অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ১২

🟢

পিরিয়ডের ব্যাথায় ছটফট করছে ইনায়া। তখন ছাদ থেকে আরিশের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে নামার পর ইনায়া পড়তে বসে। তারপর হঠাৎ পেট ব্যথা শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো তার পিরিয়ড হয়েছে।ইনায়ার মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

তার এই পিরিয়ডের প্রথম ২ দিন খুব বাজে যায়।পেট ব্যথা তাকে কাতর করে তুলে। তারপরও সে পেইন কিলার খায় না। কারণ এই ব্যাথা সাময়িক এবং নির্ধারিত। নারী হয়ে এতটুকু যদি সহ্যই না করতে পারে তাহলে সে কিসের নারী।আর তাছাড়াও এই সাময়িক ব্যথাটা কমানোর জন্য পেইন কিলার খেলে সামনে আসতে থাকে জীবনে নানা সমস্যা দেখা দিবে।তার থেকে ভালো একটু কষ্ট করে না হয় ব্যাথা সহ্য করল।

কিন্তু বাড়িতে হট ওয়াটার ব্যাগ ও নেই যে পানি গরম করে পেটে ছ্যাক দিবে। মধ্যবিত্ত দের জন্য এইসব বিলাসীতা। তারপর ইনায়া বুদ্ধি করে পানির বোতলে গরম পানি ভরে একটি গামছা দিয়ে বোতলটা মোড়িয়ে তার পেটে ছ্যাক দেয়।আর তাকে প্রত্যেকদিন খরচ বাবদ ২০ টাকা দেওয়া হয়।আজকাল ২০ টাকা কিছুই না কিন্তু ইনায়ার জন্য অনেক।তার ভাই বলেছিল তাকে ৫০ টাকা করে নিতে কিন্তু ১ দিনে ৫০ টাকা করে নিলে এক মাসে খরচ হবে ১৫০০ টাকা।ইনায়া ভাবল যদি তার পড়ালেখা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ ছাড়াও ১৫০০ টাকা খরচ করে ফেলে তাহলে কি চলবে।তাই সে ২০ টাকা করে নেয়। এবং সে মাসের শেষে একবারে তার খরচ নেয় তাহলে সে ৬০০ টাকা পায়।সেই টাকা দিয়ে অনেক সময় সে গল্পের বই কিনে। এমনকি নিজের কলেজর গাইড ও সে বেশিরভাগ নিজের জমানো টাকা দিয়ে কিনেছে।অনেক সময় চকলেট কিনে। পিরিয়ডের সময় ডার্ক চকলেট খেলে ব্যথা টা কিছু কম লাগে। কিন্তু এইবার আরিশ পরশুদিন অনেক গুলো চকলেট দিয়েছিল যাতে করে ইনায়া কে আর নিজের টাকা দিয়ে চকলেট কিনতে হবে না ‌ইনায়া মনে মনে অনেক খুশি হল এবং আরিশকে অনেক ধন্যবাদ জানাল মনে মনে।

কিন্তু ব্যাথা তো আর উধাও হবে না। তারপর আবার আজকে তার পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কলেজে যেতে হবে। ইনায়া বিরক্ত হয়ে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর আরো কিছুক্ষণ পড়ার টেবিলে বসে থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো। তার মা তাকে গরম পানি করে বোতলে ভরে তাকে দিল।ইনায়া বোতল টি পেটের সাথে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে রইল।

______________

আরিশ তখন রেশমা খানের বাড়িতে চলে গেল।তার মন ফুরফুরে কারন সকাল সকাল তার প্রিয়সীর দেখা পেয়েছে।

রেশমা খানের ঘর থেকে তার লাগেজ নিয়ে দোতলার তার রুমে চলে গেল।দেখল সব কিছু গোছানো। কথায় আছে টাকা থাকলে সব সম্ভব। আরিশ টাকা দিয়ে লোক আনিয়ে দুইটি ফ্লাটে সুন্দর ভাবে ফার্নিচার উঠিয়েছে, পর্দা টানিয়ে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে গুছিয়ে পুরো দুটি ফ্ল্যাট পরিপাটি করে ফেলেছে।

নিজের রুমে গিয়ে শাওয়ার নিল, তারপর রান্না ঘরে চলে গেল। রান্না করার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রয়োজনীয়, খাবার ,ফ্রিজ, মাইক্রো ওভেন, রাইস কুকার,প্রেসার কুকার,ব্লেন্ডার সব ছিল সেখানে।

আরিশ রান্নাবান্নার কাজে পটু।মাস্টারশেফ লন্ডন এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল এবং সে প্রথম হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল ১৪। এটা ছোট দের মাস্টারশেফ অনুষ্ঠান ছিল। তারপর একবার মাস্টারশেফ ইতালি তেও সে অংশগ্রহণ করে জিতেছিল। তখন তার বয়স ২০।সে ছোট থেকেই যখন তার মা রান্না করত তখন দেখত তার বাবা অবসর থাকলে তার মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতো।

তার বাবা বলত রান্নার কাজে ছেলেদেরও পারদর্শী থাকা উচিত।তার মা যখন অসুস্থ থাকতো তখন তার বাবা নিজেই রান্না করত। রান্না করার জন্য মেইড থাকলেও নিজেদের খাবার নিজেরা রান্না করে খাওয়ার স্বাদ আলাদা। আর তারা বাঙালি। বাঙ্গালীদের হাতের রান্নার স্বাদ আলাদা। তখন থেকে সে রান্না দেখত এবং মাকে রান্না করার কাজের সাহায্য করত।তাই সে খুব ভালো রান্না করে। লন্ডনে‌ বেশিরভাগ নিজের খাবার নিজেই রান্না করেই খেত।তার মা বাবা বাঙালি খাবার খেতো। কিন্তু সে ডায়েট করে তাই ডায়েট রুটিন অনুযায়ী খাবার খায়।

আরিশ রান্না করে খাবার খেয়ে একদম পরিপাটি হয়ে নিজের ফ্ল্যাট থেকে বের হলো। তার পরনে সাদা শার্ট, সাদা পেন্ট। তার বেশিরভাগ কাপড় উল্ড মানি ব্র্যান্ডের।আর রোলেক্স ব্র্যান্ডের ঘড়ি । যার মূল্য ৬ হাজার ৯০০ ডলার। বাংলাদেশে আট লাখ চুয়াল্লিশ হাজার উনত্রিশ টাকা ।আরিশের জন্য এইটাকা কোনো ব্যাপার না।সে নিজের ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে তার মা-বাবার ফ্ল্যাটে গেল।মা বাবার সাথে কথা বলে ইনায়া দের বাড়িতে গেল।

বিদেশ থেকে আসার পর মন খালি তার ইনু ইনু করে।সে ভাবে কখন সে তার ইনু কে নিজের করে পাবে।আরিশ চলে ইনায়াদের ঘরের উদ্দেশ্যে।

আরিশ এসে দড়জার সামনে থেকে দেখল ইনায়া বিছানায় চোখ বন্ধ করে আধশোয়া অবস্থায় বসে ছিল এবং গরম পানির বোতল গামছায় মোড়িয়ে নিজের পেটে ধরে রেখেছে।আরিশের বুঝতে দেরি হল না ইনায়ার কি হয়েছে।সে গলা খাঁকারি দিয়ে রুমে ঢুকলো।ইনায়া কারোর শব্দ শুনে ভালোমত বসল।তার মাথার ওড়না ঠিক করল। ঘরের সামনের রুমে বসে ছিল এবং দরজা খোলা ছিল বলে সে মাথায় ঘোমটা দিয়েই বসেছিল। তারপরও এখন মাথার ঘোমটা ঠিক করল।

আরিশ এসে ইনায়ার পায়ের কাছে বসল।

ইনায়া স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করল ,,,,

--"সকালের নাস্তা করছেন?"

আরিশ হেসে বলল,,,

--"হ্যাঁ। মাত্র করেই আসলাম। তুমি?"

ইনায়া মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল। তার একটা জিনিস খুব ভালো লাগে আরিশ যখন তার সাথে কথা বলে তার মুখে সবসময় হাসি থাকে। ইনায়ারএই হাসিটা খুব ভালো লাগে।

আরিশ আগ বাড়িয়ে ইনায়াকে কিছু বলল না।যত যাই হোক ইনায়া একজন মেয়ে আর তাদের ভেতরের সম্পর্কটা একটু ভিন্ন। সে চায়না ইনায়া অস্বস্তি অনুভব কর। কিন্তু সে তো তার প্রিয়সীকে কষ্ট পেতেও দেখতে পারবে না।

আরিশ বলল,,,,

--"আজ তো তোমার পরিক্ষা তাই না?তো কখন যাবে?"

ইনায়া বলল,,,

"এখন রেডি হয়ে তারপর যাব।"

আরিশ বলল,,,

--"আমি বাহিরে অপেক্ষা করছি তুমি রেডি হয়ে আসো।"

ইনায়া বলল,,,,

বিজ্ঞাপন

--"আমার কলেজ একদম কাছে আমি একাই যেতে পারবো।"

আরিশ বলল,,,,

--"আমি তোমার কাছে জিজ্ঞেস করিনি তোমাকে বলছি। আর আমি গেলে কি কোন সমস্যা?"

ইনায়া বলল,,,

--"না না। সমস্যা হতে যাবে কেন। আপনার যদি কারেন্ট বেশি থাকে তাহলে এই রোদের ভেতর আপনি চাইলে যেতে পারেন আমার সাথে। আমার কোনো সমস্যা নেই।"

ইনায়ার এই ধরনের কথা শুনে আরিশ শব্দ করে হেসে উঠলো।

ইনায়া মুখ ভেংচি কেটে অন্য রুমে চলে গেল।

আরিশ বলল ,,,

--"আমি বাইরে গাড়ি দাড়া‌ করাচ্ছি তুমি আসো।"

ইনায়া পাশের রুম থেকে একটু জোরে গলায় বলল,,,

--"এই একদম না। আমার কলেজে হেঁটে যেতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। আর রাস্তায় অনেক জ্যাম থাকে। গাড়ি করে গেলে এক ঘন্টার আগে যেতে পারবো না। তাই গাড়ি বের করার প্রয়োজন নেই।"

আরিশ কিছু না বলে চলে গেল।

ইনায়া রেডি হয়ে তার মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পরীক্ষার ফাইল এবং ওয়াটার বোতল নিয়ে রুম থেকে বের হল।

বাড়ির মেইন দরজা খুলতেই দেখল আরিশ ভাইকে হেলান দিয়ে বসে আছে।Yamaha R1 (ইয়ামাহা আর১)বাইক কালো রঙের।

ইনায়ার খুব পছন্দ হল।ইনায়ার এমনিতে বাইক খুব পছন্দ।তার গাড়ির প্রতিও অনেক আকর্ষণ।আরিশ ইনয়ার দিকে তাকালো।

সে থমকে গেল।এই আরেক রূপ।

সাদা রঙের কলেজের জামা, পায়জামা,তার উপর এপ্রোন, এবং সুন্দর করে হিজাব পরে নিজেকে কভার করছে ইনায়া। চোখে চশমা।

ইনায়া বলল,,,

--"এভাবে কি দেখেছেন?"

আরিশ বলল,,,

--" কিছু না।চশমা টা খুলো হেলমেট পরিয়ে দেই।"

ইনায়া চশমা খুলে ফাইলে রাখল।

আরিশ খুব যত্ন সহকারে এবং সাবধানতা অবলম্বন করে ইনায়াকে হেলমেট পরিয়ে দিল। তারপর নিজেও হেলমেট পরে নিল। এইসব দৃশ্য বাড়ির অনেকেই দেখছিল এবং জ্বলছিল।

ইনায়া বাইকে পিছনের অংশটা ধরে বাইকে উঠল।আরিশ এবং তার মাঝে কিছুটা দূরত্ব।

আরিশ বলল

--"আমাকে ধরে বসো ইনু।"

ইনায়া আরিশের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরলো যাতে আরিশের গায়ে স্পর্শ না লাগে।

আরিশ মুচকি হাসলো এবং মনে মনে বলল,,,

--"আর কিছুদিনের দূরত্ব। খুব শীঘ্রই তোমাকে হালাল ভাবে নিজের করে নিব। তখন আমাদের মাঝে আর কোন দূরত্ব থাকবে না। তোমাকে নিজের সামনে বসিয়ে জাপটে ধরে বাইক দিয়ে পুরো শহর ঘুরবো।"

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস