অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ২১

🟢

আরিশ ইনায়ার দিকে তাকালো তারপর বলল,,,

--"চলুন মেম।"

ইনায়া হাসল। আরিশ তার হাসি দেখতে লাগলো।ইরিন নিজেকে কাবাবে হাড্ডি মনে করছে।তাই একটু সামনে হাঁটতে লাগলো।আর মনে মনে বলল,,,

--"সবাই সবার ভালোবাসার মানুষকে পাচ্ছে।আর আমার ভালোবাসায় মানুষটা বলদ। কিছু বুঝে না অসহ্য কর।"

ইনায়া আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল,,,

--"ধন্যবাদ।আমি তো ভেবেছিলাম আমার ইচ্ছা পুরন হবে না।"

আরিশ ইনায়ার চোখে‌ চোখ রেখে বলল,,,

#আরিশ_ইহতেশাম_খান। যতদিন বেঁচে আছে তোমার

কোন ইচ্ছা অপূর্ণ থাকতে দিবে না।"

ইনায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো।সে বেশিক্ষন আরিশের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। মনে হচ্ছে আরিশ তার চোখ দিয়েই ইনায়া কে পাগল করে তুলবে।

ইনায়া কথা ঘোরানোর জন্য বলল,,,

--"আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।"

এই বলে সে ইরিনের দিকে যেতে লাগল।

আরিশ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলল,,,,

--"আমি তো চাই তোমার সাথে সময় কাটিয়ে অন্য সব কাজে দেরি করতে। তুমি যে আমার জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।"

তারপর আরিশ তাদের দিকে এগোতে লাগলো। একটি রিকশা নিল এবং ঠিকানা বলল। তিনজন মিলে রিকশায় উঠল। রিকশায় ইনায়া এবং ইরিন একের পর এক কথা বলল। আর আরিশ নিরব শ্রোতার মতো শুনছে। তারা নদীর ঘাটে আসল। রিকশা থেকে নেমে অল্প হেটে যেতে হবে।

আরিশ এবং ইরিন চোখ বুলিয়ে চারদিক দেখছে।তারা আগে কখনো এই পরিবেশ দেখেনি তাই।ইনায়া দুই ভাই বোনের কাণ্ড দেখে মুচকি হাসলো। মনে মনে ভাবল,,,

--"ভাগ্যের কি পরিহাস। নিজের গ্রাম নিজের শহর অথচ নিজেরাই প্রথমবার দেখছে।"

আরিশ বলল,,,

--"রাস্তা গুলো লন্ডনের রাস্তার মত না। অনেক জায়গায় ভাঙ্গা গর্ত গর্ত, প্রচন্ড ধুলো, চারদিকে মানুষের হইচই। তারপরও কেন জানিনা ভালো লাগছে।"

ইনায়া হেসে বলল,,,

--"আপনারই দেশ, গ্ৰাম।"

আরিশ হাসল তারপর বলল,,,

--"চলো এখন যাওয়া যাক।"

তিনজন মিলে নদীর ঘাটে গেল। আরিশ আগে থেকেই যেখানে যাবে সেখানে নাম জেনে রেখেছিল ভালো করে।

আগে আরিশ নৌকায় উঠলো তারপর হাত বাড়িয়ে দিল।ইনায়া ইরিন কে আগে উঠতে বলল।ইরিন আগে‌ উঠলো।আরিশ এখনো হাত বাড়িয়ে রেখেছে।ইনায়া হাত ধরতে গিয়েও ধরছে না।আরিশ বিষয়টি বুঝতে পারল তাই ইরিন কে বলল তার হাত বাড়িয়ে দিতে।ইরিন হাত বাড়িয়ে দিতেই ইনায়া তার হাত ধরে নৌকায় উঠলো। তিনজন মিলে নৌকার ছাউনির ভেতর গেল। ইনায়া এবং ইরিন মাথা একটু নিচু করে খুব সহজেই ছাউনির ভেতর চলে গেল। কিন্তু আরিশ লম্বা তাই অল্প একটু মাথা নিচু করলেও সে যখন যেতে চাইলো তখন মাথায় বাড়ি খেলে। ইনায়া আর ইরিন শব্দ করে হেসে উঠলো।

ইনায়া বলল,,

--"বেশি লম্বা হলে যা হয় আরকি।"

বিজ্ঞাপন

আরিশ ভ্রু কুঁচকে ইনায়ার দিকে তাকালো কিন্তু কিছু বলল না।

ইনায়া ইরিন কে বসতে সাহায্য করল।ইরিন যেহেতু আগে উঠেনি।

আরিশ ছাউনির বাইরে দাঁড়িয়ে নদীর পরিবেশ দেখছে। হয়তো তাদের লন্ডনের নদীর মতো পরিষ্কার এবং সুন্দর নয়। কিন্তু এই নদী তো এক অন্যরকম সৌন্দর্য আছে।শীতলক্ষ্যা নদী।

আরিশ ইনায়ার দিকে তাকালো দেখলো ইরিন এর সাথে মন খুলে কথা বলছে এবং হাসছে। আরিশ বেশি কিছু না ভেবে তার ফোন বের করল এবং কয়েকটা ছবি তুলে নিল। এই প্রথম সে তার প্রিয়সীর ছবি তুলেছে। যেই ছবিটি সব থেকে বেশি সুন্দর হয়েছে সেটি ওয়ালপেপার করে রাখল। তারপর ইনায়া লক্ষ্য করার আগেই ফোন পকেটে রেখে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ালো।

এক বাদাম ওয়ালা বাদাম নিয়ে বোর্ডে উঠলো।আরিশের কেন জানি মনে হলো তার ইনায়ার নদীতে ভ্রমণ করার সময় বাদাম খেতে ভালো লাগবে। তাই বেশি কিছু না ভেবে বাদাম ওয়ালার থেকে ১০ প্যাকেট বাদাম কিনল ইনায়া আর ইরিন কে দিতে বলল।বাদাম ওয়ালা তাদের কাছে বাদাম নিয়ে গেল এবং দিল।ইনায়া আর ইরিন বুঝতে পারল এইসব আরিশের কাজ।

ইনায়া নিজের জন্য এবং ইরিনের জন্য মোট আটটি বাদামের প্যাকেটে রেখে বাকি দুটো বাদাম ওয়ালাকে দিল এবং বলল আরিশকে দুইটা প্যাকেটে দিতে।

বাদাম ওয়ালা ইনায়ার কথা মতো আরিশ কে দুই প্যাকেট দিল।আরিশ ইনায়ার দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টি দিতেই ইনায়া ইশারা দিয়ে বুঝলো এগুলো খেতে।

আরিশ মুচকি হাসল তারপর বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল দাম কত হয়েছে।

বাদাম ওয়ালা বলল,,,

--"এক প্যাকেট ১০ টাকা সুতরাং ১০ প্যাকেট ১০০ টাকা"

আরিশ বাদাম ওয়ালা কে ১০০০ টাকার নোট দিল।

বাদাম ওয়ালা বলল,,,

--"এত টাকার ভাংতি হবে না তার কাছে। সকাল থেকে কিছু বিক্রি করেনি।"

আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,

--"আমি খুশি হয়ে দিয়েছি নিয়ে নিন।"

বাদাম ওয়ালা আল্লাহর কাছে শোকর করতে করতে বোর্ড থেকে নেমে গেলে।

ইনায়া বিষয়টি দেখল এবং তার কাছে খুব ভালো লাগলো।

বোর্ড চলতে শুরু করেছে।আরিশ বাদাম খাচ্ছে এবং পরিবেশ দেখছে। আসলেই তার কাছে খুব ভালো লাগছে। চারদিকে উঁচু উঁচু ঘাট, বাড়ি,দোকান। বাচ্চারা নদীতে গোসল করছে। কেউ সাঁতার কাটছে। মাঝি নৌকা দিয়ে মাছ ধরছে। বেশ রোমান্সকর পরিবেশ।

আরিশ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,,,

--"বিয়ের পর ইনু কে নিয়ে এই পুরো নদী ঘুরবো। নৌকা ভাড়া করে নিব। শুধু আমি এবং আমার ইনু।মি. আরিশ ইহতেশাম খান এবং মিসেস ইনায়া ইফরাহ খান।"

আরিশ নিজের চিন্তা ভাবনার কথা ভেবে নিজের লজ্জা পেয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।

ইনায়া চারদিক দেখছে। কত মাস বলতে গেলে প্রায় ২ বছর পর সে নদী পার হয়ে তার দাদু বাড়ি যাচ্ছে। নয়তো ব্রিজ হবার পর থেকে তো শুধু গাড়ি দিয়ে যায়। তার বাবা থাকা কালীন তার বাবা তার শখ, ইচ্ছে পূরণ করতো।আর আজ আরিশ।ইনায়ার ভিশন ভালো লাগছে আজ আরিশ কে।এই লোকটি আসার পর থেকে তার জন্য সর্বোচ্চ করে যাচ্ছে তাও কোনো ক্রেডিট না নিয়ে।আরিশের মাঝে ইনায়া তার বাবার চরিত্র দেখতে পাচ্ছে। সে ইনায়ার খেয়াল রাখছে।ইনায়ার জন্য সবকিছু করছে।ইনায়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর আরিশের দিকে এক নজরে তাকিয়ে রইল। তারপর কি করছে সে তা মনে আসতেই নিজের দৃষ্টি ছড়িয়ে ফেলল। এখন নিজের ওপর নিজেরই রাগ উঠছে। এতক্ষণ তার চাচাতো ভাই কে সে এইভাবে তাকিয়ে দেখছিল।যদি আরিশ বুঝতে পারত। ইশ্ কি লজ্জা।

ইনায়া অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে নিল।

আরিশের মনে হচ্ছিল কেউ তার দিকে অনেকক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে আছে। সে মনে মনে দোয়া করছিল যে এই সন্দেহটা যেন সঠিক হয় এবং পিছনে তাকিয়ে যেন দেখে যে ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে আছে।

সে এক আকাশ পরিমাণ আশা নিয়ে পিছনে ফিরে দেখল ইনায়া অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।আরিশের মন খারাপ হয়ে গেল।আর সে নাকি ভাবছিল ইনায়া তাকে দেখছে।

আরিশ তাচ্ছিল্যের স্বরে নিজেকে বিদ্রুপ করে বলল,,,

--"তুই এতটাও স্পেশাল এবং লাকি না যে ইনায়া তোর দিকে তাকিয়ে থাকবে। নিজের ভালোবাসার মানুষের মনে জায়গা করে নিতে ভাগ্য লাগে। মানুষ তো অনেক কিছুই চায় কিন্তু তা পায় কয়জন। এখন যদি না পায় তাহলে আর কি করার।আর কয়জনই এমন ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে যে তার ভালোবাসার মানুষটি ও তাকে ভালবাসবে।"

আরিশের চোখের কোণে জল জমে গেল।

অথচ সে জানতোই না যে ইনায়া এতক্ষণ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল।আর ইনায়া জানতে পারল না কেউ তাকে অসম্ভব ভালবাসে। এক আকাশ পরিমাণ ভালোবাসে। Unconditional love.

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস