বিকেলের ওসব ঘটনার পর আমি যে রুমে ঢুকেছি, তার পরে আর রুম থেকে বের হইনি। ওনাদের সাথে দেখাও করিনি।
বাড়ির বড়রা সবাই আমার সেই ফুফুর বাসায়। হয়তো সেখানে মিটিংয়ে বসেছে। অবশ্যই এটা সব সময়ের তামাশা। এসব দেখতে দেখতেই তো বড় হয়েছি।
পড়ার টেবিলে মনোবিজ্ঞান বই নিয়ে বসে আছি। কিন্তু কেন জানি না, পড়ার প্রতি মন দিতে পারছি না।
প্রায় দেড় বছর পর আবার এমন হলো—আমি পড়ার টেবিলে বই নিয়ে বসে আছি, অথচ মন বসছে না।
আর যাই হোক, সেই দেড় বছর আগের অতীতটা মনে করতে চাই না। _
কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না। বড় চাচার ছেলে... কি যেন নাম তার...
আরিশ... হ্যাঁ, হ্যাঁ... আরিশ।
উনাকে আমার এত চেনা কেন লাগছে?
আমি তো ওনাকে কখনো দেখিনি। কিন্তু উনার কণ্ঠস্বর, উনার শরীরের গঠন...
মনে হচ্ছে, আমার স্বপ্নে দেখা সেই অচেনা ছায়া...
কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
না ইনায়া, তুই একটু বেশি ভাবছিস।
কি না কি স্বপ্নে দেখেছিস, আবার সেগুলো নিয়ে বাস্তবেও চিন্তা-ভাবনা করছিস।
তাও আবার তোর উগান্ডা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা চাচাতো ভাইকে নিয়ে!
ওহ্ থুক্কু, লন্ডন...
উগান্ডা বললে তো লন্ডনের মান-ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে!
নিজের কথাতেই নিজেই হেসে উঠল ইনায়া।
তারপর আবার পড়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল...
________________
সবাই রেশমা খানের বাড়িতে ছিল।
সেখানে ছিলেন—আরিশ, ইমরান খান, তার স্ত্রী ও মেয়ে।
আরও ছিলেন—ইমন খান তার দুই বড় ছেলে, রেশমা খান, তার স্বামী, তাদের দুই ছেলে, মেজ চাচার স্ত্রী ও তার ছেলে ইরশাদ, এবং ইনায়ার মা।
কিছুক্ষণ আগেও এক তুমুল ঝগড়া শুরু হয়েছিল।
তবে আরিশ আর রাফি মিলে সবাইকে শান্ত করে দিয়েছে।
এখন সবাই নিস্তব্ধ বসে আছে।
তখন আরিশ এই নিরবতা ভেঙে বলল,—
“দেখুন, শেজ চাচ্চু আর ফুফুমনি, আমার বাবার কিংবা আমাদের সম্পত্তির প্রতি কোনো লোভ নেই।
আমরা এখানে শুধু এসেছি আমার বাবাকে তার পুরনো পরিবারে ফিরিয়ে দিতে, আর আমার মাকে তার শ্বশুরবাড়ির প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দিতে।
আপনারা চিন্তা করবেন না যে আমরা এখানে এসে আপনাদের বাড়িতে থাকার কোনো সুযোগ নেব।
এসব নিয়ে আপনাদের ভাবার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু একটা কথা বলব—আমি আশা করব, কেউ আমার বাবা বা আমার পরিবারের প্রতি আঙ্গুল তুলে কথা বলার সাহস দেখাবে না।
এই আরিশ ইহতেশাম খান যতটা ভালো, ঠিক ততটাই খারাপ।
বলতে পারেন, তার থেকেও অনেক বেশি খারাপ, যা আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না।”
সবার মুখে চুপ।
আরিশের বাবা তাকে শান্ত করে বললেন,
“আরিশ, ঠান্ডা থাকো।”
এরপর তিনি তার ভাই-বোনদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।
সবার কথাবার্তায় মনোযোগ দিলেও আরিশের মন অন্যত্র ছিল।
সে শুধু তার প্রিয়শীকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।
তার ‘ঘোমটা ওয়ালি’ কে এখনো পুরোপুরি দেখা হয়নি।
মনে মনে আরিশ বলল,—
“আর কতদিন পালিয়ে থাকবে আমার থেকে, ঘোমটা ওয়ালি?
তোমাকে এ আরিশের আবদ্ধে বন্দী হতে হবে, ঘুরেফিরে।”
ইমরান খান একে একে সবার সঙ্গে পরিচয় হলো।
তিনি তার ছোট ভাইয়ের কাছে বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন এবং নামগুলোও জানতেন, কিন্তু তাদের কখনো দেখা হয়নি।
তার চোখ এসে থেমে গেল ইনায়ার মায়ের দিকে, অর্থাৎ সুবর্ণা শারমিনের।
ইমরান খান বললেন,
“তুমি আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী, তাই না?”
শারমিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
আরিশ এবার তার দিকে তাকিয়ে নিজের জায়গা থেকে উঠে গেল।
সে হাঁটু গেড়ে বসে, তার হাত নিজের হাতে ধরে বলল,
“জানো, ছোট চাচী, হয়তো তুমি আমাকে জানো না, চিনো না, এমনকি আমার অস্তিত্বের ব্যাপারেও ধারনা ছিল না।
কিন্তু ছোট চাচ্চুর সঙ্গে যতবার কথা হতো, সবসময় তোমার কথা উঠতো।
সে আমাদের সবসময় দেশে আসার কথা বলতো।
আমরাও তাকে সবসময় প্রতিশ্রুতি দিতাম যে খুব শীঘ্রই আসবো।
বিশ্বাস করো, চাচিমনি, সে খুব রাগ করতো।
সবসময় বলতো—‘যেদিন আসবি, তখন আর আমাকে পাবি না।’
কিন্তু কখনো ভাবতে পারিনি সেই কথাগুলো সত্যি হয়ে উঠবে।”
এই কথা বলতে বলতে আরিশের ঠোঁট কাঁপছিল, চোখ অশ্রুজলে ভরে গেল।
ইনায়ার মা, ইমরান খান এবং তার স্ত্রী—কারো চোখের পানি আর ধরে রাখা সম্ভব হলো না, সবাই কেঁদে উঠলো।
আরিশের চোখ থেকেও এক-দু'টি ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখল।
ধীরে ধীরে সবাইকে শান্তনা দিল।
সবাই স্বাভাবিক হলো এবং নিজেদের মধ্যে টুকিটাকি কথা বলতে লাগলো।
হঠাৎ রাফি জিজ্ঞেস করল,
“ছোট মামি, ইনায়া কোথায়?”
ইমরান খান বললেন,
“হ্যাঁ, শারমিন, তোমার ছেলে-মেয়ে কোথায়? ওদের তো দেখতে পারছি না।”
শারমিন বললেন,
“আসলে আমার ছেলে এখনো অফিসে আছে।
আর মেয়ে অনেকটা লাজুক। সবার সামনে সহজে আসে না।
কিন্তু যদি একবার মিশতে পারে, সবাইকে পাগল করে দেবে।”
সবার মুখে হাসি ফোটে।
আরিশ মনে মনে বলল,
“কিন্তু মিস ঘোমটা ওয়ালি কে দেখার জন্য আমার মন যেন উতলা হয়ে উঠছে।
আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, সে কি সেটা বুঝতে পারে না?”
তারপর রাফি বলল,
“অনেক কথা হয়েছে, আপনাদের তো অনেক দূর থেকে আসতে হয়েছে। লন্ডন থেকে বাংলাদেশ যাত্রা তো আর সহজ নয়।
আপনারা খাওয়া-দাওয়া করে আজ রাতটা এখানেই কাটান, পরের দিন দেখা হবে।
আর এই বিষয় নিয়ে আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।”
আরিশ হতাশার এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল।
তার কিছুই ভালো লাগছিল না।
এই এত দিনের অপেক্ষা, লন্ডনের সব কাজ, সব মিটিং ছেড়ে এসে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র প্রিয়শীকে দেখা এবং তাকে নিজের করা।
কিন্তু বাংলাদেশে এসে ৭ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে,
এই বাড়িতে এসেছে ৪ ঘন্টা,
তবুও তার ঘোমটা ওয়ালির দেখা মেলেনি।
এত বড় অন্যায় সে মানতে পারছিল না।
লন্ডনের ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়ে, সেখানকার সব মেয়েরা তার জন্য পাগল থাকতো।
বিজনেসের দুনিয়ায় কত সফল ব্যবসায়ী তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সে শুধু মাত্র তার সপ্তদর্শীর জন্য অপেক্ষা করত।
কিন্তু এখানেই, শুধু এক নজর দেখতে, সেই সপ্তদর্শীকে খুঁজতে সে ছটফট করছে।
"ভালোবাসা কি সত্যিই এতটা যন্ত্রণার?
এত নিঃশেষ অপেক্ষায় বাঁধা?
ভিতরে এক এক করে অনুভূতি ছাই হয়ে যায়,
অথচ বাইরে এক চিলতে হাসি নিয়ে থাকতে হয়—
যেন কিছুই হয়নি, যেন হৃদয়টা এখনও সম্পূর্ণ আছে।"
সেদিন রাতে আরিশ ঠিকমতো খাবার খায়নি।
চুপচাপ শুয়ে পড়েছিল।
চোখে একরাশ ঘুম জমে থাকলেও ঘুমানোর ইচ্ছে ছিল না তার।
তার চোখ শুধু তার প্রিয়শীকে খুঁজছিল।
কিন্তু জার্নির ক্লান্তি তাকে শেষ পর্যন্ত ঘুমে ডুবিয়ে দেয়,
সে নিজেও বুঝতে পারেনি কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল।