ইনায়া ঘরে আসল।তার মা জিজ্ঞেস করল তার পরিক্ষা কেমন হয়েছে সে শুধু মাথা নাড়ল।বোঝালো ভালো হয়েছে।অন্য রুমে চলে গেল। টেবিলের উপর ফাইল রাখল। বিছানায় উপর এসে বসল।তার মাথায় এখনো কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা ঘুরছে।
আরিশ আসার পর থেকে তাকে সাপোর্ট করছে। আরিশ যেভাবে বলেছিল তাকে,,,--"তোমার আরিশ তো আছে,সব সামলিয়ে নিবে।"
এসব কথা মনে পড়লে তার পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে সে আরিশের খুব কাছের কেউ, অনেক কাছের।আর আরিশের কথা যানি কেমন। খুব যত্ন সহকারে কথা বলে যেন একটু কথার ধরন বদলে গেলে ইনায়া কষ্ট পাবে।
ইনায়া মনে মনে বলছে,,,
--"এত ভাবে কেন সে আমার কথা।আমি তো তার তেমন কেউ না। এত কিসের কেয়ার।না ইনায়া তুই বেশি ভাবছিস।তোর বাবা তার বাবাকে সাহায্য করেছিল বলে এখন সে আমাদের সাহায্য করছে আর কিছু না।আর আমার স্বপ্নে আসা সেই অচেনা ছায়া শুধু আমার কল্পনা।কারণ আমি চাই আমাকে কেউ ভালোবাসুক। উপন্যাসের নায়ক রা যেমন ভালোবাসে তেমন ভালোবাসুক।তাই আমার স্বপ্নে আসে।সে অচেনা ছায়ার সাথে আরিশের কোনো সম্পর্ক নেই।"
ইনায়া নিজেকে শাসিয়ে তারপর কাপড় নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। গোসল শেষ করে বের হলে সে পাশের রুমে এক পুরুষালী কন্ঠ শুনতে পেল।তার বুঝতে দেরি হল না এইটা আরিশের কন্ঠ।সে ঘোমটা দিয়ে ওই রুমে গেল।
আরিশ কে দেখে অবাক হয়ে গেল।তার এক হাতে হট ওয়াটার বেগ। একটি বড় একটা ছোট। এবং অন্য হাতে আইসক্রিমের কয়েকটি বক্স।
শারমিন বলল,,,
--"দেখ না ইনায়া ছেলেটা কি করেছে।তোর জন্য নিয়ে এসেছে এসব।"
ইনায়া আরিশের দিকে রাগি চোখে তাকাতেই আরিশ দাঁত বের করে হাসল।
ইনায়া রাগ দেখিয়ে বলল,,,
--"উগান্ডা থেকে আসার সময় কি টাকার গাছ কেটে নিয়ে এসছিলেন এখন খালি খরচ করছেন?"
আরিশ শব্দ করে হাসল।
শারমিন বলল,,,
--"হাইরে ছেলেটা এসেছে লন্ডন থেকে আর তুই লন্ডন কে উগান্ডা বলে লন্ডনের মান ইজ্জত মেরে দিলি।সব দোষ রিফাতের তোকে উগান্ডার প্রিন্সেস বলার পর থেকে তুই শুধু উগান্ডা উগান্ডা করিস।"
আরিশের ভ্রু কুঁচকে গেল নিজে নিজে। সে মনে মনে বলল,,
--"এই রিফাত টা আবার কে। তার কথা তো কিছু জানি না। এই আবার নতুন ক্যারেক্টার কোথা থেকে আসল।আর তার ইনায়া কে প্রিন্সেস বলে।"
শারমিন আরিশ কে বলল,,,
--"বাবা ভিতরে এসে বস।আর ইনায়া এসব জিনিস ওর হাত থেকে নে। বেচারা কতক্ষন ধরে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।"
আরিশ হাতের জিনিসপত্র টেবিলের উপর রাখল। তারপর বিছানায় বসল।
ইনায়া হট ওয়াটার বেগ এক জায়গায় রাখল তারপর পলিথিন খুলে দেখল আরিশ সব ফ্লেভারের আইসক্রিমের বক্স এনেছে।
ভ্যানিলা, চকলেট, স্ট্রবেরি, বাটার স্কচ, কফি, মিন্ট চিপ। মোট কথা এখানে যত গুলো পাওয়া যায়।ইনায়া আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল,,,
--"এত টাকা খরচ করার কি দরকার ছিল আপনার।আনতেন একটা আনতেন। এতগুলো কেন?আজিব।যাই হোক ইরিন এর জন্য এনেছেন?"
আরিশ মুচকি হাসল।এই মেয়েটি তার বোনের কথাও চিন্তাও করে।আরিশ মাথা নাড়ল।বোঝালো সে এনেছে।
ইনায়া আর কিছু বলল না।জানে এই লোক কে কিছু বলে লাভ নেই।তাই সে আইসক্রিম বক্স গুলো নিয়ে পাশের রুমে চলে গেল ফ্রিজে রাখার জন্য।
আরিশ শারমিন এর সাথে কথা বলছি।ইনায়ার ফোন বিছানায় ছিল। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো।আরিশ তাকালে দেখতে পেল ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো "Personal Diary"
আরিশ অবাক হলো।ইনায়া কার নাম্বার এই নামে সেইভ করতে পারে।আরিশের মনে এক আশংকা ঢুকে গেল।
শারমিন খান ফোন হাতে নিয়ে দেখল তারপর হেসে ইনায়া কে ডেকে বলল,,,
--"এই ইনায়া তোর পার্সোনাল ডায়েরি কল করেছে।"
ইনায়া কথাটা শুনতেই ওই রুম থেকে ছুটে চলে আসে এই রুমে। তারপর তার মায়ের হাত থেকে খুশি মুখে ফোন নেয় তারাতাড়ি। তারপর ফোন ধরেই বলতে শুরু করল,,,
--"আসসালামুয়ালাইকুম।জানো তোমার কথাই ভাবছিলাম। তোমার সাথে গত দু'দিন ধরে কথা বলি না। আল্লাহ জানো কত কাহিনী হইছে? তোমার সাথে কথা শেয়ার না করলে যে আমার পেটের ভাত হজম হয় না।"
আরিশ অবাক হয়ে দেখছে।তার জানা ছিল না তার ইনায়া একসাথে এত কথা বলতে পারে।কোই তার সাথে তো বলে না। তাহলে অন্য কোনো ছেলের সাথে কেন বলবে?তাও এই ভাবে।আরিশের চোখ মুখ লাল হয়ে গেল।আর বুকে এক চিনচিনে ব্যথা শুরু হলো।ইনায়া কে হারানোর ভয়।
ইনায়া এখনো রিফাতের সাথে কথা বলছে।তার খেয়াল নেই যে কেউ তার দিকে আঘাত প্রাপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে। কারোর মনে এক আকাশ সমান ভালোবাসা এবং চোখে এক আকাশ সমান হতাশা যন্ত্রণা।
আরিশের মনে হচ্ছে তার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার নিশ্বাস আটকে আসছে। মনে হচ্ছে কলিজা ফেটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার ভালোবাসা তার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।আরিশ সহ্য করতে পারছে না।
ইনায়ার উৎসাহিত কন্ঠে আরিশের চিন্তায় ব্যঘাত ঘটে।
ইনায়া খুশি হয়ে বলছে,,,,,
--''কি!!তুমি সত্যি শ্রীপুর এসেছো? তোমার সাথে লাস্ট ঈদের আগের দিন দেখা হয়েছে।এর পর আর দেখা হয়নি।আর তোমার পদ্মজা বই আমার কাছে। তুমি আমাকে মেসেজ দিও আমি দেখা করতে বের হবো। অনেক কথা আছে।আর বইও দিতে পারব।"
আরিশের চোখ নোনা জলে ভরে গেল। মনে হচ্ছে এক্ষুনি পানি গড়িয়ে পড়বে। কলিজা তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ১৫ বছরের ভালোবাসা এক নিমিষেই শেষ।সব শেষ।এসব ভাবতে ভাবতেই আরিশের চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরল।আরিশ নিজেকে সামলিয়ে নিল। চোখের পানি মুছে ফেলল।
ইনায়া তার ফোন রেখে তার মার দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে বলল,,
--"আম্মু, রিফাত ভাইয়া এসেছে। কতদিন ধরে দেখা হয় না।"
শারমিন বলল,,,
--"যাক ভালো।দেখা করে আসিছ।"
এই কথা বলে তিনি ইনায়ার কলেজের কাপড় যা সে নিজে ধুয়ে রেখেছিল সেগুলো নিয়ে ছাদে চলে গেলেন।
আরিশ ইনায়ার দিকে তাকালো।ইনায়ার চোখ আরিশের চোখে পরতেই ইনায়া থমকে গেল। আজ আরিশের চোখ আজ অন্য রকম। সবসময় ইনায়া আরিশের চোখে তাকিয়ে তার জন্য মায়া দেখত। কিন্তু আজ আরিশের চোখে বেদনা, যন্ত্রণা। কিন্তু এইসব দেখে ইনায়ার কষ্ট হচ্ছে কেন।আর ও কি করে পড়তে পারলো আরিশের চোখ?
ইনায়ার ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে আরিশ তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,,,
--"পার্সোনাল ডায়েরি। বয়ফ্রেন্ড তাইনা। তাহলে সেদিন কেন মিথ্যা বলেছিলে ইনু?কেন?যে তোমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই?বলো? আমায় কষ্ট দিতে কি খুব ভালো লাগে?
ইনায়া অবাক হয়ে গেল।মনে মনে ভাবল সে কি করে আরিশ কে কষ্ট দিল।আর আরিশ তাকে ভুল ভাবছে।
ইনায়া আরিশের কাছে একটু এগিয়ে আসে এবং তার চোখ চোখ রেখে বলল,,,
--"আপনি যেরকম ভাবছেন তেমন কিছু না। রিফাত ভাইয়া আমার ভাইয়া। Brother from another mother. সে আমার নিজের বড় ভাইয়ের মতোন। এবং আমি তার ছোট বোনের মতোন।"
ইনায়ার একটা কথাই যেন যথেষ্ট আরিশ কে শান্ত করার জন্য।
--"সে আমার নিজের বড় ভাইয়ের মতোন। এবং আমি তার ছোট বোনের মতোন।"
আরিশের যেন জান ফিরত এলো।সে শুধু শুধু চিন্তা করছিল। এখন তো আর ইচ্ছে করছে রিফাত কে নিজেরও ভাই বানিয়ে ফেলতে। ইচ্ছে করছে রিফাত কে চুমু খেতে।কারণ সে ইনায়াকে বোন ভাবে অন্য কিছু না।
ইনায়া আরিশ এর সামনে হাত নাড়িয়ে বলল,,,
--"কি হলো?"
আরিশ পাগলের মত বলল,,
--"চুমু খাব।"
ইনায়া আকাশ থেকে পড়ল। জোরে চিৎকার করে বলল,,,
--"কী!?"
আরিশ বলল,,,,
--"তোমার রিফাত ভাই কে চুমু খাব।"
ইনায়া বলল,,
--"এই মিয়া আপনার মাথা ঠিক আছে?কি আবল তাবল বলেছেন?আর আপনি তো ওকে চিনেনই না তো চুমু খেতে যাবেন কোন দুঃখে?"
আরিশ বলল,,,
--"দুঃখে না সুখে।সে তোমার ভাই।তাই তো।এর থেকে বড় কোনো সুখ আছে?বল ইনু,,ও ইনু বলনা,,,।
ইনায়া মাথায় হাত রাখল নিজের।আর জোরে জোরে বলল,,,
--"আপনি পাগল হয়ে গেছেন। আপনি নিশ্চিত উগান্ডা পাগলা গারদ থেকে পালিয়ে এসেছেন। আমি এক্ষুনি উগান্ডার পাগলা গারদের মেইন অফিসে কল করে বলছি আপনকে এসে নিয়ে যেতে।"
আরিশের ইনায়ার কথায় হোশ ফিরল।সে বুঝতে পারল সে এতক্ষণ পাগলের মতো কথা বলছিল।কি লজ্জা। নিজের প্রিয় মানুষের সামনে নিজের প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে গেল।আরিশ নিজেকে সামলে বলল,,,,
--"ওই না মানে আসলে এই সময় তো এরকম ভাই পাওয়া যায় না। তাই একটু বেশি ইমোশনাল হয়ে এসব বলে ফেলেছিলাম। তোমার ভাই মানে তো আমার ভাই।এই আরকি।"
ইনায়া আরিশের দিকে সন্দেহ জনক চোখে তাকিয়ে রইল।