অচেনা ছায়া তুমি

পর্ব - ৩২

🟢

ইনায়া সবে মাত্র ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসলো।আধ ঘন্টা আগে আরিশ তাকে গেটের সামনে নামিয়ে দিয়েছে। এবং বলে গেছে যে তার এক বন্ধু লন্ডন থেকে এসেছে,আরিশ তাকেই আনতে যাবে।

ইনায়া ফোন হাতে নিল। কিছু একটা ভেবে ইনস্টাগ্রামে ঢুকে আরিশের একাউন্টে চলে গেল। আরিশের প্রোফাইল পিক দেখে ইনায়া বড়োসর ক্রাশ খেল।আরিশের প্রোফাইল পিক ছিল একদম aesthetic.....____ "A Cozy, Ribbed Browny Turtleneck Sweater paired with sleek black tailored trousers.The ensemble is completed with matching black socks, polished black leather dress shoes,a minimum silver wrist watch and a simple black belt."---(একটি আরামদায়ক, রিবড ব্রাউন টার্টলনেক সোয়েটার পরা, স্মার্ট কালো টেইলার্ড ট্রাউজারের সঙ্গে। পুরো সাজটি সম্পূর্ণ হয়েছে মানানসই কালো মোজা, ঝকঝকে কালো চামড়ার ড্রেস জুতো, সাধারণ কালো বেল্ট এবং মিনিমাল সিলভার হাতঘড়ি দিয়ে।)

ইনায়া পিক জুম করে দেখল।আরিশের মুখ দেখা যায় না।সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে তার গলার অংশটা। হালকা ঝুঁকে থাকার কারণে কণ্ঠনালী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।তার মুখে লাল আভা ফুটে উঠল। রাগে?না বরং লজ্জায়।সে মনে মনে বলল,,,,,,

--"ইশ্ কি কিউট দেখতে উনি।"

ইনায়া আরিশের Account Full Scroll করল।দেখল বেশিরভাগ ছবিতে আরিশ বাদামি রঙের পোশাক পড়েছিল‌।ইনায়া বুঝে ফেলল যে আরিশের প্রিয় রং বাদামি।ইনায়া মুচকি হাসলো তারপর আরিশের বার্থডে দেখল।১ ডিসেম্বর।ইনায়া আরো বেশি খুশি হলো কারণ আরিশের জন্মদিন চলে যায়নি এবং আসতে দেরি আছে। তো ইনায়া টাকা জমিয়ে তাকে কিছু একটা উপহার দিতে পারবে।ইনায়া আরো কিছু ভেবে আরিশের কিছু ছবি স্ক্রিনশট দিয়ে ক্রপ করে রেখে দিল গ্যালারিতে। তারপর আরিশের আইডি থেকে বের হয়ে গেল।ইনায়ার মুখে ছিল হাসি এবং এক রাশ প্রশান্তি।

কিন্তু এই হাসি বেশিক্ষণ টিকলো না।তার সামনে এলো এক জনের আইডি। ডাক্তারের পোশাক পরিহিত এক পুরুষের ছবি।ইনায়া থমকে গেল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। মনে হচ্ছে তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।হাত কাঁপতে লাগল।ইনায়া কাঁপা কাঁপা হাতে সেই ব্যক্তির আইডিতে গেল।তার চোখ পড়ল আইডির নামে।

--"সানিউল ইসলাম।"

ইনায়া একবার কাঙ্খিত ব্যক্তির ছবির দিকে তাকালো। কিন্তু এখন তার কোনো অনুভূতি হলো না‌।না কোনো ভালোবাসা আর না কোনো ঘৃণা। কারণ কোনো ব্যক্তিকে ঘৃণা করতে চাইলেও সেই ব্যক্তিকে নিজের মনে এবং মাথায় স্থান দিয়ে তারপর তাকে ঘৃণা করতে হবে। কিন্তু হয়তো এই ব্যক্তিটির স্থান নেই ইনায়া জীবনে,মনে আর না মাথায়।তাই ইনায়ার ঘৃণাও হলো না।

ইনায়া বেশি কিছু না ভেবে আইডির নামের নিচে থ্রি ডটে ক্লিক করে ব্লক অপশনে ক্লিক করলো এবং ব্লক করে দিল। কারণ ব্লক না করলে আইডি তার সামনে আসত ইনায়া তা চায় না।এই ব্যক্তিটি কে সে দেখতে চায় না।

ইনায়া তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে নিজেকে বলল,,,,

--"কি অদ্ভুত তাইনা। আগে যাকে দেখার জন্য তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে কান্না করতে করতে আল্লাহর কাছে চাইতাম,যার আইডি একবার দেখার জন্য ১৭/১৮ টা ফেইক আইডি পর্যন্ত খুলে ছিলাম এখন সে নিজে থেকে এসে ধরা দিলেও তাকে দেখতে রুচিতে হয় না।"

ইনায়ার চোখ গেল তার বাম হাতের দিকে। তারপর জামার হাতা কুনি পর্যন্ত উঠালো।হাতের নিচের নরম মাংসের অংশে অতীতের কাঁটা দাগ এখনো স্পষ্ট। এখনো স্পষ্ট একটি অক্ষর যা হলো S অর্থাৎ সানিউল। এবং এই অক্ষের পাশে অনেক গুলো কাঁটার দাগ।যা একদম তার হাতের কব্জি পর্যন্ত গেছে।ইনায়ার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।এই কাঁটা দাগের জন্য তার কত কিছুই না শুনতে হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তার মা বলেছিল রাগের মাথায়,,,,

--"একেই তো মেয়ে তার উপর আবার অতীত এইগুলো কি কম ছিল?আবার হাতের কাঁটা দাগ।তাতেও আবার S অক্ষর স্পষ্ট বোঝা যায়।কোন ছেলে বিয়ে করবে তোকে?আর যদি যার সাথে তোর বিয়ে হয় তার নামের প্রথম অক্ষর যদি S দিয়ে শুরু না হয় তাহলে?কে গ্ৰহণ করবে তোকে? তুই কি ভুলে যাস তুই মেয়ে।"

তখন ইনায়া কিছু বলেনি বরং নিরবে, নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলেছে।তার এমন হাজারো রাত গেছে সে এশারের নামাজ পড়ে বিছানায় শুয়েছে নয়টায় ঘুমানোর জন্য কিন্তু ঘুমাতে পারেনি। শুধু কাঁদত।যা কেবল তার আল্লাহ এবং দুই কাঁধের ফেরেস্তা ছাড়া আর কেউ জানতো না।সে কাঁদত আর আল্লাহ কে কাঁদতে কাঁদতে হাজারো প্রশ্ন করত। তার কান্না বন্ধ হতো যখন বুঝতে পারতো তার মা তার পাশে এসে শুয়েছে। এমনো রাত গেছে সে ৯ টা থেকে রাত ১০,১১ টা পর্যন্ত অন্ধকার রুমে শুয়ে শুয়ে নিঃশব্দে কাঁদত এবং তার মা আসলে ঘুমোনোর ভান ধরতো‌। এবং ঘুমিয়ে পড়েতো।

আবার ঘুম ভাঙ্গতো তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য দিয়ে রাখা এলামের শব্দে।রাত দুইটায় ।তখন উঠে ওযু করে নামাজে কাঁদতো। কখনো কখনো তার চার রাকাত নামাজের জন্য ১ ঘন্টা সময় চলে যেত শুধু মাত্র সেজদায় পড়ে কান্না করার জন্য। নামাজ শেষে পড়ার টেবিলে বসতো ঠিকই কিন্তু পড়তে পারতো না।সেড ভিডিও সামনে আসতো তা দেখে কাঁদতো।তার মনের মাঝে থাকা কাঙ্খিত ব্যক্তির ছবি দেখে কাঁদতো,তার আইডি তে ১০০০ বার যেত। দেখতো কোনো মেয়ের কমেন্ট আছে কিনা,লাইক আছে কিনা। এইসব করতে করতে তার পড়ার সময় চলে যেত এবং ফজরের ইবাদতের সময় চলে আসতো‌। মূলত ইনায়ার ঠিক মতোন না ঘুমানো এবং এত কান্নার কারণে মাথাব্যথার সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

এইসব ভাবতে ভাবতে ইনায়ার চোখ থেকে থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।তার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে কিন্তু সে তা পারবে না।ইনায়া ফুঁপিয়ে উঠলো। মুখ দিয়ে কান্নার শব্দ বের হতে নিল কিন্তু ইনায়া তার হাতের নরম মাংসে কামড় বসালো যাতে তার কান্নার শব্দ শোনা না যায়।সে এভাবেই কান্না করতে থাকলো।এক পর্যায়ে কান্না করতে করতে প্যানিক অ্যাটাক শুরু হলো। এইটা নুতন কিছু না বরং ক্লাস নাইনের থেকে ইনায়ার প্যানিক অ্যাটাক হতো।

ইনায়া নিজের হাতের থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো তার মনে হচ্ছে যেন হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা দ্রুত অনিয়মিতভাবে স্পন্দিত হচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বা দম বন্ধ হয়ে আসার মতো অনুভূতি হচ্ছে ।মনে হচ্ছে যেন পাগল হয়ে যাচ্ছে বা মারা যাবে এক্ষুনি।অস্বাভাবিকভাবে বেশি ঘামতে লাগলো।শরীর কাঁপতে লাগলো। হাত ভীষণ কাঁপছে।

ইনায়া বিছানায় চাদর শক্ত করে চেপে ধরলো তারপর নিজেকে শান্ত করতে লাগলো। অনেকক্ষণ পর সে নিজেকে স্বাভাবিক করতে সক্ষম হলো।তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল।বুক ধড়ফড় করছে এখনো।

ইনায়া নিজের হাতের দিকে তাকালো তারপর আবার কাটা দাগ চোখে লাগলো।ইনায়া তারাতাড়ি নিজের জামার হাতা নামিয়ে ফেলল।

সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার জন্য বলল,,,,

--"ইনু শান্ত হোও। তুমি একদম ঠিক আছো।সব ঠিক আছে। এইসব কিছু না। তুমি যদি তখন পারো এত বড় যন্ত্রনার সামলে এতটুক এগিয়ে আসা। তাহলে এখন তো তোমার মধ্যে কোন পিছুটান নাই সেই হিসেবে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই।সব কিছু ঠিক আছে।"

ইনায়া শান্ত হলো। তার চোখ খুললো কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মনে পড়ল সে এতক্ষণ কি করছিল। নিজেকে আরিশের মতো শান্তনা দিল।আরিশ তাকে যেভাবে শান্তনা দেয় ঠিক সেইভাবে এখন সে নিজেকে শান্তনা দিল। এবং তার থেকে বড় কথা তার স্বপ্নে আসা অচেনা ছায়া ও তাকে ঠিক এভাবেই শান্তনা দিত। এবং যা আরিশের দেওয়া সান্তনার সাথে মিলে যেত।

ইনায়া নিজে নিজে বলল,,,,

--"আরিশই ,,,,, আমার স্বপ্ন আমার আসা #অচেনা_ছায়া_তুমি নয়তো?

বিজ্ঞাপন
অচেনা ছায়া তুমি গল্পটি নাজনীন নেছা নাবিলা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় পারিবারিক ও রোমান্টিক উপন্যাস