ভাগ বসাতে বড় চাচা আসছে। তাই তারা সবাই এখন ক্ষিপ্ত।"
ইনায়া বলল,,,
--"এখানে ভাবার কি আছে? উনি এবারের বড় সন্তান। অবশ্যই উনাকে বাড়ির সকল সম্পদের মধ্যে অধিকার আছে।"
____________
দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
বাড়ির সামনে এসে থামল এক কালো হাইস মাইক্রোবাস।
সেখান থেকে নেমে আসলো একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ এবং একজন মহিলা। তারপরই গাড়ি থেকে নেমে আসলো ইরিন এবং সেই সুদর্শন যুবক আরিশ।
বাড়ির দরজা খুলে একে একে প্রবেশ করল সবাই।
ইমরান খানের এই বাড়িতে আসা হয়নি কখনো। কিন্তু তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকতেন। পালিয়ে যাবার পর আর কোনো যোগাযোগ ছিল না এই বাড়ির কারোর সাথে। তিনি যোগাযোগ করতে চাইলেও কেউ তার সাথে যোগাযোগ রাখেনি শুধুমাত্র তার ছোট ভাই বাদে। তার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলেন এই বাড়ির কথা। ছোট ভাইয়ের সাথে তার আগে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু মাঝখানে কোনো কারনে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি অনেক চেষ্টা করেন যোগাযোগ করার কিন্তু করতে পারেন না। তারপর অনেক খোঁজখবর নেয়ার পর তিনি জানতে পারলেন তার ছোট ভাই মারা গিয়েছে। তিনি আর থাকতে পারলে না বিদেশে তাই এদেশে চলে আসলেন।
তারা সবাই মিলে যখন মেনগেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করল,,, গেটের পাশে ছিলে একটা রুম, আর একটু দূরে ছিল আরেকটা রুম, তার আরেকটু দূরে ছিল আরেকটা রুম। এবং এক পাশে ছিল সিঁড়ি এবং দোতালায় ছিল এরকম ভাবে তিনটি রুম।
তারা সবাই মিলে বাড়িটা খুব ভালোভাবে দেখছে। ঠিক তখনই গেটের সাথের রুমের দরজা খুলে একজন বয়স্ক লোক বেরিয়ে এলো এবং উত্তেজিত কন্ঠে বলল,,,
তোমরা কোন অধিকারে এ বাড়িতে এসেছ? চলে যাও বাড়ি থেকে।