ইনায়া চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে।
নিজের আঙুল দুটো কচলাচ্ছে—যেন কোনো অদৃশ্য অস্বস্তি বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।
তার কোলে বসে সাফি মিষ্টি দুষ্টুমিতে ইনায়ার ওড়নার কোণা টানছে, আঙুলে পেঁচিয়ে খেলছে।
অন্যদিকে, আরিশ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে…
চোখে এক অদ্ভুত টান, যা ইনায়া অনুভব না করলেও চারপাশ যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে।
আরিশের মনে হলো—এই মেয়েটা হয়তো Introvert.ভীষণই অন্তর্মুখী…
কিন্তু সে তো জানেই না—যদি ইনায়া একবার কথা বলা শুরু করে, তবে সত্যিই তাকে পাগল করে দেবে!
অবশেষে আরিশ নীরবতা ভেঙে নরম স্বরে বলল—
“তো… ইনায়া, কিসে পড় তুমি?”
সে খুব ভালো করেই জানে।
তবু এই প্রশ্ন—শুধু সাধারণ কথোপকথন শুরু করার জন্য… আর সবচেয়ে বড় কথা, তার প্রিয়শীর কণ্ঠ শোনার জন্য।
ইনায়া আস্তে করে উত্তর দিল—
“ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার-এ পড়ি। এয়ার চেঞ্জিং এক্সাম চলছে…”
আরিশ স্নিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল—
“তুমি কি খুব বেশি আনকম্ফোর্টেবল ফিল করছ?”
ইনায়ার গাল হালকা লালচে হয়ে উঠল।
সে বলল—
“আসলে… অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে একটু আনইজি ফিল হয়।”
আরিশের কণ্ঠে তখন একধরনের অসহায়তা—
“আমি কি এতটাই অপরিচিত… তোমার জন্য?”
ইনায়ার বুকের ভেতর হঠাৎ এক অজানা চাপ অনুভূত হলো।
কেন জানি না, তার নিঃশ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠল—শুধু আরিশের সেই অসহায় সুর শুনে।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—
“সম্পর্কে হয়তো আপনি আমার অনেক কাছের… কিন্তু বাস্তবিক আর লজিক্যালি দেখতে গেলে—অনেক দূরের।
আপনার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না।”
ইনায়ার কথাগুলো শুনে আরিশের ভেতরে হালকা একটা কষ্ট খেলে গেল।
কিন্তু সে জানে—এই কথাগুলো সত্যি।
সবই হয়েছে পরিস্থিতির কারণে।
ইনায়া নরম স্বরে আবার বলল—
“তাই… আমার সময় লাগবে, কথা বলার জন্য কম্ফোর্টেবল হতে।”
আরিশ মুচকি হেসে জবাব দিল—
“যতদিন সময়ের প্রয়োজন, নাও। এত বছর যেহেতু অপেক্ষা করেছি, আর না হয় কিছুদিন অপেক্ষা করলাম। তবে আগের অপেক্ষা আর এখনকার অপেক্ষার মধ্যে পার্থক্য একটাই—আগের অপেক্ষায় ছিল অনিশ্চয়তা… আর এখনকার অপেক্ষায় থাকবে নিশ্চয়তা।”
ইনায়া থমকে গেল।
সে সরাসরি আরিশের চোখের দিকে তাকাল।
দেখল, লোকটা তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে—চোখের ভেতর যেন অজস্র অপ্রকাশিত কথা।
এ চাহনি তার কাছে অদ্ভুত লাগে… কিন্তু খারাপ লাগে না।
মন চায়, এই চোখে হারিয়ে যেতে।
তারপরও ইনায়া বোঝার চেষ্টা করল—আরিশ কোন অপেক্ষার কথা বলছে?
আগে কেন সে অপেক্ষা করেছিল?
তার জন্য? কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব?
মাথায় আবার চিন্তা এল—হয়তো সে নিজ বাড়িতে ফিরে আসার অপেক্ষার কথা বলছে।
ইনায়ার ভাবনার স্রোত থামিয়ে দিল শারমিনের কণ্ঠ।
ইনায়ার মা হাতে একটি ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
ট্রেতে রুটি, আলু ভাজি আর ডাল ভুনা।
শারমিন হাসিমুখে বললেন—
“আমার সামর্থ্যের মধ্যে যতটা কুলায়, আমি তাই খেতে দিলাম তোমায়।”
আরিশ স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে উত্তর দিল—
"তুমি আমাকে ভালোবেসে খেতে দিবে—এটাই আমার জন্য অনেক।”
শারমিন মমতা ভরা হাতে আরিশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
ইনায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এতো বড় একজন মানুষ… লন্ডনে থাকে, খাবারের ধরণ নিশ্চয়ই আলাদা—তারপরও বিনা অভিযোগে, হাসিমুখে যা দেওয়া হয়েছে তাই খেয়ে নিচ্ছে!
শরীরের গঠন দেখে বোঝা যায়, সে নিয়মিত জিম করে, ডায়েট মেনে চলে।
তবু তেল-ঝাল খাবার, বিশেষ করে আলু ভাজি—যা অনেকেই এড়িয়ে যায়—সে একেবারে উপভোগ করে খেল।
ইনায়া মনে মনে খুশি হলো—কারণ তার মা কষ্ট করে রান্না করেছিল।
সে বুঝতে পারল—তার সামনে বসে থাকা মানুষটি মানুষের কষ্টের মূল্য দিতে জানে।
খাওয়া শেষে আরিশ খাবারের অঢেল প্রশংসা করল।
শারমিন সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন।
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন আরিশের মা, বাবা এবং ছোট বোন।
ইনায়া দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে সালাম করল, আর খোঁজখবর নিল।
ইমরান খান এগিয়ে এসে ইনায়াকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত রাখলেন।
তার চোখ ভিজে উঠল—
“একদম নিজের বাবার মতো হয়েছিস তুই।”ইমরান খান বললেন,,, তুই করে বলাতে রাগ করেছিস?
ইনায়া মুচকি হেসে বলল—
“না না, আপনার যা ইচ্ছে তাই বলে ডাকবেন আমাকে।”
ইমরান খান স্নেহভরে বললেন—
“তাহলে তুই আমাকে ‘বড় আব্বু’ আর ‘তুমি’ করে ডাকবি।”
ইনায়া হেসে মাথা নাড়ল—
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
তারপর আরিশের মা এগিয়ে এসে ইনায়ার থুতনি আলতো করে ধরে মুখ নিজের দিকে তুললেন—
“মাশা আল্লাহ… একদম আমার মনের মতো।”
ইনায়ার গাল হালকা লালচে হয়ে উঠল।
সে বলল—
“আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন।”
ইমরান খান ও তার স্ত্রী মুচকি হেসে বললেন—
“যদি তুমি আমাদেরকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করো, তাহলেই বসব।”
ইনায়া হাসল—
“আচ্ছা, ঠিক আছে, এখন বসো তোমরা।”
সবাই হাসিমুখে খাটে বসল।
ইনায়া তখন আরিশের বোনের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল।
তারা দুজন সমবয়সী—তাই অল্প সময়েই ভালো ভাব হয়ে গেল।
এদিকে, আরিশ বাইরে চলে গেছে—
কেন গেছে, সেটা কাউকে বলেনি।
শারমিন তখন ইমরান খান ও তার স্ত্রীর সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত।
কিছুক্ষণ পর আরিশ হাতে একটি লাগেজ নিয়ে ফিরে এলো।
তার চোখে একরাশ উচ্ছ্বাস, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
শারমিনের দিকে তাকিয়ে বলল—
“ছোট চাচ্চি… তোমাদের জন্য কিছু এনেছি।”
এ কথা বলেই সে আস্তে করে লাগেজের চেইন খুলল।
ঘরের সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে আছে লাগেজের ভেতরে।
প্রথমেই সে বের করল—শারমিনের জন্য কিছু সুন্দর ও দামি থ্রি-পিস, পরিপাটি বোরকা, নরম মখমলের জায়নামাজ এবং মুক্তোর দানা বসানো একটি তসবিহ।
সবগুলো জিনিস হাতে তুলে দিয়ে বলল—
“এই নিন চাচিমণি, এগুলো আপনার জন্য।”
শারমিন অবাক হয়ে তাকালেন—
“বাবা, এতকিছু আনার কি প্রয়োজন ছিল?”
আরিশ মুচকি হেসে উত্তর দিল—
“খুব তাড়াতাড়ি এখানে আসতে হয়েছে, তাই তেমন কিছু আনতে পারিনি।”
শারমিনের চোখে মায়াভরা দৃষ্টি—
“তুমি ভালোবেসে যা এনেছো, তাই আমার জন্য অনেক।”
আরিশ হালকা হাসল।
তারপর সে লাগেজ থেকে বের করল ইশানের জন্য উপহার।(ইশান ইনায়ার বড় ভাই)
দামী কোর্ট, স্যুট, Old Money ব্র্যান্ডের শার্ট, টি-শার্ট, গেঞ্জি, প্যান্ট… সঙ্গে CeraVe ব্র্যান্ডের ফেসওয়াশ ও ক্রিম, আর একটি প্রিমিয়াম হেয়ার সেটিং স্প্রে ও জেল।
এক এক করে সব কিছু বিছানায় সাজিয়ে রাখল।
ইনায়া অবাক হয়ে দেখছে—সবগুলো জিনিসই নিখুঁত এবং বেশ দামি।
শারমিন আবার বললেন—
“আরিশ বাবা, এত টাকা খরচ করার কি প্রয়োজন ছিল?”
আরিশ হালকা গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
“নিজের ছেলে মনে করে ‘বাবা’ বলছ… আবার টাকার হিসাব দেখিয়ে পর করে দিচ্ছ?”
শারমিন তাড়াতাড়ি বললেন—
“না… না, তা না বাবা।”
“তাহলে আর কোন কথা না বলে গ্রহণ করে নেও এগুলো।”
শারমিন হাসিমুখে মাথা নাড়লেন।
তারপর আরিশ আবার লাগেজের দিকে ফিরল।
ভেতরে এখনো কিছু জিনিস রয়েছে।
এইবার সে এক মুহূর্তের জন্য থামল…
চোখ তুলে তাকাল—ইনায়ার দিকে।
তারপর——