ইনায়া এলার্ম এর শব্দে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসলো।তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। আবার সেই স্বপ্ন।সেই অচেনা ছায়া তার স্বপ্নে।সেই ফেইস লেইস মানুষ। অদৃশ্য কিছু।যে শুধু বলে,,,,,
--" আমি তো আছি ইনু, আমি সব সামলিয়ে নিব। তোমার ছোট মাথায় বেশি চাপ নিও না।"
কথা গুলো ইনায়ার খুব চেনা চেনা লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে এই কথাগুলো বলেছে।কে বলেছে?
আরিশ হ্যাঁ হ্যাঁ আরিশই তাকে গতকাল সকালে কথা গুলো বলেছিল।ইনায়া আর ভাবতে পারছে না।কিসব চিন্তা করছে আজ কাল সে।সে নিজেকে শাশালো। এই সব চিন্তা না করতে। কারণ আরিশ তো তাকে এমনি বলেছিল। এবং আরিশ তো আর তাকে ইনু ডাকে না।
তার পর ফোন হাতে নিয়ে দেখল মধ্য রাত এখন।২ টা ৩০ বাজে।সে সবসময় এই সময়ে উঠে। প্রথমে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে তারপর পড়তে বসে।সে রাত জেগে পড়তে পারে না।এশার নামাজ পড়ে তারপর সূরা মুলক পড়ে তারপর ঘুমোয়।
রাতে ঘুমানোর আগে সুরা মুলক তেলাওয়াত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত। এর অনেক ফজিলত ও উপকারিতা রয়েছে, যা ইহকাল ও পরকাল উভয় জীবনেই সুফল বয়ে আনে। কবরের আজাব থেকে মুক্তি,কিয়ামতের দিন সুপারিশ,আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা। আরো অনেক ফজিলত।
মোট কথা সে রাত ৯ টা অথবা সাড়ে ৯ টায় ঘুমিয়ে পড়ে এবং মধ্যে রাত ২ টা অথবা ২:৩০ এ উঠে।
ইনায়া বিছানা ছেড়ে উঠলো এবং ফ্রেশ হয়ে পবিত্র হয়ে ওজু করে জায়নামাজ নিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ল।নিয়ম অনুযায়ী নামাজ পড়ে নিল। তারপর মোনাজাত ধরে আল্লাহ কাছে বলতে লাগলো,,,,
--"হে আল্লাহ,এক বছর আগেও এই সময়ে নামাজ পড়ে সিজদাহতে কেঁদে কেঁদে কিছু চেয়েছিলাম কিন্তু পাই নি।তা নিয়ে কোনো আফসোস নেই। তুমি উত্তম পরিকল্পনা কারী। আমি তোমার পাপী বান্দী।জেনে না জেনে শত গুণাহ করেছি। কিন্তু তুমি সবসময় আমাকে খারাপ জিনিস থাকে দূরে রেখছো।যেই একটি জিনিস জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে চেয়েছিলাম যখন তা পাইনি তখন যতটা না কষ্ট হয়েছে, তার থেকে বেশি খুশি হয়েছিলাম যখন সেই জিনিসটি না পাওয়ার কারণ জানতে পেরেছি। তুমি সবসময় আমাকে ভালো এবং খারাপের মধ্যে পার্থক্য বুঝার ক্ষমতা এবং ধৈর্য্য ক্ষমতা দিও।"
ইনায়া মোনাজাত শেষ করে উঠলো। জায়নামাজ জায়গা মতো রাখলো তারপর চা বানিয়ে চা নিয়ে পড়ার টেবিলে বসল। পড়ার টেবিলে বসতে না বসতেই তার চোখ আরিশের হাসি ভেসে উঠলো চোখের সামনে। হাসার সময় আরিশের গালে টোল পড়া,গেজা দাঁত দেখা যাওয়া সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য।
ইনায়া মাথা নাড়ল।কিসব ভাবছে সে। মনে হতেই লজ্জিত হচ্ছে নিজের কাছে।
তারপর পড়াশোনা করল ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত। ফজরের নামাজ আদায় করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ছাদে চলে গেল।তার সকালের পরিবেশ খুব ভালো লাগে।
----------------------
অন্যদিকে আরিশ ও ফজরের নামাজ আদায় করে ছাদে উঠেছে। রেশমা খানের বাড়ি ৫ তলা এবং দোতলা পর্যন্ত রুম করা হয়েছে। বাকি গুলো খোলা।
ইনায়া দের বাড়ি দোতলা।ইনায়াও তখন তাদের ছাদে।
আরিশ তিনতলা থেকে ইনায়া দের বাড়ির দোতলা ছাদের দিকে তাকাতেই সকাল সকাল তার ঘোমটা ওয়ালি কে দেখতে পেল।
আরিশের যেন সোনায় সোহাগা। মন শুধু উরু উরু করছে। মনে হচ্ছে আজ দিন খুব ভালো যাবে।
ইনায়ার মনে হলো কেউ তার দিকে অনেকক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে আছে। তাই সে তার ফুপির বাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখল আরিশ তার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত তৃষ্ণা।ইনায়া থমকে গেল।
আরিশ আর কিছু না ভেবে সেই ছাদের দোতলা থেকে তিনতলা উঠার সিঁড়ির মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে সেইখান থেকে এক লাফে এই ছাদে এসে পড়ল।
ইনায়া অবাক হয়ে গেল।সে ভাবতে পারেনি আরিশ এমন কিছু করবে।
আসলে এই দুই বাড়ি একদম কাছাকাছি।তাই যে কেউই চাইলে আসতে পারে।
ইনায়া তারাতাড়ি আরিশের কাছে গেল।
--"এই আপনি কি পাগল? হুম!! এইরকম কাজ কেউ করে?সকাল সকাল ভিমরতীতে ধরেছে? হনুমানের মতো লাফালাফি করছেন কেন?
ইনায়া কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলল।
আরিশ মুচকি হেসে ইনায়ার কথা গুলো শুনছিল।কেউ তার দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস পায়না।আর তার থেকে গুনে গুনে ১১ বছরের ছোট মেয়ে তাকে শাসাচ্ছে।আরিশের বেশ ভালো লাগলো সকাল সকাল ইনায়ার ঝাড়ি খেয়ে।তার মাও তার বাবাকে এমন ভাবে ঝাড়ি দেয়।ইনায়াকে এখন এক ছোট্ট গৃহিণী লাগছে।
আরিশ এসব ভেবে আনমনে হেসে উঠলো।
ইনায়া অবাক হয়ে গেল।এই লোক কি পাগল হয়ে গেছে?
ইনায়া আবার বলল,,
--"এই আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? এভাবে হাসছেন কেন?"
আরিশ বলল,,,
--"কিছু না। আমি একদম ঠিক আছি।আর তখন কি বললে,,,সকাল ভিমরতীতে আর একটা জানি কি,,, হ্যাঁ হনুমান।বাই দ্যা ওইয়ে হোয়াট ইস হনুমান?
ইনায়া কপালে হাত রেখে বলল,,,
--"হায় আল্লাহ। কাকে কি বলি। নিজেই তো উগান্ডা থেকে এসেছে।আর শুনুন হনুমানের ইংরেজি Entellus (এন্টেলাস)।
আরিশের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তারপর বলল,,,
--"এই মেয়ে আমাকে কি তোমার Entellus মানে হনুমান মনে হয় হু?আর আমি লন্ডন থেকে এসেছি। উগান্ডা থেকে না মাইন্ড ইট।
ইনায়া বলল,,,
--"না,না। আপনি হনুমান হতে যাবেন কেন। আপনি তো সাদা চামড়া ওয়ালা উগান্ডা থেকে আসা হনুমান।আর লন্ডন যেই কথা উগান্ডা তো একই কথা।"
আরিশের মনে হচ্ছে সে কোনো পাগলের সাথে কথা বলছে।এই মেয়ে বলে কি? উগান্ডা আর লন্ডন এক!!!।হাউ?? লন্ডনেরে মানুষ এবং প্রেসিডেন্ট শুনলে দুঃখে পাগল হয়ে যাবে। এবং উগান্ডার মানুষ এবং প্রেসিডেন্ট শুনলে খুশিতছ পাগল হয়ে যাবে।
আরিশ বলল,,,
--"তোমার না ভবিষ্যতে সাইকোলজিস্ট হওয়ার ইচ্ছা। তুমি সাইকোলজিস্ট হওয়ার আগে নিজেকে সাইকোলজিস্ট এর কাছে দেখিও কেমন?"
ইনায়া বলল,,,
--"আপনি কি ইন্ডিরেক্টলি আমাকে বলছেন যে আমার মাথায় সমস্যা আছে?"
আরিশ বলল,,,
--"না।আমি শিউরলি এবং ডিরেক্টলি বলছি তোমার মাথায় সমস্যা আছে।"
ইনায়া রাগ দেখিয়ে বলল,,,
শুনুন!!!!
আরিশ হেসে বলল,,,
--"জী ম্যাডাম শোনান। শুধুমাত্র আপনার কথা শোনার জন্যই তো সেই ছাদ থেকে এই ছাদ লাফ দিয়ে এসেছি। ও সরি হনুমানের মত লাফ দিয়ে এসেছে।"
ইনায়া বলল,,,,
--"আপনার কথা গুলো আমার মাথার উপর দিয়ে যায়। বিরক্তিকর। উফ্।
আরিশ হাসল।তারপর বলল,,,
--" আচ্ছা আচ্ছা সরি ইনু।আমি মজা করছিলাম।"
ইনায়া থমকে গেল।ইনু!!ভারী সুন্দর লাগলো তার কাছে এই নাম।আর ইনু,,,এইটাতো সে স্বপ্নের অচেনা ছায়া তাকে ইনু বলে ডাকে। কিন্তু ইনায়ার স্বপ্নে আসা অচেনা ছায়ার সাথে আরিশের এতো মিল কি করে যায়।
ইনায়া মনে মনে বলল,,,,
আরিশ #অচেনা_ছায়া_তুমি কি আমার?? তার পর নিজের চিন্তা ভাবনা দূর করে সে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল,,,
--"ইনু??
আরিশ হেসে মাথা চুলকে বলল,,
--"নামটা ছোট এবং খুব সুন্দর।তাই ভাবলাম আমার ছোট্ট ইনায়া কে ইনু বলে ডাকব।"
ইনায়া নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। মনে মনে বলল,,
--"আমার ইনায়া। উনি কি জানেন ওনি একটু আগে কি বলল। এর শব্দটা যে অনেক ভারী।ইনায়া আর ভাবতে পারছে না।এই কিসের অনুভূতি। ইনায়া তো আর এসবে জাড়াতে চায় না।সে তো একবার আঘাত পেয়েছে।সে যে আর সহ্য করতে পারবে না।সে নিজেকে শাশালো এবং মনে মনে আউরালো না না ইনায়া তুই বেশি ভাবছিস।
ইনায়াকে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,,,
--"আপনার যা ইচ্ছা।"
আরিশ হাসল।
ইনায়া আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সকালের পরিষ্কার আকাশ দেখছে।
আর আরিশ ইনায়া কে দেখছে।ইনায়ার গোলগাল চেহারা।ফুলোফুলো গাল।ডাগর ডাগর চোখ।বড় বড় চোখের পাপড়ি।
আরিশের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার গুলুমুলু ইনুর গাল গুলো ধরে টানতে।
কিন্তু ওইযে সব চাইলেই যেসব পাওয়া যায় না। আরিশ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর ইনায়া দেখতে লাগলো কত সুন্দর ভাবে ওড়না দিয়ে মাথায় ঘোমটা দেওয়া। কপালের সামনে থাকা ছোট ছোট দু একটা চুল বাদে মাথার আর একটা চুলও দেখা যাচ্ছে না।
আরিশ মনে মনে বলল,,,
ঘোমটা ওয়ালি। আমার ঘোমটা ওয়ালি।এই আরিশ ইহতেশাম খানের সপ্তদর্শী ঘোমটা ওয়ালি।