অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ২

🟢

ঘুমের মধ্যে লাফ দিয়ে উঠে বসলো ইনায়া।

আবারো সেই স্বপ্ন।সেই অস্পষ্ট চেহারা।যে শুধু বলছে আমি আসছি তোমার কাছে। খুব সীগ্ৰই । তোমার সব কষ্ট,সব যন্ত্রণা আমি মুছে ফেলব আমার ভালোবাসা দিয়ে‌ আর একটু অপেক্ষা কর।আর একটু,,,,

উফ্,,,,মাথা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে।এই বলে ইনায়া নিজের মাথা চেপে ধরল।বার বার একই স্বপ্ন।একই অস্পষ্ট চেহারা,এক অচেনা ছায়া।

কেন আসো আমার স্বপ্নে #অচেনা_ছায়া_তুমি ?

সে ফোন হাতে নিয়ে দেখলো বিকাল সাড়ে চারটা বাজে। কখন যে গল্পের বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো টেড়ই পাইনি।বাইরে থেকে কেমন জানি চেঁচামেচির শব্দ আসছে।

তার মানে কি ওনারা এসে পড়েছে।

ইনায়া আর অপেক্ষা করল না। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে আসল। ওড়না দিয়ে সুন্দর করে মাথা ঢেকে নিল। আস্তে আস্তে দড়জা খুলে বাইরে বের হয়ে এল।

____________

তোমরা কোন অধিকারে এ বাড়িতে এসেছ? চলে যাও বাড়ি থেকে।

এই কথাটা আর কেউই না বরং আমার শেজ চাচা ইমন খান বলেছেন।তিনি সব নষ্টের মূল এবং সয়তানের হাড্ডি।

ইনায়া আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।তার মা সিঁড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ইনায়া চুপচাপ গিয়ে তার মায়ের পিছনে দাঁড়াল।

তার চোখদুটো একটু কৌতুহলী হয়ে উঠল—

সে মায়ের কাঁধের পাশ দিয়ে নিচের দৃশ্য দেখতে লাগল।

তার মুখটা এমনভাবে রাখা ছিল, যেন কেউ হঠাৎ তাকালে কেবল চোখ দুটোই দেখতে পাবে—

একটা শান্ত অথচ গভীর দৃষ্টিতে ডুবে থাকা চোখ।

সে নিচে দেখল কিছু অপরিচিত চেহারা ‌। তার মধ্যে একজন লোককে অনেকটা তার বাবার মত লাগছে। তাই বুঝতে দেরি হলো না যে এটা তার বড় চাচা।

________

ইমরান খান বলল: ভাই আমার,আর কত রাগ করে থাকবি? তোদের টানে ফিরে এসেছি।

ইমন খান বললেন,,,আমাদের টানে ফিরেছিছ নাকি সম্প্রতির লোভে?তখন তো খুব পালিয়ে গিয়েছিল সকল বোঝা আমাদের ঘাড়ে রেখে। এখন সম্পত্তির লোভে এসেছিস।বের হয়ে যা এক্ষুনি এই বাসা থেকে। তোদের মত বেইমানের জায়গা নেই এই বাড়িতে কোনো। নিজ থেকে বের হয়ে যা নয় তো আমি ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।

আরিশ আর সহ্য করতে পারল না তার বাবার অপমান

সে এক পা এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল:

ব্যাস‌। অনেক হয়েছে। আপনার সাহস কি করে হয় আমার বাবাকে অপমান করার? আমার বাবার যদি সম্পত্তির লোভ থাকত তাহলে অনেক আগেই চলে আসতো নিজের সম্পত্তি নিবার জন্য।

সবার চোখ এখন আরিশের দিকে।

সে থামল না—

এতদিন দূরে থেকেও আমার বাবা সব সময় আপনাদের কথা ভাবতো। তারপরও আমার বাবা এখানে আসতো না। শুধুমাত্র ছোট চাচ্চুর সাথে যোগাযোগ ছিল বাবার। তারপর হঠাৎ যখন ছোট চাচ্চুর সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বাবা প্রথম ভেবেছিল হয়তো ছোট চাচ্চুও আপনাদের মত আর বাবার সাথে যোগাযোগ রাখবেনা। কিন্তু তারপরও আমার বাবার মন মানছিল না। অনেক খোঁজখবর নিয়ে আমরা জানতে পারি যে ছোট চাচ্চু আর এই পৃথিবীতে নেই। তিনি আরো আড়াই বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। সেটা জানতে পেরে আমার বাবা ভেঙে পড়ে। এবং সমস্ত কিছু ভুলে এখানে চলে আসে। আর রইল বাকি সম্পত্তির কথা। আপনারা যেই সম্পত্তি নিয়ে গর্ব করছেন তার থেকে হাজারগুন বেশি সম্পত্তির মালিক আমার বাবা। এই সম্পত্তিতে ভাগ বসানোর কোন প্রয়োজন নেই আমার বাবার। এ আমার বাবার সাথে কথা বলার সময় সামলিয়ে কথা বলবেন।

ইনায়া—দূরে দাঁড়িয়ে—নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে সেই যুবককের দিকে। সে এতক্ষণ এই যুবককে ভালো করে লক্ষ্য করেনি। কন্ঠ শুনে তার নজর সেই সুদর্শন যুবকের দিকে গেল। এরকম সুদর্শন এবং সুন্দর যুবক সে আগে কখনো দেখেনি। সে ভাবতো এরকম শুধুমাত্র গল্পে এবং সিনেমায় সম্ভব।ইনায়া অবাক হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছে এই কন্ঠ সে আরো শুনেছে।

কিন্তু কোথায়?...তার স্বপ্নে? হ্যাঁ।।

তার স্বপ্নের সেই অচেনা ছায়ার কন্ঠের মত। কিন্তু এইটা কি করে সম্ভব।ইনায়া মাথা নেড়ে উঠলো এবং নিজের চিন্তা ভাবনা দূর করার চেষ্টা করল।

নিচে উপস্থিত সবাই নির্বাকের মতো তাকিয়ে আছে সেই যুবকের দিকে।

তখন রেশমা খান এগিয়ে এলেন।

ইনি হচ্ছেন আমার ফুফু। বিয়ের পরে মেয়েরা স্বামীর বাড়ি চলে যায় স্বামীর সাথে সংসার করে শ্বশুর বাড়িতে। কিন্তু ইনি সেই মহান ব্যক্তি যে নিজের ভাইদের টাকায় বড় হয়ে নিজের ভাইদের বাড়ির পাশে জায়গা কিনেছেন এবং সেখানে বাড়ি করে সেখানেই থাকছেন। অবশ্য ভাইদের টাকা বললে ভুল হবে‌। সমস্ত টাকা আমার আব্বুর।

রেশমা খান একজন কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষিকা।তার দুই ছেলে।তার স্বামীও একজন প্রফেসর।

রেশমা খান এগিয়ে আসলেন ইমন খান এর কাছে এবং তাকে ধরে বললেন,,,,থাক ভাইজান এইসব বেইমান এবং তাদের সন্তানের কথায় কিছু মনে করবেন না । আপনি বেশি উত্তেজিত হবেন না। আপনার তো শরীর দূর্বল। অসুস্থ আপনি।

আরিশ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,,,,

যে অন্যায় করে, অবিচার করে, অন্যের সম্পদ ভোগ করে, অন্যের হক মারে আল্লাহ কখনো তাকে মন থেকে শান্তি দেয় না।

রেশমা খান তেঁতে বলে উঠলো,,,চুপ বেয়াদব।

তার পর ইমরান খানের দিকে তাকিয়ে বলল,,,, আপনি কি আপনার সন্তান দের শিক্ষা দিতে পারেন‌নি? আপনার সামনে আমাকে অপমান করছে।

আরিশ বলল,,, আমার বাবা আমাকে যথেষ্ট ভালো শিক্ষা দিয়েছে। তার জন্যই আমি এখনো ভদ্রতা বজায় রেখেছি। নয়তো কাকে কিভাবে সামলাতে হয় এই আরিশ ইহতেশাম খান খুব ভালো করেই জানে।

ইমন খান চিল্লিয়ে উঠল এবং বলল,,, তোকে তো,,,,

ইনায়া উপর থেকে সব দেখছে। সে ভয়ে তার মার হাত চেপে ধরলো। শুধুমাত্র তার মায়ের কাঁধের পাশ দিয়ে তার দুটি চোখ বের করে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকলো।

ইমন চিৎকারে বাড়ির বাকি সদস্যরা জমা হলো।

ইমন খান এর দুই ছেলে এক মেয়ে।তার বড় ছেলের নাম রামিম খান এবং মেজ ছেলে রবি খান। ছোট মেয়ের নাম রূকসানা খান।

বিজ্ঞাপন

ইমন খানের ছেলেরা বাড়ি ছিল না।

মেজ ছেলের বউ সারিহা বের হয়ে এল এসব চিকিৎসা শুনে।

মেজ চাচা নেই তিনিও মারা গেছেন।

তার এক ছেলে এবং এক মেয়ে।

তার ছেলের নাম ইরশাদ খান এবং মেয়ের নাম রুবিনা খান।

মেজ চাচার বউ,তার ছেলে এবং ছেলের বউ বের হয়ে এল।

রেশমা খানের দুই ছেলে এলো।

রাফি ইকবাল এবং মিশকাত ইকবাল

রাফি ইকবাল এর যথেষ্ট মেচিউর এবং বুদ্ধিমান।সে সবসময় সব সমস্যা ঠান্ডা মাথায় সমাধান করে।

রাফি পরিস্থিতি বুঝে সামনে এগিয়ে এল।

তারপর ইমন খান এর উদ্দেশ্যে বলল,,,

শেজ মামা, আপনি অসুস্থ আপনি বেশি উত্তেজিত হবেন না।

যা হবার তা হয়ে গেছে।ওনি আপনার বড় ভাই। আপনি চাইলে তা অস্বীকার করতে পারবেন না। আর উনারা অনেক দূর থেকে এসেছে। এখন এসব ঝগড়া ঝামেলা রাখেন উনারা আগে রেস্ট নিক।

তার পর রাফি ইমরান খানের দিকে তাকিয়ে সালাম দিল এবং বিনয়ের সাথে বলল,,,

আপনি তো আমার মায়ের বড় ভাই তাই বড় মামা বলে ডাকি। আপনি তো জানেন আপনার ভাই বোন কে আমার থেকে বেশি,তো এই সম্পর্কে আমার মনে হচ্ছে আমার আর সাফাই গাইতে হবে না।

ইমরান খান বলল,,না রে বাবা। দিনশেষে তো ওরা আমারই আপন জন। আমার রক্ত।

তারপর

ইমরান খান নিজের পরিবারের সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন

রাফি মুচকি হাসলো তারপর বললো,,, আসুন আপনার রেস্ট নিবেন।

এতক্ষণ যাবত ইনায়া উপর থেকে সব দেখছিল।

আরিশ হঠাৎ কিছু একটা ভাবে এবং এদিক ওদিক কাউকে খুঁজে বেড়ায়।

তারপর সে দোতলার দিকে তাকায়। তার চোখ গিয়ে আটকায় দোতলার সিড়িতে একজন মহিলার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের এক জোড়া চোখে।

সেই চোখে ছিল একরাশ বিষণ্ণতা। যেন কত শত কথা চেপে রাখা এক সমুদ্র—নিস্তব্ধ অথচ উথলে ওঠা। চোখের নিচে হালকা কালি, ক্লান্তির প্রলেপ, তবুও সেই চোখ দুটো এতটাই মায়াবী যে তাতে চোখ রাখা যায় না, আবার ফেরানোও যায় না।

আরিশ যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আশেপাশের শব্দ, আলো, মানুষ—সব যেন পেছনে গিয়ে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। শুধু সামনে ভেসে রইল সেই চোখের ছায়া।

ওই চোখদুটোর মালিক নিশ্চয়ই খুব ফর্সা নয়—কিন্তু অদ্ভুত এক কোমল রং তাঁর গায়ে লেগে আছে, সেম বর্ণের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ। যেন স্নিগ্ধ বৃষ্টির মতো—চোখে পড়লে মনে শান্তি লাগে, অথচ মনে মনে কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়।

এই প্রথম চোখাচোখি। ইনায়াও এইবার সোজা, নির্ভয়ে, আরিশের চোখে তাকাল। ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। সে থমকে গেল। তার শরীর শিরশির করে উঠলো।আরিশের এই এক অদ্ভূত চাহনিতে। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরিশ ভাবল,,, তুমি... তুমিই কি তবে আমার প্রিয়সী?

আমার সপ্তদর্শী?যার জন্য আমার বেড়ে উঠা।

যার জন্য আমি প্রতিটি শ্বাসে অপেক্ষা করেছি?

যাকে না দেখেই বছরের পর বছর ভালোবেসে এসেছি?" যার জন্য এতগুলো বছর অপেক্ষা করা। তাহলে কি এখন আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ হতে‌ যাচ্ছে।

তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ইনায়র ঘোমটার কিনারায় এসে থেমে গেল।

"ওহে ঘোমটা-ওয়ালি...

তোমার শুধু এই দুটো চোখ দেখে যদি আমার নিঃশ্বাস এমন ভাবে কেঁপে উঠে,

তবে পুরো মুখ যদি দেখতাম—তবে হয়তো আমার হৃদপিণ্ড থেমেই যেত।

"আর কতকাল... আর কত প্রহর অপেক্ষা করতে হবে তোমার জন্য, প্রিয়সী?

ইনায়া যেন এক অদ্ভুত ঘোরে তলিয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ। আরিশের চোখে ধরা এক রহস্যময় অস্থিরতা যেন তাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তবে হঠাৎই নিজেকে কঠিনভাবে সংযত করে নেয় ইনায়া। একটুও পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত পা বাড়িয়ে চলে যায় রুমের দিকে।

আরিশ দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক আগের জায়গাতেই। তার চোখ শুধু ইনায়ার চলে যাওয়ার পথটুকুই খুঁজে বেড়ায়, যতক্ষণ না সে চোখের আড়ালে মিলিয়ে যায়।

তারপর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আরিশ নিঃশব্দে মনে মনে বলে উঠে,

“শুধুমাত্র তোমার জন্যই যেন আমার এই বেড়ে ওঠা…

শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত, প্রতিটি অপেক্ষা—সবকিছু যেন তোমার দিকেই নিয়ে এসেছে আমাকে।

অনেক দিয়েছো অপেক্ষার প্রতিদান, প্রিয়সী… আর নয়।

এবার তোমাকে শুধু পাওয়ার নয়,তোমাকে অনুভব করার,

তোমাকে ভালোবাসার,আর তোমাকে পুরোপুরি আমার করে নেওয়ার সময় এসেছে।

তোমার চোখে আমার আগামীটা খুঁজে পেয়েছি—এবার শুধু সেই আগামীর হাত ধরা বাকি।”

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস