অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ১৩

🟢

আরিশ ইনায়াকে নিয়ে আস্তে আস্তে বাইকে চালিয়ে যাচ্ছে।ইনায়া তার শার্টের কলার খামচে ধরে আছে এখনো।যত যাই হোক আরিশ তার জন্য পরপুরুষ। ইসলামে পর পুরুষদের স্পর্শ করা জায়েজ নয়।

ইনায় আরিশ কে রাস্তা বলে দিচ্ছে।আরিশ সেই অনুযায়ী বাইক চালাচ্ছে।৫ মিনিটের ভিতর তারা ইনায়ার কলেজের গেটের সামনে এসে পড়ল।ইনায়া বাইক থেকে নামল।

আরিশ ইনায়ার কলেজের নাম দেখল।(মিজানুর রহমান খান ডিগ্রি মহিলা কলেজ)আরিশ আশ-পাশ পর্যবেক্ষণ করল।

আরিশ আলগস্তে ইনায়ার হেলমেট খুলে দিল।

কলেজ ছাত্রীরা যারা কলেজ যাচ্ছিল তারা ঢেব ঢেব করে আরিশের দিকে তাকিয়ে ছিল। এইটা স্বভাবিক। সুদর্শন যুবক কে দেখলে কে না তাকাবে।তাও এই শ্রীপুরের মতো শহরে। এমন সুদর্শন যুবক তো ভাঙ্গা হারিকেন নিয়ে খুঁজলেও কেউ পাবে না।

আরিশ হেলমেট খুলে দেওয়ার পর ইনায়ার ফাইল থেকে চশমা বের করে ওকে পরিয়ে দিল।

তিনতলা ভবন থেকে ইনায়া গ্ৰুপের সবাই দেখছে। অর্থাৎ ইনায়ার বান্ধবীরা।ইনায়ার বান্ধবী বলতে ইনায়া সহ ৭ জনের গ্ৰুপ।তারা হলো সায়মা, সানজিদা,দীনা,আনহা,ঊষা, সিনথিয়া,সাদিয়া।তারা উপর থেকে দেখে ইনায়া বলে জোড়ে ডেকে উঠলো।ইনায়া আর আরিশ একসাথে উপরের দিকে তাকালো।তারা তো আরিশ কে দেখে হা হয়ে গেল।ইনায়া বুঝতে পারল তার বান্ধবী দের অবস্থা এবং মনের কথা।সে হাত দিয়ে হাই দিল।

তারপর আরিশ কে বলল,,,,

--"ধন্যবাদ আপনাকে আমায় পোঁছে দেওয়ার জন্য।আর আপনার বাইক আমার খুব পছন্দ হয়েছে। বাইকটা খুব সুন্দর।"

আরিশ হাসল আর বলল...

"আর আমাকে??"

ইনায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,,,

--"কী!?"

আরিশ আবার তার কথা ফেরালো এবং বলল,,,

--"তুমি যে বললে আমার বাইক পছন্দ হয়েছে তো আমাকে পছন্দ হয় নি?"

ইনায়া বাক্য হীন হয়ে গেল। এমন ভাবে কি কেউ সরাসরি বলে। সে তো প্রথমেই কথাটা শুনেছিল। কিন্তু তারপরও না শুনার ভান করে আবার জিজ্ঞেস করে। ভেবেছিল হয়তো আরিশ কথা ঘুরিয়ে ফেলবে। কিন্তু এই লোক তো আরো সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলল।

ইনায়ার ভাবনার ছেদ ঘটে আরিশের তুড়ি বাজাতে।আরিশ ইনায়ার সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলে,,,

--"কি এত ভাবছেন মেম?"

ইনায়া বলল,,,

--"কিছু না তো।"

আরিশ বলল,,,

--"আমি কিন্তু এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি ইনু।"

ইনায়া ভাব নিয়ে বলল,,,

--"উগান্ডা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষ কে নিয়ে এত ভাবার সময় নেই আমার বুঝলেন।আসছি আমি।"

এই কথা বলে ইনায়া কলেজের গেটের দিকে এগোতে লাগলো।

আরিশ ইনায়া উত্তর পেয়ে হেসে উঠলো। হেলমেট পরা ছিল।যদি হেলমেট পরা না থাকত নিশ্চিত কলেজের অনেক মেয়ে প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খেত।

ইনায়া আবার পিছন ফিরে বলল,,,

--"এইযে শুনচ্ছেন?"

আরিশ থমকে গেল।তার পৃথিবী থমকে গেল।এত মিষ্টি কন্ঠস্বর এত মধুর ডাক। ইশ্ এই মেয়ে আমাকে মেরেই ফেলবে।

আরিশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,,,

--"জি মেডাম বলেন?"

ইনায়া বলল,,,

--"সাবধানে গাড়ি চালিয়ে যাবেন।আর যেহেতু কিছু চিনেন না এদিক সেদিক যাবেন না।যানেনই তো বাড়ির অনেকেই আপনাকে দেখতে পারে না।আর বাইক আস্তে চালাবেন। এইটা লন্ডন না।"

এই বলে সে কলেজের ভিতরে প্রবেশ করল।

আরিশ এখনো এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।আর মনে মনে বলছে,,

--"এই মেয়ে কি জানে তার এই ছোট ছোট কেয়ার, অধিকার দেখিয়ে কথা বলা, আমাকে উপেক্ষা করা এইসব এই #আরিশ_ইহতেশাম_খান কে পাগল করে দিচ্ছে। পাথরের ন্যায় শক্ত মানুষকে গলিয়ে পানি বানিয়ে দিচ্ছে। ‌আমি যে ছন্নছাড়া হয়ে বয়ে যাচ্ছি ইনু। আমাকে কবে সামলিয়ে নিবে‌। আমাকে কবে আপন করে নিবে আমি যে আর এই দূরত্ব সইতে পারছি না প্রিয়সী।"

আরিশ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর আবার বাইকে উঠে বাইক চালু করল। অথচ এখানে উপস্থিত কত মেয়ে যে এই সুদর্শন যুবকের সাথে একটা আই কন্টাক্ট চেয়েছিল তা এই যুবকের অজানা ‌আর এই যুবক জানতেও চায় না।

_________________

আরিশ এক ফার্মেসির সামনে বাইক দাঁড়া করালো। সেখান থেকে একটা বড় হট ওয়াটার বেগ এবং একটি মিনি হট ওয়াটার বেগ কিনে নিল। তারপর দোকানে গিয়ে সব ফ্লেভারের আইসক্রিম বক্স কিনে নিল। তারপর বাড়ি গিয়ে তার বোন এবং বাবা মা কে দিয়ে ইনায়ার গুলো তাল ফ্রিজে রাখল।

আরিশের ফোনে‌ একটি মেসেজ এবং একটি ভিডিও এবং একটি লোকেসন আসল।আরিশ মেসেজ এবং ভিডিও দেখে এক ডেভিড হাসি দিল তারপর লোকেসন অনুযায়ী সেই যায়গায় চলে গেল।

________________

অন্যদিকে ইনায়া কলেজে ঢুকতে না ঢুকতেই অনেক মেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল এই ছেলেটি কে।ইনায়া শুধু জবাবে বলল তার কাজিন।

আসলে ইনায়াকে বলতে গেলে কলেজের সবাই চিনে। পড়ালেখায় যেমন তেমন তার মন ও খুব ভালো। এবং দুষ্টুমি তো আছেই।

ইনায়া তিনতলা ভবনে চলে গেল। সেখানে তার বান্ধবীরা ছিল।

বিজ্ঞাপন

ইনায়া যেতেই তারা ইনায়কে চেপে ধরল।এক এক জনের এক এক কথা।

ইনায়া বলল,,,,,

---"উফ্।তোরা যা ভাবছিস তেমন কিছু না।উনি আমার কাজিন।"

দীনা বলল,,,,

--"এই একদম মিথ্যা বলবি না তোকে আমি ক্লাস ফোর থেকে চিনি। তোর সব কাজিন কে আমি চিনি।একে তো প্রথমবার দেখছি।"

ইনায়া বলল,,,

--"আরে আমি তো নিজেই চিনতাম না জানতাম না উনার বেপারে।উনি তো আমার উগান্ডা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা চাচাতো ভাই।"

সবাই হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।ইনায়ার কথায় কথায় উগান্ডা শব্দ বলার অভ্যাস।

আনহা ইনায়ার মাথা চাটা মেরে বলল,,,

--"এই ছেমরি,,, আমাদের সাথে নাটক না করে সব সুন্দর করে বল।"

ইনায় এক দীর্ঘ শ্বাস‌নিল তারপর তার বান্ধবীদের সব ঘটনা খুলে বলল।

তার বান্ধবীরা অবাক হয়ে তার কথা শুনল। তারপর সানজিদা বলল,,,

--"বোইন এইটা তো পুরা গল্পের কাহিনী। অবশ্য আজ পর্যন্ত এমন গল্প বের হয়নি।তুই এক কাজ কর তুই এই ঘটনা নিয়ে গল্প লিখ‌। দুদিনে ভাইরাল হবি‌।"

আসলে সানজিদা অনেক গল্প পড়ে তাই তার কথা এমন।

ইনায়া বলল,,,

--"তো গল্পের নায়ক নাহয় উনি কিন্তু নায়িকা কি হবে তুই?

সায়ম বলল ,,,

--"কেন তুই হবি।"

ইনায়া মুখ ভেংচি কেটে বলল,,,

--"নারে আমার এত শখ নেই। নিজের ভাইয়াকে ছাইয়া বানানো। এসব কাজিন রিলেটেড জিনিস পছন্দ না। তোর ইচ্ছা থাকলে তুই হ।

সাদিয়া বলল,,,

--"সব তো বুঝলাম কিন্তু তুই লন্ডন থেকে আসা এই হ্যান্ডসাম যুবক কে উগান্ডা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা ভাই বলছিস?বোন উগান্ডা আর লন্ডন‌ কি এক?

সবাই হাসল।

সায়মা বলল,,,,

--"তোর ওই রিফাত ভাই তোর মাথা খেয়েছে। তোকে উগান্ডার প্রিন্সেস বলার পর থেকে তুই শুধু উগান্ডা উগান্ডা করিস।"

সবাই সায় দিল সায়মার কথার।

ইনায়া কপালে হাত রেখে বলল,,,

--"এইরে আমি তো রিফাত ভাই কে এই সম্পর্কে কিছু বলিই নি। ইশ্ একদম ভুলে গিয়েছিলাম।এত ঝামেলার মধ্যে খেয়ালই ছিল না।"

সবাই হেসে উঠল।

ঊষা বলল,,

--"ইনায়া যে তোর পেটের ভাত হজম হয়েছে তে? মানে তুই তোর রিফাত ভাই কে কিছু শেয়ার করিসনি। আর তোর পেটের ভাত হজম হবে এইটা অসম্ভব।"

সবাই আবার হাসল।

(আসলে ইনায়ার রিফাত ভাই তার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের লিস্টের মধ্যে একজন পরে। এই গল্প তার চরিত্র অপরিহার্য। গল্প পড়তে পড়তে জানতে পারবেন)

সিনথিয়া বলল,,,

---"হেলমেট পরা অবস্থায় তোর চাচাতো ভাইকে অনেক হ্যান্ডসাম লেগেছে। হেলমেট খুলে কি তাকে আরো বেশি হ্যান্ডসাম লাগবে নাকি হিরো আলম?"

ইনায়া হাসল।

তারপর বলল,,,,

--"না না। হিরো আলম লাগতে যাবে কেন? উনাকে দেখতে একদম ফিকশনাল ম্যান লাগে। যে মেয়ে একবার দেখবে তার প্রেমে পড়ে যাবে। যাকে বলে একেবারে পারফেক্ট ম্যান।"

সায়মা বলল,,,

--"তার মানে আমাদের ইনায়া আপা প্রেমে পড়েছে।"

সবাই হোই হোই করে উঠলো।

ইনায়া একটু রাগ দেখিয়ে বলল,,,

--"শোন উনি হ্যান্ডসাম এবং পারফেক্ট বলেই যে আমার ওনার প্রেমে পড়তে হবে এমন কোন মানে নেই। মানুষ পারফেক্ট হয় না তাদেরকে নিজের চোখে পারফেক্ট করে নিতে হয়। অবশ্য উনার ব্যবহার অনেক ভালো। কিন্তু আমার এসব পছন্দ না। আমিতো এত গল্প পড়ি তারপরও কাজিন রিলেটেড গল্প তেমন পড়ি না। কাজিন তো কাজিনই হয়।

আর তোরা ভালো করে জানি আমি #ইনায়া_ইফরাহ_খান দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসবো না। আমার এসবে খুব ভয় করে। ভালোবাসা বলতে কিছু হয় কি না তা জানি না। আমি একটা শব্দ মেনে নিয়েছি যে আমি ভালোবাসা ডিজার্ভ করি না। আর উনার এবং আমার যায় না। এবং আমি নিজের সাধ্যকে ভালোভাবে জানি। তাই নিজের সাধ্যের বাইরে আমি যাব না। আল্লাহ আমার কপালে যা রেখেছে তাই আমি মেনে নেব। মিছে মিছে কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চাই না।"

সবাই চুপ হয়ে গেল ইনায়ার কথা শুনে।সবাই বুঝতে পারল এই কথা তুলা ঠিক হয়নি।পরীক্ষার ঘন্টা বাজাতে সবাই ক্লাস রুমে চলে গেল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস