অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৯

🟢

আরিশ নিজের চিন্তায় ভাবুক ছিল তার ভাবনা কাটলো ইনায়ার কথায়।

ইনায় বলল,,,,

--"আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,,

--"যত গুলো ইচ্ছে তত গুলো জিজ্ঞেস করেন মেডাম।"

ইনায়া হালকা হাসল। তারপর বলল,,,,

--"আপনি জন্ম গ্ৰহণ করছেন লন্ডনে কিন্তু আপনার বাংলা বলার উচ্চারণ খুব স্পষ্ট। ইংরেজির কোনো ছোঁয়া নেই।"

আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,,

--"আসলে আমার মা,বাবা তাদের দেশের প্রতি যথেষ্ট সম্মান এবং ভালোবাসা রয়েছে।তাই লন্ডনে থাকলেও তারা ভুলেনি যে আমরা বাঙালি। এবং আমাদেরও ভুলতে দেয়নি। জন্মের পর প্রথম ভাষা মনে হয় বাংলাতেই শিখেছি।আর ইরিন এর ক্ষেত্রেও সেম থিংক।"

ইনায়া বুঝে মাথা নাড়ল।

তারপর আবার তার পড়ায় মন দিল।আরিশ একবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে তারপর রুমটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।

রুমটা খুব বেশী বড় না। জানালার সাথে একটা খাট।তাও অনেকে পুরোনো। একটি ফ্রিজ, একটি আলমারি তারও আয়না ভাঙা। দুইটা পড়ার টেবিল। কিন্তু ইনায়ার পড়ার টেবিল বড় এবং অনেক বই খাতা।ইনায়া টেবিলে চারটা স্টিকি নোট দিয়ে কিছু লিখে টাঙিয়ে রেখেছে।

আরিশ চোখ ছোট ছোট করে দেখল কি লেখা।

১ টি যে লেখা আছে,,,,

"I Will Start Anew Fight For My Dream"

২য় টি তে লেখা,,,,,

"স্বপ্ন আমার ঢাবি,তাই তো আমি রাত জাগি।"

৩য় টি তে লেখা,,,,

"সব ক্লান্তি শেষ হবে যখন ডাক পিয়ন বলবে,,, ভর্তি কার্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।"

এবং চতুর্থ যেটি আরিশের কাছে বেশি ভালো লাগলো ,,,,,

"পড়তে কারোই ভালো লাগে না। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যারা পড়ে তারাই সফল হয়।"

আরিশের ইনায়ার পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে ভালো লাগলো। তারপর আবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।

তার সপ্তদর্শী এখন চশমা পড়েছে। এতক্ষণ ছিল না চশমা।আরিশের মনে হচ্ছে চশমা পড়াতে যেন ওকে আরো সুন্দর লাগছে।আরিশ নিজেই বুঝে পায় না এই মেয়ে কি এমন জাদু করেছে যে আরিশের মতো শক্তপোক্ত পুরুষও এই সপ্তদর্শীর সামনে নরম হয়ে যাচ্ছে। আসলেই পুরুষ তার ভালোবাসার মানুষটির সামনে একদম খোলা বইয়ের পাতার মতন হয়। একদম নরম,আসল। যেখানে কোনো মিথ্যা নেই।

আরিশ গলা পরিষ্কার করে বলল,,

--"চশমা পড় যে। চোখে সমস্যা?"

ইনায়া বলল,,

বিজ্ঞাপন

--"না না। আসলে মাথা ব্যথার সমস্যা তাই চশমা পড়তে হয়। চোখে একদম সলিট দেখি।"

আরিশ হাসল,,,

তার প্রিয়শী তার সাথে কত সুন্দর ভাবে কথা বলছে।

ইনায়া হঠাৎ কৌতূহল নিয়ে অনুমতি ব্যতীত জিজ্ঞেস করল,,,

আচ্ছা আব্বুর সাথে কি বড় চাচ্চুর যোগাযোগ ছিল?আর আব্বু কেন আমাদের বলেন নি। আব্বু তো সব কথা আম্মু কে বলত।

আরিশ অবাক হলো।ইনায়া এমন ভাবে কথা বলছে যেন আরিশ তার আপন কেউ,আরিশের উপর যেন তার অধিকার আছে। যেন সে যা জিজ্ঞেস করবে আরিশের বিনা অজুহাতে তার উত্তর দিতে হবে। আরিশ আবার মনে মনে আওরালো,,,

"হ্যাঁ আছেই তো। একমাত্র ইনায়ার আমার উপর অধিকার আছে

সম্পূর্ণ অধিকার।"

আরিশ নিজের চিন্তা থেকে বেরিয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দেখল ইনায়া তার দিকে প্রশ্নশুলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

আরিশ শান্ত স্বরে বলতে শুরু করল,,,,

--"সব প্রশ্নের উত্তর কি পড়ার টেবিলে বসে বই সামনে রেখেই জানবে?"

ইনায়া লজ্জা পেয়ে গেল। তারপর বই বন্ধ করে সরাসরি আরিশের দিকে তাকাল।আরিশ যেন এইটারই অপেক্ষা করছিল।

আরিশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল।

"বাবা যখন তার বিয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে এটা শুনে পালিয়ে গিয়েছিল পালানোর আগে শুধু মাত্র তোমার বাবা মানে ছোট চাচ্চুকে জানিয়ে গিয়েছিল‌। তখন বাবার কাছে বেশি টাকা ছিল না। ছোট চাচ্চু তার দুটো ব্যাংক ছিল যেখানে সে টাকা জমা তো। সেই দুটো ব্যাংক ভেঙ্গে আমার বাবাকে তার জমানো টাকা দিয়ে দিয়েছিল। সেখানে ১০০০ টাকা ছিল।আর তখন একহাজার মানে অনেক। তোমার বাবা সবসময় নিজের থেকে অনেক কথা বেশি ভেবেছে। বাবা টাকা নিতে না চাইলেও তোমার বাবা জোর করে দিয়ে দিয়েছে। তারপর আমার বাবা পালিয়ে যায় এবং তার এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে উঠে।তার সেই বন্ধুর মামা লন্ডন কাজ করত। তারপর বাবা তার বন্ধুর ধারা সেই বন্ধুর মামার কাছে অনুরোধ করিয়ে লন্ডনে কাজের জন্যে নেওয়ার জন্য বলে। তারপর কিভাবে জানি পাসপোর্ট রেডি করে উনি নিজের টাকা দিয়ে বাবাকে লন্ডনে নেয়। কিন্তু শর্ত একটাই ছিল যে বাবা কাজ করে তার টাকা তাকে ফিরত দিবে।বাবাও রাজি হয়ে যায়। তারপর চলে আসে লন্ডন। কিন্তু বাবার পড়ালেখার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল তাই প্রথম এক বছর সেই লোকটির দেওয়া কাজ ছাড়াও বাবা আরো পার্ট টাইম কাজ খুঁজে কাজ করে। যাতে সেই লোকটির টাকা তাড়াতাড়ি দিয়ে বাবা কিছু সঞ্চয় করতে পারে এবং নিজের পড়াশোনা যেন আবার শুরু করতে পারে। এবং বাবা তাই করে এক বছরের ভেতর সেই লোকটির টাকা দিয়ে দেয় এবং তার পড়াশোনা চালু করে। এবং পাশাপাশি কাজ ও করে।এর ভিতরে বাবা মাঝে মাঝে ছোট চাচ্চু কে চিঠি পাঠাতো এবং কিছু টাকা যাতে পরিবারের সাহায্য হয়। কিন্তু সেই টাকা গুলো তোমার মেজ চাচ্চু মানে ইমন খান নিজে নিয়ে নিতেন। এবং কিছু টাকা সংসারের দিয়ে বলতেন এসব তার ইনকাম। এবং বাকি টাকা নিজে সঞ্চয় করত।আর উনার সাথে ছিল তোমার ফুফি।

আর ছোট চাচ্চু কখনো কিছু বলতো না। নিজের ভাই বোনেদের ছোট হতে দিত না। আমার বাবা লন্ডনে এভাবেই কাজ করে এবং পড়ালেখা করে চালিয়ে গেছেন। তারপর তিনি কলেজ পাশ করে ইউনিভারসিটিতে উঠলেন। যখন তিনি ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়র ছিলেন তখন আমার মা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছিল স্কলারশিপ এর মাধ্যমে পড়ালেখা করতে। এবং আমার মা জুনিয়র ছিল। আমার আব্বু তখন আম্মুকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলে। তারপর সরাসরি নিজের মনের কথা বলে দেয়। আমার আম্মুও না করে না। দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে আগে তারা প্রতিষ্ঠিত হবে। এবং তারা কোন সম্পর্কে জড়াবে না এর ভেতর। আমার মা আর্থিকভাবে বাবাকে অনেক সাহায্য করে। একসময় বাবা কিছু ভালো বন্ধুদের সাথে বিজনেস শুরু করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তার কাছে কোন ক্যাশ ছিল না। এই বিষয়টি যখন তিনি ছোট চাচুর সাথে শেয়ার করেন। তখন তোমার বাবা নিজের সম্পত্তি থেকে কিছু অংশ বিক্রি করে আমার বাবাকে টাকা পাঠায়। এবং সেই টাকা দিয়েই আমার বাবা তার বিজনেস প্রতিষ্ঠিত করে। বাস্তবিক অর্থে দেখতে গেলে আমাদের এই উন্নতি শুধুমাত্র তোমার বাবার জন্য। তোমার বাবার টাকার সাহসেই আমার বাবা বাড়ি ছাড়তে পেরেছে, এবং বিজনেস এর শুরুতেও তোমার বাবার মাধ্যমেই তিনি সাহায্য পেয়েছেন। যার জন্য আজ আমরা এত প্রতিষ্ঠিত। লন্ডনে আমাদের এত নাম ডাক। আর সব কিছুই তোমার বাবার জন্য।

ইনায়া এতক্ষণ কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।তার বাবার উপর তার বরাবরই গর্ব বোধ হত। কিন্তু আজ যেন একটু বেশি হচ্ছে।

আরিশ আবার বলতে শুরু করল,,,

--"তখন বললে না যে তোমার ফুফি বলে সাইকোলজিস্টে নাকি কোন ফিউচার নেই। আমার বাবা লন্ডনের একজন ফেমাস সাইকোলজিস্ট।"

ইনায়া অবাক দৃষ্টিতে আরিশের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিশ এইবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,,

--"তাই ইনায়া নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে শিখো। নিজের জন্য লড়তে শিখ। একটু আগেও আমার বাবাকে তোমার মা বলছিল যে তুমি নাকি প্রতিবাদ করো না, কেউ কিছু বললে চুপচাপ শোন। তোমার দোষ না থাকলেও তুমি পাল্টা জবাব দাও না।কিন্তু এইটা ঠিক না ইনায়া। নিজের ভালো বুঝতে শিখ। নিজের জন্য লড়।"

ইনায়ার দৃষ্টি আরিশের চোখ থেকে সরলো না।সে আরিশের চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,,,

--"হ্যাঁ আমি লড়বো নিজের জন্য।আর চুপ থাকব না।প্রতিবাদ করব।"

আরিশ মুচকি হাসলো।

সে খুশি যে তার প্রিয়শী তার কথা শুনছে।

ইনায়া এই প্রথম আরিশ এর চেহারা ভালোভাবে দেখছে। ফর্সা গায়ের রং। বাদামি রঙের চোখ। চোখের ভ্রু খুব সুন্দর। হাসলে গালে টোল পরে। বাম পাশের একটি দাঁত গেজা। যাকে বলে একদম পারফেক্ট।

ইনায়া তারাতাড়ি নিজের দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। কিন্তু পর পুরুষের দিকে এভাবে তাকানো পাপ। তাও আবার নিজের উগান্ডা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা চাচাতো ভাই।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস