সবাই মিলে আনন্দ করে মুড়ি মাখা খাচ্ছে।এর মজাই আলাদা। তখন মূলত মুড়ি মাখার জন্য পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে ইনায়ার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।আর তাতেই সেই ঘটনা ঘটলো।সবাই মিলে মুড়ি মাখা খেয়ে কাজে লেগে পড়লো।
মা ,কাকি,চাচীরা রান্নার যত প্রয়োজনীয় জিনিস ডেগ পাতিল কড়াই ধুয়ে রান্না ঘরের কাছে সব গুছিয়ে রাখছিল। আর বাড়ির মেয়েরা এবং ছেলের বউরা রান্নার জন্য কোটাকুটি করছিল। শুধু ইনায়া ইরিন এবং তাদের দুই ভাতিজি বাদে।তারা ছোট সদস্য। এবং কাজ করার জন্য আরও সদস্য আছে তাই তাদের না করলেও চলবে।
ইরিন চলে গেল এক রুমে রেস্ট নিতে।আর বাড়ির ছেলেরা কেউ গেল তাদের পুকুরে মাছ ধরতে, আবার কেউ গেল কলাপাতা আনতে কারণ দুপুরে সবাই কলাপাতায় খাবার খাবে। ছোটরা বাড়ির উঠানে খেলছে। আর বয়স্ক লোক সবাই বাড়ির বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছি।
ইনায়া বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলের রাস্তার দিকে যেতে লাগল। বিষয়টি আর কেউ লক্ষ্য না করলেও আরিশের চোখ এড়াইনি কারণ তার চোখ তো শুধুমাত্র ইনায়ার দিকে থাকে।সেও ইনায়ার পিছন পিছন যেতে লাগলো।ইনায়া স্কুলের পিছন দিকের রাস্তা দিয়ে নদীর পাড়ের দিকে যেতে লাগলো যেখান দিয়ে তারা এসেছিল।
তারপর নদীর ঘাটে উঁচু যায়গায় গিয়ে ঘাসে বসে পরল। চারদিকে শীতল হাওয়া, নদীর পাড় থাকার কারণে হাওয়া একদম ঠান্ডা। দুই একটি করে নৌকা এবং লঞ্চ আসা যাওয়া করছে নদী দিয়ে। ছোট ছোট নৌকায় মাঝিরা মাছ ধরছে। নদীর পাড়ে অনেকেই এসে গরু ছাগল বেঁধে দিয়ে চলে যাচ্ছে। তেমন মানুষ নেই ।বলতে গেলে কোনো মানুষই নেই।
আরিশ গিয়ে ইনায়ার থেকে স্বাভাবিক দূরত্ব বজায় রেখে তার পাশে বসে পড়ল। ইনায়া তার পাশে বসে থাকা মানুষটির দিকে না তাকিয়ে বুঝতে পারল ব্যক্তিটি আরিশ।আজ কাল ইনায়া আরিশের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। কি করে সে উপলব্ধি করে এটি তার কাছে অজানা। কিন্তু সে নিজেকে নিরাপদ অনুভব করে আর তখনই বুঝতে পারে আরিশ তার পাশে। ঠিক যেমন এখন তার অনেকটা হালকা মনে হচ্ছিল আর সে ভেবেছিল আরিশ তার পাশে ঠিক তাই ঘটলো। তাদের দুজনের মধ্যে নিরবতা। দুজন মিলে পরিবেশের সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত।
এই নিরবতা ভেঙ্গে আরিশ বলল,,,
--"ইনুর কি মন খারাপ?"
ইনায়া আরিশের প্রশ্নের উত্তরে কিছুই বলল না।নিরব থাকলো।আরিশ ও আর কিছু বলল না।সে বুঝতে পারল ইনায়ার সময় প্রয়োজন।সে চায় ইনায়া তার কাছে নিজ থেকে সব বলে দিক।
হঠাৎ নিরবতা ভেঙ্গে ইনায়া বলল,,,
--"জানেন আমার কাছে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি হলো আমার আব্বু। বিষয়টি এমন নয় যে সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। কিন্তু হ্যাঁ কখনো তার কাছে কোনো আবদার করার আগেই সে নিজে থেকে বুঝে আমার আবদার পূরণ করতো।আমার প্রতি তার ছিল এক অটোল বিশ্বাস।আমি তেমন কোনো আবদার করতাম না যা স্বার্থের বাইরে হবে। কারণ আমি এতটুকু বুঝতে পারতাম বেশি কিছু আবদার করলে আব্বুর কষ্ট হয়ে যাবে।আমরা দিন আনতাম দিন খেতাম।হয়তো অনেক অটোল টাকা ছিল না কিন্তু সুখ ছিল, শান্তি ছিল। একটি মানুষের বেঁচে থাকতে আর কি লাগে? জানেন অনেক খুশি ছিলাম অনেক শান্তিতে ছিলাম কিন্তু কথায় আছে না সবার ভাগ্যে খুশি থাকে না আমার সাথেও তাই ঘটলো।।"
এই বলে ইনায়া থামলো তার চোখের কোণে জল জমে গেল।
আরিশ দেখল কিন্তু থামাল না।ইনায়ার হালকা হওয়া প্রয়োজন। কান্না করলে মন হালকা হয়।
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে আবার বলতে লাগলো,,,
--"তারিখ ছিল ১৭, মাস ছিল সেপ্টেম্বর,সাল ছিল ২০২২।আমি নবম শ্রেণিতে পড়তাম।সব কিছুই ঠিক ছিল। ইশান ভাইয়ার SSC পরিক্ষা চলছিল। সেদিন ভাইয়ার ইংরেজি পরিক্ষা ছিল। আব্বু নিজে ঈশান ভাইয়াকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিয়ে তারপর বাড়ি এসেছিল। সেদিন আমার এক আপু সে আমার বান্ধবীর মত, তার জন্মদিন ছিল।তার সাথে বের হয়েছিলাম আমি।তখন রাস্তায় আব্বুর সাথে দেখা হয়। তারপর ওই আপুর সাথে দুপুরের দিকে বাড়িতে ফিরত আসি। এসে দেখি আব্বু খাবার টেবিলে বসে খাচ্ছে। আমার জন্য আমার সেই বরাদ্দ মাঝখানের চেয়ার খালি ছিল। কারণ আব্বু জানত আমি সেই চেয়ারে না বসে খাই না। আমি ফ্রেশ হয়ে তারপর খাবার খেয়ে নেই। আব্বুর সাথে টুকিটাকি কথা বলি। সেদিন আবার আমার স্কুলের এক বান্ধবী আমাকে জাম্বুরা দিয়েছিল সেটি আমার ব্যাগে ছিল আম্মুকে বলছিলাম যে আমাকে বিকেলে যাতে কেটে দেয়। আব্বু দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। ঘুমিয়ে গেল।আমি নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে পড়তে বসেছিলাম।সেইদিন আমি আমার কোচিংয়ে পড়া পারেনি তাই সেই পড়া স্যারকে কথা দিয়ে এসেছিলাম যে পরে ক্লাসের ঠিকই দিব তাই জেদ ধরে পড়ছিলাম। বিকেল সাড়ে চারটায় আব্বুর ঘুম ভাঙল। আব্বু ওঠে দেখল আম্মু আমার আনা জাম্বুরা কেটে দিচ্ছি। আব্বু বলল ভালোভাবে কাটতে আব্বু বাজার থেকে এসে খাবে।
আমি মজা করে বলেছিলাম--"আব্বু আমি তোমাকে খেতে দিব না আমি একা খাব।"
আব্বু হেসে বলল,,--"তোমার দাদু বাড়ি থেকে আমিও জাম্বুরা এবং সাথে আমড়া এনেছি আমি সেগুলো খাব তোমাকে দেব না।"
তারপর দুজনেই হেসে উঠলাম। আব্বু বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজারে চলে গেল। আসরের আজান শুনে আমি নামাজে দাঁড়িয়ে পড়লাম। নামাজ পড়ে তারপর আবার পড়তে বসলাম খুব মন দিয়ে পড়ছিলাম। আব্বু বাড়িতে আসল। খুব ঘেমে ছিল। আব্বু সবসময় বাজারের ব্যাগ রান্নাঘরে রাখত কিন্তু সেদিন দরজার ঘরে রাখলো। আমি বিষয়টিকে তেমন পাত্তা দেইনি। আব্বু তারাতাড়ি এসে আগে বাথরুমে চলে গেল তারপর চোখে মুখে পানি দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। আম্মু তখন নিচে ছিল মোটর থেকে ঠান্ডা পানি আনতে গিয়েছিল। তারপর হঠাৎ আব্বুর ডাক শুনতে পেলাম --"ইনায়া,ও ইনায়া একটু এদিকে আসো।"
আমি বিরক্ত হয়ে"ছ" শব্দ করলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম আব্বু প্রতিবারের মতো এবারেও হয়তো সিগারেট খাবে তাই ম্যাচ দিতে বলছিল অথবা ফোনের কোন নাম্বার সেভ করতে বলছিল। এ ছিল আব্বুর বাজে অভ্যাস। সবসময় আমাকে পড়ার টেবিল থেকে উঠতে হতো।
আমি একটু তেজি স্বরে বললাম--"কি হয়েছে বলো তারাতাড়ি।"
কথায় আছে না নিজের আপন মানুষের সামনে নিজের মুড এর উপর ডিপেন্ড করে যেমন তেমন ব্যবহার করা যায় এবং তারা কখনো বিরক্ত হয় না। আমার আব্বুও কিছু মনে করত না কখনো আমার তেজি কন্ঠে। ততক্ষণে আম্মুও এসে পড়েছিল। আম্মু ছিল রান্না ঘরে।
আব্বু আস্তে আস্তে বলল,,,
--"আমার খুব খারাপ লাগছে তোমার আম্মু কে বলো আমার মাথায় যেন একটু পানি দেয়।"
আমি এই কথা শুনে তাড়াতাড়ি আম্মুকে গিয়ে বললাম এবং আম্মু রান্না ঘর থেকে সব কাজ ছেড়ে তাড়াতাড়ি আব্বুর কাছে চলে আসলো।এসে দেখল আব্বু একদম ঘেমে আছে। শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে। আম্মু আতংকে ওঠল। তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে বালতি এবং পানি আনলো। আমি আব্বুকে সোজা করে সুয়ালাম তাতে মাথায় পানি দিতে সুবিধা হয়। তারপর আম্মু বলল আমার চাচি ফুপুদের ডেকে আনতে।আমি সবাই কে ডেকে আনলাম।সবাই মিলে আব্বু কে সেবা করছে। আমি আব্বুর মাথা টিপে দিচ্ছিলাম আমার এক চাচি হাত মালিশ করছিল এবং ভাবীরা আব্বুর পা মালিশ করছিল। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হলো না শরীর হাত-পা একদম ঠান্ডা ছিল। আম্মু প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিল। আমিও অনেক ভয় পাচ্ছিলাম কিন্তু প্রকাশ করলাম না। তারপর আমার চাচাতো ভাইয়া ফুফাতো ভাইয়ারা মিলে আব্বুকে হসপিটালে নিয়ে গেল। তখন মাগরিব হয়ে গিয়েছিল।আমি দেড়ি না করে নামাজটা পড়ে নিলাম। সেদিন মোনাজাতে অনেক কাঁদলাম দোয়া করলাম যাতে আব্বুর কোন ক্ষতি না হয়। সবাই মিলে এশার নামাজের কিছুক্ষণ আগে আব্বুকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসে। বিছানায় শুইয়ে দেয়। আব্বুকে একদম ভাঙ্গা ভাঙ্গা লাগছে। মনে হচ্ছে কতদিন যাবত যেন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। হাসপাতালে যাওয়ার পর যখন চেকআপ করানো হলো তখন দেখা দিয়েছে আব্বু যখন বাজারে ছিল তখন তিনি একবার হার্ট অ্যাটাক করেছিল ছোটখাটো। এখন উনাকে ভালো হসপিটালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু আব্বু বারবার না করছিল। আব্বুর মাথায় একটা চিন্তায় ছিল যে এখন যদি হাসপাতালে যেতে হয় তাহলে অনেক টাকা খরচ হবে। আব্বু এই অবস্থাতেও আমাদের কথা ভাবছিল। তারপর সবাই আসল আব্বু কে দেখতে। আমার নানু মামা সবাই আসলো। আম্মু তখনও কিছু খায় নি।সবাই আব্বুকে জিজ্ঞেস করছে যে শরীর কি খুব খারাপ লাগছে হাসপাতালে নিবে এখনই? আব্বু বলছে না না।শারমিন এখনো কিছু খায় নি। ওকে কিছু খেতে বল। আব্বু সেই মুহূর্তেও আম্মুর খাওয়া নিয়ে ভাবছিল। সবাই মিলে আম্মুকে নিচে নিয়ে গেল তারপর সেখানে খেলো। আমি বসে বসে আব্বুর মাথা টিপে দিচ্ছিলাম।আম্মুর খাওয়া শেষ হলে তারপর আব্বু বলল যে তার অনেক খারাপ লাগছে সে হাসপাতালে যেতে চায়। এত পরে বলার কারণ সে জানে যদি তখন বলত তাহলে আম্মু না খেয়ে আব্বুকে নিয়ে হাসপাতালে যেত। তাই আম্মুর খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। আব্বু যখন হাসপাতালে যেতে রাজি হলেও তখন তাড়াতাড়ি করে প্রাইভেট কার বুক করে আব্বুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। রাত ১১ টার দিকে আব্বুকে গাড়িতে উঠানো হল। আব্বুকে ঢাকা হৃদরোগ হাসপাতালে নিবে। সেখানে আগে থেকেই রাফি ভাইয়া সব ঠিক করে রেখেছিল। আব্বু যখন গাড়িতে উঠছিল গাড়ি ছাড়ার আগে আমার কেন যেন খুব ভয় করছিল আমি কান্না করে দিয়েছিলাম। যখন আমি কান্না করা শুরু করেছিলাম আমার কান্না দেখে আম্মু ভাইয়া কান্না করা শুরু করেছিল। তারপর বুঝতে পারলাম যে আমার শক্ত থাকতে হবে। তাই কান্না না করে রুমে চলে এসেছিলাম। সেদিন আমার সাথে নানু ছিল রাতে।আমি তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কারণ নিয়ত করেছিলাম মাঝরাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে তারপর আব্বুর সুস্থতার জন্য মানত রোজা রাখবো। কিন্তু জানেন কেন জানি না সেইদিন উঠতে পারলাম না।"
এই বলে ইনায়া আবার থেমে গেল।সে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আরিশেরও চোখের কোণে জল জমে গেল।ইনায়া কিছুক্ষণ শব্দহীন কান্না করে তারপর আবার আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলো,,,
--"১৮ তারিখ, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ভাবি এসে আমাকে জাগালো। আমাকে কিছু বলল না রান্না করে চলে গেল সেখানে আমার চাচি ছিল আমাদের জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করছিল। সেদিন আমার ভাইয়ার পরীক্ষা ছিল না বন্ধ ছিল।ভাবি গিয়ে চাচিকে কিছু বলতেই চাচি শব্দ করে কেঁদে উঠলো। আমি বুঝতে পারবা না বিষয়টি এমন না কিন্তু মন মেনে নিতে চাচ্ছিল না।আমার ভাইয়া বার বার জিজ্ঞেস করছিল কেন কাঁদছে কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। আমি কাঁদলাম না। তারপর আমার চাচাতো ভাই এসে আমার ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। সকাল সকাল এত জোরে জোরে বাড়ির মানুষের কান্না শুনে আশেপাশে বাড়ির মানুষ জানলা দিয়ে দেখতে লাগলো। আমাকে ভাবি এসে জড়িয়ে ধরল।সেও কাঁদছে। কিন্তু কেউ মুখ দিয়ে বলল না যে আমার আব্বু আর বেঁচে নেই। মানতে খুব কষ্ট হচ্ছিল খুব খুব। ভাইয়া অনেক কাদলো। ভাইয়ার কান্না দেখে যে কোন মানুষ বুঝতে পারবে যে ছেলেটির বাবা মারা গিয়েছে। কিন্তু আমি? কাঁদলাম না। শক্ত থাকলাম। চুপচাপ বসে রইলাম।সবাই ভাইয়াকে সান্ত্বনা দিচ্ছে আর আমি? নিশ্চুপ।মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয়নি সব ঠিক আছে। আজকেই আব্বু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসবে। সবাই আমাকে গোসল করতে পাঠালো কারণ এখানে আসতে হবে। আব্বুর লাশ এখানে নিয়ে আসা হবে। এর ভেতর আমি তেমন কাঁদিনি। বলতে গেলে কাঁদিনিই। যদি কেউ এসে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে তাহলে কয়েক ফোঁটা পানি চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে। গোসল করে রেডি হয়ে নিলাম। রিকশা রিজার্ভ করা হয়েছিল এখানে আসার জন্য। আমাদের বাড়ি থেকে এখানে আসা পর্যন্ত পুরোটুকু রাস্তায় শুধুমাত্র আমি একটা দোয়া করেছি যে আমি যাতে আমার আব্বুকে সুস্থ দেখি। আমি মানতেই পারছিলাম না যে আব্বু আর,,,আমি বিশ্বাস করি নি।আমি পুরো রাস্তা শুধু আব্বুকে সুস্থ দেখার দোয়া করে গিয়েছি। কারণ আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব। হয়তো এটাও সম্ভব হয়ে যেত। আমি একটু কাঁদিনি রাস্তায়। কিন্তু যখন আমাদের গাড়ি একটি অনাথ আশ্রমের সামনে দিয়ে গেল তখন আমার বুক মুচরে উঠলো।আমি আমিও তো এখন অনাথ। সাথে সাথে চোখ থেকে অনবরত পানি পড়তে লাগলো। আমি চাইলেও আর শক্ত থাকতে পারলাম না। এইখানে আসার পর চারদিকে শুধু মানুষ কাঁদছে।আমি চুপচাপ রুমে বসে রইলাম আর আমি একটা দোয়াই করে যাচ্ছিলাম অনবরত যে আমি যেন আমার আব্বুকে সুস্থ দেখি। বিকেলে অ্যাম্বুলেন্স আসলো আমি দৌড়ে গেলাম। মনে মনে দোয়া করলাম যেন আব্বুকে সুস্থ দেখি।আমি মনে বললাম এখন অ্যাম্বুলেন্স খুলে দেখবো আব্বু হাসিমুখে শুয়ে আছে। কিন্তু আল্লাহ হয়তো সেদিন আমার কথা রাখেননি। হয়তো আমার দোয়ায় কোন কমতি ছিল। অ্যাম্বুলেন্স এর দরজা খুলে দেখলাম ,,,,,,
ইনায়া আর বলতে পারল না কেঁদে উঠলো। খুব কাদছে সে। খুব।
তারপর কান্না করতে করতে বলল,,,
--"কেউ বলতে পারবে না যে ইনায়া তার নিজের বাবার মৃত্যুতে এক ঘন্টা অন্তত কেঁদেছে। আমার মনে হয় ওই সারাদিনের হিসাব করলেও এক ঘন্টা কেঁদেছি কিনা। আমি কেমন পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। বারবার ভাবছি যদি আমি কাঁদি তাহলে আমার আম্মু এবং ভাইয়া আরো ভেঙে পড়বে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। রাফি ভাইয়া এসে আমাকে জরিয়ে ধরেছিল।আমি তখন তার সংস্পর্শে এসে কিছুটা কেঁদেছিলাম।আমি বারবার বলছিলাম আব্বু ফিরে আসো আমি তোমাকে আমার আনা জাম্বুরা খেতে দেব।আমার নিজেকে খুব নির্দয় মনে হয়। খুব কষ্ট হয়। যে আমি নিজের বাবার মৃত্যুতে কান্না করিনি। কান্না করলেই তো আর ভালবেসে প্রকাশ পায় না। আমার মনে হয়েছিল আমার দুনিয়া থমকে গেছে। সবকিছু উলটপালট হয়ে গেছে। কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিন্তু চোখের সামনে আব্বুর মৃত দেহ পড়ে থাকতে দেখে কিভাবে চোখকে অবিশ্বাস করব। খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছিল সেদিন। কিন্তু কান্না করিনি। কান্না করিনি আমি। আমি আমার বাবার মৃত্যুতে কান্না করতে পারিনি। আমি আমার বাবার মৃত্যুতে কান্না করতে পারিনি। মন ভরে কান্না করতে পারিনি। "
এই কথা বলে ইনায়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।