অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ২৭

🟢

আরিশ বসে বসে ছক কষছে কিভাবে সে তার নতুন মিশনে কাজ করবে।এখন যে তার ইনায়া কেউ দেখতে হবে।সে এখানে আসাতে এবং ইনায়াকে এত সাপোর্ট করাতে ইনায়া অনেকের চোখে খারাপ হয়ে গেছে। এখন যে ইনায়ার নিজের লোকই ইনায়ার ক্ষতি করতে পারে। এইসব ভেবে আরিশ তার মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছে।

_________________

ইনায়া ঘুম থেকে উঠে পড়ল।তার মাথা এখন কিছুটা ভালো লাগছে।সে প্রায় দেড় ঘন্টা খানেক ঘুমিয়েছে। এখন তার অনেকটা ভালো লাগছে। পাশে তাকিয়ে দেখল ইরিন ঘুমিয়ে আছে ইনায়া মুচকি হাসলো তারপর মাথায় ঘোমটা দিয়ে জামা ঠিক করে ঘর থেকে বের হলো। ঘরের পিছনে একটি চাপ কল ছিল। সেখানে চলে গেল তারপর একটা মগে পানি ভরে নিল। এবং হাত মুখ ধুয়ে নিল।

মনে মনে বলল,,,,

--"মাথা ব্যথার মলম তো আনতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও তেমন ব্যাথা নেই। হয়তো ঘুমোনোর কারণে।"

কিন্তু ইনায়া তো জানেই না এর পিছনেও আরিশ আছে।

ইনায়া রান্না ঘরে চলে গেল।দেখল প্রায় সব রান্না শেষ। মাটির ৩ টা চুলা থাকায় সুবিধা হয়েছে।

ইনায়া তার মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর বলল,,,

--"আম্মু মাথা ব্যথা করছে চা বানাই?"

তখনি পাশের বাড়ির এক কাকিমা। তাদের দূর সম্পর্কে আত্মীয় হয় উনি বললেন,,,

--"ইনায়া তুমি এক কাজ কর আমাদের বাসার রান্নাঘরে চলে যাও সেখানে সবকিছু আছে, চা কফি যা ইচ্ছা গ্যাসের চুলায় বানিয়ে ফেলো তাহলে সুবিধা হবে।"

ইনায়া সায় জানিয়ে পাশের বাড়িতে চলে গেল। নিজের জন্য বেশি করে লিকার, দুধ দিয়ে চা বানালো। শুধুমাত্র নিজের জন্য বানালো কারণ জানে এই গরমে এরকম মাঝ দুপুরে কেউ চা খাবে না। বরং তাকে খেতে দেখলে সবাই পাগল বলবে। তার চা যখন জালে ছিল তখন তার খেয়াল হলো আরিশ যদি কফি খায়? তাই সে বেশি কিছু না ভেবে আরিশের জন্য কফি বানিয়ে নিলো। তারপর একটি কাপে নিজের জন্য চা এবং আরেকটি তাকে কফি ঢেলে নিজের বাড়ির দিকে এলো। দেখলো সবাই বাড়ির উঠানে ,বারান্দায় থাকলেও আরিশ বাড়ির পিছনে একটি চেয়ারে বসে ছিল।

ইনায়া এক হাতে চায়ের কাপ এবং অন্য হাতে কফির কাপ নিয়ে আরিশের দিকে গেল।আরিশ তখনো মাথায় চুল খামচে ধরে আছে।চোখ বন্ধ তার।মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। হঠাৎ অনুভব করল তার প্রিয়সী তার খুব নিকটে।আরিশ চোখ খুলে পিছনে তাকিয়ে তার ঘোমটা ওয়ালি কে দেখতে‌ পেল।

আরিশ হাসার চেষ্টা করল।আরিশের পাশে আরেকটি চেয়ার ছিল। কিছুক্ষণ আগে তার বাবা এসে বসেছিল। এখন সেই চেয়ার খালি।

ইনায়া আরিশের পাশের চেয়ারে বসল। তারপর বিন বাক্যে আরিশের দিকে কফির মগ বাড়িয়ে দিল।আরিশ মুচকি হাসল।আসলে এখন তার কফির খুব প্রয়োজন ছিল।আরিশ আলগস্তে কফির মগ নিল যাতে ইনায়ার হাতের সাথে তার হাতের স্পর্শ না লাগে তার পর কফির মগে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।এই কফির স্বাদ অন্যরকম স্বাদ।

আরিশ নিজেকে প্রশ্ন করল,,,

--"ভালোবাসার মানুষের কি সব কিছুই ভালো হয়? নাকি আমরা ভালবাসি বলে তার সবকিছু নিজেদের চোখে ভালো করে তুলি। আসলে কেউই পারফেক্ট হয় না বরং নিজের চোখে তাকে পারফেক্ট করে নিতে হয় তাহলেই জীবন সুন্দর।"

আরিশের ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে ইনায়া বলল,,

--"কফি কি খাওয়ার যোগ্য? আসলে আমি জানি না আপনি কেমন খান, কতটুকু চিনি বা কতটুকু কফি। তাই নিজের মন মতো করে বানিয়েছি।"

আরিশ মুচকি হেসে বলল,,,,

--"তুমি যেমন করে বানাবে তেমন করেই খাব আমি। তুমি বানিয়েছ খারাপ কি করে হয় ইনু?"

ইনায়া মুখ ভেংচি কেটে বলল,,,

--"ইশ্ ঢং। তাহলে এক কাজ করি harpic দিয়ে চা বানিয়ে দেই এবং সান্ডার মাংস দিয়ে বিরিয়ানি। আপনি খুশি খুশি মগ চেটে চা খান এবং আঙ্গুল চেটে বিরিয়ানি খান।"

আরিশ কফির চুমুক দিয়েছিল এই সময় ইনায়ার এমন কথা শুনে মুখ থেকে কফি ফালিয়ে দিল।আরিশ তালুতে উঠে পড়ল।সে কাশতে কাশতে বলল,,,

--"তার থেকে ভালো আমাকে বিষ দিও। অবশ্যই তোমার হাতে বিষ এসে অমৃত তে পরিণত হবে।"

ইনায়া ভ্রু কুঁচকালো।আর মনে মনে বলল,,,

--"এই লোকটির ফ্লার্টিং শেষ হয়ে না।"

তারপর দুজনেই নিশ্চুপ।ইনায়া চা খাওয়া শেষ এবং আরিশের কফি। আরিশ ইনায়ার হাত থেকে চায়ের মগ নিয়ে নিজের কাছে রাখল। ইনায়া কিছু বলতে গেলে বলল,,,

--"বেশি কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকো।"

ইনায়া আর কিছু বলল না। হঠাৎ তার মনে হলো আরিশ কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত।সে জানে না তার এমন কেন মনে হলো। কিন্তু মনে হলো।ইনায়া আর বেশি কিছু না ভেবে আরিশ কে জিজ্ঞেস করল,,,

--"আপনি কি কোন বিষয় নিয়ে চিন্তিত? না মানে কেন জানিনা আমার মনে হল। আপনি চাইলে বলতে পারেন আর না চাইলে থাক।"

আরিশ অবাক হলো। তার ইনু তাকে বুঝতে শুরু করেছে। নয়তো সে কি করে বুঝতে পারলো আরিশ যে কিছু নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু বলতে পারবে না তো আরিশ তার চিন্তার বিষয়। এখনো যে সময় হয়নি।আরিশ তার চিন্তার বিষয় নিয়ে ভাবছে কিভাবে সে ইনায়া বলবে।

(আসুন আরিশের চিন্তার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানি।)

বিজ্ঞাপন

সাদমান মুলত আরিশ কে মেসেজ দিয়েছিল এক সিক্রেট মিশেনের জন্য।আর সেটি হলো লন্ডনের কিছু পাচারকারী দল যারা সেখানে পড়তে যাওয়া এশিয়ান মেয়েদের টার্গেট করেছে। মেয়েদেরকে লন্ডন থেকে ইতালি পাচার করে দিবে।আর আরিশ মূলত সেই বিষয় নিয়ে চিন্তিত কি করে কি করবে। সে শুধু জানে ওই টিমে কারা আছে এবং কোথায় তারা মেয়েদের আটকিয়ে রেখেছে। কিন্তু কিভাবে উদ্ধার করবে তার মাথার কিছুই আসছে না। তারপর আবার ইনায়ার চিন্তা।

আরিশ কথা ঘুরিয়ে ইনায়া কে বলল,,,

--"আসলে আমার একটা ফ্রেন্ড আছে যে Wattpad এ গল্প লিখে।তুমি শুনেছো এই অ্যাপটির নাম?"

ইনায়া উৎসাহ নিয়ে বলল,,,

--"কি যে বলেন Wattpad তো আমার প্রিয় অ্যাপ।আমি অনেক Stroy পড়েছি।"

আরিশ ভ্রু কুঁচকে ইনায়ার দিকে তাকালো তারপর বলল

--" বাহ্ তুমি তো দেখছি বেশ আপডেট।তো কি কি Wattpad Story পড়েছো?"

ইনায়া আমতা আমতা করে বলল,,,,

--"Inaam-E-Ishq, Insane For Her, The Mafia's Pure Desire, Ideal Match, His Innocent Wife, His Replace Bride, Nayantara, Drilling I Own You. এগুলো ছাড়াও আরো আছে।"

আরিশের কাশি উঠে গেল।সে ইনায়াকে কে ইনোসেন্ট ভেবেছিল কিন্তু ইনায়ার পড়া বই গুলো শুনে বুঝতে পারল মেয়ের fantasy সেই। তারপর এগুলো বেশিরভাগ মাফিয়া এবং সিক্রেট এজেন্ট রিলেটেড।

আরিশ মুচকি হেসে মনে মনে বলল,,,

--"যাক আমিও এজেন্ট তাহলে আমার ইনুর fantasy পূরণ হবে।"

তারপর বলল,,,

--"বাহ্ বাহ্ বেশ ভালো মেডাম। খুব ভালো গল্প পড়েছেন দেখছি।"

ইনায়া হেসে বলল,,,

--"কথা না ঘুরিয়ে নিজের সমস্যার কথা বলেন।"

আরিশ সায় দিল তারপর বলতে লাগলো,,,

--"তো যা বলছিলাম,, আমার বন্ধু গল্প লিখে। গল্পের নায়ক একজন সিক্রেট এজেন্ট। এবং তার একটা সিক্রেট মিশেন এসে পড়েছে।আর সেটি হলো লন্ডনের কিছু পাচারকারী দল যারা সেখানে পড়তে যাওয়া এশিয়ান মেয়েদের টার্গেট করেছে। মেয়েদেরকে লন্ডন থেকে ইতালি পাচার করে দিবে।আর নায়ক মূলত সেই বিষয় নিয়ে চিন্তিত কি করে কি করবে। সে শুধু জানে ওই টিমে কারা আছে এবং কোথায় তারা মেয়েদের আটকিয়ে রেখেছে। কিন্তু কিভাবে উদ্ধার করবে তার মাথার কিছুই আসছে না।"এখন এই বিষয়ে আমার বন্ধু কি লিখে তুলে ধরবে গল্পে সে তা বুঝতে পারছে না।"

এক টানে কথাগুলো বলে থেমে পড়লো যেন মনে হচ্ছে এগুলো তার মুখস্ত ছিল।

ইনায়া মনোযোগ দিয়ে কথা গুলো শুনছিল তারপর বলল,,

--"দেখুন, আপনি তো বলছেন গল্পের নায়ক জানে কারা আছে আর কোথায় তারা মেয়েগুলোকে আটকে রেখেছে। মানে, অর্ধেক পথ তো সে জেনেই গিয়েছে। এখন তার দরকার কেবল বুদ্ধি আর ধৈর্য।

সে চাইলে সরাসরি যুদ্ধে নামতে পারে, কিন্তু সেটা ঝুঁকিপূর্ণ—মেয়েগুলোর জীবন তখন আরও বিপদে পড়বে। বরং সে আগে তাদের দুর্বলতা খুঁজে বের করো। পাচারকারীরা যত শক্তিশালী হোক, কোথাও না কোথাও ফাঁক থাকবেই।

সে চাইলে আশেপাশের লোকজনকে কাজে লাগাতে পারো—যেমন বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটি, এলাকার মানুষ, এমনকি ওদের নিজেদের ভেতরের কাউকে। অনেক সময় ভেতরের একজন ছোট্ট বিশ্বাসঘাতকই পুরো খেলা ঘুরিয়ে দেয়।

আর একটা কথা শোনেন… বুদ্ধি দিয়ে করা লড়াই সবসময় শক্তি দিয়ে করা লড়াইয়ের চেয়ে জেতার সম্ভাবনা বেশি।সে যদি আগে তাদের জালে ফাঁদ পেতে ঢুকে যায়, তারপর হঠাৎ আঘাত করো—তাহলেই তারা বুঝতেই পারবে না কখন তারা ধরা পড়ে গেছে।"

ইনায়া এই বলে থামলো। তারপর বলল,,,

--"আপনা বন্ধু কে বলুন এরকম ভাবেই কিছু নিজের কথায় গল্পে তুলে ধরতে।"

আরিশ মনে মনে বলল,,,

--"তুমি জানো না ইনু তুমি আমার কত বড় উপকার করলে। এত ছোট একটা জিনিস আমার মাথায় আসেনি। কিন্তু তোমার ছোট মাথায় এত বড় একটা জিনিস চলে এসেছে। আসলেই তুমি আরিশ ইহতেশাম খানের বউ হবার যোগ্য। তোমার মধ্যে সব ধরনের গুন আছে। এখন তোমার বুদ্ধি দিয়ে এবং আমার মত করে আমি আমার এই লড়াই জিতব।"

তারপর আরিশ বলল,,

--"হুম খুব ভালো বলেছো। আমার বন্ধুকে বলব তোমার কথা অনুযায়ী যাতে সে কাজ করে। আর হ্যাঁ যদি সে সফল হয় তাহলে আমি তোমাকে ট্রিট দেব। এখন চলো ঘরে চলে যাই দুপুর হয়ে যাচ্ছে।"

ইনায়া সায় দিয়ে উঠে দাঁড়ালো তার চেয়ার হাতে নিতে যাবে এই সময়ে আরিশ‌ নিজের চেয়ার এবং ইনায়ার চেয়ার এক হাতে এবং অন্য হাতে দুটি কাপ নিয়ে বলল,,

--"সামনে হাটেন মেডাম।"IAM ALWAYS AT YOUR DISPOSAL MA'AM."

ইনায়ার গাল লাল হয়ে গেল।তার প্রিয় বই থেকে প্রিয় নায়কের ডায়লগ তাকেই বলছে।

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস