অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ২৫

🟢

ইনায়া এখনো কেঁদেই যাচ্ছে।আরিশ তার পাশেই বসে আছে।না সে পারছে ইনায়াকে চুপ করতে বলতে আর না সে পারছে ইনায়াকে নিজের বুকে আগলে নিতে। যেখানে বিয়ের পর স্বামী যতক্ষণ না তার স্ত্রী কে দেনমোহর পরিশোধ করবে ততক্ষণ তার নিজের স্ত্রী কে স্পর্শ করতে পারবে না। সেই যায়গায় তো আরিশ ইনায়ার জন্য নন-মহরোম। তাদের মধ্যে কোনো পবিত্র সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ আরিশের ভালোবাসা পবিত্র। তাই তো সে তার সপ্তদর্শীকে এত কান্না করতে দেখেও কিছু করতে পারছে না, স্পর্শ করতে পারছে না।

আরিশের চোখ দিয়েও পানি পরছে।তার মতো শক্তপোক্ত পুরুষের চোখেও পানি তাও নিজের পছন্দের নারীর জন্য। বিষয়টি এমন নয় যে আরিশ কখনো কান্না করেনি।তার প্রত্যেক রাত শুধু চোখের পানি ভাসিয়ে কেটেছে।সে নামাজে সিজদায় পড়ে তার সপ্তদর্শীর জন্য দোয়া করত এবং আল্লাহর কাছে তাকে পাওয়ার জন্য দোয়া চাইত।আর তার সপ্তদর্শীকে হারানোর ভয়ে মোনাজাতে, সিজদাতে কাঁদতো। এমনকি ইনায়া কে পাওয়ায় জন্য আরিশ মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতো। তাহাজ্জুদ নামাজে ইনায়াকে চাইতো।সে সবসময় তার মোনাজাতে বলল সে কখনও তার সপ্তদর্শীকে কষ্ট পেতে দিবে না। অথচ তার ভালোবাসার মানুষটি তার চোখের সামনে বাচ্চার মতো কাঁদছে কিন্তু সে কিছু করতে পারছে না।সছ না তার ভালোবাসার মানুষটিকে জরিয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে পারছে না।সে কি এতটাই ব্যর্থ প্রেমিক পুরুষ?

আরিশ আকাশের দিকে তাকালো।তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরছে।সে চোখের পানি মুছার প্রয়োজন মনে করলো না।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,,,

--"আল্লাহ!! আমি কি এতটাই ব্যর্থ প্রেমিক পুরুষ যে কিনা নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে কষ্ট পেতে দেখছে কিন্তু তাকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। তাকে বুকে আগলে রাখতে পারছে না। আল্লাহ সবাই তো তোমার বান্দা।তুমি তো তোমার কোনো বান্দার কষ্ট দেখতে পার না তাহলে এইটুকু মেয়েকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন?আর আমাকে সেই অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত রেখছো কেন?যেই অধিকার দিয়ে তাকে আগলে রাখতে পারব‌।"

আরিশ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো তারপর তার মনে পড়ল এক আয়াত।সে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দেখল ইনায়ার কান্না কিছুটা কমেছে। এখন শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

আরিশ শান্ত কন্ঠে বলল,,,

--""আল্লাহ কোনো বান্দাকে ততটাই কষ্ট দেন, যতটা সে সহ্য করতে পারবে" এইটি সূরা বাকারার (আল-বাকারা) ২৮৬ নম্বর আয়াতে আছে।এত মানে আশা করি বুঝ।তার মানে তোমাকে আল্লাহ ততটাই কষ্ট দিচ্ছেন যতটা তুমি সহ্য করতে পারবে।আর আমার ইনু তো অনেক ধৈর্য্য শীল তাই না। তাহলে এতটা ভেঙ্গে পরলে চলবে ইনু পাখি।তখন যদি শক্ত থাকতে পারো তাহলে এখনো পারবে।এর থেকে বেশি শব্দ নেই যে আমার কাছে তোমাকে শান্তনা দেওয়ার। কিন্তু তুমি পারবে না আমার জন্য কান্না বন্ধ করতে? তোমার কান্না যে আমার সহ্য হয় না। কলিজা ফেটে যাচ্ছে। সহ্য হচ্ছে না ইনু, সহ্য হচ্ছে না। প্লিজ কেঁদনা।"

এই বলে আরিশ অন্য পাশে ফিরে গেল।তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।ইনায়া থমকে গেল।এই লোকটি তার জন্য কাঁদছে।তার কান্না দেখে ‌।এখন তো তার কাঁদলে চলবে না।

ইনায়া নিজেকে সামলে করুণ সুরে বলল,,,

--"এইযে দেখুন আমি কাঁদছি না।দেখুন আপনার ইনু আর কাঁদছে না।দেখুন আপনার ইনুর ঠোঁটে হাসি।"

বিজ্ঞাপন

আরিশ ইনায়ার দিকে তাকালো। ইনায়া হয়তো জানে না তার সামান্য কথায় কতটা প্রভাব ফেলেছে আরিশের উপর।

এইযে ইনায়া নিজের মুখ থেকে বলল,,,

--"তার ইনু।"শব্দটি ছোট হলেও অর্থ যে অনেক ভারি। এই শব্দের অর্থ যে ইনায়ার জানা নেই। কিন্তু আরিশের জানা আছে।আর সে এই অর্থ কে অর্থহীন হতে দিবে না।

এইসব ভেবে আরিশ ইনায়ার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল ইনায়া চোখ লাল হয়ে গেছে ‌চোখ ফুলে আছে। শ্যামলা মুখে চোখের নিচের কালো দাগ যেন আরো কালো লাগছে।আরিশ আর বেশি কিছু না ভেবে ইনায়ার মাথার উপর আলগস্তে হাত রাখলো।

তাকে সান্তনা দেওয়ার জন্য হয়তো।আরিশ মাথায় হাত রেখে বলল,,,

--"কি করেছো তুমি নিজের চোখের অবস্থা? কান্না করে কেউ নিজের এই অবস্থা করে? তোমার কি মাথা আমার উপর একটুও দয়া করতে ইচ্ছে করে না?বুঝনা কেন তোমার কষ্টে তুমি কষ্ট না পেলেও আমি পাই। আমার উপর তো একটু রহম করতে পারো ইনু।"

ইনায়া চুপ হয়ে গেল।তার চোখ পানিতে ছল ছল করে উঠলো।তার জন্য কেউ এইভাবে ভাবতে পারে? এতটা নিঃস্বার্থভাবে? যেখানে কোনো স্বার্থ ছাড়া মানুষ কিছু করে না। সেই যায়গায় তার জন্য এই লোকটি নিঃস্বার্থভাবে সব কিছু করছে। তাকে সামলাচ্ছে।না ইনায়া এই লোকটি পরিশ্রম বৃথা হতে দিবে না।ইনায়া আর কাঁদবে না। শুধু মাত্র আরিশের জন্য, শুধু মাত্র আরিশের জন্য। এই বলে ইনায়া নিজেকে প্রতিজ্ঞা করল।

তারপর মুচকি হাসি মুখে টেনে বলল,,,

--"আমি একদম ঠিক আছি মি. উগান্ডিয়ান। আমি আর কাঁদবো না। কাঁদলে তো আর সব পাওয়া যায় না।তাই কান্না করে মাথা ব্যথা বানিয়ে লাভ নেই। চলুন দেরি হয়ে গেছে।"

আরিশ হাসলো।ইনায়া মাথা থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,,,

--"এইতো আমার ইনুর মতোন কথা। I like this spirit. চলেন মেডাম। নিশ্চিত কান্না করার জন্য মাথা ব্যথা করছে। ঘরে গিয়ে রেস্ট নিবেন।"

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস