অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ১৮

🟢

ইনায়া দেখল আরিশ এক ধেনে তার দিকে তাকিয়ে আছে।আরিশের তাকানো তে কোনো খারাপ ইঙ্গিত নেই। বরং একরাশ মায়া। একটি মেয়ে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় শক্তি দ্বারা বুঝতে পারে কোন ছেলে তার দিকে কি মতলবে তাকাচ্ছে। কিন্তু আরিশের তাকানো তার কাছে ভিশন ভালো লাগে।

কিন্তু ইনায়া নিজের ভালোলাগা কে বেশিক্ষণ প্রশ্রয় দিল না।আরিশের সামনে তুড়ি মেরে বলল,,,

--"আবলাকান্তার মতোন তাকিয়ে আছেন কেন?আমি কি বলছি তা কানে গেছে?"

আরিশ নিজের হোশে ফিরে এল এবং বলল,,,

--"আমি আপনার সব কথা শুনেছি। If you want, I can repeat every line, every word.(তুমি চাইলে আমি প্রত্যেক লাইন, শব্দ রিপিট করতে পারি।)"

ইনায়া অবাক হলো। এইটা তো তার সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাসের নায়কের বলা এক লাইনের মতোন হয়ে গেল।

উমেরা আহমেদ এর লেখা এক উর্দু উপন্যাস যার নাম আবে হায়াত। যেখানে সালার সিকান্দার ইমামাকে অনেকটা এমন একটি লাইন বলেছিল।

যখন ইমামা সালার সিকান্দারের সাথে সারারাত জেগে কথা বলেছিল তখন সালার সিকান্দার বলেছিল --"তুমি যদি এভাবে কথা বল আমি প্রত্যেক রাত জাগতে পারি।" আরো বলেছিল --"তুমি চাইলে তোমার বলা প্রত্যেক লাইন আমি রিপিট করতে পারি।"

(লাইন গুলো হুবুহু নাও হতে পারে যারা পড়েছেন তারা প্লিজ judge করবেন না।

)

এইসব পড়ে ইনায়া চাইতো কেউ তাকে এইভাবে বলুক।আর আজ আরিশ বলছে।এই লোক কি তার মনের সব ইচ্ছার কথা জানে নাকি। বিদেশ থেকে আসতে না আসতেই তার স্বপ্নের ফোন,সাদা রঙের গাউন, তার স্বপ্নের ব্যান্ডের হিল দিয়েছে।

এগুলো তাও মানা যায়। কিন্তু তার উপন্যাসের নায়কের মত করে কথা বলা ইনায়ার হজম হলো না।

এইবার আরিশ ইনায়ার সামনে তুড়ি বাজালো এবং বলল,,,

--"এইযে ঘোমটা ওয়ালি। কোন উগান্ডার চিন্তায় হারিয়ে যাও তুমি?"

ইনায়ার হোশ ফিরলে আরিশের কথা শুনে হেসে উঠলো।তার dialogue তাকেই।

ইনায়া বলল,,,

--"কোথাও না।যাই হোক দেখি কি উপহার এনেছেন?"

আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,

--"এই ব্যাগ থেকে একটা একটা করে বের করে দেখ।"

ইনায়া আর দেরি না করে আরিশের হাতে ব্যাগ থাকা অবস্থায় সেই ব্যাগ থেকে সবার উপরে থাকা একটি প্যাকেট বের করল।

প্যাকেট খুলে দেখতে পেল,, একটি বাদামি রঙের কটন থ্রি পিসের সেট। একদম তৈরি করা। সাথে পায়জামা এবং সুন্দর বড় ওড়না।

ইনায় নিজের হাত দিয়ে থ্রি পিসটা আলগস্তে ছুঁয়ে দিল। তার খুব পছন্দ হয়েছে এটি তার ঠোঁটের হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

তারপর আরিশের হাতে থাকা ব্যাগ থেকে আরেকটি প্যাকেট বের করল। সেটির ভেতর বাদামী রঙের চেরি কাপড়ের বড় হিজাব।ইনায়ার খুব ভালো লাগলো।

তারপর আবার সেই ব্যাগ থেকে একটা জুতার বক্স বের করল।সেই বক্স খুলে দেখল sneakers nike shoes.সেখানে লেবেলে দাম লেখা ছিল ২২০০০।দাম দেখে ইনায়া আকাশ থেকে পড়ল।

তারপর আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল,,,,,

--"মাথা ঠিক আছে আপনার?২২০০০ হাজার টাকার জুতা কে কিনে? এত টাকার আমার ৩ মাসের কেনা কাপড়, জুতার দাম সমান হবে নাকি সন্দেহ।আর আপনি এক জুতা নিয়ে এসেছেন ২২০০০ টাকার।"

আরিশ জিহ্বায় কামর দিল। তার থ্রি পিস এবং হিজাব থেকে লেবেল খুলতে মনে থাকলেও জুতার কথা খেয়াল ছিল না।সে জানে ইনায়া দাম দেখে রাগ করবে তাই লেবেল খুলে ফেলেছিল।আরিশ মনে মনে বলল,,,

--"Where there is fear of tigers, there is evening."(যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা।)

তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,,,

--"ইনু আমি তোমাকে জোর করব না। কিন্তু এই প্রথমবার তোমার কাছে কিছু আবদার করেছি। আশা করি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিবে না।"

ইনায়ার আরিশের ফেস দেখে গলে না গেলেও তার ভালোই লাগে আরিশের এইসব নাটক।সে রাগ দেখিয়ে বলল,,,

--"আপনি জীবনেও শুধরাবেন না।আপনাকে উগান্ডার জেলে বন্দী করে রাখা উচিত।"

আরিশ মনে মনে বলল,,,,

--"১৫ বছর ধরে তোমার ভালোবাসার জেলে বন্দী হয়েছি। এর থেকে বড় আর কোনো জেল নেই।"

তারপর আরিশ বলল,,,

--"হয়েছে মেডাম আমাকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা না হয় পরে করবেন আগে এগুলো ধরেন। কালকে আশা করছি এই গুলো পরবেন। I'll be waiting to see you in this dress."

এই বলে আরিশ ইনায়ার হাতে সব দিয়ে কিছু না বলে চলে যেতে লাগলো। নিচে গিয়ে আরিশ নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে গেল এবং জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল।

তারপর মনে মনে বলতে লাগলো,,

বিজ্ঞাপন

--"এই মেয়েটা এত বুদ্ধিমান একটু হলেই ধরা খেয়ে যেতাম।আর এখন সেখান থেকে চলে না আসলে আরো হাজারো প্রশ্ন করত। পরে দেখা যেত থ্রি পিস এবং হিজাবের দাম ও জিজ্ঞেস করত। এবং সবশেষে দেখা যেত একটা জিনিসও সে নিত না।"

তারপর হঠাৎ আরিশের কিছু একটা মনে পড়তে সে বলে,,

--"Oh God!How could I have made such a big mistake like a fool?

(আমি এত বড় ভুল কাজ বোকার মত কি করে করলাম?)

এই কথা বলে আরিশ আবার ছাদে যাওয়ার জন্য ফ্ল্যাট থেকে বের হল।

ইনায়া ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল।আরিশেল সব কথাবার্তা, ব্যবহার কেমন জানি অদ্ভুত। বিষয়টি এমন নয় যে তার ভালো লাগে না। কিন্তু কথায় আছে না সব ভালো লাগাকে প্রশ্রয় দিতে নেই। নয়তো নিজেকে কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়।ইনায়ার হয়েছে সেই দশা। তাই সে সব অস্বাভাবিক জিনিস গুলো স্বাভাবিক চোখে দেখার চেষ্টা করছে।

তারপর সে পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে ছাদ থেকে নামার জন্য।সিঁড়ির কাছে গিয়ে দেখতে পেল আরিশ আবার উপরে উঠছে।

ইনায়া অবাক হয়ে গেল। মনে মনে বলল,,,,

--"এই লোক আবার কেন এলো?"

আরিশ উপরে এসে ইনায়ার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিল। তারপর বলল,,,,

--"I'm extremely sorry ইনু। আমার একদমই ব্যাগের কথা খেয়াল ছিল না। আমার মনে না পড়লে তো এখন তোমাকে কষ্ট করে এগুলো নিয়ে নিচে নামতে হতো। I'm sincerely apologise for my ugly behaviour."

ইনায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আরিশের দিকে তারপর জিজ্ঞেস করল,,,,

--"আপনি কি শুধু মাত্র এই ব্যাগ নেওয়ার জন্য উপরে এসেছেন?"

আরিশ মাথা নাড়ল এবং বলল হ্যাঁ।

ইনায়া অবাক হলো। শুধুমাত্র তার ব্যাগ নিয়ে নামতে কষ্ট হবে বলে আরিশ আবার পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে এসেছে। এতোটাও কেউ ভাবতে পারে তার জন্য তা ইনায়ার জানা ছিল না।

আরিশ বলল,,,

--"এত না ভেবে আসুন মেডাম।"

ইনায়া আর কিছু না বলে চুপচাপ সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো। এবং আরিশ তার পেছনে পেছনে নামলো। নিচে নেমে ইনায়া বলল,,,

--"আমাকে দিন আমি এখন এগুলো নিয়ে বাসায় যেতে পারবো।"

আরিশ একটু নাটকিয় ভঙ্গিমায় বলল,,,

--"তুমি কি indirectly আমাকে তোমার বাসায় যেতে না করছো?"

ইনায়া মাথা নেড়ে বলল,,,

--"এই না ছিঃ ছিঃ। আমি এ কথা বলিনি। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম আর কি জিনিস গুলো আমাকে,,, যাইহোক আপনি যখন ইচ্ছে তখনই আসতে পারেন।"

আরিশ বলল

--"তাহলে চল।"

এই কথা বলে আরিশ ব্যাগ নিয়ে আবার হাঁটতে লাগলো।আরিশ রাস্তা দিয়ে ঘুরে গেল। পিছনে তাকিয়ে দেখল ইনায়া নেই।তার বুঝতে দেরি হল না যে ইনায়া ছোট গেট দিয়ে প্রবেশ করেছে।সে আর কিছু না ভেবে রাস্তা দিয়ে ঘুরে বাড়িতে প্রবেশ করল তারপরও দোতলায় যেতে লাগলো। গিয়ে দেখল ইনায়া বিছানায় বসে ঠান্ডা পানি খাচ্ছে। আরিশ ঘরের ভেতর ঢুকলো। তারপর ব্যাগ থেকে জিনিসগুলো বের করে খাটের উপর রাখল। শুধুমাত্র জুতার বক্স আলাদা রাখল।

তারপর বিছানায় বসল।

ইনায়া যে বোতলে মুখ লাগিয়ে পানি খাচ্ছিল, পানি খেয়ে বোতলটা টেবিলের উপর রাখল। তারপর আরিশ কে জিজ্ঞেস করল,,

--"আপনি ঠান্ডা পানি খাবেন?"

আরিশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।

ইনায়া বলল,,

--"আচ্ছা তাহলে আমি ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতলে নিয়ে আসছি।"

তারপর চলে গেল। ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে এসে দেখল,,,

যে বোতলে সে একটু আগে মুখ লাগিয়ে পানি খেয়েছিল আরিশ সে বোতল দিয়ে পানি খাচ্ছে।

ইনায়া সেখানে দাঁড়িয়ে গেল।তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। তারপর দুপুরের ঘটনা মনে পড়ে গেল।আরিশ দুপুরেও তার খাওয়া চামচে থাকা এঁটো আইসক্রিম খেয়েছিল।

ইনায়া আরিশের সামনে এসে কোমরের দুই হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,,,

--"এইটা কি হলো?"

আরিশের কাশি উঠে পড়ল।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস