অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৪

🟢

বেলা এগারোটা।

নরম আলোয় ঘরের পর্দাগুলো দুলছে হালকা বাতাসে। আরিশ আস্তে আস্তে চোখ মেলে চেয়ে রইল চারপাশে। চোখেমুখে খানিক ঘুমচোখ ভাব, তবুও চারদিকে তাকিয়ে সে জায়গাটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল।

ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার—১১টা পেরিয়ে গেছে!

তাড়াতাড়ি উঠে বসল বিছানা ছেড়ে। লাগেজ ঘাঁটতে ঘাঁটতেই তার পছন্দের বাদামি রঙের Old Money ব্র্যান্ডের টি-শার্ট‌ নিল। আরিশের বাদামি রঙ অনেক পছন্দের।

তার বাদামি রঙের ২৯ টি-শার্ট আছে। এবং ১৯ টা শার্ট আছে

তার লন্ডনে রুমে রঙ বাদামি। বেশিরভাগ ঘরি বাদামি রঙের, অফিস রুম টাও সে বাদামি রঙের করেছে।

আর সাদা চেনা প্যান্ট তুলে নিল।

চুপচাপ বাথরুমে ঢুকে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো।

দাঁড়িয়ে আয়নায় একবার নিজেকে দেখল।

চুলগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে নিল, কলার সোজা করল।

সে জানে, প্রিয়শীর সামনে তাকে পরিপাটি, নিখুঁত লাগতেই হবে।সে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো যে তাকে ভালো লাগছে নাকি খারাপ। সে কখনো নিজেকে এমন ভাবে পর্যবেক্ষণ করেনি। তার ভেতর এতটুকু আত্মবিশ্বাস ছিল যে সে যথেষ্ট পরিমাণে হ্যান্ডসাম। কিন্তু কেন জানিনা আজ তার নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে।

কোনো দিকেই মন না দিয়ে, ভাবনায় মগ্ন অবস্থায় রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল।

_____________

রেশমা খানদের বাড়ি থেকে ইনায়াদের বাড়ির দূরত্ব খুব একটা নয়।

রাস্তা ঘুরেও যাওয়া যায়, আবার দু’টি বাড়ির মাঝখানে একটা ছোট গেইট আছে—

সেই গেইট দিয়েও পার হওয়া যায় সহজে।

আরিশ ঘুরে রাস্তা দিয়ে গেল।

দরজায় দাঁড়িয়ে একটুখানি থেমে গেল, তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল।

চোখটা চলে গেল উপরে—দোতলার দিকে।

তারপর এক এক করে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল,

হৃদয়ে যেন জমে থাকা অজানা উত্তেজনা নিয়ে...

___________

“ইনায়া… এই ইনায়া!”

শারমিন রান্নাঘর থেকে তার মেয়েকে ডাকছে।

ইনায়া তখন পুচুর সাথে খুনসুটি করে খেলায় মগ্ন।

পুচু, অর্থাৎ ইমন খানের মেজ ছেলের তিন বছরের ছোট্ট ছেলে।

এই দুরন্ত বয়সী বাচ্চাটা যেন ইনায়ার প্রাণ। ইনায়া বাচ্চাদের অসম্ভব ভালোবাসে, আর পুচু তার একেবারে পছন্দের তালিকার শীর্ষে।

আসলে ছোট্টটার আসল নাম সাফি। কিন্তু ইনায়া ছোটবেলা থেকেই ওকে ‘পুচু’ বলে ডাকত—আজও সে নামেই ডাকে, ওটাই যেন হৃদয়ের নাম।

মায়ের গলা শুনে ইনায়া পুচুকে কোলে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল।

“আজকে কি রান্না করব মা?” — শারমিন জানতে চাইল।

ইনায়া হেসে বলল,

“এক কাজ কর আম্মু। চেপাঁর তরকারি আর সাথে আলু ভাজি করে ফেলো।”

শারমিন ফ্রিজ থেকে চেপাঁ বের করে একটা বাটিতে রাখল।

ঠিক তখনই হুট করে পুচু ইনায়ার কোল থেকে নেমে গিয়ে বাটি থেকে দুটো চেপাঁ তুলে নিয়ে দৌড় দিল।

মা-মেয়ে দুজনেই হতবাক!

পরমুহূর্তেই তারা হেসে উঠল।

ইনায়া তখন গলার ওড়নাটা মাথায় দিয়ে ঘোমটা করল,

পুচুর পেছনে ছোটে গিয়ে চিৎকার করল,

“চোর! চোর! চেপাঁ চোর! দাঁড়া এক্ষুনি ধরতেছি তোকে!”

শারমিন হেসে হেসে শেষ! যেন পুরো বাড়িটা আনন্দে ভরে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তে...

আরিশ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল।

আর মাত্র একটা সিঁড়ি বাকি।

সেই একটুখানি দেরিতে সে এমন এক দৃশ্য দেখতে পেল যা হয়তো সারাজীবনেও ভুলতে পারবে না।

একটি ঘোমটাওয়ালি মেয়ে একটি ছোট বাচ্চার পিছনে দৌড়াচ্ছে।

চেপাঁ চোর বলে।

আরিশের পা থমকে গেল।

ইনায়া পুচুকে‌ ধরে ফেলল এবং কোলে তুলে নিয়ে আদরে আদরে বলছে,

“ওরে আমার চেপাঁ চোর, হুমম?”

পুচু খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।

আরিশ থমকে দাঁড়াল।

তার দৃষ্টি আটকে গেল সেই ঘোমটা ওয়ালির মুখে।

শ্যামবর্ণ, কোমল-মায়াবী এক মুখ।

হরিণের মতো টানা টানা চোখ, গভীর কালো চাহনি—যেন একেকটা অচেনা গল্প বলে।

ঘন ভ্রু, খাড়া নাক, পূর্ণ ঠোঁট। গোলাপি নয়, কিন্তু আরিশের চোখে যেন নিখুঁত—পরিপূর্ণ। কপালে বা পাশে,বাম চোখে ভ্রুর একটু উপরে দুইটি গর্ত দাগ। দেখে কষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে কোন এক সময় বসন্ত হয়েছিল এবং বসন্ত চলে যাওয়ার আগেই সেই স্মৃতি রেখে গিয়েছে।

ফুলের মতো নরম গাল।গুলুমুলু টাইপের।মাথা ঘোমটায় ঢাকা, তাই চুল বোঝা যাচ্ছে না ঠিকঠাক,

তবু এমন মোহময় রূপের সামনে আর কিছুই যেন দেখা যায় না।

আরিশ যেন হঠাৎ করেই নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

তার হৃদয় এক অজানা ঘোরে ঢুকে পড়ল।

এই দৃশ্য বাস্তব, নাকি স্বপ্ন—সে নিজেও নিশ্চিত নয়।

"এত মুখ দেখেছি জীবনভর, কিন্তু আজ—

আমি যেন স্বপ্নের রঙ ছুঁয়ে ফেলেছি…

তার মুখটা, তার চোখের ভাষা, তার একটুখানি হাসি—

বিজ্ঞাপন

সব মিলে আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য…!"

অন্যদিকে ইনায়া জানেই না কেউ তার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে—

ভালোবাসায় ভেজা, শুদ্ধ মুগ্ধতায় ডুবে থাকা চোখ। যে চোখ সে সব সময় দেখতে চাইতো।সে ঠিক যেমনটা কল্পনা করত, কেউ যদি একদিন এমনভাবে তার দিকে তাকাত—

আজ, কেউ সত্যিই সেভাবেই তাকিয়ে আছে।

কিন্তু সে তা বুঝতে পারছে না… এখনো না।

এই মুহূর্তেই…

পুচু, মানে সাফি, দুই হাতে চেপাঁ দুটো সামনে ছুঁড়ে দিল।

আরিশ তখনও ঘোরেই।

একটা চেপাঁ সরাসরি আরিশের গলার উপর পড়ল—

টি-শার্টের গলার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে ভিতরে চলে গেল।

অন্যটি নাকে লেগে পড়ে গেল মেঝেতে।

চেপাঁর সেই কাঁচা, টিপ টিপ গন্ধে আরিশ যেন বিদ্যুতের মতো চমকে উঠল।

ঘোর কেটে গেল।

নাক মুখ কুঁচকে চোখ বন্ধ করে বলল—

“Ewwww… what the hell is this?”

সে এক হাত দিয়ে নাক চেপে ধরল, আরেক হাতে টি-শার্ট সরিয়ে দেখে…

চেপাঁর একটি অংশ নিচে গড়িয়ে পড়ছে।

ইনায়ার যেন হঠাৎ করেই হুশ ফিরে এলো।

আরিশের কথায় সে বাস্তবতায় ফিরল—

এই কয়েক সেকেন্ডে যা কিছু ঘটল, তার সবকিছু যেন তার মাথার উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল।

সে তাকিয়ে আছে আরিশের দিকে—

আজ, অনেক কাছ থেকে।

গতকাল দেখেছিল ঠিকই, তবে দূর থেকে।

আজ প্রথমবার এমন কাছে থেকে দেখছে তাকে।

আরিশ…

যেন বাস্তবের একজন রাজপুত্র, ইনায়ার স্বপ্নের রাজকুমারের অবিকল ছায়া।

তার স্বপ্নে বহুবার দেখা অদৃশ্য এক অবয়ব আজ ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে—

নির্বাক, অভিভূত করে দেওয়া এক বাস্তবতা হয়ে।

ইনায়া নিজেকে সংযত করে গলা পরিষ্কার করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

“ভাই… ভাইয়া, আসলে এইটা… হেল না, এইটা চেপাঁ।”

তার কমল, ধীর কণ্ঠে আরিশ মুগ্ধ হতে যাচ্ছিল,

ঠিক তখনই “ভাইয়া” শব্দে মাথায় আগুন লেগে গেল।

তার গম্ভীর কণ্ঠ যেন হঠাৎই ভারী হয়ে উঠল,

“What did you just say to me???”

ইনায়া ভেবে নিল—আরিশ বিদেশ থেকে এসেছে, চেপাঁ কি জিনিস বুঝে উঠতে পারছে না হয়তো।

সে কনফিডেন্ট মুখে বলল,

“ভাইয়া, এইটা চেপাঁ। I mean… it’s a semi-fermented fish.”

আরিশ আবারও সেই “ভাইয়া” শব্দ শুনে চোখ বন্ধ করে এক গভীর হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়ল।

আরিশ মনে মনে বলল,,,

ভাইয়া…?

সে কি সত্যিই তাকে ভাইয়া বলল?

এত বড় দুঃসাহস!

আমি এখানে এসেছি তার সাইয়া হতে, আর সে কিনা আমাকে বলে ভাইয়া?!

How dare she!

আরিশ ভেতরে ভেতরে ফুটে উঠছিল।

তবে ইনায়ার নরম কণ্ঠের দোলায় আবারও একটু শান্ত হলো।

ইনায়া এবার আরও নরম স্বরে বলল,

“আসলে পুচু… মানে সাফি, দুষ্টুমি করে করেছে। ও বুঝতে পারেনি। প্লিজ… Don’t mind…”

আরিশ ইনায়ার কণ্ঠ শুনে হঠাৎ যেন ঝড় থেমে গেল তার ভেতরে।

তার মুখে এক স্বাভাবিক ভাব ফুটে উঠল।

সে শান্ত গলায় বলল,

“It’s okay.”

ইনায়া একটু মুচকি হেসে তাকাল।

আর সেই হাসি…

আরিশের হৃদয়ে যেন ঝড় তুলল।

তার মনে হলো কেউ এসে বুকের মাঝখানে এক ঝলক তীর ছুড়ে দিয়েছে।

মাথার পাশে যেন ঢোল আর বাঁশি একসাথে বেজে উঠেছে।

সে মনে মনে বলল…

“ওহে আমার প্রিয়শী…

আমার কল্পনার পাতায় আঁকা মুখ…

আমার ঘোমটা ওয়ালি…

আমি প্রতিজ্ঞা করছি—

"কখনো তোমার মুখ থেকে এই হাসি

আমি হারিয়ে যেতে দিব না।"

"এই মিষ্টি হাসি রক্ষা করার দায়িত্ব এবং কর্তব্য আমার।

"আজ থেকে তোমার জীবন সুখের রাঙিয়ে দেওয়া এবং দুঃখ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব আমার জন্য ফরজ হয়ে গেল। "

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস