ইনায়া যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিঁড়ি দিয়ে নামছে।তার মনে হচ্ছে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে।সে যে তাকে অপেক্ষা করাতে পারবে না। কিন্তু সমস্যা তো এক জায়গায় যে ইনায়া কথায় কথায় এদিক সেদিক পরে যায়। এখনো তাই ঘটলো।ইনায়া একদম নিচ তলায় এসে পরেছে।তিন সিঁড়ি বাকি।সে এক সিঁড়ি বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সিঁড়ি তে পা রাখতে চায় কিন্তু পা ফসকে শেষ সিঁড়িতে চলে যায়। এবং বেকায়দায় পা ফেলার কারণে সে পরে যায়।ইনায়ার ফ্রেন্ড কিছু নিচে ছিল।তারা সাহায্য করবে কি আগে পাগলের মতো হাসতে লাগলো। কথায় আছে না বন্ধুরা আগে হাসে তারপর সাহায্য করে। এখনো তাই ঘটলো। এমনকি ইনায়া নিজেও হাসছে।সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর কাপড় থেকে ময়লা, ধুলো ঝাড়লো। এবং বান্ধবীদের তাকিয়ে কেবলা মার্কা হাসি দিয়ে আবার হাঁটতে লাগলো কলেজে বাইরে অপেক্ষাকৃত ব্যক্তির কাছে।
আরিশ এখনো বাইকে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। তার মন তাকে জানান দিচ্ছে জানালার ধারে যে মেয়ে বসে ছিল সেটি তার সপ্তদর্শী ছিল। এবং এখন তার সপ্তদর্শী তার নিকট আসছে। এবং আরিশ সেটার জন্য অপেক্ষা করছে।তার দৃষ্টি কলেজের গেটের দিকে।
আরিশের মুখে হাসি ফুটে উঠল যখন সে তার সপ্তদর্শীকে কলেজের গেইট থেকে হাসি মুখে বের হতে দেখল। ইনায়া হাসি মুখে গেইট থেকে বের হয়ে আরিশের কাছে গেল তারপর বলল,,,
--"আপনি এখানে?"
আরিশ ইনায়ার প্রশ্নের উত্তর দিবে এমন সময় খেয়াল করল ইনায়ার সাদা কলেজের ড্রেসের হাতায়,জামায় নিচে কোণায় ধুলো জমে আছে।আরিশ উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো প্রশ্ন করল,,,,,
--"ইনু তোমায় ড্রেসে ধুলো লাগলো কি করে?"
ইনায়া একটু হেসে বলল,,,,
--"ওই তেমন কিছু না just বেকায়দায় পা ফেলার কারণে পরে গিয়েছিলাম।"
আরিশ চিন্তিত কন্ঠে ব্যস্ত হয়ে বলল,,,,
--"কি!!!! তুমি ঠিক আছো তো? কোথাও ব্যথা পাও নি তো? সাবধানে চলাফেরা করতে পারো না? এত তাড়াহুড়ো কিসের হুম?এত কেয়ারলেস কেন তুমি ইনু।"
ইনায়া শান্ত কন্ঠে বলল,,,,,
--"আরে আরে এত ব্যস্ত হয়ে পরবেন না।আমি ঠিক আছি।এইসব ছোট খাট ব্যথায় আমার কিছু হয় না।আমি কষ্ট পাই না।"
আরিশ ইনায়ার চোখের দিকে চোখ রেখে আবেক প্রবণ স্বরে বলল,,,,
--"তোমার নিজের কষ্টে কষ্ট না হলেও আমার হয় কষ্ট তোমার কষ্ট দেখে। ভিতরটা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। সহ্য হয় না যে ইনু।"
ইনায়া থমকে গেল।কি বললো আরিশ।ইনায়ার কষ্টে তার কষ্ট হয় কিন্তু কেন?আরিশের কথা এবং ব্যবহার অন্য রকম তা ইনায়ার বুঝতে সমস্যা হয় না।সে এতদিন বিষয়টি লক্ষ্য করে নি এড়িয়ে গেছে। কিন্তু আজ আর পারছে না।তাই ইনায়া আর মনে প্রশ্ন চেপে রাখল না।
সে সরাসরি আরিশ কে জিজ্ঞেস করল,,,
--"যে জায়গায় সবাই আমাকে কষ্ট দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পায়,সেই জায়গায় আপনার কেন কষ্ট হবে আমার কষ্ট দেখে? আর আমি তো শুধু পরে গিয়েছিলাম সেখানে এত কষ্টের কি আছে? আর বিষয়টি এমন না যে আপনি আমাকে ছোটবেলা থেকে চিনেন আমার প্রতি আপনার অন্যরকম টান। উত্তর দিন।"
আরিশ চুপ হয়ে গেল।সে উত্তরে কি বলবে? হ্যাঁ তার কাছে উত্তর আছে কিন্তু সেই উত্তর এখন প্রযোজ্য নয়।আরিশ দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলো। তারপর মিথ্যা বলার জন্য মুখ খুললো।
--"আসলে আমার বাবার পর তোমার আব্বু আমার খুব কাছের। আর তুমি তোমার আব্বুর খুব কাছের। তোমার আব্বু সব সময় তোমার কথা বলতো। তুমি ওনার কাছে খুব স্পেশাল এবং উনি আমার কাছে। সেই হিসেবে তোমার যত্ন নেওয়া, তোমার জন্য চিন্তা করা আমার কাছে ফরজ।তাই আমি তোমার কেয়ার করি এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত করব।"
আরিশ থামল। কিন্তু ইনায়া,,,তার ভেতর ঝড় বয়ে গেল। শুধু মাত্র তার বাবার জন্য কেউ তার এত যত্ন করবে তা কখনো ইনায়া ভাবতে পারেনি।তাই সে নিজেকে এখন সে আরো বেশি ভাগ্যবতী মনে করছে কারণ তার বাবা বেঁচে থাকাকালীন যেমন তার যত্ন নিত মৃত্যু বরণ করার পরও তার যত্নের কমতি হওয়ার কোন ব্যবস্থা রাখেনি।আর ইনায়া আরিশের কথা বিশ্বাস করে নিল কারণ সে নিজেকে খুব স্পেশাল মনে করে না যে আরিশ তাকে আলাদ ভাবে ট্রিট করবে।তাই আরিশের কথা কে সে বিশ্বাস করল।
ইনায়া আরিশের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলল,,,,
--"তাই বলুন।যাই হোক এইসব টুকিটাকি পরে যাবার অভ্যাস আমার আছে। আর আমি ব্যথা পাইনি।আমি একদম ফিট।তাই চিন্তা করতে হবে না।"
আরিশ নিশ্চিত হলো যে ইনায়া তার কথা বিশ্বাস করেছে।সে চায় না বিষয়টি বেশি বড় হোক।তাই সে মুখে হাসি রেখে বলল,,
--"হ্যাঁ তোমার পরে যাবার বিষয় তো তোমার মা আগে বলে দিয়েছে। আচ্ছা তোমার কি সবার সামনে পরে যেতে একটুও আনকমফোর্টেবল ফিল হয় না?"
ইনায়া শব্দ করে হেসে উঠলো তারপর বলল,,,
--"যেখানে আমি জানি আমি যতই সোজা, সুন্দর জায়গা দিয়ে হাঁটি না কেন আমি পরেই যাব সেই জায়গায় লোক লজ্জার কথা ভেবে লাভ আছে? আর আমি পরে গেলে সবাই আমার পরে যাওয়া দেখে হাসার আগে আমি নিজেই হেসে উঠি।"
এই বলে আবার হাসতে লাগলো।
আরিশ মাথায় হাত দিল।আর মনে মনে বলল,,,,
--"হায় আল্লাহ আমি এই মেয়েকে কি করে সামলাবো। এখন তো আমার সত্যি মনে হচ্ছে এই মেয়েকে সামলাতে গিয়ে আমায় উগান্ডার পাগলা গারদে ভর্তি হতে হবে।"
তারপর আরিশ ইনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,,,,
--"হয়েছে মেডাম অনেক হেসেছেন। এখন বাইকে ওঠে আমার উপর দয়া করুন।"
ইনায়া ভাব নিয়ে বলল,,,,
--"অবশ্যই।আমার মন খুব বড়।এই সামান্য দয়া তো আমি করতেই পারি।"
আরিশ হাসলো।ইনায়া আজ আরিশের হাসি খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করল।গালে টোল পরা হাসি। এই হাসিতে যে কোন মেয়ে ফিদা হয়ে যাবে।আসলে আজকাল ইনায়া আরিশ কে খুব ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লেগেছে।তার কেন জানি মনে হচ্ছে আরিশ তার অভ্যাসে পরিনত হতে নিচ্ছে। কিন্তু ইনায়া এইটা হতে দিবে না। তাই তৎক্ষণিক নিজের দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল। এবং চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিল।
ততক্ষণে আরিশা বাইকে উঠে পড়েছে।সে ইনায়ার দিকে তাকালো।ইনায়া নিজেকে স্বাভাবিক করে আরিশের নিকটে এলো। কারণ সে জানে আরিশ এখন তার চশমা খুলে নিজের পকেটে রাখবে এবং তাকে নিজ হাতে হেলমেট পরিয়ে দিবে।
যেই ভাবনা সেই কাজ।আরিশ ইনায়া তার কাছে যেতে না যেতেই আরিশ সযত্নে ইনায়ার চোখের চশমা খুলে নিজের শার্টের পকেটে রাখল। তারপর খুব যত্ন সহকারে হেলমেট পরিয়ে দিল।
ইনায়া মনে মনে হাসলো কারণ তার ধারণা একদম ঠিক হয়ে গেল।
________________
ইমন খান রেশমা খানের সাথে কথা বলছে। সেখানে ইমন খানের বড় ছেলেও আছে।
ইমন খান উত্তেজিত কন্ঠে বললেন,,,,
--"আরিশ ছেলেটা খুব বেশি বাড়াবাড়ি করছে। আমায় তো ভয় করছে যতই বলুক যে তার জমি জামার প্রয়োজন নেই কিন্তু যদি ভাগ চায় তাহলে আমরা বিপদে পড়ে যাব।আমি কখনোই জমির ভাগ দিব না।আর এইসব কাগজ পাতি নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে ইনায়ার বাবার যেইসব জমির কাগজ নিজের কাছে আটকে রেখেছি সেগুলো বের হয়ে যাবে। এতে মহা মুশকিল হবে।"
রেশমা খান এবং ইমন খানের ছেলে সায় দিল। তারপর ইমন খানের ছেলে বলল,,,,
--"ইনায়ার খুব বার বেরেছে। নির্লজ্জের মত সেই ছেলেটির সাথে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে। বুঝি না যে এইসব বড়লোক ছেলে কে সে নিজের ফাঁদে ফাঁসাতে চাচ্ছে। যেখানে বাড়ির অন্য দুটি মেয়ের খুব সাধারণ পরিবারে বিয়ে হয়েছে সেখানে আমি বেঁচে থাকতে ইনায়ার সাথে কোন বড়লোক বা অসাধারণ ছেলের বিয়ে হতে দিব না।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইনায়া বিয়ে দিয়ে বের করব বাড়ি থেকে।"
রেশমা খান বলল,,,,
--"আহ্ থাম। শুধু শুধু মেয়েটির নামেই সব কথা বলো না। সবাই জানি মেয়েটি কতটা ভালো। আমি যতই তোমাদেরকে বেশি সাপোর্ট করিনা কেন, ইনায়া কিন্তু আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে। তাকেও আমি ফালিয়ে দিব না। তাই তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে তোমরা।"
ইমন খান এবং তার ছেলে চুপ হয়ে গেল। কারণ আপাতত রেশমা খান তাদের ডাবার গুটি। এই গুটিকে তারা হারাতে পারবে না তাই যতদিন প্রয়োজন ততদিন ব্যবহার করবে।