ইনায়া পরিক্ষা দিয়ে বান্ধবীদের সাথে কথা বলতে বলতে কলেজের গেটের বাইরে আসল।দেখল আরিশ বাইকে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে ফোন টিপছে।কত মেয়ে যে তাকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে তার কোনো মাথাব্যথা নেই ।
ইনায়া তার বান্ধবীদের বিদায় নিয়ে আরিশের কাছে গিয়ে দাড়ালো।আরিশ কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে সামনে তাকাল।
ইনায়া কে দেখতে পেয়ে মুচকি হাসলো হেলমেট পরা থাকলেও ইনায়া তার চোখ দেখে বুঝতে পারল আরিশ হাসছে।
ইনায়া জিজ্ঞেস করল,,,
--"আপনি এখানে যে?"
আরিশ বলল,,,
--"ভাবলাম যেহেতু আমি পৌঁছে দিয়েছিলাম তাহলে আমিই না হয় নিয়ে যাব।"
ইনায়া মজার ছলে বলল,,,
--"আমাকে নিতে এসেছেন নাকি মহিলা কলেজের মেয়েদের দেখতে এসেছেন?"
আরিশ হেসে বলল,,
--"তুমি থাকতে অন্য মেয়েদের দেখতে যাব কেন?"
ইনায়া এক ভ্রু উঁচু করে জিজ্ঞেস করল,,,,,
--"কী বললেন?"
আরিশ একটু ঘাবড়ে বলল,,,,
--"না মানে বলছিলাম যে,তুমি থাকতে আমি কেন মেয়ে দেখব।তুমিতো আছোই মেয়ে খুঁজে দেওয়ারও জন্য।"
ইনায়া মাথা নাড়ল এবং বলল,,,
--"ও তাই বলুন।"
আরিশ কথা কাটিয়ে বলল,,,
--"পরিক্ষা কেমন দিলে ইনু?"
ইনায়া খুশি হয়ে বলল,,,
--"মনোবিজ্ঞান এবং ইংরেজি যদি আমি কিছু না পড়েও পরিক্ষা দেই তারপরো পাশ শিউর।সেই জায়গায় তো পড়ে পরিক্ষা দিছি। আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে।"
আরিশ খুশি হয়ে বলল,,,
--"যাক। তাহলে তো ভালোই।"
ইনায়া বলল,,,
--"কচু!!"
আরিশ বলল,,,
--"বাই দ্যা ওইয়ে হোয়াট ইস কচু?
ইনায়া বলল,,,,
--"আমি বারবার ভুলে যাই আপনি উগান্ডাবাসি।যাই হোক কচু ইংরেজি Taro (টারো)। কিন্তু বাঙালি রা কচু মানে বেশিরভাগ কিছু না,আই মিন নাথিং বোঝায়।"
আরিশ বলল,,,
--"কথায় কথায় উগান্ডা শব্দ বলা কি তোমার স্বভাব?"
ইনায়া বলল,,,
--"স্বভাবের কথা জানি না বাট আই লাইক ইট।"
আরিশ হাসল। তারপর বলল,,,
--"কিন্তু কচু বললে কেন?"
ইনায়া বলল,,,,
--"সেই লম্বা কাহিনী। এখন এখানে আর যাইহোক বলা সম্ভব নয়। আর তাছাড়াও সবাই ঘুরে ঘুরে আমাদের দেখছে। বিশেষ করে আপনাকে।"
আরিশ বলল,,,
--"সবাই আমাকে দেখুক অথবা না দেখুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। যাইহোক চশমা খুলেন মেডাম।"
ইনায়া চশমা খুলে ফাইলে রাখল।
আরিশ তাকে হেলমেট পরিয়ে দিল।সে নিজে বাইকে উঠলো। তারপর ইনায়া উঠলো। আগের মতই দূরত্ব।
আরিশ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,,,
--"ইনু তোমার কি পেট ব্যথা করছে?"
ইনায়া অবাক হলো।তার পেটে ব্যাথা করছে। কিন্তু আরিশ কি করে বুঝলো?
সে বলল,,,,
--"না মানে ওই একটু আকটু।"
আরিশ বুঝলো ইনায়া ইতস্তত বোধ করছে।তাই সে বিনা শব্দে বাইক চালাতে লাগল।
ইনায়া দের কলেজের সামনেই একটা মার্কেট যা নতুন market নামে পরিচিত।আরিশ তার সামনে গাড়ি থামাল। তারপর বাইক থেকে নেমে একটা দোকানে গেল।ইনায়া চুপচাপ দেখছে। তারপর তার জন্য একটি আইসক্রিম নিয়ে এল।
আরিশ আইসক্রিম ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল এবং বলল,,,
--"এই নেও খেয়ে নেও তাহলে ভালো লাগবে। চকলেট আনতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেদিন যা ভাসন দিলে এখন চকলেট আনলে বলতে --"এসবের কী প্রয়োজন ছিল। বাড়িতে তো আপনার আনা চকলেট এখনো আছে।"
ইনায়া হাসল আর আইসক্রিম টা তার হাত থেকে নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেই আরিশ বলল,,
--"এক মিনিট।"
তারপর সুন্দর করে কোণ আইসক্রিমের কাগজ খুলে দিল তারপর একটা টিস্যু দিয়ে একটুখানি অংশ পেঁচিয়ে দিল যাতে ইনায়ার হাতে আইসক্রিম গলে না লাগে।
ইনায়া অবাক হয়ে দেখছে।কেই কখনো এভাবে তার খেয়াল রাখে নি। হ্যাঁ মা বাবা ভাই রাখে। কিন্তু তারা আপন এইটা স্বাভাবিক। কিন্তু তারা ছাড়া আর কেউ এমন ভাবে তার কেয়ার করেনি। একমাত্র তার স্বপ্নে আসা অচেনা ছায়া ছাড়া।আর এখন আরিশ। তাহলে আরিশই কি,,,?
ইনায়ার ভাবনার ছেদ ঘটে আরিশের কথায়।
আরিশ বলল,,,
--"এই নেও এখন খাও তাহলে আর হাত নষ্ট হবে না।"
ইনায়া আইসক্রিম নিয়ে খেতে শুরু করল।আরিশ আবার বাইকে উঠে বাইক চালু করল। আস্তে আস্তে সে বাইক চালাচ্ছে।আর লুকিং গ্লাস দিয়ে ইনায়ার আইসক্রিম খাওয়া দেখছে।তার কাছে এইটা সবথেকে সুন্দর দৃশ্য লাগছে।
আরিশ ইনায়ার বাড়ির মেইন গেইটের সামনে গাড়ি থামাল।ইনায়া গাড়ি থেকে নেমে পরে।আরিশ ওকে ভিতরে যেতে বলল। এবং বলল সে বাইক রেখে তারপর আসছে।
ইনায়া ভিতরে চলে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাবে তখনই তার চাচা ইমন খান বললেন,,,
--"এইসব বাইরের ছেলেদের দিয়ে বিশ্বাস নেই। ওদের সাথে যেন তোকে আর না দেখি। নয়তো পা ভেঙ্গে হাতে ধরিয়ে দিব।"
ইনায়া কিছু বলল না।ভয় পায় বিষয় টা এমন না। কিন্তু বয়সে বড় বলে সম্মান করে।
আরিশ বাইক রেখে যখন বাড়িতে প্রবেশ করেছিল।সে সব শুনে তার মাথায় রাগ উঠে যায়।
সে শব্দ করে দড়জা খোলে ভিতরে ঢুকে একবার ইনায়ার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে তারপর ইমন খানের দিকে তাকায় এবং তাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে,,,,
--"আওয়াজ নিচে। আপনার সাহস কি করে হলো ইনায়ার সাথে এমনভাবে কথা বলার?ইনায়া কি আপনার টাকায় খায় নাকি চলে? বরং আপনারাই সারাজীবন ওর বাবার টাকায় চলে এসেছেন।আর এখন ওকে বলছেন আপনার কথায় চলতে।আর আরেকটা কথা,,,ওর পা কেটে ওর হাতে ধরিয়ে দিবেন? তাহলে শুনে রাখুন মি. ইমন খান, এই #আরিশ_ইহতেশাম_খান বেঁচে থাকা কালীন কেউ ইনায়ার উপর হাত তোলা তো দূরের কথা তার দিকে রাগি চোখে তাকালে তার চোখ তুলে ফেলতে আমি দ্বিতীয় বার ভাবব না।তার জন্য আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। আপনি আমার বড় তাই এইবার সম্মান দিয়ে কথা বললাম। তারমানে এই না যে আপনি বারবার পাড় পেয়ে যাবেন।"
ইমন খান কিছুটা ঘাবড়ে গেল এবং সুড়সুড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।
ইনায়া আরিশের থেকে চোখ সরাতে পারছে না।তার জন্যও এমন কেউ আছে যে প্রতিবাদ করতে পারে?তার জানামতে কেউই নেই। কিন্তু আজ আরিশ তার জানামত কে ভুল প্রমাণিত করে তার জন্য প্রতিবাদ করছে।ইনায়ার চোখে পানি চলে এসেছে।
আরিশ ইনায়ার দিকে রাগি চোখে তাকালেও এখন তার রাগ বরফে পরিণত হয়ে গড়িয়ে পরছে ইনায়ার চোখের পানি দেখে।সে তারাতাড়ি ইনায়ার কাছে আসে তারপর বলে,,,
--"এই ইনু?কি হয়েছে?ভয় পেয়েছো?আমি তো আছি তাই না।কেউ তোমাকে কিছু বলার সাহস পাবেনা বুঝলে? তোমার আরিশ তো আছে তাই না?সব সামলিয়ে নিব ইনু। তুমি শুধু প্রতিবাদি হও।আমি চাই আমার ইনু প্রতিবাদ করুক।কি পারবে না আমার জন্য প্রতিবাদি হতে?"
ইনায়া মাথা নাড়ল শুধু। কিছু বলার মতো অবস্থাতে নেই সে।সে বাক্য হীন হয়ে গেছে।এত যত্ন,এত নরম সুরে তাকে সামলানো।ইনায়ার মনে হচ্ছে তার স্বপ্ন থাকে সেই অচেনা ছায়া এসে তাকে সামলাচ্ছে।
আরিশ ইনায়া দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,,,
--"তাহলে নিজের চোখের পানি মুছে ফেল।"
ইনায়া হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলল।
আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,,
--"দেস্ট মাই গুড গাল।"
তারপর ইনায়ার মাথার উপর আলগস্তে তার হাত রেখে ইনায়াকে শান্তনা দিল। এবং উপরে যাওয়ার জন্য ইশারা করলো।
ইনায়া উপরে দিকে যেতে লাগল।আরিশ তার দিকে তাকিয়ে থাকল যতক্ষণ তাকে দেখা যায়। তার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো এবং মনে মনে বলল,,,,
--"ওহে আমার ইনু তুমি এই কঠোর দুনিয়ার জন্য খুব নরম। তোমাকে যে আরো শক্ত হতে হবে।এত ভালো থাকলে যে পদে পদে তোমাকে ঠকতে হবে, কষ্ট পেতে হবে।সবাই তোমার বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে। কিন্তু আমি তো এসে গেছি। আমি আর তোমার সাথে অন্যায় হতে দিব না।এক হাতে সব সামলাব। এবং অন্য হাতে তোমাকে সাহায্য করবো শক্ত হতে, প্রতিবাদী হতে। একদিন তুমি নিজেই নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। I swear."
তারপর আরিশ তার ফোনে ম্যাসেজ দিয়ে বলল,,,
--"পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দাও। পাখির পাখা অনেক বড় হয়ে গেছে। সেই পাখা দিয়ে আমার জিনিস আঘাত করতে চায়। এখন সেই পাখা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় হয়ে গেছে।"
মেসেজ পাঠিয়ে আরিশ এক ডেভিল হাসি দিল।